এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘সংবহন’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

রক্ত কী?
রক্তরস ও রক্তকণিকার সমন্বয়ে গঠিত যে তরল যোগকলা প্রাণীদেহে মুখ্য সংবহন মাধ্যমরূপে কাজ করে, তাকে রক্ত বলে।
রক্তের মাধ্যমে কী কী বস্তু সংবাহিত হয়?
রক্তের মাধ্যমে খাদ্য, গ্যাসীয় উপাদান, রেচনবস্তু, হরমোন প্রভৃতি উপাদান বা বস্তু সংবাহিত হয়।
হিমোসিল কাকে বলে? কোন্ প্রাণীদেহে হিমোসিল দেখা যায়?
অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের যে দেহগহ্বরে রক্ত প্রবাহিত হয়, তাকে হিমোসিল বলে। আরশোলা, চিংড়ি প্রভৃতি সন্ধিপদী প্রাণী এবং শামুক, ঝিনুক প্রভৃতি কম্বোজী প্রাণীদেহে হিমোসিল দেখা যায়।
হিমোলিম্ফ কাকে বলে?
পতঙ্গশ্রেণির প্রাণীদের শ্বাসরঞ্জক বা হিমোগ্লোবিন বিহীন বর্ণহীন রক্তকে হিমোলিম্ফ বলে। হিমোলিম্ফ রক্তরস ও শ্বেত রক্তকণিকার সমন্বয়ে গঠিত হয়।
প্লাজমা প্রোটিন কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
রক্তরসে যে-সমস্ত প্রোটিন পাওয়া যায়, তাদের প্লাজমা প্রোটিন বলে।
উদাহরণ – সিরাম অ্যালবুমিন, সিরাম গ্লোবিউলিন, ফাইব্রিনোজেন ও প্রোথ্রম্বিন।
লসিকায় উপস্থিত দুটি কোশীয় উপাদান ও দুটি প্রোটিনের নাম লেখো।
কোশীয় উপাদান – লিম্ফোসাইট, অল্পসংখ্যায় মনোসাইট।
প্রোটিন – ফাইব্রিনোজেন, প্রোথ্রম্বিন।
রক্তের সাকার উপাদান বলতে কী বোঝায়?
রক্তের তিনপ্রকার কোশীয় উপাদান বা কণিকাতে বিভিন্ন প্রকার কোশীয় অঙ্গাণু অনুপস্থিত। এ ছাড়া এদের আদর্শ কোশের মতো বৈশিষ্ট্যগুলিও থাকে না। একারণে লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা ও অণুচক্রিকাকে রক্তের সাকার উপাদান বলা হয়।
মানুষের লোহিত রক্তকণিকার পার্শ্বদৃশ্য ডাম্বেলের মতো দেখায় কেন?
মানুষসহ সমস্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের লোহিত রক্তকণিকা নিউক্লিয়াসবিহীন হয়। এর ফলে লোহিত রক্তকণিকার কেন্দ্রস্থল চুপসে যায় এবং প্রান্তদুটি খোলা থাকে। এই কারণে লোহিত রক্তকণিকার গঠন দ্বিঅবতল হয় ও পার্শ্বদৃশ্যে একে ডাম্বেলের মতো দেখায়।
মেরুদণ্ডী প্রাণীর রক্ত লাল রঙের হয় কেন?
মেরুদণ্ডী প্রাণীর রক্ত লাল রঙের হয়, কারণ – রক্তের লোহিত রক্তকণিকায় লৌহঘটিত রঞ্জক হিমোগ্লোবিন থাকে। হিমোগ্লোবিন অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে লাল রঙের অক্সিহিমোগ্লোবিন যৌগ গঠন করে।
আরশোলার রক্ত লাল নয় কেন?
আরশোলার রক্ত (হিমোলিম্ফে) কোনো রক্তরঞ্জক বিশেষতঃ হিমোগ্লোবিন না থাকায় আরশোলার রক্ত সাধারণতঃ বর্ণহীন বা লাল বর্ণের হয় না।
নীল রক্ত কাকে বলে? কোন্ প্রাণীর দেহে নীলরক্ত পাওয়া যায়?
কিছু কিছু অমেরুদণ্ডী প্রাণীর রক্তে হিমোসায়ানিন নামক তাম্রঘটিত শ্বাসরঞ্জক বর্তমান থাকে। হিমোসায়ানিন অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অক্সিহিমোসায়ানিন নামক যৌগ গঠন করে, যার রং হালকা নীল। অক্সিহিমোসায়ানিনযুক্ত রক্তকে নীলরক্ত বলে।
চিংড়ি, অক্টোপাস, ললিগো, সেপিয়া প্রভৃতি প্রাণীদেহে নীল রক্ত দেখা যায়।
হিমোসায়ানিন -এর অবস্থান ও কাজ লেখো।
হিমোসায়ানিন -এর অবস্থান – হিমোসায়ানিন মোলাস্কা ও আর্থ্রোপোডা পর্বের প্রাণীতে দেখতে পাওয়া যায়।
হিমোসায়ানিন -এর কাজ – শ্বাসবায়ু পরিবহণে সাহায্য করা হিমোসায়ানিনের প্রধান কাজ।
অ্যাগ্লুটিনোজেন কাকে বলে? মানবরক্তে কত প্রকারের অ্যাগ্লুটিনোজেন পাওয়া যায়?
মানুষের লোহিত রক্তকণিকার কোশঝিল্লিতে রক্তগ্রুপ নির্ধারণকারী যে বিশেষ ধরনের বহুশর্করা উপস্থিত থাকে, তাকে অ্যাগ্লুটিনোজেন বলে। মানবরক্তে তিনপ্রকার অ্যাগ্লুটিনোজেন উপস্থিত থাকে। যথা –
- অ্যাগ্লুটিনোজেন-A,
- অ্যাগ্লুটিনোজেন B ও
- Rh অ্যাগ্লুটিনোজেন।
অ্যাগুটিনিন কাকে বলে? মানবরক্তে কত প্রকার অ্যামুটিনিন বর্তমান?
মানুষের রক্তের রক্তরসে বা প্লাজমায় যে বিশেষ ধরনের প্রোটিনজাতীয় পদার্থ উপস্থিত থাকে এবং লোহিত রক্তকণিকার অ্যাগুটিনেশন ঘটায়, তাকে অ্যাগ্লুটিনিন বলে। মানবরক্তে মোট দুপ্রকার অ্যাগ্লুটিনিন থাকে। যথা – α-অ্যাগ্লুটিনিন ও β-অ্যাগ্লুটিনিন।
মানবদেহকে রোগজীবাণুর হাত থেকে রক্ষায় রক্তের ভূমিকা উল্লেখ করো। অথবা, শ্বেত রক্তকণিকার প্রতিরক্ষামূলক কাজগুলি লেখো।
শ্বেত রক্তকণিকার প্রতিরক্ষামূলক কাজ –
- রোগজীবাণু ধ্বংস – দেহে প্রবিষ্ট রোগজীবাণুকে নিউট্রোফিল ও মনোসাইট শ্বেতরক্তকণিকা আগ্রাসন বা ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে আত্মসাৎ করে এবং পাচনের মাধ্যমে তাদের ধ্বংস করে।
- অ্যান্টিবডি উৎপাদন – B-লিম্ফোসাইট অ্যান্টিবডি (গামা গ্লোবিউলিন প্রোটিন) উৎপাদনের মাধ্যমে দেহে প্রবিষ্ট বিজাতীয় বস্তু বা অ্যান্টিজেনকে ধ্বংস করে।
- কোশভিত্তিক অনাক্রম্যতা – T-লিম্ফোসাইট কোশভিত্তিক অনাক্রম্যতার দ্বারা দেহকে রোগজীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করে।
তিনটি প্লাজমা প্রোটিন ও তাদের কাজ লেখো।
| প্লাজমা প্রোটিন | কাজ |
| সিরাম অ্যালবুমিন | ক্যালশিয়াম পরিবহণে সাহায্য করে। |
| সিরাম গ্লোবিউলিন | থাইরক্সিন হরমোন, ভিটামিন A, D, E ও K, লিপিড প্রভৃতি আবদ্ধকরণে ও পরিবহণে সাহায্য করে। |
| প্রোথম্বিন | রক্ততঞ্চনে সাহায্য করে। |
রক্ততঞ্চন বিলম্বিত হয় কেন?
রক্ততঞ্চন বিলম্বিত হওয়ার কারণগুলি হল – উষ্ণতা হ্রাস, ক্যালশিয়াম আয়নের অভাব, ফাইব্রিনোজেনের পরিমাণ হ্রাস এবং হেপারিন, হিরুডিন প্রভৃতি তঞ্চনবিরোধী পদার্থের উপস্থিতি।
সিরাম (Serum) কী?
ক্ষতস্থানে রক্ততঞ্চনের পর তঞ্চনপিণ্ড থেকে যে হালকা হলুদ রঙের তরল পদার্থ নিঃসৃত হয়, তাকে রক্তমতু বা সিরাম বলে। সিরামে রক্তকণিকা, ফাইব্রিনোজেন, প্রোথ্রম্বিন প্রভৃতি প্রোটিন থাকে না।
রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে অণুচক্রিকা কীভাবে ভূমিকা পালন করে?
রক্তক্ষরণ বন্ধে অণুচক্রিকার ভূমিকা –
- রক্ততঞ্চন – বিদীর্ণ অণুচক্রিকা থ্রম্বোপ্লাস্টিন (থ্রম্বোকাইনেজ) নামক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রক্ততঞ্চনকারী পদার্থ উৎপন্ন করে যা নিষ্ক্রিয় প্রোথ্রম্বিনকে সক্রিয় থ্রম্বিনে পরিণত করে ও রক্ততঞ্চনের সূচনা হয়।
- প্লাগ সৃষ্টি – রক্তবাহের ক্ষতস্থানের অমসৃণ তলের সংস্পর্শে অণুচক্রিকাগুলি মিলিতভাবে একটি অনিয়মিত পদার্থ গঠন করে। একে প্লাগ বলে। এই প্লাগ ক্ষতস্থানটিকে বন্ধ করে দেয় ও রক্তক্ষরণ থেমে যায়।
- রক্তবাহের সংকোচন সৃষ্টি – বিদীর্ণ অণুচক্রিকা সেরোটোনিন, প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন প্রভৃতি হরমোন ক্ষরণ করে, যা রক্তবাহের সংকোচন ঘটায় ও রক্তক্ষরণ বন্ধ করে।
রক্ততঞ্চনের গুরুত্ব বা তাৎপর্য কী?
রক্ততঞ্চনের গুরুত্ব বা তাৎপর্য –
- ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে দেহে রক্তের পরিমাণ নির্দিষ্ট রাখে।
- রক্ততঞ্চন ব্যাহত হলে রক্তের চাপ কমে যাবে ফলে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ভৌত প্রক্রিয়া (যেমন – অভিস্রবণ, ব্যাপন প্রভৃতি) ব্যাহত হবে।
- অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে দেহে রক্তের প্রবাহ হ্রাস পাবে এবং খাদ্যবস্তু, O₂ – CO₂ পরিবহণ, মূত্র উৎপাদন, রেচনবস্তুর অপসারণ প্রভৃতি কাজগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আমাদের দেহে বর্তমান একটি রক্ততঞ্চনবিরোধী পদার্থের নাম লেখো। এটি কোথা থেকে ক্ষরিত হয় এবং রক্ততঞ্চনরোধে কীভাবে ভূমিকা পালন করে?
আমাদের দেহে বর্তমান একটি রক্ততঞ্চনবিরোধী পদার্থ হল হেপারিন।
- হেপারিনের উৎস – যকৃৎ, ফুসফুস, মাস্ট কোশ ও বেসোফিল শ্বেতরক্তকণিকা।
- হেপারিনের কাজ – হেপারিন প্রোথ্রম্বিনকে থ্রম্বিনে পরিণত হতে বাধা দেয়। ফলে ফাইব্রিনোজেন ফাইব্রিনে রূপান্তরিত হতে পারে না এবং রক্তবাহের মধ্যে রক্ততঞ্চন ঘটে না।
দেহের রক্তবাহের মধ্যে প্রবহমান রক্ত সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় জমাট বাঁধে না কেন?
রক্তনালীর মধ্যে প্রবহমান রক্ত জমাট না বাঁধার কারণ –
- থ্রম্বোপ্লাস্টিনের অনুপস্থিতি – রক্তবাহের অন্তর্গাত্র অত্যন্ত মসৃণ হওয়ায় অণুচক্রিকা বিদীর্ণ হয় না, ফলে থ্রম্বোপ্লাস্টিন নির্গত হয় না।
- হেপারিনের উপস্থিতি – বেসোফিল শ্বেতরক্তকণিকা, যকৃৎকোশ, অ্যারিওলার যোগকলার মাস্ট কোশ প্রভৃতি থেকে হেপারিন ক্ষরিত হয় যা প্রোথ্রম্বিনকে থ্রম্বিনে পরিণত হতে বাধা দেয়।
- রক্তপ্রবাহের গতি – রক্তবাহের ভিতর প্রবহমান রক্তের গতি রক্তকে জমাট বাঁধতে বাধা দেয়।
মেরুদণ্ডী প্রাণীদেহে রক্তপ্রবাহের কারণ কী?
মেরুদণ্ডী প্রাণীদেহে রক্তপ্রবাহের কারণ –
- হৃৎপিণ্ডের নিলয়ের স্বতঃস্ফূর্ত সংকোচন বা পাম্প -এর মতো ক্রিয়া রক্তপ্রবাহে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
- ধমনি, শিরা ও রক্তজালকে রক্তচাপের পার্থক্য রক্তকে প্রবাহিত অবস্থায় থাকতে সাহায্য করে।
- হৃৎপিণ্ড ও শিরায় উপস্থিত কপাটিকাগুলি রক্তের একমুখী প্রবাহে সাহায্য করে।
- ধমনি গহ্বর সরু হওয়ায় রক্তের গতি বাড়ে ও অস্থিপেশির সংকোচন শিরাতে রক্তকে প্রবহমান অবস্থায় থাকতে সাহায্য করে।
ক্রস-ম্যাচিং কাকে বলে?
ক্রস-ম্যাচিং (Cross matching) – যে পদ্ধতির সাহায্যে দাতার লোহিত রক্তকণিকা গ্রহীতার প্লাজমাস্থিত অ্যাগুটিনিন দ্বারা এবং গ্রহীতার লোহিত রক্তকণিকা দাতার প্লাজমাস্থিত অ্যাগ্লুটিনিন দ্বারা পিণ্ডে পরিণত হয় কি না নির্ধারণ করা হয়, তাকে ক্রস ম্যাচিং বলে।
ক্রস-ম্যাচিং -এর গুরুত্ব কী?
ক্রস-ম্যাচিং -এর গুরুত্ব –
- সাধারণত রক্ত সঞ্চালনের সময় দাতার প্লাজমা (পরিমাণে কম) গ্রহীতার প্লাজমা (পরিমাণে বেশি) দ্বারা লঘুকরণ হওয়ায় দাতার প্লাজমাস্থিত অ্যাগুটিনিন গ্রহীতার লোহিত রক্তকণিকার পিণ্ডভবন (অ্যাগ্লুটিনেশন) ঘটাতে পারে না।
- কিন্তু কোনো কারণে দাতার রক্তে অ্যাঙ্গুটিনিন বেশি ঘনত্বে থাকলে বা সর্বজনীন দাতার রক্ত বেশি পরিমাণে গ্রহীতার দেহে প্রবেশ করালে বিপদের সম্ভাবনা থাকে।
- একারণে বর্তমানে ক্রস ম্যাচিং ছাড়া অন্য রক্তগ্রুপের রক্ত শিরান্তর রক্ত সঞ্চালনের জন্য অনুমোদন করা হয় না।
অ্যান্টিসিরাম ব্যবহার করে দাতা ও গ্রহীতা ব্যক্তির রক্তের ক্রশ ম্যাচিং কীভাবে করা হয়?
লোহিতকণিকা যদি অ্যান্টি-A -এর সংস্পর্শে জমাট বাঁধে তবে তা A শ্রেণির রক্ত, যদি অ্যান্টি-B -এর সংস্পর্শে জমাট বাঁধে তবে তা B শ্রেণির রক্ত এবং কোনো অ্যান্টিসিরামের পৃথক বা একত্রিত অবস্থায় সংস্পর্শে জমাট না বাঁধে তবে তা O শ্রেণির রক্ত হিসেবে নির্ধারিত হয়। এই ভাবে অ্যান্টিসিরাম ব্যবহার করে রক্তের ক্রশ ম্যাচিং করা হয়।
বিসংগতি বা ইনকমপ্যাটিবল রক্তসঞ্চারণের বিপত্তিগুলি উল্লেখ করো।
বিসংগতি বা Incompatible রক্তসঞ্চারণের বিপত্তি –
- রক্তগ্রুপের ভিত্তিতে সম্ভব নয় এমন ক্ষেত্রে শিরান্তর রক্ত সঞ্চালন ঘটলে প্রথমেই গ্রহীতার দেহে দাতার লোহিত রক্তকণিকার অ্যাপ্লুটিনেশন বা পিণ্ডভবন এবং পরে হিমোলাইসিস ঘটে।
- হিমোলাইসিসের ফলে গ্রহীতার দেহে পরবর্তীকালে জন্ডিস দেখা দেয়।
হিমোলাইসিস (Haemolysis) কী?
রক্তদানের সময় রক্ত সঞ্চারণ ত্রুটিপূর্ণ হলে গ্রহীতার প্রতিরক্ষাতন্ত্র গৃহীত লোহিত রক্তকোশকে বিনষ্ট করে। এই ঘটনাকে বলে হিমোলাইসিস। রক্তগ্রুপ ম্যাচিং সঠিক না হলে এই সমস্যা দেখা যায়।
ত্রুটিপূর্ণ রক্তসঞ্চারণের ফলে হিমোলাইসিস হয় কেন?
ত্রুটিপূর্ণ রক্তসঞ্চারণ করলে রক্তের লোহিত কণিকার প্লাজমা পর্দাস্থিত অ্যান্টিজেন এবং রক্তরসে অবস্থিত অ্যান্টিবডির বিক্রিয়ার কারণে লোহিত রক্তকণিকার পুঞ্জীভবন ও বিদারণ ঘটতে পারে।
হৃৎপিণ্ড অসাড় বা অবসাদগ্রস্ত হয় না কেন?
হৃৎপিণ্ডের অসাড় বা অবসাদগ্রস্ত না হওয়ার কারণ –
- দীর্ঘ নিঃসাড়কাল – হৃৎপেশির নিঃসাড়কাল দীর্ঘস্থায়ী। ফলে বারবার উদ্দীপনা প্রয়োগ করলেও হৃৎপেশি উদ্দীপিত হয় না এবং হৃৎপিণ্ডে অসাড়তা সৃষ্টি হয় না।
- ল্যাকটিক অ্যাসিড বিপাক – হৃৎপেশিতে উৎপন্ন ল্যাকটিক অ্যাসিড পুষ্টির জন্য ব্যবহৃত হয়ে যায় ফলে ল্যাকটিক অ্যাসিড সঞ্চিত হতে পারে না এবং হৃৎপেশিও ক্লান্ত হয় না।
- মায়োগ্লোবিনের উপস্থিতি – হৃৎপেশি বেশি পরিমাণ মায়োগ্লোবিনযুক্ত হওয়ায় বেশি পরিমাণে O₂ আবদ্ধ করতে পারে যা হৃৎপিণ্ডের অধিক ক্রিয়ার সময় ব্যবহৃত হয়।
পেরিকার্ডিয়াম কী? এর কাজ লেখো।
পেরিকার্ডিয়াম (Pericardium) – হৃৎপিণ্ডকে ঘিরে যে পাতলা পর্দার আবরণ থাকে, তাকে পেরিকার্ডিয়াম বলে।
পেরিকার্ডিয়ামের কাজ –
- হৃৎপিণ্ডকে স্বতন্ত্রতা দান করে।
- হৃৎপিণ্ডকে বাহ্যিক আঘাত থেকে রক্ষা করে।
- হৃৎপিণ্ডকে বেশি প্রসারিত হতে বাধা দেয়।
- পেরিকার্ডিয়ামে উপস্থিত তরল হৃৎপিণ্ডের স্বতঃস্ফূর্ত সংকোচন ও প্রসারণে সাহায্য করে।
একচক্রী রক্তসংবহন কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
একচক্রী রক্তসংবহন (Single Circuit Circulation) – যে বদ্ধ রক্তসংবহন পদ্ধতিতে সারাদেহের রক্ত কেবলমাত্র একবারই হৃৎপিণ্ডে যায়, তাকে একচক্রী রক্তসংবহন বলে।
উদাহরণ – মাছের রক্তসংবহন।
একচক্রী রক্তসংবহনের শব্দচিত্র –

দ্বিচক্রী রক্তসংবহন কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
দ্বিচক্রী রক্তসংবহন (Double Circuit Circulation) – যে বন্ধ রক্তসংবহন পদ্ধতিতে সারা দেহের রক্ত সংবহনকালে দুবার হৃৎপিণ্ডে প্রবেশের মাধ্যমে একবার সম্পূর্ণ সংবহন ক্রিয়া সম্পন্ন করে, তাকে দ্বিচক্রী রক্তসংবহন বলে।
উদাহরণ – ব্যাং, সাপ, পাখি, মানুষ প্রভৃতি প্রাণীর রক্তসংবহন।
দ্বিচক্রী রক্তসংবহনের শব্দচিত্র –

ভেনাস হৃৎপিণ্ড কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
একটিমাত্র অলিন্দ ও নিলয় দ্বারা গঠিত যে হৃৎপিণ্ডের মধ্যে দিয়ে কেবলমাত্র দূষিত রক্ত প্রবাহিত হয়, তাকে ভেনাস হৃৎপিণ্ড বলে। যেমন – মাছের হৃৎপিণ্ড। কপাটিকা না থাকার কারণে ভেনাস হৃৎপিণ্ডে দূষিত ও বিশুদ্ধ রক্তের মিশ্রণ ঘটে।

প্যাপিলারি পেশি কী? কর্ডিটেনডনি কী?
প্যাপিলারি পেশি মানুষের হৃৎপিণ্ডের অভ্যন্তরে নিলয়ের গাত্রে যে ছোটো, বড়ো আঙুলের ন্যায় প্রবর্ধক লক্ষ করা যায়, তাদের প্যাপিলারি পেশি বা পীড়কা পেশি বলে।
কার্ডিটেলডলি – হৃৎপিণ্ডের নিলয়স্থিত প্যাপিলারি পেশি যে-সমস্ত সরু সুতোর মতো পেশিতন্ত দ্বারা দ্বিপত্র ও ত্রিপত্র কপাটিকার খোলামুখের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাকে কর্ডিটেনডনি বলে।
কর্ডিটেনডনির কাজ কী?
কর্ডিটেনডনির কাজ – নিলয় সংকোচনের সময় কর্ডিটেনডনি দ্বিপত্র ও ত্রিপত্র কপাটিকাদ্বয়কে অলিন্দের দিকে খুলতে বাধা দেয়।
মানব হৃৎপিণ্ডের প্রাচীরের বিভিন্ন স্তরগুলির নাম লেখো।
মানব হৃৎপিণ্ডের প্রাচীর তিনটি স্তরযুক্ত এগুলি হল –
- এন্ডোকার্ডিয়াম – ভেতরের স্তর,
- মায়োকার্ডিয়াম – পুরু, পেশিবহুল মধ্যস্তর,
- এপিকার্ডিয়াম – বাইরের স্তর।
শিরা কয় প্রকার ও কী কী?
শিরা দুপ্রকার। যথা –
- সিস্টেমিক শিরা – যে-সমস্ত শিরা দেহস্থ কোনো রক্তজালক থেকে উৎপত্তি লাভ করে সরাসরি হৃৎপিণ্ডে এসে মিলিত হয়, তাদের সিস্টেমিক শিরা বলে।
- পোর্টাল শিরা – যে-সমস্ত শিরা দেহস্থ কোনো রক্তজালক থেকে উৎপত্তি লাভ করে সরাসরি হৃৎপিণ্ডে মিলিত না হয়ে দেহের অন্য কোনো অঙ্গে (প্রধানত যকৃৎ বা বৃক্কে) পুনরায় রক্তজালক গঠন করে (অর্থাৎ, শিরার উভয় প্রান্তেই রক্তজালক বর্তমান থাকে), তাদের পোর্টাল শিরা বলে। যেমন – হেপাটিক পোর্টাল শিরা।
সিস্টেমিক সংবহন কাকে বলে?
যে ধরনের সংবহনে রক্ত হৃৎপিণ্ড থেকে ধমনির মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন কলাকোশে ছড়িয়ে পড়ে এবং কলাকোশ থেকে রক্ত শিরার মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডে ফিরে আসে, তাকে সিস্টেমিক সংবহন বলে।
পোর্টাল সংবহন কাকে বলে?
যে ধরনের সংবহনে রক্ত কোনো দেহস্থ জালক থেকে পোর্টাল শিরার মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডে ফেরার পথে অগ্রসর হয়ে হৃৎপিণ্ডে না ফিরে অন্য কোনো অঙ্গে (যকৃত, বৃক্ক) প্রবেশ করে পুনরায় জালক সৃষ্টি করে এবং শেষে জালক থেকে বেরিয়ে সংশ্লিষ্ট অঙ্গের শিরার মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডে ফেরে, তাকে পোটাল সংবহন বলে। উদাহরণ – হেপাটিক (যকৃৎ) এবং রেনাল (বৃক্ক) পোর্টাল সংবহন।
ABO পদ্ধতি বলতে কী বোঝো?
1900 খ্রিষ্টাব্দে বিজ্ঞানী ল্যান্ডস্টেইনার লোহিত রক্তকণিকার প্লাজমা পর্দায় অবস্থিত অ্যান্টিজেন এবং রক্তরসে উপস্থিত অ্যান্টিবডির উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে রক্তকে A, B, AB এবং O এই চারটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেন। এই গোষ্ঠীবিভাজন পদ্ধতিকে ABO রক্তগোষ্ঠী বা ABO blood group বলে।
সর্বজনীন দাতা (Universal Donor) কাকে বলে?
যে ব্যক্তির রক্তের লোহিত রক্তকণিকার কোশঝিল্লিতে কোনো অ্যাগ্লুটিনোজেন থাকে না, ফলে যে-কোনো রক্তগ্রুপভুক্ত গ্রহীতাকেই রক্তদান করতে পারে, তাকে সর্বজনীন দাতা বলে। যেমন – O রক্তগ্রুপভুক্ত ব্যক্তিকে সর্বজনীন দাতা বা সার্বিক দাতা বলে।
সর্বজনীন গ্রহীতা (Universal Receptor) কাকে বলে?
যে ব্যক্তির রক্তের রক্তরসে কোনো প্রকারের অ্যাগুটিনিন না থাকায় সব রক্তগ্রুপভুক্ত রক্ত গ্রহণ করতে পারে, তাকে সর্বজনীন গ্রহীতা বা সার্বিক গ্রহীতা বলে। যেমন – AB-রক্তগ্রুপভুক্ত ব্যক্তিকে সর্বজনীন গ্রহীতা বলে।
অ্যাগ্লুটিনেশন (Agglutination) কী?
দাতা ও গ্রহীতার রক্ত একই গ্রুপভুক্ত বা মিলনক্ষম গ্রুপভুক্ত না হলে দাতার লোহিত রক্তকণিকাগুলি গ্রহীতার রক্তরসের অ্যাগ্লুটিনিন -এর সংস্পর্শে পিণ্ডে পরিণত হয় (বা জমাট বেঁধে যায়)। লোহিত রক্তকণিকার এইরূপ জমাট বেঁধে যাওয়াকে পিণ্ডভবন বা অ্যাগ্লুটিনেশন বলে।
শিরান্তর রক্তসঞ্চালনের সময় কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার?
- শিরান্তর রক্তসঞ্চালনের আগে দাতা ও গ্রহীতার রক্তগ্রুপ সতর্কতার সঙ্গে নির্ণয় করা প্রয়োজন।
- দাতা ও তার রক্তনমুনা যেন সংক্রামক জীবাণু (যেমন – HIV, হেপাটাইটিস-B ভাইরাস, ম্যালেরিয়া জীবাণু) মুক্ত থাকে।

Rh পজিটিভ বা Rh+ ও Rh নেগেটিভ বা Rh– বলতে কী বোঝো?
Rh পজিটিভ বা Rh+ – যে-সমস্ত ব্যক্তির রক্তে লোহিত রক্তকণিকার কোশঝিল্লিতে Rh ফ্যাক্টর উপস্থিত থাকে, তাকে Rh পজিটিভ বা Rh+ বলে। এই রক্ত Rh– অ্যান্টিবডির সংস্পর্শে এলে লোহিত কণিকা পিণ্ডে পরিণত হয়।
Rh নেগেটিভ বা Rh– – যে ব্যক্তির রক্তের লোহিত কণিকার কোশঝিল্লিতে Rh ফ্যাক্টর থাকে না, তাকে Rh নেগেটিভ বা Rh– বলে।
কোনো Rh ব্যক্তির দেহে Rh+ রক্ত সঞ্চারণ করলে কী ঘটনা ঘটবে?
কোনো Rh– ব্যক্তির দেহে Rh+ রক্ত সঞ্চারণ করা হলে 14 দিন পর গ্রহীতার রক্তে Rh-অ্যান্টিবডির সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে প্রথমবার রক্ত সঞ্চারণের ফলে গ্রহীতার দেহে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঘটে না। কিন্তু গ্রহীতার দেহে দ্বিতীয়বার রক্ত সঞ্চারণ ঘটালে প্রবিষ্ট রক্তের (দাতার রক্ত) লোহিত রক্তকণিকাগুলি পিণ্ডে পরিণত হবে এবং ব্যক্তির মৃত্যু ঘটবে।
রক্তদান সম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণার উল্লেখ করো।
রক্তদান সম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণাগুলি হল –
- রক্তদান করলে দেহে রক্ত কমে যাবে।
- রক্তদান করলে ব্লাড ক্যানসার বা AIDS হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- রক্তদান করলে ক্লান্ত বা অবসন্ন লাগবে।
রক্তদান করলে দাতার কোনো ক্ষতি হয় না কেন?
রক্তদান করলে দাতার কোনো ক্ষতি হয় না। কারণ – মানুষের দেহে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্ত স্থায়ীভাবে অবস্থান করে। এই পরিমাণ রক্ত থেকে কিছু রক্ত দান করার পরও মানব শরীর স্বাভাবিক থাকে কারণ আমাদের দেহে অবিরাম রক্তকোশের সৃষ্টি ও বিনাশ ঘটে চলেছে। লোহিত রক্তকণিকা 110-120 দিন, অণুচক্রিকা 2-7 দিন, শ্বেত রক্তকণিকা প্রায় 1-15 দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে। তাই দেহে উপস্থিত রক্তের কিছু অংশ দিলেও ক্ষতি হয় না। এই রক্তকণিকাগুলির মানবদেহে প্রাকৃতিক নিয়মে ধ্বংস ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ঘটে চলেছে।
হৃৎপিণ্ডের গ্রাহক প্রকোষ্ঠ কাকে বলে?
হৃৎপিণ্ডের যে প্রকোষ্ঠ দূষিত ও বিশুদ্ধ রক্ত গ্রহণ করে, তাকে গ্রাহক প্রকোষ্ঠ বলে। যেমন – অলিন্দ। হৃৎপিণ্ডের ডান অলিন্দ দূষিত রক্ত ও বাম অলিন্দ বিশুদ্ধ রক্ত গ্রহণ করে।
হৃৎপিণ্ডের প্রেরক প্রকোষ্ঠ বলতে কী বোঝো?
হৃৎপিণ্ডের যে প্রকোষ্ঠ সারাদেহে রক্ত প্রেরণ করে, তাকে প্রেরক প্রকোষ্ঠ বলে। যেমন – নিলয়। হৃৎপিণ্ডের ডান নিলয় দূষিত রক্ত ফুসফুসে প্রেরণ করে এবং বাম নিলয় সারাদেহে বিশুদ্ধ রক্ত প্রেরণ করে।
রক্ততঞ্চনের জন্য কী কী উপাদানের প্রয়োজন হয়?
রক্ততঞ্চনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান –
- প্লাজমাপ্রোটিন – ফাইব্রিনোজেন ও প্রোথম্বিন।
- উৎসেচক – প্রোথ্রম্বিনেজ ও থ্রম্বোপ্লাসটিন বা থ্রম্বোকাইনেজ ( বিনষ্ট কলাকোশ ও অণুচক্রিকা থেকে নিঃসৃত হয়)।
- খনিজ পদার্থ – ক্যালশিয়াম আয়ন (Ca++)।
- ভিটামিন – K।
তঞ্চনকাল কাকে বলে?
ক্ষতস্থান থেকে নির্গত রক্ত জমাট বাঁধতে বা তঞ্চিত হতে যে সময় নেয়, তাকে তঞ্চনকাল বলে। মানুষের রক্তের স্বাভাবিক তঞ্চনকাল হল 3-8 মিনিট (গড়ে 5 মিনিট)।
ত্রিপত্র কপাটিকা কাকে বলে? এর কাজ লেখো।
হৃৎপিণ্ডের ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের সংযোগস্থলে অলিন্দ-নিলয় ছিদ্রপথে তিনটি পাতার মতো খণ্ড যুক্ত যে কপাটিকা উপস্থিত থাকে, তাকে ত্রিপত্র বা ট্রাইকাসপিড কপাটিকা বলে।
ত্রিপত্র কপাটিকার কাজ – বেশি CO₂ যুক্ত রক্তকে ডান অলিন্দ থেকে ডান নিলয়ে প্রবেশ করতে সাহায্য করে এবং রক্তকে নিলয়ের সংকোচনের সময় বিপরীত পথে যেতে বাধা দান করে।
দ্বিপত্র কপাটিকা কাকে বলে? এর কাজ লেখো।
হৃৎপিণ্ডের বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়ের সংযোগস্থলে অলিন্দ-নিলয় ছিদ্রপথে দুটি পাতার মতো খণ্ডযুক্ত যে কপাটিকা উপস্থিত থাকে, তাকে দ্বিপত্র বা মিট্রাল বা বাইকাসপিড কপাটিকা বলে।
দ্বিপত্র কপাটিকার কাজ – বাম অলিন্দ থেকে বেশি O₂ যুক্ত রক্তকে বাম নিলয়ে প্রবেশে সাহায্য করে এবং নিলয়ের সংকোচনকালে রক্তকে বিপরীত পথে ফিরতে বাধা দেয়।
সিস্টোল ও ডায়াস্টোল বলতে কী বোঝো?
হৃৎপিণ্ডের স্বতঃস্ফূর্ত সংকোচনকে বলা হয় সিস্টোল এবং হৃৎপিণ্ডের স্বতঃস্ফূর্ত প্রসারণকে বলা হয় ডায়াস্টোল।
মানুষের হৃৎপিণ্ডের বাম নিলয়ের প্রাচীর ডান নিলয়ের প্রাচীরের তুলনায় অধিক পুরু হয় কেন?
মানুষের হৃৎপিণ্ডের বাম নিলয়ের প্রাচীর ডান নিলয়ের প্রাচীরের তুলনায় অধিক পুরু হয়। কারণ –
- ডান নিলয় থেকে ফুসফুসের দূরত্ব কম, তাই ফুসফুসে রক্ত পৌঁছে দিতে ডান নিলয়কে বেশি বাধার সম্মুখীন হতে হয় না।
- অন্যদিকে বাম নিলয় দেহের সর্বত্র রক্ত পৌঁছে দেয় এবং স্বাভাবিকভাবেই এই দূরত্ব অনেক বেশি, আর এই পথ অতিক্রম করতে বাম নিলয়কে অনেক বেশি বাধা পেতে হয়। তাই বাম নিলয়ের প্রাচীর ডান নিলয়ের প্রাচীর থেকে অনেক বেশি পুরু হয়।
হৃৎপিণ্ডের ভিতর দিয়ে রক্তসংবহনের সময় রক্ত অলিন্দ থেকে নিলয়ে যেতে পারে কিন্তু নিলয় থেকে রক্ত অলিন্দে ফিরতে পারে না কেন?
হৃৎপিণ্ডের অলিন্দ ও নিলয়ের সংযোগস্থলে অবস্থিত দ্বিপত্র ও ত্রিপত্র কপাটিকা অলিন্দ থেকে নিলয়ের দিকে খুলতে পারে কিন্তু বিপরীত দিকে খুলতে পারে না। তাই রক্তপ্রবাহ সর্বদা একমুখী হয়। অর্থাৎ, রক্ত অলিন্দ থেকে নিলয়ে যায় কিন্তু বিপরীত পথে ফিরতে পারে না।
শিরার মধ্যে দিয়ে রক্ত ধীরে প্রবাহিত হয় কেন?
শিরার মধ্যে কপাটিকা থাকে, তাই রক্ত শিরার মধ্যে দিয়ে ধীরে প্রবাহিত হয়।
সিস্টোলিক চাপ ও ডায়াস্টোলিক চাপ কাকে বলে?
সিস্টোলিক চাপ মানবদেহে হৃৎপিণ্ডের দুটি নিলয়ের সংকোচনকালে, ধমনির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত রক্ত ধমনির প্রাচীরগাত্রে যে সর্বাধিক পার্শ্বচাপ প্রদান করে, তাকে সিস্টোলিক চাপ বলে।
ডায়াস্টোলিক চাপ – মানবদেহে হৃৎপিণ্ডের দুটি নিলয়ের প্রসারণকালে, ধমনির মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত রক্ত ধমনির প্রাচীরগাত্রে যে সর্বনিম্ন পার্শ্বচাপ প্রদান করে, তাকে ডায়াস্টোলিক চাপ বলে।
SA নোডের পুরো নাম কী? এর অবস্থান ও কাজ লেখো।
SA লোড – সাইনো এট্রিয়াল নোড (Sinoatrial node)।
অবস্থান – ডান অলিন্দে উদ্ধ মহাশিরার নিকট এপিকার্ডিয়াম ও এন্ডোকার্ডিয়ামের মধ্যে অবস্থান করে।
কাজ – মিনিটে 70-80 বার হৃৎস্পন্দন সৃষ্টি করে। এটি হৃৎপিণ্ডের প্রধান পেসমেকার বা ছন্দনিয়ামক।
AV নোডের পুরো নাম কী? এর অবস্থান ও কাজ লেখো।
AV লোড – অ্যাট্রিওভেনট্রিকিউলার নোড (Atrioven-tricular node)।
অবস্থান – হৃৎপিণ্ডের ডান অলিন্দের পশ্চাৎভাগে, যেখানে করোনারি সাইনাস উন্মুক্ত হয়, সেই স্থানের নিকটে অবস্থিত।
কাজ – মিনিটে 40-60 বার হৃৎস্পন্দন সৃষ্টি করে। এটি হৃৎপিণ্ডের রিজার্ভ পেসমেকার বা সংরক্ষিত ছন্দনিয়ামক।
মানব হৃৎপিণ্ডকে দ্বিচক্রী হৃৎপিণ্ড বলে কেন?
মানব হৃৎপিণ্ডকে দ্বিচক্রী হৃৎপিণ্ড বলে, কারণ – মানব হৃৎপিণ্ড চার প্রকোষ্ঠ-যুক্ত, একই সময় অধিক O₂ যুক্ত রক্ত এবং অধিক CO₂ যুক্ত রক্ত যথাক্রমে বাম ও ডান অলিন্দে এবং তারপর যথাক্রমে বাম ও ডান নিলয়ে প্রবাহিত হয়। এরপর বাম নিলয় হতে রক্ত মহাধমনির মাধ্যমে সমগ্র দেহে এবং ডান নিলয় হতে ফুসফুসীয় ধমনির মাধ্যমে ফুসফুসে যায়। একটি হৃৎপিণ্ডের মধ্যে রক্তের এই দুই চক্রাকার আবর্তন ঘটে বলে, মানব হৃৎপিণ্ডকে দ্বিচক্রী হৃৎপিণ্ড বলে।
সংবহনের তিনটি উদ্দেশ্য লেখো।
সংবহনের উদ্দেশ্য –
1. পরিবহণ – পাচিত ও শোষিত খাদ্যরস, অক্সিজেন, হরমোন, উৎসেচক প্রভৃতি রক্ত ও লসিকার মাধ্যমে কলাকোশে পরিবাহিত হয়।

2. অপসারণ – বিপাকীয় কাজের ফলে উৎপন্ন দূষিত রেচন পদার্থ, কার্বন ডাইঅক্সাইড প্রভৃতি কোশ থেকে অপসারিত হয়ে রক্ত ও লসিকার মাধ্যমে নির্দিষ্ট রেচন অঙ্গে প্রেরিত হয়।

3. উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ – উশোণিত প্রাণীদেহে সংবহনের মাধ্যমে দেহে তাপমাত্রার সমতা বজায় থাকে।
প্রাণীদেহে পরিবহণ মাধ্যমগুলির নাম লেখো।
প্রাণীদেহে পরিবহণ মাধ্যম –
- জল – স্পঞ্জ, হাইড্রা, জেলিফিশ, তারামাছ প্রভৃতি প্রাণীদেহে জল সংবহনের প্রধান মাধ্যমরূপে কাজ করে।
- রক্ত – উন্নত প্রাণীদেহে প্রধান পরিবহণ মাধ্যম।
- লসিকা – মেরুদণ্ডী প্রাণীদেহে অন্যতম প্রধান পরিবহণ মাধ্যম।
সংবহনতন্ত্রের উপাদানগুলি কী কী? উপাদানগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক আলোচনা করো।
সংবহনতন্ত্রের উপাদানগুলি হল –
- রক্ত,
- রক্তবাহ ও
- হৃৎপিণ্ড।
উপাদানগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক –
- হৃৎপিণ্ডের স্বতঃস্ফূর্ত সংকোচন ও প্রসারণের ফলে রক্ত হৃৎপিণ্ড থেকে ধমনির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে দেহের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে যায়।
- কলাকোশকে ঘিরে ধমনি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম শাখাপ্রশাখায় বিভক্ত হয়ে রক্তজালকের সৃষ্টি করে।
- রক্তজালক মিলিতভাবে শিরার উৎপত্তি ঘটায় ও রক্ত শিরার মাধ্যমে হৃৎপিন্ডে ফিরে আসে।
- অর্থাৎ, রক্তসংবহনতন্ত্রের উপাদানগুলি (রক্ত, রক্তবাহ ও হৃৎপিণ্ড) পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কবদ্ধ অবস্থায় থাকে।

মুক্ত সংবহনতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।
মুক্ত সংবহনতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য –
- মুক্ত সংবহনতন্ত্র হৃৎপিণ্ড, রক্তবাহ, হিমোসিল, ল্যাকুনা ও সাইনাস দ্বারা গঠিত।
- মুক্ত সংবহনতন্ত্রে রক্তজালক অনুপস্থিত থাকে।
- এক্ষেত্রে রক্ত কলাকোশীয় তরলের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসে। কলাকোশীয় তরল এবং রক্তের সমন্বয়কে হিমোলিম্ফ বলা হয়।
- অরেখ পেশির অনুপস্থিতির জন্য রক্ত খুব ধীর গতিতে এবং কম চাপে প্রবাহিত হয়।
ঘাম বা ঘর্ম কাকে বলে? ঘামের কাজ লেখো।
ঘাম বা ঘর্ম (Sweat) – আবহ উষ্ণতা 29°C বা তার বেশি হলে চর্মস্থিত উৎক্ষরা ঘর্মগ্রন্থির সক্রিয়তায় যে বর্ণহীন জলীয় তরল পদার্থ নিঃসৃত হয়, তাকে ঘাম বা ঘর্ম বলে।
ঘামের কাজ –
- দেহ থেকে অতিরিক্ত জল, দূষিত পদার্থ এবং জৈব ও অজৈব পদার্থের বহিষ্করণ করে।
- ঘর্ম নিঃসরণ ও নিঃসৃত ঘর্মের বাষ্পীভবনের মাধ্যমে দেহের তাপমাত্রা কমে যায় ও দেহে জলের ভারসাম্য বজায় থাকে।
- ঘামের মাধ্যমে কিছু পরিমাণ অম্লের নির্গমন ঘটায় তা দেহের অম্ল-ক্ষার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে।
মৃত্র কী? মূত্রের কাজ কী?
মৃত্র (Urine) – বৃক্কের সাংগঠনিক একক নেফ্রনের বিভিন্ন অংশের সক্রিয়তায় দেহের পক্ষে ক্ষতিকারক ও অপ্রয়োজনীয় জৈব ও অজৈব পদার্থ সমন্বিত যে অল্প অম্লধর্মী, হালকা হলুদ রঙের তরল উৎপন্ন হয়ে মূত্রাশয়ে সাময়িকভাবে সঞ্চিত থাকে এবং সময় সময় দেহের বাইরে বর্জিত হয়, তাকে মুত্র বলে।
মূত্রের কাজ –
- মূত্রের মাধ্যমে দেহ থেকে দূষিত, ক্ষতিকারক রেচন পদার্থ নির্গত হয়।
- দেহের জল ও খনিজ আয়নের ভারসাম্য রক্ষা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে মূত্র মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
CSF কী? এটি কোথায় অবস্থান করে? এর কাজ লেখো।
CSF বা সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড বা মস্তিষ্কমেরুরস – মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠগুলিতে, সুষুম্নাকাণ্ডের কেন্দ্রীয় নালিতে এবং মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ডকে ঘিরে থাকা সাবঅ্যারাকনয়েড স্থানে যে বর্ণহীন, স্বচ্ছ, সামান্য ক্ষারীয় প্রকৃতির পরিবর্তিত কলারস উপস্থিত থাকে, তাকে CSF (Cerebrospinal Fluid) বা মস্তিষ্ক মেরুরস বলে।

CSF -এর অবস্থান – মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠ, সুষুম্নাকান্ডের কেন্দ্রীয় নালি ও মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকান্ডের সাবঅ্যারাকনয়েড স্পেস।
CSF -এর কাজ –
- কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিউরোনে পুষ্টিপদার্থ, O₂ প্রভৃতি সরবরাহ করে।
- কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিউরোন থেকে বিপাকজাত রেচন পদার্থ অপসারণ করে।
- কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ভিতরে ও বাইরে যান্ত্রিক চাপের মধ্যে সমতা রক্ষা করে এবং নিউরোনকে বাহ্যিক আঘাত থেকে রক্ষা করে।
সাইনোভিয়াল তরল দেহের কোন্ স্থানে অবস্থান করে? এর কাজ লেখো।
সাইনোভিয়াল তরলের অবস্থান – সচল অস্থিসন্ধির (যেমন – কাঁধ, কনুই, হাঁটু প্রভৃতি স্থান) সাইনোভিয়াল গহ্বরে সাইনোভিয়াল তরল উপস্থিত থাকে।

সাইনোভিয়াল তরলের কাজ – অস্থিসন্ধিতে উপস্থিত সাইনোভিয়াল তরল সংলগ্ন দুটি অস্থির বিচলনের সময় অস্থিপ্রান্তদ্বয়কে আঘাত ও ঘর্ষণজনিত ক্ষয় থেকে রক্ষা করে।
আন্তঃকোশীয় তরল কাকে বলে? এর কাজ লেখো।
আন্তঃকোশীয় তরল – কোশের সাইটোপ্লাজমের কোশীয় অঙ্গাণু ছাড়া বাকি, অস্বচ্ছ, সমসত্ত্ব, কোলয়েড জাতীয় অর্ধতরল পদার্থকে আন্তঃকোশীয় তরল বলে।
আন্তঃকোশীয় তরলের কাজ –
- কলাকোশকে পুষ্টিপদার্থ, O₂, হরমোন প্রভৃতি সরবরাহ করে।
- কলাকোশ থেকে বিপাকজাত রেচন পদার্থ, CO₂ প্রভৃতি অপসারণ করে।
- লসিকার উৎপাদনে সাহায্য করে।
- রক্তের রক্তরসের পরিমাণের সাম্যাবস্থা বজায় রাখে।
লসিকা কাকে বলে? লসিকার উপাদান ও অবস্থান উল্লেখ করো।
লসিকা (Lymph) – যে স্বচ্ছ ক্ষারীয় পরিবর্তিত কলারস লসিকাবাহের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দেহে বিভিন্ন পদার্থ সংবহনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তাকে লসিকা বলে।
লসিকার উপাদান – জল, কঠিন পদার্থ, বিভিন্ন প্রোটিন, ইউরিয়া, শর্করা, অ্যামিনো অ্যাসিড, ক্রিয়েটিনিন, NaCl, ফসফরাস, ক্যালশিয়াম প্রভৃতি আয়ন লসিকাতে থাকে।
লসিকার অবস্থান – লসিকা লসিকাবাহে অবস্থান করে।
লসিকার কাজগুলি আলোচনা করো।
লসিকার কাজসমূহ –
- পরিবহণ যে-সমস্ত বৃহৎ অণু (যেমন – ফ্যাটকণা) রক্তজালক ভেদ করতে পারে না, সেগুলি লসিকার মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। কলাস্থান থেকে বেশিরভাগ প্রোটিন লসিকার মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে রক্তে আসে।
- পুষ্টিপদার্থ সরবরাহ দেহে যে-সমস্ত স্থানে রক্তের সরবরাহ থাকে না, সেই স্থানের কলাকোশকে লসিকা পুষ্টি সরবরাহ করে। যেমন – ত্বকের বহিঃস্তর বা এপিডারমিসে লসিকা পুষ্টি জোগান দেয়।
- কলারসের অপসারণ কলাকোশের ফাঁকে ফাঁকে সঞ্চিত কলারসের অংশ লসিকার মাধ্যমে অপসারিত হয়। 1
- স্নেহপদার্থ শোষণ – ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাই-এর কেন্দ্রীয় লসিকা নালি বা ল্যাকটিয়েলের সাহায্যে ফ্যাটি অ্যাসিড শোষিত হয় এবং লসিকাবাহের মাধ্যমে এর পরিবহণ ঘটে।
এ ছাড়া লসিকা জীবদেহে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্থানে শ্বাসবায়ুর (O₂ এবং CO₂) পরিবহণ ঘটায় এবং দেহে উৎপন্ন বিপাকজাত পদার্থের অপসারণ করে।
রক্তরসের কাজগুলি লেখো।
রক্তরসের কাজ –
- পরিবহণ – শোষিত খাদ্যরস, শ্বাসবায়ু, হরমোন, উৎসেচক, রক্ততঞ্চনকারী ফ্যাক্টরগুলি এবং বিপাকজাত বিভিন্ন রেচনপদার্থ দেহের বিভিন্ন স্থানে পরিবহণে রক্তরস ও রক্তরসস্থিত প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- রক্তের সান্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ – রক্তরসস্থিত বিভিন্ন প্রোটিন রক্তের সান্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে। সান্দ্রতা দ্বারা রক্তের চাপ (Blood Pressure) নিয়ন্ত্রিত হয়।
- রক্ততঞ্চন – রক্তরসে উপস্থিত ফাইব্রিনোজেন, প্রোথ্রম্বিন ও অন্যান্য রক্ততঞ্চন সহায়ক ফ্যাক্টরগুলি রক্তকে ক্ষতস্থানে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।
- প্রোটিনের সঞ্চয় ভাণ্ডার – রক্তরস বিভিন্ন প্রোটিনের সঞ্চয় ভাণ্ডাররূপে কাজ করে।
- তাপমাত্রা বজায় রাখা – দেহে উষ্ণতার সমবণ্টনে এবং নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখতে রক্তরস সাহায্য করে।
- দেহে অম্ল-ক্ষার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ – রক্তরসে উপস্থিত প্রোটিন বাফার রূপে রক্তের অম্লত্ব ও ক্ষারত্বের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
- জলসাম্য নিয়ন্ত্রণ – দেহে জলসাম্য নিয়ন্ত্রণে রক্তরস সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
- সুরক্ষা প্রদান – রক্তরসে উপস্থিত অ্যান্টিবডি বা গামা গ্লোবিউলিন দেহে রোগজীবাণু ধ্বংস করে সুরক্ষা প্রদান করে।
রক্তের রং লাল হওয়ার কারণ কী? রক্তের মাধ্যমে সংবাহিত হয় এমন বস্তুগুলির নাম লেখো। রক্তকে তরল যোগকলা বলা হয় কেন?
রক্তের রং লাল হওয়ার কারণ – রক্তের সাকার উপাদান লোহিত রক্তকণিকায় লালরঙের হিমোগ্লোবিন নামক লৌহঘটিত শ্বাসরঞ্জক থাকে তাই মেরুদন্ডী প্রাণীদের রক্ত এবং কিছু অমেরুদণ্ডী প্রাণীর (কেঁচোর রক্তরসে থাকে হিমোগ্লোবিন) দেহের রক্তের রং লাল হয়।
রক্তের মাধ্যমে জীবদেহে বাহিত হয় এমন বস্তুগুলি হল –
- অজৈব বস্তু – শ্বাসবায়ু (O₂ ও CO₂), খনিজ পদার্থসমূহ (সোডিয়াম, পটাশিয়াম, লোহা, তামা, ফসফরাস, সালফার এবং পদার্থগুলির লবণ)।
- জৈব বস্তু – খাদ্যবস্তু (গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, ফ্যাটি অ্যাসিড), ভিটামিন, হরমোন, ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া ইত্যাদি।
রক্তকে তরল যোগকলা বলার কারণ –
- রক্ত ভ্রূণজ মেসোডার্ম থেকে উৎপন্ন হয়।
- রক্তে কোশীয় উপাদানের তুলনায় ধাত্রের পরিমাণ বেশি।
- রক্ত তরল ধাত্রের সাহায্যে জীবদেহের কলা-কোশ, অঙ্গ ও তন্ত্রের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে।
- রক্তে কোনো ভিত্তিপর্দা থাকে না।
লোহিত রক্তকণিকা কাকে বলে? এর উৎপত্তি ও আয়ুষ্কাল উল্লেখ করো।
লোহিত রক্তকণিকা (Erythrocytes or Red Blood Corpuscles or RBC) – হিমোগ্লোবিন শ্বাসরঞ্জকযুক্ত, গোলাকার বা চাকতির মতো, দ্বি-অবতল, লাল বর্ণের যে সাকার উপাদান দেহের কলা-কোশে শ্বাসবায়ু পরিবহণ করে, তাকে লোহিত রক্তকণিকা বা এরিথ্রোসাইট বলে।
| লোহিত রক্তকণিকার উৎপত্তিকাল | উৎপত্তি স্থান |
| ভ্রূণ অবস্থার 1ম ও 2য় মাস | ডিম্বাণুর কুসুমথলির মেসোডার্ম স্তর |
| ভ্রূণের 3য় ও 4র্থ মাস | যকৃৎ, প্লীহা ও থাইমাস গ্রন্থির মেসেনকাইম কোশ। |
| ভ্রূণের 5ম মাস | যকৃৎ, প্লীহা ও লাল অস্থিমজ্জা। |
| জন্মের পর, পরিণত মানুষের দেহে | লোহিত অস্থিমজ্জার হিমোসাইটোব্লাস্ট নামক কোশ। |
আয়ুষ্কাল – লোহিত রক্তকণিকার গড় আয়ু 120 দিন।
লোহিত রক্তকণিকার বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।
লোহিত রক্তকণিকার বৈশিষ্ট্য –
- মানুষসহ সকল স্তন্যপায়ীর ক্ষেত্রে লোহিত রক্তকণিকা গোলাকার, দ্বিঅবতল, চাকতির মতো ও নিউক্লিয়াসবিহীন হয়।
- এটি দ্বি-অবতল (ব্যাঙের ক্ষেত্রে দ্বিউত্তল) হওয়ায় বাইরের তলের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি পায় এবং বেশি পরিমাণে শ্বাসবায়ু পরিবহণে সক্ষম হয়।
- লোহিত রক্তকণিকায় হিমোগ্লোবিন উপস্থিত থাকে, তাই রক্তের রং লাল হয়।
- লোহিত রক্তকণিকা লাইপো-প্রোটিন নির্মিত কোশপর্দা দ্বারা আবৃত থাকে। পর্দাতে সামান্য কার্বোহাইড্রেটও থাকতে পারে।
- পরিণত RBC নিউক্লিয়াস, মাইটোকনড্রিয়া, ER প্রভৃতি বিহীন হয়।
- RBC -র গড় ব্যাস 7.2µm।

লোহিত রক্তকণিকার কাজগুলি লেখো।
লোহিত রস্তকণিকার কাজ –
- শ্বাসবায়ু পরিবহণ – শ্বাসঅঙ্গ থেকে কলাকোশে অক্সিজেন ও কলাকোশ থেকে শ্বাসঅঙ্গে কার্বন ডাইঅক্সাইড পরিবহণে লোহিত রক্তকণিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- অম্ল-ক্ষারের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ – RBC -র হিমোগ্লোবিন বাফার গঠনের মাধ্যমে রক্তে অম্ল-ক্ষার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে।
- রক্তের সান্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ – লোহিত রক্তকণিকা রক্তের সান্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে।
- রঞ্জক পদার্থের উৎস – RBC ধ্বংস হলে হিমোগ্লোবিন বিশ্লিষ্ট হয়ে বিলিরুবিন, বিলিভারডিন নামক রঞ্জক উৎপাদন করে।
শ্বেত রক্তকণিকা কাকে বলে? শ্বেত রক্তকণিকার কোশীয় বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করো।
শ্বেত রক্তকণিকা (Leucocytes or White Blood Corpuscle or WBC) – রক্তে অবস্থিত নিউক্লিয়াসযুক্ত, বর্ণহীন ও অনিয়তাকার বৃহৎ যে রক্তকণিকাগুলি জীবদেহকে অনাক্রম্যতা প্রদান করে, তাদের শ্বেত রক্তকণিকা বা লিউকোসাইট বলে।
শ্বেত রক্তকণিকার কোশীয় বৈশিষ্ট্য –
- প্রতিটি শ্বেত রক্তকণিকাগুলি লাইপো-প্রোটিন নির্মিত কোশপর্দা দ্বারা আবৃত থাকে।
- শ্বেত রক্তকণিকার আকার অন্যান্য রক্তকোশের থেকে বড়ো হয়। এর আকৃতি অনিয়ত প্রকৃতির হয়।
- কোশে সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস থাকে। নিউক্লিয়াস গোলাকার বা বৃক্ক আকৃতির এবং কয়েকটি খণ্ডবিশিষ্ট হয়।
- শ্বেত রক্তকণিকার কোশে কোনো রঞ্জক উপাদান থাকে না। তাই কোশগুলি বর্ণহীন হয়।
- কোশের সাইটোপ্লাজম দানাদার বা অদানাদার হয় এবং মাইক্রোটিউবিউলযুক্ত সাইটোপ্লাজম অ্যামিবয়েড গমন করতে সক্ষম হয়।

ছকের মাধ্যমে শ্বেত রক্তকণিকার প্রকারভেদ, তাদের গঠন ও কাজ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।

| বৈশিষ্ট্য | নিউট্রোফিল | ইওসিনোফিল | বেসোফিল | লিম্ফোসাইট | মনোসাইট |
| কোশের গড় আয়তন | 10-12µm | 10-14µm | 8-10μm | 8-12µm | 10-18μm |
| নিউক্লিয়াস | 3-7টি লোবযুক্ত | 2টি লোবযুক্ত | 2-3টি লোবযুক্ত | আকারে বড়ো প্রায় সমস্ত কোশ জুড়ে থাকে | বৃক্কাকার |
| গড় সংখ্যা | 70-80% | 2-4% | 0-1% | 25% | 2-5% |
| আয়ুষ্কাল | 10-14 দিন | 8-12 দিন | 12-15 দিন | 1-3 দিন | 2-4 দিন |
| উৎপত্তি | অস্থিমজ্জা | অস্থিমজ্জা | অস্থিমজ্জা | লসিকাগ্রন্থি | লসিকাগ্রন্থি |
| কাজ | আগ্রাসন প্রক্রিয়ায় রোগজীবাণু ধ্বংস করে। | হিস্টামিন ক্ষরণ দ্বারা অ্যালার্জির উপসর্গ প্রতিরোধ করে। | হেপারিন নামক রক্ততঞ্চন বিরোধী পদার্থ ক্ষরণ করে। | অ্যান্টিবডি উৎপাদনের মাধ্যমে অ্যান্টিজেন ধ্বংস করে। | আগ্রাসন পদ্ধতিতে রক্তে প্রবিষ্ট রোগ-জীবাণু ধ্বংস করে। |
শ্বেত রক্তকণিকার কাজগুলি লেখো।
শ্বেত রক্তকণিকার কাজ –
- রোগজীবাণু ধ্বংস – নিউট্রোফিল ও মনোসাইট শ্বেত রক্তকণিকাগুলি আগ্রাসন বা ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে ও টক্সিন রোগজীবাণু ও পদার্থকে আত্মসাৎ করে তাদের পাচিত করে।
- অ্যান্টিবডি উৎপাদন – লিম্ফোসাইট নামক শ্বেত রক্তকণিকা অ্যান্টিবডি বা গামা গ্লোবিউলিন জাতীয় প্রোটিন উৎপাদনের মাধ্যমে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে।
- ফাইব্রোব্লাস্ট উৎপাদন – দেহের প্রদাহ অঞ্চলে লিম্ফোসাইট জমা হয়ে ফাইব্রোব্লাস্ট কোশে রূপান্তরিত হয় এবং ক্ষয়পূরণ করে।
- হেপারিন ক্ষরণ – বেসোফিল শ্বেতরক্তকণিকা হেপারিন ক্ষরণের মাধ্যমে রক্তনালির মধ্যে রক্তকে জমাট বাঁধতে বা রক্ততঞ্চনে বাধা দেয়।
- অ্যালার্জি প্রতিরোধ – ইওসিনোফিল শ্বেতরক্তকণিকা হিস্টামিন ক্ষরণের মাধ্যমে দেহে অ্যালার্জির উপসর্গ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
- ট্রিফোন সৃষ্টি – মনোসাইট প্লাজমা প্রোটিন থেকে ট্রিফোন নামক রাসায়নিক পদার্থ তৈরির মাধ্যমে কলাকোশের পুষ্টি ও বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
অণুচক্রিকা বা প্লেটলেট কাকে বলে? এর উৎপত্তি, আয়ুষ্কাল, গঠনগত বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো।
অণুচক্রিকা বা প্লেটলেট বা থ্রম্বোসাইট (Platelets or Thrombocytes) – রক্তের সব থেকে ছোটো, ডিম্বাকার নিউক্লিয়াসবিহীন যে রক্তকণিকা রক্ততঞ্চনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তাকে অণুচক্রিকা বা প্লেটলেট বা থ্রম্বোসাইটস বলে।
অণুচক্রিকার উৎপত্তি – অণুচক্রিকা লাল অস্থিমজ্জার বৃহৎ কোশ (মেগাক্যারিওসাইট কোশ) থেকে উৎপন্ন হয়।

অণুচক্রিকার আয়ুষ্কাল – অণুচক্রিকার গড় আয়ু 3-5 দিন।
অণুচক্রিকার কোশীয় বৈশিষ্ট্য –
- গোলাকার বা ডিম্বাকার দ্বি-অবতল ক্ষুদ্র চাকতির মতো গঠনযুক্ত হয়।
- প্রতিটি অণুচক্রিকা 2.5µm ব্যাসযুক্ত হয়।
- একক পর্দাবৃত, নিউক্লিয়াসবিহীন।
- সাইটোপ্লাজমে সংকোচী গহ্বর, পিনোসাইটিক গহ্বর, মাইটোকনড্রিয়া, গলগি বডি, অন্তঃকোশজালক ও 50-100টি দানা উপস্থিত থাকে।
অণুচক্রিকার কাজগুলি লেখো।
অণুচক্রিকার কাজ –
- রক্ততঞ্চন – ক্ষতস্থানে রক্তক্ষরণের সময় অণুচক্রিকা ভেঙে গিয়ে থ্রম্বোপ্লাস্টিন নির্গত করে যা রক্তকে জমাট বাঁধতে বা রক্ততঞ্চনে সাহায্য করে।
- রক্তজালকের এন্ডোথেলিয়াম মেরামত – ক্ষতস্থানে অণুচক্রিকা রক্তজালকের এন্ডোথেলিয়ামে এঁটে গিয়ে মেরামতির কাজকে দ্রুত করে।
- স্থিতিশীলতা প্রদান – বিনষ্ট অণুচক্রিকা থেকে হিস্টামিন এবং 5-হাইড্রক্সিট্রিপটামিন পদার্থ ক্ষরিত হয় যা রক্তনালির সংকোচন ঘটায় ও রক্তে স্থিতিশীলতা প্রদান করে।
রক্তবাহ কাকে বলে? রক্তবাহ কয় প্রকার ও কী কী? হৃৎপিণ্ড ও রক্তবাহের মধ্যে সম্পর্কের শব্দচিত্র উল্লেখ করো।
রক্তবাহ (Blood Vessels) – হৃৎপিণ্ডের স্বতঃস্ফূর্ত সংকোচন ও প্রসারণের ফলে রক্ত যে-সমস্ত নালিপথে দেহের সর্বত্র প্রবাহিত হয় এবং পুনরায় হৃৎপিণ্ডে ফিরে আসে, তাদের রক্তবাহ বলে।
রক্তবাহ তিনপ্রকার। যথা –
- ধমনি,
- শিরা ও
- রক্তজালক।
হৃৎপিণ্ড ও রক্তবাহের সম্পর্কের শব্দচিত্র –

ধমনি কাকে বলে? ধমনির বৈশিষ্ট্য ও কাজ লেখো।
ধমনি (Artery) – যে-সমস্ত রক্তবাহ হৃৎপিণ্ড থেকে উৎপত্তি লাভ করে বেশি অক্সিজেন (O₂) যুক্ত রক্তকে সমস্ত দেহে ছড়িয়ে দেয়, তাদের ধমনি বা আর্টারি বলে।

ধমনির বৈশিষ্ট্য –
- ধমনি হৃৎপিণ্ড থেকে উৎপত্তি লাভ করে।
- প্রতিটি ধমনির প্রাচীর পুরু এবং তিনটি কোশস্তর দ্বারা গঠিত। যথা –
- বহিস্থ তন্তুময় স্তর বা টিউনিকা এক্সটারনা।
- পেশি সমৃদ্ধ মধ্যস্তর বা টিউনিকা মিডিয়া এবং
- আঁইশাকার আবরণীকলা দ্বারা গঠিত অন্তঃস্তর বা টিউনিকা ইন্টারনা।
- ধমনির গহ্বর সরু এবং কপাটিকাবিহীন।
- উপধমনিতে বহিঃস্তর থাকে না।
ধমনির কাজ –
- হৃৎপিণ্ডের বাম নিলয় থেকে বেশি O₂ যুক্ত রক্তকে দেহের সর্বত্র কলাকোশে পৌঁছে দেয়।
- ফুসফুসীয় ধমনি বেশি CO₂ যুক্ত রক্তকে ডান নিলয় থেকে ফুসফুসে পৌঁছে দেয়।
শিরা কাকে বলে? শিরার বৈশিষ্ট্য ও কাজ লেখো।
শিরা (Veins) – যে-সমস্ত রক্তবাহ রক্তজালক থেকে উৎপত্তি লাভ করে বেশি CO₂ যুক্ত রক্তকে বহন করে হৃৎপিণ্ডে পৌঁছে দেয়, তাদের শিরা বলে।

শিরার বৈশিষ্ট্য –
- শিরা রক্তজালক থেকে উৎপত্তি লাভ করে এবং হৃৎপিণ্ডে এসে উন্মুক্ত হয়।
- শিরার প্রাচীর ধমনির প্রাচীরের তুলনায় পাতলা এবং তিনটি কোশস্তরযুক্ত। যথা –
- বহিস্থ টিউনিকা এক্সটারনা,
- মধ্যস্থ টিউনিকা মিডিয়া ও
- অন্তঃস্থ টিউনিকা ইন্টারনা।
- শিরার গহ্বর প্রশস্ত এবং কপাটিকাযুক্ত হয়।
- শিরাতে স্থিতিস্থাপক তত্ত্ব থাকে না।
শিরার কাজ –
- কম O₂ যুক্ত এবং বেশি CO₂ যুক্ত রক্তকে কলাকোশ থেকে হৃৎপিণ্ডে পৌঁছে দেয়।
- ফুসফুসীয় শিরা বেশি O₂ যুক্ত রক্তকে ফুসফুস থেকে বাম অলিন্দে পৌঁছে দেয়।
রক্তচাপ কী?
রক্তচাপ – ধমনির মধ্যে দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার সময় ধমনির প্রাচীরে যে পার্শ্বীয় চাপের সৃষ্টি হয়, তাকে রক্তচাপ বলে। হৃৎপিণ্ড পর্যায়ক্রমিকভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত হয় বলে নিলয়ের সংকোচনের সময় সর্বাধিক রক্তচাপ (সিস্টোলিক চাপ) ও নিলয়ের প্রসারণের সময় সর্বনিম্ন রক্তচাপ (ডায়াস্টোলিক চাপ) সৃষ্টি হয়।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের সিস্টোলিক চাপ 120 mm Hg এবং ডায়াস্টোলিক চাপ 80 mm Hg।
স্ফিগমোম্যানোমিটার নামক যন্ত্রের সাহায্যে রক্তচাপ মাপা হয়।

রক্তজালক কাকে বলে? এর কাজ কী?
রক্তজালক (Blood Capillaries) – উপধমনির শেষপ্রান্তে এবং শিরার উৎপত্তিস্থলে একস্তরীয় এন্ডোথেলিয়াম আবরণ দ্বারা আবৃত যে-সমস্ত সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম রক্তবাহ জালকের আকারে কলাকোশ বেষ্টন করে থাকে, তাদের রক্তজালক বলে।
রক্তজালকের কাজ – একক কোশস্তর দ্বারা গঠিত রক্তজালকের রক্ত ও কলাকোশের কলারসের মধ্যে বিভিন্ন পদার্থের আদানপ্রদান ঘটে।

‘হৃৎপিণ্ড একটি পাম্পযন্ত্রের মতো কাজ করে’ – এই বক্তব্যের যথার্থতা ব্যাখ্যা করো।
পেশিবহুল হৃৎপিণ্ডকে পাম্পযন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়। পাম্পযন্ত্র দিয়ে যেমনভাবে বিভিন্ন স্থানে জল সরবরাহ করা হয়, তেমন ভাবে হৃৎপিণ্ডের স্বতঃস্ফূর্ত সংকোচন ও প্রসারণ ক্রিয়ায় সারাদেহে রক্ত সরবরাহ হয়।
ব্যাখ্যা –
- হৃৎপেশির বিশেষ ধর্মের প্রভাবে হৃৎপিণ্ড নিয়মিত ছন্দবদ্ধভাবে সংকুচিত (সিস্টোল) ও প্রসারিত (ডায়াস্টোল) হয়।
- স্বতঃস্ফূর্ত সংকোচনের সময় বাম নিলয়ের বেশি O₂ যুক্ত রক্ত মহাধমনিতে উৎক্ষিপ্ত হয় এবং বিভিন্ন ধমনি, উপধমনি, ধমনিকা ও রক্তজালকের মাধ্যমে সারাদেহের কলাকোশে পৌঁছে যায় এবং ফুসফুসীয় ধমনির মাধ্যমে বেশি CO₂ যুক্ত রক্ত ফুসফুসে পৌঁছে যায়।
- অন্য দিকে স্বতঃস্ফূর্ত প্রসারণকালে সারাদেহ থেকে বেশি CO₂ যুক্ত রক্ত উপশিরা, শিরা, মহাশিরার মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডের ডান অলিন্দে এবং ফুসফুস থেকে বা ফুসফুসীয় শিরার মাধ্যমে বেশি O₂ যুক্ত রক্ত হৃৎপিণ্ডের বাম অলিন্দে প্রবেশ করে।
- সুতরাং দেখা যাচ্ছে, হৃৎপিণ্ড একটি কেন্দ্রীয় পাম্পযন্ত্রের মতো ক্রিয়ার (Pumping action) মাধ্যমে রক্তবাহ দ্বারা সারাদেহে রক্ত সঞ্চালনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

হৃৎপিণ্ডের কপাটিকাগুলির অবস্থান ও কাজ ছকের সাহায্যে উল্লেখ করো।
| কপাটিকার নাম | কপাটিকার অবস্থান | কপাটিকার কাজ |
| দ্বিপত্র বা বাইকাসপিড বা মিট্রাল কপাটিকা | বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়ের সংযোগস্থলে। | বিশুদ্ধ রক্তকে বাম অলিন্দ থেকে বাম নিলয়ে যেতে সাহায্য করে, কিন্তু বিপরীত পথে যেতে বাধা দেয়। |
| ত্রিপত্র বা ট্রাইকাসপিড কপাটিকা | ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের সংযোগস্থলে। | দূষিত রক্তকে ডান অলিন্দ থেকে ডান নিলয়ে যেতে সাহায্য করে, কিন্তু বিপরীত পথে যেতে বাধা দেয়। |
| অ্যাওর্টিক কপাটিকা | বাম নিলয় ও মহাধমনির সংযোগস্থলে। | বিশুদ্ধ রক্তকে বাম নিলয় থেকে মহাধমনিতে যেতে সাহায্য করে, কিন্তু বিপরীত পথে ফিরতে বাধা দেয়। |
| পালমোনারি কপাটিকা | ডান নিলয় ও ফুসফুসীয় ধমনির সংযোগস্থলে। | দূষিত রক্তকে ডান নিলয় থেকে ফুসফুসীয় ধমনিতে যেতে সাহায্য করে, কিন্তু বিপরীত পথে ফিরতে বাধা দেয়। |
| থিবেসিয়ান কপাটিকা | ডান অলিন্দ ও করোনারি সাইনাসের সংযোগস্থলে। | দূষিত রক্তকে করোনারি সাইনাস থেকে ডান অলিন্দে যেতে সাহায্য করে, কিন্তু বিপরীত পথে যেতে বাধা দেয়। |
| ইউস্টেচিয়ান কপাটিকা | ডান অলিন্দ ও নিম্ন মহাশিরার সংযোগস্থলে। | ডান অলিন্দ থেকে রক্তকে নিম্ন মহাশিরায় যেতে বাধা দেয়। |
হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে যুক্ত শিরা ও ধমনিগুলির নাম ও কাজ ছকের মাধ্যমে উল্লেখ করো।
| শিরা ও ধমনির নাম | সংশ্লিষ্ট হৃৎপিণ্ড প্রকোষ্ঠ | কাজ |
| ঊর্ধ্ব মহাশিরা | ডান অলিন্দ | দেহের ঊর্ধ্বভাগ থেকে বেশি CO₂ যুক্ত রক্তকে ডান অলিন্দে পৌঁছে দেয়। |
| নিম্ন মহাশিরা | ডান অলিন্দ | দেহের নিম্নভাগ থেকে বেশি CO₂ যুক্ত রক্তকে ডান অলিন্দে পৌঁছে দেয়। |
| ফুসফুসীয় শিরা | বাম অলিন্দ | ফুসফুস থেকে বেশি O₂ যুক্ত রক্তকে বাম অলিন্দে পৌঁছে দেয়। |
| করোনারি শিরা | ডান অলিন্দ | হৃৎপেশি থেকে বেশি CO₂ যুক্ত রক্তকে ডান অলিন্দে আনে। |
| ফুসফুসীয় ধমনি | ডান নিলয় | ডান নিলয় থেকে বেশি CO₂ যুক্ত রক্তকে ফুসফুসে পৌঁছে দেয়। |
| মহাধমনি | বাম নিলয় | বাম নিলয় থেকে বেশি O₂ যুক্ত রক্তকে সারাদেহে ছড়িয়ে দেয়। |
Rh-ফ্যাক্টর কাকে বলে? রক্তের শ্রেণি নির্ণয়ে Rh-ফ্যাক্টরের গুরুত্ব লেখো। **
Rh-ফ্যাক্টর – বিজ্ঞানী ল্যান্ডস্টেনার রক্তের Rh-ফ্যাক্টর আবিষ্কার করেন। ভারতীয় বাঁদর রিস্যাস (Rhesus macacus) -এর রক্ত খরগোশের দেহে প্রবেশ করিয়ে খরগোশের সিরামে এক ধরনের অ্যান্টিবডির সৃষ্টি করা হয়েছিল, যাকে Rh-ফ্যাক্টর নামে অভিহিত করা হয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, কিছু কিছু মানুষের দেহে এই একই ধরনের অ্যান্টিজেন উপস্থিত। এই অ্যান্টিজেনটি অনেকগুলি অ্যান্টিজেনের সমন্বয়ে গঠিত এবং রিস্যাস বাঁদরের নামানুসারে Rh-ফ্যাক্টর নামে পরিচিত। প্রায় 85% মানুষের দেহে Rh-ফ্যাক্টর দেখা যায়।
রক্তের Rh ফ্যাক্টরের গুরুত্ব –
নিরাপদ রক্তসঞ্চালন – Rh+ রক্ত কোনো Rh– ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করানো হলে 12 দিনের মাথায় গ্রহীতার রক্তে Rh বিরোধী (anti-Rh) পদার্থের সৃষ্টি হয়। তাই দ্বিতীয়বার পূর্বোক্ত ব্যক্তির দেহে Rh+ রক্ত দেওয়া হলে গ্রহীতার দেহে দাতার রক্তের লোহিত রক্তকণিকাগুলি পুঞ্জীভূত হয়ে জমাট বাঁধে। তাই রক্ত সঞ্চালনের পূর্বে Rh-ফ্যাক্টর জানা অত্যন্ত জরুরী। কারণ – ভিন্ন শ্রেণির রক্তসঞ্চারণের ফলে গ্রহীতার নানারকম বিপত্তি ঘটার সম্ভাবনা থাকে। যেমন – হিমোলাইসিস, জন্ডিস, বৃক্কের ক্রিয়াকলাপ নষ্ট, এমনকি প্রাণহানিও ঘটতে পারে।
এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস – কোনো Rh+ ব্যক্তির সঙ্গে Rh– মহিলার বিবাহ হলে, তাদের সন্তান যদি Rh+ হয়, তবে মায়ের গর্ভে থাকাকালীন ভ্রূণের Rh অ্যান্টিজেন মায়ের রক্তে প্রবেশ করে Rh অ্যান্টিবডি তৈরি করে। এই অ্যান্টিবডি প্রথম সন্তানের তেমন কোনো ক্ষতি না করলেও দ্বিতীয়বার সন্তানধারণকালে মারাত্মক ক্ষতি করে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় সন্তান ভ্রূণাবস্থাতেই মারা যায় অথবা তীব্র রক্তাল্পতা নিয়ে জন্মায়। এই রোগকে এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস বলে।
এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস বলতে কী বোঝো?
অথবা, গর্ভাবস্থায় ভুণের রক্ত Rh+ এবং মায়ের রক্ত Rh– হলে কী ঘটতে পারে তা লেখো।
গর্ভাবস্থায় মায়ের রক্ত Rh– এবং ভ্রুণের রক্ত Rh+ হলে –
- প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না, সে স্বাভাবিক হবে।
- প্রথম সন্তানের প্রসবকালে ভ্রূণের Rh+ রক্ত, মায়ের Rh– রক্তের সঙ্গে মিশ্রিত হয়। ফলে মায়ের রক্তে অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি গঠিত হয়।
- উক্ত মায়ের দ্বিতীয় ভ্রূণটি Rh+ হলে, মায়ের রক্তে থাকা অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি প্লাসেন্টা বা অমরা ভেদ করে ভ্রূণের দেহে প্রবেশ করে (কারণ – এই অ্যান্টিবডিগুলি IgG প্রকৃতির হয়)
- ভ্রূণের দেহে প্রবিষ্ট অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি লোহিত কণিকার কোশপর্দার উপর অবস্থিত Rh অ্যান্টিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, লোহিত রক্তকণিকাকে ভেঙে দেয় এবং অ্যাপ্লুটিনেশন ঘটে।
- ফলে ভ্রূণটি লোহিত রক্তকণিকার ভাঙনজনিত তীব্র রক্তাল্পতা ও জন্ডিসে আক্রান্ত হয়। ভ্রূণের এই অবস্থাকে এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস বলে। এক্ষেত্রে ভ্রূণের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে এবং মায়ের গর্ভপাত ঘটে।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘সংবহন’ অংশের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন