এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “উনিশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণ কী বলতে বোঝো? বঙ্গীয় নবজাগরণের সীমাবদ্ধতাগুলি লেখো?” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাস পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই “উনিশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণ বলতে কী বোঝো? বঙ্গীয় নবজাগরণের সীমাবদ্ধতাগুলি লেখো?“ প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায় “সংস্কার – বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা“ -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবং চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়।

উনিশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণ বলতে কী বোঝো?
পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে উনিশ শতকের বাঙালি সমাজে এক যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী আলোড়ন দেখা যায়। এর প্রভাবে সমকালীন ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা, সাহিত্য, রাজনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে যে ব্যাপক, গভীর ও বৈপ্লবিক জাগরণ ঘটে তাকে অনেকে বঙ্গীয় নবজাগরণ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
বঙ্গীয় নবজাগরণের সীমাবদ্ধতাগুলি লেখো?
বাংলার নবজাগরণের ব্যপ্তি ছিল খুবই সীমিত। ঐতিহাসিক ব্ৰমফিল্ড বলেছেন উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণে যাঁরা সামিল হয়েছিলেন তাঁরা আসলে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক, মূলত শহর কলকাতাকেন্দ্রিক। গ্রাম বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এটা ছিল মূলত পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চবর্ণ ও উচ্চ শিক্ষিত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
- ড. অশোক মিত্র 1951 খ্রিস্টাব্দে আদমশুমারি রিপোর্টে বাংলার নবজাগরণকে ‘তথাকথিত নবজাগরণ’ (so called Renaissance) বলে অভিহিত করেছেন। বিনয় ঘোষ মন্তব্য করেছেন এই নবজাগরণ ‘অতিকথা’ (Myth) মাত্র। বাংলার নবজাগরণকে ‘ঐতিহাসিক প্রতারণা’ (Historical Hoax) বলেও তিনি অভিহিত করেছেন। কেমব্রিজ ঐতিহাসিক ড.অনিল শীল এঁদের আন্দোলনকে “এলিটিস্ট আন্দোলন’ বা ‘উচ্চবিত্তের আন্দোলন” নামে অভিহিত করেছেন।
- এই নবজাগরণ মূলত হিন্দু ধর্ম ও সমাজ সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। মুসলমান সম্প্রদায় ও নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর এর কোনো প্রভাব পড়েনি।
- বাংলার নবজাগরণের নেতৃবৃন্দ ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ছিলেন অতিমাত্রায় শ্রদ্ধাশীল। তাঁরা মনে করতেন ব্রিটিশ শাসনের দ্বারাই ভারতবাসীর কল্যাণ সম্ভব। ব্রিটিশ সংস্কৃতিতে মোহগ্রস্থ নবজাগরণের নেতৃবৃন্দ ভারতীয় সভ্যতার সমস্ত কিছুতেই দোষ দেখতেন।
- নবজাগরণের নেতৃবৃন্দ ভূস্বামী শ্রেণীর স্বার্থরক্ষায় অধিক সচেতন ছিলেন, তাঁরা কৃষক বিদ্রোহগুলিকে সমর্থন করেননি। হরিশ্চন্দ্র মুখার্জি ও দীনবন্ধু মিত্র ছাড়া অন্যান্য শিক্ষিত ব্যক্তিরা কৃষকদের সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন।
বাংলার নবজাগরণের প্রভাব – তবে, এইসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের গুরুত্ব অপরিসীম। ইটালীয় নবজাগরণের সঙ্গে এর যথেষ্ট পার্থক্য থাকলেও এর ফলে বাংলা তথা ভারতের সমাজ,ধর্ম,শিক্ষা,সাহিত্য,রাজনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল যা নবভারতের আবির্ভাবকে ত্বরান্বিত করে ছিল।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
বঙ্গীয় নবজাগরণকে কেন ‘এলিটিস্ট আন্দোলন’ বলা হয়?
এই নবজাগরণ মূলত পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চবর্ণের হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নিম্নবর্ণের মানুষ এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের সাথে এর কোনো সংযোগ ছিল না। তাই একে ‘এলিটিস্ট আন্দোলন’ বা উচ্চবিত্তের আন্দোলন বলা হয়।
বঙ্গীয় নবজাগরণের ইতিবাচক প্রভাবগুলি কী কী?
1. সমাজে যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী চিন্তার প্রসার ঘটে।
2. ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি হয়।
3. শিক্ষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে আধুনিকতার সূচনা হয়।
4. রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা রাখে।
বঙ্গীয় নবজাগরণের নেতৃবৃন্দ কারা ছিলেন?
বঙ্গীয় নবজাগরণের উল্লেখযোগ্য নেতৃবৃন্দের মধ্যে রয়েছেন রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কেশবচন্দ্র সেন, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ।
বঙ্গীয় নবজাগরণকে কেন ‘তথাকথিত নবজাগরণ’ বলা হয়?
ড. অশোক মিত্র এবং বিনয় ঘোষের মতে, এই নবজাগরণের প্রভাব খুবই সীমিত ছিল এবং এটি মূলত উচ্চবিত্ত ও শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। তাই একে ‘তথাকথিত নবজাগরণ’ বা ‘অতিকথা’ বলা হয়।
বঙ্গীয় নবজাগরণের ফলে কী ধরনের সামাজিক পরিবর্তন ঘটে?
1. সতীদাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ, কৌলীন্য প্রথা ইত্যাদি কুপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে।
2. নারী শিক্ষার প্রসার ঘটে এবং নারীর অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
3. বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে আধুনিকতার সূচনা হয়।
বঙ্গীয় নবজাগরণের ফলে রাজনৈতিক চেতনা কীভাবে বিকশিত হয়?
এই নবজাগরণের ফলে বাংলার শিক্ষিত সমাজে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। পরবর্তীতে এই চেতনা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।
বঙ্গীয় নবজাগরণের ফলে বাংলা সাহিত্যে কী পরিবর্তন আসে?
বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূচনা হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ লেখকদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য নতুন মাত্রা পায়।
বঙ্গীয় নবজাগরণের ফলে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন কীভাবে গড়ে ওঠে?
রাজা রামমোহন রায়ের ব্রাহ্মসমাজ, স্বামী বিবেকানন্দের রামকৃষ্ণ মিশন এবং কেশবচন্দ্র সেনের নববিধান আন্দোলনের মাধ্যমে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনগুলি কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।
বঙ্গীয় নবজাগরণের ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে কী পরিবর্তন আসে?
ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটে এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও বিভিন্ন স্কুল-কলেজ স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার ঘটে।
বঙ্গীয় নবজাগরণের ফলে নারী সমাজের অবস্থার কী পরিবর্তন হয়?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায় প্রমুখের প্রচেষ্টায় নারী শিক্ষার প্রসার ঘটে এবং নারীর অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। বাল্যবিবাহ ও সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে।
এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “উনিশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণ কী বলতে বোঝো? বঙ্গীয় নবজাগরণের সীমাবদ্ধতাগুলি লেখো?” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই “উনিশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণ কী বলতে বোঝো? বঙ্গীয় নবজাগরণের সীমাবদ্ধতাগুলি লেখো?” প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায় “সংস্কার – বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা” -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবং চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব। তাছাড়া, নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।