এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ভূগোলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — “ভারতের জনসংখ্যা বণ্টনের তারতম্যের পাঁচটি কারণ আলোচনা করো।” — নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক ভূগোলের পঞ্চম অধ্যায় “ভারতের অর্থনৈতিক পরিবেশ” -এর “ভারতের জনসংখ্যা” অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই আসে, তাই এটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের জনসংখ্যা বণ্টনের তারতম্যের পাঁচটি কারণ আলোচনা করো।
অথবা, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জনঘনত্বের তারতম্যের প্রধান কারণগুলি ব্যাখ্যা করো।
অথবা, ভারতে জনসংখ্যা বণ্টনের প্রাকৃতিক কারণগুলির প্রভাব আলোচনা করো।
ভারতের মোট জনসংখ্যা 121.02 কোটি (2011 খ্রিস্টাব্দ)। এই জনসংখ্যা সর্বত্র সমান হারে বণ্টিত হয়নি। বসতি স্থাপনের অনুকূল পরিবেশ, জীবিকানির্বাহের সুযোগসুবিধা, স্থানীয় জলবায়ু, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অবস্থা প্রভৃতির তারতম্য জনবসতি বণ্টনে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে।
প্রাকৃতিক কারণসমূহ –
ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, নদনদী, মৃত্তিকা, ভৌগোলিক অবস্থান প্রভৃতি প্রাকৃতিক কারণগুলি জনসংখ্যা বণ্টনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। যেমন –
- ভূপ্রকৃতি –
- উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে খাড়া ঢাল, ধস প্রবণতা, উর্বর মৃত্তিকার অভাব, বাসযোগ্য সমভূমির অভাব, পরিবহণ ও ভারী শিল্প গড়ে তোলার অসুবিধা থাকায় ভারতের হিমালয়, পশ্চিমঘাট, পূর্বঘাট, আরাবল্লি, বিন্ধ্য, সাতপুরা, মহাদেব, মহাকাল পার্বত্য অঞ্চল জনবিরল।
- মালভূমি অঞ্চলে অনুর্বর মৃত্তিকা, কৃষিকাজের প্রতিকূলতা ও পরিবহণে অনগ্রসরতা থাকলেও খনিজ ও শিল্প সমৃদ্ধির জন্য জনবসতির ঘনত্ব মাঝারি ধরনের। ছোটোনাগপুর ও দাক্ষিণাত্যের মালভূমিতে জনবসতি মাঝারি ধরনের।
- সমভূমি অঞ্চলে জীবনধারণের সব অনুকূল দিকগুলি বর্তমান থাকায় পৃথিবীর প্রায় 90% মানুষ সমভূমি অঞ্চলে বসবাস করে। সমভূমির বিস্তীর্ণ সমতলক্ষেত্র, উর্বর কৃষিজমি, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্প, ব্যাবসাবাণিজ্য প্রভৃতি উপাদানগুলির কারণে মানুষের সর্বাধিক বিকাশ ঘটে। ভারতের গঙ্গা-সিন্ধু-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত সমভূমি অঞ্চল ভারতের সর্বাধিক জনবহুল অঞ্চল।
- জলবায়ু – জনসংখ্যার বণ্টনে জলবায়ুর গুরুত্ব অপরিসীম। উষ্ণ মরু অঞ্চলে (থর) চরমভাবাপন্ন জলবায়ু, প্রখর উষ্ণতা, পার্বত্য অঞ্চলে হিমশীতল জলবায়ু ও বৃষ্টিবহুল পরিবেশের কারণে জনবসতি বিরল। অন্যদিকে উপকূলীয় ও সমভূমি অঞ্চলের সমভাবাপন্ন মনোরম জলবায়ুর কারণে জনঘনত্ব অধিক।
- নদনদী – নদনদী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভারতের জনসংখ্যার বণ্টনকে প্রভাবিত করে। গঙ্গা, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র, মহানদী, কৃষ্ণা, কাবেরী, গোদাবরী প্রভৃতি নদনদী দ্বারা জলসেচ, পানীয় জলের জোগান, নৌপরিবহণ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, মৎস্য সংগ্রহ, শিল্প কাজে জল সরবরাহ প্রভৃতি সুবিধার কারণে নদী অববাহিকা অঞ্চলে জনবসতি অধিক। অন্যদিকে নীচু অববাহিকা ও প্লাবনভূমি, জোয়ারভাটা প্রভাবিত অঞ্চল, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ, ঝিল প্রভৃতি স্থান মনুষ্য বসবাসের প্রতিকূল হওয়ায় জনবসতির জনঘনত্ব কম।
- মৃত্তিকা – সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা, উপকূলীয় সমভূমি, ডেকানট্র্যাপ অঞ্চলে উর্বর মৃত্তিকার কারণে জনঘনত্ব অধিক। অন্যদিকে অনুর্বর ল্যাটেরাইট (ছোটোনাগপুর মলভূমি), পডসল (হিমালয়), সিরোজেম (থর) মৃত্তিকায় বিরল জনবসতি দেখা যায়।
- বনভূমি – ঘন অরণ্যাবৃত অঞ্চলে, যেমন – উত্তর ও উত্তর-পূর্বের পার্বত্য অঞ্চল, পশ্চিমঘাট পর্বত, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ জনবসতি বিকাশের পক্ষে অন্তরায় হওয়ায় এইসব অঞ্চল জনবিরল। তবে বনভূমির সীমান্তবর্তী অংশে মূল্যবান ভেষজ, মোম, মধু, ধুনা, লাক্ষা প্রভৃতি সংগ্রহের কারণে বিক্ষিপ্ত ঘনজনবসতি দেখা যায়। যেমন হিমালয়ের পাদদেশের কিছু অঞ্চল। প্রাকৃতিক কারণের মতো অপ্রাকৃতিক বা আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কারণ জনবসতির ঘনত্বকে প্রভাবিত করে।
অর্থনৈতিক কারণসমূহ –
- কৃষি – ভারতের অধিকাংশ মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। কৃষির সুযোগসুবিধাযুক্ত স্থানগুলিতে জনঘনত্ব অধিক বিস্তার লাভকরে। উর্বর মৃত্তিকা, বিস্তীর্ণ সমভূমি, জলসেচের সুবিধা প্রভৃতি কারণে গঙ্গা-সিন্ধু-ব্রহ্মপুত্র নদী অববাহিকায় কৃষির উন্নতির কারণে জনঘনত্ব অধিক।
- শিল্প – শিল্পাঞ্চলে ও শিল্পকেন্দ্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি থাকায় জনঘনত্ব বেশি হয়। কর্মসংস্থানের অধিক সুযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে পরিব্রাজনের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলে জনঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। তাই হুগলি, দুর্গাপুর, আসানসোল, মুম্বাই পুনে, আহমেদাবাদ, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু শিল্পাঞ্চল অত্যন্ত জনঘনত্বপূর্ণ।
- পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা – উন্নত পরিবহণের কারণে শিল্প, ব্যাবসাবাণিজ্য প্রভৃতি গড়ে ওঠায় মানুষের জীবনযাত্রায় অনুকূল প্রভাব বিস্তার করে। উন্নত যোগাযোগের কারণে গঙ্গা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল, মুম্বাই, চেন্নাই অঞ্চলের জনঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। অন্যদিকে সুন্দরবন অঞ্চল জনবিরল। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণসমূহ –
- ধর্ম – ধর্মীয় আচারআচরণকে কেন্দ্র করে ধর্ম তীর্থস্থানগুলিতে নিবিড় জনবসতি গড়ে ওঠে। যেমন – আজমীর, বারাণসী, পুরী, তিরুপতি।
- শিক্ষা ও সংস্কৃতি – শিক্ষাদীক্ষা, শিল্পকলা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তির চর্চা যেখানে বেশি সেখানেই জনঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। যেমন – পুনে, হায়দরাবাদ, মুম্বাই, শান্তিনিকেতন, আলিগড়, নালন্দা প্রভৃতি।
রাজনৈতিক কারণসমূহ –
- ভারত বিভাজন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্বে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে (পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিমবঙ্গ, অসম) অনুপ্রবেশের কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
- প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলিতে অধিক কর্মসংস্থানের জন্য শহুরে জনসংখ্যার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন – চণ্ডীগড়, নিউ দিল্লি, কলকাতা, ভোপাল প্রভৃতি।
এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ভূগোলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — “ভারতের জনসংখ্যা বণ্টনের তারতম্যের পাঁচটি কারণ আলোচনা করো।” — নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক ভূগোলের পঞ্চম অধ্যায় “ভারতের অর্থনৈতিক পরিবেশ” -এর “ভারতের জনসংখ্যা” অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই আসে, তাই এটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব। । ধন্যবাদ।





Leave a Comment