অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – দক্ষিণ আমেরিকা – আমাজন অববাহিকা – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর

Souvick

আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দশম অধ্যায় ‘দক্ষিণ আমেরিকা’-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপবিভাগ ‘আমাজন অববাহিকা’ থেকে কিছু বাছাই করা ‘সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নোত্তরগুলি অষ্টম শ্রেণির বিদ্যালয়ের পরীক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্যও অত্যন্ত সহায়ক।

Contents Show

অষ্টম শ্রেণির ভূগোল: আমাজন অববাহিকা (দক্ষিণ আমেরিকা) – গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর

আমাজন অববাহিকায় গভীর বনভূমি সৃষ্টির কারণ লেখো।

আমাজন নদী অববাহিকা নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্গত। নিরক্ষীয় অঞ্চলে –

  • সারাবছর তীব্র উত্তাপ (বার্ষিক গড় উষ্ণতা 25°-27°C),
  • প্রতিদিন বিকালে প্রচুর পরিচলন বৃষ্টিপাত (বার্ষিক গড় 250-300 সেমি),
  • শীত ঋতুর অনুপস্থিতি,
  • শীত ও গ্রীষ্মের তাপের সামান্য পার্থক্য-প্রভৃতি কারণে আমাজন অববাহিকায় এক প্রকার গভীর বনভূমির সৃষ্টি হয়েছে।
  • সারাবছর প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় বলে মৃত্তিকায় জলের অভাব হয় না। ফলে, গাছগুলির পাতা সব একসঙ্গে ঝরে পড়ে না।
  • এ ছাড়া, সূর্যালোক পাওয়ার জন্য গাছগুলি ডালপালা বিস্তৃত করে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে।

সেলভা কী? এর বৈশিষ্ট্য লেখো।

সেলভার অবস্থান – নিরক্ষরেখার উভয় পাশে ব্রাজিলের আমাজন অববাহিকা (60%), পেরু (13%), কলম্বিয়া (10%) এবং গিয়ানা, ভেনেজুয়েলা, সুরিনাম, বলিভিয়া, ফ্রেঞ্চ গিয়ানা প্রভৃতি দেশের উপকূল সমভূমিতে সৃষ্ট নিরক্ষীয় চিরসবুজ অরণ্যকে সেলভা বলা হয়।

সেলভার বৈশিষ্ট্য –

  • সারাবছর ধরে প্রচুর উষ্ণতা ও বৃষ্টি পায় বলে এই বনভূমির গাছগুলি চিরসবুজ থাকে। তাই এই বনভূমিকে চিরহরিৎ বৃক্ষের বনভূমি বলা হয়।
  • প্রচুর বৃষ্টিপাতের জন্য গাছগুলির দৈর্ঘ্য খুব বেশি হয়, এক-একটি প্রায় 40-50 মিটার বা তারও বেশি দীর্ঘ।
  • গাছের পাতাগুলি খুব চওড়া হয় ও গাছগুলি ঘন সন্নিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকায় সূর্যের আলো বনভূমির অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে না। এজন্য সেলভা অরণ্যকে ‘চির গোধূলি অঞ্চল’ (Land of Eternal Twilight) বলা হয়।
  • বনভূমির তলদেশ থাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন, স্যাঁতসেঁতে ও আর্দ্র এবং বিভিন্ন ঝোপঝাড় ও লতাপাতায় পরিপূর্ণ।
  • বিভিন্ন প্রকার বৃক্ষের পাশাপাশি অবস্থানের ফলে এই বনভূমির কাঠ সংগ্রহে অসুবিধা দেখা দেয়।
  • সেলভা অরণ্যভূমি পৃথিবীর 20% অক্সিজেন সরবরাহ করে। সেজন্য একে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ বলে।
  • প্রায় 2.5 লক্ষ পতঙ্গ ও 4 লক্ষ উদ্ভিদ প্রজাতি এখানে আছে।
  • পৃথিবীর মোট জীবন্ত প্রজাতির মধ্যে 10% এই সেলভা বনভূমিতে অবস্থান করছে।

উদ্ভিদসমূহ – এই অরণ্যের উল্লেখযোগ্য বৃক্ষগুলি হল – মেহগনি, আবলুশ, ব্রাজিল নাট, রবার, রোজ উড, টাগুয়া নাট প্রভৃতি। অরণ্যের তলদেশ লতা, গুল্ম, আগাছা ইত্যাদিতে পূর্ণ থাকে। তবে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিষাক্ত কীটপতঙ্গ ও পোকামাকড় এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এই বনভূমির কাঠ তেমন ব্যবহার করা যায় না।

পৃথিবীর বৃহত্তম নদীর বৈশিষ্ট্য লেখো।

অথবা, আমাজন নদীর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।

আমাজন নামের অর্থ – 1541 খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত পর্যটক ওরেল্লানা নদীটিকে ‘আমাজন’ নামে অভিহিত করেছিলেন। ‘আমাজন’-এর অর্থ ‘বীর রমণী’।

আমাজন নদীর উৎপত্তি ও পতনস্থল – পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরের নিকটবর্তী পেরুর দক্ষিণে অবস্থিত আন্দিজ পর্বতের মিশমি শৃঙ্গ থেকে উৎপন্ন হয়ে পূর্বমুখী অসংখ্য উপনদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে বিশালাকার রূপ ধারণ করে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রায় গোটা দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ অতিক্রম করে নিরক্ষরেখার কাছে আটলান্টিক মহাসাগরে পড়েছে।

আমাজন নদীর বৈশিষ্ট্য –

  • উৎস থেকে মোহানা পর্যন্ত আমাজন নদীর মোট দৈর্ঘ্য 6,437 কিমি।
  • আমাজন পৃথিবীর দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী।
  • জলের পরিমাণ, নদীস্রোতের বেগ (2,09,000 ঘনমিটার/সেকেন্ড), অববাহিকার আয়তন (55,00,000 বর্গকিমি) প্রভৃতির বিচারে আমাজন পৃথিবীর বৃহত্তম নদী।
  • এই নদীতে প্রবাহিত জলের পরিমাণ পৃথিবীর অন্য সব নদীতে প্রবাহিত জলের তুলনায় অনেক বেশি। মোহানার কাছে নদীটি প্রায় 400 কিমি চওড়া।
  • এই নদীর মোহানাতে গঠিত হয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম নদীদ্বীপ ইলহা-দা-মারাজো।

আমাজন নদীর উপনদী – প্রবাহকালে অসংখ্য উপনদী (সংখ্যায় প্রায় 1,000টি) এসে আমাজনে মিশেছে। বামতীরের উপনদীর মধ্যে পুতুমায়ো, মাদিরা, জাপুরা, নেগ্রো, মাপুয়েরা এবং ডানতীরের উপনদীগুলির মধ্যে জুরুয়া, পুরুস, জিয়াঙ্গু, টাপাজোস প্রধান।

আমাজন অববাহিকায় কাষ্ঠ আহরণের সমস্যার বিবরণ দাও।

আমাজন অববাহিকার অন্তর্গত সেলভা অরণ্যে আয়রন উড, রোজ উড, মেহগনি, আবলুশ প্রভৃতি মূল্যবান কাঠের গাছ অবস্থান করলেও এখানে কাষ্ঠ আহরণ ও কাষ্ঠ শিল্পে উন্নতি ঘটে নি। কারণ –

  • মিশ্র প্রজাতির বৃক্ষ – বনভূমিতে বিভিন্ন প্রকার বৃক্ষের সহাবস্থানের জন্য বাণিজ্যিক হারে কাষ্ঠ সংগ্রহ করা যায় না।
  • দুর্ভেদ্য অরণ্য – বনভূমির তলদেশ ঝোপঝাড় ও লতা দ্বারা আবৃত থাকায় অরণ্যে প্রবেশে সমস্যা হয়।
  • পরিবহণ সমস্যা – মৃত্তিকা আর্দ্র থাকায় বনভূমিতে যানবাহন প্রবেশে অসুবিধা হয়।
  • ভারী কাঠ – একমাত্র নদীগুলির মাধ্যমে সেলভা অরণ্যে প্রবেশ করা যায় বটে, কিন্তু কাঠগুলি জলের তুলনায় ভারী হওয়ায় জলের মাধ্যমে কাঠ পরিবহণ করা যায় না।
  • বনভূমির পরিবেশ – অস্বাস্থ্যকর জলবায়ু, বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব, হিংস্র জন্তুর উপস্থিতি প্রভৃতি কারণে বনভূমির কাষ্ঠ আহরণ করা যায় না।
  • অন্যান্য কারণ – এ ছাড়া স্বল্প জনবসতি, অনুন্নত প্রযুক্তি বিদ্যা, চাহিদার অভাব প্রভৃতি কারণে এখানে কাষ্ঠ আহরণে সেভাবে উন্নতি ঘটে নি। ফলে, সমগ্র অঞ্চলটি কাষ্ঠশিল্পে যথেষ্ট অনুন্নত।

আমাজন অববাহিকার প্রাকৃতিক পরিবেশ কীভাবে সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা আলোচনা করো।

আমাজন অববাহিকায় মুরা, গুয়াত, নামবিকওয়ালা, মাকিগোন, জিভারো, শিপিবো, শিরিয়ানা, সেরিংগুইরো প্রভৃতি আদিম অধিবাসী, পোর্তুগিজ ও ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত অ্যামেরিন্ডিয়ান বাস করে। এদের জীবনযাত্রায় কিছু বৈচিত্র্য দেখা যায়।

  • খাদ্যসংগ্রহ – এরা সাধারণত বন থেকে ফলমূল সংগ্রহ ও পশু শিকার করে। যারা নদীর তীরে বাস করে তারা মাছ, কুমির, কচ্ছপ ইত্যাদি জলজ প্রাণী শিকার করে।
  • পোশাক-পরিচ্ছদ – উষ্ণ-আর্দ্র জলবায়ুর জন্য এখানে পোশাক-পরিচ্ছদের বিশেষ প্রয়োজন হয় না। এখানকার অধিবাসীরা লজ্জা নিবারণের জন্য বনের লতাপাতা ব্যবহার করে। সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গায়ে কাদা মাখে।
  • বাসস্থান – এরা সাধারণত বনের ঘাস, লতাপাতা, তালপাতা ইত্যাদি দিয়ে ঘর তৈরি করে।
  • কৃষি – এখানে সাধারণত ঝুম প্রথায় চাষ করা হয়। এরা গাছপালা পুড়িয়ে দিয়ে তার ওপর জল দিয়ে বীজ ছড়িয়ে দেয়। প্রধান খাদ্যফসল হল কলা। কলা আলুর মতো সেদ্ধ করে খায়, ভাজা খায়, গুঁড়িয়ে ময়দার মতো ব্যবহার করেও খায়। অন্যান্য ফসল হল – বিট, ভুট্টা ও শাকসবজি। আর পোর্তুগিজরা ইক্ষু, ধান ও তুলার চাষ বেশি করে। এ ছাড়া ব্রাজিল বাদাম, বন্য রবার, কাঠ প্রভৃতি সংগ্রহ ও বিক্রি করে এরা জীবিকা নির্বাহ করে।

সেলভা অরণ্যের সাম্প্রতিক অবস্থা কী ও তার প্রভাব ব্যাখ্যা করো।

সেলভা অরণ্যের সাম্প্রতিক অবস্থা – বিগত কয়েক দশক ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অরণ্যচ্ছেদন ঘটে চলেছে। ‘সেলভা’ অরণ্যের মতো দুর্ভেদ্য অরণ্যও তার ব্যতিক্রম নয়। 1991-2000 সালের তথ্য অনুযায়ী এই সময় অরণ্যের প্রায় 2,27,000 বর্গমাইল এলাকা পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে যা প্রায় স্পেন, মাদাগাস্কার বা ম্যানিটোবার আয়তনের সমতুল্য। বিভিন্ন আর্থসামাজিক কারণ যেমন – কৃষিভূমির প্রসারণ, পশুপালন, বসতি নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসার বিশেষত ট্রান্স-আমাজন হাইওয়ের নির্মাণ বনভূমির প্রায় গভীরে প্রবেশ সহজতর করে দেয়, ফলে ব্যাপক হারে এই অরণ্য বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে চলেছে। 2014 সালের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিগত পঞ্চাশ বছরে এই অরণ্যের প্রায় 17 শতাংশ এলাকা ধ্বংস হয়েছে।

সেলভা অরণ্যচ্ছেদন

সেলভা অরণ্যের সাম্প্রতিক প্রভাব –

  • জীব বৈচিত্র্যের ধ্বংসসাধন – অরণ্য ধ্বংসসাধনের ফলে বহু প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটছে। ফলে, জীব বৈচিত্র্যের ধ্বংসসাধন ঘটছে। এই অববাহিকায় প্রাপ্ত জাগুয়ার, ‘হার্পি ঈগল’, গোল্ডেন লায়ন, টামারিন বানর, ধূসর ইঁদুর প্রভৃতি প্রাণী আজ বিপদগ্রস্ত।
  • বিশ্ব উষ্ণায়ন – অরণ্যচ্ছেদনের ফলে বাতাসে O₂ ও CO₂-এর ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে যা বিশ্ব উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করছে।
  • জলবায়ু পরিবর্তন – ক্রমাগত বৃক্ষচ্ছেদনের ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস ও বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতার বৃদ্ধির ফলে সমগ্র পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে।
  • জলচক্রের ভারসাম্যে ব্যাঘাত – ক্রমাগত অরণ্যচ্ছেদন বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস করছে, ফলে সামগ্রিক জলচক্রে ব্যাঘাত হানছে।
  • সামাজিক প্রভাব – যে-সকল মানুষ অরণ্যের ফলমূল, বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করে জীবিকা অর্জন করে তাদের অন্যত্র স্থানান্তর ঘটছে।
আমাজন অববাহিকার বিপদগ্রস্ত প্রাণী

আমাজনকে ‘পৃথিবীর বৃহত্তম নদী’ বলা হয় কেন?

আমাজন নদী পৃথিবীর বৃহত্তম জল বহনকারী নদী এবং দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। এর দৈর্ঘ্য 6,437 কিমি। নিরক্ষীয় অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে প্রায় সারাবছরই বৃষ্টি হয়। মাঝে মাঝে বৃষ্টির প্রাবল্য এতই বৃদ্ধি পায় যে আমাজনের জল হঠাৎ প্রায় 12-18 মিটার বেড়ে গিয়ে বন্যার সৃষ্টি করে। তখন এই নদীটি 80-160 কিমি অঞ্চল পর্যন্ত প্লাবিত করে। এ ছাড়া এর অসংখ্য উপনদী বাহিত জলধারা আমাজনে এসে পড়ে। ফলে, আমাজন নদীপথে প্রচুর জল প্রবাহিত হয়। তাই এই নদীকে ‘পৃথিবীর সর্ববৃহৎ নদী’ বলা হয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে মোট যে পরিমাণ জল প্রবাহিত হয় তার প্রায় শতকরা 20 ভাগ একমাত্র আমাজন নদীখাত দিয়ে বয়ে যায়।

আমাজন অববাহিকাকে ‘পৃথিবীর বৃহত্তম নদী অববাহিকা’ বলা হয় কেন?

আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলে মিশমি শৃঙ্গ থেকে উৎপন্ন হয়ে আমাজন নদী তার বিভিন্ন উপনদী ও শাখানদী সহ পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পড়েছে। নিরক্ষীয় অঞ্চলে অবস্থান এবং তার ফলে সারাবছর প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে এই নদীটি প্রচুর পরিমাণে জলবহন করে। রিও নেগ্রো, জাপুরা, জুরুয়া, পুরুস, মদিরা প্রভৃতি আমাজনের প্রধান উপনদী। অধিকাংশ উপনদীর দৈর্ঘ্য ভারতের গঙ্গার থেকেও বেশি। সমগ্র অববাহিকাটির ক্ষেত্রমান প্রায় 70.50 লক্ষ বর্গকিমি যা ক্ষেত্রমানে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সমান এবং ভারতের ক্ষেত্রমানের প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। তাই এটি পৃথিবীর বৃহত্তম নদী অববাহিকা।

আমাজন অববাহিকা শিল্পে অনুন্নত কেন?

আমাজন অববাহিকায় শিল্পোন্নতি না ঘটার কারণ –

  • দুর্ভেদ্য অরণ্য – আমাজন অববাহিকার সেলভা অরণ্য বিশ্বের গভীরতম অরণ্য। এই অরণ্যের তলদেশ ঝোপগুল্ম ও আগাছায় পরিপূর্ণ থাকে। সুতরাং, এককথায় বলা যায়, সমগ্র অরণ্যাঞ্চলটি দুর্ভেদ্য।
  • অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ – সমগ্র অঞ্চলটির জলবায়ু উষ্ণ, আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে, যা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর।
  • হিংস্র ও বিষাক্ত প্রাণীর উপদ্রব – সেলভা বনভূমি হিংস্র পশুপাখি ও বিষাক্ত পোকামাকড়ে পরিপূর্ণ, যা শিল্পস্থাপনে অনুপযুক্ত।
  • অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা – দুর্ভেদ্য জঙ্গল, আর্দ্র মৃত্তিকা প্রভৃতি কারণে এখানে পরিবহণ ব্যবস্থা অত্যন্ত অনুন্নত মানের।
  • কাঁচামালের অপ্রাচুর্যতা – কৃষিজ, খনিজ ও অন্যান্য কাঁচামালের অভাব।
  • শিক্ষা, মূলধন ও উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার অভাব – এখানে শিল্পস্থাপনে প্রধান অন্তরায় হল চরম দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামোগত অনুন্নতি।
  • স্বল্প জনবসতি – প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে স্বল্প জনবসতি গড়ে উঠেছে। ফলে দক্ষ শ্রমিক পাওয়া দুর্লভ।

আমাজন নদীর মুখে বদ্বীপ গড়ে ওঠেনি কেন?

  • তীব্র জলস্রোত – আমাজন নদী সারাবছর প্রচুর জল বহন করে (সেকেন্ডে 1,16,000 টন), সেই জন্যে নদীটিতে সর্বদা প্রবল স্রোত লক্ষ করা যায়।
  • স্বল্প লবণতা – মোহানা থেকে 200 কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত সমুদ্রের জল ঘোলা থাকে এবং লবণতার পরিমাণ হ্রাস পায়।
  • জোয়ারভাটা – প্রবল বেগে জোয়ারভাটা সংগঠিত হয় বলে কোনো রকম পলি আমাজন নদীর মোহানায় সঞ্চিত হতে পারে না।
  • সমুদ্রস্রোত – আমাজন নদী মোহানায় প্রবল সমুদ্রস্রোত দেখা যায়, ফলে বাহিত পলি সঞ্চিত হওয়ায় সুযোগ পায় না। ফলে, আমাজন নদীর মোহানায় কোনো বদ্বীপের সৃষ্টি হয়নি।

সেলভাকে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ বলা হয়।

অথবা, ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ কাকে ও কেন বলে?

অবস্থান – নিরক্ষরেখার উভয় পাশে ব্রাজিলের আমাজন অববাহিকা (60%), পেরু (13%), কলম্বিয়া (10%) এবং গিয়ানা, ভেনেজুয়েলা, সুরিনাম, বলিভিয়া, ফ্রেঞ্চ গিয়ানা প্রভৃতি দেশের উপকূল সমভূমিতে সৃষ্ট নিরক্ষীয় চিরসবুজ অরণ্যকে সেলভা বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য –

  • সারাবছর ধরে প্রচুর উষ্ণতা ও বৃষ্টি পায় বলে এই বনভূমির গাছগুলি চিরসবুজ থাকে। তাই এই বনভূমিকে চিরহরিৎ বৃক্ষের বনভূমি বলা হয়।
  • প্রচুর বৃষ্টিপাতের জন্য গাছগুলির দৈর্ঘ্য খুব বেশি হয়, এক-একটি প্রায় 40-50 মিটার বা তারও বেশি দীর্ঘ।
  • গাছের পাতাগুলি খুব চওড়া হয় ও গাছগুলি ঘন সন্নিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকায় সূর্যের আলো বনভূমির অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে না। এজন্য সেলভা অরণ্যকে ‘চির গোধূলি অঞ্চল’ (Land of Eternal Twilight) বলা হয়।
  • বনভূমির তলদেশ থাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন, স্যাঁতসেঁতে ও আর্দ্র এবং বিভিন্ন ঝোপঝাড় ও লতাপাতায় পরিপূর্ণ।
  • বিভিন্ন প্রকার বৃক্ষের পাশাপাশি অবস্থানের ফলে এই বনভূমির কাঠ সংগ্রহে অসুবিধা দেখা দেয়।
  • সেলভা অরণ্যভূমি পৃথিবীর 20% অক্সিজেন সরবরাহ করে। সেজন্য একে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ বলে।
  • প্রায় 2.5 লক্ষ পতঙ্গ ও 4 লক্ষ উদ্ভিদ প্রজাতি এখানে আছে।
  • পৃথিবীর মোট জীবন্ত প্রজাতির মধ্যে 10% এই সেলভা বনভূমিতে অবস্থান করছে।

উদ্ভিদসমূহ – এই অরণ্যের উল্লেখযোগ্য বৃক্ষগুলি হল – মেহগনি, আবলুশ, ব্রাজিল নাট, রবার, রোজ উড, টাগুয়া নাট প্রভৃতি। অরণ্যের তলদেশ লতা, গুল্ম, আগাছা ইত্যাদিতে পূর্ণ থাকে। তবে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিষাক্ত কীটপতঙ্গ ও পোকামাকড় এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এই বনভূমির কাঠ তেমন ব্যবহার করা যায় না।

আমাজন অববাহিকা কাষ্ঠশিল্পে অনুন্নত কেন?

আমাজন অববাহিকার অন্তর্গত সেলভা অরণ্যে আয়রন উড, রোজ উড, মেহগনি, আবলুশ প্রভৃতি মূল্যবান কাঠের গাছ অবস্থান করলেও এখানে কাষ্ঠ আহরণ ও কাষ্ঠ শিল্পে উন্নতি ঘটে নি। কারণ –

  • মিশ্র প্রজাতির বৃক্ষ – বনভূমিতে বিভিন্ন প্রকার বৃক্ষের সহাবস্থানের জন্য বাণিজ্যিক হারে কাষ্ঠ সংগ্রহ করা যায় না।
  • দুর্ভেদ্য অরণ্য – বনভূমির তলদেশ ঝোপঝাড় ও লতা দ্বারা আবৃত থাকায় অরণ্যে প্রবেশে সমস্যা হয়।
  • পরিবহণ সমস্যা – মৃত্তিকা আর্দ্র থাকায় বনভূমিতে যানবাহন প্রবেশে অসুবিধা হয়।
  • ভারী কাঠ – একমাত্র নদীগুলির মাধ্যমে সেলভা অরণ্যে প্রবেশ করা যায় বটে, কিন্তু কাঠগুলি জলের তুলনায় ভারী হওয়ায় জলের মাধ্যমে কাঠ পরিবহণ করা যায় না।
  • বনভূমির পরিবেশ – অস্বাস্থ্যকর জলবায়ু, বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব, হিংস্র জন্তুর উপস্থিতি প্রভৃতি কারণে বনভূমির কাষ্ঠ আহরণ করা যায় না।
  • অন্যান্য কারণ – এ ছাড়া স্বল্প জনবসতি, অনুন্নত প্রযুক্তি বিদ্যা, চাহিদার অভাব প্রভৃতি কারণে এখানে কাষ্ঠ আহরণে সেভাবে উন্নতি ঘটে নি। ফলে, সমগ্র অঞ্চলটি কাষ্ঠশিল্পে যথেষ্ট অনুন্নত।

আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের দশম অধ্যায় ‘দক্ষিণ আমেরিকা’-এর ‘আমাজন অববাহিকা‘ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তরগুলি নিয়ে আলোচনা করেছি। আশা করি এই নোটসগুলি আপনাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।

আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে (Telegram) যোগাযোগ করতে পারেন, আমরা দ্রুত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। পোস্টটি আপনার সহপাঠী ও প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ!

Please Share This Article

Related Posts

দক্ষিণ আমেরিকা - পম্পাস অঞ্চল - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – দক্ষিণ আমেরিকা – পম্পাস অঞ্চল – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

দক্ষিণ আমেরিকা - পম্পাস অঞ্চল - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – দক্ষিণ আমেরিকা – পম্পাস অঞ্চল – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

দক্ষিণ আমেরিকা - আমাজন অববাহিকা - অষ্টম শ্রেণি ভূগোল - রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – দক্ষিণ আমেরিকা – আমাজন অববাহিকা – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

About The Author

Souvick

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – দক্ষিণ আমেরিকা – পম্পাস অঞ্চল – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – দক্ষিণ আমেরিকা – পম্পাস অঞ্চল – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – দক্ষিণ আমেরিকা – আমাজন অববাহিকা – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – দক্ষিণ আমেরিকা – আমাজন অববাহিকা – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ভূগোল – দক্ষিণ আমেরিকা – আমাজন অববাহিকা – টীকা