আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের ষষ্ঠ পাঠের দ্বিতীয় অধ্যায়, ‘রাধারাণী’ -এর কিছু রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

‘রাধারাণী’ গদ্যাংশে নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
ভূমিকা – ‘নামকরণ’ সাহিত্যের আত্মা। নামকরণের মাধ্যমে পাঠক ও সাহিত্যের মধ্যে এক যোগসূত্র স্থাপিত হয়। সাহিত্যিক তাঁর সৃষ্ট রচনার মূল ভাবটির ধারণা প্রকাশ করেন নামকরণের মাধ্যমে। নামকরণ কখনও চরিত্রনির্ভর, কাহিনিনির্ভর, আবার কখনও ব্যঞ্জনাধর্মী হয়ে থাকে।
বঙ্কিমচন্দ্রের দেওয়া নামকরণ – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একাধিক উপন্যাসে মূল নামকরণের পাশাপাশি বিবিধ পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত ঘটনাবলির পৃথক শিরোনাম দিয়েছেন। আলোচ্য ‘রাধারাণী’ পাঠ্যাংশটি ‘রাধারাণী’ উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদ। আটটি পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত এই উপন্যাসে পরিচ্ছেদগুলির পৃথক নামকরণ করা হয়নি। মূল উপন্যাসের নামটিই পাঠ্যাংশে ব্যবহার করেছেন সংকলকগণ। আমাদের বিচার্য পাঠ্যাংশের নামকরণটি যথাযথ হয়েছে কি না।
নামকরণ ও কাহিনি – ‘রাধারাণী’ পাঠ্যাংশটি পড়েই বোঝা যায় নামকরণে ঘটনাব্যঞ্জনা নয়, চরিত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দশ-এগারো বছরের বালিকা রাধারাণীর জীবনকথাই আলোচ্য পাঠ্যাংশে প্রাধান্য পেয়েছে। ‘বড়ো মানুষের মেয়ে’ রাধারাণী জ্ঞাতি তথা প্রতিবেশীর ষড়যন্ত্রে আর ভাগ্যের বিড়ম্বনায় অসুস্থ মাকে নিয়ে বড়োই অসহায়। রুগ্ন মায়ের পথ্য জোগাড় করার উদ্দেশ্যে মাহেশের রথের মেলায় বনফুলের মালা গেঁথে বিক্রি করতে যায় সে। প্রবল বর্ষণে মেলা ভেঙে যাওয়ায় অন্ধকারের মধ্য দিয়ে সে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরছিল। কর্দমাক্ত পিচ্ছিল পথে হঠাৎই রাধারাণীর সংঘর্ষ হয় এক অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে। সেই ব্যক্তিই পরম স্নেহে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল রাধারাণীকে। রাধারাণী সেই ব্যক্তির কাছ থেকে বনফুলের মালার দামস্বরূপ পয়সা নিতে বাধ্য হয়েছিল। বুদ্ধিমতী রাধারাণী অন্ধকারেই অনুমান করে, আগন্তুক তাকে টাকা দিয়েছে। সে আগন্তুককে বাড়িতে অপেক্ষা করতে বলে আলো জ্বালিয়ে দেখেছে তার অনুমান সত্যি। বাইরে এসে আগন্তুকের খোঁজ করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। আগন্তুক রাধারাণীর জন্য কাপড় পাঠিয়েছিল এবং তার দেওয়া নোট থেকে রাধারাণী জানতে পারে আগন্তুকের নাম রুক্মিণীকুমার রায়। মালা বিক্রির টাকায় মায়ের পথ্য, প্রদীপ জ্বালানোর তেল কিনলেও আগন্তুকের ফেলে যাওয়া নোট সে তুলে রেখেছিল ফেরত দেওয়ার জন্য। প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করতে আদর্শে বেধেছিল রাধারাণীর।
নামকরণের সার্থকতা – সমগ্র পাঠ্যাংশে রাধারাণীর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। বালিকা রাধারাণীর সক্রিয় কর্মকাণ্ডে এ উপন্যাসের গতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। সে এই পাঠ্যাংশের চালিকা শক্তি। তাই ‘রাধারাণী’ উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদ তথা আমাদের পাঠ্যাংশটির নাম যথার্থ ও শিল্পসার্থক হয়েছে।
‘রাধারাণী’ গদ্যাংশে রাধারাণীর চরিত্রের যে রূপ প্রকাশিত তা নিজের ভাষায় লেখো।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘রাধারাণী’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রাধারাণী। উপন্যাস তথা গৃহীত পাঠ্যাংশের সমস্ত ক্ষেত্রেই রাধারাণীর সক্রিয় উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়।
ধৈর্য ও সহনশীলতা – রাধারাণীর পিতা যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন তাদের কোনোরূপ আর্থিক সমস্যা হয়নি। যথেষ্ট স্বচ্ছলতার মধ্য দিয়েই তাদের দিনাতিপাত হত, কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর জ্ঞাতিকুটুম্বের মামলায় ও চক্রান্তে পরাজিত হয়ে তারা সর্বহারা হয়। রাধারাণী ও তার মা নিজেদের বাড়ি থেকে উৎখাত হওয়ার পর একটা কুটিরে আশ্রয় গ্রহণ করে নিদারুণ পরিশ্রম ও কষ্টে দিনযাপন করতে থাকে। এই পরিস্থিতিও রাধারাণী মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়। এর মধ্য দিয়ে তার ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় পাওয়া যায়।
বাস্তববোধ – রাধারাণী বালিকা, বয়স তার এগারো সম্পূর্ণ হয়নি। এমন অবস্থায় যখন সাধারণভাবে মানুষ পিতামাতার স্নেহচ্ছায়ায় বড়ো হলেও রাধারাণীর ক্ষেত্রে এর অন্যথা হয়। রাধারাণী অল্প বয়সে এই কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হয়েও নিজের ধৈর্য হারায় না। অসুস্থ মায়ের পথ্য কীভাবে জোগাড় করবে সেই চিন্তা করে। রথের মেলায় বনফুলের মালা বিক্রি করে যে পয়সা পাওয়া যাবে তাতেই মায়ের জন্য পথ্যের ব্যবস্থা করতে পারবে, এমন চিন্তায় তার বাস্তববোধের পরিচয়ও পাওয়া যায়।
মানবিক মূল্যবোধ – মানবিক মূল্যবোধের বৃষ্টির কারণে মেলা তেমন না জমায় যখন বনফুলের মালা বিক্রি হয় না তখন তার হতাশা, ব্যর্থতার যন্ত্রণা আর করুণ অবস্থা পাঠকের হৃদয়কে বেদনাবিধুর করে তোলে। পাশাপাশি বাড়ি ফেরার পথে অচেনা লোক তথা আগন্তুকের সাহায্য গ্রহণ করে, তার কাছেই বনফুলের মালা বিক্রি করে দাম গ্রহণের দ্বিধাগ্রস্ততার মধ্য দিয়ে রাধারাণীর পরিচয় পাওয়া যায়। একই ছবি পাওয়া যায় পয়সার বদলে টাকা পেয়ে তা ফিরিয়ে দেওয়ার তীব্র প্রয়াসের মধ্যে।
নির্ভরশীলতা – আগন্তুকের প্রশ্নের উত্তরে রাধারাণী জানিয়েছিল যে, তার কেউ নেই, কেবল মা আছেন। তার এই কথার মধ্য দিয়ে রাধারাণীর মায়ের উপর নির্ভরতার ছবি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। সত্যিই সে মায়ের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। তাই মায়ের কথামতোই সে রুক্মিণীকুমারের দেওয়া দান গ্রহণ করে খরচ করে।
সমস্ত দিক বিবেচনা করে বলা যায় ‘রাধারাণী’ পাঠ্যাংশে রাধারাণী একটি সক্রিয় ও প্রাণবন্ত চরিত্র।
“তাঁহার নাম রুক্মিণীকুমার রায়।” – রুক্মিণীকুমার রায়ের যে পরিচয় পাওয়া যায় তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করে লেখো।
ভূমিকা – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘রাধারাণী’ উপন্যাস থেকে পাঠ্যাংশ হিসেবে গৃহীত প্রথম পরিচ্ছেদের শেষাংশে রুক্মিণীকুমার রায় নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।
দয়ালু ব্যক্তিত্ব – বনফুলের মালা বিক্রি করার উদ্দেশে রাধারাণী মাহেশের রথের মেলায় গেলেও, বৃষ্টির কারণে মেলা তেমন জমে না ওঠায় মালা বিক্রি হয় না। অসহায় রাধারাণী অসুস্থ মায়ের জন্য পথ্য জোগাড় করবে কী উপায়ে – এমন চিন্তায় যখন কান্নায় আকুল তখন বৃষ্টিভেজা, অন্ধকার পথে হঠাৎ তার ঘাড়ের উপর একজন এসে পড়ায় তার কান্না আরও বেড়ে যায়। কিন্তু যখন সে পুরুষকণ্ঠটি শোনে তখন তার চেনা কণ্ঠ না হলেও লোকটি যে দয়ালু তা বুঝতে বালিকা রাধারাণীর বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না। এরপর থেকে সমগ্র অংশ জুড়ে সেই দয়ালু ব্যক্তির বদান্যতার নানা ঘটনা কাহিনির বিন্যাসে দেখা যায়।
দানশীলতার পরিচয় – অন্ধকারে নিরাপদে রাধারাণীকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, প্রসঙ্গক্রমে অসুস্থ মায়ের পথ্য জোগাড়ের জন্য মাহেশের রথে বনফুলের মালা বিক্রি করতে আসা ও বিক্রি না হওয়ায় রাধারাণীর দুশ্চিন্তা অনুমান করে মালা কেনা, মালার দাম হিসেবে পয়সার বদলে টাকা দেওয়া, রাধারাণীর একটার বেশি পরনের কাপড় নেই জেনে কাপড় কিনে পাঠানো এবং সর্বশেষে বাড়িতে ফেলে যাওয়া নোট- এই সমস্ত কিছুর মধ্য দিয়ে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির দানশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।
উপকারী ব্যক্তি – প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যখন কোনো ব্যক্তি কারোর উপকার করে তখন উপকারী তার উপকারকেই অধিক গুরুত্ব প্রদান করে থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি তথা রুক্মিণীকুমার রায় রাধারাণীদের উপকার করেছেন, কিন্তু উপকার করেছেন এমন ভাব প্রকাশ করেননি – আর সেখানেই তাঁর মহত্ত্ব। শেষপর্যন্ত নোটে তিনি নিজের নামটি লিখে দিয়েছিলেন তার কারণ পাছে নোটটি দেখে কেউ রাধারাণীদের সন্দেহ করে। সমস্ত ঘটনার পারম্পর্য বিশ্লেষণ করে বলা যায়, রুক্মিণীকুমার রায় যথার্থই একজন উপকারী ব্যক্তি।
আজকের প্রচারসর্বস্ব মেকি সামাজিকতায় রুক্মিণীকুমারের মতো প্রচারবিমুখ মহানুভব প্রকৃত উপকারী মানুষ সত্যই বিরল।
‘রাধারাণী’ গদ্যাংশে রাধারাণীর মায়ের যে পরিচয় পাওয়া যায় তা নিজের ভাষায় লেখো।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘রাধারাণী’ উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদে স্থান পেয়েছে রাধারাণী নামক এক বালিকা ও তার বিধবা মায়ের জীবনসংগ্রামের কথা।
মানসিক দৃঢ়তা – রাধারাণী অবস্থাপন্ন বড়ো ঘরের মেয়ে, কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর তাদের এক জ্ঞাতির সঙ্গে সম্পত্তির অধিকার নিয়ে তার মায়ের মামলা হয়। নিম্ন আদালতে রাধারাণীরা মামলায় হেরে যাওয়ায় তাদের সর্বস্বান্ত হতে হয়। এমনকি ডিক্রিদার এসে তাদের বাড়ি থেকে পর্যন্ত উৎখাত করে দেয়। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে যখন অধিকাংশ মানুষই নিজের অসহায়তাকে ভাগ্যের পরিহাস বলে স্বীকার করে নেয়, রাধারাণীর মা সেই অবস্থাতেও ন্যায় বিচারের আশায় প্রিবি কাউন্সিলে আপিল করেন। এর থেকে অনুমান করা যায় রাধারাণীর মা মানসিকভাবে দৃঢ়।
সাহসী মনোবল – পরবর্তী পর্যায়ে রাধারাণীকে নিয়ে তার মা একটি কুটিরে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং শারীরিক পরিশ্রম করে উভয়ের আহারের ব্যবস্থা করেন। রাধারাণীর মায়ের যা অলংকার এবং নগদ অর্থ ছিল সবই মামলার খরচ চালানোর কাজে ব্যয় হয়েছিল। তাই তিনি একাদশ বয়সি বালিকা রাধারাণীর বিবাহ দিতে পারেননি। সমাজে অবস্থান করেও সামাজিক অনুশাসনকে অনুসরণ না করার মানসিক দৃঢ়তা তার সাহসী মনোবলের পরিচায়ক। প্রসঙ্গক্রমে আমরা এও জানতে পারি যে, রাধারাণীর অল্প হলেও লেখাপড়ার চর্চা ছিল। অর্থাৎ মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব তিনি অনুধাবন করেছিলেন।
বাস্তববোধ – রাধারাণী যখন অচেনা আগন্তুকের দান নিয়ে বিব্রত, দ্বিধান্বিত তখন রাধারাণীর মায়ের উক্তি – ‘আমরাও ভিখারি হইয়াছি, দান গ্রহণ করিয়া খরচ করি।’ – এর মাধ্যমে তাঁর বাস্তববোধসম্পন্ন সচেতন মানসিকতার ছবি পাওয়া যায়।
আত্মমর্যাদাবোধ – রাধারাণী যখন ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে একখানি নোট কুড়িয়ে পায় তখনও তার মায়ের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এই নোট সেই অচেনা ব্যক্তি তাঁদের জন্যই দিয়ে গিয়েছেন। রাধারাণী ও তার মা শ্রীরামপুর শহর এবং সন্নিহিত অঞ্চলে উক্ত নামের ব্যক্তির অনুসন্ধান করেও বিফল হয়েছিল। তারা চেয়েছিল নোটটি উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দিতে, কারণ তাদের অর্থের প্রয়োজন ছিল ঠিকই কিন্তু তারা লোভী নয়। এই আচরণের মধ্য দিয়ে একদিকে তাঁর আত্মমর্যাদাবোধ যেমন পরিস্ফুট হয় তেমনি তার মানবিক মূল্যবোধও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘রাধারাণী’ রচনাংশ অবলম্বনে পদ্মলোচন সাহার চরিত্র আলোচনা করো।
গল্প, উপন্যাস কিংবা নাটকের চরিত্রদের উপর নির্ভর করে সেই রচনার মূল উদ্দেশ্য এবং জনপ্রিয়তা। প্রধান চরিত্র বা মুখ্য চরিত্রগুলি যথাযথভাবে পরিস্ফুট হয় অপ্রধান কিংবা গৌণ চরিত্রগুলির উপযুক্ত উপস্থিতিতে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘রাধারাণী’ উপন্যাসে পদ্মলোচন সাহা এক অন্যতম উল্লেখযোগ্য গৌণ তথা অপ্রধান চরিত্র।
চরিত্র বিশ্লেষণ – পাঠ্যাংশের শেষ পর্বে পদ্মলোচন সাহার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। রুক্মিণীকুমার রাধারাণীর সঙ্গে কথোপকথন প্রসঙ্গে জানতে পারেন যে, তার একটি ছাড়া আর অতিরিক্ত কোনো পরনের কাপড় না থাকায় তাকে ভিজে কাপড়েই থাকতে হবে। এ কথা শুনে রুক্মিণীকুমার রায় পদ্মলোচন সাহার কাপড়ের দোকান থেকে নগদ মূল্যে রাধারাণীর জন্য কাপড় কিনে পদ্মলোচন সাহার হাত দিয়েই রাধারাণীর বাড়িতে পাঠান। এই ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, পদ্মলোচন সাহা রাধারাণীর বাড়িতে অতিপরিচিত ব্যক্তি ছিল। কিন্তু পদ্মলোচনের মধ্যে ব্যবসায়ীর ধুরন্ধর বুদ্ধি অতিমাত্রায় ছিল। সে চার টাকার কাপড় আট টাকা সাড়ে চোদ্দো আনায় বিক্রি করে যথেষ্ট মুনাফা রেখেছিল। রাধারাণীর পিতার সময় থেকেই পদ্মলোচন তাঁদের পরিবারে সুপরিচিত ব্যক্তি ছিল। কিন্তু পদ্মলোচনের অধিক মুনাফা লাভ করার মানসিকতার জন্য তাকে যে সবাই অপছন্দ করত তার উল্লেখ পাওয়া যায় রাধারাণীর ব্যবহৃত ‘পোড়ারমুখো, কাপুড়ে মিনসে’ – ইত্যাদি শব্দবন্ধে।
‘রাধারাণী’ রচনাংশ অবলম্বনে সেকালের সমাজজীবনের পরিচয় দাও।
ভূমিকা – সাহিত্য হল সমাজের দর্পণ। সাহিত্যের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজজীবন প্রতিফলিত হয়ে থাকে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘রাধারাণী’ উপন্যাসের মাধ্যমেও তৎকালীন সমাজের ছবি সুপরিস্ফুট।
অভিভাবকের ভূমিকা – তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজজীবনে পিতা তথা পুরুষ অভিভাবকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রাধারাণী সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর তাদের পারিবারিক অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে যায়। জ্ঞাতির ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তারা সর্বহারা হয় এবং মিথ্যে ডিক্রির বলে তারা ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হয়।
কন্যাবিবাহে অর্থব্যয় – রাধারাণীর মা প্রায় দশ লক্ষ টাকার সম্পত্তির যথাযথ মালিকানা পাওয়ার জন্য প্রিবি কাউন্সিলে আপিল করেন। এই কাজের জন্য তাঁর যথেষ্ট অর্থ ব্যয় হয়। সঞ্চিত অর্থ আর অলংকারাদি বিক্রি করে তিনি এই কাজ সম্পন্ন করেন। আর সেই কারণেই তিনি রাধারাণীর বিবাহ দিতে পারেন না। এর দ্বারা সহজেই অনুমান করা যায় যে, মেয়েদের বিয়ের জন্য যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করতে হত।
সমাজ ব্যক্তিত্ব – পদ্মলোচন সাহার মতো সুযোগসন্ধানী ধুরন্ধর ব্যক্তিরা সমাজে বর্তমান ছিল সে কথাও জানা যায়। আর এসবের পাশাপাশি রুক্মিণীকুমার রায়ের মতো পরোপকারী, সহৃদয় ব্যক্তির পরিচয়ও সমাজ তুলে ধরে।
তৎকালীন সমাজ আঙ্গিকে রথের মেলা এবং লৌকিক উৎসবের জনপ্রিয়তা বর্তমান ছিল সে-কথাও জানা যায় পাঠ্যাংশ থেকে।
‘মোকদ্দমাটি বিধবা হাইকোর্টে হারিল’ – কোন্ মোকদ্দমার কথা বলা হয়েছে? মোকদ্দমাটি হেরে বিধবার কী পরিণতি হয়েছিল?
অথবা, “প্রায় দশ লক্ষ টাকার সম্পত্তি; ডিক্রিদার সকলই লইল।” – প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ব্যাখ্যা করো।
প্রসঙ্গ – আলোচ্য উদ্ধৃতিটি সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘রাধারাণী’ উপন্যাস থেকে গৃহীত প্রথম পরিচ্ছেদের অংশ। রাধারাণীর পিতার মৃত্যুর পর প্রায় দশ লক্ষ টাকা নিয়ে একজন জ্ঞাতির সঙ্গে রাধারাণীর বিধবা মায়ের মোকদ্দমা শুরু হয়। হাইকোর্টের রায়ে বিধবা সর্বহারা হন এবং এই বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির দখল নেয় ডিক্রিদার।
ব্যাখ্যা – বাস্তবিক রাধারাণীরা সঙ্গতিসম্পন্ন এবং অবস্থাপন্ন বড়ো ঘরের মানুষ ছিলেন; কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর রাধারাণী ও তার বিধবা মা এক জ্ঞাতির সঙ্গে সম্পত্তির অধিকার নিয়ে মামলা-মোকদ্দমায় জড়িত হয়ে পড়ে। হাইকোর্টের রায়ে রাধারাণীর বিধবা মা সমস্ত সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, এমনকি বাড়ি থেকে তাদের উৎখাত করা হয়। মোকদ্দমা চালানোর খরচ ও ব্যয়বহন করার জন্য সঞ্চিত অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। নিজের গয়না বিক্রি করে রাধারাণীর মা সুবিচারের আশায় প্রিবি কাউন্সিলে একটি আপিল করেছিলেন। এই সমস্ত কারণে তাঁদের হতদরিদ্র অবস্থা হয়েছিল।
অসুস্থ মায়ের পথ্য জোগাড় করবার জন্য রাধারাণী কীর্প চেষ্টা করেছিল?
পথ্য সংগ্রহে রাধারাণীর চেষ্টা – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘রাধারাণী’ পাঠ্যাংশে দেখা যায় এক সঙ্গতিসম্পন্ন, অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তান রাধারাণী পিতার মৃত্যুর পর অবস্থার দুর্বিপাকে অত্যন্ত দারিদ্র্যের সম্মুখীন হয়। সুবিচার পাওয়ার আশায় রাধারাণীর মা তাঁর সঞ্চিত অর্থ ও গয়না বিক্রির অর্থ দিয়ে প্রিবি কাউন্সিলে আপিল করেন। কিন্তু তাদের আহারসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। একটি কুটিরে বিধবা মা রাধারাণীকে নিয়ে কঠিন শারীরিক পরিশ্রমে দিনযাপন করতে থাকে। কিন্তু রথের আগে অত্যন্ত অসুস্থ হওয়ায় রাধারাণীর মা আর কায়িক পরিশ্রম করতে পারেন না, ফলত রাধারাণীদের আহার একরকম বন্ধ হয়ে উপবাস চলতে থাকে। এমন অবস্থায় রাধারাণী ভাবে সে কতকগুলি বনফুল তুলে মালা গেঁথে রথের মেলায় মালা বিক্রি করে দু-এক পয়সা যা উপার্জন করতে পারবে তাই দিয়েই অসুস্থ মায়ের জন্য পথ্য জোগাড় করবে। অসুস্থ মায়ের পথ্য জোগাড় করবার জন্য রাধারাণী এইভাবেই চেষ্টা করেছিল। শেষপর্যন্ত রথের মেলায় এক অচেনা ব্যক্তি রাধারাণীর কাছ থেকে নগদ মূল্যে মালা কিনে নেয়। রাধারাণী যখন দেখে যে মালাটির প্রকৃত দামের চেয়ে বেশি দাম দেওয়া হয়েছে তখন সে তা ফেরত দিতে ঘরের বাইরে এসে দেখে যে আগন্তুক বাইরে নেই। তাই সেই দামের টাকা দিয়েই রাধারাণীর রথ দেখতে যাওয়ার উদ্দেশ্য সফল হয় অর্থাৎ সে মায়ের পথ্য কিনতে সক্ষম হয়।
“অগত্যা রাধারাণী কাঁদিতে কাঁদিতে ফিরিল” – রাধারাণী কোথা থেকে ফিরল? সে কাঁদছিল কেন?
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘রাধারাণী’ গদ্যাংশ থেকে উদ্ধৃতিটি সংকলিত। রথের পূর্বে রাধারাণীর মা গুরুতর পীড়িতা হলে রাধারাণী মায়ের পথ্য সংস্থানে কিছু বনফুল তুলে মালা গেঁথে মাহেশের রথের হাটে বিক্রি করতে গিয়েছিল। আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টিতে হাট ভেঙে গেলে রাধারাণী মালা বিক্রয়ে ব্যর্থ হয়ে অশ্রুসজল চোখে ভাঙাহাট থেকে বাড়ির পথে অগ্রসর হয়।
রাধারাণীর দুঃখমোচন – বনফুলের মালাটি মাহেশের রথের মেলায় বিক্রি করতে পারেনি রাধারাণী। বৃষ্টির কারণে রথের মেলা ভেঙে যায়। অন্ধকার কর্দমাক্ত পিছল পথে চলার সময় অকস্মাৎ এক অচেনা লোকের সঙ্গে রাধারাণীর সংঘর্ষ হয়। পরবর্তী অংশে রাধারাণীর বনফুলের মালাটি অচেনা লোক তথা আগন্তুক তার বাড়ির ঠাকুরের জন্য কিনে নিয়েছিলেন। এইভাবেই অচেনা আগন্তুক রাধারাণীর দুঃখমোচন করেন।
রথের মেলায় গিয়ে রাধারাণী যে পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল, তার বিস্তৃত বর্ণনা দাও।
অথবা, “তথাপি রাধারাণী সেই এক পয়সার বনফুলের মালা বুকে করিয়া রাখিয়াছিল” – ‘তথাপি’ শব্দটি প্রয়োগের কারণ ব্যাখ্যা করো। বনফুলের মালাটির শেষপর্যন্ত কী হয়েছিল লেখো।
‘তথাপি’ শব্দপ্রয়োগের ব্যাখ্যা – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘রাধারাণী’ পাঠ্যাংশের অন্তর্গত প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে ‘তথাপি’ শব্দটির প্রয়োগ তাৎপর্যপূর্ণ। অসুস্থ মায়ের পথ্য জোগাড় করার উদ্দেশ্যে কতগুলি বনফুল দিয়ে মালা গেঁথে মাহেশের রথের মেলায় মালা বিক্রি করার জন্য রাধারাণী রথের হাটে গিয়েছিল। রথের টান অর্ধেক হতে না হতেই প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। প্রথমদিকে রাধারাণী মনে করে বৃষ্টির কারণে সে একটু ভিজলেও বৃষ্টি থামলেই আবার লোক জমবে এবং রাধারাণী বনফুলের মালা বিক্রি করতে পারবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বৃষ্টি না থামার জন্য লোক জমে না অর্থাৎ মেলা বসে না। সন্ধ্যা-রাত গভীর হওয়াতে রাধারাণী বিফল-মনোরথ হয়ে কাঁদতে কাঁদতে কদর্মাক্ত পিছল পথ ধরে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করে। ঘন অন্ধকার, বৃষ্টির মুষলধারা এবং রাধারাণীর চোখের জল – সব মিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পিছল পথে আছাড় খেয়েও রাধারাণী বনফুলের মালা হাতছাড়া করেনি বরং আরও যত্নসহকারে আঁকড়ে রেখেছিল। পরিস্থিতির কঠোরতা বোঝানোর জন্য ‘তথাপি’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়েছে।
রাধারাণীর দুঃখমোচন – বনফুলের মালাটি মাহেশের রথের মেলায় বিক্রি করতে পারেনি রাধারাণী। বৃষ্টির কারণে রথের মেলা ভেঙে যায়। অন্ধকার কর্দমাক্ত পিছল পথে চলার সময় অকস্মাৎ এক অচেনা লোকের সঙ্গে রাধারাণীর সংঘর্ষ হয়। পরবর্তী অংশে রাধারাণীর বনফুলের মালাটি অচেনা লোক তথা আগন্তুক তার বাড়ির ঠাকুরের জন্য কিনে নিয়েছিলেন। এইভাবেই অচেনা আগন্তুক রাধারাণীর দুঃখমোচন করেন।
রথের মেলা থেকে ফিরে আসার পথে রাধারাণীর সঙ্গে কার সাক্ষাৎ ঘটেছে? উভয়ের কথোপকথন নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘রাধারাণী’ পাঠ্যাংশে রথের মেলা থেকে ফিরে আসার পথে রাধারাণীর সঙ্গে অচেনা আগন্তুক তথা রুক্মিণীকুমার রায়ের সাক্ষাৎ হয়েছিল।
কথোপকথন – অন্ধকার বৃষ্টির রাতে রাধারাণী রথের মেলা থেকে বিফল-মনোরথ হয়ে ফেরার পথে অকস্মাৎ তার ঘাড়ের ওপর অচেনা ব্যক্তি পড়ে যাওয়ায় রাধারাণী আরও তীব্রস্বরে কাঁদতে শুরু করে। এমন সময় সেই ব্যক্তি রাধারাণীর পরিচয় জানতে চান। রাধারাণী পুরুষ মানুষটির দয়ালু। কণ্ঠস্বর শুনে বুঝতে পারে ব্যক্তিটি অসৎ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আসেনি। এরপর রাধারাণী আরও জানায় সে দুঃখী লোকের মেয়ে, মা ভিন্ন তার আর কেউ নেই। তখন অচেনা ব্যক্তি তথা রুক্মিণীকুমার রায় জানান যে, তিনিও শ্রীরামপুর যাবেন তাই তিনি রাধারাণীকে তাঁর সঙ্গেই আসতে বলেন এবং রাধারাণী যাতে অন্ধকারে পিছল পথে পড়ে না যায় তাই তাঁর হাত ধরতে বলেন। এই সময়ে তিনি বুঝতে পারেন যে, রাধারাণী নিতান্ত এক বালিকা, তাই তার একাকী মেলায় আসার কারণ জানার প্রসঙ্গে রাধারাণীর মায়ের অসুস্থতার কথা এবং বনফুলের মালা বিক্রি করে পথ্য জোগাড় করার বাসনার কথাও জানতে পারেন। এইভাবেই তিনি রাধারাণীর অবস্থার কথা জানতে পারেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে রাধারাণীর জন্য নিঃস্বার্থভাবে উপকার করেন।
“রাধারাণীর আনন্দ হইল, কিন্তু মনে ভাবিল যে” – রাধারাণীর মনে আনন্দ কেন হয়েছিল? মনে কী ভাবনাই বা হয়েছিল এবং সেইরূপ ভাবনার কারণ কী ছিল?
আনন্দের কারণ – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘রাধারাণী’ পাঠ্যাংশে দেখা যায়, অসুস্থ মায়ের পথ্য জোগাড় করবার জন্য রাধারাণী মাহেশের রথের মেলায় বনফুলের মালা বিক্রি করতে গিয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টির জন্য মেলা-জমে ওঠার আগেই ভেঙে যাওয়ায় তার মালা বিক্রি হয়নি। মালা বিক্রি না হওয়ায় পয়সা জোগাড় করতে পারেনি রাধারাণী। তাই মায়ের পথ্য কীরূপে কিনবে এমন ভাবনায় যখন রাধারাণী চিন্তিত তখন এক অচেনা আগন্তুক, রাধারাণীর বনফুলের মালা কিনতে চেয়ে আগ্রহ প্রকাশ করায় রাধারাণীর মনে আনন্দ হয়েছিল। দ্বিধাগ্রস্ত রাধারাণী মায়ের অসুস্থতা আর তাদের অসহায়তার কথা ভেবে শেষপর্যন্ত অচেনা ব্যক্তিটির থেকে মালা বিক্রির দাম নিতে সম্মত হয়েছিল।
ভাবনা ও তার কারণ – রাধারাণীর কাছে আগন্তুক বনফুলের মালা কিনতে চেয়ে আগ্রহ প্রকাশ করায় রাধারাণীর আনন্দ হয়। রাধারাণী মালা বিক্রির পয়সা দিয়ে মায়ের জন্য পথ্য জোগাড় করতে পারবে এমন চিন্তা করে খুশি হয়। কিন্তু পরমুহূর্তেই রাধারাণীর মনে ভাবনা হয় এই অচেনা আগন্তুকের কাছে সে বনফুলের মালা বিক্রি করে দাম নেবে কীভাবে? রাধারাণীর এমন ভাবনার কারণ হল – বৃষ্টির মধ্যে অন্ধকার রাতে পিচ্ছিল কর্দমাক্ত পথে রাধারাণী যখন আছাড় খেতে খেতে বাড়ির পথে আসার চেষ্টা করছিল, তখন এই অচেনা লোকটি যত্ন করে হাত ধরে অন্ধকারে তার বাড়ি ফেরার জন্য সাহায্য করেছিল। তার বিপদে যে ব্যক্তি উপকার করেছে তার কাছে বনফুলের মালার দাম রাধারাণী কী করে গ্রহণ করবে? কিন্তু মালার দাম গ্রহণ না করলে অসুস্থ মায়ের পথ্যের জোগাড় করা অসম্ভব। দ্বিধাগ্রস্ত রাধারাণী মায়ের অসুস্থতা আর তাদের অসহায়তার কথা ভেবে শেষপর্যন্ত অচেনা ব্যক্তিটির থেকে মালা বিক্রির দাম নিতে সম্মত হয়েছিল।
“তুমি ঘরে আসিয়া দাঁড়াও” – বক্তা কে? কার উদ্দেশে এ কথা বলা হয়েছে? ঘরে দাঁড়াতে বলার কারণ কী ছিল?
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘রাধারাণী’ পাঠ্যাংশ থেকে গৃহীত উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা রাধারাণী স্বয়ং।
মাহেশের রথের মেলা থেকে ফেরার পথে দুর্যোগের মধ্যে হঠাৎ পরিচিত হওয়া অচেনা ব্যক্তির উদ্দেশে রাধারাণী উক্তিটি করেছে।
দাঁড়াতে বলার কারণ – মাহেশের রথের মেলায় বনফুলের মালা বিক্রি করার উদ্দেশে রাধারাণী গিয়েছিল, কিন্তু বৃষ্টির কারণে মেলা তেমনভাবে না জমায় রাধারাণী মালা বিক্রি করতে পারেনি। মালা বিক্রি না হওয়ায় অসুস্থ মায়ের জন্য পথ্য কী উপায়ে জোগাড় করবে এমন ভাবনায় যখন রাধারাণী অসহায়ের মতো বৃষ্টিভেজা অন্ধকার পথে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছে, তখন অন্ধকারে এক ব্যক্তি তার ঘাড়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এই অবস্থায় রাধারাণী ভয়ে ও আতঙ্কে চিৎকার করে কান্না শুরু করলে আগন্তুক তাকে আশ্বস্ত করে। তিনিই হাত ধরে তাকে বাড়ির পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। কথাপ্রসঙ্গে অচেনা লোকটি রাধারাণীর মেলায় আসার কারণ এবং বনফুলের মালার কথা জেনে তার বাড়ির ঠাকুরের জন্য মালাটি কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে। রাধারাণী একটু দ্বিধান্বিত হয়ে মালাটি ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে। দাম হিসেবে পয়সা গ্রহণ করতে গিয়ে রাধারাণীর মনে হয় যে, তাকে সম্ভবত টাকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু অচেনা লোকটি রাধারাণীকে জানায় কলের নতুন পয়সা বলেই তা চকচক করছে এবং বড়ো বলে মনে হচ্ছে। তবু রাধারাণীর সন্দেহ কমে না। অন্ধকার থাকায় ভালো দেখা না যাওয়ার কারণে এই সমস্যা হয়। তাই রাধারাণী আগন্তুককে জানায় বাড়ি গিয়ে আলো জ্বেলে সে দেখে নেবে যে, পয়সা মনে করে ভুল করে টাকা দিয়ে দেওয়া হয়েছে কি না; আর যদি সত্যিই তা টাকা হয় তাহলে রাধারাণী তা ফিরিয়ে দেবে। এই কারণেই ব্যক্তিকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল।
“রাধারাণী বড়োঘরের মেয়ে, একটু অক্ষর পরিচয় ছিল।” – রাধারাণী কি সত্যিই বড়ো ঘরের মেয়ে ছিল? তার যে অক্ষরপরিচয় ছিল, তা আমরা কীভাবে জানতে পারি?
সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘রাধারাণী’ উপন্যাসের অন্তর্গত ‘রাধারাণী’ পাঠ্যাংশের প্রধান চরিত্র রাধারাণী। রাধারাণীর বাবা যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন তাদের কোনো আর্থিক দুরবস্থা ছিল না। পাঠ্যাংশ থেকেই জানা যায় যে, রাধারাণীদের সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় দশ লক্ষ টাকার মতো। আর্থিক দিক বিবেচনা করলে সে সত্যিই বড়ো অর্থাৎ ধনী ঘরের মেয়ে।
বড়ো ঘরের মানুষ মেয়ে রাধারাণী – বিপরীত দিক থেকে ‘বড়ো’ অর্থে যদি মহানুভব, উদার, নির্লোভ বোঝায় তাহলে রাধারাণী ও তার মা উভয়েই উক্ত মানসিকতার। তাই রাধারাণীকে সত্যিই বড়ো ঘরের মেয়ে বলা যায়।
তার অক্ষরপরিচয় – রাধারাণীর অক্ষরপরিচয় ছিল। রুক্মিণীকুমার রাধারাণীর কুটিরে একটি নোট ফেলে রেখে দিয়েছিলেন, যাতে ‘রুক্মিণীকুমার রায়’ নাম লেখা ছিল। রাধারাণী যখন তার অসুস্থ মা-কে খেতে দেবে বলে ঘর ঝাঁট দিতে যায় তখন কাগজ মনে করে রাধারাণী তা তুলে নিয়ে মায়ের কাছে নিয়ে গেলে তার মা বলেন নোটে তার নামই লেখা আছে। রাধারাণী সেই নাম পড়ে এবং এর থেকেই বোঝা যায় যে, রাধারাণীর অক্ষরপরিচয় ছিল।
“তাহারা দরিদ্র, কিন্তু লোভী নহে” – তাৎপর্য লেখো।
আলোচ্য উদ্ধৃতিটি সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘রাধারাণী’ উপন্যাসের অন্তর্গত প্রথম পরিচ্ছেদ থেকে গৃহীত।
তাৎপর্য ব্যাখ্যা – পিতার অকস্মিক মৃত্যুতে সহায়-সম্বলহীনা রাধারাণী ও তার মা সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলায় পরাজিত ও সর্বস্বান্ত হয়ে, ভিটেমাটি ছেড়ে এক নিতান্ত কুটিরে নিদারুণ দারিদ্র্যে দিনযাপন করতে থাকে। রথের পূর্বে রাধারাণীর মা গুরতর পীড়িতা হলে তার পথ্যের সংস্থানে রাধারাণী বনফুলের মালা গেঁথে মাহেশের রথের হাটে বিক্রয় করতে যায়। কিন্তু প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতে হাট ভেঙে যায়। মালা বিক্রয়ে ব্যর্থমনোরথ হয়ে রাধারাণী যখন অশ্রুসজল চোখে বাড়ির দিকে অগ্রসর হয়, তখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে এক আগন্তুকের।
অচেনা সেই আগন্তুক রাধারাণীর সঙ্গে কথোপকথনকালে তার অসহায়তার কথা জেনে মালা কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে। রাধারাণী দ্বিধাগ্রস্ত হয় উপকারী সেই ব্যক্তির কাছ থেকে দাম গ্রহণে। শুধু তাই নয়, সেই ব্যক্তি দয়াপরবশ হয়ে মালার নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করেন। রাধারাণীর জন্য শাড়ি কিনে পাঠান এমনকি একটা নোটও ফেলে যান তাদের বাড়িতে। এই সমস্তই তিনি সচেতনভাবে করেন যাতে রাধারাণীর উপকার হয়। তাঁর দেওয়া দানে যথার্থই রাধারাণীর উপকার হয়। রাধারাণী অসুস্থ মায়ের জন্য পথ্য জোগাড় করতে পারে, প্রদীপ জ্বালার জন্য তেলও কিনতে পারে। কিন্তু তাঁর দেওয়া নোটটি তারা ভাঙায় না। পরবর্তীকালে রাধারাণী ও তার মা শ্রীরামপুর ও তার নিকটবর্তী স্থানে রুক্মিণীকুমার রায়ের বহু সন্ধান করে, কিন্তু এই নামের কারোর সন্ধানই পায় না। তারা তখন নোটটি যত্ন করে তুলে রাখেন। অর্থের প্রয়োজন তাঁদের ছিল ঠিকই কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত নয়। তারা বর্তমানে দরিদ্র, অসহায় বলেই রুক্মিণীকুমারের দান গ্রহণ করেছে আর সেই দানে তাদের সমস্যার সমাধানও হয়েছে। অতিরিক্ত অর্থের প্রতি তাদের কোনো লোভ ছিল না বলেই সেই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য তারা তাঁর সন্ধান করেছিল।
“রাধারাণী নামে এক বালিকা মাহেশে রথ দেখিতে গিয়াছিল।” — রাধারাণীর মাহেশে রথ দেখতে যাওয়ার কারণ কী ছিল? সেখানে তার কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল?
রথ দেখতে যাওয়ার কারণ – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাধারাণী গল্পাংশের প্রধান চরিত্র রাধারাণী ছিল এগারো বছরেরও কমবয়সি একটি মেয়ে। জ্ঞাতির সঙ্গে মোকদ্দমায় বিপুল সম্পত্তি বেহাত হওয়ার পরে রাধারাণীর বিধবা মা একটা কুটিরে আশ্রয় নিয়ে শারীরিক পরিশ্রম করে পেটের ভাত জোগাড় করতেন। কিন্তু হঠাৎ তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় রাধারাণীদের দিন চলা দায় হয়। রাধারাণীকে উপোস করতে হয়। কিন্তু রথের দিন তার মায়ের অসুখ বেড়ে গেলে পথ্যের প্রয়োজন হয়। এই পথ্য জোগাড়ের জন্য রাধারাণী বন থেকে ফুল তুলে এনে একটি মালা গাঁথে। মালাটি বিক্রি করে মায়ের পথ্য জোগাড় করার জন্যই রাধারাণী মাহেশে রথের মেলায় যায়।
রাধারাণীর অভিজ্ঞতা – প্রবল বৃষ্টির কারণে মেলা অসময়ে ভেঙে যাওয়ায় রাধারাণীর মালা বিক্রি হয় না। রাধারাণী যখন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরছিল, তখনই অন্ধকার পথে তার ঘাড়ের উপর একটি লোক এসে পড়ে। রাধারাণী ভয়ে উচ্চস্বরে কেঁদে ওঠে। অচেনা পথিক রাধারাণীর পরিচয় জানতে চায়। লোকটির গলার আওয়াজেই তার দয়ালু স্বভাব উপলব্ধি করে রাধারাণী। এরপরে রাধারাণীর হাত ধরে সেই অন্ধকার পিছল পথে লোকটি তাকে বাড়ি পৌঁছোতে সাহায্য করে এবং তার রথের মেলায় যাওয়ার কারণ শুনে মালাটি কিনে নেয়।
“মোকদ্দমাটি বিধবা হাইকোর্টে হারিল।” — এই বিধবার পরিচয় দিয়ে তার পরিণতি কী হল সংক্ষেপে লেখো।
বিধবার পরিচয় – রাধারাণী গল্পে রাধারাণীর মা ছিলেন এক অবস্থাপন্ন পরিবারের বউ।
মোকদ্দমায় পরাজয় এবং তার তাৎক্ষণিক ফল – কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পরে একজন জ্ঞাতির সঙ্গে তার মোকদ্দমা হয়। হাইকোর্টে হেরে যাওয়ার পরে রাধারাণীর মাকে সর্বস্ব হারাতে হয়। ডিক্রিদার সেই জ্ঞাতি ডিক্রি জারি করে তাঁকে ভিটে থেকেও উচ্ছেদ করে দেন। প্রায় দশ লক্ষ টাকার সম্পত্তি বেহাত হয়ে যায়। নগদ যা ছিল তা-ও ব্যয় হয়ে যায় মামলার খরচ জোগাতে। অলংকার ইত্যাদি বিক্রি করে রাধারাণীর মা প্রিভি কাউন্সিলে আপিল করে।
পরিণতি – এইসব মামলা-মোকদ্দমার কারণে রাধারাণীর মা নিঃস্ব হয়ে পড়েন। তাঁর খাবার জোগারের ব্যবস্থা থাকে না। বিধবা একটা কুটিরে আশ্রয় নিয়ে কোনো রকমে শারীরিক পরিশ্রম করে দিন কাটাতে থাকেন। দারিদ্র্যের কারণে রাধারাণীর বিয়ে দিতে পারেন না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত রথের আগে রাধারাণীর মা ঘোরতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে শারীরিক পরিশ্রম করার ক্ষমতাও হারান। খাবার জোগারের ব্যবস্থা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। আর রাধারাণীকে ভাবতে হয় মায়ের পথ্যের জোগাড় হবে কোথা থেকে।
“রাধারাণীর বিবাহ দিতে পারিল না।” — রাধারাণীর পরিচয় দাও। কে কেন তার বিবাহ দিতে পারেনি?
রাধারাণীর পরিচয় – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাধারাণী রচনাংশে রাধারাণী ছিল একটি মেয়ে, যার বয়স এগারো বছরও পূর্ণ হয়নি। বড়োলোকের মেয়ে হলেও তাদের অবস্থা ভালো ছিল না। সর্বোপরি রাধারাণীর বাবাও বেঁচে ছিলেন না।
বিবাহ না দিতে পারার কারণ – রাধারাণীর মা রাধারাণীর বিয়ে দিতে পারেননি। এককালে অবস্থাপন্ন হলেও রাধারাণীর পরিবার ক্রমশ নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল। একজন জ্ঞাতির সঙ্গে সম্পত্তির অধিকার নিয়ে রাধারাণীর মার মোকদ্দমা হয়, এবং হাইকোর্টে তিনি হেরে যান। তার ফলে তাদের বাস্তুভিটে থেকে উচ্ছেদ করা হয় এবং দশ লক্ষ টাকার সম্পত্তি বেহাত হয়ে যায়। নগদ যেটুকু ছিল সেটুকুও খরচ ও ওয়াশিলাত (ক্ষতিপূরণ) দিতে চলে যায়। রাধারাণীর মা অলংকার ইত্যাদি বিক্রি করে প্রিভি কাউন্সিলে আপিল করেন। কিন্তু সর্বস্ব হারিয়ে তাঁদের খাবার জোগাড়ের অবস্থাও থাকে না। রাধারাণীর বিধবা মা একটি কুটিরে আশ্রয় নিয়ে শারীরিক পরিশ্রমের দ্বারা দিন কাটাতে থাকেন। কিন্তু এই তীব্র দারিদ্র্যের কারণে রাধারাণীর মা রাধারাণীর বিয়ে দিতে পারেননি।
“অগত্যা রাধারাণী কাঁদিতে কাঁদিতে ফিরিল।” — রাধারাণী কোথা থেকে ফিরল? সে কাঁদছিল কেন?
উদ্দিষ্ট স্থান – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাধারাণী রচনাংশে রাধারাণী নামের মেয়েটি মাহেশের রথের মেলা থেকে ফিরছিল।
রাধারাণীর কাঁদার কারণ – পথ্যসংগ্রহের প্রচেষ্টা – রাধারাণী তার অসুস্থ মার জন্য পথ্যসংগ্রহের উদ্দেশ্যে বনফুলের একটি মালা গেঁথে সেটি বিক্রি করার জন্য রথের মেলায় গিয়েছিল। ব্যর্থতা ও পুনঃপ্রচেষ্টা – কিন্তু রথের দড়ি অর্ধেক টানার পরেই বৃষ্টি আরম্ভ হয়। বৃষ্টিতে মেলা ভেঙে যাওয়ার ফলে তার মালা কেউ কেনে না। রাধারাণী মনে মনে ভেবেছিল যে বৃষ্টি কিছুটা থামলে হয়তো আবার মেলা জমবে। তাই সে বৃষ্টিতে ভিজেই অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু বৃষ্টি থামে না। ফলে মেলায় লোকের ভিড়ও হয় না। হতাশাজনক
পরিণতি – সন্ধ্যা পার হয়ে রাত হয়। চারপাশে অন্ধকার নেমে আসে। কাদাময় পিছল পথে কোনো কিছুই দেখা যায় না। মায়ের অসুস্থতা, খাদ্যের অভাব ইত্যাদির কথা ভেবে রাধারাণী দুশ্চিন্তা ও হতাশায় কাতর হয়ে পড়ে। প্রবল অসহায়তা থেকেই সে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির পথে ফিরতে থাকে।
“কিন্তু কণ্ঠস্বর শুনিয়া রাধারাণীর রোদন বন্ধ হইল।” — রাধারাণী কেন কেঁদেছিল এবং তা বন্ধই বা হয়েছিল কেন? গল্পের কাহিনি অবলম্বনে আলোচনা করো।
আলোচ্য অংশটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাধারাণী রচনাংশ থেকে নেওয়া।
রাধারাণীর কাঁদার কারণ – রাধারাণী রথের মেলায় গিয়েছিল ফুলের মালা বিক্রি করে মায়ের জন্য পথ্য জোগাড় করতে। কিন্তু প্রবল বৃষ্টিতে মেলা ভেঙে যাওয়ায় তার মালা বিক্রি করা হয়নি। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে অপেক্ষা করলেও বৃষ্টি থামেনি, রথের মেলাও আর জমেনি। এইভাবে সন্ধ্যা নামে, রাত্রি হয় — রাধারাণীর হতাশাও বেড়ে যায়। সে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির পথ ধরে।
কান্না বন্ধ হওয়ার কারণ – অন্ধকার কাদামাখা পথ ধরে রাধারাণী যখন তীব্র হতাশায় কাঁদতে কাঁদতে পিছল পথে বাড়ির দিকে ফিরছিল, তখন সে প্রায়শই আছাড় খেয়ে পড়ছিল। তবুও বুকে ধরে রেখেছিল তার সেই বিক্রি না হওয়া ফুলের মালা। সেই সময় হঠাৎই তার ঘাড়ের উপরে কেউ একজন এসে পড়ে। ব্যক্তিটি রাধারাণীর পরিচয় জানতে চায়। যদিও সেই পুরুষমানুষটি তার অচেনা, তা সত্ত্বেও তার গলার আওয়াজের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিটির দয়ালু স্বভাবকে রাধারাণী উপলব্ধি করতে পারে। এই কারণে তার কান্না বন্ধ হয়ে যায়।
“তুমি ঘরে আসিয়া দাঁড়াও, আমরা আলো জ্বালিয়া দেখি, টাকা কী পয়সা।” – বক্তা কখন এই মন্তব্য করেছে? আলো জ্বালার পরের ঘটনা উল্লেখ করো।
প্রসঙ্গ – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাধারাণী গল্পাংশে রাধারাণীর কাছে তার ফুলের মালার যাবতীয় কথা শুনে পথিক ভদ্রলোকটি সদয় হয় এবং বাড়ির বিগ্রহকে পরানোর জন্য মালাটি কিনে নিতে চায়। রাধারাণী দ্বিধা সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত মালাটি বিক্রি করে। পথিক ভদ্রলোকটি মালার দাম হিসেবে চার পয়সা দেয়। সেই পয়সা হাতে নিয়ে রাধারাণীর বেশ বড়ো লাগে; টাকা বলে মনে হয়। কিন্তু পথিক “ডবল পয়সা” বলে রাধারাণীকে আশ্বস্ত করে। রাধারাণী এতে সম্পূর্ণ ভরসা করতে পারেনি। তাই সে নিজের কুটিরের দরজায় উপস্থিত হয়ে পথিককে অপেক্ষা করতে বলে। উদ্দেশ্য ছিল, প্রদীপের আলো জ্বেলে মুদ্রাগুলি পরীক্ষা করা।
পরবর্তী ঘটনা – ঘরে তেল না থাকায় রাধারাণী চালের খড় টেনে তাতে চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালায় এবং দেখে যে তার অনুমানই ঠিক। মালার মূল্য হিসেবে তাকে টাকা দেওয়া হয়েছে, পয়সা নয়। রাধারাণী বাইরে এসে পথিকের খোঁজ করে। কিন্তু দেখে যে, সেই ব্যক্তি চলে গিয়েছে। মায়ের কাছে রাধারাণী তার কী করা উচিত জানতে চাইলে রাধারাণীর মা বলেন যে, দাতা ব্যক্তি তাদের দুঃখ শুনে দান করেছে, তাই তারা সেটা গ্রহণ করবে।
“আমরাও ভিখারি হইয়াছি, দান গ্রহণ করিয়া খরচ করি।” — বক্তার এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপট গল্পাংশ অবলম্বনে আলোচনা করো।
রাধারাণীদের নিঃস্ব হয়ে যাওয়া – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাধারাণী গল্পাংশে রাধারাণীর মা এই উক্তিটি করেছেন। রাধারাণীর পরিবার একসময় খুবই সম্পন্ন ছিল। কিন্তু রাধারাণীর বাবার মৃত্যুর পরে এক জ্ঞাতির সঙ্গে সম্পত্তি সম্পর্কিত বিবাদে জড়িয়ে গিয়ে, হাইকোর্টে হেরে মামলার খরচ ও ওয়াশিলাত দিতে, প্রিভি কাউন্সিলে আবেদন করতে রাধারাণীর মা নিঃস্ব হয়ে যান। রাধারাণীর মা একটা কুটিরে আশ্রয় নিয়ে শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে দিন কাটাতে থাকেন।
বনফুলের মালা বিক্রি করতে যাওয়া – মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাদের অবস্থা আরও খারাপ হয়। উপোস করে দিন কাটানো শুরু হয়। অসুস্থ মায়ের পথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রাধারাণী বনফুলের মালা গেঁথে রথের মেলায় বিক্রি করতে গেলেও বৃষ্টিতে মেলা ভেঙে যাওয়ায় তার মালা বিক্রি হয়নি।
পথিকের মালা কেনা ও পরবর্তী ঘটনা – মেলা থেকে ফেরার পথে এক পথিক সব শুনে চার পয়সায় মালাটি কিনে নেয়। কিন্তু বাড়ি ফিরে পথিককে বাইরে দাঁড়াতে বলে সে আগুন জ্বালিয়ে যখন দেখে তাকে পয়সার বদলে টাকা দেওয়া হয়েছে, তখন বাইরে বেরিয়ে সে পথিককে খুঁজে পায় না। বিভ্রান্ত হয়ে রাধারাণী তার মায়ের কাছে পরামর্শ চাইলে মা বলেন: “আমরাও ভিখারি হইয়াছি, দান গ্রহণকরিয়া খরচ করি।” অর্থাৎ, দাতা স্বেচ্ছায় অর্থ দিয়েছেন এবং দরিদ্র বলেই তাদের তা গ্রহণ করে খরচ করা ছাড়া অন্য উপায় নেই।
“নোটখানি তাহারা ভাঙাইল না — তুলিয়া রাখিল — তাহারা দরিদ্র, কিন্তু লোভী নহে।” — মন্তব্যটির তাৎপর্য গল্পাংশ অবলম্বনে আলোচনা করো।
পথ্যসংগ্রহের চেষ্টা – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাধারাণী গল্পাংশে রাধারাণীর মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় এগারো বছরেরও কমবয়সি পিতৃহীন রাধারাণীকে মায়ের পথ্য সংগ্রহের জন্য ফুলের মালা গেঁথে তা রথের হাটে বিক্রির জন্য যেতে হয়।
সাহায্যকারী পথিক – প্রবল বৃষ্টির কারণে মালা বিক্রি না হলে এক পথিক (রুক্মিণীকুমার রায়) তার সাহায্যকারীর ভূমিকায় উপস্থিত হন। তিনি শুধু মালাটি কিনে নেন তা-ই নয়, চার পয়সার বদলে দুটি টাকা দেন। পরদিন পদ্মলোচন নামে এক কাপড় ব্যবসায়ীর মাধ্যমে তিনি আরও দুটি মূল্যবান কাপড় পাঠান।
নোট প্রাপ্তি ও তা ফেরতের চেষ্টা – কিছুদিন পরে রাধারাণী ঘর ঝাঁট দিতে গিয়ে একটি নোট (টাকার চেক/হুণ্ডি) পায়। নোটটি ছিল রুক্মিণীকুমারের পাঠানো আরও আর্থিক সাহায্য। রাধারাণী ও তার মা নোটটি ভাঙাননি (অর্থাৎ টাকা তুলেননি), বরং ফেরত দেবার জন্য রুক্মিণীকুমারকে অনেক খুঁজেছিলেন। তাঁকে না পেয়ে নোটটি তুলে রাখেন।
ঘটনার তাৎপর্য – এই ঘটনা প্রমাণ করে দারিদ্র্য রাধারাণীর পরিবারের সততা ও নির্লোভ মানসিকতা কেড়ে নিতে পারেনি। তারা অভাবগ্রস্ত হলেও পরের সম্পদ লোভ করেনি। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাহায্য তারা গ্রহণ করতে পারেনি, যা তাদের চরিত্রের মহত্ত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধকে তুলে ধরে।
রাধারাণী গল্পাংশে রাধারাণীর চরিত্রকে যেভাবে পাওয়া যায় তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো।
বঙ্কিমচন্দ্রের রাধারাণী গল্পাংশের নামকরণই কাহিনিতে রাধারাণী চরিত্রের গুরুত্বকে বুঝিয়ে দেয়। রাধারাণী চরিত্রের যে বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখযোগ্যভাবে চোখে পড়ে —
দায়িত্ববোধ – বয়সের তুলনায় রাধারাণী ছিল অত্যন্ত দায়িত্ববোধসম্পন্ন। তাই অসুস্থ মায়ের পথ্যের অর্থসংগ্রহের জন্য মালা গেঁথে একা-একাই সে সেই মালা রথের মেলায় বিক্রি করতে গিয়েছিল।
মাতৃভক্তি – মায়ের পথ্যের জন্য মালা বেচতে যাওয়া শুধু রাধারাণীর দায়িত্ববোধেরই নয়, তার মাতৃভক্তিরও পরিচায়ক। দ্বিধা সত্ত্বেও মায়ের কথাতেই সে রুক্মিণীকুমারের কাছে মালা বিক্রি করে পাওয়া অতিরিক্ত অর্থগ্রহণে রাজি হয়।
নীতিবোধ ও সততা – তার নৈতিকতাবোধের জন্যই রুক্মিণীকুমারের রেখে যাওয়া নোটটিও রাধারাণী ভাঙেনি; সৎ বলেই তা ফেরত দেওয়ার কথা ভাবে।
বিবেচনাবোধ – অন্ধকারে হাত ধরে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসা সেই উপকারী মানুষটির কাছ থেকে মালার দাম নেওয়া উচিত হবে কিনা তা নিয়ে রাধারাণীর যে সংশয়, তা তার কৃতজ্ঞতাবোধেরই পরিচায়ক।
সেবাপরায়ণতা – বাজারে যাওয়া, তেল আনা, রান্না করা, মাকে খেতে দেওয়া, ঘর পরিষ্কার করা — রাধারাণীর এইসব কাজকর্ম থেকে বোঝা যায় ঘরের কাজে এবং সেবাযত্নেও সে যথেষ্ট দক্ষ ছিল। এভাবেই রাধারাণী নিজ চরিত্রগুণে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
রাধারাণী গল্পাংশের পথিক চরিত্রটি আলোচনা করো।
বঙ্কিমচন্দ্রের রাধারাণী গল্পাংশের শেষে জানা যায়, পথিকের নাম রুক্মিণীকুমার। বৃষ্টিতে পণ্ড হয়ে যাওয়া রথের মেলা থেকে ফেরার পথে রাধারাণীর সঙ্গে তার আলাপ। তার চরিত্রের যে বিশেষত্বগুলি আমাদের চোখে পড়ে, সেগুলি হল —
দয়ালু ও পরোপকারী – পথিকটি বৃষ্টিভেজা, অন্ধকার, পিছল পথে রাধারাণীকে হাত ধরে বাড়ি পৌঁছে দেয়। রাধারাণীর প্রয়োজন ও তার বিক্রি না হওয়া মালার কথা শুনে পথিক সেই মালাটিও কিনে নেয়। শুধু তাই নয়, মূল্য হিসেবে পয়সার বদলে তাকে টাকা দেয়। রাধারাণীর পরার আর কাপড় নেই শুনে পদ্মলোচন সাহার দোকানে কাপড়ের দাম দিয়ে, তা রাধারাণীকে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশও দিয়ে যায় সেই পথিক। এসবই তার পরোপকারী, উদারমনা স্বভাবকে স্পষ্ট করে।
আত্মপ্রচারবিমুখ – রুক্মিণীকুমার উপকার করলেও সে কখনোই তা সরাসরি জানতে দেয়নি। এমনকি রাধারাণীদের আর্থিক অবস্থার কথা জানতে পেরে সবার অজান্তেই তার ঘরে নোটখানি রেখে গেছে।
বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন – রুক্মিণীকুমার ছিল বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন। তাই রাধারাণীর ঘরে ফেলে যাওয়া নোটটিকে কেউ যেন চোরাই নোট বলতে না পারে, সেজন্য তাতে দাতা ও প্রাপকের নাম লিখে রেখে যান।
রাধারাণী গল্পাংশে রাধারাণী চরিত্রটি পথিকের দ্বারা যে যে ভাবে উপকৃত হয়েছে তা নিজের ভাষায় লেখো।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাধারাণী গল্পাংশে রাধারাণীর অসহায়তা এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত পথিক চরিত্রটি প্রবলভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনভাবে এই সাহায্যের চেষ্টা লক্ষ করা যায় —
পথপ্রদর্শন ও নিরাপত্তাদান – প্রবল বৃষ্টিতে মেলা পণ্ড হয়ে রাধারাণী যখন একা অন্ধকার পথে ফিরছিল, তখনই তার সঙ্গে পথিকের আলাপ হয়। ভীতসন্ত্রস্ত রাধারাণীকে আশ্বস্ত করে, তার হাত ধরে তাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেয় সে।
অর্থসাহায্য – রাধারাণীর কাছে তার দুরবস্থা এবং মালা বিক্রি না করতে পারার কথা জেনে পথিক মালাটি চার পয়সায় কিনে নেয় এবং অন্ধকারে পয়সার বদলে তাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করে। উপরন্তু সে একটি নোট রাধারাণীর ঘরের মেঝেতে ফেলে যায়, যা রাধারাণী ঘর ঝাঁট দিতে গিয়ে উদ্ধার করে।
বস্ত্রসাহায্য – রাধারাণীর কাছেই তার কাপড়ের অভাবের কথা শুনে চলে যাওয়ার সময়ে পথিকটি কাপড়ের ব্যবসায়ী পদ্মলোচন সাহার দোকানে একজোড়া শান্তিপুরি কাপড়ের দাম মিটিয়ে তা রাধারাণীদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
এইভাবে একাধিক উপায়ে পথিক ভদ্রলোক (নোটে লেখা নাম থেকে যার নাম জানা যায় রুক্মিণীকুমার রায়) রাধারাণীকে সাহায্য করতে উদ্যোগী হয়েছে।
রাধারাণী রচনাংশ অবলম্বনে সেকালের সমাজজীবনের পরিচয় দাও।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাধারাণী রচনাংশটি কোনো সামাজিক সমস্যা ও সংকটকে অবলম্বন করে রচিত না হলেও কাহিনির প্রেক্ষাপটে সমাজ উঁকি দিয়েছে বারেবারেই।
সম্পত্তিজনিত বিবাদ – রাধারাণীর মায়ের নিঃস্ব হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ কিংবা মামলা-মোকদ্দমা তখন যথেষ্টই ছিল।
গ্রামবাংলার ছবি – রথের মেলা উপলক্ষ্যে লোকের ভিড় গ্রামবাংলারই জীবন্ত ছবি।
দরিদ্রতা – দারিদ্র্য কত কষ্টকর হতে পারে তার পরিচয় পাওয়া যায়, যখন রাধারাণীদের খাবার জোটে না কিংবা রাধারাণী জানায় তার দুটি ভিন্ন কাপড় নেই, ভিজে কাপড়ে থাকতেই সে অভ্যস্ত।
অসৎ ব্যবসাবৃত্তি – কাপড়ের ব্যবসায়ী পদ্মলোচন সাহা অসৎ ব্যবসাবৃত্তির প্রতীক, যে চার টাকার কাপড় আট টাকা সাড়ে চোদ্দো আনায় বিক্রি করে।
মেয়েদের অবস্থা – মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার যে চল ছিল তা বোঝা যায়, যখন রাধারাণী সম্পর্কে লেখক বলেন — “রাধারাণী বড়োঘরের মেয়ে, একটু অক্ষরপরিচয় ছিল।”
শেষের কথা – রাধারাণী এবং তার মায়ের রুক্মিণীকুমার রায়ের রেখে যাওয়া নোট তুলে রাখার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, পদ্মলোচনের মতো অসৎ চরিত্রের বিপরীতে সৎ এবং আদর্শবাদী মানুষও তখন সমাজে যথেষ্ট ছিল।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের ষষ্ঠ পাঠের দ্বিতীয় অধ্যায়, ‘রাধারাণী’ -এর কিছু রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে এসেছে। যদি আপনার কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।
মন্তব্য করুন