আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের পঞ্চম অধ্যায় ‘মেঘ ও বৃষ্টি’ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার (Class 8 Geography) জন্য ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মেঘ কাকে বলে? মেঘের উৎপত্তি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
অথবা, মেঘ বলতে কী বোঝো? কীভাবে সৃষ্টি হয়?
মেঘ (Cloud) – সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন জলভাগ থেকে জলীয় বাষ্পপূর্ণ হালকা বায়ু বায়ুমণ্ডলে উত্থিত হয়ে, ঘনীভবন প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা (ব্যাস 0.02-0.06 মিমি) ও তুষার কণায় পরিণত হয়ে যখন বিভিন্ন উচ্চতায় বিভিন্ন আকার ধারণ করে ভেসে বেড়ায়, তাকে মেঘ বলে। উদাহরণ – বায়ুমণ্ডলে ভাসমান কয়েকটি মেঘ হল – সিরোস্ট্র্যাটাস মেঘ, অল্টোস্ট্র্যাটাস মেঘ, কিউমুলাস মেঘ, নিম্বোস্ট্র্যাটাস মেঘ, কিউমুলোনিম্বাস মেঘ প্রভৃতি।

মেঘের উৎপত্তি – বায়ুমণ্ডলে মেঘের সৃষ্টি প্রসঙ্গে বিভিন্ন আবহবিদ কয়েকটি পর্যায়ের কথা বলেছেন, এর মধ্যে মেঘ সৃষ্টির কয়েকটি বিশেষ পর্যায় নিম্নরূপ।
- প্রথম পর্যায় – এই পর্যায়ে সূর্যতাপে সাগর, মহাসাগর, নদী, হ্রদ, পুকুর, জলাশয় প্রভৃতি ক্ষেত্র থেকে জল বাষ্পীভূত হয়। এই জলীয় বাষ্প হালকা বলে তা ক্রমশ উপরে উঠে বায়ুমণ্ডলে জমতে থাকে। তা ছাড়া উদ্ভিদের প্রস্বেদন প্রক্রিয়া থেকে সৃষ্ট জলীয় বাষ্প এক্ষেত্রে বায়ুমণ্ডলে সঞ্চিত হয়।
- দ্বিতীয় পর্যায় – ঊর্ধ্বমুখী জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার পর চাপ হ্রাসের ফলে ক্রমশ শীতল হয়ে তাপমাত্রা শিশিরাঙ্কের (Dew Point) নীচে নেমে গেলে ঘনীভবন প্রক্রিয়া কার্যকরী হয়। ফলে, বায়ুমণ্ডলের ঘনীভূত জলীয় বাষ্প ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা ও তুষার কণায় পরিণত হয়।
- তৃতীয় পর্যায় – এই পর্যায়ে বায়ুমণ্ডলের ঘনীভূত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা ও তুষার কণা বায়ুতে ভাসমান সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ধূলিকণা, ছাই (Fly Ash), লবণ কণা, কয়লার কণা প্রভৃতিকে আশ্রয় করে মেঘরূপে ভেসে বেড়ায়।
উচ্চতা অনুযায়ী মেঘের শ্রেণিবিভাগ করো।
মেঘের ভূমিকা – ‘আন্তর্জাতিক মেঘ সংহিতা’ (International Cloud Code) অনুসারে প্রায় 28 রকম মেঘের বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে উচ্চতা, আকৃতি, প্রকৃতি, রং তথা মেঘের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অনুসারে অতি পরিচিত মেঘমণ্ডলকে 11টি ভাগে বিভক্ত করা যায়। 1803 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ রসায়নবিদ লিউক হাওয়ার্ড মেঘের উচ্চতা ও বৈশিষ্ট্য অনুসারে মেঘসমূহকে প্রধানত 4টি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন, যা 1956 খ্রিস্টাব্দে ‘আন্তর্জাতিক আবহবিদ্যা সংস্থা’ (International Meteorological Organization) বিজ্ঞানসম্মত ও সর্বসম্মত বলে মেনে নিয়েছে।


অধিক উচ্চতার মেঘের (High Altitude Cloud) বর্ণনা দাও।
অধিক উচ্চতার মেঘ (High Altitude Cloud) –
অবস্থান – ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 20 হাজার ফুটেরও অধিক উচ্চতায় এই মেঘের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়।
অধিক উচ্চতার মেঘের শ্রেণিবিভাগ –
1. সিরাস মেঘ – এটি উচ্চস্তরীয় বায়ুমণ্ডলের স্বচ্ছ অলক প্রকৃতির মেঘ।
সিরাস মেঘের বৈশিষ্ট্য –
- এটি হালকা পালক সদৃশ একপ্রকার মেঘ।
- বিচ্ছিন্নভাবে বায়ুমণ্ডলে এই মেঘ অবস্থান করে।
- এই মেঘের গঠন অনেকটা রেশম বা তন্তু বুননের মতো।
- আকাশে এই মেঘ থাকা সত্ত্বেও সূর্যকে এর মধ্য দিয়ে দেখা যায়।
- ঘোড়ার লেজের মতো দেখতে হওয়ায় একে ‘Mare’s Tail’ বলে।
সিরাস মেঘের প্রভাব – সাধারণভাবে এই মেঘ পরিষ্কার আবহাওয়া নির্দেশ করলেও সিরাস মেঘের পারস্পরিক বন্ধনী খারাপ আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়।
2. সিরোস্ট্র্যাটাস মেঘ – উচ্চ বায়ুমণ্ডলের পাতলা একপ্রকার মেঘ হল এই সিরোস্ট্র্যাটাস বা অলক স্তর মেঘ।
সিরোস্ট্র্যাটাস মেঘের বৈশিষ্ট্য –
- এটি সাদা পাতলা চাদরের ন্যায় একপ্রকার মেঘ।
- এই মেঘে ঢাকা আকাশকে অনেকটা দুধের মতো সাদা দেখায়।
- এর মধ্য দিয়ে সূর্য এবং চাঁদকে উজ্জ্বল মণ্ডলের ন্যায় দেখায়।
- আকাশে রামধনুর রং অনেক সময় এই মেঘ থেকে দেখা যায়।
সিরোস্ট্র্যাটাস মেঘের প্রভাব – সিরোস্ট্র্যাটাস মেঘের অস্তিত্ব ঝড়ের সংকেত দেয়।
3. সিরোকিউমুলাস মেঘ – বায়ুমণ্ডলে গোলাকার স্তূপবিশিষ্ট হয়ে অবস্থান করে সিরোকিউমুলাস বা অলক স্তূপ মেঘ।
সিরোকিউমুলাস মেঘের বৈশিষ্ট্য –
- এটি খণ্ড খণ্ড পেঁজা তুলোর ন্যায় মেঘ।
- সুন্দরতম এই মেঘটি দলবদ্ধ, সারি কিংবা ঢেউ খেলানো ভাবে ভেসে বেড়ায়।
- এই মেঘ পৃথিবীতে ছায়া সৃষ্টি করে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। (এই মেঘ পৃথিবীতে ছায়া সৃষ্টি করে না।)
- ম্যাকারেল মাছের পিঠের মতো এই মেঘে ঢাকা আকাশকে ম্যাকারেল আকাশ (Mackerel Sky) বলে।
সিরোকিউমুলাস মেঘের প্রভাব – আকাশে এই মেঘের অস্তিত্ব সাধারণত পরিষ্কার আবহাওয়ার নির্দেশ করে।
মধ্যম উচ্চতার মেঘ (Clouds of Middle Altitude) বা স্ট্যাটাস (Stratus) মেঘের বর্ণনা দাও।
মাঝারি উচ্চতার মেঘ (Clouds of Middle Altitude) –
অবস্থান – বায়ুমণ্ডলের গড়ে 6,500 ফুট থেকে 20,000 ফুট উচ্চতায় মাঝারি উচ্চতার মেঘ গঠিত হয়ে থাকে।
শ্রেণিবিভাগ –
1. অল্টোস্ট্র্যাটাস (Altostratus) মেঘ – বায়ুমণ্ডলে সমানভাবে বিস্তৃত এক বিশেষ মেঘ হল অল্টোস্ট্র্যাটাস বা সরু স্তরবিশিষ্ট মেঘ।
- বৈশিষ্ট্য –
- এই মেঘ কিছুটা ধূসর বা নীল রং বিশিষ্ট হয়।
- প্রকৃতিগত দিক থেকে এই মেঘ অনেকটা তন্তুর ন্যায়।
- এটি কিছুটা ঘন সিরোস্ট্র্যাটাস মেঘের মতো।
- সূর্য কিংবা চাঁদের আলোকে এই মেঘ কিছুটা ম্লান করে দেয়।
- সাধারণত সকালে বা অপরাহ্নে এই মেঘ দৃষ্টিগোচর হয়।
- প্রভাব – আকাশে এই মেঘ একটানা বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেয়।
2. অল্টোকিউমুলাস (Altocumulus) মেঘ – আকাশে মাঝারি উচ্চতার এই মেঘ দানাকৃতির হয়ে ছড়িয়ে থাকে।
- বৈশিষ্ট্য –
- এই মেঘ সাদা থেকে ধূসর বর্ণের হয়ে থাকে।
- প্রকৃতিগতভাবে এটি চ্যাপটা, গোলাকার মেঘ।
- আকাশে এই মেঘ রেখা কিংবা ঢেউ-এর মতো অবস্থান করে।
- এর ফাঁক দিয়ে নীল আকাশ দেখা যায়।
- প্রভাব – এই মেঘ মূলত পরিষ্কার আকাশকে নির্দেশ করে এবং এই মেঘের ফাঁকে ফাঁকে নীল আকাশ সুন্দর দেখায়।
নিম্ন উচ্চতার মেঘ (Clouds of Low Altitude) বা কিউমুলাস (Cumulus) মেঘের বর্ণনা দাও।
নিম্ন উচ্চতার মেঘ (Clouds of Low Altitude) –
অবস্থান – নিম্ন উচ্চতার মেঘ সাধারণত বায়ুমণ্ডলের 1,600 ফুট থেকে 6,500 ফুট উচ্চতার মধ্যে অবস্থান করে।
শ্রেণিবিভাগ –
1. স্ট্র্যাটোকিউমুলাস (Stratocumulus) মেঘ – নিম্ন আকাশের অন্তর্গত স্তূপের মতো স্তরবিশিষ্ট এক বিশেষ প্রকার মেঘ হল স্ট্র্যাটোকিউমুলাস বা স্তর-স্তূপ মেঘ।
- বৈশিষ্ট্য –
- এই মেঘ কিছুটা উজ্জ্বল ধূসর প্রকৃতির হয়।
- এই মেঘগুলি স্তরে স্তরে স্তূপাকারে আকাশে সজ্জিত থাকে।
- একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসে এই মেঘ সজ্জিত থাকে।
- এই মেঘের স্তরগুলি সর্বদা গতিশীল থাকে বলে একে ‘Bumpy Cloud’ বলা হয়।
- প্রভাব – সাধারণভাবে এই মেঘের প্রভাবে আকাশ পরিষ্কার থাকে।
2. স্ট্র্যাটাস (Stratus) মেঘ – নিম্ন বায়ুমণ্ডলে এই মেঘ বিভিন্ন সারি সৃষ্টি করে অবস্থান করে।
- বৈশিষ্ট্য –
- এই মেঘ ঘন কুয়াশা সদৃশ ধূসর বর্ণের।
- সাধারণত এই মেঘের নিম্নতল ভূপৃষ্ঠের কাছে থাকে।
- এটি সারা আকাশকে স্তরে স্তরে ঢেকে রাখে।
- উচ্চ পর্বতে সৃষ্ট এই মেঘ বিমান চলাচল ও পর্বতারোহণে বাধা সৃষ্টি করে।
- প্রভাব – এই মেঘের আস্তরণ অনেক সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ঘটায়।
3. নিম্বোস্ট্র্যাটাস (Nimbostratus) মেঘ – সাধারণভাবে বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটাস মেঘ যখন নিম্নগামী হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়, তাকে নিম্বোস্ট্র্যাটাস মেঘ বলে।
- বৈশিষ্ট্য –
- এটি একপ্রকার ঘন কালো মেঘ।
- এই মেঘ পুরু এবং আকারহীন।
- এই মেঘ সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়।
- এটি খারাপ আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়।
- প্রভাব – আকাশের এই মেঘ থেকে অবিরাম বৃষ্টিপাত ঘটে থাকে।
নিম্বাস বা ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন উল্লম্ব মেঘের বর্ণনা দাও।
নিম্বাস (Nimbus) / ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন উল্লম্ব মেঘ –
অবস্থান – বায়ুমণ্ডলের গড় নিম্নতল 1,600 ফুট উচ্চতায় সাধারণত এই উল্লম্ব মেঘ সৃষ্টি হয়।
শ্রেণিবিভাগ –
1. কিউমুলাস (Cumulus) মেঘ – ঘন স্তূপের আকারে বায়ুমণ্ডলে এই মেঘ অবস্থান করে।
- বৈশিষ্ট্য –
- এই মেঘ অত্যন্ত ঘন ও পুরু প্রকৃতির।
- প্রকৃতিগতভাবে মেঘটি অনেকটা ফুলকপির মতো।
- বায়ুমণ্ডলে মেঘটি উল্লম্বভাবে বিস্তৃত।
- এই মেঘের পাদভূমি সমতল কালো বর্ণের হলেও ঊর্ধ্বাংশ সাদা বর্ণের হয়।
- তলদেশ থেকে শীর্ষদেশের উচ্চতা অনেক বেশি।
- আকাশে বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করে।
- প্রভাব – বায়ুমণ্ডলে এই মেঘ মূলত পরিষ্কার আবহাওয়া নির্দেশ করে।
2. কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus) মেঘ – এই ধরনের মেঘ যে-কোনো উচ্চতায় তৈরি হয়ে থাকে।
- বৈশিষ্ট্য –
- এই মেঘ অত্যন্ত ঘন ও গভীর প্রকৃতির।
- এটি ধূসর কালো কিংবা ঘন কালো প্রকৃতির।
- এই মেঘ ভূপৃষ্ঠের খুব কাছে অবস্থান করে, তবে এর আকৃতি ও উচ্চতা একটি বিশালাকৃতির পর্বতের মতো। তলদেশ প্রায় সমতল কিন্তু উপরিভাগ চ্যাপটা প্রকৃতির হয়।
- বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে উত্তর-পশ্চিম আকাশে এই মেঘ দৃষ্টিগোচর হয়।
- প্রচণ্ড বজ্রপাত ঘটানোর জন্য এই মেঘের অপর নাম ‘বজ্রমেঘ’ (Thunder Cloud)।
- প্রভাব – এই মেঘ থেকে প্রচণ্ড বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড় ও বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে।
অধঃক্ষেপণ (Precipitation) কাকে বলে? অধঃক্ষেপণ কীভাবে ঘটে?
অধঃক্ষেপণ – পৃথিবীর সমগ্র জলভাগ থেকে উত্থিত জলীয় বাষ্প উচ্চ বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত শীতলতার জন্য ঘনীভূত হয়ে জলকণা বা তুষার কণায় পরিণত হওয়ার পর সেগুলি যখন পৃথিবীর অভিকর্ষের টানে ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে, তখন তাকে অধঃক্ষেপণ বলে। উদাহরণ – বৃষ্টিপাত, তুষারপাত, শিলাবৃষ্টি প্রভৃতি।
অধঃক্ষেপণের সৃষ্টি –
- প্রথম পর্যায় – সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন জলাশয় যেমন – সাগর, মহাসাগর, নদী, হ্রদ, পুকুর প্রভৃতির জল সূর্যতাপে বাষ্পীভূত হয়। এই বাষ্পীভবনে সৃষ্ট জলীয় বাষ্প হালকা বলে উষ্ণ বায়ুর সঙ্গে উপরে উঠে যায়।
- দ্বিতীয় পর্যায় – বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প যত উপরের দিকে ওঠে, ততই তা সম্পৃক্ত অবস্থা থেকে শিশিরাঙ্ক (Dew Point) উষ্ণতায় পৌঁছায়। ফলে, জলীয় বাষ্প ক্রমশ ঘনীভূত হয়ে জলকণায় পরিণত হয়।
- তৃতীয় পর্যায় – ঘনীভূত জলকণাগুলি এরপর বাতাসে ভাসমান বিভিন্ন প্রকার ধূলিকণা, লবণ কণা, কয়লা কণাকে আশ্রয় করে ভেসে বেড়ায় ও মেঘ সৃষ্টি করে।
- চতুর্থ পর্যায় – এই মেঘে থাকা জলকণাগুলির ব্যাস যখন 2 মিমির বেশি হয়ে যায়, তখন পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে ভূপৃষ্ঠের দিকে ধাবিত হয় ও বৃষ্টিপাত ঘটায়।
- পঞ্চম পর্যায় – তবে যেসব জায়গায় উষ্ণতা 0°C-এর কম হয়, সেখানে বৃষ্টিকণা জমে বরফে পরিণত হয়ে তুষারপাত ঘটায়।

অধঃক্ষেপণের বিভিন্ন রূপগুলি আলোচনা করো।
অথবা, অধঃক্ষেপণের রূপগুলি কী কী?
অধঃক্ষেপণের শ্রেণিবিভাগ – অধঃক্ষেপণ মূলত দুই রূপে হয়, যথা –
- জলরূপে বা তরলরূপে এবং
- বরফরূপে বা কঠিনরূপে।
জলরূপে বা তরলরূপে অধঃক্ষেপণ –
- বৃষ্টিপাত (Rainfall) – জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু হালকা হওয়ায় ঊর্ধ্বগামী হয়। এই ঊর্ধ্বগামী বায়ু উপরে শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এলে ঘনীভূত হয়ে জলকণায় পরিণত হয়। এই ছোটো, বড়ো জলকণাগুলি পরস্পর সংযুক্ত হয়ে আয়তনে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়। ভূপৃষ্ঠে একসঙ্গে বহু জলকণার পতনকেই বৃষ্টিপাত বলে। প্রসঙ্গত, এই বৃষ্টিপাতে জলকণার ব্যাস প্রায় 2 মিমি বা তার চেয়েও বেশি হয়।
- গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি (Drizzle) – উচ্চ বা মধ্য বায়ুমণ্ডলের স্তর থেকে কখনো কখনো 0.5 মিমির কম ব্যাসযুক্ত জলকণা গুঁড়িগুঁড়ি আকারে ভূপৃষ্ঠে পতিত হলে, তাকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি (Drizzle) বলে। শীতকালে স্ট্র্যাটাস মেঘ থেকে এই ধরনের বৃষ্টিপাত হয়।
বরফরূপে বা কঠিনরূপে অধঃক্ষেপণ –
- শিলাবৃষ্টি (Hail Storm) – অনেক সময় জলীয় বাষ্পপূর্ণ ঊর্ধ্বমুখী বায়ু প্রবল গতিতে অনেক উপরের দিকে অতি শীতল স্থান (উষ্ণতা হিমাঙ্কের নীচে বা 0°C-এর অনেক কম) পর্যন্ত উঠে যায়। সেখানে অধিক শৈত্যের জন্য জলকণা জমাট বেঁধে ছোটো ছোটো বরফকণার সৃষ্টি করে। বায়ুর গতি কমে গেলে এই বরফকণাগুলি পরস্পর সংযুক্ত হয়ে আয়তনে বৃদ্ধি পেলে পৃথিবীর অভিকর্ষজ বলের টানে বৃষ্টির সঙ্গে ভূপৃষ্ঠের দিকে নেমে আসতে থাকে। একেই শিলাবৃষ্টি বলে। কিউমুলোনিম্বাস মেঘে শিলাবৃষ্টির উৎপত্তি হয়। ভারতবর্ষে কালবৈশাখীর সময় মাঝে মাঝে শিলাবৃষ্টি হয়। শিলাবৃষ্টিতে বরফকণার পরিধি প্রায় 5-50 মিমি-র হয়ে থাকে।
- তুষারপাত (Snowfall) – শীতপ্রধান দেশ বা উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু হিমাঙ্কের থেকে কম উষ্ণতায় (0°C-এর কম) ঘনীভূত হলে জলকণার বদলে ময়দার গুঁড়োর মতো তুষারে পরিণত হয়। এই তুষার পৃথিবীর অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে ভূপৃষ্ঠে পতিত হলে, তাকে তুষারপাত বলে।
- স্লিট বা বরফপত্র (Sleet) – অনেক সময় ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি শীতল মেঘের স্তর ও তার উপরে উষ্ণ মেঘের স্তর অবস্থান করে। মধ্য ও উচ্চ অক্ষাংশে তুষার নীচে পড়ার সময় উষ্ণ বায়ুস্তরের মধ্যে গলে জলকণায় পরিণত হয়। এই জলকণাগুলি ভূপৃষ্ঠের কাছে আবার শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এলে জমাট বেঁধে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তুষারকণায় পরিণত হয়। এই অধঃক্ষেপণকেই স্লিট বলে।
বৃষ্টিপাত কয়প্রকার ও কী কী?
অথবা, চিত্রসহ পরিচলন বৃষ্টিপাতের বর্ণনা দাও। পরিচলন বৃষ্টিপাত (Convectional Rainfall) সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।
পৃথিবীর যাবতীয় বৃষ্টিপাত নিম্নলিখিত তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত, যেমন – পরিচলন বৃষ্টিপাত, শৈলৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত এবং ঘূর্ণবাত বৃষ্টিপাত।

পরিচলন বৃষ্টিপাত (Convectional Rainfall) –
সংজ্ঞা – ভূপৃষ্ঠের অধিক উষ্ণতার ফলে পরিচলন পদ্ধতিতে জলীয় বাষ্পপূর্ণ উষ্ণ বায়ু ঊর্ধ্বে উঠে ঘনীভূত হয়ে যে বৃষ্টিপাত ঘটায়, তাকে পরিচলন বৃষ্টিপাত বলে।

পরিচলন বৃষ্টিপাতের সৃষ্টির পরিবেশ –
- লম্ব সূর্যরশ্মি,
প্রচণ্ড উত্তপ্ত জলভাগ বা ভূভাগ, - বাতাসে অধিক জলীয় বাষ্পের জোগান হল পরিচলন বৃষ্টির আদর্শ পরিবেশ।
পদ্ধতি – ভূপৃষ্ঠের যে সমস্ত অঞ্চলে জলভাগের বিস্তার বেশি এবং সূর্যরশ্মি প্রায় লম্বভাবে পড়ে সেখানে জলভাগ থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প বায়ুতে মেশে। এই জলীয় বাষ্পপূর্ণ উষ্ণ ও হালকা বায়ু উপরে উঠে যায়। উপরে শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে এই বায়ুস্থিত জলীয় বাষ্প শীতল ও ঘনীভূত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয় এবং মেঘের সৃষ্টি করে। এই জলকণা পরস্পর যুক্ত হয়ে ক্রমশ বড়ো হয় এবং মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে পরিচলন বৃষ্টিরূপে ভূপৃষ্ঠে ঝরে পড়ে।
বৈশিষ্ট্য –
- পরিচলন বৃষ্টিপাত সাধারণত দুপুরের পর বা বিকেলের দিকে হয়, তাই একে 4 O’Clock Rain বলে।
- মূলত কিউমুলোনিম্বাস মেঘ থেকে বজ্রবিদ্যুৎসহ মুষলধারে পরিচলন বৃষ্টিপাত হয়।
- এই বৃষ্টিপাত খুব কম সময় ধরে অল্প জায়গার মধ্যে হয়ে থাকে।
- বৃষ্টিপাতের পর আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়।
- সবচেয়ে কম পরিমাণ মেঘাচ্ছন্নতা থেকে সর্বাধিক পরিমাণ বৃষ্টিপাত এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
উদাহরণ –
- নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারাবছর বিকেলবেলা পরিচলন বৃষ্টি হয়।
- ক্রান্তীয় অঞ্চলে মৌসুমি বায়ু প্রভাবিত দেশগুলিতে মৌসুমি বায়ু আসার আগে পরিচলন বৃষ্টি হয়।
- নাতিশীতোষ্ণমণ্ডলে গ্রীষ্মকালের শুরুতে এই বৃষ্টি হয়ে থাকে।
চিত্রসহ শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাতের (Orographic Rainfall) বর্ণনা দাও।
অথবা, শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টির একটি চিহ্নিত চিত্র আঁকো।
সংজ্ঞা – ‘শৈল’ শব্দের অর্থ ‘পর্বত’ এবং ‘উৎক্ষেপ’-এর অর্থ ‘উপরে ওঠা’। সাধারণত জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু পর্বতে বাধা পেয়ে উপরে উঠে ঘনীভূত হয়ে যে বৃষ্টিপাত ঘটায়, তাকে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত বলে।

সৃষ্টির পরিবেশ –
- সমুদ্র নিকটবর্তী সুউচ্চ পর্বতের অবস্থান।
- সমকোণে প্রবল জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু পর্বত দ্বারা বাধা পেয়ে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টির পরিবেশ সৃষ্টি করে।
পদ্ধতি – সমুদ্র থেকে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু তার প্রবাহপথে আড়াআড়িভাবে অবস্থিত কোনো পর্বতে বাধা পেলে পর্বতের গা বেয়ে উপরে উঠে যায়। ঊর্ধ্বগামী এই বায়ু প্রসারিত ও শীতল হতে থাকে এবং বায়ুস্থিত জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে জলকণায় পরিণত হয়। এই জলকণাগুলি পরস্পর যুক্ত হয়ে ক্রমশ বড়ো হতে থাকে এবং পর্বতের যে ঢাল বেয়ে বায়ু উপরে উঠে এসেছে, সেই প্রতিবাত ঢালে (Windward Side) প্রচুর শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ঘটায়। পর্বত অতিক্রম করে এই বায়ু যখন বিপরীত ঢাল অর্থাৎ, অনুবাত ঢালে (Leeward Side) এসে পৌঁছায় তখন তাতে আর জলীয় বাষ্প থাকে না। তা ছাড়া নীচের দিকে নামতে থাকায় বায়ু ক্রমশ উষ্ণ হতে থাকে, ফলে, ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তাই এই ঢালে বৃষ্টি হয় না বললেই চলে। একে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল (Rainshadow Region) বলে।
উদাহরণ –
- ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসি পাহাড়ের প্রতিবাত ঢালে অবস্থিত চেরাপুঞ্জির মৌসিনরামে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বাধা পেয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু শিলং বিপরীত পাশে থাকায় সেখানে বৃষ্টিপাত কম হয়।
- দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আরবসাগরীয় শাখা পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম ঢালে বাধা পেয়ে প্রচুর শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ঘটায়, কিন্তু পূর্ব ঢালে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল সৃষ্টি হয়েছে।
ঘূর্ণবৃষ্টি (Cyclonic Rainfall) সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।
অথবা, ক্রান্তীয় ঘূর্ণবৃষ্টির চিত্রসহ ব্যাখ্যা দাও।
অথবা, নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবৃষ্টির চিত্রসহ বর্ণনা দাও।
সংজ্ঞা – ঘূর্ণবাতের ফলে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু উপরে উঠে ঘনীভূত হয়ে যে বৃষ্টিপাত ঘটে, তাকে ঘূর্ণবৃষ্টিপাত বলে।
সৃষ্টির শর্ত –
- বায়ুমণ্ডলে আর্দ্র উষ্ণ ও শুষ্ক শীতল বায়ুর সংঘাত।
- বাতাসের ঘূর্ণন গতিবেগ ঘূর্ণবৃষ্টিপাতের পরিবেশ তৈরি করে।
পদ্ধতি – ঘূর্ণবৃষ্টি মূলত দু-ভাবে সৃষ্টি হয়। যথা –
ক্রান্তীয় ঘূর্ণবৃষ্টি (Tropical Cyclonic Rainfall) – ক্রান্তীয় অঞ্চলে স্বল্প পরিসর স্থানে হঠাৎ উষ্ণতা বেড়ে গেলে গভীর নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়। তখন চারদিকের উচ্চচাপ অঞ্চলের শীতল ও ভারী বাতাস ওই নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে প্রবলবেগে ছুটে আসে এবং উষ্ণ হয়ে কুণ্ডলাকারে ঘুরতে ঘুরতে উপরে ওঠে। এই ঊর্ধ্বগামী উষ্ণ আর্দ্র বায়ু শীতল ও ঘনীভূত হয়ে বজ্রবিদ্যুৎসহ মুষলধারে বৃষ্টি ঘটায়। এর নাম ক্রান্তীয় ঘূর্ণবৃষ্টি। উদাহরণ – 2013 সালে ঘূর্ণবাত ফাইলিন (Phailin)-এর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে।

নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবৃষ্টি (Temperate Cyclonic Rainfall) – নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের কোনো স্থানে নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে মেরু অঞ্চল থেকে শীতল শুষ্ক বায়ু এবং ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে উষ্ণ আর্দ্র বায়ু ওই নিম্নচাপের দিকে ছুটে এসে দুই বায়ু পরস্পরের মুখোমুখি হলে তাদের মধ্যে আলোড়নের সৃষ্টি হয়। তখন উষ্ণ বায়ু হালকা হওয়ায় ভারী শীতল বায়ুর ওপর ধীরে ধীরে উঠে যায় এবং উষ্ণ বায়ুস্থিত জলীয় বাষ্প শীতল ও ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। এই বৃষ্টি নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবৃষ্টি নামে পরিচিত। ঝিরঝির করে এই বৃষ্টি বহুক্ষণ ধরে হয়। উদাহরণ – সাধারণত শীতকালে নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের দেশগুলিতে এই বৃষ্টি দেখা যায়।

আমরা আমাদের আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের পঞ্চম অধ্যায় ‘মেঘ ও বৃষ্টি’ থেকে কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পরীক্ষার জন্য বা চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে।
আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা হলে, আপনারা আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। তাছাড়া নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।





Leave a Comment