আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের প্রথম অধ্যায় ‘পৃথিবীর অন্দরমহল’ এর কিছু ‘সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

পৃথিবীর ভিতরটা সম্পর্কে মানুষ যতটা জেনেছে, সেটুকু জানল কীভাবে?
পৃথিবীর ভিতরের অংশ বা ভূ-অভ্যন্তর সম্পর্কে যেসব তথ্য সংগৃহীত হয়েছে, সেগুলিকে উৎস অনুসারে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়, যথা –
প্রত্যক্ষ উৎস –
- আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত।
- সমুদ্রগর্ভে গর্ত খনন।
- মূল্যবান রত্নের খনি খনন।
- উষ্ণ প্রস্রবণের জলের প্রকৃতি।
- মনুষ্যসৃষ্ট কৃত্রিম গর্তে সরাসরি প্রবেশ করে।
পরোক্ষ উৎস – নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্রানুযায়ী অনুমান করা যায়, আবর্তনরত পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে ক্রমশ ভারী পদার্থসমূহ সঞ্চিত হবে ও ঘনত্ব বৃদ্ধি পাবে। ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রকার তরঙ্গের (P, S, L) গতিপ্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করে ভূ-অভ্যন্তর সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানা সম্ভব হয়েছে। অনুমান করা যায়, ভূগর্ভে অবস্থিত বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় খনিজ পদার্থ থেকে নির্গত তাপ বা উষ্ণতার প্রভাবে ভূ-অভ্যন্তরভাগ কখনোই স্থির থাকতে পারে না।
পৃথিবীর বাইরের আর পৃথিবীর ভিতর সম্পর্কে তুমি যা জানো তা লেখো। তোমার কোনটি বেশি পছন্দের এবং কেন?
আমি পৃথিবীর তিনটি স্তরের মধ্যে ভূত্বকের ওপরে অবস্থিত শিলামণ্ডলে বাস করি এবং এই শিলামণ্ডলের কোথাও রয়েছে পাহাড়-পর্বত আবার কোথাও সমভূমি, কোথাও বা মরুভূমি। এই শিলামণ্ডল যেমন মানুষের আবাসস্থল, একইভাবে এখানে আরো জীবজন্তু ও গাছপালা অবস্থান করে। পৃথিবীর ভিতরের অংশ অর্থাৎ, পৃথিবীর কেন্দ্র সম্পর্কে আমরা বিশেষ কোনো তথ্য পাইনি, কারণ পৃথিবীর কেন্দ্রের তাপমাত্রা এতই বেশি যে সেখানে পৌঁছোনো সম্ভব নয়। আমরা কেন্দ্র সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি তা ‘P’, ‘S’ ও ‘L’ ভূকম্পীয় তরঙ্গের মাধ্যমেই জানতে পেরেছি। আমি পৃথিবীর বাইরের অংশে অর্থাৎ, শিলামণ্ডলে বসবাস করি, তাই এই বৈচিত্র্যময় শিলামণ্ডল অর্থাৎ, পৃথিবীর বাইরের অংশকেই বেশি পছন্দ করি।
পৃথিবীর অভ্যন্তরের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে ঘনত্বের পার্থক্য লক্ষ করা যায় কেন?
অথবা, পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছে থাকা পদার্থগুলির ঘনত্ব বেশি হয় কেন?
পৃথিবীর ভূত্বকের গড় ঘনত্ব 2.6-3.3 গ্রাম/ঘনসেমি, গুরুমণ্ডলের গড় ঘনত্ব 3.4-5.6 গ্রাম/ঘনসেমি এবং কেন্দ্রমণ্ডলের গড় ঘনত্ব 9.1-13.1 গ্রাম/ঘনসেমি। পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরের ঘনত্বের এরূপ পার্থক্যের মূল কারণগুলি হলো –
- সৃষ্টির পর উত্তপ্ত তরল অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হওয়ার সময় পৃথিবীর কেন্দ্রমুখী আকর্ষণের জন্য অপেক্ষাকৃত ঘন ও ভারী উপাদানগুলি, যেমন – নিকেল, লোহা নীচের দিকে থিতিয়ে পড়ে, ফলে কেন্দ্রের দিকের ঘনত্ব ক্রমশ বেশি হয়।
- অত্যধিক উত্তাপ সত্ত্বেও নীচের দিকে চাপ খুব বেশি হওয়ার জন্য উপাদানগুলি ঘন ও স্থিতিস্থাপক অবস্থায় থাকে।
- পৃথিবীর গোলক আকৃতি ও আবর্তন গতির জন্য ভারী উপাদানগুলি কেন্দ্রের দিকে ও হালকা উপাদানগুলি ওপরের দিকে অবস্থান করছে।
পৃথিবীর ভূ-অভ্যন্তরীণ গঠন কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে তা লেখো।
আজ থেকে প্রায় 460 কোটি বছর আগে পৃথিবীর সৃষ্টি। সৃষ্টির সময় পৃথিবী ছিল প্রচণ্ড উত্তপ্ত গ্যাসীয় পিণ্ড। এরপর ক্রমশ তাপ বিকিরণ করার ফলে পৃথিবীর ওপরের স্তরটি ঠান্ডা হয়ে শক্ত ও কঠিন হয়ে যায়। ফলে, ভিতরের উত্তপ্ত তরল পদার্থের তাপ আর বিকিরিত হতে পারে না। এ কারণে পৃথিবীর অভ্যন্তরের সমস্ত পদার্থ প্রচণ্ড উত্তপ্ত অবস্থায় আছে। পৃথিবীর আবর্তন গতি ও মাধ্যাকর্ষণের টানে ভারী পদার্থগুলি কেন্দ্রের কাছে প্রচণ্ড চাপে স্থিতিস্থাপক অবস্থায় অবস্থান করছে। এর নাম কেন্দ্রমণ্ডল। এই কেন্দ্রমণ্ডল ও ওপরের কঠিন ভূত্বকের মাঝে উষ্ণতা ও চাপ কেন্দ্রের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় উত্তপ্ত তরল পদার্থ সান্দ্র বা থকথকে জেলির মতো অবস্থায় আছে। এর নাম গুরুমণ্ডল।
ভূ-অভ্যন্তরের স্তরবিন্যাস করো।
ভূমিকম্প তরঙ্গের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা 6,370 কিমি ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ থেকে ভূকেন্দ্র পর্যন্ত অংশকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করেছেন।
- শিলামণ্ডল (Lithosphere) – 5-60 কিমি পুরু তুলনামূলকভাবে পাতলা শিলাস্তর যা প্রধানত গ্রানাইট ও ব্যাসল্ট শিলা দ্বারা গঠিত।
- গুরুমণ্ডল (Mantle) – শিলামণ্ডলের নীচে প্রায় 2,900 কিমি পুরু স্তর যা লোহা, নিকেল, সিলিকন ও ম্যাগনেশিয়াম দ্বারা গঠিত।
- কেন্দ্রমণ্ডল (Core) – গুরুমণ্ডলের নীচে প্রায় 3,500 কিমি ব্যাসার্ধযুক্ত স্তর যা প্রধানত লোহা ও নিকেল দ্বারা গঠিত।
ভারতের মানচিত্রে চিহ্নিত উষ্ণ প্রস্রবণগুলির নাম লেখো।

নির্দেশিকা –
- পশ্চিমবঙ্গের বক্রেশ্বর
- সিকিমের রেশি।
- ঝাড়খণ্ডের মানডু।
- ওড়িশার আত্রি।
- গুজরাটের উনাই।
- হিমাচল প্রদেশের মণিকরণ।
পৃথিবীর অভ্যন্তরের চিহ্নিত চিত্র অঙ্কন করো।

বলো তো আপেলের খোসার সঙ্গে পৃথিবীর কোন্ স্তরের তুলনা করা যায়? বলো তো আপেলের কোন্ অংশ গুরুমণ্ডলের সঙ্গে তুলনীয়? আপেলের কোন্ অংশটা কেন্দ্রমণ্ডলের মতো বলো তো?
আপেলের খোসার সঙ্গে পৃথিবীর ভূত্বকের তুলনা করা যায়, কারণ উভয়ই খুবই পাতলা এবং সবচেয়ে বাইরের স্তর।
আপেলের খোসার নিচে নরম স্ফীত শাঁস অংশটি গুরুমণ্ডলের সঙ্গে তুলনীয়।
আপেলের একেবারে মাঝখানে যে অংশে বীজ থাকে, সেই অংশটি কেন্দ্রমণ্ডলের সঙ্গে তুলনীয়।

কিছুটা নুড়ি, পাথর ও মাটি নাও। কাচের গ্লাসে অর্ধেক জল ভর্তি করো। ওগুলো গ্লাসে ঢেলে দিয়ে দেখো কী হয়?
একটি গ্লাসে অর্ধেক ভর্তি জলের মধ্যে নুড়ি, পাথর, মাটি মেশানো হলো। দেখা যাবে যে, ঘনত্ব অনুযায়ী পদার্থগুলো বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত হবে। একেবারে নিচে জমবে বেশি ঘনত্বযুক্ত পাথর, মাঝখানে অপেক্ষাকৃত কম ঘনত্বযুক্ত নুড়ি এবং সবচেয়ে উপরের স্তরে মাটি। পাথর, নুড়ি ও মাটির এই গঠন বিন্যাসটি ভূ-অভ্যন্তরের গঠন বিন্যাসের যথাক্রমে – কেন্দ্রমণ্ডল, গুরুমণ্ডল ও ভূত্বকের সঙ্গে তুলনীয়।

সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে তুমি অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের পরিচলন স্রোত বুঝিয়ে দাও।
একটি পাত্রে অর্ধেক জল দিয়ে তার মধ্যে কাঠের পাতলা টুকরো ভাসিয়ে দেওয়া হলো। এইবার পাত্রের নিচে তাপ প্রয়োগ করা হলো। কিছুক্ষণ তাপ প্রয়োগ করার পর দেখা গেল জল ফুটতে শুরু করেছে। জল ফোটার পর জলের বুদ্বুদ নিচ থেকে উপরে উঠতে শুরু করলে দেখা গেল, কাঠের টুকরো জলের ওপরে ভাসমান অবস্থায় চলমান। দেখা যাচ্ছে যে, কখনও দুটি কাঠের টুকরো পরস্পরের কাছে আসছে আবার কখনও দুটি টুকরো পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ঠিক একইভাবে ভূ-অভ্যন্তরে অ্যাসথেনোস্ফিয়ারে ম্যাগমার পরিচলন স্রোতের প্রভাবে পাতগুলি ভাসমান অবস্থায় চলমান।

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের প্রথম অধ্যায় ‘পৃথিবীর অন্দরমহল’ এর ‘সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নগুলি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষায় প্রায় দেখা যায়।
আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।





Leave a Comment