অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

Rahul

আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায়, “আঞ্চলিক শক্তির উত্থান”-এর কিছু “বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

আঞ্চলিক শক্তির উত্থান – অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর
Contents Show

1. জগৎশেঠ -এর ক্ষমতা কীরূপ ছিল?

জগৎশেঠ-এর উপাধি – ব্যবসায়ী ফতেহচাঁদ মোগল সম্রাটের থেকে জগতের শেঠ বা জগৎশেঠ উপাধি পান। এই উপাধি বংশানুক্রমিকভাবে চলতে থাকে। এটি একটি নির্দিষ্ট বণিক পরিবারের উপাধি।

জগৎশেঠ-এর ক্ষমতা –

  • নিজেদের মুদ্রা তৈরি, মহাজনি ব্যাবসা প্রভৃতি বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষমতা ছিল জগৎ শেঠদের। বাংলায় জগৎশেঠ-এর হাত ধরে একধরনের ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।
  • মুর্শিদাবাদে বাংলার নবাবের দরবারে জগৎশেঠ-দের রাজনৈতিক প্রভাব খুব বেশি ছিল। পলাশির যুদ্ধের পর জগৎশেঠদের সম্মতিতে ব্রিটিশ কোম্পানি মিরজাফরকেই নবাব নির্বাচিত করে।
জগৎ শেঠের বাড়ি

2. বাংলায় বর্গিহানা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

বাংলায় বর্গিহানা – বাংলায় মারাঠা বা বর্গিহানা ছিল নবাব আলিবর্দির সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। 1742-1752 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মারাঠারা বাংলা ও ওড়িশার বিভিন্ন অঞ্চলে লুঠতরাজ ও আক্রমণ চালিয়েছিল। নবাবের রাজধানী মুর্শিদাবাদও বর্গিহানা থেকে বাদ যায়নি।

  • সন্ধি – এই পরিস্থিতিতে নবাব আলিবর্দি খান 1751 খ্রিস্টাব্দে মারাঠা বা বর্গিদের সঙ্গে সন্ধি করেন। সন্ধির একটি শর্ত ছিল—মারাঠারা সুবা বাংলার পশ্চিম সীমা ওড়িশার জলেশ্বরের কাছে সুবর্ণরেখা নদী ভবিষ্যতে পার হবে না।
  • ফল/প্রভাব – বর্গিহানার ফলে বাংলার পশ্চিমের অনেক মানুষ পূর্ববাংলা, উত্তর বাংলা এবং কলকাতায় চলে যায়। অনেকে ব্রিটিশ বণিকদের কাছে আশ্রয় পেয়েছিল।

3. আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে হায়দরাবাদ রাজ্যের উত্থান সম্পর্কে আলোচনা করো।

ক্ষয়িষ্ণু মোগল সাম্রাজ্যের পটভূমিকায় ভারতবর্ষে যতগুলি আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ঘটেছিল, সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল হায়দরাবাদ রাজ্য।

হায়দরাবাদ রাজ্যের উত্থান –

  • পটভূমি
    • মোগল দরবারের একজন প্রভাবশালী অভিজাত ছিলেন মির কামার উদ্দিন খান সিদ্দিকি। ঔরঙ্গজেবের সময় তিনি বিজাপুরের সুবাদার ছিলেন। তাঁকে চিন কুলিচ খান উপাধিতে ভূষিত করেন সম্রাট ঔরঙ্গজেব।
    • সম্রাট বাহাদুর শাহ 1713 খ্রিস্টাব্দে তাঁকে অযোধ্যার সুবাদার নিয়োগ করেন।
    • এরপর মোগল সম্রাট ফারুখশিয়র তাঁকে নিজাম-উল-মুলক উপাধি দিয়ে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার করে পাঠান।
  • রাজ্য প্রতিষ্ঠা – 1720 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সম্রাট মোহাম্মদ শাহ তাঁকে আসফ ঝা উপাধি দিয়ে দিল্লিতে তাঁর প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত করেন। কিন্তু তিনি নানা কারণে সেই পদ ত্যাগ করে হায়দরাবাদে চলে যান। সেখানে রাজত্ব করছিলেন মুবারিজ খান। 1723 খ্রিস্টাব্দে নিজাম তাঁকে পরাজিত করেন এবং পরের বছর নিজেকে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার ঘোষণা করেন। তখন থেকেই তিনি দিল্লির কর্তৃত্ব অস্বীকার করে হায়দরাবাদে একটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।
নিজাম-উল-মুলক
Image Source: Wikipedia

4. আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে অযোধ্যার উত্থান সম্পর্কে কী জানো?

মোগল সম্রাটদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভারতবর্ষে অনেকগুলি স্বাধীন আঞ্চলিক রাজ্য আত্মপ্রকাশ করে। এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল অযোধ্যা রাজ্য।

অযোধ্যা রাজ্যের উত্থান –

  • পটভূমি – মোগল সম্রাট মুহম্মদ শাহের রাজত্বকালে সাদাৎ খান নামে এক খুরাসান নিবাসী অযোধ্যার সুবেদার হন। কিন্তু সেখানকার জমিদাররা তাঁর সঙ্গে বিরোধিতা শুরু করেন। এই অবস্থায় সাদাৎ খান কঠোর হস্তে তাদের দমন করেন। তখন মোগল সম্রাট তাঁকে বুরহান-উল-মুলক উপাধিতে ভূষিত করেন।
  • অযোধ্যার উন্নতি – অযোধ্যাকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শক্তিশালী করে তোলার জন্য তিনি রাজস্ব সংক্রান্ত নানান সংস্কার করেন। তিনি জমিদারদের শোষণের হাত থেকে কৃষকদের মুক্ত করেন। প্রশাসনিক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতাকেই মাপকাঠি ধার্য করেন।
  • স্বাধীন অযোধ্যার প্রতিষ্ঠা – 1722 খ্রিস্টাব্দ থেকেই সাদাৎ খান অযোধ্যায় স্বাধীনভাবে রাজ্যপাট চালাতে শুরু করেন। 1750 খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু অবধি তিনি স্বাধীনভাবেই রাজত্ব করেন।

অযোধ্যায় পরবর্তী শাসকরা ছিলেন সফদর জং, সুজা উদ-দৌলা প্রমুখ।

5. অযোধ্যায় কীভাবে স্বাধীন নবাবির সূচনা হয়? অথবা, এ প্রসঙ্গে সাদাৎ খানের অবদান কী ছিল?

মোগল দরবারে সাদাৎ খান ছিলেন একজন নামজাদা উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক।

  • সাদাৎখানের ভূমিকা – অযোধ্যার স্থানীয় রাজা ও গোষ্ঠীপতিদের বিদ্রোহ মোকাবিলা করার জন্য মোগল সম্রাট তাকে অযোধ্যায় পাঠান। শীঘ্রই তিনি সেই কাজ দক্ষ হাতে সামাল দেন। মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহ তাঁর কাজে খুশি হয়ে তাঁকে বুরহান-উল-মুলক উপাধি দেন।
  • স্বাধীন নবাবি প্রতিষ্ঠা – কেন্দ্রীয় শাসনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সাদাৎ খান অযোধ্যায় তাঁর নিজস্ব প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট হন। প্রথমেই তিনি
    • নিজের জামাতা মকরজংকে অযোধ্যার প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন।
    • দেওয়ানি ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করেন।
    • জায়গিরদারি ব্যবস্থাও নিজের মতো করে গড়ে তোলেন।

এইভাবে 1722 খ্রিস্টাব্দে সাদাৎ খানের নেতৃত্বে অযোধ্যায় একটি স্বাধীন নবাবি গড়ে ওঠে। যদিও তিনি মোগল দরবারের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেননি; বরং আনুগত্য দেখিয়ে স্বাধীনভাবে নবাবির সূচনা করেন।

6. ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র সম্পর্ক কেমন ছিল?

1717 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কোম্পানি মোগল সম্রাট ফারুকশিয়রের নিকট সুবা বাংলায় বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার ফরমান বা অধিকার লাভ করে। কিন্তু মুর্শিদকুলি খাঁ ইংরেজদের এই আধিপত্য মেনে নিতে পারেননি। ‘দস্তকের’ জোরে কোম্পানির বণিকরা বাংলায় ব্যক্তিগত বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছিল। এর ফলে যেমন ক্ষতি হচ্ছিল বাংলার বণিককুলের, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল নবাবের অর্থনৈতিক স্বার্থ। কারণ কোম্পানি ও তার বণিকরা বিনা শুল্কে অর্থাৎ কর ফাঁকি দিয়ে বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যেতে থাকে; সুতরাং, নবাব প্রতি বছর এক বিশাল অঙ্কের কর থেকে বঞ্চিত হতেন। তবে মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলার স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ইংরেজদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের রাস্তায় যাননি। বরং নিমরাজি হয়েই এই ব্যবস্থা মেনে নেন। এইভাবে বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র সঙ্গে ইংরেজ কোম্পানির সম্পর্কের অবনতি হয়। যদিও তা যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত পৌঁছোয়নি।

7. ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বাংলার নবাবদের বিরোধের প্রধান কারণ কী ছিল?

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বাংলার নবাবদের সম্পর্ক –

  • 1717 খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সম্রাট ফারুকশিয়র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলায় ব্যবসা করার জন্য দস্তক দেন। এই দস্তকের অপব্যবহার নিয়ে বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র সঙ্গে ইংরেজদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
  • ইংরেজ বণিকরা সম্রাট ফারুকশিয়রের কাছ থেকে প্রাপ্ত ফরমান ব্যক্তিগত ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে থাকে। এর ফলে বাংলার বণিকদের ব্যবসার এবং নবাবের রাজস্বের ক্ষতি হতে থাকে। মুর্শিদকুলি খাঁ ফারুকশিয়রের ফরমান অগ্রাহ্য করেন। তিনি ব্রিটিশ কোম্পানিকে দস্তকের অপব্যবহার করতে নিষেধ করেন।
  • পরবর্তী নবাব সুজাউদ্দিন বা আলিবর্দি খাঁ কোম্পানির আচার-আচরণে সন্দিহান ছিলেন। ইংরেজ বণিকগণ আলিবর্দির নিকট দুর্গ নির্মাণের আবেদন করলে, তা তিনি অগ্রাহ্য করেন।
  • এরপর বাংলার মসনদে বসেন সিরাজ-উদ-দৌলা। তিনিও তাঁর পূর্বসূরীদের পথ অনুসরণ করেন। ফলে শীঘ্রই সিরাজের সঙ্গে কোম্পানির দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই দ্বন্দ্ব 1757 খ্রিস্টাব্দের 23 জুন পলাশির যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি হয়।

8. বাংলার প্রথম তিনজন নবাবদের সঙ্গে ইংরেজ বণিকদের কীরূপ সম্পর্ক ছিল? সিরাজ-উদ-দৌলার আমলে এ সম্পর্কে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছিল?

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম থেকেই সুবা বাংলায় অর্থাৎ— বাংলা, বিহার ও ওড়িশায় বাণিজ্য করার জন্য উদগ্রীব ছিল। সেজন্য দরকার ছিল বাণিজ্য করার ‘ফরমান’। 1717 খ্রিস্টাব্দে কোম্পানি বাংলায় বাণিজ্য করার জন্য মোগল সম্রাট ফারুকশিয়রের কাছ থেকে ফরমান আদায় করে নেয়।

প্রথম তিন নবাবের সঙ্গে সম্পর্ক – ফারুকশিয়রের ফরমান অনুযায়ী কোম্পানি মুর্শিদকুলি খাঁ, সুজাউদ্দিন, আলিবর্দি খাঁ-র বাংলায় তেমন বাণিজ্যিক সুবিধা আদায় করতে পারেনি। কোম্পানির আচার-আচরণে এঁরা বিশেষ সজাগ ছিলেন। তবে নিজেদের স্বার্থে উভয়েই উভয়ের সঙ্গে একটা অম্লমধুর সম্পর্কের নীতি মেনে চলেছিলেন।

সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে সম্পর্ক – কিন্তু সমস্যা হয় নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সময়। তাঁর আমলেই নানা কারণে কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং শেষপর্যন্ত 1757 খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্কের নিষ্পত্তি ঘটে। সিরাজ বিরোধী ষড়যন্ত্রে কোম্পানি অংশগ্রহণ করলে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। দ্রুত কোম্পানির সঙ্গে সিরাজের সম্পর্ক তিক্ততার স্তরে পৌঁছায়। তিনি কোম্পানিকে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করতে নিষেধ করেন। যদিও কোম্পানি সিরাজের নিষেধ অমান্য করে। তা ছাড়া কোম্পানি নবাবের আদেশ অগ্রাহ্য করে কলকাতা ও চন্দননগরে দুর্গ নির্মাণ করে। সেজন্য ক্রুদ্ধ সিরাজ 1756 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কুঠি কাশিমবাজার আক্রমণ করেন।

9. ‘ফারুকশিয়রের ফরমান’ বলতে কী বোঝো? এই ফরমানের শর্তগুলি কী ছিল?

1717 খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট ফারুকশিয়রের নিকট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাদেশে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার জন্য যে অধিকার লাভ করে তাকেই বলা হয় ফারুকশিয়রের ফরমান।

ফরমানের শর্ত – এই ‘ফরমান’ অনুসারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায়

  1. বার্ষিক তিন হাজার টাকার বিনিময়ে বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার ছাড়পত্র পায়,
  2. গঙ্গাতীরবর্তী সুতাণুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা সহ আরও 38টি গ্রাম ক্রয় করার অনুমতি লাভ করে,
  3. কলকাতায় ইংরেজগণ ‘দস্তক’ ব্যবহারের অনুমতি পায় এবং
  4. প্রয়োজনে কোম্পানিকে মুর্শিদাবাদ টাকশাল থেকে মুদ্রা উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হয়।

10. বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব কী?

1764 খ্রিস্টাব্দের 22 অক্টোবর মিরকাশিম ও তাঁর মিত্রশক্তি (অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা ও মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম) ইংরেজদের কাছে বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত হয়। বাংলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই যুদ্ধের ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী।

  • এর ফলে বাংলার স্বাধীন নবাবির শেষ প্রদীপটুকু নিভে যায়।
  • ইংরেজ কোম্পানি বাংলায় ‘প্রকৃত ক্ষমতায়’ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলায় তাদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
  • ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তি আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
  • এক সঙ্গে তিন শক্তিকে পরাস্ত করার ফলে কোম্পানির সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়।
  • ইংরেজদের রাজনৈতিক আধিপত্য বাংলার সীমানা অতিক্রম করে সুদূর এলাহাবাদ পর্যন্ত প্রসারিত হয়। তাই ঐতিহাসিক স্মিথ যথার্থই বলেছেন, ‘পলাশির যুদ্ধ ছিল কয়েকটি কামানের খেলা; কিন্তু বক্সারের যুদ্ধ ছিল এক চূড়ান্ত যুদ্ধ।’

11. বক্সারের যুদ্ধের ফল কী হয়েছিল?

বক্সারের যুদ্ধের ফলাফল – 1764 খ্রিস্টাব্দে অক্টোবরে সংঘটিত বক্সারের যুদ্ধে বাংলার নবাব মিরকাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা ও দিল্লির মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম পরাজিত হন।

বক্সারের যুদ্ধের ফলাফল – এই যুদ্ধের ফলে—

  • ব্রিটিশ কোম্পানির সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়।
  • বাংলায় নবাবী শাসনের অবসান ঘটে। কোম্পানির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য সুনিশ্চিত হয়েছিল।
  • অযোধ্যার শাসকের পরাজয়ের ফলে প্রায় পুরো উত্তর ভারতে কোম্পানির ক্ষমতা বিস্তৃত হয়।
  • দিল্লির মোগল সম্রাট পরাজিত হলে, তিনি সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য ব্রিটিশ কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানির অধিকার দেন।

12. দেওয়ানির অধিকার ব্রিটিশ কোম্পানির কাছে কতটা লাভজনক ছিল?

দেওয়ানির অধিকার – 1765 খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ব্রিটিশ কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানির অধিকার দেন। এর বিনিময়ে কোম্পানি শাহ আলমকে বার্ষিক 26 লক্ষ টাকা দিতে অঙ্গীকার করে। দেওয়ানির অধিকার-এর ফলে—

  • ব্রিটিশ কোম্পানি প্রকৃত অর্থে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বাংলার বৈধ ক্ষমতা কোম্পানির হাতে আসে।
  • ব্রিটিশ কোম্পানির আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি পায়। এই সম্পদের ওপর ভিত্তি করেই কোম্পানি পরবর্তীকালে সর্বভারতীয় শক্তিতে পরিণত হয়।

13. সময়ক্রম অনুসারে সাজিয়ে লেখো – বক্সারের যুদ্ধ, পলাশির যুদ্ধ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ। এই তিনটি ঘটনার যোগসূত্র উল্লেখ করো।

সময় সারণি – 1757 খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধ, 1764 খ্রিস্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধ এবং 1765 খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির দেওয়ানি লাভ ঘটে।

ঘটনার যোগসূত্র – বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা 1757 খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধে পরাজিত হন। এরপর বাংলার নবাব হন মিরজাফর। মিরজাফরের পরবর্তীকালে বাংলার সিংহাসনে বসেন মিরকাশিম। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা নবাব। তিনি ইংরেজদের ঔদ্ধত্য মেনে নিতে পারেননি। তাই ইংরেজদের হটানোর জন্য অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা ও মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সঙ্গে তিনি গোপন আঁতাত তৈরি করেন। তাঁরা 1764 খ্রিস্টাব্দে সম্মিলিতভাবে বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত হন এবং কোম্পানির সঙ্গে আত্মরক্ষামূলক সন্ধি করতে বাধ্য হন। এইভাবে 1765 খ্রিস্টাব্দে এলাহাবাদের দ্বিতীয় চুক্তি অনুযায়ী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মোগলসম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট থেকে সুবা-বাংলার ‘দেওয়ানি’ অধিকার লাভ করে।

14. ‘দ্বৈত শাসনব্যবস্থা’ কী? কোম্পানি কেন এই ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিল?

প্রেক্ষাপট – 1765 খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানি লাভের পর লর্ড ক্লাইভ একই সঙ্গে নবাব ও কোম্পানির যে অভিনব শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, তা দ্বৈত শাসনব্যবস্থা নামে পরিচিত।

প্রবর্তনের কারণ – লর্ড ক্লাইভ ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি। আইনত দেওয়ানি লাভ করলেও বাস্তবে কিন্তু তিনি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন প্রবর্তন করেননি। এর কারণ ছিল—

  • দেশীয় ভাষা, রীতিনীতি সম্পর্কে কোম্পানির পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল না।
  • শাসন করার মতো পর্যাপ্ত কর্মচারীর অভাব ছিল।
  • অন্যান্য ইউরোপীয় বণিক সম্প্রদায়গুলির বিরোধিতা করতে চাননি।
  • বাংলার সম্পদ শোষণ করাই ছিল একমাত্র উদ্দেশ্য।

15. লর্ড ডালহৌসির সাম্রাজ্যবাদী নীতির উদ্দেশ্য লেখো।

অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য – ঐতিহাসিক গগ মনে করেন, ডালহৌসির সাম্রাজ্যবাদী নীতির পিছনে কাজ করেছিল অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য। ঐতিহাসিক বিপানচন্দ্র মনে করেন, ব্রিটিশ পণ্যের আমদানি বৃদ্ধি ছিল রাজ্যবিস্তার নীতির মূল প্রেরণা। ডালহৌসি মনে করতেন, দেশীয় রাজ্যগুলির প্রশাসন অত্যন্ত বিশৃঙ্খলপূর্ণ বলে ব্রিটিশ পণ্য ভারতে যথেষ্ট বাজার পায় না। এ জন্য ডালহৌসি ব্রিটিশ শিল্পপতিদের স্বার্থে ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে চেয়েছিলেন।

দেশীয় রাজ্যগুলি দখল – প্রাচ্যদেশীয় শাসনের প্রতি ডালহৌসির বিন্দুমাত্র আস্থা ছিল না। তিনি মনে করতেন, যে-কোনো ভাবে দেশীয় রাজ্যগুলিকে দখল করা প্রয়োজন। তাঁর ধারণা ছিল, ভারতীয়রা অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত। পার্সিভাল স্পিয়ার বলেছেন, ডালহৌসি বিশ্বাস করতেন, “যা কিছু ভালো, পশ্চিম থেকে এসেছে এবং যত বেশি আসে তত ভালো” (“All good things came from the West and the more of them the better”)। ঐতিহাসিক ইনস লিখেছেন, ডালহৌসির পূর্ববর্তী ইংরেজ শাসকগণ যেখানে সম্ভব সেখানে দেশীয় রাজ্যজয় করা বা দেশীয় রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে চাইতেন, ডালহৌসি সেখানে সর্বদা দেশীয় রাজ্য দখলের সুযোগ খুঁজতেন।

16. টিপু সুলতান কেন কোম্পানির কাছে পরাজিত হয়েছিলেন?

টিপু সুলতানের পরাজয়ের কারণ – দক্ষিণ ভারতে টিপু সুলতান ছিলেন ব্রিটিশ কোম্পানির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁকে পরাজিত করার জন্য কোম্পানিকে কূটনীতি গ্রহণ করতে হয়েছিল। এর ফলে টিপু পরাজিত হয়েছিলেন। তাঁর পরাজয়ের কারণ ছিল—

  • ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে হায়দরাবাদ ও মারাঠাদের সহযোগিতা।
  • ব্রিটিশ কোম্পানির সুশৃঙ্খল ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনী।
  • দক্ষিণ ভারতের প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সঙ্গে টিপুর সদভাব না থাকা।
  • টিপু সুলতানের কূটনৈতিক জ্ঞানের অভাব।

17. ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের গুরুত্ব লেখো।

ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের গুরুত্ব – ভারতে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ কোম্পানি জয়লাভ করেছিল। এই দ্বন্দ্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। যথা —

  • তৃতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধে ফরাসিরা ব্রিটিশদের কাছে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হলেও ভারতে তাদের বাণিজ্যকেন্দ্রগুলি ফিরে পায়। তবে এই প্রতিশ্রুতি দিতে হয় যে, পরবর্তীকালে তারা ভারতের রাজনৈতিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না।
  • তৃতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধে ব্রিটিশদের সাফল্য তাদের ভারতে রাজনৈতিক শক্তি স্থাপনের পথকে প্রশস্ত করেছিল।
  • ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব প্রমাণ করেছিল যে ভারতীয় রাজারা সামরিক দিক দিয়ে বিদেশিদের তুলনায় দুর্বল ছিল।
  • এই যুদ্ধ ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরি করেছিল।

আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায়, “আঞ্চলিক শক্তির উত্থান”-এর কিছু “বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

About The Author

Rahul

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

নিষেক বলতে কী বোঝায়? নিষেকের প্রকারভেদ

নিষেক ও দ্বিনিষেক কী? নিষেক ও দ্বিনিষেক -এর মধ্যে পার্থক্য

সম্পূর্ণ ফুল এবং অসম্পূর্ণ ফুল কাকে বলে? সম্পূর্ণ ফুল এবং অসম্পূর্ণ ফুলের মধ্যে পার্থক্য

সমাঙ্গ ফুল ও অসমাঙ্গ ফুল কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর