এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের চতুর্থ পাঠের অন্তর্গত ‘ছন্নছাড়া’-এর কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

‘ঘেঁষবেন না ওদের কাছে।’ – এই সাবধানবাণী কে উচ্চারণ করেছেন? ‘ওদের’ বলতে কাদের কথা বোঝানো হয়েছে? ওদের কাছে না ঘেঁষার পরামর্শ দেওয়া হলো কেন?
এই সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন কবি যে ট্যাক্সিতে উঠেছিলেন, তার ড্রাইভার। ওদের বলতে এখানে সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই সমস্ত ছেলেদের কথা বলা হয়েছে, যারা মূলত ছন্নছাড়া, চালচুলোহীন এবং সকলে যাদের মনে করে যে তারা আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি, সৌজন্য-শিষ্টাচার, শালীনতা-ভদ্রতা কোনো কিছুরই ধার ধারে না, তাদেরই বোঝানো হয়েছে। ওদের কাছে না ঘেঁষার পরামর্শ ট্যাক্সি ড্রাইভার এই কারণেই দিয়েছে যে, সে মনে করে ওরা সমাজের কাছে গ্রহণীয় নয়, অর্থাৎ যে যে উপাদানগুলি থাকলে একজন ব্যক্তিকে সভ্য বা ভদ্র বলা যায়, তার কোনোটিই ওদের স্বভাবে বা জীবনে নেই।
‘তাই এখন এসে দাঁড়িয়েছে সড়কের মাঝখানে।’ – এখানে কাদের কথা বলা হয়েছে? তাদের জীবনের এমন পরিণতির কারণ কবিতায় কীভাবে ধরা পড়েছে, তা নির্দেশ করো।
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘ছন্নছাড়া’ কবিতায় এখানে সেই সমস্ত চালচুলোহীন ছন্নছাড়া যুবকদের কথা বলা হয়েছে, যারা গলির মোড়ে একেবারে সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল এবং তাদের পরনে চোঙা প্যান্ট, চোখা জুতো আর তাদের মেজাজ সব সময়েই রুক্ষ। এদের জীবনের এমন পরিণতির কারণ হলো তাদের জীবনের চারদিকে কেবল ব্যর্থতা আর শূন্যতা। এরা কলেজে ভর্তি হতে পারে না। এরা কোনো অফিস বা কারখানায় কাজ পায় না, বাড়িতে আশ্রয় পায় না, কোনো আদর্শ মানুষকে পায় না যাকে অনুসরণ করতে পারে বা কারও কাছ থেকে এতটুকু প্রেরণাসঞ্চারী ভালোবাসা পায় না। এই সব কারণে জীবনে কেবল হতাশা ও শূন্যতার চাপেই এদের জীবনের এমন পরিণতি ঘটে।
‘জিজ্ঞেস করলুম, তোমাদের ট্যাক্সি লাগবে?’ – প্রশ্নবাক্যটিতে প্রশ্নকর্তার কোন্ অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে? তাঁর এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়ার পর কীরূপ পরিস্থিতি তৈরি হলো?
প্রশ্নবাক্যটির মধ্য দিয়ে রাস্তায় জড়ো হওয়া ছন্নছাড়া এবং সমাজের কাছে উপেক্ষিত যুবকদের প্রতি প্রশ্নকর্তার গভীর সহানুভূতি ও মানবিকতাবোধের পরিচয় ধরা পড়েছে। তাঁর এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল সেই সব যুবকদের আচরণে এক ধরনের অপ্রত্যাশিত তৎপরতা ফুটে উঠেছে। তারা যেন অভাবিতভাবে একটা বিরাট মূল্যবান কিছু পেয়েছে এমনটা মনে হলো, কেননা তারা সোল্লাসে সিটি দিয়ে ‘পেয়ে গেছি পেয়ে গেছি’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। কেননা গাড়িতে সদ্য চাপা পড়া এক ভিখিরির আহত রক্তাক্ত দলাপাকানো দেহটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সঠিক মুহূর্তেই প্রশ্নকর্তার ‘ট্যাক্সি লাগবে!’ প্রশ্নটি এক ধরনের অভাবিত আশাপূরণের মতো উত্তেজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল।
‘প্রাণ আছে, এখনও প্রাণ আছে।’ – এই দুর্মর আশাবাদের ‘তপ্ত শঙ্খধ্বনি’ কবিতায় কীভাবে বিঘোষিত হয়েছে তা আলোচনা করো।
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত রচিত ‘ছন্নছাড়া’ কবিতায় দেখি, যখন চালচুলোহীন বেকার ছন্নছাড়া ছেলেরা অপ্রত্যাশিতভাবে ট্যাক্সি পেয়ে যায়, তখন তারা আশ্চর্য উল্লাসে নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে এবং রাস্তায় গাড়িতে সদ্য চাপা পড়া আহত রক্তাক্ত ভিখিরিকে ট্যাক্সিতে তোলার সময় ‘প্রাণ আছে, এখনও প্রাণ আছে’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে। যাকে তারা হয়তো বা ‘মৃত’ বলেই ভেবেছিল, তার প্রাণ আছে এবং সে বেঁচে যেতে পারে, ছন্নছাড়া যুবকদের এই আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে এই কবিতায় এক গভীর সত্য ফুটে উঠেছে যে, একইভাবে এই উপেক্ষিত মানুষগুলোও প্রাণবন্ত, তাদের চোখেও স্বপ্ন, মনে আশা এবং হৃদয়ে ভালোবাসা আছে। এদেরও সমাজ ‘মৃত’ বা পরিত্যক্ত বলে মনে করে হয়তো, কিন্তু এরাও মরে যায়নি। এরা বেঁচে থাকা ও বাঁচিয়ে রাখার আশাকে বহন করে চলেছে। এই কবিতায় সেই আশাবাদের ‘তপ্ত শঙ্খধ্বনি’ প্রাণের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে বিঘোষিত হয়েছে।
কবিতায় নিজের ভব্যতা ও শালীনতাকে বাঁচাতে চাওয়া মানুষটির ‘ছন্নছাড়া’দের প্রতি যে অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে তা বুঝিয়ে দাও।
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘ছন্নছাড়া’ কবিতায় যে মানুষটি রাস্তার ছন্নছাড়া ও সমাজে উপেক্ষিত ছেলেদের জন্য নিজের ভাড়া করা ট্যাক্সিটি ছেড়ে দিলেন, তিনি যখন দেখলেন তারা একটি গাড়ি চাপা পড়া আহত রক্তাক্ত ভিখিরির দেহ ট্যাক্সিতে তুলছে, তখন তিনি সেই রক্তের দাগ যাতে নিজের গায়ে-পোশাকে না লাগে, সেই ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে ট্যাক্সি থেকে নেমে যান। কবি বলেছেন, হয়তো বা ভিখিরির রক্তে যদি তাঁর সামাজিক ভব্যতা বা কৃত্রিম শালীনতা ক্ষুণ্ণ হয়, সেই কারণেই হয়তো সেই ব্যক্তি নেমে গিয়েছিলেন। কিন্তু এর পরে যখন সেই ব্যক্তির মনের মধ্যে সেই সব ছন্নছাড়া মানুষদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ধরা পড়ে, তখন বোঝা যায় তিনি কতখানি মানবিক। শহরের সর্বত্র তিনি তাদের উচ্চারিত ‘প্রাণ আছে, এখনও প্রাণ আছে’ বাক্যটি প্রতিধ্বনিত হতে শোনেন এবং এই অনুভূতি মূলত সেই ‘ছন্নছাড়া’ মানুষদের প্রতি আস্থা, প্রত্যয় ও নির্ভরতারই প্রকাশ।
কবিতায় ‘গাছটি’ কীভাবে প্রাণের প্রতীক হয়ে উঠেছে তা আলোচনা করো।
লেখক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত জরুরি কাজে যখন ট্যাক্সি চেপে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন রাস্তার ধারে গলির মোড়ে দেখতে পেলেন একটি জীর্ণ, শীর্ণ, নীরস, বিগত সবুজের কাঠামোকে তুলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মুমূর্ষু এক গাছকে। কিন্তু ফেরার পথে যা দেখলেন, তাতে তিনি যেন কিঞ্চিৎ বিস্মিত আবার কিঞ্চিৎ আশ্বস্তও। যাওয়ার সময় দেখে যাওয়া গাছটিতে যেন দেখছেন হাজার হাজার সোনালি কিশলয়ের মর্মরিত গুঞ্জন, যেন গুচ্ছে গুচ্ছে উথলে উঠছে ফুল। উড়ে আসা রংবেরঙের পাখির কলকণ্ঠের কাকলি যেন মুগ্ধ করছে প্রকৃতিকে। যেন প্রাণের স্পন্দনে, মানবিকতার ছোঁয়ায় নবরূপে সজ্জিত হয়েছে প্রকৃতি। পথের ধারে পড়ে থাকা ভিখিরির মূল্যহীন প্রাণের দাবি যেন মানবিকতার ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আর তারই হাত ধরে সমগ্র প্রকৃতি পেল বিলুপ্তপ্রায় মানবিকতার এক সঞ্জীবনী মহৌষধ। তাই গাছটি প্রকৃত অর্থেই যথার্থ প্রাণের প্রতীক।
‘এক ক্ষয়হীন আশা / এক মৃত্যুহীন মর্যাদা’ – ‘প্রাণকে’ কবির এমন অভিধায় অভিহিত করার সঙ্গত কারণ নিজের ভাষায় বিশ্লেষণ করো।
‘ছন্নছাড়া’ কবিতায় প্রথমেই কবি গাছের একটি প্রতীক চিত্র ব্যবহার করেছেন। তিনি গাছটিকে প্রথমে গাছ বললেও, পরে তাকে গাছের প্রেতচ্ছায়া বলেছেন। কবির মনে হয়েছিল, যে গাছ মানুষকে বাঁচাতে সাহায্য করে, তাতে আর প্রাণ নেই। সেই প্রাণহীন গাছটি যেন গোটা মানবসমাজের প্রতীক। ওই গাছটির মতো যুবসমাজও নষ্ট হয়ে গেছে।
কিন্তু, প্রাণ সম্পর্কে কবির এই ধারণা বদলে গেল, যখন তিনি দেখলেন তাঁর ট্যাক্সিতে সেই ছন্নছাড়া যুবকের দল এক বেওয়ারিশ ভিখিরির রক্তাক্ত দেহ তুলে নিল এবং “প্রাণ আছে, প্রাণ আছে” বলে সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল।
কবি বুঝলেন যে, যে-যুবসমাজকে তিনি প্রাণহীন মনে করছিলেন, তাদের মধ্যেও রয়েছে পরোপকারী মানসিকতা ও দয়ামায়া—যেগুলি জীবনের লক্ষণ। তাই শেষে কবি দেখলেন, প্রেতের মতো গাছটির ডালে ডালে সবুজ সোনালি পাতার সমারোহ। অর্থাৎ, এই পৃথিবী প্রাণময় হয়ে উঠুক, এটাই কবির আশা। কিন্তু প্রাণ না থাকলে পৃথিবী জড়বস্তুতে পরিণত হবে। কারণ, প্রাণ আশার প্রতীক, প্রাণ ভরসার প্রতীক, প্রাণ হচ্ছে মৃত্যুহীন। এক প্রাণ চলে যায়, সৃষ্টি করে যায় আর-একটি প্রাণ; তাই পৃথিবী কখনো প্রাণশূন্য হয় না। এই কারণে কবি প্রাণকে বলেছেন— ‘এক মৃত্যুহীন মর্যাদা’।
‘ওরা বিরাট এক নৈরাজ্যের—এক নেই রাজ্যের বাসিন্দে।’ – ‘ওরা’ কারা? তাদের সম্পর্কে এমন কথা বলা হয়েছে কেন?
ওরা বলতে এখানে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের লেখা ‘ছন্নছাড়া’ কবিতায় উল্লিখিত ছন্নছাড়া বেকার ছেলেদের বোঝানো হয়েছে। সেই সব ছন্নছাড়া বেকার ছেলেদের যুগের চাপে কিছুই নেই। তাদের না আছে ভিটে, না আছে ভিত, না আছে রীতিনীতি। আইনকানুন, বিনয়-ভদ্রতা, শ্লীলতা-শালীনতা এসব কিছুই নেই তাদের। ওদের জন্য কলেজে সিট নেই, অফিসে চাকরি নেই, কারখানায় কাজ নেই, ট্রামে-বাসে জায়গা নেই। তাদের জন্য মেলায়, খেলার মাঠে টিকিট নেই, হাসপাতালে শয্যা নেই, বাড়িতে ঘর ও খেলার মাঠ নেই। তাদের অনুসরণ করার মতো নেতা নেই, প্রেরণা-জাগানো প্রেম নেই। এমনকি তাদের প্রতি সম্ভাষণে কারও দরদ নেই। এ কারণেই তাদের সম্পর্কে প্রশ্নোক্ত কথাটি বলা হয়েছে।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের চতুর্থ পাঠের অন্তর্গত ‘ছন্নছাড়া’-এর কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করলাম। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যালয়ের বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের উপকারে এসেছে। যদি তোমাদের কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।





Leave a Comment