এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে বাংলার ছাত্র সমাজ কীরূপ ভূমিকা পালন করেছিল?” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাস পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই “সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে বাংলার ছাত্র সমাজ কীরূপ ভূমিকা পালন করেছিল?” প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাসের সপ্তম অধ্যায় “বিশ শতকের ভারতে নারী, ছাত্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলন: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ“ -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবং চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়।

সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে বাংলার ছাত্র সমাজ কীরূপ ভূমিকা পালন করেছিল?
বিংশ শতকের সূচনায় বাংলা তথা ভারতের বুকে সশস্ত্র বিপ্লববাদের যে পদধ্বনি শোনা যেতে থাকে, ছাত্র সমাজের সক্রিয় তথা স্বতঃস্ফূর্ত অংশ-গ্রহণ তাতে ছিল সম্মুখ সারিতে। দেশ মাতৃকার পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের উদ্দেশ্যে একদল অকুতোভয় তরুণ-তরুণী সশস্ত্র পথে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মরনপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের উয় শোণিতেই লেখা হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের নতুন অধ্যায়।
বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে ছাত্র সমাজের ভূমিকা
মহারাষ্ট্রে সশস্ত্র বিপ্লববাদের সূচনা হলেও বাংলায় তা ব্যাপকতা লাভকরে। সরকারি চণ্ডনীতি কংগ্রেসের নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের ব্যর্থতা, বঙ্কিমচন্দ্র ও স্বামীজির বাণী, ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, আমেরিকার বিপ্লব প্রভৃতির ইতিহাস বাংলার ছাত্র-যুব মানসকে আত্মবলিদানে উদ্বুদ্ধ করে। বাংলার নানাস্থানে গড়ে ওঠে একাধিক গুপ্ত সমিতি।
গুপ্ত সমিতির মাধ্যমে বিপ্লব প্রচেষ্টা
অনুশীলন সমিতি –
1902 খ্রিস্টাব্দে সতীশচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে ও সভাপতিত্বে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় অগ্নিযুগের বাংলার প্রথম গুপ্ত সমিতি-‘অনুশীলন সমিতি’। লাঠি খেলা, শরীরচর্চা প্রভৃতির মাধ্যমে দেশে ক্ষাত্র শক্তির বিকাশ এবং নৈতিক চরিত্রের উন্নতি বিধান করে সশস্ত্র পথে ভারতের মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনা করাই ছিল এই সংগঠনের প্রধান উদ্দেশ্য। 1905 খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় ব্যারিস্টার পি. মিত্রের পৌরহিত্যে অনুশীলন সমিতি অধিকতর সক্রিয় হয়ে ওঠে। 1906 খ্রিস্টাব্দে পুলিন বিহারী দাসের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে ‘ঢাকা অনুশীলন সমিতি’। ব্রিটিশের চণ্ডনীতি ও অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারণে এই সমিতির কার্যকলাপ ক্রমশ সংকুচিত হলেও সশস্ত্র বিপ্লবাবদের ক্ষেত্র প্রস্তুতিতে অনুশীলন সমিতির অবদান অনস্বীকার্য।
যুগান্তর দল –
বিপ্লবী বারিন্দ্র কুমার ঘোষের উদ্যোগে 1906 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় গড়ে ওঠে ‘যুগান্তর দল’। এই দলের উদ্যোগে স্বৈরাচারী ইংরেজ আমলাদের হত্যার পরিকল্পনা রচিত হয়। এই দলের দুই উল্লেখযোগ্য সদস্য হেমচন্দ্র কানুনগো ও উল্লাসকর দত্ত কলকাতার মানিকতলা অঞ্চলের মুরারিপুকুরে বোমা তৈরির কারখানা গড়ে তোলেন।
বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স –
বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের উদ্যোগে 1912 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ঢাকায় গড়ে ওঠে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স (বি. ভি.) নামে এক বিপ্লবী যুব দল। 1928 খ্রিস্টাব্দে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনকে সুরক্ষিত রাখতে এই দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। 1930 -এর দশক পর্যন্ত বি. ভি. -এর সক্রিয়তা বজায় ছিল।
ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি –
1930 খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবী সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে গড়ে ওঠে এই গুপ্ত সমর বাহিনী। এই দলের উল্লেখযোগ্য সদস্য ছিলেন গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, নির্মল সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত প্রমুখ দুঃসাহসী যুবক-যুবতী। 1930 খ্রিস্টাব্দের 18 এপ্রিল চট্টগ্রামের সরকারি অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনায় এই দলের সক্রিয়তা ব্রিটিশ সরকারকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছিল।
সশস্ত্র বিপ্লববাদে ছাত্র সমাজের অংশগ্রহণের দৃষ্টান্ত
কিংসফোর্ডকে হত্যার প্রচেষ্টা –
অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার জন্য ‘যুগান্তর দল’ -এর দুই তরুণ সদস্য ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী মুজাফ্ফরপুরে যান। কিন্তু তাদের বোমার আঘাতে ভুলক্রমে জনৈকা মিসেস কেনেডি ও তার শিশু কন্যা নিহত হন। ক্ষুদিরাম বসু ধরা পড়েন ও বিচারে তাঁর ফাঁসি হয়। তরুণ বিপ্লবীর এই নির্ভীক আত্মত্যাগ বাংলার যুবসমাজকে অত্যাচারী বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করে।
লোম্যান হত্যা –
বি. ভি.-র সদস্য বিনয়কৃষ্ণ বসু নামে ডাক্তারি পাঠরত এক ছাত্র তৎকালীন বাংলা পুলিশের প্রধান লোম্যান ও ঢাকার পুলিশ সুপার হাডসনকে হত্যার চেষ্টা করেন। এই ঘটনায় লোম্যান নিহত হলেও হাডসন কোনোক্রমে প্রাণে বেঁচে যান। এরপর বিনয় বসু পালিয়ে কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানেই বিপ্লবী কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন।
অলিন্দ যুদ্ধ –
বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের তিন তরুণ বিপ্লবী বিনয়কৃষ্ণ বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত 1930 খ্রিস্টাব্দের 8 ডিসেম্বর বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের মূল কেন্দ্র রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান করেন এবং কারা বিভাগের অধিকর্তা সিম্পসকে হত্যা করেন। তাদের সঙ্গে রাইটার্স বিল্ডিং -এর অলিন্দে ব্রিটিশ পুলিশের যে খন্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়, তা ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ নামে খ্যাত। ধরা পড়ার অসম্মান থেকে বাঁচার জন্য বিনয় ও বাদল আত্মহত্যা করেন এবং বিচারে দীনেশের ফাঁসি হয়।
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন –
1930 খ্রিস্টাব্দের 18 এপ্রিল মাস্টারদা সূর্য সেনের পরিচালনায় ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির একদল যুবক চট্টগ্রামের সরকারি অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করেন এবং সরকারি প্রশাসনের যাবতীয় চিহ্ন নিঃশেষ করে দিয়ে অস্থায়ী জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে খন্ডযুদ্ধ এই সরকারের পতন ঘটলেও পরাধীন ভারতের এখানেই স্বাধীনতার পতাকা প্রথম উত্তলিত হয়।
মেদিনীপুরের জেলাশাসকদের হত্যা –
পূর্ববঙ্গের ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হলেও পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরেই বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের পুনর্জন্ম ঘটে বলা চলে। মেদিনীপুরে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের কাজকর্ম ব্রিটিশ শাসককে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলে। 1931-1933 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মেদিনীপুরের পর পর তিন জন জেলাশাসক যথাক্রমে পেডি, ডগলাস ও বার্জ বি. ভি. -এরসদস্যদের হাতে নিহত হন।
বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে ছাত্র সমাজের মূল্যায়ন –
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে ছাত্র সমাজ সর্বদা থেকেছে সম্মুখসারিতে। পরাধীন ভারতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিপ্লবের রক্ত পতাকা বাহিত হয়েছে তাদের বজ্র-কঠিন হাতে।
এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে বাংলার ছাত্র সমাজ কীরূপ ভূমিকা পালন করেছিল?” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই “সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে বাংলার ছাত্র সমাজ কীরূপ ভূমিকা পালন করেছিল?” প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাসের সপ্তম অধ্যায় “বিশ শতকের ভারতে নারী, ছাত্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলন: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ” -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবং চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন।





Leave a Comment