এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের নবম পাঠের অন্তর্গত ‘পরাজয়’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করব। এখানে লেখকের পরিচিতি, গল্পের উৎস, গল্পের পাঠপ্রসঙ্গ, গল্পের সারসংক্ষেপ, গল্পের নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘পরাজয়’ গল্প সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং গল্পটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এ ছাড়া, অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক ও গল্পের সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক পরিচিতি
বাংলার ক্রীড়া সাংবাদিকতার জগতে একজন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব হলেন শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়। একজন ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবে সকলের কাছেই তিনি পরিচিত। 1945 খ্রিস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বিদ্যাশিক্ষা শুরু হয় টাকি সরকারি বিদ্যালয়ে। পরবর্তীকালে টাকি সরকারি মহাবিদ্যালয় ও কলকাতার সিটি কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ‘দৈনিক বসুমতী’ ও ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় ক্রীড়া সম্পাদকরূপে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। সমকালীন সময়ে তিনি একজন দক্ষ ক্রিকেটারও ছিলেন। কলকাতার ‘এরিয়ান্স’ ক্লাবে সাফল্যের সঙ্গে ক্রিকেট খেলেছেন। ‘যুগান্তর’ পত্রিকার বার্তা সম্পাদক হিসেবেও তিনি বহুদিন কাজ করেছেন। বর্তমানে ‘শুকতারা’ ও ‘নবকল্লোল’ পত্রিকার সম্পাদনা বিভাগের দায়িত্বভার নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন। তাঁর লেখা প্রথম গ্রন্থ হল ‘দেরারি’ উপন্যাস। খেলাধুলার জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে উক্ত জগতের বিষয়বস্তু নিয়ে অনেকগুলি গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘ক্রিকেট খেলার আইনকানুন’, ‘ক্লাবের নাম মোহনবাগান’, ‘ক্লাবের নাম ইস্টবেঙ্গল’, ‘মারাদোনা মারাদোনা’, ‘ক্রিকেট খেলা শিখতে হলে’, ‘ক্রিকেট মাঠের বাইরে’, ‘ক্রিকেটের পাঁচ নক্ষত্র’, ‘ফুটবলের পাঁচ নক্ষত্র’, ‘রিংয়ের রাজা আলি’ ইত্যাদি। তাঁর রচনার সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষা প্রয়োগ পাঠকদের তৃপ্তি দেয়।
পাঠপ্রসঙ্গ
সমাজে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের প্রয়োজন পেশার। কিন্তু পাশাপাশি মনোগত দিক থেকে সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজন নেশার। নেশার সঙ্গে মিশে থাকে আমাদের অন্তরের ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার স্থানটি থেকে যখন আমরা প্রতারিত হই, আশাভঙ্গের বেদনায় তখন প্রতিশোধ গ্রহণের ইচ্ছা জাগ্রত হয়। সাময়িকভাবে সেই প্রতিশোধস্পৃহা হয়তো আমরা চরিতার্থ করতে পারি, কিন্তু বিবেকের দংশনে আমাদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে। এই উপলব্ধির জন্যই ‘পরাজয়’ নামক গদ্যাংশটির অবতারণা।
বিষয়সংক্ষেপ
রঞ্জন একজন দক্ষ ফুটবলার। 15 বছর ধরে যে ক্লাবের জন্য মাঠে ঘাম ঝরিয়েছে সে, নববর্ষের বারপুজোয় সেই ক্লাবই চরমভাবে অবহেলা করে তাকে কোনোরকম আমন্ত্রণ না জানিয়ে। প্রতি বছর এমন দিনে উপস্থিত থাকার জন্য কত অনুরোধ আসে, ক্লাবের গাড়ি এসে নিয়ে যায় — আর এ বছর তার প্রতি চরম উদাসীন ক্লাব! যেন মেনেই নিতে পারে না রঞ্জন ক্লাবের কর্মকর্তাদের এমন আচরণ। গত বছর থেকেই সে বুঝতে পারছিল যে, তার প্রতি ক্লাবের উন্মাদনা অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে। দারুণ এক মানসিক অস্থিরতা তাকে কুরে কুরে খায়। কিন্তু এই ক্লাবে থাকার জন্যই কতবার অন্য ক্লাবের বিরাট অর্থের প্রলোভন ত্যাগ করেছে সে। প্রাত্যহিক কাজে মনোনিবেশ করতে পারে না রঞ্জন। মাঠে যাওয়ার জন্য কেউ অন্তত একটা ফোনও করল না তাকে — ভাবতেই পারে না সে। সে অনুভব করে যে ওকে বুঝিয়ে দেওয়া হল — ওকে আর ক্লাবের প্রয়োজন নেই। সারাটা দিন বাড়িতে ছটফট করেই কাটিয়ে দেয় সে। ধীরে ধীরে মনের মাঝে জমে ওঠে তীব্র ক্ষোভ। সে ভাবে, খেলার মাঠেই প্রমাণ দিতে হবে যে সে ফুরিয়ে যায়নি এখনও। তবে ক্লাব ছেড়ে দিতে হবে ভাবলেই আঁতকে ওঠে রঞ্জনের মন। যে ক্লাবের জার্সিকে মায়ের মতো ভালোবাসে, যা মান-প্রতিপত্তি দিয়েছে তাকে — কীভাবে তাকে ত্যাগ করবে! ছটফট করতে থাকে রঞ্জন। পরের দিন অফিসে গিয়ে নানা মানুষের নানা প্রশ্নের সামনে পড়তে হয় তাকে। অফিস থেকে বেরিয়ে প্রকৃতির নির্জনতায় একটু শান্তি খুঁজে পাওয়ার আশায় ছুটে যায় গঙ্গার ধারে। পাখির ডাক, গঙ্গার ঢেউ, কোকিলের সুরে ক্ষণিকের জন্য শান্ত হয় তার মন। তবে ক্লাবের কথা মনে পড়তেই বুকের মাঝে যন্ত্রণাটা অনুভব করে সে বহু কষ্টে। সে স্থির করে অন্য ক্লাবে যোগ দিয়ে, অপমানের জবাব দেবে রঞ্জন।
দুই দিন অপেক্ষা করে রঞ্জন তৃতীয় দিন রাতে ফোন করে অন্য বড়ো দলের কর্মকর্তাদের কাছে। তারা সুযোগের সদ্ব্যবহার করে রঞ্জনকে দলবদলের প্রথম দিনেই নিজেদের দলে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। তবে রঞ্জন স্পষ্টভাবে জানায় যে, অর্থের জন্য নয় — উপযুক্ত সম্মানটুকুই সে আশা করে। শত প্রলোভনেও যে কখনও দল বদলের কথা ভাবেনি, সেই রঞ্জন সরকার একরাশ অপমান মাথায় নিয়ে সরে এল তার ভালোবাসার ক্লাবটি থেকে। রঞ্জন সরকারের দল ছাড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে খবরের কাগজে শুরু হয়ে গেল নানা গবেষণা। রঞ্জনকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে পুরোনো ক্লাবের সমর্থকরা বিক্ষোভ দেখালেন ক্লাব তাঁবুতে। এবার টনক নড়ল ক্লাবকর্তাদের, তারা ছোটাছুটি শুরু করলেন, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সকলে যখন হন্যে হয়ে খুঁজছে তাকে, তখন রঞ্জন বসে আছেন সিকিমের মাউন্ট পান্ডিম হোটেলের ঘরে।
শুরু হল নতুন মরশুম। শুরু থেকেই নতুন ক্লাবের হয়ে দুরন্ত খেলতে লাগল রঞ্জন। সে যে ফুরিয়ে হয়নি সে-কথা প্রমাণ করার তাগিদ তাকে পেয়ে বসেছে তখন। দেখতে দেখতে এসে গেল অগ্নিপরীক্ষার দিন। দুই প্রধানের খেলা দেখার জন্য সেদিন যুবভারতী স্টেডিয়ামে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতি। খেলা শুরু হলে দেখা গেল রঞ্জনকে সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে তার পুরোনো ক্লাবের ডিফেন্ডাররা, কিন্তু সহ-খেলোয়াড়দের কাছ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পাচ্ছে না রঞ্জন। দ্বিতীয়ার্ধে খেলার চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেল। রঞ্জনের পুরোনো দল রক্ষণাত্মক মনোভাব ছেড়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ল কিন্তু তাতে সুবিধা হল রঞ্জনের, কারণ এখন সে অনেকটা ফাঁকা স্থান পেল নিজের মতো খেলার। কিছুক্ষণের মধ্যেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ব্যাকভলির মাধ্যমে বিপক্ষের জালে বল জড়িয়ে দিল সে। রঞ্জন প্রমাণ করল যে, সে ফুরিয়ে যায়নি। সহ-খেলোয়াড়রা জয়ের আনন্দে আত্মহারা কিন্তু রঞ্জন সেই আনন্দে অংশ নিতে পারল না। সে অনুভব করল 15 বছর যে দলের হয়ে ঘাম-রক্ত ঝরিয়েছে, আজ সেই ক্লাবকেই হারতে হল তারই গোলে। অপমানের জবাব হয়তো দেওয়া গেল, কিন্তু মনের দিক থেকে তো তার পরাজয়ই হল। অন্য কেউ এ কথা জানবে না কিন্তু নিজের হৃদয়কে তো ফাঁকি দেওয়া যায় না। তাই পুরোনো ক্লাবকে পরাজিত করে রঞ্জন সরকার নিজেই পরাজিত হল।
নামকরণ
সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল নামকরণ। নামকরণের মাধ্যমেই রচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে আগাম ধারণা তৈরি হয় পাঠকের মনে। নামকরণ বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে, যেমন – চরিত্রধর্মী, বিষয়ধর্মী, ব্যঞ্জনাধর্মী ইত্যাদি। এবার দেখা যাক শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পরাজয়’ গল্পের নামকরণটি কতখানি সার্থকতা লাভ করেছে।
আলোচ্য গল্পটিতে রঞ্জন সরকার নামক একজন ফুটবলারের খেলোয়াড় জীবনের অন্তিম লগ্নে ঘটে যাওয়া মানসিক সংঘাতের পরিচয় আমরা পাই। দীর্ঘ 15 বছর ধরে রঞ্জন যে ক্লাবের সুখে-দুঃখে নিবিড়ভাবে যুক্ত রেখেছে নিজেকে, যে ক্লাবের জন্য ঘাম-রক্ত ঝরিয়েছে — সেই ক্লাবের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে চরমভাবে অপমানিত হয়েছে সে। নববর্ষের বারপুজোর দিনে ক্লাবের পক্ষ থেকে তাকে একবারের জন্যও আমন্ত্রণ জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি কেউ। গত বছর থেকেই তার প্রতি উদাসীন ব্যবহার শুরু হয়েছিল, সেটা অনুভব করেছিল রঞ্জন, তবে সে ভাবতে পারেনি যে এমনভাবে তাকে অবহেলা-অপমান করবে ক্লাব কর্তৃপক্ষ! মানসিক যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সে একসময় যোগ দেয় অন্য ক্লাবে, কারণ সে যে ফুরিয়ে যায়নি, এখনও যে তার দক্ষতা বর্তমান, সেটা প্রমাণ করে দেবে সে, এভাবে পরাজয় কিছুতেই মেনে নেওয়া যাবে না। রঞ্জনের দলবদলের খবরটা প্রচারিত হবার পরেই ক্লাবের টনক নড়ে, তারা চেষ্টা করে তাকে ফিরিয়ে আনতে কিন্তু ব্যর্থ হয়। তারপর মরশুম শুরু হয়, একসময় চলে আসে মাহেন্দ্রক্ষণ — পুরোনো দলের মুখোমুখি হয় রঞ্জনদের দল। প্রায় লক্ষাধিক দর্শকের উপস্থিতিতে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে রঞ্জনের গোলে পরাজিত হল সেদিন রঞ্জনের পুরোনো ক্লাব। রঞ্জন যথাযোগ্য জবাব দিতে পেরেছে অপমানের, অবহেলার — সে বিজয়ী।
সাজঘরে পৌঁছে বিশ্রাম নিতে নিতে রঞ্জনের মনে বিষাদ উপস্থিত হল। সবাই আনন্দ করছে কিন্তু সে তো আনন্দে যোগ দিতে পারছে না। সে অনুভব করল — যে ক্লাব ছিল তার কাছে মায়ের মতো সম্মাননীয়া, যে ক্লাবের জন্য আজ তার নাম-খ্যাতি — সেই ক্লাব আজ পরাজিত হল তারই গোলে। বুকের মাঝে চরম অস্বস্তি অনুভব করে সে। অপমানের জবাব দিতে গিয়ে সে তো তার ভালোবাসার ক্লাবকেই পরাজিত করেছে। এই পরাজয় তো হৃদয় থেকে সে মেনে নিতে পারছে না। এটা তো তার নিজেরও পরাজয়, এতে আনন্দ নেই, আছে গভীর বেদনাবোধ।
এভাবেই গল্পের নামকরণ ‘পরাজয়’ ব্যঞ্জনাবাহী এবং সার্থক হয়ে উঠেছে।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের নবম পাঠের অন্তর্গত ‘পরাজয়’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেছি।
আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। এ ছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





Leave a Comment