এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের প্রথম পাঠের তৃতীয় অধ্যায়, ‘ইলিয়াস’ -এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করবো। এখানে লেখকের পরিচিতি, গল্পের উৎস, গল্পের পাঠপ্রসঙ্গ, গল্পের সারসংক্ষেপ, গল্পের নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘ইলিয়াস’ সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং গল্পটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এছাড়া, নবম শ্রেণীর পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক ও গল্পের সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

‘ইলিয়াস’ গল্পের লেখক পরিচিতি
লিও তলস্তয়ের জন্ম পরিচয় –
সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার ইয়াসিনা পলিয়ানায় 1828 খ্রিস্টাব্দের 9 সেপ্টেম্বর লিও তলস্তয় জন্মগ্রহণ করেন সম্ভ্রান্ত এক পরিবারে। তাঁর প্রকৃত নাম কাউন্ট লেও নিকোলায়েভিচ্ তলস্তয়। বাবা কাউন্ট নিকোলায় ইলায়িচ তলস্তয়, মা কাউন্টেস মারিয়া তলস্তয়। লেখক ছিলেন তাদের চতুর্থ সন্তান। শৈশবেই তিনি মা-বাবাকে হারিয়ে একা হয়ে পড়েন; সেই একাকিত্ব থেকে আসে অদম্য এক সৃজনশক্তি। মাত্র বারো বছরের তলস্তয় লিখে ফেলেন প্রথম সাহিত্যকর্ম ‘আমার প্রিয় কাকিমাকে’।
লিও তলস্তয়ের শিক্ষা ও সাহিত্য জীবন –
স্কুলজীবনের প্রথম পর্বে তলস্তয় কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি হন, পরে চলে আসেন সেন্ট পিটার্সবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিদ্যাশিক্ষার মধ্যেই চলে তাঁর সাহিত্যচর্চা। 1850 খ্রিস্টাব্দ থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুধ্যান লক্ষিত হয় এবং তারই ফসল 1852 খ্রিস্টাব্দ-তে প্রকাশিত ‘আমার শৈশবের গল্প’। লেখকের অসংখ্য গল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘কসাক’, ‘বনানী ধ্বংস’, ‘বিলিয়ার্ড খেলার মার্কার’, ‘যৌবন’, ‘ল্যুসেন’, ‘হাজি মুরাদ’ প্রভৃতি।
লিও তলস্তয়ের সাহিত্যের স্বরুপ –
মঁপাসা, চেক, ম্যাক্সিম গোর্কি প্রমুখ দিকপাল ধ্রুপদি সাহিত্যিকের। বিরল সান্নিধ্য তলস্তয়ের সাহিত্যপ্রতিভাকে আরও ক্ষুরধার করেছে, তাঁর বিপুল সাহিত্যসম্ভারে এনেছে বৈচিত্র্য ও বৈদগ্ধ্যের রুপোলি আলো। লেখকের শ্রেষ্ঠ অবদানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘ওয়ার অ্যান্ড পীস্’ (রচনাকাল 1862-1868 খ্রিস্টাব্দ), ‘আন্না কারেনিনা’ (রচনাকাল 1878 খ্রিস্টাব্দ), ‘রেজারেকসন’ ইত্যাদি – যেগুলি বিশ্বের ক্লাসিকাল সাহিত্যসম্ভারকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর রচনাগুলি প্রধানত 90 খণ্ডে বিভক্ত।
লিও তলস্তয়ের মৃত্যু –
1910 খ্রিস্টাব্দের 20 নভেম্বর (নতুন পঞ্জিকা অনুসারে) 82 বছর বছর বয়সে সকাল ছটা পাঁচ মিনিটে লিও তলস্তয়ের প্রয়াণ ঘটে। দুটো পঁয়তাল্লিশ মিনিটে ইয়াসিনা পলিনিয়া-তে নিজের বাড়ির নিকটে শৈশবের লীলাক্ষেত্রে ছায়াচ্ছন্ন এক গাছের তলায় তাঁর প্রাক্তন ছাত্র ফোকানভ্ কর্তৃক খোদিত কবরে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।
‘ইলিয়াস’ গল্পের উৎস
লিও তলস্তয়ের লেখা ‘Selected Stories’ গ্রন্থের ‘Stories for Young Readers’ নামক অধ্যায় থেকে ‘ইলিয়াস’ (ILYAS) গল্পটি নেওয়া হয়েছে। গল্পটি লেখা হয় 1885 খ্রিস্টাব্দে।
‘ইলিয়াস’ গল্পের পাঠপ্রসঙ্গ
একদিকে দাসপ্রথা উচ্ছেদ আন্দোলন সদ্য শেষ হয়েছে, অন্যদিকে সমাজ পুনর্গঠনে নবপথরেখার অন্বেষণ চলেছে গোটা রাশিয়াজুড়ে। সেই ক্রান্তিকালে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক লিও তলস্তয়ের (1828-1910 খিস্টাব্দ) আবির্ভাব ঘটে। পপুলিস্ট এবং সর্বহারা বিপ্লবের ভাবধারায় দ্বিধাতাড়িত জাতির কাছে তলস্তয় নিয়ে এসেছিলেন নতুন পথের দিশা। পাশ্চাত্যের অনুসরণে রাশিয়ার উন্নতির পথ হবে কৃষিভিত্তিক, যেখানে আধুনিক শিল্পীকরণ থাকবে পশ্চাতে। শৈশব জীবনের ভাগ্যবিড়ম্বনা, ককেশাসের মর্মান্তিক যুদ্ধ, অহিংসার অন্বেষণ, আধ্যাত্মিকতার অনুশীলন, প্রেমের বহুমাত্রিকতা, গণশক্তির জাগরণ-লিও তলস্তয়ের সাহিত্যে বর্ণময়তা দান করেছে। সমকালীন রাশিয়ার-সমাজের বিনির্মাণ, ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়েন ও অস্তিত্বরক্ষার কথা, যূথ জীবনযাপনের ভাবনা তাঁর ছোটোগল্পগুলিতে প্রতিফলিত হয়েছে। ‘কসাক’-এও মানবজীবনের সহজ দর্শনের কথা উঠে এসেছে।
‘ইলিয়াস’ গল্পের বিষয়সংক্ষেপ
লিও তলস্তয়ের ‘ইলিয়াস’ গল্পটিতে ইলিয়াসের জীবনে সামগ্রিক উত্থান ও পতনের কাহিনিটি চিত্রিত হয়েছে। প্রথম জীবনে ইলিয়াস দরিদ্র হলেও পঁয়ত্রিশ বছরের প্রভূত পরিশ্রমে সে অনেক সম্পত্তি গড়ে তুলেছিল। এই সময় ইলিয়াসের বাড়বাড়ন্ত দেখে প্রতিবেশীরা হিংসা করত। কিন্তু ইলিয়াস অত্যন্ত অতিথিবৎসলও ছিল, তাই তার প্রতিপত্তি স্বদেশের সীমা অতিক্রম করে বিদেশেও পৌঁছে গিয়েছিল। অত্যন্ত ধনী হওয়ার ফলে একসময় ইলিয়াসের ছেলেরা আয়েশি হয়ে পড়ল। তাঁর বড়ো ছেলে মারামারি করতে গিয়ে মারা গেল এবং ছোটো ছেলে পিতার অমতে ঝগড়াটে বউ বিয়ে করে আনল। পারিবারিক অশান্তি মেটাতে সম্পত্তির ভাগ দিয়ে ইলিয়াস ছেলেকে বাড়িছাড়া করেছিল। এরপর তাঁর জীবনে দুর্যোগ নেমে এল। ইলিয়াস কিছুকাল পরেই সর্বস্ব হারিয়ে সর্বশ্রান্ত হয়ে পড়ল। কাছাকাছি কোনো আত্মীয় না থাকায় বৃদ্ধ ইলিয়াস তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রী শাম-শেমাগিকে নিয়ে প্রতিবেশী মহম্মদ শা-র আশ্রয় গ্রহণ করল। সেখানে তারা ভাড়াটে মজুরের মতো কাজ করতে লাগল। মহম্মদ শা তাদের করুণার চোখে দেখত এবং যথাসম্ভব সহায়তা করত। মহম্মদ শার বাড়িতে অতিথিরা এলে তাদের মধ্যে একজন ইলিয়াসকে দেখে চিনতে পারে। ইলিয়াসের এই পরিণতি দেখে তারা সহানুভূতি জানালে ইলিয়াস ও তাঁর পত্নী বলে তারা যথেষ্ট সুখে রয়েছে। ইলিয়াস প্রথম জীবনে সম্পত্তির অধিকারী হলেও নানা কারণে মনে দুশ্চিন্তা ছিল, ঈশ্বরকে আরাধনার সময়ও তাদের ছিল না, নিত্য অশান্তি লেগে থাকত। কিন্তু জীবনে দারিদ্র্য নেমে এলে তাদের আর কিছু হারাবার ভয় ছিল না। সেখানে সারাদিন তারা প্রভুর সেবা করত আর দিনান্তে ঈশ্বর সাধনা। তাদের মতে এইসময়ই তারা জীবনের সার্থক মর্মার্থ উপলব্ধি করেছিল।
‘ইলিয়াস’ গল্পের নামকরণ
ভূমিকা
সাহিত্যের ক্ষেত্রে শিরোনাম একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। নামকরণের মধ্যে দিয়ে পাঠক সাহিত্যিকের সৃষ্টি সম্বন্ধে সাহিত্যরচনার পূর্বেই একটি আভাস পেয়ে যায়। সেক্ষেত্রে সাহিত্যিক ও পাঠকের মাঝে নামকরণ এক প্রারম্ভিক সেতু রচনা করে, যার আলোয় সচেতন পাঠকের মূল বিষয়ে প্রবেশ করা সহজতর হয়। নামকরণে সাহিত্যিকের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে – সেই স্বাধীনতার প্রকাশ ঘটেছে লিও তলস্তয় রচিত এবং মনীন্দ্র দত্ত কর্তৃক অনূদিত ‘ইলিয়াস’ গল্পটিতে। গল্পকার এখানে মূল চরিত্রের প্রতি বিশেষ আলোকসম্পাত করে আলোচ্য শিরোনামটি ব্যবহার করেছেন।
সুখ যে অর্থ-নিরপেক্ষ এক মহার্ঘ মানসিক বিষয়, সেই উপলব্ধির কথা ব্যক্ত হয়েছে উত্থানপতনে ভরা ইলিয়াসের বর্ণময় জীবনকাহিনির মধ্য দিয়ে। প্রত্যন্ত প্রদেশ উফার সামান্য এক বাস্কির ইলিয়াস তার স্ত্রী শাম-শেমাগির সহায়তায় শ্রম আর নিষ্ঠার মাধ্যমে বিপুল সম্পদশালী হয়ে ওঠে। গুটিকয়েক পশু নিয়ে যাত্রা করে পঁয়ত্রিশ বছরে ইলিয়াস দুশো ঘোড়া, দেড়শো গোরু-মোষ আর বারোশো ভেড়া’র বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়; তার নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে, ঈর্ষান্বিত হয় প্রতিবেশীরা।
‘ইলিয়াস’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা
এহেন ধনী ইলিয়াসের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে পারিবারিক কলহ, দুর্ভিক্ষ, মড়ক। সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে বৃদ্ধ দম্পতি। সর্বহারা হয়ে তারা আশ্রয় নেয় জনৈক প্রতিবেশী মহম্মদ শা-র বাড়িতে। শুরু হয় মজুরের জীবন। তারা মেনে নেয় ভাগ্যের এই পরিহাস। কিন্তু এমন জীবনে সম্পদরক্ষাজনিত উৎকণ্ঠা থাকে না, বরং প্রাণের কথা বলার সুযোগ থাকে, ঈশ্বর আরাধনার অবসরও হয় – সেই পথেই দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের দাম্পত্য জীবনে তারা প্রথমবার সুখের পরশ লাভ করে। ইলিয়াসের জীবনের আপাত এই অবিশ্বাস্য কাহিনি শুনিয়েছিল বৃদ্ধা শাম-শেমাগি। আর মোল্লাসহ মহম্মদ শা-র সমাগত অতিথিরা স্তম্ভিত হয়েছিল। জ্ঞানের কথার সঙ্গে ইলিয়াসের জীবনকথা মিলে গিয়েছিল চমৎকারভাবে। গল্পের যাবতীয় ঘটনাক্রম ইলিয়াসকে অবলম্বন করেই আবর্তিত বলে, এ গল্পের নামকরণ সহজবোধ্য ও সার্থক হয়েছে।
এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের প্রথম পাঠের তৃতীয় অধ্যায়, ‘ইলিয়াস’ -এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করবো। এখানে লেখকের পরিচিতি, গল্পের উৎস, গল্পের পাঠপ্রসঙ্গ, গল্পের সারসংক্ষেপ, গল্পের নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘ইলিয়াস’ সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দিয়েছে এবং গল্পটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এছাড়া, নবম শ্রেণীর পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক পরিচিতি, গল্পের নামকরণ ও গল্পের সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য করুন