এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের নবম পাঠের অন্তর্গত ‘মাসিপিসি’-এর কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

‘শতবর্ষ এগিয়ে আসে—শতবর্ষ যায়’ – এই পঙ্ক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি কী বলতে চেয়েছেন, আলোচনা করো।
প্রশ্নোক্ত উদ্ধৃতিটি আধুনিক কবি জয় গোস্বামীর ‘মাসিপিসি’ নামক কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।
আলোচ্য কবিতায় কবি সমাজের শ্রমজীবী মহিলাদের জীবনাচরণের একটুকরো ছবিকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। কবিতায় উল্লিখিত মাসিপিসিরা হলেন গ্রাম থেকে শহরের বুকে যাত্রা করা চালবিক্রেতা নারী। চোখে জল ছিটিয়ে ঘুম সরিয়ে রাতের অন্ধকারেই তারা ট্রেন ধরতে ছুটে চলে। নানা বাধা বা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েই তাদের জীবনসংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হয়। পরিবারে সদস্য অনেক, কিন্তু উপার্জন করে হয়তো একজনই। ফলে কঠোর শ্রমের মাধ্যমে দুমুঠো অন্নের সংস্থান করতে হয় তাদের। বছর শেষ হয়, নতুন বছর আসে, আবার তাও চলে যায়। কিন্তু এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর জীবনপ্রবাহ একইরকম থাকে, কোনো পরিবর্তন হয় না তাদের জীবনে। প্রশ্নোক্ত উদ্ধৃতির মাধ্যমে কবি এ কথাই বোঝাতে চেয়েছেন।
‘মাসিপিসি’ কবিতায় এই মাসিপিসি কারা? তাদের জীবনের কোন্ ছবি এই কবিতায় তুমি খুঁজে পাও?
কবি জয় গোস্বামীর ‘মাসিপিসি’ কবিতায় বর্ণিত ‘মাসিপিসি’রা হলেন সমাজের দরিদ্র, দিন-আনা দিন-খাওয়া মহিলা শ্রমজীবী। আলোচ্য কবিতায় এদের গ্রাম থেকে শহরে আসা চালবিক্রেতা মহিলারূপে দেখানো হয়েছে।
কবির লেখনীতে মাসিপিসিদের দারিদ্র্যপূর্ণ সংগ্রামমুখর জীবনের পরিচয় পাই আমরা। প্রতিদিন কঠিন সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয় এদের। নানা ধরনের বাধা এদের চলার পথে কাঁটা হয়ে দেখা দেয়। পরিবারের সকলের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য ঘুমকে দূরে সরিয়ে রাত থাকতে থাকতেই তাদের শুরু করতে হয় দিনের কাজ। দিন, মাস, বছর হিসাব করে তারা চলে না, কারণ প্রতিটি দিনই তাদের কাছে সমান সংগ্রামের। আলোচ্য কবিতায় মাসিপিসিদের এমন কঠিন সংগ্রামমুখর জীবনচিত্রের পরিচয় আমি খুঁজে পাই।
‘মাসিপিসি’ কবিতার এই মাসিপিসিদের মতো আর কাদের কথা তুমি বলতে পারো, যাদের ট্রেনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা অর্জন করতে হয়?
‘মাসিপিসি’ কবিতায় জয় গোস্বামী গ্রাম থেকে শহরে আসা চালবিক্রেতা মহিলাদের জীবনসংগ্রামের কাহিনি উপস্থাপিত করেছেন; এই শ্রমজীবী মহিলাদের কবি ‘মাসিপিসি’ বলে উল্লেখ করেছেন। এদের জীবিকা অনেকাংশে ট্রেনের উপরে নির্ভর করে। আমাদের সমাজে ‘মাসিপিসি’দের মতোই আরও অনেকেই আছেন, যাদের জীবিকা ট্রেনের উপরে নির্ভরশীল। যেমন –
প্রতিদিন শহরের বাজারে বাজারে বহু মহিলা সবজি বিক্রেতা বসেন, যারা দূরদূরান্তের গ্রাম থেকে ছুটে আসেন শহরে শাকসবজি বিক্রি করে দুটি পয়সা উপার্জন করার আশায়। শহরের বহু বাড়িতে কাজ করতে আসেন বহু গ্রাম্য মহিলা—যাদের আমরা অনেকেই ‘কাজের মাসি’ বলে ডেকে থাকি। বাড়িতে সংসার, সন্তান ফেলে রেখে শুধুমাত্র পেটের অন্নসংস্থানের আশায় এরা রাতশেষের ট্রেন ধরেন। এছাড়াও বহু মহিলা গ্রাম থেকে সকালের ট্রেনে কলকাতা তথা নানা শহরে চলে আসেন নানা ধরনের জীবিকার সন্ধানে। সঠিক সময়ে ট্রেন ধরতে না পারলে হয়তো দিনের উপার্জন অধরাই থেকে যাবে তাদের।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ওরা কাজ করে’ কবিতাটি তুমি পড়ে নাও। ‘মাসিপিসি’ কবিতার সঙ্গে ‘ওরা কাজ করে’ কবিতার কোন্ সাদৃশ্য তোমার চোখে পড়ল, তা আলোচনা করো।
‘ওরা কাজ করে’ কবিতাটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। উক্ত কবিতায় কবি ‘ওরা’ বলতে শ্রমজীবী মানুষের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। তাদের জীবনে কোনো আরাম নেই, তারা অবিরতভাবে কাজ করে চলে এই পৃথিবীতে। কবি বলেছেন, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পতন ঘটবে একদিন, কিন্তু কৃষক-মজুর শ্রমজীবীদের কর্মচাঞ্চল্য পৃথিবীকে সজীব করে রাখবে। শ্রমজীবীরা সভ্যতার ইমারত গড়ে তোলে, ফসল ফলায়। কবির ভাষায় –
“ওরা চিরকাল টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল; ওরা মাঠে মাঠে বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে -“
ধরণির হাল তাদেরই হাতে থাকে। এই শ্রমজীবীরা চিরকাল অমর। যুগ যুগ ধরে এরাই সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। ‘মাসিপিসি’ কবিতায় বর্ণিত মাসিপিসিদের জীবনও এমনই কর্মচঞ্চল। বছরের প্রতিটি দিনই তাদের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে, তাই কবি জয় গোস্বামী বলেছেন –
‘সাল মাহিনার হিসেব তো নেই, জষ্টি কি বৈশাখ মাসিপিসির কোলে-কাঁখে চালের বস্তা থাক।’
অর্থাৎ, বছরের প্রতিটি দিনই তাদের কাছে সমান গুরুত্বের।
এইভাবে শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের একইরকম জীবনসংগ্রামের কাহিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ওরা কাজ করে’ এবং জয় গোস্বামীর ‘মাসিপিসি’ কবিতায় লক্ষ করা যায়।
শহরে চাল বিক্রি করতে আসা ‘মাসিপিসি’দের সংগ্রামী জীবনের পরিচয় ‘মাসিপিসি’ কবিতা অবলম্বনে লেখো।
আমাদের সমাজে বহু পরিবার আছে, যাদের ঘরের মহিলারা জীবিকার তাগিদে শ্রমজীবীরূপে জীবন অতিবাহিত করেন। তাদের জীবন সর্বদাই দারিদ্র্যপূর্ণ, সংগ্রামমুখর। এদের সঙ্গে আমাদের অনেক ক্ষেত্রেই কাজের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, কিন্তু তাদের ব্যক্তিপরিচয় থেকে যায় অজানা। এমন মহিলা শ্রমজীবীরা আমাদের কাছে ‘মাসিপিসি’ বলেই পরিচিতি পেয়ে থাকেন। চোখের ঘুমকে সরিয়ে রেখে চোখের পাতা আর ঠোঁটে জল সিঞ্চন করে এরা দিনের কাজ শুরু করেন। আকাশে তখনও দেখা দেন না সূর্যদেব, প্রকাশিত হয় না দিনের আলো, কিন্তু শুরু হয়ে যায় ‘মাসিপিসি’দের নিত্যদিনের কাজ; তখনও চাঁদ আকাশ ছেড়ে যায় না, আকাশে জ্বলজ্বল করে শুকতারা, তখনও বাসি কাপড় কেচে ট্রেন ধরতে ছুটে যায় ‘মাসিপিসি’রা। দু-এক ফোঁটা শিশির তখন ঘাসের মাথায় জেগে ওঠে। ঘুমকে দূরে সরিয়ে বেরিয়ে পড়ে তারা, গ্রাম থেকে শহরে আসার উদ্দেশ্যে ট্রেন ধরেন ‘মাসিপিসি’রা। এই শ্রমজীবী মহিলাদের পরিবারে সদস্যসংখ্যা অনেক, কিন্তু উপার্জন করার মানুষ কেউ নেই। ফলে অনেকগুলি পেট চলে একজনের সামান্য উপার্জনে। তাই প্রতিদিনই এদের কালঘাম ফেলে ছুটতে হয় শহরের উদ্দেশ্যে। ট্রেনে ওঠার আগে-পরে নানা বাধার সামনে পড়তে হয় তাদের। রেলবাজারের হোমগার্ডরা নানা সমস্যায় ফেলে এদের। বছর বা মাসের হিসাব নয়—সারাবছরই ‘মাসিপিসি’দের এমনভাবে জীবনসংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হয়। বছর আসে, বছর যায়—এদের জীবনের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। পরিবারের মুখে ক্ষুধার অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য এরা লালগোলা-বনগাঁয় চালের বস্তা তুলে ছুটে যায় শহরের দিকে, উপার্জনের আশায়।
এভাবেই আলোচ্য কবিতায় ‘মাসিপিসি’র প্রতীকে সমাজে দরিদ্র, খেটে-খাওয়া মহিলাদের জীবনের কাহিনি কবি তুলে ধরেছেন।
‘মাসিপিসি’ কবিতাটির নামকরণ যুক্তিসঙ্গত হয়েছে কিনা, আলোচনা করো।
নামকরণ সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নামকরণের মধ্য দিয়ে পাঠক সাহিত্য বিষয়টি পাঠ করার পূর্বেই তার সম্পর্কে খানিক ধারণা পেতে পারেন। কবি জয় গোস্বামীর ‘মাসিপিসি’ নামক কবিতাটির মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে গ্রাম থেকে শহরে আসা চালবিক্রেতা রমণীদের জীবনসংগ্রামের ছবি ফুটে উঠলেও, এর অন্তরে নিহিত আছে মহিলা শ্রমজীবী জনতার দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনসংগ্রামের চিত্র।
পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য এরা রাত থাকতে ওঠে, বাসি জামাকাপড় কেচে ট্রেন ধরতে ছোটে। শারীরিক আরাম গ্রহণের কোনো অবকাশ তাদের নেই। কিন্তু শহরের পথে যাওয়ার সময়ও তাদের সম্মুখীন হতে হয় নানা প্রতিবন্ধকতার। রেলবাজারের হোমগার্ডরা বিভিন্ন ঝামেলার সৃষ্টি করে। এদের জীবনে কোনো দিনবদল ঘটে না। এরা কোনো মাস বা বছরেরও হিসাব রাখে না। দৈনন্দিন রোজগারই এদের একমাত্র ভরসা। অনন্ত সময় বয়ে চলে, শ্রমজীবী জনতার কর্মপ্রবাহে কোনো ছেদ পড়ে না।
কবি জয় গোস্বামী কবিতার যে নামকরণ করেছেন, তাকে দুটি পন্থায় বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথমত, আমরা ঘুমপাড়ানি ছড়াতে ছেলেবেলায় ঘুমপাড়ানি মাসিপিসির কথা জেনেছি, যারা খোকার চোখে ঘুমের আবেশ এনে দিত। কিন্তু বাস্তবের মাসিপিসিরা নিজেদের চোখের ঘুমকে সরিয়ে রেখে কঠিন জীবনসংগ্রামের পথে বের হয়। তাই এর মধ্য দিয়ে একদিকে কবির লোকজ উপাদানের প্রতি ঐতিহ্য প্রদর্শন এবং অন্যদিকে প্রবল বাস্তববোধের পরিচয় পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, শ্রমজীবী জনতার সাথে শহরের মানুষদের অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। তাই তাদের নামধামও থেকে যায় অনেক ক্ষেত্রেই অজানা। তারা শুধুমাত্রই ‘মাসি’ বা ‘পিসি’। এই দুই দিক বিচার করে বলা যায়, কবিতাটির নামকরণ সার্থকভাবে প্রযুক্ত হয়েছে।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের নবম পাঠের অন্তর্গত ‘মাসিপিসি’ কবিতার কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করলাম। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিদ্যালয়ের বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের উপকারে এসেছে। যদি তোমাদের কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।





Leave a Comment