আমরা আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দশম অধ্যায় ‘দক্ষিণ আমেরিকা’-এর গুরুত্বপূর্ণ উপবিভাগ ‘আমাজন অববাহিকা’ থেকে কিছু বাছাই করা ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার (Competitive Exams) জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অষ্টম শ্রেণির ভূগোল: আমাজন অববাহিকা (দক্ষিণ আমেরিকা) – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর
আমাজন অববাহিকার ভূপ্রকৃতি, নদনদী ও জলবায়ুর পরিচয় দাও।
অথবা, আমাজন নদী অববাহিকার বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।
ভূপ্রকৃতি –
প্রায় তিনদিকে পর্বতবেষ্টিত আমাজন অববাহিকার মধ্যভাগ প্রায় সমতল হলেও পূর্ব দিকে এই সমভূমি ক্রমশ ঢালু। মানাওসের পশ্চিমে এই অববাহিকা সবচেয়ে বেশি চওড়া হলেও পূর্ব দিকে গিয়ানা ও ব্রাজিলের উচ্চভূমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় এই অববাহিকা অনেক সরু হয়ে গিয়েছে। প্রধান নদী আমাজন ও তার উপনদীসমূহ বহুকাল ধরে পলি সঞ্চয় করে এই সমভূমির সৃষ্টি করেছে। অববাহিকার পশ্চিম দিকের কিছু অংশ পার্বত্যময় উচ্চভূমি। তাই ভূপ্রকৃতি অনুযায়ী আমাজন অববাহিকাকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায় – 1. পশ্চিমের উচ্চভূমি এবং 2. মধ্য ও পূর্ব দিকের পলিগঠিত সমভূমি। নিম্নভূমি, পরিত্যক্ত নদীখাত, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ, জলাভূমি, ছোটো ছোটো পাহাড় ও মালভূমি নিয়ে আমাজন অববাহিকা গড়ে উঠেছে। এই অববাহিকার উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকের ভূমি মধ্যের সমভূমির দিকে ঢালু হয়ে গিয়েছে। মধ্যের সমভূমি অঞ্চলের ভূমির ঢাল খুব কম হওয়ায় আমাজন নদী এই অংশের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে খুব ধীরগতিতে প্রবাহিত হয়েছে। আমাজনের মধ্য ও নিম্নগতিতে অসংখ্য জলাভূমি, খাল, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ প্রভৃতি দেখা যায়। মোহানার কাছে আমাজন নদী অনেকগুলি বদ্বীপ গঠন করেছে, যার মধ্যে ইলহা-দা-মারাজো দ্বীপটি বৃহত্তম নদীদ্বীপ।
নদনদী –
আমাজন – পৃথিবীর বৃহত্তম (জল বহনের দিক থেকে) ও দ্বিতীয় দীর্ঘতম এবং আমাজন অববাহিকার সর্বশ্রেষ্ঠ নদী আমাজন। আন্দিজ পর্বতের মিশমি শৃঙ্গ থেকে উৎপন্ন ম্যারানন এবং উকায়ালি ও ওয়ায়াগা নদীর মিলিত প্রবাহ পেরুর ইকুইটসের পর থেকে আমাজন নামে প্রবাহিত হয়েছে।
উপনদী –
- আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চল থেকে উৎপন্ন আমাজনের উপনদীগুলি হল – ম্যারানন, জাপুরা, উকায়ালি, নাপো, পুরুস, জুরুয়া, মদিরা ইত্যাদি।
- উত্তরের গিয়ানা উচ্চভূমি থেকে উৎপন্ন নেগ্রো নদী মানাওসের কাছে আমাজনের সঙ্গে মিশেছে।
- ব্রাজিলের উচ্চভূমি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন আমাজনের উপনদীগুলি হল – টাপাজোস, জিঙ্গু ইত্যাদি।
শাখানদী – মোহানার নিকট আমাজন থেকে পারা নামে এক শাখানদী প্রবাহিত হয়েছে। ব্রাজিলের উচ্চভূমি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে টোকানটিস নদী পারা নদীতে মিলিত হয়েছে।
জলবায়ু –
- প্রকৃতি – আমাজন অববাহিকা নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলে অবস্থিত। এই জলবায়ুর প্রকৃতি উষ্ণ ও আর্দ্র।
- উষ্ণতা – এখানে কোনো ঋতু পরিবর্তন হয় না-সারাবছর আর্দ্র গ্রীষ্ম ঋতু বিরাজ করে। এখানে বার্ষিক গড় উষ্ণতা 27°C।
- বৃষ্টিপাত – প্রায় প্রতিদিন অপরাহ্নে এখানে বজ্রবিদ্যুৎসহ পরিচলন বৃষ্টিপাত হয়। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত 250-300 সেমি।
- আর্দ্রতা – এই অঞ্চলের বায়ুতে আর্দ্রতার পরিমাণ খুব বেশি থাকায় আবহাওয়া স্যাঁতসেঁতে, অস্বস্তিকর ও অস্বাস্থ্যকর।

আমাজন অববাহিকার স্বাভাবিক উদ্ভিদ এবং জীবজন্তুর পরিচয় দাও।
স্বাভাবিক উদ্ভিদ –
- প্রচুর বৃষ্টিপাত ও বেশি উষ্ণতার জন্য আমাজন অববাহিকায় এক গভীর অরণ্য সৃষ্টি হয়েছে। সারাবছর বৃষ্টিপাত হওয়ায় এখানে গাছের পাতাগুলি সারাবছর সবুজ থাকে। এজন্য এই অরণ্যের নাম নিরক্ষীয় বৃষ্টি অরণ্য বা নিরক্ষীয় চিরসবুজ অরণ্য।
- মেহগনি, সিডার, ব্রাজিল নাট, রবার, আবলুশ, আয়রন উড, পাম প্রভৃতি এই অরণ্যের উল্লেখযোগ্য বৃক্ষ। আমাজন অববাহিকার এই অরণ্যকে স্থানীয়ভাবে সেলভা বলে।
- গাছগুলি ঘন সন্নিবদ্ধভাবে অবস্থান করার জন্য বনভূমির উপরিভাগ এতই দুর্ভেদ্য যে দুপুরবেলাতেও সূর্যালোক ভালোভাবে অরণ্যের ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না। তাই দিনের বেলাতেই গোধূলি অবস্থার সৃষ্টি হয়। বনভূমির তলদেশ থাকে স্যাঁতসেঁতে, আর্দ্র এবং বিভিন্ন ঝোপঝাড়, আগাছা, ফার্ন, ছত্রাক, শৈবাল, লতাপাতা ও পরজীবী উদ্ভিদে পরিপূর্ণ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিষাক্ত কীটপতঙ্গ ও পোকামাকড় এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এই বনভূমির কাঠ তেমন ব্যবহার করা যায় না। এখানকার অরণ্যের গাছগুলির কাঠ খুব শক্ত হয়।
জীবজন্তু –
গভীর বনভূমির জন্য এখানে নানা ধরনের জীবজন্তু আছে। তবে ঝোপঝাড়, ভিজে মাটি ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের জন্য এখানকার অরণ্যে পদচারী জন্তুর পরিবর্তে শাখাচারী প্রাণী বেশি আছে; যেমন – বিভিন্ন ধরনের বানর। এখানে বড়ো বড়ো রক্তচোষা জোঁক, ভয়ংকর মাংসাশী পিঁপড়ে, বিশালাকৃতি অ্যানাকোন্ডা সাপ, ট্যারেনটুলা মাকড়শা, বিষাক্ত মাছি, রক্তচোষা বাদুড় প্রভৃতি খুব বেশি দেখা যায়। বিখ্যাত রিয়া ও ক্যানডর পাখি এখানে রয়েছে। এগুলি আকৃতিতে খুব বড়ো এবং ডানাহীন। এখানকার জলভাগে পিরানহা নামে এক প্রকার তীক্ষ্ণ দাঁতের হিংস্র মাছ, পিরারুকু মাছ, বৃহদাকার কচ্ছপ এবং ঈল মাছেরও দেখা মেলে।

আমাজন অববাহিকার বনজ সম্পদ ও কৃষিকাজের বিবরণ দাও।
বনজ সম্পদ –
আমাজন অববাহিকার সেলভা বনভূমি থেকে নানাবিধ বনজ সম্পদ সংগ্রহ করা হয়, যেমন – এখানকার প্রধান বনজ সম্পদ হল প্রাকৃতিক রবার, যার বিজ্ঞানসম্মত নাম হেভিয়া ব্রাসিলিয়েনসিস। এই গাছের রস বা আঠা থেকে রবার সংগ্রহ করা হয়। এখানকার রবার ‘কালো সোনা’ নামে পরিচিত। ব্রাজিল নাট গাছ থেকে বাদাম সংগ্রহ করা হয়। এই বাদাম থেকে তেল তৈরি করা হয়। বাদামের খোসা বোতাম তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। পাম নাট থেকে পাম তেল উৎপাদন করা হয়। জাপোটি গাছের রস চিকল্ থেকে চিউইংগাম প্রস্তুত করা হয়। সেলভা বনভূমি থেকে কিছু কিছু মূল্যবান কাঠ সংগ্রহ করা হয়। এই কাঠ রেলওয়ে স্লিপার, জাহাজের পাটাতন, আসবাবপত্র প্রভৃতি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া বনভূমি থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন তন্তু, ঔষধি লতা প্রভৃতি নানা কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
কৃষিকাজ –
এই অঞ্চলের অধিক উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের জন্য গভীর অরণ্য ও অতিরিক্ত জৈব পদার্থ মিশ্রিত আম্লিক মৃত্তিকা কৃষিকাজের অনুপযোগী হওয়ায় এখানে কৃষিকাজ সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তবে বর্তমানে এই অরণ্যের কিছু অংশ পরিষ্কার করে এবং উপকূলবর্তী অংশে বিট, আখ, ভুট্টা, তুলা, ধান, ট্যাপিওকা, বাদাম প্রভৃতি চাষ করা হচ্ছে। বাদাম এখানকার গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। এ ছাড়া এখানে দানাশস্য, কাসাভা, কলা, রবার, কোকো, তামাক প্রভৃতিও চাষ করা হচ্ছে।
আমাজন অববাহিকার খনিজ সম্পদ, শিল্প ও জনবসতির বর্ণনা দাও।
খনিজ সম্পদ – আমাজন অববাহিকার প্রতিকূল পরিবেশের জন্য খনিজ সম্পদের সন্ধান তেমনভাবে করা সম্ভব হয়নি। আমাজনের উচ্চ উপত্যকা অঞ্চলে অবস্থিত গান জো আজুল এলাকা থেকে কিছু পরিমাণে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করা হয়। এ ছাড়া আমাজন বদ্বীপের উত্তরে আমাপা এলাকা থেকে ম্যাঙ্গানিজ ও আকরিক লোহা পাওয়া যায়।
শিল্প – দুর্ভেদ্য অরণ্য, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, কাঁচামালের ঘাটতি, স্বল্প জনবসতি, মূলধন ও উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার অভাব প্রভৃতি কারণে এখানে শিল্পোন্নতি হয়নি। এখানে গড়ে ওঠা শিল্পসমূহ হল –
- মানাওস, বেলেম প্রভৃতি স্থানে কিছু বাদাম ও পাম তেলের কল, রবার শিল্প, ছোটো আকারের কাষ্ঠশিল্প প্রভৃতি। এ ছাড়া,
- ইকুইটসে একটি খনিজ তেল শোধনাগার গড়ে উঠেছে।
- এখানকার স্থানীয় কারখানায় রবার থেকে মোটরগাড়ির টায়ার তৈরি করা হয়।
- পারা নদীর মোহানায় অবস্থিত বেলেম বন্দরের মাধ্যমে কিছু পরিমাণ রবার বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
- এখানে তৈল শোধনাগার ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে।
জনবসতি – আমাজন অববাহিকার লোকবসতি অতি বিরল। প্রতিকূল পরিবেশ ও জলবায়ু, গহন অরণ্যের উপস্থিতি, হিংস্র পশুর বাস এবং জীবিকার অভাব প্রভৃতি কারণে এখানে লোকবসতি প্রায় নেই বললেই চলে। এখানে প্রতি বর্গকিমিতে গড়ে মাত্র 1 জন লোক বাস করে। তবে মানাওস, বেলেম, ইকুইটস প্রভৃতি শহরে জনসংখ্যার ঘনত্ব কিছুটা বেশি। এই অঞ্চলের বিভিন্ন অংশে মুরা, গুয়াত, নামবিকওয়ালা, মাকিগোন, জিভারো, শিপিবো, শিরিয়ানা, সেরিংগুইরো প্রভৃতি আদিম অধিবাসী এবং পোর্তুগিজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত অ্যামেরিন্ডিয়ান বাস করে। অ্যামেরিন্ডিয়ানরা হল আমাজন অববাহিকা অঞ্চলের আদি অধিবাসী। বিভিন্ন আদিম অধিবাসীরা বন থেকে পশু শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ, নদী থেকে জলজ প্রাণী শিকার ও ঝুম চাষ করে। অ্যামেরিন্ডিয়ানরা স্থায়ীভাবে কৃষিকাজ এবং খনিজ ও শিল্পের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে।

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দশম অধ্যায় ‘দক্ষিণ আমেরিকা’ এর উপবিভাগ ‘আমাজন অববাহিকা‘ থেকে কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া, নিচে থাকা শেয়ার বাটনের মাধ্যমে পোস্টটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ!





Leave a Comment