এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের পঞ্চম পাঠের অন্তর্গত ‘গাছের কথা’-এর কিছু ‘সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

‘আগে এসব কিছুই জানিতাম না।’ – কোন্ বিষয়টি লেখকের কাছে অজানা ছিল?
গাছেরা কোনো কথা না বললেও তাদের যে একটা জীবন আছে, তারা যে মানুষের মতোই আহার করে, দিনে দিনে বেড়ে ওঠে—এই বিষয়টি লেখকের কাছে অজানা ছিল।
‘ইহাদের মধ্যেও তাহার কিছু কিছু দেখা যায়।’ – কাদের কথা বলা হয়েছে? তাদের মধ্যে কী লক্ষ করা যায়?
এখানে গাছেদের কথা বলা হয়েছে। মানুষের মধ্যে যেসব সদ্গুণ আছে, গাছেদের মধ্যেও তার কিছু কিছু লক্ষ করা যায়। এই গুণগুলির মধ্যে আছে একে অপরকে সাহায্য করা, বন্ধুত্ব, স্বার্থত্যাগ, সন্তানের জন্য নিজের জীবন দান ইত্যাদি।
‘গাছের জীবন মানুষের ছায়ামাত্র।’ – লেখকের এমন উক্তি অবতারণার কারণ বিশ্লেষণ করো।
‘গাছের কথা’ প্রবন্ধে জগদীশচন্দ্র বসু বলেছেন, গাছপালাকে ভালোবাসতে শিখে তিনি অনুভব করেছেন যে মানুষের মতোই গাছেরাও আহার করে, দিনে দিনে বাড়ে। মানুষের মতোই তাদেরও অভাব, তাদেরও দুঃখকষ্ট আছে, জীবনধারণের জন্য সদাব্যস্ততা আছে। কিছু মানুষ যেমন কষ্টে পড়লে চুরি-ডাকাতি করে, কোনো কোনো গাছের মধ্যেও সেই প্রবৃত্তি দেখা যায়। মানুষের বিভিন্ন সদ্গুণ, যেমন— পারস্পরিক সাহায্য, বন্ধুত্ব, এমনকি মানুষের সর্বোচ্চ গুণ ‘স্বার্থত্যাগ’-ও গাছের মধ্যে দেখা যায়। মায়ের মতোই প্রয়োজনে সন্তানের জন্য জীবনত্যাগও গাছের মধ্যে দেখা যায়। এগুলি অনুভব করেই লেখক ‘গাছের জীবন মানুষের ছায়ামাত্র’ মন্তব্যটির অবতারণা করেছেন।
জীবনের ধর্ম কীভাবে রচনাংশটিতে আলোচিত ও ব্যাখ্যাত হয়েছে তা বিশ্লেষণ করো।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রচিত ‘গাছের কথা’ প্রবন্ধের বক্তব্য অনুধাবন করলে বোঝা যায় যে, লেখকের মতে গতি এবং বৃদ্ধি হলো জীবনের ধর্ম। এই ধর্ম যেমন মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে দেখা যায়, তেমনই দেখা যায় উদ্ভিদের মধ্যেও। পাখির ডিমের মধ্যে জীবন যেমন সুপ্ত থাকে, তেমনই জীবন সুপ্ত থাকে বীজের মধ্যেও। উত্তাপ পেলে ডিম থেকে জন্মায় পাখির ছানা; তেমনই মাটি, জল ও উত্তাপ পেলে বীজ থেকে জন্ম নেয় বৃক্ষশিশু। জন্মলাভের পর জীবের গতি ও বৃদ্ধি দৃষ্টিগোচর হয়। যদিও প্রাণীদের মতো গাছের গতি সহজে বোঝা যায় না, তবুও লেখক দৃষ্টান্তস্বরূপ লতার ঘুরে ঘুরে গাছকে জড়ানোর কথা বলেছেন। এ ছাড়াও জীবনধারণের জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে নানা উপায় অবলম্বন, পারস্পরিক সহযোগিতা, বন্ধুত্ব, স্বার্থত্যাগ—এসবই প্রাণী এবং উদ্ভিদ উভয়েরই জীবনের ধর্ম।
‘নানা উপায়ে গাছের বীজ ছড়াইয়া যায়।’ – উপায়গুলি পাঠ্যাংশ অনুসরণে আলোচনা করো।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর ‘গাছের কথা’ প্রবন্ধে গাছের বীজ ছড়িয়ে পড়ার কিছু উপায়ের উল্লেখ করেছেন। যেমন – কৃষকরা চাষের খেতে বীজ ছড়ায়, তা থেকে ফসল ফলে। পাখিরা ফল খেয়ে তার বীজ দূরদেশে নিয়ে যায়। এইভাবে জনমানবশূন্য দ্বীপেও গাছ জন্মায়। আবার শিমুল প্রভৃতি গাছের ফল ফেটে বীজ বাতাসে উড়ে যায়। এইভাবে বাতাসে ভেসেও বহু বীজ দেশদেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
লেখক তাঁর ছেলেবেলার কথা পাঠ্যাংশে কীভাবে স্মরণ করেছেন, তা আলোচনা করো।
‘গাছের কথা’ প্রবন্ধের লেখক জগদীশচন্দ্র বসু শিমুল গাছের বীজ ছড়ানোর প্রসঙ্গে নিজের ছেলেবেলার কথা স্মরণ করেছেন। পাকা শিমুল ফল রৌদ্রে ফেটে গেলে তার ভিতর থেকে বীজ তুলোর সঙ্গে বাতাসে ওড়ে। ছেলেবেলায় লেখক ও তাঁর সঙ্গীরা সেই বীজ ধরার জন্য ছুটতেন। কিন্তু হাত দিয়ে ধরতে গেলেই বাতাস সেই বীজকে তুলোসমেত অনেক উপরে উড়িয়ে নিয়ে যেত।
‘ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বীজ পাকিয়া থাকে।’ – উদ্ধৃতিটির সাপেক্ষে নীচের ছকটি পূরণ করো।
| বীজ | কোন্ ঋতুতে পাকে? |
| আম | গ্রীষ্ম |
| লিচু | গ্রীষ্ম |
| ধান | হেমন্ত |
| যব | হেমন্ত |
| শিমুল | গ্রীষ্ম |
‘পৃথিবী মাতার ন্যায় তাহাকে কোলে লইলেন।’ – বিশ্বপ্রকৃতি সম্পর্কে লেখকের গভীর উপলব্ধি উদ্ধৃতিটিতে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, তা আলোচনা করো।
জগদীশচন্দ্র বসু একাধারে ছিলেন বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক। তাঁর বহু রচনাতেই বিশ্বপ্রকৃতিতে ঘটে চলা বিভিন্ন ঘটনার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গভীর দার্শনিক উপলব্ধিও প্রতিফলিত হয়েছে। ‘গাছের কথা’ প্রবন্ধেও তিনি একটি প্রাকৃতিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যা এইরূপ— আশ্বিন মাসে পেকে ওঠা কোনো একটি বীজ আশ্বিনের ঝড়ের সময় উড়ে সারাদিন মাটিতে লুটোতে লুটোতে হয়তো একটা ভাঙা ইট বা মাটির ডেলার নীচে আশ্রয় নিল এবং ক্রমশ ধুলোবালিতে ঢাকা পড়ল। লোকচক্ষুর আড়ালে গেলেও তা বিধাতার দৃষ্টির বাইরে যায়নি। মানবশিশু যেমন মায়ের কোলে নিরাপদে ঘুমিয়ে থাকে, বীজের মধ্যেকার বৃক্ষশিশুটিও যেন তেমনি মাটিতে ঢাকা পড়ে বাইরের শীত ও ঝড়ের থেকে রক্ষা পেয়ে পৃথিবীমাতার কোলে নিরাপদে ঘুমিয়ে রইল। ভারতীয় দর্শনে জড়প্রকৃতির মধ্যেও যে প্রাণসত্তার প্রকাশ দেখা যায়, এখানে লেখক সেই প্রাণসত্তাকেই অনুভব এবং উপলব্ধি করেছেন।
‘প্রত্যেক বীজ হইতে গাছ জন্মে কিনা, কেহ বলিতে পারে না।’ – বীজ থেকে গাছের জন্মের জন্য অত্যাবশ্যকীয় শর্তগুলি আলোচনা করো।
‘গাছের কথা’ প্রবন্ধে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু বলেছেন— ‘প্রত্যেক বীজ হইতে গাছ জন্মে কিনা, কেহ বলিতে পারে না।’ কারণ, ‘অঙ্কুর বাহির হইবার জন্য উত্তাপ, জল ও মাটি চাই।’ অর্থাৎ বীজ থেকে গাছের জন্মের জন্য অত্যাবশ্যকীয় শর্তগুলি হলো –
- উপযুক্ত উত্তাপ – অতিরিক্ত শীতল বা উষ্ণ পরিবেশে বীজ অঙ্কুরিত হতে পারে না। এর জন্য যথোপযুক্ত উত্তাপ প্রয়োজন।
- জল – বীজ শুষ্ক অবস্থায় অঙ্কুরিত হয় না। জল শোষণ করে ফুলে উঠলে তবেই বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়।
- মাটি – কঠিন পাথুরে জমিতে গাছ জন্মায় না। কারণ, অঙ্কুর পাথরকে ভেদ করতে পারে আসতে পারে না। নরম মাটিতে শিকড় চালাতে পারলে তবেই অঙ্কুরিত বীজ থেকে গাছ জন্মায়।
‘তখন সব খালি-খালি লাগিত।’ – কখনকার অনুভূতির কথা বলা হলো? কেন তখন সব খালি-খালি লাগত? ক্রমশ তা কীভাবে অন্য চেহারা পেল তা পাঠ্যাংশ অনুসরণে বুঝিয়ে দাও।
‘গাছের কথা’ প্রবন্ধের লেখক জগদীশচন্দ্র বসু প্রথম জীবনে যখন একা মাঠে কিংবা পাহাড়ে বেড়াতে যেতেন, তখনকার অনুভূতির কথা বলা হয়েছে। সেই সময় তিনি গাছ, পাখি, কীটপতঙ্গ ইত্যাদিকে ভালোবাসতে শেখেননি। অর্থাৎ প্রকৃতিপ্রেমিক না হলে তিনি প্রকৃতির বিপুল সৌন্দর্যের মাধুর্য গ্রহণ করতে পারতেনড়িয়ে নিতে পারতেন না। তাই স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সঙ্গীর অভাবে তাঁর খালি খালি লাগত। যখন থেকে তিনি এদের ভালোবাসতে শিখলেন, এদের বিষয়ে অনেক কথা বুঝতে পারলেন, তখন এই বিপুল বিশ্ব নতুনরূপে ধরা দিল তার কাছে। তিনি বুঝলেন গাছ, পাখি, কীটপতঙ্গের মর্যাদা, এ বিশ্বপ্রবাহে তাদের ভূমিকা। বর্তমান পাঠ্যাংশে তিনি বিশেষ করে গাছের কথাই বলেছেন। নির্বাক গাছদেরও যে মানুষের মতোই জীবন আছে, আহার ও বৃদ্ধি আছে, অভাব-দুঃখ-কষ্ট আছে, জীবনধারণের জন্য ব্যস্ততা আছে, মানুষের মতোই পারস্পরিক সহযোগিতা, বন্ধুত্ব, স্বার্থত্যাগ প্রভৃতি সদ্গুণ আছে; তা বুঝতে পারার পর থেকেই তাঁর সেই খালি খালি লাগার বোধ ক্রমশ অন্য চেহারা পেল এবং এরাই তাঁর একাকিত্বের সঙ্গী হয়ে উঠল।
‘বৃক্ষদের মধ্যে একে অন্যকে সাহায্য করিতে দেখা যায়, ইহাদের মধ্যে একের সহিত অপরের বন্ধুত্ব হয়।’ – তোমার জানা কিছু দৃষ্টান্তের সাহায্যে বক্তব্যটি ব্যাখ্যা করো।
বৃক্ষজগতেও পারস্পরিক সাহায্য এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ দেখা যায়। একটা বড়ো গাছের সুশীতল ছায়ায় ছোটোগাছ জন্মায়; একটা তীব্র ভূমিক্ষয়রোধী ক্ষমতাসম্পন্ন বৃক্ষ অন্য বৃক্ষদের জীবনযাপন সহজ করে, লতাজাতীয় গাছকে আশ্রয় দেয় সবল কাণ্ডের গাছ। মটরশুঁটি, শিমজাতীয় গাছেদের মাটিতে প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করে অন্য গাছেদের বাঁচতে সাহায্য করে। শৈবাল ও ছত্রাকরা পরস্পরকে খাদ্যনির্মাণ ও পুষ্টিতে সাহায্য করে। বড়ো বৃক্ষের গায়ে জন্মে তার থেকে পুষ্টি নিয়ে পরজীবী উদ্ভিদ বাঁচে। এভাবে গাছেরা বন্ধুর মতো একে অন্যকে সাহায্য করে।
‘কষ্টে পড়িয়া ইহাদের মধ্যেও কেহ কেহ চুরি-ডাকাতি করে।’ – কীভাবে উদ্ভিদেরা কষ্টে পড়ে চুরি-ডাকাতি করে?
মানুষ যেমন কখনো-কখনো খাদ্য কিংবা অর্থের অভাবে চুরি-ডাকাতি করে থাকে, উদ্ভিদজগতেও তেমনটা দেখা যায়। ক্লোরোফিলযুক্ত সবুজ উদ্ভিদেরা নিজেদের খাদ্য প্রস্তুত করতে সক্ষম। কিন্তু যেসব উদ্ভিদের ক্লোরোফিল নেই, তারা তা পারে না। তখন তারা পরজীবীরূপে সবুজ উদ্ভিদকে আশ্রয় করে ও তার দেহ থেকে খাদ্য টেনে নেয়। এর ফলে সেই সবুজ উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শুকিয়ে বা মরেও যেতে পারে। যেমন— বিভিন্ন ছত্রাক অথবা স্বর্ণলতার মতো পরজীবী উদ্ভিদ আশ্রয়দাতা উদ্ভিদের খাদ্য কেড়ে নিয়ে তাকে রুগ্ণ করে দেয়।
‘বীজগুলি যেন গাছের ডিম’ – লেখক এই উক্তি কোন্ প্রসঙ্গে করেছেন? বীজ ও ডিমের এই তুলনা তিনি কেন করেছেন?
‘গাছের কথা’ প্রবন্ধে জগদীশচন্দ্র বসু জীবিতের লক্ষণ সম্বন্ধে আলোচনা প্রসঙ্গে এই উক্তি করেছেন। তিনি বলেছেন, জীবিতের লক্ষণ হলো এই যে, তার গতি এবং বৃদ্ধি আছে। জীবিত উদ্ভিদ অথবা প্রাণী, উভয়ের ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে তারা ক্রমশ বৃদ্ধি পায় এবং নড়াচড়া করে। উদ্ভিদের গতি হঠাৎ বোঝা না গেলেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণে তা বুঝতে পারা যায়। কিন্তু ডিমের মধ্যে জীবনের এই লক্ষণগুলি দেখা যায় না, কারণ ডিমে জীবন ‘ঘুমিয়ে থাকে’। লেখক বলেছেন ডিমে জীবন ঘুমিয়ে থাকে। উত্তাপ পেলে ডিম থেকে পাখির ছানা জন্মায়। তেমনি বীজগুলি যেন গাছের ডিম। কারণ, বীজের মধ্যেও গাছ যেন ঘুমিয়ে থাকে। মাটি, জল ও উত্তাপ পেলে বীজ থেকে বৃক্ষশিশু জন্মায়। এই সাদৃশ্যের জন্যই লেখক ডিমের সঙ্গে বীজের তুলনা করেছেন।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের পঞ্চম পাঠের অন্তর্গত ‘গাছের কথা’-এর কিছু ‘সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করলাম। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যালয়ের বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের উপকারে এসেছে। যদি তোমাদের কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।





Leave a Comment