অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

Rahul

আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের তৃতীয় অধ্যায়, “ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা – অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর
Contents Show

1. রেগুলেটিং আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য কী ছিল? এই আইনের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

অষ্টাদশ শতকের সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে নানা কারণে কোম্পানির ব্যাপারে ইংল্যাণ্ডের পার্লামেন্টের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। ইংল্যাণ্ডে ও ভারতে কোম্পানির শাসনের উন্নতি ঘটানো ছিল রেগুলেটিং অ্যাক্টের উদ্দেশ্য। 1765 খ্রিস্টাব্দের পর থেকে আর্থিক দেউলিয়ার ফলে বাংলা ও ভারতে অর্থনৈতিক দুর্দশার সৃষ্টি হয়েছিল। কোম্পানির কর্মচারীরা অবৈধ উপায়ে বহু অর্থ উপার্জন করে ইংল্যাণ্ডের রাজনীতির ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রয়াস চালিয়েছিল। অ্যাডাম স্মিথ ও অন্যান্যরা কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের বিরোধিতা করেছিল। স্বাধীন বণিকরা ভারতের বাণিজ্যে অংশগ্রহণের জন্য আগ্রহ দেখিয়েছিল। এইভাবে রেগুলেটিং অ্যাক্টের পটভূমি তৈরি হয়েছিল।

রেগুলেটিং আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য –

তিনটি লক্ষ্য নিয়ে 1773 খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাস করা হয়েছিল। যথা—

  1. ব্রিটিশ সরকার ও কোম্পানির মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণ করা ছিল এই আইনের প্রথম লক্ষ্য।
  2. কোম্পানির ডিরেক্টর সভার পুনর্গঠন করে ভারতের শাসনের ওপর এর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের ব্যবস্থা করা।
  3. ভারতে একটি কেন্দ্রীয় শাসন কাঠামো গড়ে তোলা, যাতে সব ব্রিটিশ উপনিবেশগুলির ওপর এর কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়।

রেগুলেটিং আইনের বৈশিষ্ট্য –

  1. ডিরেক্টর সভার গঠনের পরিবর্তন ঘটানো হয়। 24 জন ডিরেক্টরের এক-চতুর্থাংশ এক বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন। স্থির হয় ডিরেক্টর সভার আয়ুষ্কাল হবে চার বছরের। ইংল্যাণ্ডে অন্তত দু-বছর কাটানোর পর কোম্পানির কোনো কর্মচারী ডিরেক্টর পদের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন।
  2. বাংলা শাসনের জন্য একজন গভর্নর জেনারেল ও চার সদস্যবিশিষ্ট একটি কাউন্সিল থাকবে। গভর্নর জেনারেল সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে চলবেন।
  3. কলকাতার সুপ্রিম গভর্নমেন্ট অন্যান্য প্রেসিডেন্সির যুদ্ধ ও শান্তির ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন। বোম্বাই ও মাদ্রাজ সরকার সুপ্রিম গভর্নমেন্টের নির্দেশ মেনে চলবেন।
  4. এই আইন অনুযায়ী কলকাতায় একটি সুপ্রিমকোর্ট স্থাপন করা হয়। স্থির হয় যে, এই কোর্ট ব্রিটিশ নাগরিকদের বিচার করবে, তবে গভর্নর জেনারেল ও তার কাউন্সিলের সদস্যদের বিচারের অধিকার কোর্টকে দেওয়া হয়নি। গভর্নর জেনারেল, কাউন্সিলের সদস্য ও সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের উচ্চ বেতনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য করার অধিকার বাতিল করা হয়েছিল।

রেগুলেটিং আইনের ত্রুটি –

রেগুলেটিং অ্যাক্টের কতগুলি ত্রুটি ছিল, সেজন্য এই আইনটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছিল। গভর্নর জেনারেলের বিশেষ ক্ষমতা ছিল না। কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি চলতে বাধ্য ছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে কাউন্সিলের তিনজন সদস্য (ফ্রান্সিস, মানসন ও ক্লেভারিং) এবং গভর্নর জেনারেল হেস্টিংসকে পছন্দ করতেন না, একমাত্র বারওয়েল ছিলেন তাঁর বন্ধু। সুপ্রিম গভর্নমেন্ট কোনো প্রেসিডেন্সির মত খণ্ডন করলে তা বাতিল করতে পারতেন, ইতিবাচক নির্দেশ দিতে পারতেন না। এই আইনে সুপ্রিমকোর্ট ও সুপ্রিম গভর্নমেন্টের অধিকার নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি, ফলে বিরোধের সৃষ্টি হয়।

রেগুলেটিং আইনের মূল্যায়ন

1781 খ্রিস্টাব্দে একটি সংশোধনী আইন পাস করে পার্লামেন্ট রেগুলেটিং অ্যাক্টের ত্রুটিগুলি দূর করার প্রয়াস চালিয়েছিল। গভর্নর জেনারেলের কার্যাবলিকে সুপ্রিমকোর্টের অধিকারের বাইরে স্থাপন করা হয়। এই আইন অনুযায়ী স্থির হয়েছিল, রাজস্ব আদায় ও সংগ্রহের ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। এ ছাড়া এই আইন অনুযায়ী সুপ্রিম গভর্নমেন্ট প্রাদেশিক কাউন্সিল ও কোর্টের জন্য আইন প্রণয়নের অধিকার পেয়েছিল।

2. ওয়ারেন হেস্টিংসের শাসন সংস্কার সম্পর্কে যা জানো লেখো।

1773 খ্রিস্টাব্দের ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’ অনুযায়ী ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলায় প্রথম গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কোম্পানির আমলে তিনিই প্রথম একটি সুসংহত প্রশাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন।

হেস্টিংসের শাসন সংস্কার –

প্রশাসনিক সংস্কার –

  • প্রথমেই হেস্টিংস দ্বৈতশাসনের অবসান ঘটান।
  • নায়েব-সুবেদার পদ বিলোপ করেন।
  • নবাবের ভাতা হ্রাস (32 লক্ষ থেকে 16 লক্ষ) করেন।
  • সরকারি কোষাগার কলকাতায় স্থানান্তরিত করেন।

রাজস্ব সংস্কার –

  • রাজস্ব আদায়ের জন্য গঠিত হয় ‘ভ্রাম্যমাণ কমিটি’।
  • সঠিক রাজস্ব আদায়ের জন্য গড়ে তোলেন ‘রাজস্ব বোর্ড’।
  • তিনি সুবা-বাংলাকে 6টি ভাগে ভাগ করে প্রত্যেক ভাগে একটি করে ‘প্রাদেশিক কাউন্সিল’ গঠন করেন।
  • তাঁরই আমলে ‘পাঁচশালা’ ও ‘একশালা’ ভূমি-ব্যবস্থা গৃহীত হয়।

বিচার সংস্কার –

  • তিনি বাংলাকে 35টি জেলায় ভাগ করেন।
  • প্রত্যেক জেলায় একটি করে ফৌজদারি ও দেওয়ানি আদালত স্থাপন করেন।
  • তিনিই এদেশে প্রথম ‘আইনের শাসন’ চালু করেন।
  • তাঁর আমলে কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট স্থাপিত হয়।

পুলিশি সংস্কার –

  • তিনি বাংলা ও বিহারকে কতকগুলি ফৌজদারি জেলায় বিভক্ত করেন।
  • প্রত্যেক জেলায় ছিল একটি করে থানা এবং সেখানে একজন করে ফৌজদার নিয়োগ করেন।
  • শহরের শান্তি রক্ষা করতেন কোতোয়ালগণ।

মূল্যায়ন – এইভাবে তাঁর আমলে সর্বপ্রথম একটি কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তিনিই ভারতে প্রথম আধুনিক বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলেন। সেজন্য ঐতিহাসিক পার্সিভাল স্পীয়ার তাঁকে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলেছেন।

3. লর্ড কর্নওয়ালিসের শাসনসংস্কার আলোচনা করো।

ওয়ারেন হেস্টিংসের পর ভারতে কোম্পানি শাসনের মূল স্থপতি ছিলেন লর্ড কর্নওয়ালিস। তিনি চেয়েছিলেন ইংল্যান্ডের ধাঁচে ভারতের শাসনকার্য গড়ে তুলতে।

কর্নওয়ালিসের শাসন সংস্কার –

শাসন সংস্কার – কর্নওয়ালিস হেস্টিংসের শাসনব্যবস্থা যেমন অনুসরণ করেন, তেমনই এর ব্যাপক সংস্কারও করেন। যথা—

  1. প্রথমেই তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীদের ঘুষ নেওয়া বন্ধ করতে তাদের বেতন বৃদ্ধি করেন।
  2. কঠোর হস্তে তাদের অবৈধ অর্থ উপার্জনের পথ এবং ব্যক্তিগত ব্যবসা বন্ধ করে দেন।
  3. কোম্পানির ব্যয় সংকোচনের জন্য বহু উচ্চপদ বাতিল করেন।
  4. শাসনকার্যের সুবিধার জন্য বাংলাকে 35টি জেলা থেকে কমিয়ে 23টি করেন।

সিভিল সার্ভিস – লর্ড কর্নওয়ালিস ছিলেন ভারতে ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। ভারতের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগের জন্য তিনি তাঁদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন।

পুলিশি সংস্কার –

  1. জেলা শাসনের জন্য তিনি জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, ডেপুটি কালেক্টর প্রভৃতি শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ করেন।
  2. জেলাগুলিকে কতকগুলি থানায় বিভক্ত করেন। থানার দায়িত্বে ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।
  3. কলকাতায় আইনশৃঙ্খলা দেখার জন্য পুলিশ কমিশনার নিয়োগ করেন।
  4. গ্রামের ও শহরের আইনশৃঙ্খলা দেখাশোনা করতেন চৌকিদার ও কোতোয়ালগণ।

বিচার সংস্কার –

  1. সদর নিজামত আদালত মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় নিয়ে আসেন। এর নিচে ছিল 4টি প্রাদেশিক আদালত (কলকাতা, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ ও পাটনা)।
  2. ফৌজদারি মামলার জন্য তিনি 4টি ভ্রাম্যমাণ আদালত স্থাপন করেন।
  3. বিচারব্যবস্থায় সর্বনিম্ন আদালত ছিল মুন্সেফের আদালত।
  4. 1793 খ্রিস্টাব্দে তিনি 48টি রেগুলেশনসহ ‘কর্নওয়ালিস কোড’ নামে একটি আইন-সংহিতা প্রকাশ করেন। এর দ্বারাই তিনি প্রথম আইন, শাসন ও বিচার বিভাগকে আলাদা করেন।

4. ওয়ারেন হেস্টিংস ও কর্নওয়ালিসের বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের তুলনামূলক আলোচনা করো। এই সংস্কারগুলির প্রভাব ভারতীয়দের ওপর কীভাবে পড়েছিল?

ইংরেজ কোম্পানির আমলে ওয়ারেন হেস্টিংস ও লর্ড কর্নওয়ালিস ভারতীয় বিচার ব্যবস্থায় কিছু উল্লেখযোগ্য সংস্কার সাধন করেন। এক্ষেত্রে তাঁদের কাজের মধ্যে কিছু মিল ও অমিল লক্ষ করা যায়।

কোন্ বিষয়েকী মিল / অমিল
1. বিচারপতিউভয় ইংরেজ প্রশাসকই ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় ইউরোপীয় বিচারপতিদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছিলেন। অন্যদিকে এদেশীয় বিচারপতিদের গুরুত্ব কমানো হয়েছিল।
2. বিধিবদ্ধ আইনওয়ারেন হেস্টিংস এদেশীয় হিন্দু ও মুসলিম আইনগুলি পৃথকভাবে সংকলন করেছিলেন। অন্যদিকে লর্ড কর্নওয়ালিস 48টি আইন সহ একটি বিধিবদ্ধ আইন সংহিতা সংকলন করেন। যার নাম ছিল কর্নওয়ালিস কোড।
3. আইনের শাসনএদেশে প্রথম আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস, কর্নওয়ালিস নয়। (বইয়ের পাঠ্য অনুযায়ী)
4. ভ্রাম্যমান আদালতলর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় ভ্রাম্যমান আদালতের ব্যবস্থা করেননি তা করেছিলেন লর্ড কর্নওয়ালিস।
5. বিচারপতিবিচার ব্যবস্থায় হেস্টিংস ভারতীয় বিচারপতিদের ব্যবহার করলেও, কর্নওয়ালিস তা বাতিল করেছিলেন।
6. পৃথক ব্যবস্থাএ দেশের আইন, শাসন ও বিচার ব্যবস্থাকে পৃথক করেছিলেন লর্ড কর্নওয়ালিস।

প্রভাব – ভারতীয়দের ওপর উক্ত সংস্কারগুলির প্রভাব লক্ষ করা যায়। যেমন—

  • ভারতে প্রচলিত পুরাতন বিচার ব্যবস্থার অবসান শুরু হয় এবং এদেশে আধুনিক বিচার ব্যবস্থার সূচনা হয়।
  • সারা দেশে একই আইনকানুন ও বিচারব্যবস্থার প্রচলন ঘটে।

5. লর্ড বেন্টিঙ্কের শাসন সংস্কার সম্পর্কে যা জানো লেখো।

লর্ড বেন্টিঙ্কের শাসন সংস্কার ভারতে শাসন সংস্কারের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তিনি কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত প্রশাসনিক ব্যবস্থার কিছু পরিবর্তন করেন। তিনি মনে করতেন, এদেশের মঙ্গলের জন্য একটি সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।

বেন্টিঙ্কের সংস্কার

অর্থনৈতিক সংস্কার – কোম্পানির বাৎসরিক আয়ের ঘাটতি পূরণের জন্য তিনি –

  • সরকারি কর্মচারীদের বেতন হ্রাস করেন।
  • নিষ্কর জমির ওপর রাজস্ব ধার্য করেন।
  • মাদ্রাজে রায়তওয়ারি ব্যবস্থা চালু করেন।
  • মালবে আফিম ব্যবসার ওপর শুল্ক আরোপ করেন।

বিচার বিভাগীয় –

  1. ভ্রাম্যমান আদালতগুলি বাতিল করেন।
  2. ফৌজদারি বিচারের দায়িত্ব পান জেলা জজ।
  3. আদালতে ফারসি ভাষার বদলে ইংরেজিতে কাজকর্ম চালু করেন।
  4. বিচার ব্যবস্থায় ভারতীয়দের নিয়োগের ব্যবস্থা করেন।
  5. তিনি ‘ল-কমিশন’ গঠন করেন।

প্রশাসনিক সংস্কার –

  1. এদেশে প্রশাসনিক পদে তিনিই প্রথম ভারতীয়দের নিয়োগ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
  2. প্রশাসনের সুবিধার জন্য তিনি কয়েকটি জেলা নিয়ে একটি ডিভিশন বা প্রদেশ গঠন করেন। এর দায়িত্ব পান কমিশনারগণ।
  3. প্রশাসনিক পদে ভারতীয়দের নিয়োগের জন্য তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর নামক দুটি নতুন পদ তৈরি করেন।

মূল্যায়ন – এই সমস্ত কারণের জন্যই ভারতবর্ষে তাঁর শাসনকাল (1828-35) ‘সংস্কারের যুগ’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। লর্ড মেকলের মতে তাঁর শাসনকাল ছিল ভারতীয়দের সর্বাঙ্গীন মঙ্গলের যুগ।

6. ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল কে ছিলেন? তাঁর বিভিন্ন সংস্কারগুলি লেখো।

ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল হলেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক।

সংস্কারসমূহ –

হিতবাদী দর্শন দ্বারা প্রভাবিত বেন্টিঙ্ক বিশ্বাস করতেন যে, সর্বোচ্চ সংখ্যক ভারতবাসীর সর্বোৎকৃষ্ট উন্নতি ও সুখের জন্য কোম্পানির প্রশাসন পরিচালনা করা প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক সংস্কার –

  1. নিষ্কর জমি অনুসন্ধান করে তার ওপর কর ধার্য করা হয়।
  2. কোম্পানির বার্ষিক করের ঘাটতি মেটানোর জন্য কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা হ্রাস করা হয়।
  3. মাদ্রাজে রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত চালু (1820 খ্রিস্টাব্দ) করে তিনি ভূমি রাজস্ব বৃদ্ধি করেন।
  4. কম বেতনে কাজের জন্য ভারতীয় কর্মচারী নিয়োগ করেন।

প্রশাসনিক সংস্কার –

  1. তিনি জেলাগুলিকে পুনর্গঠন করেন। জেলাগুলির তদারকির ভার অর্পিত হয় বিভাগীয় ডিভিশন-এর ওপর।
  2. যোগ্যতা অনুযায়ী ভারতীয়দের উচ্চপদে নিয়োগ করেন। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, ডেপুটি কালেক্টর প্রভৃতি পদে ভারতীয়দের নিয়োগ করা হয়।
  3. আইনসচিব মেকলের নেতৃত্বে ভারতীয় আইন-বিধি (Indian Penal Code) সংকলন করেন।

বিচারবিভাগীয় সংস্কার –

  1. লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত ভ্রাম্যমান বিচারব্যবস্থা বাতিল করে দেন। তাঁর আমলে জেলার পূর্বতন বিচারব্যবস্থা ফিরে আসে।
  2. কালেক্টরদের আবার ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়।
  3. উচ্চ আদালতগুলিতে ফারসির বদলে ইংরেজি এবং নিম্ন আদালতগুলিতে স্থানীয় ভাষা প্রযুক্ত হয়।

সমাজ সংস্কার –

সমাজ সংস্কারক হিসেবে বেন্টিঙ্ক ইংরেজ শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য সমাজসংস্কারগুলি হল—

  1. তিনি 1829 খ্রিস্টাব্দে হিন্দু নারীর অভিশাপ ‘সতীদাহ প্রথা’ রদ করেন।
  2. তিনি 1830 খ্রিস্টাব্দে কর্নেল শ্লীম্যানের নেতৃত্বে দিল্লি ও মধ্য ভারতের মারাত্মক ‘ঠগি’ দস্যুদের নিশ্চিহ্ন করেন। সেইসঙ্গে তিনি পিন্ডারি দস্যুদেরও দমন করেন।
  3. তিনি কাথিয়াবাড় ও রাজস্থানে নবজাত কন্যাসন্তান হত্যার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

শিক্ষাসংস্কার –

  1. বেন্টিঙ্ক প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্বের নিরসন করে আইনসচিব মেকলের নেতৃত্বে ভারতে ইংরেজি (পাশ্চাত্য) শিক্ষার প্রচলন করেন।
  2. তিনি ডাক্তারি শিক্ষার জন্য 1835 খ্রিস্টাব্দে কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও বোম্বাইতে এলফিনস্টোন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

মূল্যায়ন – শাসনসংস্কারক হিসেবে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক অবশ্যই ভারতের ইংরেজ প্রশাসনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। সতীদাহ প্রথা রদ করে মধ্যযুগীয় বর্বরতা থেকে ভারতীয় নারী সমাজকে মুক্ত করেন। এই কারণে তাঁকে ভারতীয় নারীদের সতীদাহ প্রথা থেকে মুক্তির পথিকৃৎ বলা হয়।

7. কোম্পানির আমলে পুলিশি ব্যবস্থা/পুলিশ প্রশাসনের কী কী সংস্কারসাধন ঘটেছিল?

পটভূমি – 1765 খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির দেওয়ানিলাভের পর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, দেশের শান্তি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, পুলিশ ইত্যাদির দায়িত্ব নবাবের হাতে থেকে যায়। ফলে বাংলায় শুরু হয় দ্বৈতশাসন। ওয়ারেন হেস্টিংস দ্বৈতশাসনের অবসান ঘটিয়ে সমগ্র ক্ষমতা কোম্পানির হস্তগত করেন।

হেস্টিংসের সংস্কার – ভারতে ব্রিটিশ শাসনের তৃতীয় স্তম্ভ ছিল পুলিশ বিভাগ। ব্রিটিশ শাসনের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে পুলিশিব্যবস্থাকে ওয়ারেন হেস্টিংস ব্যাপকভাবে সংস্কার করেন।

  1. হেস্টিংস প্রত্যেকটি থানার সঙ্গে পুলিশি হাজত নির্মাণ করেন।
  2. থানার দায়িত্ব ফৌজদারের ওপর ন্যস্ত হয়।
  3. ফৌজদারকে সাহায্য করার জন্য অনেক কর্মচারী নিয়োগ করা হত।

পরবর্তীতে হেস্টিংস ফৌজদারি পদ তুলে দিয়ে এই ক্ষমতা অর্পণ করেন দেওয়ানি আদালতের বিচারপতিদের ওপর।

কর্নওয়ালিসের সংস্কার – আধুনিক পুলিশিব্যবস্থার প্রবর্তক হিসেবে লর্ড কর্নওয়ালিস সমধিক পরিচিত। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল পুলিশি ব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ—

  • তিনি প্রথমে কলকাতাকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে প্রতিটি ভাগের জন্য একজন করে পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট নিয়োগ করেন। তাদের অধীনে পুলিশবাহিনী সংযুক্ত করে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব দেন।
  • প্রতিটি জেলাকে এলাকা অনুযায়ী কতকগুলি ভাগে ভাগ করা হয় এবং এক-একটি এলাকার দায়িত্ব এক-একজন সুপারিনটেন্ডেন্টকে দেওয়া হয়।
  • সুপারিনটেন্ডেন্টদের অধীনে এলাকাভিত্তিক কয়েকটি থানা গঠন করা হয়।
  • প্রতিটি থানায় একজন করে ভারতীয় দারোগা ও তাঁর অধীনে কয়েকজন সিপাহি নিয়োগ করা হয়।
  • জেলার ম্যাজিস্ট্রেট সুপারিনটেন্ডেন্টদের সাহায্য নিয়ে জেলার আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করতেন।
  • জেলা কালেক্টর থানার দারোগাদের নিয়োগ করতেন।
  • প্রতিটি গ্রামের জন্য চৌকিদার থাকত। তাদের নিয়োগ করতেন থানার দারোগারা।

মূল্যায়ন – কিন্তু কর্নওয়ালিসের প্রচেষ্টা বিশেষভাবে সফল হয়নি। দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশের হাতে সাধারণ মানুষ অত্যাচারিত হত। ফলে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছিল ভীতির সম্পর্ক।

অবশ্যই, এখানে আপনার নির্দেশমতো পাঠ্যাংশের সমস্ত সংখ্যা ইংরেজিতে (English numerals) এবং বাকি অংশ বাংলায় রাখা হয়েছে।

8. প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব কী? ইংরেজি/পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব আলোচনা করো।

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ভারতবর্ষে শিক্ষার প্রসারে সরকারি উদাসীনতা লক্ষ করা যায়। বড়োলাট আর্ল অব মিন্টো, উইলবারফোর্স প্রমুখ ইংরেজ ব্যক্তিবর্গ প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেন। কোম্পানি বার্ষিক এক লক্ষ টাকা শিক্ষাখাতে ব্যয় করার জন্য অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। ওই অর্থ ব্যয় প্রাচ্য না পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে হবে, এ সম্বন্ধে নির্দেশ না থাকার ফলে মতভেদ দেখা দেয়। একই সঙ্গে শিক্ষায় অর্থ ব্যয়ের দায়িত্ব সরকারের, এই নীতিও গৃহীত হয়। অর্থ মঞ্জুর করা হলেও 1823 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কিন্তু ওই অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষা বিষয়ে নীতি নির্ধারণের জন্য ‘জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন’ গঠিত হলেও কমিটির দশ জন সদস্যের পাঁচ জন করে প্রাচ্যবাদী (Orientalist) ও পাশ্চাত্যবাদী (Anglicist) মতাদর্শে বিভক্ত ছিলেন। প্রাচ্যবাদীরা চাইছিলেন সংস্কৃত, দেশীয় ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষার জন্য এ অর্থ ব্যয় করা হোক। অপরদিকে পাশ্চাত্যবাদীরা চাইছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের জন্য সে অর্থ ব্যবহৃত হোক।

এই বিতর্কে সরকারি উদ্যোগের অচলাবস্থা দেখা দেয়। এই সময়ে ‘পাবলিক ইনস্ট্রাকশন কমিটি’-র সভাপতি হন টমাস ব্যাবিংটন মেকলে। তিনি ছিলেন পাশ্চাত্যবাদী। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারেই ছিল তাঁর উদ্যোগ। তিনি তাঁর স্মারকলিপিতে (1835 খ্রিস্টাব্দে) মাতৃভাষার দাবি অগ্রাহ্য করে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কও ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষপাতী।

ইংরেজি শিক্ষার প্রভাব –

একথা ঠিক যে, পাশ্চাত্য শিক্ষাগ্রহণের ফলে ভারতীয়দের কাছে বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডার উন্মুক্ত হয়। বাস্তবক্ষেত্রে ইংরেজি শিক্ষাগ্রহণ ভারতীয়দের কাছে সবটাই আদর্শবাদী ছিল না। তবুও এর কিছু ইতিবাচক দিকও ছিল।

  • চাকরির সংস্থান – ইংরেজি শিক্ষাগ্রহণের ফলে মধ্যবিত্তদের কাছে আশু প্রয়োজন হিসেবে ইংরেজদের অধীনে চাকরি পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়। এর ফলে মধ্যবিত্ত বাঙালি তথা ভারতীয়রা ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ থেকে বিরত থেকে নেহাতই চাকরিজীবীতে পরিণত হয়।
  • বাবু সম্প্রদায় – ইংরেজি শিক্ষার ফলে সৃষ্টি হয় মধ্যবিত্ত ‘বাবু’ সম্প্রদায়ের। পূর্বের বৃত্তিভোগী বা বণিক সমাজ দ্রুত অন্তর্হিত হয়। ব্যবসাজনিত কষ্ট, একাগ্রতা, ধৈর্যশীলতা পরিত্যাগ করে তারা বাঁধা মাইনের চাকরি লাভে লালায়িত হয়ে ওঠে।
  • ভ্রান্ত অহমিকা – ইংরেজি-শিক্ষিত বাঙালি যুবক সম্প্রদায় একটি ভ্রান্ত অহমিকার শিকার হয়ে পড়ে। ইংরেজি বা পাশ্চাত্য শিক্ষার সঙ্গে তাদের মধ্যে পরমুখাপেক্ষিতার সৃষ্টি হয়। নিজস্ব ভাবধারা ও আত্মবিশ্বাস ত্যাগ করে মেকি ইংরেজি অনুসরণ করাই তাদের ধ্যানজ্ঞান হয়।
  • নিজেদের ঐতিহ্যের প্রতি অনাস্থা – পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালিদের অনেকসময়ে নিজেদের ঐতিহ্য ও ধর্মবিশ্বাসের প্রতি অশ্রদ্ধা আসে। অনেকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়।
  • স্বাদেশিকতা – শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালিরাই প্রথম অনুধাবন করে স্বাদেশিকতার গ্লানি। তাই এক সংগ্রামশীল চেতনায় তারা আপ্লুত হয়। তারই বহিঃপ্রকাশ হতে থাকে তাদের বিভিন্ন কর্মধারার মাধ্যমে, সংগঠনের মাধ্যমে, সাহিত্য ও পত্রিকা প্রকাশনার মাধ্যমে।

9. ভারতবর্ষে কীভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের পথ প্রশস্ত হয়?

ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের ঘটনা আধুনিক ভারতের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। উনিশ শতকের শুরুতেই কোম্পানি এ বিষয়ে নড়েচড়ে বসে এবং এক ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।

ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তার –

  • সনদ আইন ঘোষণা – ইংরেজ কর্তৃপক্ষ 1813 খ্রিস্টাব্দে যে সনদ আইন ঘোষণা করে, তাতে বলা হয় যে, তারা এদেশের শিক্ষাখাতে বছরে 1 লক্ষ টাকা ব্যয় করবে।
  • প্রাচ্য-পাশ্চাত্যবাদীদের দ্বন্দ্ব – উক্ত টাকা কোন খাতে ব্যয় হবে তা স্পষ্টভাবে 1813 খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনে বলা হয়নি। তাই এই বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যবাদীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেধে যায়।
    • 1. প্রাচ্যবাদীরা চাইছিলেন এই অর্থ ভারতীয় ভাষা, সাহিত্য ও দর্শন ভিত্তিক প্রাচ্য শিক্ষার খাতে ব্যয় হোক।
    • 2. পাশ্চাত্যবাদীরা চাইছিলেন এদেশের শিক্ষার মাধ্যম হোক ইংরেজি ভাষা এবং বিষয় হোক পাশ্চাত্যের সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞান।
  • মেকলে-প্রস্তাব – এই সমস্যার সমাধানের জন্য তৎকালীন বড়োলাট লর্ড বেন্টিঙ্ক ‘পাবলিক ইনস্ট্রাকশন কমিটি’র সভাপতি টমাস ব্যাবিংটন মেকলের নেতৃত্বে একটি কমিটি তৈরি করেন। মেকলে তাঁর রিপোর্টে (মেকলে মিনিট) পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষেই রায় দেন। এইভাবে এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের পথ প্রশস্ত হয়।
  • হার্ডিঞ্জের ঘোষণা – 1844 খ্রিস্টাব্দে বড়োলাট লর্ড হার্ডিঞ্জ সরকারি চাকরিতে ইংরেজি ভাষাকে প্রাধান্য দিলে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের পথ আরও মসৃণ হয়।
  • উডের ডেসপ্যাচ – ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের ‘মহাসনদ’ বলা হয় ‘উডের ডেসপ্যাচ’-কে। এই ঘোষণায় ভারতে ইংরেজি ভাষা তথা পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

10. ‘মেকলে মিনিট’-এ কী কী সুপারিশ করা হয়েছিল?

অথবা, ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারে মেকলে মিনিটের সুপারিশগুলি কী কী ছিল?

1835 খ্রিস্টাব্দে ঘোষিত ‘মেকলে মিনিট’ ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের পথ প্রশস্ত করে।

মেকলে সাহেবের মিনিট –

  • মেকলের প্রস্তাব – তৎকালীন বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য বিতর্কের অবসানের জন্য ‘কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন’-এর সভাপতি লর্ড ব্যাবিংটন মেকলের ওপর দায়িত্ব দেন। অবশেষে সব বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে মেকলে 1835 খ্রিস্টাব্দের 2 ফেব্রুয়ারি তাঁর বিখ্যাত রিপোর্ট পেশ করেন। এই রিপোর্টই ‘মেকলে মিনিট’ বা ‘মেকলে প্রস্তাব’ নামে খ্যাত। মেকলের প্রস্তাব অনুযায়ী ভারতবর্ষে কোম্পানি শাসনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এমন এক মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি করা, যারা জন্মগতভাবে হবে ভারতবর্ষীয়, কিন্তু রুচি, আদর্শ ও নৈতিকতায় হবে ব্রিটিশ।
  • মেকলের সুপারিশ – মেকলে সাহেব তাঁর সুপারিশে যে বক্তব্য রাখেন, তা হলো—
    • পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার – ভারতে ইংরেজি ভাষা তথা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। কারণ এর দ্বারা ভারতবাসীর মধ্যে যথার্থ জ্ঞানের উন্মেষ ঘটবে এবং এদেশ থেকে কুসংস্কার দূর করা যাবে।
    • উৎকৃষ্ট পাশ্চাত্য শিক্ষা – প্রাচ্য শিক্ষা অপেক্ষা পাশ্চাত্য শিক্ষা অধিকতর উৎকৃষ্ট এবং পাশ্চাত্যের জ্ঞানভাণ্ডার অফুরন্ত। সুতরাং, প্রাচ্যবিদ্যা শেখার প্রয়োজন নেই।
    • নিম্নমুখী পরিস্রুত নীতি – পাশ্চাত্য ভাষা ও শিক্ষাকে ভারতের উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলে ‘নিম্নমুখী পরিস্রুত নীতি’ (Downward Filtration Theory) অনুযায়ী সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছে যাবে।
  • মূল্যায়ন – শেষপর্যন্ত তৎকালীন ভারতের বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ‘মেকলে প্রস্তাব’-এ সিলমোহর দিলে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের প্রথম সোপান রচিত হয়।

11. ভারতে কোম্পানি শাসনকাল থেকে ব্রিটিশ শাসন পর্যন্ত শিক্ষানীতির পরিচয় দাও।

1813 খ্রিস্টাব্দে ঘোষিত সনদ আইনে বলা হয়, ইংরেজ কোম্পানি ভারতের শিক্ষাখাতে বছরে 1 লক্ষ টাকা ব্যয় করবে। কিন্তু সেই টাকা কোন খাতে ও কীভাবে ব্যয় করা হবে, তার স্পষ্ট উল্লেখ ছিল না। তাই এ নিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যবাদীদের মধ্যে তুমুল দ্বন্দ্ব বেধে যায়।

  • মেকলে মিনিট – বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক এই সমস্যার সমাধানের জন্য ‘কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন’-এর সভাপতি টমাস ব্যাবিংটন মেকলের ওপর দায়িত্ব দেন। 1835 খ্রিস্টাব্দের 2 ফেব্রুয়ারি মেকলে তাঁর রিপোর্ট পেশ করেন। এই রিপোর্টে তিনি ইংরেজি শিক্ষাকেই ভারতের সরকারি শিক্ষানীতি রূপে ঘোষণা করেন। সুতরাং, উক্ত টাকা ইংরেজি সাহিত্য ও পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষার খাতে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
  • হার্ডিঞ্জের ঘোষণা – 1844 খ্রিস্টাব্দে বড়োলাট ‘হার্ডিঞ্জের ঘোষণা’য় ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের পথ আরও মসৃণ হয়। কারণ সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তিনি ইংরেজি ভাষাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এতে দেশবাসীর কাছে ইংরেজি শিক্ষা অর্থকরী বৃত্তিশিক্ষায় পরিণত হয়।
  • উডের ডেসপ্যাচ – 1854 খ্রিস্টাব্দে ‘বোর্ড অফ কন্ট্রোল’-এর সভাপতি চার্লস উড ভারতের শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে প্রথম একটি সুস্পষ্ট নীতির কথা বলেন। তিনি তাঁর প্রস্তাবে (উডের ডেসপ্যাচ) ইংরেজি ও দেশীয় ভাষায় শিক্ষা সম্প্রসারণ ও বেসরকারি বিদ্যালয়গুলিতে সরকারি অনুদান দেওয়ার কথা বলেন।
  • হান্টার কমিশন – 1882 খ্রিস্টাব্দে লর্ড রিপন নিযুক্ত হান্টার কমিশন ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। এর ফলে উচ্চশিক্ষার দ্রুত প্রসার ঘটে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় আইন – বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সংস্কারকল্পে 1902 খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জন টমাস র‍্যালের সভাপতিত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী 1904 খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিধিবদ্ধ হয়। এই আইনের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সরকারি কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে পঠনপাঠন ও অধ্যাপক নিয়োগের ব্যবস্থা, গবেষণার ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগার, প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগার স্থাপনের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ওপর ন্যস্ত হয়।

1910 খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকারের উচ্চশিক্ষা নীতি অনুসারে ভারতের প্রতিটি বড়ো বড়ো প্রদেশে কমপক্ষে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলা হয়। ফলে পাটনা, নাগপুর, ঢাকা, আলিগড়, বেনারস ও রেঙ্গুনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। ইতিমধ্যে বড়ো বড়ো বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রশাসনিক জটিলতা বাড়তে থাকায় 1917 খ্রিস্টাব্দে মাইকেল স্যাডলারের নেতৃত্বে কলকাতা ‘বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন’ নিযুক্ত করা হয়। এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী অনেকগুলি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়।

12. পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে খ্রিস্টান মিশনারিদের অবদান লেখো।

পটভূমি – বাংলা তথা ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষাপ্রসারের ইতিহাসে বিভিন্ন খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের কার্যকলাপ বিশেষ বিস্তার লাভ করে। বস্তুতপক্ষে, বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারি বা যাজক সম্প্রদায় ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষাপ্রসারে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষার মাধ্যমে ভারতবাসীর কুসংস্কার দূর করে খ্রিস্টধর্মের প্রচার করা। যদিও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমদিকে ভারতে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের পক্ষপাতী ছিল না, কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ থেকে ইংরেজ শাসকদের মনোভাব পরিবর্তিত হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে ভারতে তিনটি খ্রিস্টান ধর্মপ্রতিষ্ঠান তাদের কার্যকলাপ শুরু করে। 1813 খ্রিস্টাব্দের সনদে ভারতে মিশনারিদের আগমনের পথ সহজতর করা হয়, ফলে মিশনারিরা একইসঙ্গে ধর্মপ্রচার ও শিক্ষাবিস্তারের কাজে আত্মনিয়োগ করে।

বাংলাদেশে ব্যাপটিস্ট মিশন, লন্ডন মিশনারি সোসাইটি, চার্চ মিশনারি সোসাইটি ও স্কটিশ মিশনারি সোসাইটি শিক্ষা-বিস্তারে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

কেরি ও তাঁর দুই সহকর্মী ওয়ার্ড ও মার্শম্যান প্রায় 126টি স্কুল স্থাপন করেন এবং 1818 খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীরামপুর কলেজ।

ব্যাপটিস্ট মিশনারিদের অবদান – 1800 খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ডের মিলিত প্রচেষ্টায় শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন প্রতিষ্ঠা হয়। এই মিশনের উদ্যোগেই সর্বপ্রথম বাংলা ও অন্যান্য 26টি ভারতীয় ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ প্রকাশিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটির প্রচেষ্টাতেই মোট 126টি বিদ্যালয়ে প্রায় 10 হাজার ভারতীয় ছাত্র পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পায়।

লন্ডন মিশনারিদের অবদান – লন্ডন মিশনারি সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট মে চুঁচুড়ায় ব্রেইল পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের লক্ষ্যে একটি স্কুল নির্মাণ করেন। এ ছাড়া লন্ডনের ক্ল্যাপহাম গোষ্ঠীর অন্যতম দুই সদস্য চার্লস গ্রান্ট ও মিস্টার উইলবার ফোর্স ভারতে ইংরেজি শিক্ষাপ্রসারের পক্ষে প্রচার চালান। তাঁরা যুক্তি ও তথ্য দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, ভারতীয় সমাজের কুসংস্কারগুলি দূর করার জন্য ও ভারতীয়রা যাতে সবদিক থেকে পিছিয়ে না পড়ে, তার জন্য ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন ও খ্রিস্টধর্মের প্রচার প্রয়োজন।

চার্চ ও স্কটিশ মিশনারিদের অবদান – স্কটিশ মিশনারি আলেকজান্ডার ডাফ স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলার সমাজজীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেন। তিনি 1830 খ্রিস্টাব্দে ‘জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন’ স্থাপন করেন। এটি পরে স্কটিশ চার্চ কলেজে রূপান্তরিত হয়।

জেসুইট মিশনারিদের অবদান – জেসুইট মিশনারিরা প্রতিষ্ঠা করেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ (1835 খ্রিস্টাব্দ)। বেলজিয়ামের জেসুইট মিশনারিরা গড়ে তুলেছিলেন লরেটো হাউস কলেজ।

মূল্যায়ন – 1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার ভারতে মিশনারি কার্যকলাপে উৎসাহ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ করে। সরকারি উদাসীনতার ফলে শিক্ষাবিস্তারের কাজে খ্রিস্টান মিশনারিদের উৎসাহ কমে যায়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে ভারতে শিক্ষাপ্রসারের কাজে মিশনারিদের ভূমিকা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এরপর মিশনারিরা অনুন্নত সম্প্রদায়, আদিম জাতি ও পার্বত্য উপজাতিদের মধ্যে শিক্ষাপ্রসারের কাজে প্রয়াসী হয়।

13. ভারতে ইংরেজ প্রশাসনে সিভিল সার্ভিসের গুরুত্ব আলোচনা করো।

পটভূমি – ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য ভারতবর্ষে এসেছিল এবং কোম্পানির ব্যবসাসংক্রান্ত কাজ দেখার জন্য কিছু ব্রিটিশ যুবককে ‘রাইটার’ বা করণিক হিসেবে নিযুক্ত করেছিল। দেওয়ানি লাভের পর ভারতবর্ষের বেশ কয়েকটি অঞ্চলের ওপর কোম্পানি অধিকতর রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপন করেছিল। এইসব অঞ্চলে বাণিজ্য ব্যতীত প্রশাসনিক কাজেও কোম্পানি রাইটারদের ব্যবহার করত। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তাদের অযোগ্যতা ও দুর্নীতি ধরা পড়ে। দ্বিতীয়বার গভর্নর হয়ে আসার পর লর্ড ক্লাইভ প্রশাসনিক কর্মচারীদের দিয়ে একটি চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করান, এতে কর্মচারীদের সততা সম্পর্কে শপথ গ্রহণ করতে হত।

নিয়োগের চুক্তিপত্র ও দুর্নীতি দমন – লর্ড কর্নওয়ালিসের আমলে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে এই চুক্তিপত্র বাধ্যতামূলক করা হয়। তাঁকেই সিভিল সার্ভিসের প্রকৃত প্রবর্তক বলা হয়। তিনি কর্মচারীদের দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

  1. তিনি বাণিজ্য ও রাজস্ব দপ্তরকে পৃথক করেন।
  2. রাজস্ব বিভাগের কর্মচারীদের শাসনকার্য পরিচালনায় উৎসাহ দেন।
  3. কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা ও উৎকোচ গ্রহণ নিষিদ্ধ করেন।
  4. ‘কর্নওয়ালিস কোড’ নামে আইনবিধি চালু করে সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি দমনের জন্য বিধি প্রণয়ন করেন।

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপন – নিযুক্ত কর্মচারীদের ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের জন্য ওয়েলেসলি কলকাতায় 1800 খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপন করেন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন দেশীয় পণ্ডিতরা শিক্ষানবিশ কর্মচারীদের দেশীয় ভাষা, রীতিনীতি ও প্রচলিত দেশীয় আইন সম্পর্কে অবহিত করতেন। পরবর্তীকালে 1805 খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে হেইলবেরি কলেজ স্থাপিত হওয়ায় নতুন কর্মচারীরা সেখান থেকে শিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে সরাসরি নিয়োগপত্র হাতে ভারতবর্ষে আসতেন।

ভারতীয়দের নিয়োগে বাধা – লর্ড কর্নওয়ালিস মনে করতেন ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষই দুর্নীতিপরায়ণ (Every native of Hindustan is corrupt)। এইসব কারণে 1793 খ্রিস্টাব্দের সনদে বলা হয়, যেসব সরকারি পদগুলির বেতন বছরে পাঁচশো পাউন্ড বা তার বেশি, সেইসব পদগুলিতে কেবলমাত্র শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিরাই নিযুক্ত হতে পারবে।

বেন্টিঙ্কের নতুন নিয়োগ-নীতি – বেন্টিঙ্কের আগে পর্যন্ত বিভিন্ন গভর্নর জেনারেল ভারতবিদ্বেষ নীতি অনুকরণ করেছেন। বেন্টিঙ্ক বিচারবিভাগের উচ্চপদে ভারতীয়দের নিয়োগ আইনসিদ্ধ করেন। 1833 খ্রিস্টাব্দের সনদে কোম্পানির কোনো পদে জাতি-ধর্ম-বর্ণের নিরিখে নিয়োগ-নীতি বাতিল করে যোগ্যতাকেই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনার জন্য বলা হয়। বেন্টিঙ্কের এই মতবাদের পিছনে রয়েছে হিতবাদী মতবাদ ও কোম্পানির ব্যয় সংকোচ।

সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা – কর্মচারীদের কার্যকলাপের গুণগত মান সম্পর্কে ইংল্যান্ডে প্রশ্ন ওঠায় মনোনয়নের বদলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। 1853 খ্রিস্টাব্দের চার্টার আইনে বলা হয় যে, ইংল্যান্ডে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে কর্মচারী নিয়োগ করা হবে। 1858 খ্রিস্টাব্দের সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভারতের শাসনভার স্বহস্তে গ্রহণ করার ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দায়িত্ব সিভিল সার্ভিস কমিশনারের হাতে দেওয়া হবে। আরও বলা হয় যে, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিতে ইচ্ছুক ব্যক্তি 18 থেকে 23 বছরের মধ্যে বয়স হলে এই পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে পারবে।

মন্তব্য – ভারতীয় সিভিল সার্ভিসকে ব্রিটিশ শাসনের ‘ইস্পাত কাঠামো’ বলা হত। পার্সিভাল স্পিয়ারের মতে, ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের বেতন ও সুযোগসুবিধা পৃথিবীর অন্যান্য দেশ অপেক্ষা উন্নত ছিল। তবে এর দ্বারা ব্রিটিশ স্বার্থরক্ষা হয়েছিল, ভারতীয়দের কোনো উপকার হয়নি।

14. উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণে এশিয়াটিক সোসাইটির ভূমিকা কী ছিল?

1784 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠা ভারতীয় তথা বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

এশিয়াটিক সোসাইটির অবদান –

প্রতিষ্ঠাতা – ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’-র মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তৎকালীন কলকাতা সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার উইলিয়াম জোনস। এ ছাড়া এই কাজে যুক্ত ছিলেন বিচারপতি হাইড ইস্ট, হেনরি ভ্যানসিটার্ট, স্যার জন শোর, চার্লস উইলকিনস, জোনাথান ডানকান প্রমুখ।

উদ্দেশ্য – ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল—এশিয়ার প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট ইতিহাস সম্বন্ধে অনুসন্ধান করা। এ ছাড়া এশিয়ার প্রাচীন সংস্কৃতি, শিল্পকলা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য সম্পর্কে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা ইত্যাদি।

কার্যাবলি – এই সভার সদস্যগণ প্রথমেই ভারতীয় ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাস বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। ‘ভগবদ্গীতা’, ‘মনুসংহিতা’ ও ‘শকুন্তলা’ কাব্যটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়। 1837 খ্রিস্টাব্দে জেমস প্রিন্সেপ সর্বপ্রথম ব্রাহ্মীলিপি পাঠোদ্ধার করেন। কোলব্রুক ‘অমরকোষ’-এর ইংরেজি অনুবাদ করেন। এরপর হোরেস হেইম্যানের উদ্যোগে সংস্কৃত-ইংরেজি অভিধান রচিত হয়। এই সময় 18টি ‘পুরাণ’ ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়। জন শোর ‘যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ’ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।

মন্তব্য – এইভাবে ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’-র উদ্যোগে ভারতের প্রাচীন জ্ঞানগরিমা পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়। ফলে ভারতীয়রা ভারতের প্রাচীন ইতিহাস, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয় এবং তাদের মধ্যে জাতীয় চেতনা জাগ্রত হয়।

15. ধরো তুমি ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থী। তুমি দেশীয় ও পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কোনটিকে গ্রহণ করবে এবং কেন?

পাশ্চাত্য শিক্ষার সমর্থনে যুক্তি – আমি 1800 খ্রিস্টাব্দের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ছাত্র। একসময়ে আমি দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন করেছি। কিন্তু ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে প্রচলিত পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থায় আমি জ্ঞানের বিকাশ লক্ষ করছি। পাশ্চাত্য শিক্ষায় বিজ্ঞান চেতনা ও যুক্তিবাদ প্রতিষ্ঠা অন্যতম লক্ষ্য। বিজ্ঞানের আলোতে ইতিহাস, দর্শন শাস্ত্রকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এই শিক্ষায়। জনগণের মধ্যে আধুনিক ভাবধারা বিস্তারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল মানুষের সব বিষয়ে জানার আগ্রহ ও যুক্তিতর্ক দিয়ে বিচার করে তা গ্রহণ করার প্রবণতা। ধর্ম, সাহিত্য, শিল্পকলা প্রভৃতি ক্ষেত্রে যুক্তিবাদ প্রয়োগের ফলে দেখা যায় অনেক প্রচলিত তত্ত্বই ভিত্তিহীন। বিজ্ঞানচর্চার ফলে প্রচলিত অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের প্রভাব ক্রমশ কমে আসতে থাকে। তা ছাড়া পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে যুক্তিবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে ভারতীয়দের মধ্যে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবোধ ও মানবতাবাদের ধারণার উদ্ভব ঘটবে। চাকরি পাওয়ার জন্য ইংরেজি জানার প্রয়োজন ছিল।

দেশীয় শিক্ষা কেন সমর্থনযোগ্য নয় – পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা এবং দেশীয় শিক্ষা ভারতবর্ষে সমান্তরালভাবে চলেছিল। দেশীয় শিক্ষা বলতে ছিল মক্তব ও পাঠশালা এবং মাদ্রাসা ও টোলের মাধ্যমে হিন্দু ও মুসলমান শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষা দেওয়া। পঠন-পাঠন পদ্ধতি ছিল পুরোনো। বিত্তশালীরা তাঁদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা স্বগৃহে করাতেন। মক্তবগুলিতে ফারসি ভাষা ও ব্যাকরণ ছাড়াও গণিত শিক্ষা দেওয়া হত। কোনো মুদ্রিত গ্রন্থ ছিল না। পাণ্ডুলিপি ব্যবহৃত হত। টোলে পড়ানো হত ধর্ম, দর্শন, আইন ও তর্কশাস্ত্র। মেয়েদের শিক্ষা অবহেলিত ছিল। শিক্ষার মান ছিল নিচু। এমনকি বেদ, বেদান্ত, গীতা, পুরাণ, ইতিহাস প্রভৃতির জ্ঞান পণ্ডিতদের কাছে অজ্ঞাত ছিল।

16. তুমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র হিসেবে ইতিহাসের তৃতীয় অধ্যায়ের টুকরো কথাগুলির মূল্যায়ন কীভাবে করবে?

আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ইতিহাস বিষয়টি পড়তে আমার ভালো লাগে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যক্রমের মধ্যে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। গতানুগতিক মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে আমাদের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ এবং উপলব্ধির বিষয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। মূল বিষয়ের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ছোটো ছোটো ‘টুকরো কথা’ যুক্ত করা হয়েছে। এগুলি মূল বিষয়ের বর্ণনার মধ্যে প্রয়োগ করলে হয়তো আমাদের কাছে জানা এবং বোঝা অসম্পূর্ণ রয়ে যেত। ‘টুকরো কথার’ মধ্যে তা প্রয়োগ করার ফলে ওই বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং আমরা গুরুত্ব দিয়ে তা বোঝার চেষ্টা করেছি। আলোচ্য অধ্যায়ে 10টি ‘টুকরো কথা’ বিশ্লেষণ করলেই গুরুত্ব বোঝা যাবে।

  • রেগুলেটিং অ্যাক্ট ও পিট প্রণীত ভারত শাসন আইন অনুযায়ী গভর্নর জেনারেল নামে নতুন পদ তৈরি করে ভারতে ব্রিটিশ শাসন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।
  • রেগুলেটিং আইন অনুসারে সুপ্রিমকোর্টের প্রতিষ্ঠা করা হয়। একজন প্রধান বিচারপতি ও তিনজন বিচারপতি নিয়ে গঠিত হয় সুপ্রিমকোর্ট।
  • গভর্নর জেনারেল বেন্টিঙ্ক প্রশাসনের ব্যয় কমানোর জন্য ভূমি-রাজস্ব নির্ধারণের বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেন। যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মচারী নিয়োগের কথাও বলেন।
  • কোম্পানি জাঠ, পাঠান, রাজপুত, নেপালি ও গোর্খাদের সামরিক জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ব্যবস্থা করেন।
  • ঔপনিবেশিক প্রশাসন আইন মেনে কাজ করবে এবং জাতি-বর্ণ-ধর্ম-শ্রেণি হিসেবে সবার ক্ষেত্রে একই আইন চালু থাকবে।
  • পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে হ্যালেডের লেখা প্রথম মুদ্রিত বাংলা বই
  • উইলিয়াম কেরি,
  • মেকলে এবং
  • উডের প্রতিবেদন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।
  • ওয়ারেন হেস্টিংস ইজারাদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে কোম্পানির ভূমি বন্দোবস্ত আরও সুদৃঢ় করেন।

আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের তৃতীয় অধ্যায়, “ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

About The Author

Rahul

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

নিষেক বলতে কী বোঝায়? নিষেকের প্রকারভেদ

নিষেক ও দ্বিনিষেক কী? নিষেক ও দ্বিনিষেক -এর মধ্যে পার্থক্য

সম্পূর্ণ ফুল এবং অসম্পূর্ণ ফুল কাকে বলে? সম্পূর্ণ ফুল এবং অসম্পূর্ণ ফুলের মধ্যে পার্থক্য

সমাঙ্গ ফুল ও অসমাঙ্গ ফুল কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর