নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – রেচন – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

Souvick

এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘রেচন’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

জৈবনিক প্রক্রিয়া-রেচন-জীবনবিজ্ঞান-নবম শ্রেণী
Contents Show

রেচন কাকে বলে? জীবদেহে রেচনের গুরুত্বগুলি আলোচনা করো।

রেচন (Excretion) – জীব যে জৈবনিক প্রক্রিয়ায় সজীব কোশে উৎপন্ন বিপাকজাত দূষিত পদার্থগুলিকে দেহকোশে অদ্রাব্য কেলাস বা কোলয়েডরূপে সঞ্চিত রাখে (উদ্ভিদের ক্ষেত্রে) অথবা বিশেষ অঙ্গের সাহায্যে দেহ থেকে নির্গত করে (প্রাণীদের ক্ষেত্রে) দেহকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখে, তাকে রেচন বা এক্সক্রিশন বলে।

জীবদেহে রেচনের গুরুত্ব –

  • দেহকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখা – জীবকোশে প্রতিনিয়ত বিপাক ক্রিয়ায় যে-সমস্ত দূষিত পদার্থ উৎপন্ন হয়, রেচন ক্রিয়ার মাধ্যমে সেগুলি দেহ থেকে অপসারিত হয় এবং দেহ সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকে।
  • জলসাম্য বজায় রাখা – রেচনের মাধ্যমে জীব দেহ থেকে জল নির্গত করে এবং দেহে জলসাম্য বজায় থাকে।
  • প্রোটোপ্লাজমীয় বস্তুর ভারসাম্য রক্ষা – রেচনের মাধ্যমে কোশ থেকে দূষিত ও ক্ষতিকারক রেচন পদার্থের নির্গমন ঘটে এবং এর মাধ্যমে প্রোটোপ্লাজমীয় বস্তুর ভারসাম্য রক্ষিত হয়।
  • প্রাকৃতিক সম্পদের আবর্তন – রেচনের মাধ্যমে উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহ থেকে বিপাকজাত দূষিত জটিল ও নাইট্রোজেনযুক্ত রেচন পদার্থগুলি পরিবেশে পরিত্যক্ত হয়। অণুজীবের ক্রিয়ায় রেচন পদার্থগুলি বিশ্লিষ্ট হয়ে পুনরায় সরল জৈব ও অজৈব উপাদানে পরিণত হয় এবং জলে দ্রবীভূত অবস্থায় উদ্ভিদেহে গৃহীত হয়।
  • অর্থনৈতিক গুরুত্ব – উদ্ভিদদেহে উৎপন্ন বেশিরভাগ রেচন পদার্থ (যেমন – রজন, রবার, গঁদ, উপক্ষার প্রভৃতি) মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হয়।

উদ্ভিদের রেচন ক্রিয়ার বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

উদ্ভিদের রেচনক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য –

  • উদ্ভিদদেহে কোনো সুনির্দিষ্ট রেচন অঙ্গ থাকে না।
  • উদ্ভিদদেহে বিপাকীয় ক্রিয়ার হার প্রাণীদের তুলনায় কম। এই কারণে রেচন পদার্থ উৎপাদনের পরিমাণও কম হয়।
  • উদ্ভিদদেহে প্রোটিন বিপাক কম হয়, ফলে নাইট্রোজেনঘটিত রেচন পদার্থ উৎপাদনও কম হয়।
  • উদ্ভিদের রেচন পদার্থগুলি কম জটিল ও কম ক্ষতিকারক।
  • উদ্ভিদ উপচিতি বিপাকের সাহায্যে পুনরায় রেচন পদার্থগুলিকে ব্যবহার করতে পারে।
  • উদ্ভিদ বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন রেচন পদার্থগুলিকে কোশে অদ্রবণীয় কেলাস বা কোলয়েডরূপে সঞ্চিত করে রাখতে পারে।

উদ্ভিদের বিভিন্ন প্রকার রেচন পদ্ধতিগুলি আলোচনা করো।

উদ্ভিদের বিভিন্ন প্রকার রেচন পদ্ধতি –

উদ্ভিদদেহে সুনির্দিষ্ট কোনো রেচন অঙ্গ থাকে না। তাই উদ্ভিদরা দেহে উৎপন্ন রেচন পদার্থগুলিকে দেহের বিভিন্ন স্থানে কেলাস ও কোলয়েডরূপে সঞ্চয় করে রাখে এবং অঙ্গমোচনের মাধ্যমে দেহ থেকে তা নির্গত করে।

পত্রমোচন – পর্ণমোচী উদ্ভিদ (যেমন – শিরীষ, আমড়া প্রভৃতি) একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে এবং চিরহরিৎ। উদ্ভিদ (যেমন – আম, জাম প্রভৃতি) সারাবছর ধরে পত্রমোচনের মাধ্যমে পাতায় জমা রেচন পদার্থ ত্যাগ করে।

পত্রমোচন

বাকলমোচন – বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ বিপাকক্রিয়ায় উৎপন্ন রেচন পদার্থগুলিকে গাছের বাকল বা ছালে (bark) জমা রাখে। বাকলমোচনের মাধ্যমে রেচন পদার্থগুলি উদ্ভিদদেহ থেকে অপসারিত হয়। যেমন – অর্জুন, পেয়ারা প্রভৃতি উদ্ভিদ।

বাকলমোচন

ফলমোচন – কিছু কিছু উদ্ভিদ ফলের খোসা ও বীজের মধ্যে রেচন পদার্থ জমা রাখে এবং ফলমোচনের। মাধ্যমে রেচনবস্তু দেহ থেকে অপসারিত হয়। যেমন – লেবুতে সাইট্রিক অ্যাসিড, আপেলে ম্যালিক অ্যাসিড এবং তেঁতুলে টারটারিক অ্যাসিড রেচন পদার্থ হিসেবে সঞ্চিত থাকে।

ফলমোচন

তরুক্ষীর নিঃসরণ – বট, অশ্বত্থ ফণীমনসা প্রভৃতি উদ্ভিদ দেহ থেকে তরুক্ষীর নিঃসরণের মাধ্যমে রেচন পদার্থ ত্যাগ করে।

তরুক্ষীর নিঃসরণ

জল নির্গমন – বিপাকীয় কাজের মাধ্যমে উৎপন্ন অতিরিক্ত জল জলরন্ধ্রের মাধ্যমে নিঃস্রাবণ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ থেকে রেচিত হয়। যেমন – টম্যাটো উদ্ভিদ।

গঁদ ও রজন নিঃসরণ – বাবলা, আমড়া, শাল, সজনে প্রভৃতি উদ্ভিদ গঁদ নিঃসরণের মাধ্যমে এবং পাইন, শাল প্রভৃতি গাছ কাণ্ডের রজন নালিতে সঞ্চিত রজন নিঃসরণের মাধ্যমে দেহ থেকে রেচন পদার্থ ত্যাগ করে।

গঁদ ও রজন নিঃসরণ

পুষ্পমোচন – কিছু কিছু উদ্ভিদ পুষ্পপত্রে রেচন পদার্থ জমিয়ে রাখে এবং ফুল ঝরার মাধ্যমে রেচন পদার্থ অপসারণ করে। যেমন – আর্টেমিসিয়া।

রেচন পদার্থ কাকে বলে? উদ্ভিদদেহে নাইট্রোজেনবিহীন ও নাইট্রোজেনযুক্ত রেচন পদার্থ সারণির সাহায্যে উল্লেখ করো।

রেচন পদার্থ – জীবের দেহকোশে বিপাকীয় কাজের ফলে উৎপন্ন দেহের পক্ষে ক্ষতিকারক, দূষিত ও অপ্রয়োজনীয় পদার্থগুলিকে রেচন পদার্থ বলে।

উদ্ভিদ রেচন পদার্থ

উদ্ভিদের নাইট্রোজেনবিহীন রেচন পদার্থগুলির নাম, উৎস, প্রকৃতি ও অর্থকরী গুরুত্ব ছকের আকারে লেখো।

নাম ও প্রকৃতিউৎসঅর্থকরী গুরুত্ব
গাঁদ বা গাম (Gum) – জলে দ্রাব্য, চটচটে আঠালো পদার্থ।উদ্ভিদের সেলুলোজ নির্মিত কোশপ্রাচীর বিনষ্ট হয়ে উৎপন্ন হয়। বাবলা, শিরীষ, আমড়া, জিওল প্রভৃতি উদ্ভিদ থেকে নিঃসৃত হয়।1. কাগজশিল্প, কাষ্ঠশিল্পও বইবাঁধাইশিল্পে কাজেলাগে।
2. ছাপার কালি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
3. ওষুধ তৈরির সময় অপদ্রব্যরূপে কাজে লাগে।
4. জোলাপ, প্রসাধনী সামগ্রী এবং লজেন্স তৈরিতে কাজে লাগে।
রজন বা রেজিন (Resin) – হালকা হলুদ বর্ণের, শক্ত অথচ ভঙ্গুর, জলে অদ্রাব্য কিন্তু অ্যালকোহলে দ্রাব্য।পাইন, শাল প্রভৃতি গাছের কান্ড, শাখাপ্রশাখা, পাতা প্রভৃতি অংশের রজননালিতে তরল, অর্ধতরল বা কঠিন রূপে সঞ্চিত থাকে।1. পাইন গাছ থেকে প্রাপ্ত রজন (তার্পিন তেল বা টারপেনটাইন) ভার্নিশ শিল্পে ও কাঠে রং করতে লাগে।
2. হিং গাছের থেকে প্রাপ্ত হিং রান্নায় ব্যবহৃত হয়।
3. শাল গাছের থেকে প্রাপ্ত ধুনো পূজা-অর্চনার কাজে লাগে।
4. এছাড়া ফিনাইল, কালি তৈরিতেও রজন লাগে।
তরুক্ষীর বা ল্যাটেক্স (Latex) – তরল, কোলয়েডধর্মী পদার্থ। সাধারণত কোশে সঞ্চিত প্রোটিন, গঁদ, রজন, উপক্ষার প্রভৃতির মিশ্রিত জলীয় দ্রবণকে তরুক্ষীর বলে।উদ্ভিদের তরুক্ষীর নালিতে তরুক্ষীর সঞ্চিত থাকে। রবার, বট, আকন্দ, পেঁপে প্রভৃতি উদ্ভিদের তরুক্ষীর সাদা দুধের মতো। কলা, তামাক উদ্ভিদে জলের মতো বর্ণহীন এবং আফিং, শিয়ালকাঁটা উদ্ভিদে হলুদ রঙের তরুক্ষীর সঞ্চিত থাকে।1. হিভিয়া ব্রাসিলিয়েনসিস (Hevea brasiliensis), ফাইকাস ইলাস্টিকা (Ficus elastica) প্রভৃতি উদ্ভিদ নিঃসৃত তরুক্ষীর থেকে বাণিজ্যিক রবার তৈরি হয়।
2. পেঁপেগাছের তরুক্ষীরে প্যাপাইন উৎসেচক থাকায় খাদ্য হজমকারী ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
3. তরুক্ষীর জলনিরোধক রূপে কাজ করে।
বানতেল বা উদ্বায়ী তেল (Volatile Oil) – নাইট্রোজেনবিহীন প্রধানত হাইড্রোকার্বনযুক্ত রেচন পদার্থ। জলে দ্রাব্য, সুগন্ধযুক্ত।লেবু, ইউক্যালিপটাস প্রভৃতির পাতা ও ফলত্বকে, লবঙ্গ, জুঁই, গোলাপ প্রভৃতি ফুলের পাপড়িতে, তেজপাতার ত্বকে, দারুচিনির কাণ্ডের ত্বকের তৈলগ্রন্থিতে থাকে।1. লবঙ্গ, দারুচিনি, তেজপাতা প্রভৃতি রান্নায় ব্যবহৃত হয়।
2. প্রসাধন শিল্পে ও ওষুধ শিল্পে বানতেল কাজে লাগে।
3. আতর, সাবান, সুগন্ধি দ্রব্য প্রস্তুতিতে উদ্বায়ী তেল ব্যবহার করা হয়।
জৈব অ্যাসিড বা জৈব অম্ল (Organic Acid) – কোশরসে দ্রবীভূত অম্লধর্মী তরল।লেবু, তেঁতুল, আপেল, আমরুল উদ্ভিদের পাতা ও ফলের কোশরসে যথাক্রমে সাইট্রিক অ্যাসিড, টারটারিক অ্যাসিড, ম্যালিক অ্যাসিড ও অক্সালিক অ্যাসিড প্রভৃতি জৈব অ্যাসিড সঞ্চিত থাকে।1. বিভিন্ন খাদ্যবস্তু তৈরিতে (যেমন – জ্যাম, জেলি, আচার, সস প্রভৃতি) ব্যবহৃত হয়।
2. ওষুধ ও প্রসাধন শিল্পে কাজে লাগে।
ট্যানিন (Tannin) – কালচে রঙের, নাইট্রোজেন বিহীন, কার্বনযুক্ত রেচন পদার্থ। স্বাদে তেতো।চা গাছের পাতায়, আমলকী-বহেড়া-হরীতকী ফলের ত্বকে পাওয়া যায়। খয়ের গাছের কান্ডের কোশপ্রাচীরে পাওয়া যায়।1. পানের সঙ্গে মশলারূপে খয়ের ব্যবহৃত হয়।
2. চামড়া ট্যান করার কাজে লাগে।
4. কালি ও ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

উপক্ষার কাকে বলে? উদ্ভিদের নাইট্রোজেনযুক্ত উপক্ষারের নাম, উৎস ও অর্থকরী গুরুত্ব ছকের মাধ্যমে উল্লেখ করো।

উপক্ষার বা অ্যালকালয়েড (Alkaloid) – উদ্ভিদদেহে প্রোটিন বিপাকের ফলে উৎপন্ন কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন ও নাইট্রোজেনের সমন্বয়ে গঠিত জলে দ্রাব্য বা অদ্রাব্য জটিল জৈব যৌগকে উপক্ষার বা অ্যালকালয়েড বলে।

N₂-যুক্ত রেচন পদার্থউৎসঅর্থকরী গুরুত্ব
কুইনাইনসিঙ্কোনা গাছের বাকলম্যালেরিয়া রোগের ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে।
রেসারপিনসর্পগন্ধা গাছের মূলউচ্চ রক্তচাপ কমানোর ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
ডাটুরিনধুতুরাগাছের পাতা ও ফলহাঁপানির ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে।
মরফিনআফিংগাছের কাঁচা ফলের ত্বকব্যথা-বেদনা উপশমকারী ও গাঢ় নিদ্রার ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে।
অ্যাট্রোপিনবেলেডোনা গাছের মূল ও পাতাচোখের তারারন্ধ্র প্রসারণে, রক্তচাপ বৃদ্ধিতে সাহায্যকারী এবং সমবেদী স্নায়ুকে উদ্দীপিত করার ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে।
নিকোটিনতামাক পাতামাদকদ্রব্য রূপে ব্যবহৃত হয়।
স্ট্রিকনিননাক্সভমিকা গাছের বীজপেটের রোগের ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে।
ক্যাফিনকফি বীজব্যথাবেদনা উপশমকারী ওষুধ তৈরিতে ও ক্লান্তিনাশক রূপে ব্যবহৃত হয়।
এমিটিনইপিকাক গাছের মূলআমাশয়, উদরাময়, বমি ও কাশির ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে।

প্রাণী রেচনের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

প্রাণী রেচনের বৈশিষ্ট্য –

  • বেশিরভাগ প্রাণীর সুনির্দিষ্ট রেচন অঙ্গ বর্তমান। উন্নত প্রাণীদেহে সুগঠিত রেচনতন্ত্র উপস্থিত থাকে।
  • অধিকাংশ প্রাণীর রেচন প্রক্রিয়া জটিল প্রকৃতির।
  • প্রাণীরা দেহে উৎপন্ন রেচন পদার্থগুলিকে কখনোই পুনরায় ব্যবহার করতে পারে না।
  • প্রাণীরা প্রোটিন খাদ্য বেশি পরিমাণে গ্রহণ করে, এজন্য নাইট্রোজেনঘটিত রেচন পদার্থ বেশি পরিমাণে উৎপন্ন হয়।
  • প্রাণীরা রেচন পদার্থগুলিকে কোশের মধ্যে সঞ্চয় করে রাখতে পারে না, এজন্য এগুলির কোশ থেকে দ্রুত অপসারণ ঘটে।
  • প্রাণীদের রেচন পদার্থ বেশি ক্ষতিকারক হওয়ায় নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই, তা দেহ থেকে অপসারণের প্রয়োজন ঘটে।

নিম্নলিখিত রেচন অঙ্গগুলি কোন্ কোন্ প্রাণীদেহে অবস্থিত ছকের আকারে লেখো – 1. সংকোচনশীল গহ্বর, 2. ফ্লেমকোশ, 3. নেফ্রিডিয়া, 4. ম্যালপিজিয়ান নালিকা, 5. বৃক্ক।

রেচন অঙ্গসংশ্লিষ্ট প্রাণী
1. সংকোচনশীল গহ্বরঅ্যামিবা, প্যারামেসিয়াম
2. ফ্লেমকোশ বা শিখাকোশচ্যাপটাকৃমি, ফিতাকৃমি
3. নেফ্রিডিয়াকেঁচো, জোঁক
4. ম্যালপিজিয়ান নালিকাআরশোলা, প্রজাপতি, মাছি
5. বৃক্কব্যাং, মানুষ

রেচনতন্ত্র কাকে বলে? মানুষের রেচনতন্ত্রের সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।

রেচনতন্ত্র (Excretory System) – দেহের কলাকোশে উৎপন্ন রেচন পদার্থ অপসারণ ও নির্গমনে সাহায্যকারী অঙ্গগুলি মিলিতভাবে যে তন্ত্র গঠন করে, তাকে রেচনতন্ত্র বলে।

মানবদেহের রেচনতন্ত্র – মানুষের দেহে প্রধান রেচন অঙ্গ হল একজোড়া বৃক্ক বা কিডনি। এছাড়া আনুষাঙ্গিক রেচন অঙ্গগুলি হল দুটি গবিনী, একটি মূত্রথলি বা মূত্রাশয় এবং একটি মূত্রনালি।

  • বৃক্ক বা কিডনি – বৃক্ক দুটি দেখতে অনেকটা শিমবীজের মতো। বৃক্ক দুটি মানুষের উদর গহ্বরে কটি বা লাম্বার অঞ্চলের পিছনের দিকে মেরুদণ্ডের দুপাশে অবস্থান করে।
  • গবিনী বা ইউরেটার – বৃক্কের অবতল খাঁজযুক্ত হাইলাম অংশ থেকে উৎপন্ন হয়ে মূত্রথলি পর্যন্ত বিস্তৃত 20-30 সেমি দীর্ঘ লম্বা সরু নলাকার গঠন। বৃক্কে উৎপন্ন মূত্র এই নালির মাধ্যমে মুত্রথলিতে পরিবাহিত হয়। 
  • মূত্রথলি বা ইউরিনারি ব্লাডার – পেশিবহুল, স্থিতিস্থাপক থলিবিশেষ। এখানে দুটি গবিনী উন্মুক্ত হয়। বৃক্কে উৎপন্ন মূত্র গবিনীর মাধ্যমে মূত্রথলিতে সাময়িকভাবে জমা থাকে।
  • মূত্রনালি বা ইউরেথ্রা – মূত্রথলি থেকে মূত্রছিদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছোটো নলাকার গঠন।
মানুষের রেচনতন্ত্র

বৃক্ক কী? মানবদেহে বৃক্কের অবস্থান ও কাজগুলি আলোচনা করো।

বৃক্ক (Kidney) – বৃক্ক বা কিডনি হল মেরুদণ্ডী প্রাণীদের প্রধান রেচন অঙ্গ। মানবদেহে বিপাকজাত দুষিত রেচন পদার্থগুলি বৃক্কে প্রস্তুত মূত্রের মাধ্যমে দেহ থেকে নির্গত হয়। মানবদেহে একজোড়া বৃক্ক উপস্থিত থাকে।

মানব বৃক্কের অবস্থান – মানব বৃক্ক দুটি উদর গহ্বরের পিছনে মেরুদণ্ডের দুপাশে অবস্থান করে। 12তম বক্ষদেশীয় কশেরুকা অঞ্চল থেকে 3য় কশেরুকা অঞ্চল পর্যন্ত বৃক্ক দুটি অবস্থিত।

বৃক্কের কাজগুলি হল –

  • দেহ থেকে রেচন পদার্থের অপসারণ – মূত্র উৎপাদনের মাধ্যমে বৃক্ক দেহ থেকে ক্ষতিকারক নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্যপদার্থের অপসারণ ঘটায় ও দেহের অভ্যন্তরে স্থিতিসাম্য বা হোমিওস্ট্যাসিস নিয়ন্ত্রণ করে।
  • দেহতরলে অম্ল-ক্ষার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ – অম্লীয় ও ক্ষারীয় উপাদান রেচনের মাধ্যমে বৃক্ক দেহতরলে অম্ল-ক্ষার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে।
  • দেহে জলের ভারসাম্য বজায় রাখা – প্রয়োজনে বিভিন্ন ঘনত্বের মূত্র উৎপাদনের মাধ্যমে বৃক্ক দেহে জলের ভারসাম্য বজায় রাখে।
  • রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ – বৃক্ক রক্তের অভিস্রবণ চাপ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রয়োজনবোধে বৃক্ক রেনিন উৎসেচক ক্ষরণ করে এবং রেনিনের সাহায্যে অ্যানজিওটেনসিন উৎপাদনের দ্বারা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
  • লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন – অক্সিজেনের অভাব ঘটলে বৃক্ক এরিথ্রোপোয়েটিন নামক হরমোন সদৃশ পদার্থ ক্ষরণ দ্বারা লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করে।

মানব বৃক্কের গঠন আলোচনা করো।

প্রতিটি বৃক্ক গাঢ় লালচে বাদামি রঙের শিমবীজের মতো আকৃতিযুক্ত, লম্বায় 11 সেমি ও চওড়ায় 5 সেমি এবং 3 সেমি স্থূলত্বযুক্ত হয়। প্রতিটি পরিণত বৃক্কের ওজন প্রায় 150 গ্রাম।

বৃক্কের বহির্গঠন –

  • প্রতিটি বৃক্ক তত্ত্বময় যোগকলার আবরণী, ক্যাপসুল দ্বারা আবৃত থাকে।
  • বৃক্কের বাইরের পৃষ্ঠ উত্তল এবং ভিতরের পৃষ্ঠ অবতল বা খাঁজযুক্ত। এই স্থানকে বৃক্কের নাভি বা হাইলাম বলে।
  • হাইলাম অংশ দিয়ে বৃক্কীয় শিরা, বৃক্কীয় ধমনি এবং গবিনী বেরিয়ে আসে।
মানুষের বৃক্কের লম্বচ্ছেদে দৃশ্যমান অভ্যন্তরীণ গঠন

বৃক্কের অভ্যন্তরীণ গঠন –

প্রতিটি বৃক্কের লম্বচ্ছেদ করলে দুটি অংশ দেখা যায়। যথা –

  • বাইরের গাঢ় লাল রঙের অংশ বহিঃস্তর বা কর্টেক্স এবং
  • ভিতরের অপেক্ষাকৃত হালকা লাল অংশ অন্তঃস্তর বা মেডালা।প্রতিটি গবিনী বৃক্কের ভিতরে গিয়ে ফানেলের মতো প্রসারিত হয়। একে বৃক্কীয় পেলভিস বলা হয়। বৃক্কীয় পেলভিস বৃক্কের মধ্যে প্রবেশ করে 2-3টি প্রধান ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এদের প্রধান বৃতি বা মেজর ক্যালিক্স বলে। প্রতিটি প্রধান বৃতি আবার 7-13টি শাখায় বিভক্ত হয়। এই শাখাগুলিকে শাখাবৃতি বা মাইনর ক্যালিক্স বলে।
  • বৃক্কের ভিতরে কর্টেক্সের কিছু কিছু অংশ মেডালার গভীরে গিয়ে স্তম্ভাকৃতি ধারণ করেছে। এদের রেনাল প্যাপিলা বলে।
  • কর্টেক্সের এই রকম বিন্যাসের ফলে মেডালা অঞ্চলে কতকগুলি পিরামিডাকার অংশ দেখা যায়। এদের রেনাল পিরামিড বলে। পিরামিডের সরু অংশ বৃক্কীয় পেলভিসের দিকে থাকে।
  • প্রতিটি বৃক্কের কর্টেক্স ও মেডালা অংশে প্রায় 10 লক্ষ নেফ্রন থাকে। নেফ্রন হল বৃক্কের গঠনগত ও কার্যগত একক।

নেফ্রন কাকে বলে? চিত্রসহ নেফ্রনের গঠন বর্ণনা করো।

নেফ্রন (Nephron) – বৃক্কের গঠনগত ও কার্যগত একককে নেফ্রন বলে। প্রতিটি বৃক্কে প্রায় 9-12 লক্ষ (গড়ে 10 লক্ষ) নেফ্রন থাকে।

নেফ্রনের গঠন – প্রতিটি নেফ্রন প্রধানত দুটি অংশ দ্বারা গঠিত। যথা

  1. ম্যালপিজিয়ান কণিকা এবং
  2. বৃক্কীয় নালিকা।
নেফ্রনের গঠন

ম্যালপিজিয়ান কণিকা (Malpighian Corpuscle) –

নেফ্রনের স্ফীত অগ্রভাগকে ম্যালপিজিয়ান কণিকা বলে। এই অংশটি বৃক্কের কর্টেক্স স্তরে উপস্থিত থাকে। প্রতিটি ম্যালপিজিয়ান কণিকা আবার দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। যথা –

  1. বাওম্যানের ক্যাপসুল এবং
  2. গ্লোমেরুলাস।

বাওম্যানের ক্যাপসুল (Bowman’s Capsule) – ম্যালপিজিয়ান কণিকার বদ্ধপ্রান্ত ও ফানেলের মতো স্ফীত, প্রসারিত আকৃতিযুক্ত যে অংশ গ্লোমেরুলাস নামক রক্তজালকগুচ্ছকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে বেষ্টন করে থাকে, তাকে বাওম্যানের ক্যাপসুল বা বাওম্যানস ক্যাপসুল বলে। এটি ছোটো থলির মতো দ্বিস্তরীয় অংশ বিশেষ, যার মধ্যে রেনাল ধমনিকা প্রবেশ করে কুণ্ডলীকৃত জালকের সৃষ্টি করেছে।

গ্লোমেরুলাস (Glomerulus) – ম্যালপিজিয়ান কণিকার বাওম্যানের ক্যাপসুল দ্বারা প্রায় সম্পূর্ণভাবে আবৃত 50টি লুপের মতো রেনাল পিণ্ড বা রক্তজালক পিণ্ডকে গ্লোমেরুলাস বলে। রেনাল ধমনির বহির্মুখী ধমনিকা লম্বা ও কম ব্যাসযুক্ত হয় এবং অন্তর্মুখী ধমনিকা লম্বায় ছোটো ও বেশি ব্যাসযুক্ত হয়। এই কারণে, গ্লোমেরুলাসের রক্তচাপ বেশি হয় এবং পরিস্রাবক পর্দার উপস্থিতিতে রক্তের পরিস্তুতকরণ ঘটে ও মূত্র উৎপন্ন হয়।

বৃক্কীয় নালিকা (Renal Tubule) –

বাওম্যানস ক্যাপসুলের তলদেশ থেকে সংগ্রাহক নালিকার উৎপত্তি হয়েছে। এরা পেলভিসের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এখানে পরিশ্রুত তরল পুনঃশোষিত হয়। প্রতিটি বৃক্কীয় নালিকা প্রায় ও সেমি লম্বা এবং 20-60 µm ব্যাসযুক্ত হয়। এটি প্রধানত তিনটি অংশে বিভক্ত থাকে। যথা –

  • নিকটবর্তী সংবর্ত নালিকা বা পরাসংবর্ত নালিকা,
  • হেনলির লুপ এবং
  • দূরসংবর্ত নালিকা।

নিকটবর্তী সংবর্ত নালিকা (Proximal Convoluted Tubule or PCT) – বৃক্কীয় নালিকার অত্যন্ত প্যাঁচানো (সংবর্ত), 15 mm দীর্ঘ ও 55 µm ব্যাসযুক্ত প্রথম প্রশস্ত অংশকে নিকটবর্তী সংবর্ত নালিকা বলে।

হেনলির লুপ (Henle’s Loop) – বৃক্কীয় নালিকার ‘U’ আকৃতিযুক্ত লুপের মতো অংশকে হেনলির লুপ বলে।

দূরবর্তী সংবর্ত নালিকা (Distal Convoluted Tubule or DCT) – বৃক্কের কর্টেক্স অঞ্চলে অবস্থানকারী বৃক্কীয় নালিকার শেষে 5 mm দীর্ঘ ও 20-50 µm ব্যাসযুক্ত অল্প প্যাঁচানো (সংবর্ত) অংশকে দূরবর্তী সংবর্ত নালিকা বলে। দূরবর্তী সংবর্ত নালিকা যে অপেক্ষাকৃত মোটা নালিতে উন্মুক্ত হয়, তাকে সংগ্রাহক নালিকা বা কালেকটিং টিউবিউল (Collecting Tubule) বলে।

সংগ্রাহক নালিকা (Collecting Tubule) –

দূরবর্তী সংবর্ত নালিকার পরবর্তী যে অংশ স্থূল নালিকায় যুক্ত হয়, তাকে সংগ্রাহক নালিকা বলে। এই অংশে পরিস্তুত তরল পুনঃশোষণের পর মুত্ররূপে জমা হয়। অনেকগুলি সংগ্রাহক নালিকা একত্র হয়ে বেলিনির নালি গঠন করে। অবশেষে বেলিনির নালি সাইনাস গহ্বরে প্রবেশ করে এবং প্রকৃতপক্ষে এই সাইনাস গহ্বর-ই হল ইউরেটার বা গবিনীর স্ফীত প্রান্ত।

মুত্র উৎপাদনে নেফ্রনের ভূমিকা আলোচনা করো।
অথবা, মানবদেহের মূত্র উৎপাদন প্রক্রিয়াটি সংক্ষেপে লেখো।

মৃত উৎপাদনে নেফ্রনের ভূমিকা –

নেফ্রনের বিভিন্ন অংশ মূত্র উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে –

মূত্র উৎপাদনে ম্যালপিজিয়ান কণিকার ভূমিকা –

ম্যালপিজিয়ান কণিকা পরিস্রাবক যন্ত্ররূপে কাজ করে।

পরাপরিস্রাবণ প্রক্রিয়া –

  • ম্যালপিজিয়ান কণিকাস্থিত অন্তর্মুখী উপধমনির ব্যাস (50 µm) বহির্মুখী উপধমনির ব্যাসের (25 µm) দ্বিগুণ হওয়ায় গ্লোমেরুলাসে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি হয় (কার্যকরী পরিস্রাবণ চাপের মাত্রা 25 mm Hg)।
  • এই চাপের প্রভাবে গ্লোমেরুলাসস্থিত রক্তের প্রোটিনবিহীন রেচন পদার্থযুক্ত তরল পরিদ্রুত হয়ে বাওম্যানস ক্যাপসুলের গহ্বরে প্রবেশ করে।

মুত্র উৎপাদনে বৃক্কীয় নালিকার ভূমিকা –

বৃক্কীয় নালিকার বিভিন্ন অংশ বাওম্যানস ক্যাপসুলের পরিস্রুত তরলকে নিম্নলিখিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূত্রে রূপান্তরিত করে।

  • পুনঃশোষণ – পরিস্রুত তরল বৃক্কীয় নালিকার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় শোষণ পদ্ধতিতে গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, Na+, K+, HCO3, Cl, ফসফেট, সালফেট, ভিটামিন-C, জল প্রভৃতি পুনঃশোষিত হয়।
  • নালিকার ক্ষরণ – বৃক্কীয় নালিকার প্রাচীরস্থিত কোশ থেকে K+, H+, NH4+, ক্রিয়েটিন প্রভৃতি ক্ষরিত হয়।
  • নতুন পদার্থের উৎপাদন – বৃক্কীয় নালিকার প্রাচীরস্থিত কোশ থেকে অ্যামোনিয়া (NH3), অজৈব ফসফেট, হিপ্পিউরিক অ্যাসিড প্রভৃতি উৎপন্ন হয় এবং নালিকা গহ্বরের তরলে পরিত্যক্ত হয়।

মূত্র উৎপাদন –

বৃক্কীয় নালিকায় পুনঃশোষণ, ক্ষরণ ও উৎপাদিত নতুন পদার্থের সংযোজনের মাধ্যমে অতিসারক মূত্র উৎপন্ন হয়। এই মূত্র সংগ্রাহক নালি থেকে বেলিনির নালিতে আসে এবং সেখানে বৃক্কীয় শ্রোণির মাধ্যমে গবিনীতে প্রবেশ করে। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দেহে 24 ঘণ্টায় 150-170L তরলের পরিস্রাবণ ঘটে গড়ে 1.5L মূত্র উৎপন্ন হয়।

মূত্র কী? মূত্রের স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক উপাদানগুলির নাম লেখো।

মূত্র (Urine) – মেরুদণ্ডী প্রাণীর দেহে বিপাক ক্রিয়ায় উৎপন্ন ও নেফ্রনের দ্বারা পরিস্রুত এবং পুনঃশোষণের পর পরিত্যক্ত, অপ্রয়োজনীয়, নাইট্রোজেনযুক্ত ও নাইট্রোজেনবিহীন বর্জ্যপদার্থ সমন্বিত বিশেষ গন্ধযুক্ত, অম্লধর্মী, হালকা হলুদ রঙের তরল পদার্থকে মূত্র বলে।

মূত্রের স্বাভাবিক উপাদান – জল, ইউরিয়া (25-35 gm), ক্রিয়েটিন, ক্রিয়েটিনিন, অ্যামোনিয়া, হিপ্পিউরিক অ্যাসিড, NaCl, KCl, ফসফেট, সালফেট প্রভৃতি।

মূত্রের অস্বাভাবিক উপাদান – শর্করা (গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ প্রভৃতি), প্রোটিন, কিটোনবস্তু, রক্ত, ফ্যাট প্রভৃতি।

মানবদেহে অতিরিক্ত রেচনাঙ্গ হিসেবে যকৃৎ, ফুসফুস ও ত্বকের ভূমিকা আলোচনা করো।

মানব রেচনে যকৃতের ভূমিকা –

  • ইউরিয়া উৎপাদন – দেহে অপ্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড ডি-অ্যামাইনেজ উৎসেচকের সাহায্যে অ্যামোনিয়ায় পরিণত হয়। অ্যামোনিয়া যকৃতে আরজিনেজ উৎসেচকের সাহায্যে ইউরিয়ায় পরিণত হয়। ইউরিয়া রেনাল ধমনির মাধ্যমে বৃক্কে পৌঁছায় ও মূত্রের মাধ্যমে দেহ থেকে রেচিত হয়।
  • বিলিরুবিন, বিলিভারডিন উৎপাদন – যকৃতে হিমোগ্লোবিন বিশ্লিষ্ট হয়ে বিলিরুবিন, বিলিভারডিন নামক পিত্তরঞ্জক উৎপন্ন করে। এগুলি মূত্রের মাধ্যমে দেহ থেকে নির্গত হয়।

মানব বেচনে ফুসফুসের ভূমিকা – ফুসফুসের মাধ্যমে নিশ্বাস বায়ু দেহের বাইরে নির্গত হয়। এই নিশ্বাস বায়ুর মাধ্যমে কার্বন ডাইঅক্সাইড, জলীয় বাষ্প, অ্যালকোহল, অ্যাসিটোন, অ্যামোনিয়া প্রভৃতি রেচন পদার্থ দেহ থেকে নির্গত হয়।

মানব রেচনে ত্বকের ভূমিকা –

  • ঘর্ম ক্ষরণ – ত্বকের ডারমিস স্তরে উপস্থিত ঘর্মগ্রন্থি থেকে ঘর্ম ক্ষরিত হয়। এই ঘর্ম বা ঘামের মাধ্যমে দেহ থেকে CO₂, NaCl, H₂O, ইউরিয়া প্রভৃতি রেচিত হয়।
  • সিবাম উৎপাদন – ত্বকের ডারমিস স্তরে উপস্থিত সিবেসিয়াস গ্রন্থি থেকে সিবাম ক্ষরিত হয়। এই সিবামের মাধ্যমে দেহ থেকে ফ্যাটি অ্যাসিড, কোলেস্টেরল, গ্লিসারল প্রভৃতি রেচিত হয়।

মানবদেহে উৎপাদিত পাঁচটি রেচন পদার্থের নাম, উৎপত্তি স্থান, উৎপত্তির কারণ ও নির্গমনের প্রকৃতি ছকের সাহায্যে উল্লেখ করো।

মানবদেহের রেচন পদার্থউৎপত্তি স্থানউৎপত্তির কারণনির্গমন প্রকৃতি
ইউরিয়াযকৃৎপ্রোটিন বিপাকমূত্র ও ঘাম
অ্যামোনিয়াদেহকোশপ্রোটিন বিপাকমূত্র ও ঘাম
বিলিরুবিন ও বিলিভারডিনযকৃৎহিমোগ্লোবিন বিশ্লিষ্টকরণমূত্র ও জল
কিটোন বডিযকৃৎফ্যাটি অ্যাসিড -এর β-জারণ (কার্বোহাইড্রেটের অভাব ঘটলে)মূত্র
কার্বন ডাইঅক্সাইডদেহকোশকার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট ও প্রোটিন বিপাকনিশ্বাস বায়ু

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘রেচন’ অংশের রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

পরিবেশ ও তার সম্পদ-বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন-জীবনবিজ্ঞান-নবম শ্রেণী

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

পরিবেশ ও তার সম্পদ-বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন-জীবনবিজ্ঞান-নবম শ্রেণী

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – টীকা

পরিবেশ ও তার সম্পদ-বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন-জীবনবিজ্ঞান-নবম শ্রেণী

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

About The Author

Souvick

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – টীকা

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর