আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের চতুর্থ অধ্যায়, “ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র”-এর কিছু “বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

1. ওয়ারেন হেস্টিংসের ভূমিরাজস্ব নীতি সম্পর্কে কী জান?
1772 খ্রিস্টাব্দে বাংলার গভর্নর হয়ে আসেন ওয়ারেন হেস্টিংস। প্রথমেই তিনি দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা তুলে দেন এবং সুবা বাংলায় একটি সুষ্ঠু রাজস্ব নীতি নির্ধারণ করেন।
বোর্ড অব রেভিনিউ গঠন – ওয়ারেন হেস্টিংসের নেতৃত্বে বোর্ড অব রেভিনিউ গঠিত হয়। এই বোর্ডের অধীনে ছিল একটি ‘ভ্রাম্যমাণ কমিটি’। রাজস্ব আদায়ের জন্য তিনি নিয়োগ করেন কালেক্টর নামে কর্মচারী।
পাঁচশালা বন্দোবস্ত – 1772 খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস জমি পাঁচ বছরের জন্য নিলামে জমিদারদের বণ্টন করেন। কিন্তু এই ব্যবস্থায় নানা ত্রুটি দেখা দেয়, যেমন—
- জমিদারগণ অতিরিক্ত খাজনা আদায় করে প্রজাপীড়ন করতেন,
- ঠিক সময়ে খাজনা সরকারি কোষাগারে জমা পড়ত না,
- তা ছাড়া জমির প্রতি জমিদারগণ যত্নবান ছিলেন না ইত্যাদি।
একশালা বন্দোবস্ত – 1777 খ্রিস্টাব্দে পাঁচশালা বন্দোবস্তের অসুবিধাগুলি বিবেচনা করে এবং ‘আমিনি কমিশনের’ রিপোর্টের ভিত্তিতে ওয়ারেন হেস্টিংস বাৎসরিক জমি ইজারা দানের ব্যবস্থা করেন এবং কালেক্টরদের পরিবর্তে ভারতীয় দেওয়ান নিয়োগ করে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করেন।
2. ইজারাদারি ও পাঁচশালা বন্দোবস্ত বলতে কী বোঝায়? এই দুই ব্যবস্থার ত্রুটিগুলি উল্লেখ করো।
1772 খ্রিস্টাব্দে বাংলার গভর্নর জেনারেল হয়ে আসেন ওয়ারেন হেস্টিংস। তিনি প্রথমেই দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে বাংলায় একটি সুনির্দিষ্ট ভূমিরাজস্ব নীতি নির্ধারণের জন্য এক ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন।
ইজারাদারি ও পাঁচশালা বন্দোবস্ত – লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলায় ভূমিরাজস্ব আদায়ের জন্য ইজারাদারি বন্দোবস্ত চালু করেন। 1772 খ্রিস্টাব্দে এক ভ্রাম্যমাণ কমিটির সুপারিশ ক্রমে নিলামের মাধ্যমে জমিদার বা ইজারাদারদের কাছে বাংলার জমি বন্দোবস্ত করা হয়। যে ইজারাদার কোম্পানিকে সর্বোচ্চ পরিমাণ রাজস্ব দিতে রাজি হত, তাকে পাঁচ বছরের জন্য জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হত। হেস্টিংস প্রবর্তিত এই ভূমি বন্দোবস্তকেই বলা হয় ইজারাদারি বন্দোবস্ত বা পাঁচশালা বন্দোবস্ত।
পাঁচশালা বন্দোবস্তের ত্রুটি – ইজারাদারি বা পাঁচশালা বন্দোবস্ত নানা কারণে ত্রুটিপূর্ণ ছিল, যেমন —
- এই ব্যবস্থায় ইজারাদারগণ প্রজাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করত। ফলে বাংলার প্রজাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে।
- এই ব্যবস্থায় প্রতি বছর জমিদার বদল হওয়ায় জমির কোনো উন্নতি হয়নি।
- ইজারাদারগণ ঠিক সময় সঠিক রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা দিতেন না।
- জমির উন্নতির দিকেও তাদের কোনো দৃষ্টি ছিল না। ফলস্বরূপ কৃষিক্ষেত্রে সার্বিক কোনো উন্নয়ন ঘটেনি।
3. চিরস্থায়ী ভূমি বন্দোবস্তের বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করো।
1793 খ্রিস্টাব্দে ভারতের তৎকালীন বড়োলাট লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় চিরস্থায়ী ভূমি বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন। এই বন্দোবস্তের বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল—
- খাজনা দেওয়ার সময়সীমা – বাংলার জমি নির্দিষ্ট খাজনার বিনিময়ে চিরদিনের জন্য জমিদারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বলা হয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমিদাররা তাদের প্রদেয় খাজনা সরকারি কোষাগারে জমা দেবেন।
- সূর্যাস্ত আইন – চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অনুযায়ী জমিদারগণ তাদের প্রদেয় খাজনা বাংলা বছরের শেষদিনে সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে সরকারের কোষাগারে জমা দিতে বাধ্য থাকবে। তা না হলে সরকার তাদের জমিদারি বাজেয়াপ্ত করবে।
- খাজনা নির্ধারণ – চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমির খাজনা 1765 খ্রিস্টাব্দের আগে যা ছিল, তার দ্বিগুণ বর্ধিত করা হয়। বলা হয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় যেমন—খরা, বন্যার সময়েও খাজনা মুকুব করা হবে না।
4. রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের শর্তাবলি বা বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
1820 খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির গভর্নর টমাস মনরো ও আলেকজান্ডার রীড মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির কয়েকটি এলাকায় ও দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় যে নতুন ভূমিরাজস্ব বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন, তাকেই বলা হয় রায়ত-ওয়ারি বন্দোবস্ত।
রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের বৈশিষ্ট্য/শর্তাবলি –
- দক্ষিণ ভারতে জমিদারতন্ত্রের তেমন প্রাদুর্ভাব না থাকায় ইংরেজ কোম্পানি ওই সমস্ত এলাকার জমি কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে, এই ব্যবস্থা রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত নামে খ্যাত।
- এই ব্যবস্থায় ভূমি রাজস্বের পরিমাণ ছিল উৎপন্ন ফসলের 45 শতাংশ।
- এই ব্যবস্থা অনুযায়ী ঠিক হয় প্রতি 20-30 বছর অন্তর ভূমিরাজস্বের পরিমাণ মূল্যায়ন বা বৃদ্ধি করা হবে।
- এই ব্যবস্থায় জমি জরিপের ব্যবস্থা করা হয় এবং জমির উর্বরতা শক্তির মাপকাঠিতে জমিকে 9টি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়।
- প্রকৃতপক্ষে জমিতে চাষিরা চাষ করার অধিকার পেলেও, জমির মালিকানা লাভ করেনি।
- রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত অনুযায়ী ভূমিরাজস্ব নগদ টাকায় দিতে হত।
- প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ও ভূমিরাজস্বে ছাড় ছিল না ইত্যাদি।
5. মহলওয়ারি বন্দোবস্তের শর্তাবলি বা বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করো।
ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রবর্তিত বিভিন্ন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার মধ্যে অন্যতম ছিল মহলওয়ারি বন্দোবস্ত।
মহলওয়ারি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য –
মহলওয়ারি বন্দোবস্তের বৈশিষ্ট্যগুলি নীচে উল্লেখ করা হল—
- গাঙ্গেয় উপত্যকায় কয়েকটি গ্রাম নিয়ে এক একটি মহল গড়ে তোলা হয়।
- প্রতিটি গ্রাম বা মহলের ওপর নির্দিষ্ট হারে রাজস্ব নির্ধারিত হত।
- এই রাজস্ব মহলবাসীরা মিলিতভাবে সরকারকে প্রদান করত।
- জমির উর্বরতা শক্তির বিচারে জমিকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে ভূমিরাজস্ব নির্ধারণ করা হত। সাধারণত এই রাজস্বের হার ছিল উৎপন্ন ফসলের 2/3 অংশ।
- সরকার মহলগুলির সঙ্গে আলোচনা করে এলাকার জমি 30 বছরের জন্য বণ্টন করে।
- এই ব্যবস্থায় কোনো জমিদার বা মধ্যস্বত্বভোগী অস্তিত্ব ছিল না। মহলের চাষিদের সঙ্গে আলোচনা করে পর্যালোচনা করা হত।
6. মহলওয়ারি বন্দোবস্তের ফল কী হয়েছিল? অথবা, এই ব্যবস্থার ত্রুটিগুলি কী ছিল?
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভূমিরাজস্ব থেকে আয় সুনিশ্চিত করতে যে নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল মহলওয়ারি ব্যবস্থা।
মহলওয়ারি ব্যবস্থার ফল/ত্রুটি –
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রবর্তিত ভূমিরাজস্ব বন্দোবস্ত কৃষকদের কোনো আশার আলো দেখায়নি। এই বন্দোবস্ত ছিল ত্রুটিপূর্ণ। কারণ—
- এই ব্যবস্থায় কৃষকদের জমি চাষ বা ভোগের অধিকার থাকলেও, জমির ওপর তাদের মালিকানা-স্বত্ব ছিল না।
- গ্রামের প্রধানরা কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করত। ফলে কৃষকদের ওপর দারুণ অর্থনৈতিক চাপ পড়ত।
- এই ব্যবস্থায় ভূমিরাজস্বের হারও ছিল বেশি। তাই চড়া হারে রাজস্ব প্রদান করতে গিয়ে তারা সর্বস্বান্ত হত।
- কৃষকের জমি একপ্রকার বিক্রয়জাত পণ্যে পরিণত হয়েছিল।
- মহলওয়ারি বন্দোবস্তের ফলে গাঙ্গেয় উপত্যকায় বহু জমিদার তাঁদের জমিদারি হারিয়ে বসেন।
- সরকারের খাজনা মেটাতে কৃষকরা মহাজনদের কাছ থেকে ঋণগ্রহণ করত। এর ফলে তারা মহাজনদের কাছে ঋণের দায়ে ডুবে থাকত।
- এর সঙ্গে ছিল মহলদারদের শোষণ ও অত্যাচার।
মন্তব্য – এইভাবে গাঙ্গেয় উপত্যকায় কৃষকদের জীবনে নেমে এসেছিল চরম হতাশা ও দৈন্যদশা। 1833 খ্রিস্টাব্দে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক মহলওয়ারি বন্দোবস্তের কিছু সংস্কার বা উন্নতি করলেও, অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।
7. কোম্পানির আমলে ভারতের গ্রামীণ শিল্পের অবস্থা কেমন হয়?
- গ্রামীণ শিল্প – ভারতে রেলপথের প্রসার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ শিল্পের হাল খারাপ হতে থাকে। একসময় বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলির মধ্যে গ্রামীণ হস্তশিল্পের বিশেষ চাহিদা ছিল। তবে কোম্পানির প্রচেষ্টায় রেলপথ প্রসারের ফলে গ্রামগুলির মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হওয়ায় স্থানীয় গ্রামীণ বাজারেও ব্রিটিশ দ্রব্যের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং প্রতিযোগিতার বাজারে গ্রামীণ পণ্যগুলি পিছু হটতে থাকে। এই ভাবেই ভারতীয় হস্তশিল্পের অবনমন ঘটে।
- নানা শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিকাশ – উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে ভারতে বেশ কিছু যন্ত্রনির্ভর শিল্পের বিকাশ ঘটে। যেমন— 1850-এর দশকে ভারতে সুতির কাপড়, পাট ও কয়লা শিল্পের বিকাশ সাধিত হয়। 1853 খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইয়ে প্রথম সুতির কাপড় তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। 1855 খ্রিস্টাব্দে রিষড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় চটকল। বিশ শতকের প্রথম ভাগের মধ্যেই চামড়া, চিনি, লৌহ-ইস্পাত ও নানা খনিজ শিল্প গড়ে ওঠে।
- মাল পরিবহনের ক্ষেত্রে সরকারি বৈষম্য – সরকারের মাল পরিবহন ও রেলব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ছিল নানা বৈষম্য। কেন-না দেশীয় পণ্য সরবরাহের জন্য বেশ চড়া হারে রেলভাড়া নেওয়া হত। ফলে ঔপনিবেশিক আমলে দেশীয় শিল্পের অগ্রগতি মূলত সুতি ও পাটশিল্পের মধ্যেই আটকে ছিল। এজন্য সঠিক শিল্পায়নের উন্নতি ঔপনিবেশিক শাসনাধীন ভারতবর্ষে দেখা যায়নি।
8. ‘অর্থনীতির আধুনিকীকরণ’ বলতে কী বোঝো? এর ফল কী হয়েছিল?
ঔপনিবেশিক ভারতের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘বাণিজ্য’। আর এই বাণিজ্যের মাধ্যম ছিল কৃষিজাত পণ্য। তাই একে বলা হত কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ। এর মাধ্যমে বাণিজ্যের কাজে কৃষিজ ফসল উৎপাদনের ওপর বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়। আসলে ঔপনিবেশিক সরকার নিজেদের স্বার্থেই চা, নীল, পাট, তুলো প্রভৃতি ফসল চাষ করার জন্য কৃষকদের ওপর চাপ দিয়েছিল। সামগ্রিকভাবে রেলপথ নির্মাণ, রপ্তানির হার বাড়ানো ও কৃষিতে বাণিজ্যিকীকরণের প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘অর্থনীতির আধুনিকীকরণ’।
কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফলে ভারতীয় সমাজে পারস্পরিক ভেদাভেদ তৈরি হয়েছিল। এই বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে মূলধন জোগাড় করা ও বাজারের চাহিদামতো কৃষিজ ফসল উৎপাদনের বিষয়গুলি জড়িত ছিল। কিন্তু কৃষকরা এ ব্যাপারে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। ফলে কৃষি-উৎপাদনে লাভের পরিমাণও তেমন ছিল না। মূলধন বিনিয়োগকারীরাই বেশি লাভ করত।
9. অবশিল্পায়নের ফল কী হয়েছিল?
আঠারো শতকে বাংলা তথা ভারতের কুটির শিল্পের অবনতিকেই বলা হয় অবশিল্পায়ন। ভারতের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী।
অবশিল্পায়নের ফল –
- কুটিরশিল্পের পতন – আঠারো শতকে নানা কারণে ভারতের চিরাচরিত কুটির শিল্পগুলির পতন হয়। তার মারাত্মক প্রভাব পড়ে ভারতীয় জনজীবনে, যেমন—
- বেকারত্ব বৃদ্ধি – অবশিল্পায়নের ফলে শিল্পগুলি বন্ধ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মী ও শিল্পীরা বেকার হয়ে পড়ে। ফলে অভাব ও দারিদ্র্য ভারতীয় শিল্পী সমাজকে গ্রাস করে।
- কৃষি উৎপাদন হ্রাস – কর্মচ্যুত শ্রমিক, শিল্পী ও কর্মীরা কাজের আশায় দলে দলে কৃষিজমিতে ভিড় করে। ফলে উদ্ভব হয় ভূমিহীন কৃষকশ্রেণির। যার ফলে কৃষিজমিতে উৎপাদন হ্রাস পায়।
- শহরের জৌলুস নষ্ট – শিল্পে মন্দাভাব দেখা দেওয়ায় ভারতের শিল্পসমৃদ্ধ নগরগুলি (যেমন—মুর্শিদাবাদ, ঢাকা, সুরাট) তাদের পূর্বের জৌলুস হারায়।
- আমদানি বৃদ্ধি – কুটিরশিল্পের অধঃগতির ফলে ভারতের বাজার বিলেতি পণ্যে ছেয়ে যায়।
মন্তব্য – এককথায় বলা যায় যে, অবশিল্পায়নের হাত ধরে ভারত একটি কৃষি উৎপাদক উপনিবেশে পরিণত হয় এবং ব্রিটেন দ্রুত একটি ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উন্নীত হয়।
10. দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামার (1875 খ্রিস্টাব্দ) সূচনা হয় কীভাবে?
‘নীল বিদ্রোহের’ ঠিক 15 বছর পর দক্ষিণ ভারতের পুনা ও আহমেদনগরে অনুরূপ একটি কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়, যা ‘দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা’ নামে পরিচিত।
দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা/বিদ্রোহ –
বিদ্রোহের কারণ –
- মহারাষ্ট্রে কুনবী সম্প্রদায়ের কৃষকরা সাধারণত তুলা চাষ করত। তাদের দারিদ্র্য ও অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে গুজরাটি মহাজনরা তাদের জমিজমা দখল করত।
- চাষিদের ওপর ইংরেজ সরকার মাত্রাতিরিক্ত খাজনার বোঝা চাপিয়ে দেয়।
- 1866-67 খ্রিস্টাব্দ এবং 1867-1868 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ মহারাষ্ট্রে অনাবৃষ্টি হওয়ার ফলে অজন্মা হয়। তা সত্ত্বেও সরকার চাষিদের রাজস্ব মকুব করেনি। আবার 1871 খ্রিস্টাব্দের দুর্যোগের দিনেও সরকার সেখানে প্রায় 1.5 গুণ খাজনা বৃদ্ধি করে।
- এদিকে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ শেষ হলে ইউরোপে ভারতের তুলোর চাহিদা কমে যায়। ফলে ভারতের তুলোর দামও কমে যায়।
বিদ্রোহের সূচনা – এরূপ পরিস্থিতিতে 1874 খ্রিস্টাব্দে পুনার কার্দে গ্রামে এক সাহুকার মহাজন বাবাসাহেব দেশমুখ নামে এক চাষির জমি নিলামে বিক্রি করে দেয়। এই ঘটনায় কৃষকরা দারুণ ক্ষুব্ধ হয়। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে ওই মহাজনের বাড়ি আক্রমণ করে লুটপাট চালায়। এই ঘটনার সূত্র ধরে মহারাষ্ট্রের 33টি জেলার কৃষকরা বিদ্রোহে শামিল হয়।
11. ‘দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা’র (1875 খ্রিস্টাব্দ) প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করো।
1875 খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রের পুনা ও আহমেদনগর জেলায় যে কৃষক বিদ্রোহ হয় তা ‘দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা’ বা ‘দাক্ষিণাত্য বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত।
দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামার প্রকৃতি –
- কৃষক বিদ্রোহ – 1875 খ্রিস্টাব্দের দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা ছিল মূলত একটি কৃষক বিদ্রোহ, যাতে মুখ্যত মহারাষ্ট্রের কুনবী সম্প্রদায়ের তুলো চাষিরাই অংশগ্রহণ করেছিল।
- কৃষক হাঙ্গামা – সরকারিভাবে এই কৃষক বিদ্রোহ একটি কৃষক হাঙ্গামা বলে চিহ্নিত হয়েছিল। কারণ এই বিদ্রোহ চলাকালে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ছাড়া বেশি কিছু ঘটেনি।
- বহ্নি-উৎসব – অত্যাচারিত কৃষকরা মহাজনদের বাড়িঘর, দোকান, গুদাম প্রভৃতি আক্রমণ করে লুটপাট চালাত। তারা মহাজনদের দলিল ও ঋণপত্রগুলি পুড়িয়ে দিয়ে বহ্নিউৎসবে মেতে উঠত।
- গণ-সমর্থন – শুধুমাত্র কুনবী সম্প্রদায়ের তুলো চাষিরাই নয়; এই বিদ্রোহে যোগদান করে ধনী কৃষক ও সমাজের অন্যান্য মানুষজন। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এই বিদ্রোহে প্রত্যক্ষ মদত দেয়।
চাষিরাই নয়, এই বিদ্রোহে যোগদান করে ধনী কৃষক ও সমাজের অন্যান্য মানুষজন। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এই বিদ্রোহে প্রত্যক্ষ মদত দেয়।
12. 1875 খ্রিস্টাব্দের দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামার ফলাফল/গুরুত্ব আলোচনা করো।
1875 খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও নিষ্ফল হয়নি।
দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামার গুরুত্ব/ফলাফল –
- দাঙ্গা কমিশন – দাক্ষিণাত্য বিদ্রোহ মূলত পরিচালিত হয়েছিল মহাজনি শোষণ ও প্যাটেল সম্প্রদায়ের কৃষক নিপীড়ন নীতির বিরুদ্ধে। এই বিদ্রোহ প্রত্যক্ষভাবে সরকারবিরোধী ছিল না, তবুও সরকার ভীত হয়। তাই বিদ্রোহের কারণ নিরূপণ ও তার প্রতিকারের জন্য 1876 খ্রিস্টাব্দে গঠিত হয় দাক্ষিণাত্য দাঙ্গা কমিশন।
- কৃষি আইন প্রবর্তন – দাঙ্গা কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে 1879 খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্য কৃষি ত্রাণ আইন প্রবর্তিত হয়। ঠিক হয় ঋণের দায়ে অভিযুক্ত কৃষকদের গ্রেপ্তার করা যাবে না। প্রয়োজন হলে মহাজনদের লেনদেনের কাগজপত্র আদালতে পরীক্ষা করা হবে ইত্যাদি।
- তাকাভির বাতিলকরণ – সরকার তাকাভি বা কৃষিঋণের ব্যাপারে নতুন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। কৃষক ও সাউকার বা মহাজনদের মধ্যে যে কৃষিঋণ চুক্তি হয়েছিল, তা রদ করা হয়।
- অন্যান্য বিষয় – কৃষকদের ক্ষোভ প্রশমনের জন্য সরকার মহাজনি ঋণের সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
মূল্যায়ন – এতকিছু সত্ত্বেও দাক্ষিণাত্যের কৃষকদের অবস্থার বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি। মহাজনি শোষণ অব্যাহত ছিল।
13. উনিশ শতকে ভারতে রেলপথ সম্প্রসারণ সম্পর্কে কী জান?
উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগ ছিল ভারতে রেলপথ সম্প্রসারণের যুগ। এই সময় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে রেলপথ সম্প্রসারিত হয়।
ভারতে রেলপথ সম্প্রসারণ –
- ডালহৌসির সময় – ভারতে রেলপথ স্থাপনের কাজ শুরু করেন বড়লাট লর্ড ডালহৌসি। 1853 খ্রিস্টাব্দে বোম্বে থেকে থানে পর্যন্ত মোট 21 মাইল রেলপথ স্থাপিত হয়। ডালহৌসির আমলে ভারতে মোট 280 মাইল রেলপথ সম্প্রসারিত হয়। 1854 খ্রিস্টাব্দে বাংলায় হাওড়া থেকে পাণ্ডুয়া পর্যন্ত রেলপথ স্থাপিত হয়।
- মহাবিদ্রোহের পর – মহাবিদ্রোহের পর সরকার ভারতে রেলপথের প্রয়োজন অনুভব করে। তাই এই পর্বে রেলের কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়। প্রথমে ভারতের বন্দর ও শহরগুলির মধ্যে রেল যোগাযোগ গড়ে তোলা হয়। 1870 খ্রিস্টাব্দে কলকাতা থেকে বোম্বাই পর্যন্ত রেলপথ স্থাপিত হয়। 1858-1905 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে মোট 36,880 কিমি রেলপথ স্থাপিত হয়। আর 1947 খ্রিস্টাব্দে ভারত যখন স্বাধীন হয়, তখন রেলপথের বিস্তার ছিল 65,217 কিমি।
14. রেলপথ স্থাপনে ভারতীয়রা ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয় কেন?
উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে ভারতে রেলপথের সূচনা হয়। এর ফলে যেমন ভারতীয়রা উপকৃত হয়, তেমনি বঞ্চিতও হয়। এই কারণে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি তাঁদের ক্ষোভ বৃদ্ধি পায়।
ক্ষোভের কারণ –
- ব্রিটেনের লাভ – ভারতে রেলপথ সম্প্রসারণে সবচেয়ে বেশি লাভ হয় ব্রিটেনের। রেলপথ স্থাপনের ফলে ব্রিটেনের শিল্প-বাণিজ্যের প্রভূত উন্নতি হয়।
- ভারতীয়দের প্রতি বঞ্চনা – রেলপথ নির্মাণের উন্নত প্রযুক্তি ভারতীয় কারিগরদের শেখানো হত না। সাধারণ শ্রমিকের কাজে ভারতীয়দের নিয়োগ করা হত।
- জীবিকায় আঘাত – রেলপথ স্থাপনের ফলে বহু মানুষ ঘর, বাড়ি, চাষের জমি, পুকুর ইত্যাদি হারায়। জঙ্গল কাটার ফলে বহু মানুষ তাদের জীবিকা হারিয়ে বসে।
- অন্যান্য ক্ষতি – রেলপথ স্থাপনের ফলে মানুষের জলনিকাশি ব্যবস্থার ক্ষতি হয় এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। গাছ কাটার ফলে পরিবেশ দূষিত হয়।
15. ‘টেলিগ্রাফ’ ব্যবস্থা ঔপনিবেশিক শাসনকে কি দৃঢ় করেছিল? তোমার উত্তরের সমর্থনে যুক্তি দাও।
ভূমিকা – উনিশ শতকে ভারতে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছিল। ব্রিটিশ শাসনে মূলত রাজনৈতিক ও সামরিক প্রয়োজনে এই ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়েছিল।
টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার বিকাশ – প্রথমে 1851 খ্রিস্টাব্দে মাত্র কয়েক মাইল এলাকায় টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা চালু হয়। 1856 খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে এই উপমহাদেশে অন্তত 46টি টেলিগ্রাফ কেন্দ্র চালু হয়। এসময় প্রায় 4,250 মাইলের বেশি এলাকা টেলিগ্রাফ যোগাযোগের আওতায় চলে আসে। ফলে কলকাতা থেকে আগ্রা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশ, বোম্বাই, মাদ্রাজ ও ওটাকামুন্ডে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটেছিল। 1865 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে 17,500 মাইল এবং উনিশ শতকের শেষদিকে 52,900 মাইল এলাকায় টেলিগ্রাফ যোগাযোগ ছড়িয়ে পড়ে।
টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের কারণ –
- টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের নেপথ্যে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিল।
- ব্রিটিশ প্রশাসনের জরুরি খবরগুলি টেলিগ্রাফ মারফতই পাওয়া যেত।
- টেলিগ্রাফ ব্যবস্থাই 1857 খ্রিস্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহ থেকে ব্রিটিশ প্রশাসনকে রক্ষা করেছিল।
- টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা অত্যন্ত দ্রুত ইউরোপীয় ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করতে থাকে।
- 1870 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে টেলিগ্রাফ যোগাযোগ বিস্তৃত হয়।
আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের চতুর্থ অধ্যায়, “ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র”-এর কিছু “বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।
আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন