উনিশ শতকে ছাপাখানার বাণিজ্যিক উদ্যোগে বাঙালির অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

Rahul

এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “উনিশ শতকে ছাপাখানার বাণিজ্যিক উদ্যোগে বাঙালির অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাস পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই “উনিশ শতকে ছাপাখানার বাণিজ্যিক উদ্যোগে বাঙালির অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।“ প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাসের পঞ্চম অধ্যায় “বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা“ -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবং চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়।

উনিশ শতকে ছাপাখানার বাণিজ্যিক উদ্যোগে বাঙালির অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উনিশ শতকে ছাপাখানার বাণিজ্যিক উদ্যোগে বাঙালির অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উনিশ শতকে ছাপাখানা স্থাপন বাঙালির কাছে বিশেষ গৌরব ও নেশার বিষয় হয়ে উঠেছিল। এই সময় ছাপাখানা মালিকদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন গুণী, পণ্ডিত, সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক ও ধনাঢ্য ব্যক্তি।

মার্জিত বাংলা হরফের প্রথম কারিগর পঞ্চানন কর্মকারের জামাতা মনোহর কর্মকার ও তাঁর পুত্ররা ‘চন্দ্রোদয় যন্ত্র’ নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এর যথেষ্ট সুনাম ছিল। দুর্গাচরণ গুপ্ত স্থাপন করেন ‘গুপ্তযন্ত্র’। আর তাঁর পুস্তক বিপণি ‘গুপ্ত ব্রাদার্স’। গুপ্তযন্ত্রে ছাপা ‘গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা’ বাঙালির চিরকালীন সম্পদ। প্যারিচরণ সরকার মূলত নিজের বই প্রকাশের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্কুল বুক প্রেস’। এখান থেকে বেশ কিছু সংবাদপত্রও ছাপা হয়েছে।

ছাপাখানায় বাঙালির বাণিজ্যিক উদ্যোগের একটি লক্ষণীয় দিক হল যৌথ উদ্যোগে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা। এঁদের অধিকাংশই ছিলেন মধ্যবিত্ত এবং পেশায় শিক্ষক। এদের সাধ থাকলেও সাধ্য ছিল না। তাই ছাপার খরচ জোগানের জন্য তাদের অংশীদারিত্বের পথে যেতে হয়, অথবা ধনীদের দ্বারস্থ হতে হয়। ‘বাঙ্গাল গেজেটি’-র সম্পাদক গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য, হরচন্দ্র রায়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে স্থাপন করেন ‘বাঙ্গাল গেজেটি প্রেস’। বিদ্যাসাগর ও তাঁর বন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘সংস্কৃত যন্ত্র’ প্রেসও যৌথ উদ্যোগের উদাহরণ। কাঙ্গাল হরিনাথ ঋণগ্রস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রেস বিক্রি করে দেন। হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরও ঋণগ্রস্ত পরিবার তাঁর প্রেস বন্ধ করে দেন।

মুদ্রণ শিল্পে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের অবদান

গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ছিলেন প্রথম বাঙালি মুদ্রণ ব্যবসায়ী, প্রকাশক ও গ্রন্থকার। তাঁর নিবাস ছিল বর্ধমানের বহড়া গ্রামে। কাজের খোঁজে তিনি শ্রীরামপুর মিশনারিদের সংস্পর্শে আসেন।

শ্রীরামপুর মিশনেই গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের মুদ্রণ শিল্প এবং প্রকাশনার কাজে হাতেখড়ি হয়। শ্রীরামপুর মিশনের ছাপাখানার কম্পোজিটর, ফেরিস কোম্পানির ছাপাখানায় মুদ্রাকর হিসেবে এবং এরপর উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের গোড়ায় কলকাতায় এসে ব্যবসায়িক লক্ষ্যে ছাপাখানা খোলেন ও বই বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন। পরিশেষে কলকাতা থেকে প্রেস নিয়ে স্বগ্রাম বহড়ায় চলে আসেন।

গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের প্রেসের নাম ছিল ‘বাঙ্গাল গেজেটি যন্ত্রালয়’। এখান থেকেই তিনি প্রকাশ করতেন সাপ্তাহিক ‘বাঙ্গাল গেজেটি’ পত্রিকা। তাঁর প্রেস থেকে তাঁরই সম্পাদিত ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ সহ বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম সচিত্র বাংলা গ্রন্থ ‘অন্নদামঙ্গল’ প্রকাশে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর প্রেস থেকেই একে একে ছাপা হয় ‘এ গ্রামার ইন ইংলিশ অ্যান্ড বেঙ্গলি’, ‘গণিত নামতা’, ‘ব্যাকরণ লিখবার আদর্শ’, ‘হিতোপদেশ’, ‘দায়ভাগ’, ‘চিকিৎসার্নব’ ইত্যাদি অন্যান্য গ্রন্থ। মুদ্রণের ব্যবসায়িক উদ্যোগের পথপ্রদর্শক বাঙালি পুরুষরূপে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।

মুদ্রণ শিল্পে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান

মুদ্রণের ব্যবসায়িক উদ্যোগে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের ঠিক পরেই যার নাম উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

বাংলা মুদ্রণ প্রকাশনা জগতের উন্নতিকল্পে তিনি ছিলেন এক সচেতন মুদ্রাকর, প্রকাশক ও পুস্তক ব্যবসায়ী। তিনি স্বরবর্ণ ও ব্যাঞ্জনবর্ণগুলির সংস্কার করেন এবং তাদের আদর্শরূপ তুলে ধরেন বর্ণপরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডে। তিনি নতুন ধাঁচে বাংলা অক্ষর তৈরি করান এবং তা ‘বিদ্যাসাগর সাট’ নামে পরিচিতি পায়।

বিদ্যাসাগর 1847 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় স্থাপন করেন সংস্কৃত প্রেস। এখান থেকে মুদ্রিত প্রথম বাংলা বই ছিল ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’। তাঁর দুই খণ্ডের ‘বর্ণপরিচয়’ (1855), ‘কথামালা’, ‘বোধদয়’, মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা’ প্রভৃতি গ্রন্থও এখান থেকেই প্রকাশিত হয়।

মুদ্রণ প্রকাশনার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত প্রেস ডিপোজিটারি স্থাপন করেন 1847 খ্রিস্টাব্দে। এটিই ছিল তাঁর প্রথম বইয়ের দোকান। তাঁর নিজের সংস্কৃত প্রেস ছাড়াও অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থার বই এখানে বিক্রয় হত। শুধুমাত্র স্কুলপাঠ্য বই ছেপে ও বিক্রি করে তখন বিদ্যাসাগরের মাসিক আয় ছিল তিন-চার হাজার টাকা। ‘বর্ণপরিচয়’ বছরে প্রায় পঞ্চাশ হাজার কপি বিক্রি হত।

পরবর্তী সময়ে 1885 খ্রিস্টাব্দে ‘কলকাতা পুস্তকালয়’ নামে তিনি নতুন একটি পুস্তক বিপণি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নিজের ও কপি রাইটের বইগুলি এই সংস্থা থেকে প্রকাশিত হত। তৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ পুস্তক প্রকাশনা ও বিক্রয় সংস্থার মালিক হয়ে বাংলা বই ব্যবসার অন্যতম অগ্রণী পুরুষ হিসেবে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

মুদ্রণ শিল্পে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর অবদান

বাংলায় মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাসে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’ (1895 খ্রিস্টাব্দে) এক অবিস্মরণীয় নাম। আধুনিক ‘হাট্টান’ ব্লকের সৌজন্যে বাংলা গ্রন্থচিত্রণে যুগান্তর আনেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী উপেন্দ্রকিশোর। বিলেত থেকে যন্ত্রপাতি ও বইপত্র আনিয়ে হাফ্টোন ব্লক তৈরির বিদ্যা নিজেই আয়ত্ত করেন। পাশাপাশি, আধুনিক ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণশিল্প সম্পর্কে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য নিজের পুত্র সুকুমার রায়কে ইংল্যান্ডে পাঠান। রঙিন মুদ্রণের জন্য তিনি নানাপ্রকার ডায়াফর্ম যন্ত্র, স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার যন্ত্র, ডুয়ো টাইপ ও টিন্ট প্রসেস পদ্ধতি আবিষ্কার করেন এবং তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার এবং টিন্ট প্রসেস যন্ত্রটিকে তাঁর নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে।

তাঁর ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত ‘টুনটুনির বই’, ‘ছেলেদের মহাভারত’ প্রভৃতি গ্রন্থে এবং কিশোর পাঠ্য রঙিন ‘সন্দেশ’ পত্রিকার পাতায় চিত্রকর এবং মুদ্রাকর উপেন্দ্রকিশোরের নৈপুণ্যের স্বাক্ষর মেলে। মুদ্রণশিল্পের নৈপুণ্যে তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘ইউ এন রায় অ্যান্ড সন্স’ শুধু ভারতে নয়, সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছাপাখানায় পরিণত হয়েছিল।

মুদ্রণ শিল্পের মূল্যায়ন –

এইভাবে সমগ্র উনিশ শতক জুড়ে মুদ্রণের জগতে বাঙালির জয়যাত্রা অব্যাহত থেকেছে। শিক্ষা সংস্কারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সাফল্যলাভও যে অসম্ভব নয়, তা তাঁরা বারংবার প্রমাণ করেছেন।


এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “উনিশ শতকে ছাপাখানার বাণিজ্যিক উদ্যোগে বাঙালির অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই “উনিশ শতকে ছাপাখানার বাণিজ্যিক উদ্যোগে বাঙালির অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।” প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাসের পঞ্চম অধ্যায় “বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা” -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবং চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন।

Please Share This Article

Related Posts

সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।

সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।

সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে ছাত্রদের অবদান আলোচনা করো।

সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে ছাত্রদের অবদান আলোচনা করো।

রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (1953 খ্রিস্টাব্দ) কেন গঠিত হয়েছিল? ভারতের রাজ্য পুনর্গঠন এর ভিত্তিগুলি লেখো।

রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (1953 খ্রিস্টাব্দ) কেন গঠিত হয়েছিল? ভারতের রাজ্য পুনর্গঠন এর ভিত্তিগুলি লেখো।

About The Author

Rahul

Tags

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

জীবাশ্মের সংজ্ঞা ও উদাহরণ | জৈব বিবর্তনে জীবাশ্মের ভূমিকা – মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান

প্রতিটি মেরুদণ্ডী প্রাণীর ভ্রূণের গঠনের মিল ও সিদ্ধান্ত

জিরাফের গ্রীবা লম্বা হওয়ার কারণ – ডারউইন ও ল্যামার্কের তত্ত্ব | মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান

নতুন প্রজাতির উৎপত্তিলাভে প্রকরণের ভূমিকা – মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান

ল্যামার্কবাদের সপক্ষে অঙ্গের ব্যবহার ও অব্যবহারের উদাহরণ | মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান