এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “বাঙালির অধিকাংশ ছাপাখানা যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল কেন? বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগ সমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাস পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই “বাঙালির অধিকাংশ ছাপাখানা যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল কেন? বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগ সমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।“ প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাসের পঞ্চম অধ্যায় “বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা“ -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবং চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়।

বাংলার অধিকাংশ ছাপাখানা যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল কেন?
ছাপাখানায় বাঙালির বাণিজ্যিক উদ্যোগের একটি লক্ষণীয় দিক ছিল যৌথ উদ্যোগ। এই সময় ছাপাখানার প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন মধ্যবিত্ত এবং পেশায় শিক্ষক। এঁদের সাধ থাকলেও সাধ্য ছিল না। তাই ছাপার খরচ জোগানের জন্য তাদের অংশীদারিত্বের পথে যেতে হয়, অথবা ধনীদের দ্বারস্থ হতে হয়। ‘বাঙ্গাল গেজেটি’-র সম্পাদক গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য-হরচন্দ্র রায়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে স্থাপন করেন ‘বাঙ্গাল গেজেটি প্রেস’। বিদ্যাসাগর ও তাঁর বন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘সংস্কৃত যন্ত্র’ প্রেসও যৌথ উদ্যোগের উদাহরণ।
বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগ সমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগের ভূমিকা –
অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে ঊনবিংশ শতকের প্রথমভাগ পর্যন্ত সময়ে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য ছাপাখানা স্থাপিত হয়। ছাপাখানার প্রসারের ফলে মুদ্রণশিল্প একটি প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারি ব্যাবসা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগে হিকির ভূমিকা –
প্রথমদিকের মুদ্রাকরদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন জেমস অগাস্টাস হিকি। 1777 খ্রিস্টাব্দে তিনিই প্রথম কলকাতাতে কাঠের ছাপাখানা গড়ে তোলেন। এখান থেকেই তিনি 1780 খ্রিস্টাব্দে ভারতের প্রথম সংবাদপত্র বেঙ্গল গেজেট প্রকাশ করেন।
বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগে উইলকিন্স –
1778 খ্রিস্টাব্দে চার্লস উইলকিন্স হ্যালহেডের ‘A Grammar of the Bengal Language’ গ্রন্থটি ছাপানোর কাজ শুরু করেন। এটি ছিল বাংলা ভাষায় ছাপানো প্রথম বই। এইসময় তিনি পঞ্চানন কর্মকারের সহযোগিতায় প্রথম ছেনিকাটা বাংলা হরফ নির্মাণ করেন। বাংলায় মুদ্রণ জগতে উইলকিন্সের অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলার ‘মুদ্রণশিল্পের জনক’ ও ‘বাংলার গুটেনবার্গ’ বলা হয়।
বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগে বটতলা প্রকাশনী –
1818-1820 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কলকাতার দরজিপাড়া, শিয়ালদহ, শোভাবাজার, জোড়াসাঁকো (চিৎপুরের একটি বটগাছকে কেন্দ্র করে) অঞ্চলে যে ছাপাখানা ও প্রকাশনী গড়ে ওঠে তাকে বলা হয় বটতলা প্রকাশনী। এখানকার বিভিন্ন প্রেস থেকে সচিত্র চটুল সাহিত্য-সহ নানাধরনের বই ছাপা হত। এ কারণে বইগুলি খুব জনপ্রিয় হয়। এগুলি ফেরি করে বিক্রি করা হত।
বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য –
1818 খ্রিস্টাব্দে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য কলকাতায় বাঙ্গাল গেজেটি প্রেস স্থাপন করেন। এখান থেকেই প্রকাশিত হয় বাঙ্গাল গেজেটি নামে একটি সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা। এই প্রেস থেকে ছাপানো হত সরকারি নোটিশ, গেজেট ও চাকুরি সংক্রান্ত বিষয় ও বিভিন্ন গ্রন্থ। এখান থেকেই ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের লেখা অন্নদামঙ্গল কাব্য প্রকাশিত হয়। এটি ছিল বাংলা ভাষায় ছাপা প্রথম সচিত্র গ্রন্থ।
বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগে গুপ্তপ্রেস –
1861 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় গড়ে ওঠে গুপ্ত প্রেস। 1869 খ্রিস্টাব্দে এখান থেকেই বাংলা ভাষায় প্রথম পঞ্জিকা ছাপানো হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ব্যবসায়ী কিশোরীমোহন বাগচি। এই প্রেস থেকে পঞ্জিকা ছাড়া প্রকাশিত হত নানা ধরনের গ্রন্থ, যেমন – বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ, পুরাণ সাহিত্য, শিশু সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য, জ্যোতিষশাস্ত্র, গীতবিতান প্রভৃতি।
বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগে বিদ্যাসাগর –
বাংলায় ছাপাখানা শিল্প তথা এই ব্যবসায় কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। 1847 খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত যন্ত্র নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি স্বয়ং ছিলেন প্রকাশক ও পরিচালক। তিনিই প্রথম মুদ্রণে ছেদ ও যতি চিহ্ন ব্যবহার করা শুরু করেন। এ ছাড়া তিনি অপ্রয়োজনীয় বর্ণগুলিকে বাদ দিয়ে দেন। এই মুদ্রাক্ষর ও মুদ্রণরীতিকেই বলা হয় বিদ্যাসাগর সাট। এখান থেকেই প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা বর্ণপরিচয়, কথামালা, বোধোদয়-সহ বেতাল পঞ্চবিংশতি, ভ্রান্তিবিলাস, শকুন্তলা, মেঘদূত প্রভৃতি অনুবাদ সাহিত্য। বই ব্যবসায় এই সাফল্যের জন্য তাঁকে বিদ্যাবণিক উপাধি দেওয়া হয়।
বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি –
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি 1895 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন ইউ রায় অ্যান্ড সন্স। এখানে আধুনিক পদ্ধতিতে নানা বই, পত্রপত্রিকা, ছবি ইত্যাদি ছাপানো হত। এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল – টুনটুনির বই, ঠাকুরমার ঝুলি, সন্দেশ পত্রিকা, বিভিন্ন জাতীয় নেতার ছবি ইত্যাদি। তাঁরই হাত ধরে ভারতে হাফটোন ব্লক পদ্ধতির সূচনা হয়। ক্রমে এই কোম্পানির হাত ধরে ভারতের ছাপাখানা শিল্পের বাণিজ্যিকিকরণ ঘটে।
বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগের উপসংহার –
সুতরাং বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগ বাংলা তথা ভারতে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারায় ক্ষেত্রে ব্যপক পরিবর্তন আনে।
এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “বাঙালির অধিকাংশ ছাপাখানা যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল কেন? বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগ সমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই “বাঙালির অধিকাংশ ছাপাখানা যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল কেন? বাংলার ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগ সমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।” প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাসের পঞ্চম অধ্যায় “বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা” -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবং চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন।





Leave a Comment