এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘সংবহন’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

সংবহন কাকে বলে? সংবহনের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তাগুলি উল্লেখ করো।
সংবহন (Circulation) – যে সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ায় বহুকোশী উন্নত জীবদেহে প্রতিটি সজীব কোশে, সুনির্দিষ্ট পথে, তরল মাধ্যমে খাদ্যের সারাংশ, অক্সিজেন, হরমোন প্রভৃতি পৌঁছায় এবং কোশ থেকে CO₂, বিপাকীয় পদার্থ প্রভৃতি অপসারিত হয়ে নির্দিষ্ট অঙ্গে প্রেরিত হয়, তাকে সংবহন বলে।
সংবহনের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা –
- পরিপোষক পরিবহণ – শোষিত সরল খাদ্য বা পুষ্টিরস জীবদেহের প্রতিটি সজীব কোশে পৌঁছে দেওয়া।
- শ্বাসবায়ু পরিবহণ – প্রশ্বাসকালে গৃহীত অক্সিজেন (O₂) বিভিন্ন কোশে পৌঁছে দেওয়া এবং শ্বসনে উৎপন্ন কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস (CO₂) কোশ থেকে অপসারিত করে শ্বাসযন্ত্রে প্রেরণ করা।
- হরমোন সংবহন – প্রাণীদেহের অনাল বা অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিসমূহ থেকে উৎপন্ন হরমোন সংবহন প্রক্রিয়ায় বাহিত হয়ে দেহের টার্গেট কলা-কোশ বা অঙ্গে পৌঁছায়।
- বিপাকীয় বর্জ্য অপসারণ – দেহকোশে উৎপন্ন বিপাকজাত রেচন পদার্থ বা বর্জ্য পদার্থসমূহ কোশ থেকে অপসারিত হয়ে নির্দিষ্ট রেচন অঙ্গে পৌঁছায়।
- সুরক্ষা প্রদান – দেহে সংক্রামিত রোগজীবাণুর প্রতিরোধ বা ধ্বংসের জন্য প্রতিরোধী বস্তুসমূহ নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়া।
- তাপের পরিবহণ – উষ্ণশোণিত প্রাণীর ক্ষেত্রে শ্বসনে নির্গত তাপের সমবণ্টন করা এবং দেহের নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা।
মুক্ত সংবহনতন্ত্র কাকে বলে? চিত্রসহযোগে মুক্ত সংবহন পদ্ধতি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
মুক্ত সংবহনতন্ত্র (Open Circulatory System) – যে সংবহনতন্ত্রে রক্ত কেবলমাত্র রক্তবাহের মধ্যে আবদ্ধভাবে সংবাহিত না হয়ে হিমোসিল (দেহগহ্বর) অথবা সাইনাস অথবা ল্যাকুনায় উন্মুক্ত হয় এবং কলাকোশের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসে, তাকে মুক্ত সংবহনতন্ত্র বলে।
উদাহরণ – চিংড়ি, আরশোলা প্রভৃতি অমেরুদণ্ডী প্রাণীদেহে এই প্রকার সংবহনতন্ত্র দেখা যায়।
আরশোলার দেহের মুক্ত সংবহন পদ্ধতি –
- আরশোলার মুক্ত সংবহন হৃৎপিণ্ড, দেহগহ্বর ও মহাধমনির মাধ্যমে ঘটে।
- আরশোলার হৃৎপিণ্ড 13টি প্রকোষ্ঠযুক্ত হয়। প্রতিটি প্রকোষ্ঠ সামনের প্রকোষ্ঠে উন্মুক্ত হয় এবং প্রকোষ্ঠদ্বয়ের সংযোগস্থলে কপাটিকা থাকে। প্রতিটি প্রকোষ্ঠের পশ্চাদে দুপাশে একজোড়া করে অস্টিয়া (Ostia) নামক ছিদ্র থাকে।

- 12 জোড়া অ্যালারি পেশির পর্যায়ক্রমিক সংকোচন ও প্রসারণে পেরিকার্ডিয়াল সাইনাস থেকে অস্টিয়া ছিদ্রপথে রক্ত হৃৎপিণ্ডে প্রবেশ করে।
- এরপর হৃৎপিণ্ডের সংকোচনে রক্ত দেহের সামনের দিকে প্রবাহিত হয় এবং হৃৎপিণ্ডের প্রথম প্রকোষ্ঠ থেকে রক্ত অগ্রমহাধমনি পথে দেহগহ্বরে বা হিমোসিলে উন্মুক্ত হয়।
- আরশোলার রক্ত সংবহনের পথ-

বদ্ধ সংবহনতন্ত্র কাকে বলে? উদাহরণ ও চিত্রসহযোগে বদ্ধ সংবহনতন্ত্র ব্যাখ্যা করো।
অথবা, বন্ধ সংবহনতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য লেখো।
বদ্ধ সংবহনতন্ত্র (Closed Circulatory System) – যে সংবহনতন্ত্রে রক্ত সবসময়ই রক্তবাহ এবং হৃৎপিণ্ডের মধ্যে আবদ্ধভাবে সংবাহিত হয় এবং কখনোই দেহগহ্বরে উন্মুক্ত হয় না ও কলাকোশের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসে না, তাকে বদ্ধ সংবহনতন্ত্র বলে।
উদাহরণ – কেঁচো, জোঁক (অমেরুদণ্ডী প্রাণী), মাছ, ব্যাং, সাপ, পাখি, মানুষ প্রভৃতি মেরুদণ্ডী প্রাণীদেহে বদ্ধ সংবহনতন্ত্র দেখা যায়।
বদ্ধ রক্ত সংবহন পদ্ধতি-
- বদ্ধ সংবহনতন্ত্র রক্তবাহ (ধমনি, শিরা ও জালক) ও হৃৎপিণ্ড দ্বারা গঠিত।
- এই সংবহনে রক্ত হৃৎপিণ্ড থেকে ধমনির মধ্যে প্রবেশ করে এবং দেহের বিভিন্ন অংশে অবস্থিত জালকে পৌঁছায়।
- জালক থেকে রক্ত শিরার মাধ্যমে পুনরায় হৃৎপিণ্ডে ফিরে আসে।

- এই সংবহনে রক্ত কলাকোশের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসে না।
- পেশিময়, সংকোচনশীল রক্তবাহের উপস্থিতির জন্য রক্ত দ্রুত গতিতে বাহিত হয়।
- রক্তবাহের পেশির সংকোচন বা প্রসারণের দ্বারা কলাকোশ দিয়ে প্রবাহিত রক্তের পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত হয়।
- বন্ধ সংবহন দু-প্রকার। যথা –
- একচক্রী সংবহন ও
- দ্বিচক্রী সংবহন।
দেহতরল কাকে বলে? মানবদেহে উপস্থিত বিভিন্ন প্রকার দেহতরলের নাম লেখো। দেহতরলের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তাগুলি লেখো।
দেহতরল (Body Fluid) – বহুকোশী প্রাণীদেহে উপস্থিত যে বিশেষ তরল পদার্থের মাধ্যমে প্রতিটি সজীব কোশে পুষ্টি পদার্থ, শ্বাসবায়ু, হরমোন, ভিটামিন প্রভৃতি পৌঁছায় এবং কোশ থেকে বিভিন্ন রেচন পদার্থ অপসারিত হয়ে নির্দিষ্ট রেচন অঙ্গে প্রেরিত হয়, তাকে দেহতরল বলে।
মানবদেহে উপস্থিত বিভিন্ন প্রকার দেহতরলগুলি হল – রক্ত, লসিকা, ঘাম, মূত্র, সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF), সাইনোভিয়াল তরল, কলারস।
দেহত্তরলের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা –
- পরিবহণ – পুষ্টিপদার্থ, শ্বাসবায়ু, হরমোন, ভিটামিন, বর্জ্যপদার্থ প্রভৃতি পরিবহণে সাহায্য করে।
- বিপাকীয় ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ – অন্তঃকোশীয় তরল কোশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বিপাকীয় ক্রিয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
- সাম্যাবস্থা বজায় রাখা – দেহের অভ্যন্তরীণ সাম্যাবস্থা বা হোমিওস্ট্যাসিস নিয়ন্ত্রণে দেহতরল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- তাপ নিয়ন্ত্রণ – উন্নশোণিত প্রাণীদেহে তাপের সমবন্টনে ও নিয়ন্ত্রণে দেহতরল মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
রক্ত কী? রক্তের প্রধান কাজগুলি উল্লেখ করো।
রক্ত – রক্তকণিকা ও রক্তরস দ্বারা গঠিত হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠে ও রক্তবাহে প্রবহমান যে ক্ষারধর্মী, অস্বচ্ছ, লবণাক্ত তরল যোগকলা জীবদেহে পুষ্টিদ্রব্য, গ্যাসীয় উপাদান পরিবহণ করে ও দেহের রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে, তাকে রক্ত বলে।
রক্তের কাজ –
রক্তের প্রধান কাজগুলি হল –
- খাদ্যবস্তুর পরিবহণ – খাদ্য পরিপাকের ফলে উৎপন্ন খাদ্যের সরল অংশসমূহ অস্ত্র থেকে শোষিত হয়ে রক্তের মাধ্যমে দেহের কলাকোশে পরিবাহিত হয়।
- শ্বাসবায়ুর পরিবহণ – রক্ত শ্বাসঅঙ্গ থেকে অক্সিজেনকে বহন করে দেহের প্রতিটি কলাকোশে পৌঁছে দেয় আবার কলাকোশে উৎপন্ন কার্বন ডাইঅক্সাইডকে শ্বাসঅঙ্গে ফিরিয়ে আনে।
- হরমোন পরিবহণ – রক্ত দেহের অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হরমোনের পরিবহণ ঘটায়।
- দূষিত পদার্থের অপসারণ – রক্ত বিপাকজাত দূষিত পদার্থগুলিকে কোশ থেকে অপসারণ করে রেচন অঙ্গে পৌঁছে দেয়।
- রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ – রক্তে উপস্থিত প্লাজমা প্রোটিন (প্রোথম্বিন, ফাইব্রিনোজেন) রক্ততঞ্চনের মাধ্যমে রক্তপাত বন্ধ করে।
- দেহের তাপ নিয়ন্ত্রণ – রক্ত দেহের তাপ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
- রক্ষণাত্মক কাজ – রক্তের শ্বেত রক্তকণিকা দেহে প্রবিষ্ট রোগজীবাণুকে ধ্বংস করে সুরক্ষা প্রদান করে।
- প্রোটিন সঞ্চয় ভাণ্ডার – রক্তরসের প্রোটিন প্রয়োজনে কলাকোশের প্রোটিনের সঞ্চয় ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে।
- জল ও ক্ষারের সাম্যাবস্থা – রক্তের বাফার ধর্ম দেহের অম্ল ও ক্ষারের সাম্যাবস্থা বজায় রাখে।
- পরিবহণের মাধ্যম – রক্ত মেরুদণ্ডী প্রাণী এবং কিছু অমেরুদণ্ডী প্রাণী (ব্যতিক্রম – তারামাছ, স্পঞ্জ, হাইড্রা)-এর ক্ষেত্রে পরিবহণের প্রধান মাধ্যমরূপে কাজ করে।
রক্তের উপাদানগুলি ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করো।
রক্তের উপাদানসমূহ –

রক্তরস কাকে বলে? রক্তরসের উপাদানগুলি আলোচনা করো। *
রক্তরস (Plasma) – অজৈব ও জৈব পদার্থসমৃদ্ধ হালকা হলুদ রঙের অল্প ক্ষারীয় প্রোটিনধর্মী রক্তের যে বিশেষ তরল ধাত্রের মধ্যে রক্তকণিকাগুলি ভাসমান অবস্থায় থাকে, তাকে রক্তরস বা প্লাজমা বলে।
রক্তরসের উপাদানসমূহ –

বিভিন্ন প্রকার রক্তকোশ বা রক্তকণিকার নাম, উৎপত্তি, আয়ুষ্কাল, কোশীয় বৈশিষ্ট্য ও কাজ সারণি আকারে উল্লেখ করো।
| রক্তকোশ বা রক্ত কণিকার নাম | উৎপত্তি | আয়ুষ্কাল | কোশীয় বৈশিষ্ট্য | কাজ |
| লোহিত রক্তকণিকা বা RBC বা এরিথ্রোসাইট | ভ্রুণ অবস্থায় যকৃৎ ও প্লীহা থেকে এবং জন্মের পর লাল অস্থিমজ্জা থেকে উৎপত্তি লাভ করে। | 120 দিন | 1. পরিণত RBC নিউক্লিয়াসবিহীন, দ্বিঅবতল, চাকতির মতো গঠন যুক্ত হয়। 2. এতে হিমোগ্লোবিন থাকে। | 1. অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড পরিবহণ। 2. দেহে অম্ল-ক্ষার ভারসাম্য রক্ষা। |
| শ্বেত রক্তকণিকা বা WBC বা লিউকোসাইট | নিউট্রোফিল, ইওসিনোফিল ও বেসোফিল শ্বেত রক্তকণিকাগুলি লাল অস্থিমজ্জা এবং মনোসাইট ও লিম্ফোসাইট প্লীহা ও লসিকা গ্রন্থি থেকে উৎপত্তি লাভ করে। | 1-15 দিন | 1. অনিয়তাকার ও সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াসযুক্ত। 2. সাইটোপ্লাজম দানাযুক্ত বা দানাবিহীন হয়। | 1. রোগজীবাণু ধ্বংস করে দেহকে প্রতিরক্ষা দান। 2. অ্যান্টিবডি উৎপাদনের মাধ্যমে অনাক্রম্যতা দান। |
| অণুচক্রিকা বা প্লেটলেট | অস্থিমজ্জার মেগাক্যারিওসাইট নামক কোশের ক্ষণপদ খণ্ডিত হয় অণুচক্রিকা সৃষ্টি হয়। | 3-5 দিন | 1. ক্ষুদ্র, ডিম্বাকার বা গোলাকার দ্বিঅবতল চাকতির মতো গঠন যুক্ত। 2. এগুলি নিউক্লিয়াসবিহীন কোশীয় অংশ বিশেষ। | রক্ততঞ্চনে সাহায্য করা। |

রক্ততঞ্চন কাকে বলে? প্রক্রিয়াটি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
রক্ততঞ্চন (Blood Coagulation) – যে ভৌত রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় দেহের ক্ষতস্থান থেকে নির্গত তরল রক্ত অল্প সময়ের মধ্যে অর্ধকঠিন জেলির মতো পদার্থে পরিণত হয়, তাকে রক্ততঞ্চন বলে।
রক্ততঞ্চনের প্রয়োজনীয় উপাদান –
- প্লাজমা প্রোটিন – প্রোথ্রম্বিন, ফাইব্রিনোজেন।
- খনিজ পদার্থ – ক্যালশিয়াম
- ভিটামিন – K
- রক্তকণিকা – অণুচক্রিকা

রক্ততঞ্চন পদ্ধতি – রক্ততঞ্চন প্রক্রিয়াটি একটি দ্রুত সংঘটিত ধারাবাহিক পর্যায়ক্রমিক রাসায়নিক বিক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াটি 13টি ফ্যাক্টরের উপস্থিতিতে ঘটে এবং 2-5 মিনিটে সম্পন্ন হয়।
রক্ততঞ্চন প্রক্রিয়ার পর্যায়সমূহ –
পর্যায় 1 – ক্ষতস্থান থেকে রক্তপাতের সময় ক্ষতিগ্রস্ত কলাকোশ ও রক্তস্থিত অণুচক্রিকা রক্তবাহের ওই ক্ষত অংশের সংস্পর্শে ভেঙে যায় এবং ক্ষতস্থান থেকে থ্রম্বোপ্লাসটিন নির্গত করে। এই থ্রম্বোপ্লাসটিন ক্যালশিয়াম আয়নের (Ca2+) সহায়তায় প্রোথ্রম্বিনেজ নামক উৎসেচক গঠন করে।
ক্ষতস্থান এবং বিনষ্ট অণুচক্রিকা → থ্রম্বোপ্লাসটিন;
থ্রম্বোপ্লাসটিন + Ca2+ → প্রোথ্রম্বিনেজ।
পর্যায় 2 – ক্যালশিয়াম আয়নের উপস্থিতিতে প্রোথ্রম্বিনেজ হেপারিনের ক্রিয়া বিনষ্ট করে এবং রক্তরসস্থিত প্রোথ্রম্বিনকে থ্রম্বিনে পরিণত করে।
পর্যায় 3 – সক্রিয় থ্রম্বিন (উৎসেচক) রক্তরসস্থিত ফাইব্রিনোজেনকে (দ্রবণীয়) ভিটামিন-K ও Ca+ -এর উপস্থিতিতে ফাইব্রিনে (অদ্রবণীয়) পরিণত করে। ফাইব্রিন তত্ত্বর পলিমার জালকাকারে বিন্যস্ত হয় ও রক্তস্থিত লোহিত রক্তকণিকা ও শ্বেত রক্তকণিকা ফাইব্রিন জালে আবদ্ধ হয়। এর ফলে ক্ষতস্থানে রক্ত অর্ধকঠিন জেলির মতো থকথকে পদার্থে পরিণত হয় ও রক্ততঞ্চন ঘটে।
থ্রম্বিন + ফাইব্রিনোজেন + Ca++ + Vit-K → ফাইব্রিন → রক্ততঞ্চন
রক্ততঞ্চন পদ্ধতির শব্দচিত্র –

রক্তের শ্রেণি বলতে কী বোঝো? মানুষের রক্তের শ্রেণি ও তাদের মধ্যে সম্পর্কগুলি বিবৃত করো। রক্তের শ্রেণিবিভাগের তাৎপর্য কী?
রক্তশ্রেণি (Blood Group) – তিনটি প্রধান রক্তগ্রুপ নির্ধারণকারী পলিস্যাকারাইডের (অ্যাপ্লুটিনোজেন-A অ্যাপ্লুটিনোজেন-B ও RH অ্যাগ্লুটিনোজেন) উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ব্যক্তির রক্তের যে শ্রেণিবিভাগ করা হয়, তাকে রক্তশ্রেণি বলা হয়।
এই ধরনের রক্তের শ্রেণিকে ABO ব্লাড গ্রুপ বা ল্যান্ডস্টেনার ব্লাড গ্রুপও বলা হয়।
মানুষের রাস্তর শ্রেণি ও তাদের মধ্যে সম্পর্ক –
| রক্তের শ্রেণি | অ্যাগ্লুটিনোজেন | অ্যাগুটিনিন | রক্তদান করতে পারে | রক্তগ্রহণ করতে পারে |
| A | A | β | A, AB | A, O |
| B | B | α | B, AB | B, 0 |
| AB | A ও B | – | AB | A, B, AB, O |
| O | – | α ও β | A, B, AB, O | O |
রক্তের শ্রেণিবিভাগের তাৎপর্য/গুরুত্ব/প্রয়োজনীয়তা –
- রক্ত সঞ্চারণ – কোনো রোগীকে শল্যচিকিৎসার সময় রক্তদান বা রক্তগ্রহণ করার প্রয়োজন হলে দাতা ও গ্রহীতার রক্তের শ্রেণি জানা অত্যন্ত প্রয়োজন। তা না হলে বিপরীত অ্যাগ্লুটিনোজেনের প্রভাবে রক্তের অ্যাপ্লুটিনেশন ঘটে।
- ব্যক্তির শনাক্তকরণ – ফরেনসিক সায়েন্সে রক্তের শ্রেণি নির্ণয়ের সাহায্যে অপরাধী ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়।
- পিতৃত্ব নির্ণয় – রক্তের শ্রেণি পরীক্ষার মাধ্যমে কোনো সন্তানের পিতৃত্বের জটিলতার সমাধান করা হয়।
- রোগ নির্ণয় – রক্তের শ্রেণি নির্ণয়ের সাহায্যে কয়েকটি বংশগত রোগ শনাক্ত করা হয়। যেমন – (a) ‘A’ রক্তশ্রেণিভুক্ত ব্যক্তিরা রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া রোগে বেশি ভোগেন। এদের পাকস্থলীতে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। (b) ‘O’ রক্তশ্রেণিভুক্ত ব্যক্তিরা পেপটিক আলসারে বেশি আক্রান্ত হন।
হৃৎপিণ্ড (Heart) কাকে বলে? মানব হৃৎপিণ্ডের অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।
হৃৎপিণ্ড (Heart) – পেশিবহুল ত্রিকোণাকার যে পাম্পযন্ত্র বক্ষগহ্বরে দুটি ফুসফুসের মাঝখানে দেহের মধ্যরেখার সামান্য বামদিকে উপস্থিত থেকে অবিরাম ছান্দিক গতিতে স্পন্দিত হয়ে সারাদেহে রক্ত সঞ্চালনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তাকে হৃৎপিণ্ড বলে।
হূৎপিণ্ডের অভ্যন্তরীণ গঠন –
- হৃৎপিণ্ডের আবরণ – দ্বিস্তরীয় পেরিকার্ডিয়াম।
- হৃৎপিণ্ডের প্রাচীর ত্রিস্তরবিশিষ্ট যথা –
- বাইরের এপিকার্ডিয়াম,
- মাঝের সর্বাপেক্ষা পেশিবহুল মায়োকার্ডিয়াম এবং
- মসৃণ, পাতলা ভিতরের এন্ডোকার্ডিয়াম।

প্রকোষ্ঠ – প্রতিটি হৃৎপিণ্ড দুটি অলিন্দ এবং দুটি নিলয় দ্বারা গঠিত। অলিন্দ দুটি হল যথাক্রমে ডান অলিন্দ ও বাম অলিন্দ। অলিন্দের প্রাচীর পাতলা এবং অলিন্দ দুটি পরস্পর আন্তঃঅলিন্দ ব্যবধায়ক দ্বারা পৃথক থাকে। নিলয় দুটি হল – ডান ও বাম নিলয়। নিলয় দুটির অন্তঃপ্রাচীরে প্যাপিলারি পেশি থাকে এবং তাদের অগ্রভাগ থেকে কর্ডি টেনডনি নামক প্রোটিনের তত্ত্ব উৎপন্ন হয়। নিলয়ের প্রাচীরে কলামনি কারনি নামক পেশিবহুল খাঁজ বর্তমান। মানব হৃৎপিণ্ডের আন্তঃঅলিন্দ ব্যবধায়কে একটি অবতল খাঁজ বর্তমান, একে ফোসা ওভালিস বলে।
ডান অলিন্দে ঊর্ধ্ব ও নিম্ন মহাশিরা উন্মুক্ত হয় এবং এরা সারা দেহ থেকে দূষিত রক্ত নিয়ে আসে। অপরদিকে বাম অলিন্দ ফুসফুস থেকে ফুসফুসীয় শিরার মাধ্যমে ফুসফুস থেকে আগত বিশুদ্ধ রক্ত গ্রহণ করে। বিশুদ্ধ রক্ত বাম নিলয় থেকে মহাধমনিতে এবং দুষিত রক্ত ডান নিলয় থেকে ফুসফুসীয় ধমনিতে মুক্ত হয়।
কপাটিকা – হৃৎপিণ্ডের বিভিন্ন প্রকোষ্ঠ এবং রক্তবাহের সংযোগস্থলে এবং দুটি প্রকোষ্ঠের সংযোগস্থলে পাতার ন্যায় কপাটিকা অবস্থান করে। এই কপাটিকাগুলি রক্তের একমুখী প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। হৃৎপিণ্ডের কপাটিকাগুলি হল – দ্বিপত্র কপাটিকা (বাম অলিন্দ-নিলয় সংযোগস্থলে), ত্রিপত্র কপাটিকা (ডান অলিন্দ-নিলয় সংযোগস্থলে), পালমোনারি কপাটিকা (ডান নিলয় ও ফুসফুসীয় ধমনির সংযোগস্থলে), থিবেসিয়ান কপাটিকা (করোনারি সাইনাস ও ডান অলিন্দের সংযোগস্থলে), ইউস্টেচিয়ান কপাটিকা (নিম্ন মহাশিরা ও ডান অলিন্দের সংযোগস্থলে)।
হৃৎপিণ্ডের বিশেষ সংযোজী কলা বলতে কী বোঝো? সংযোজী কলাগুলির অবস্থান ও কাজ উল্লেখ করো।
অথবা, হৃদপ্রাচীর সংলগ্ন বিশেষ সংযোজী কলা হিসেবে SA নোড ও পারকিনজি তন্তুর ভূমিকা উল্লেখ করো।
হৃৎপিণ্ডের বিশেষ সংযোজী কলা – যে-সমস্ত পরিবর্তিত পেশিকলা হৃৎস্পন্দনের আবেগের উৎপত্তি ও তার বিস্তারে অংশগ্রহণ করে এবং হৃৎপিণ্ডের নিয়মিত ছান্দিক গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের বিশেষ সংযোজী কলা বলে।

বিশেষ সংযোজী কলার প্রকারভেদ –
- সাইনোঅ্যাট্রিয়াল নোড (Sinoatrial Node or SA Node) –
- অবস্থান – ডান অলিন্দের যে স্থানে ঊর্ধ্ব মহাশিরা প্রবেশ করে, সেই স্থানে SA নোড উপস্থিত থাকে।
- কাজ – SA নোড প্রতি মিনিটে 70-80 বার হৃৎস্পন্দনের আবেগ সৃষ্টি করে যা হৃৎপিণ্ডকে 70-80 বার (গড়ে 72 বার)/মিনিট স্পন্দিত করে। এজন্য SA নোডকে হৃৎপিণ্ডের ছন্দনিয়ামক বা পেসমেকার (Pacemaker) বলে।
- অ্যাট্রিওভেন্ট্রিকুলার নোড (Atrioventricular Node or AV Node) –
- অবস্থান – ডান অলিন্দের পিছনের দিকে আন্তঃনিলয় প্রাচীরের কাছে যে অংশে করোনারি সাইনাস উন্মুক্ত হয়, সেই স্থানে AV নোড উপস্থিত থাকে।
- কাজ – AV নোড প্রতি মিনিটে 40-60 বার (গড়ে 50 বার) হৃৎস্পন্দনের আবেগ সৃষ্টি করে। এই জন্য AV নোডকে সংরক্ষিত ছন্দ নিয়ামক বা Reserve Pacemaker বলে।
- হিজের বান্ডিল বা হিজের তন্তুগুচ্ছ (Bundle of His) –
- অবস্থান – AV নোড থেকে উৎপন্ন হয়ে অলিন্দ-নিলয় প্রাচীর অতিক্রম করে দুটি ভাগে ভাগ হয়ে বিন্যস্ত থাকে।
- কাজ – হিজের তন্তুগুচ্ছ প্রতি মিনিটে 36 বার হৃৎস্পন্দনের আবেগ সৃষ্টি করে ও পরিবাহিত করে।
- পারকিনজি তন্তু (Purkinje Fibres) –
- অবস্থান – হিজের তন্তুগুচ্ছ থেকে উৎপন্ন হয়ে হৃৎপিণ্ডের অগ্রভাগের দিকে নিলয় প্রাচীরে বিন্যস্ত থাকে।
- কাজ – পারকিনজি তন্তু প্রতি মিনিটে 35 বার হৃৎস্পন্দনের আবেগ সৃষ্টি করে এবং হৃৎস্পন্দনের আবেগকে নিলয়ের প্রতিটি পেশিতে ছড়িয়ে দেয়।
- আন্তরনোডীয় তন্তুপথ (Internodal Fibres) –
- অবস্থান – সম্মুখগামী, মধ্যগামী ও পশ্চাৎগামী তন্তুসমূহ SA নোড ও AV নোডের অন্তর্বর্তী স্থানে বিন্যস্ত থাকে।
- কাজ – হৃৎস্পন্দনের আবেগকে SA নোড থেকে AV নোডে পরিবাহিত করে।
- ব্যাকম্যানের তন্তুগুচ্ছ (Bachmann’s bundle) –
- অবস্থান – SA নোড থেকে উৎপন্ন হয়ে বাম অলিন্দের প্রাচীরে বিন্যস্ত থাকে।
- কাজ – হৃৎস্পন্দনের আবেগ বাম অলিন্দে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে।
মানব হৃৎপিণ্ডের মধ্যে দিয়ে রক্ত সংবহন কীভাবে হয়? সংক্ষেপে লেখো।
মানব হূৎপিণ্ডের মাধ্যমে রস্ত সংবহন পদ্ধতি – মানব হৃৎপিণ্ডের স্বতঃস্ফূর্ত সংকোচন (সিস্টোল) ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রসারণ (ডায়াস্টোল) -এর মাধ্যমে রক্ত সংবাহিত হয়। মানব হৃৎপিণ্ডের মধ্যে দিয়ে রক্তসংবহন নিম্নরূপে ঘটে –
- অলিন্দদ্বয়ের ডায়াস্টোল – দেহের বিভিন্ন কলাকোশ থেকে ঊর্ধ্বমহাশিরা ও নিম্নমহাশিরা এবং হৃৎপিণ্ড প্রাচীর থেকে করোনারি সাইনাস অক্সিজেনবিহীন রক্ত ডান অলিন্দে বয়ে নিয়ে আসে। এই সময় ডান অলিন্দের প্রসারণ বা ডায়াস্টোল হয়, এবং এই ডায়াস্টোল অবস্থাতে থাকাকালীন ফুসফুস থেকে বিশুদ্ধ রক্ত ফুসফুসীয় শিরা দিয়ে বাম অলিন্দে আসে।
- অলিন্দদ্বয়ের সিস্টোল – অলিন্দদ্বয় রক্তপূর্ণ হলে এদের সংকোচন অর্থাৎ, সিস্টোল হয়। এই সময় দ্বিপত্র ও ত্রিপত্র কপাটিকা খুলে যায়, ফলে ডান অলিন্দ থেকে দূষিত রক্ত ডান নিলয়ে এবং বাম অলিন্দ থেকে বিশুদ্ধ রক্ত বাম নিলয়ে প্রবেশ করে।
- নিলয়দ্বয়ের ডায়াস্টোল – অলিন্দদ্বয়ের সংকোচনের ফলে রক্ত অলিন্দদ্বয় থেকে বাম নিলয় ও ডান নিলয়ে প্রবেশ করলে নিলয়দ্বয়ের প্রসারণ অর্থাৎ, ডায়াস্টোল শুরু হয়। এই সময় অর্ধচন্দ্রাকৃতি বা সেমিলিউনার কপাটিকা বন্ধ থাকে।
- নিলয়দ্বয়ের সিস্টোল – রক্তে ভরতি হয়ে গেলে নিলয়দুটির সংকোচন অর্থাৎ, সিস্টোল হয় এবং নিলয়-মধ্যস্থ রক্তচাপ বৃদ্ধিতে দ্বিপত্র ও ত্রিপত্র কপাটিকা বন্ধ হয়ে যায় এবং অর্ধচন্দ্রাকৃতি (পালমোনারি কপাটিকা ও অ্যাওর্টিক কপাটিকা) কপাটিকা খুলে যায়। ফলে ডান নিলয় থেকে দূষিত রক্ত ফুসফুসীয় ধমনির মাধ্যমে ফুসফুসে চলে যায় এবং বাম নিলয় থেকে বিশুদ্ধ রক্ত মহাধমনিতে প্রবেশ করে এবং ধমনিতন্ত্রের সাহায্যে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এইভাবে হৃৎপিণ্ডের ক্রমাগত সংকোচন ও প্রসারণের দ্বারা রক্তের সংবহন হয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য বিষয় হল, অলিন্দদ্বয় যখন সংকুচিত হয় নিলয়দ্বয় তখন প্রসারিত অবস্থায় থাকে, অপরপক্ষে অলিন্দদ্বয় যখন প্রসারিত হয় নিলয়দ্বয় তখন সংকুচিত অবস্থায় থাকে।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘সংবহন’ অংশের রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন