অষ্টম শ্রেণি বাংলা – নাটোরের কথা – বিষয়সংক্ষেপ

Souvick

এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের ষষ্ঠ পাঠের অন্তর্গত ‘নাটোরের কথা’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করব। এখানে লেখকের পরিচিতি, গল্পের উৎস, গল্পের পাঠপ্রসঙ্গ, গল্পের সারসংক্ষেপ, গল্পের নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘নাটোরের কথা’ গল্প সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং গল্পটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এছাড়া, অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক ও গল্পের সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নাটোরের কথা - লেখক পরিচিতি - অষ্টম শ্রেণী - বাংলা

লেখক পরিচিতি

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন খ্যাতিমান ভারতীয় চিত্রশিল্পী, নন্দনতাত্ত্বিক এবং সুলেখক। তিনি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রপৌত্র, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয় ভ্রাতা গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র এবং গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর পিতৃব্য অর্থাৎ কাকা। 1871 খ্রিস্টাব্দের 7 আগস্ট জোড়াসাঁকোয় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণায় তাঁর লেখার সূত্রপাত। অঙ্কনশিল্পী হিসেবেও তিনি যথেষ্ট বিখ্যাত ছিলেন।

1913 খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় এবং ইংরেজ সরকার তাঁকে সি.আই.ই. (CIE) উপাধি দেন। 1921 খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.লিট. উপাধি দেয়। তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’-র অলংকরণ করেন। 1941-1945 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি শান্তিনিকেতনের আচার্য পদের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিলাতি শিল্পীদের কাছে অঙ্কন শিক্ষা করেন। অবনীন্দ্রনাথ ‘ভারতীয় মডার্ন আর্ট’-এর জনক হিসেবে পরিগণিত হন। মোগল ও প্রাচীন ভারতের মহিমা এবং ভারতীয় জীবনচিত্র তাঁর ছবির অন্যতম বিষয়। তাঁর তত্ত্বাবধানেই জন্ম নেয় চিত্রশিল্পীদের নতুন প্রজন্ম। নন্দলাল বসু, অসিত হালদার, ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার, যামিনী রায় প্রমুখ শিল্পীরা তাঁর তত্ত্বাবধানে ও অনুপ্রেরণায় অঙ্কন শিল্পে এক নব ও পরিবর্তিত যুগের সূচনা করেন। ছোটোদের জন্য তাঁর লেখা বইগুলি বাঙালির অক্ষয় সম্পদ। বাংলাদেশের জীবনচিত্র তাঁর লেখায় যেন নতুন করে প্রাণ পেয়েছে। ‘শকুন্তলা’, ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘রাজকাহিনি’, ‘ভারতশিল্প’, ‘ভূতপরীর দেশ’, ‘নালক’, ‘বাংলার ব্রত’, ‘খাজাঞ্চির খাতা’, ‘প্রিয়দর্শিকা’, ‘চিত্রাক্ষর’, ‘বুড়ো আংলা’, ‘ভারতশিল্পের ষড়ঙ্গ’, ‘আলোর ফুলকি’, ‘ঘরোয়া’, ‘রংবেরং’ ইত্যাদি তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ। ‘ওমর খৈয়াম’, ‘আরব্য উপন্যাসের গল্প’, ‘ঋতুসংহার’, ‘কবিকঙ্কণ চণ্ডী’, ‘বুদ্ধ’, ‘সুজাতা’ তাঁর আঁকা বিখ্যাত চিত্রকর্ম। পাঠ্যাংশে গৃহীত গল্পাংশটি তাঁর ‘ঘরোয়া’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া। 1951 খ্রিস্টাব্দের 5 ডিসেম্বর এই মহান শিল্পী পরলোকগমন করেন।

পাঠপ্রসঙ্গ

ইংরেজশাসিত ভারতবর্ষে স্বাধীনতা আনার ক্ষেত্রে বাংলার একটা বিশেষ ভূমিকা বর্তমান। আর বাংলার অন্যতম প্রধান পরিবার হিসেবে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের নাম করা যেতে পারে। ইংরেজদের শাসনে ও শোষণে বিপর্যস্ত মানুষ তখন ইংরেজ বিতাড়নের উদ্দেশ্যে গোপনে একত্রিত হয়ে ইংরেজবিরোধী কার্যকলাপ শুরু করে। আর তারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মাঝে মাঝে ইংরেজদের আক্রমণ করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে থাকে। এই সময়টাকে বলা হয় স্বদেশি যুগ। ঠাকুর পরিবারের সদস্যরাও ইংরেজবিরোধী কার্যকলাপ সমর্থন করেন। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা কম নয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখার দ্বারা জনগণকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেন। সকলেই এই আবহে মেতে ওঠেন।

অবনীন্দ্রনাথও এই বিষয়ের সমর্থনকারী। অবিভক্ত বাংলার রাজশাহী ডিভিশনের নাটোরে রাজা জগদিন্দ্রনাথের আতিথেয়তায় ও সাহায্যে স্বাধীনতাবিষয়ক প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই প্রসঙ্গেই পরিণত বয়সে লিখতে গিয়ে নাটোরের সম্মেলনের কথা লেখকের মনে পড়েছে। স্বাদেশিকতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ এবং তরুণ বয়সি বেশ কিছু সদস্যের প্রচেষ্টায় এই সম্মেলনেই মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষা প্রথম ব্যবহৃত হয়। তখন পোশাকি ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষারই চল ছিল। তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ভাষার জনসমক্ষে প্রচলন একটি বিশাল পদক্ষেপ বলা যেতে পারে। স্বদেশি যুগের বিষয়ে লেখার প্রসঙ্গেই এই নাটোর-বিষয়ক গল্পটি লেখকের স্মৃতিচারণায় প্রাধান্য পেয়েছে।

বিষয়সংক্ষেপ

স্বদেশি আন্দোলনের পটভূমিকায় পাঠ্যরচনাটি লেখা হয়েছে। এটি একটি স্মৃতিকথামূলক রচনা। সত্য ঘটনাকেই লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর গল্পের মতো করে প্রাঞ্জল ভাষায় পরিবেশন করেছেন। নাটোরে সে বছর প্রভিনসিয়াল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নাটোরের তৎকালীন মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ ঠাকুরবাড়ির বিশিষ্ট সকল মানুষদের এবং তরুণ প্রজন্মের ছেলেদেরও আমন্ত্রণ জানান। অবনীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ এবং আরও বয়স্যবর্গ সকলে মহারাজার ব্যবস্থা করা স্পেশাল ট্রেনে রওনা হন। তারপর সারাঘাট স্টেশনে নেমে পদ্মা নদীতে স্টিমারে চেপে নাটোরে পৌঁছান। পথে অতিথিদের দেখাশোনা, খাওয়াদাওয়া সব কিছুর সুবন্দোবস্ত করা হয়। নাটোরে পৌঁছেও মহারাজার তরফ থেকে অতিথিরা সবিশেষ সমাদর লাভ করেন। মহারাজার নিযুক্ত পরিচারকরা অতিথিদের সকল কাজ করে দিতে থাকে। খাওয়াদাওয়ার বিষয়ে মহারাজা বিশেষ নজর দেন। নাটোরের বিখ্যাত সন্দেশ বাড়িতে টাটকা তৈরি করে খাওয়ানো হয়।

এখানে প্রাদেশিক সম্মেলন শুরু হলে রবীন্দ্রনাথের সহায়তায় তরুণরা সম্মেলনটি সম্পূর্ণ বাংলায় চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। বয়স্করা বা বড়োরা এই প্রস্তাব না মেনে ইংরেজিতেই সম্মেলন শুরুর চেষ্টা করেন, কিন্তু তরুণরা তীব্র প্রতিবাদ জানাতে থাকে এবং বড়োরা বাধ্য হয়ে এই প্রস্তাব মেনে নেন। মূলত এভাবেই জনসম্মেলনে সর্বসমক্ষে বাংলা ভাষা সম্মান পায়।

নামকরণ

বর্তমানে পূর্ববঙ্গের কিন্তু তৎকালীন অবিভক্ত বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের রাজশাহী ডিভিশনের নাটোর নামক বর্ধিষ্ণু গ্রাম বা অঞ্চলের কথা এই গল্পে বর্ণিত হয়েছে। স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ারে তখন বাংলা ভাসছে। সকলের মধ্যেই স্বাদেশিকতার মানসিকতা গড়ে উঠছে। এইরকম অবস্থায় নাটোরে প্রাদেশিক সম্মেলন হবে বলে স্থির হলো। নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ ঠাকুরবাড়ির গুণীজনদের আমন্ত্রণ জানালেন। অবনীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ এবং অন্যান্যরা সকলে তৈরি হলেন যাওয়ার জন্য। মহারাজা অতিথিদের জন্য বিশেষ ট্রেন ও স্টিমারের ব্যবস্থা করলেন। সকলে নাটোরে পৌঁছালেন। গ্রামটি সকলের ভালো লাগল। নাটোরের রানি ভবানী নিজে হাতে পিঠে ও পায়েস করে অতিথিদের খাওয়ালেন। এছাড়া হালুইকর নাটোরের বিখ্যাত মিষ্টি সন্দেশ ও অন্যান্য মিষ্টি তৈরি করে টাটকা খেতে দিল। সকলে খাওয়াদাওয়ার বিষয়ে সম্যক প্রীত হলেন। এরপর নাটোরে প্রাদেশিক সম্মেলন গোলটেবিল বৈঠকের মতো করে অনুষ্ঠিত হলো। সেখানে রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য অনুজ তরুণদের চেষ্টায় সম্মেলনটি সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় সুচারুরূপে সম্পন্ন হলো। এই রচনার সম্পূর্ণটাই নাটোর অঞ্চলটিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। তাছাড়া মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ ঠাকুরবাড়ির সকলের কাছে ‘নাটোর’ নামে পরিচিত ছিলেন। সম্পূর্ণ গল্পে মহারাজা ‘নাটোরে’র ভূমিকাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। নাটোর গ্রাম ও মানুষ ‘নাটোর’—এই দুইয়ের সমন্বিত ভূমিকায় ‘নাটোরের কথা’ রচনাটি পরিবেশিত হয়েছে। তাই রচনাটির ‘নাটোরের কথা’ নামটি সার্থক হয়েছে বলা যেতে পারে।


এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের ষষ্ঠ পাঠের অন্তর্গত ‘নাটোরের কথা’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেছি।

আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

স্বাধীনতা - অষ্টম শ্রেণী - বাংলা - রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – স্বাধীনতা – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

স্বাধীনতা - অষ্টম শ্রেণী - বাংলা - সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – স্বাধীনতা – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

স্বাধীনতা - অষ্টম শ্রেণী - বাংলা - অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – স্বাধীনতা – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

About The Author

Souvick

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – স্বাধীনতা – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – স্বাধীনতা – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – স্বাধীনতা – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – স্বাধীনতা – বিষয়সংক্ষেপ

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – জেলখানার চিঠি – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর