আজকের আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়, ‘ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র’-এর ‘বিষয়সংক্ষেপ’ নিয়ে আলোচনা করব। এই অংশটি পড়ার ফলে অধ্যায়টির মূল কাঠামো ও প্রধান বিষয়াবলি বুঝতে সুবিধা হবে, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি, এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা তোমাদের প্রস্তুতিকে আরও মজবুত করতে সাহায্য করবে।

1790 খ্রিস্টাব্দে বড়লাট লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলা, বিহার ও ওড়িশার জমিদারদের সঙ্গে দশশালা বন্দোবস্ত করেন। তিনি আশা করেছিলেন যে, জমিদাররা নিয়মিত রাজস্ব দেবে এবং জমির উন্নতি ঘটাবে। কোম্পানির ডিরেক্টর সভার অনুমোদন পেলে এই দশশালা বন্দোবস্ত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত হবে—এই মর্মে লর্ড কর্নওয়ালিস ঘোষণা করেন যে —
- জমিদারদের সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত,
- রায়ত বা কৃষকদের সঙ্গে রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত এবং
- গ্রাম সমাজের সঙ্গে মহলওয়ারি বন্দোবস্ত।
1793 খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস দশশালা বন্দোবস্তকে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ রূপে ঘোষণা করেন। কিন্তু এই ব্যবস্থা বিশেষ সুবিধাজনক না হওয়ায়, কোম্পানি ও কৃষকের স্বার্থ রক্ষিত না হওয়ায় এবং রাজস্ব আদায় ব্যাহত হওয়ায় কোম্পানি রাজস্ব আদায়ে নতুন পথের সন্ধান করতে থাকে। এই পটভূমিকায় টমাস মনরো ও আলেকজান্ডার রিড মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে রায়তওয়ারি ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা বলেন।
1790 খ্রিস্টাব্দে জন শোর জমিদারদের সঙ্গে বন্দোবস্তের পক্ষে মত দেন। কিন্তু জেমস গ্রান্ট ভিন্ন মত পোষণ করেন এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিরোধিতা করেন। ফিলিপ ফ্রান্সিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিরোধিতা করে বলেন যে, জমির মালিকানা জমিদারদের না দিয়ে রায়ত বা কৃষকদের দেওয়া উচিত। শেষ পর্যন্ত 1793 খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুফল ও কুফল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে নতুন জমিদার শ্রেণি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয়। গ্রামের পুরোনো সমাজ কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং কৃষকের ওপর করের বোঝা ও মহাজনদের শোষণ বৃদ্ধি পায়।
ঔপনিবেশিক শাসনে ভারতীয় অর্থনীতির আর-একটি বিশেষ দিক ছিল কৃষি ও কৃষকের বাণিজ্যিকীকরণ। কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের নেতিবাচক ফল হিসেবে দেখা দিল গ্রামীণ ঋণগ্রস্ততা। কৃষকরা খাজনা মেটানোর জন্য মহাজনের কাছে ঋণ নিতে বাধ্য হতো এবং ঋণের দায়ে জমিজমা মহাজনের হাতে চলে যেত। এই প্রক্রিয়াকে ‘গ্রামীণ ঋণগ্রস্ততা’ বলা হতো।
অন্যদিকে, ঔপনিবেশিক অর্থনীতির স্বার্থে ব্রিটিশরা কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ওপর জোর দেয়। কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইংল্যান্ডের শিল্পের প্রয়োজনে সস্তায় কাঁচামাল সংগ্রহ করা এবং ইংল্যান্ডের কারখানায় তৈরি পণ্য ভারতের বাজারে বিক্রি করা। এর ফলে ভারত কাঁচামাল রপ্তানিকারক ও শিল্পজাত পণ্য আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়।
পাশাপাশি ভারতে নীল ও চা-বাগিচা শিল্পে ব্রিটিশ পুঁজি বিনিয়োগ বাড়ে। নীলকর সাহেবরা চাষিদের দাদন বা অগ্রিম অর্থ দিয়ে নীলচাষে বাধ্য করত। এই ব্যবস্থাকে ‘দাদন প্রথা’ বলা হতো।
ব্রিটিশ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে ভারতের হস্তশিল্প ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ঐতিহাসিকরা এই ঘটনাকে ‘অবশিল্পায়ন’ বলে অভিহিত করেছেন। অবশিল্পায়নের ফলে ভারতের অর্থনীতি পুরোপুরি কৃষি-নির্ভর হয়ে পড়ে। কারিগর ও শিল্পীরা কাজ হারিয়ে কৃষিকাজে ভিড় জমায়, ফলে জমির ওপর চাপ বাড়ে। একে বলা হয় ‘কৃষির গ্রাম্যকরণ’।
সামগ্রিকভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ভারতীয় অর্থনীতির তিনটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়—সম্পদ নির্গমন, অবশিল্পায়ন ও কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ।
আজকের আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়, “ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র”-এর “বিষয়সংক্ষেপ” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই আলোচনাটি অধ্যায়টির মূল কাঠামো ও প্রধান বিষয়গুলো সহজে বুঝতে সাহায্য করবে, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কিছুটা হলেও সহায়ক হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, মতামত জানাতে চাও বা আরও সহায়তার প্রয়োজন হয়, তাহলে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারো কিংবা আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারো—তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত।





মন্তব্য করুন