এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “উনিশ শতকের বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মসমাজগুলির কীরূপ ভূমিকা ছিল?” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাস পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই “উনিশ শতকের বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মসমাজগুলির কীরূপ ভূমিকা ছিল?“ প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায় “সংস্কার – বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা“ -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবং চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়।

উনিশ শতকের বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মসমাজগুলির কীরূপ ভূমিকা ছিল?
1828 খ্রিস্টাব্দে রাজা রামমোহন রায় তাঁর একেশ্বরবাদী ধর্মমত প্রচারের উদ্দেশ্যে যে ‘ব্রাহ্মসভা’ গড়ে তোলেন, পরবর্তীকালে তা একাধিক শাখা-উপশাখায় বিভক্ত হয়ে গেলেও বাস্তবিক পক্ষে এগুলির সবই ছিল বৃহত্তর ব্রাহ্ম আন্দোলনের শরিক এবং মানব হিতৈষণার ব্রতে ব্রতী। ভারতীয় জনজীবনে ব্রাহ্ম আন্দোলনের অবদান অনস্বীকার্য।
ব্রাহ্ম আন্দোলনের অবদান
কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠন –
কুসংস্কারের নিগড়ে আবদ্ধ রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের বুকে ব্রাহ্ম সমাজই প্রথম সজোরে আঘাত হানে। ব্রাহ্ম ধর্মের একেশ্বরবাদ ও সমন্বয়বাদ পরবর্তীকালে হিন্দুধর্মের নবজাগরণে সাহায্য করেছিল। সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে 1870 খ্রিস্টাব্দে কেশবচন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারতীয় সংস্কার সভা’। জনকল্যাণ, সমাজ সংস্কার ও জনগণের নৈতিক উন্নতিসাধন এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ ছিল।
নারী সমাজের উন্নয়ন –
স্ত্রীশিক্ষা ও স্ত্রী স্বাধীনতার প্রসারের ক্ষেত্রে ব্রাহ্ম সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। 1863 খ্রিস্টাব্দে কেশবচন্দ্রের প্রেরণায় বয়স্কা মহিলাদের নিজ নিজ গৃহে শিক্ষাদানের জন্য ব্রাহ্মিকাগণ নিযুক্ত হন। এ ছাড়াও ব্রাহ্ম সমাজ থেকে ‘ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়’ স্থাপিত হয়। পিতার সম্পত্তিতে কন্যার আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্রাহ্ম সমাজের উদ্যোগ অনস্বীকার্য। নারী শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে 1871 খ্রিস্টাব্দে কেশবচন্দ্র ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
তিন আইন পাস –
ব্রাহ্ম সমাজের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের তীব্রতায় ব্রিটিশ সরকার 1872 খ্রিস্টাব্দে ‘তিন আইন’ পাস করতে বাধ্য হয়। এই আইন বলে, বাল্য বিবাহ ও পুরুষের বহু বিবাহ রদ করা হয় এবং অসবর্ণ বিবাহ আইনসিদ্ধ হয়। তাই এই আইন বহুক্ষেত্রে ‘ব্রাহ্ম বিবাহ আইন’ নামেও পরিচিত।
নিম্নবর্গের সামাজিক উন্নয়ন –
সমাজের প্রান্তিক জনসাধারণের উন্নয়নের জন্য ব্রাহ্মসমাজ উদ্যোগী হয়। অন্ত্যজ শ্রেণির উন্নয়নের পাশাপাশি পাটকল শ্রমিকদের জন্য নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন, মদ্যপান-বিরোধী প্রচার ইত্যাদি কর্মসূচির রূপায়ণ করে ব্রাহ্ম সমাজ। বয়স্ক শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি 1870 খ্রিস্টাব্দে নৈশ্য বিদ্যালয় স্থাপন করেন। শ্রমজীবি মানুষের উন্নতি কল্পে কেশবচন্দ্রের অনুপ্রেরণায় ব্রাহ্ম নেতা শশীপদ ব্যানার্জি 1870 খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন ‘শ্রমজীবি সমিতি’ এবং প্রকাশ করেন ‘ভারত শ্রমজীবি’ পত্রিকা। বস্তুতপক্ষে এটি ছিল বাংলা তথা ভারতে শ্রমজীবি মানুষের জন্য প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা। এছাড়াও কেশবচন্দ্রের অনুপ্রেরণায় ব্রাহ্মনেতা উমানাথ গুপ্তের সম্পাদনায় 1870 খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল ‘সুলভসমাচার’ নামক সাপ্তাহিক।
জাতীয়তাবাদের জাগরণ –
জাতীয়তাবাদের জাগরনে ব্রাহ্ম সমাজ, বিশেষত, কেশবচন্দ্র সেনের অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। কেশবচন্দ্রের সর্বভারতীয় ভ্রমণ ও প্রচারকার্য শিক্ষিত ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদের জাগরণে কার্যকরী ভূমিকা নেয়। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার কেশবচন্দ্রের নেতৃত্বাধীন ব্রাহ্ম আন্দোলনকে ‘প্রথম সর্ব ভারতীয় আন্দোলন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
অন্যান্য অবদান –
- ব্রাহ্মসমাজ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠ বিষয়গুলির সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে দেশোন্নয়নে ব্রতী হয়।
- আর্ত-পীড়িতের সেবাকার্যেও ব্রাহ্মসমাজ পিছিয়ে ছিল না।
- এই প্রতিষ্ঠানই ভারতকে বহু জাতীয়তাবাদী নেতা তথা ধর্ম ও সমাজ-সংস্কারক উপহার দিয়েছে।
- বর্তমানে ভারতীয় সংস্কৃতিতে ‘ব্রাহ্মিকা পদ্ধতি’তে শাড়ি পরিধানের যে বিশেষ রীতি প্রচলিত রয়েছে, তা ব্রাহ্ম সমাজের অভ্যন্তরে ঠাকুর বাড়ির মহিলাদের দ্বারাই প্রথম সূচিত হয়েছিল।
মূল্যায়ন –
অনেকে ব্রাহ্মসমাজী আন্দোলনকে ‘এলিটিস্ট’ এবং ‘জাতীয় জীবনের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন’ বলে সমালোচনা করলেও, উনিশ শতকীয় বাংলা তথা ভারতের নবজাগরণে ব্রাহ্ম আন্দোলনের অবদান কোনোমতেই অস্বীকার করা যায় না।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
ব্রাহ্মসমাজ কী এবং কে এটি প্রতিষ্ঠা করেন?
ব্রাহ্মসমাজ ছিল একটি সমাজ-ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন, যা 1828 সালে রাজা রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত “ব্রাহ্মসভা” থেকে উদ্ভূত হয়। এটি হিন্দু সমাজের কুসংস্কার, মূর্তিপূজা ও জাতিভেদের বিরুদ্ধে সংস্কারের লক্ষ্যে কাজ করে।
ব্রাহ্মসমাজের প্রধান সংস্কারগুলি কী ছিল?
1. একেশ্বরবাদের প্রচার (মূর্তিপূজার বিরোধিতা)।
2. নারীশিক্ষা ও নারী অধিকারের প্রচার (বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ বন্ধ, স্ত্রীশিক্ষা প্রসার)।
3. সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির উন্নয়ন (অন্ত্যজ শ্রেণির জন্য শিক্ষা, শ্রমজীবীদের অধিকার)।
4. জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভূমিকা (কেশবচন্দ্র সেনের সর্বভারতীয় প্রচার)।
ব্রাহ্মসমাজ নারী সমাজের উন্নয়নে কী ভূমিকা পালন করে?
1. ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে নারীশিক্ষার প্রসার।
2. ব্রাহ্ম বিবাহ আইন (1872) পাস করিয়ে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করে।
3. ভিক্টোরিয়া কলেজ (1871) স্থাপন করে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি।
সম্পত্তিতে নারীর অধিকারের পক্ষে আন্দোলন।
ব্রাহ্মসমাজের সাথে কেশবচন্দ্র সেনের সম্পর্ক কী?
কেশবচন্দ্র সেন ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন। তিনি ভারতীয় সংস্কার সভা (1870), শ্রমজীবী সমিতি এবং সুলভসমাচার পত্রিকার মাধ্যমে সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ব্রাহ্মসমাজের “তিন আইন” কী ছিল?
1872 সালে ব্রিটিশ সরকার ব্রাহ্ম বিবাহ আইন পাস করে, যা –
1. বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করে।
2. পুরুষের বহুবিবাহ বন্ধ করে।
3. অসবর্ণ বিবাহকে বৈধতা দেয়।
ব্রাহ্মসমাজ জাতীয়তাবাদে কী অবদান রেখেছিল?
কেশবচন্দ্র সেনের সর্বভারতীয় ভ্রমণ ও ধর্মীয়-সামাজিক সংস্কার আন্দোলন শিক্ষিত ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় চেতনা জাগ্রত করে। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার একে “প্রথম সর্বভারতীয় আন্দোলন” বলে অভিহিত করেছেন।
ব্রাহ্মসমাজের সমালোচনা কী ছিল?
কিছু সমালোচক মনে করেন ব্রাহ্মসমাজ “এলিটিস্ট” ছিল এবং সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন। তবে বাংলার নবজাগরণে এর ভূমিকা অপরিসীম।
বর্তমানে ব্রাহ্মসমাজের প্রভাব কী?
ব্রাহ্মসমাজের আদর্শ নারীশিক্ষা, সমতাভিত্তিক সমাজ ও জাতীয়তাবাদ আজও প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে “ব্রাহ্মিকা শাড়ি পরার রীতি” তাদেরই অবদান।
ব্রাহ্মসমাজের কিছু উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান কী কী?
ভারতীয় সংস্কার সভা (1870), ভিক্টোরিয়া কলেজ (1871), শ্রমজীবী সমিতি (1870), সুলভসমাচার (সামাজিক সংবাদপত্র)।
ব্রাহ্মসমাজের ধর্মীয় দর্শন কী ছিল?
ব্রাহ্মসমাজ একেশ্বরবাদ, যুক্তিনির্ভর ধর্ম ও সমন্বয়ধর্মী চিন্তা প্রচার করত, যা হিন্দুধর্মের সংস্কারে সাহায্য করে।
এই আর্টিকেলে আমরা মাধ্যমিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “উনিশ শতকের বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মসমাজগুলির কীরূপ ভূমিকা ছিল?” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই “উনিশ শতকের বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মসমাজগুলির কীরূপ ভূমিকা ছিল?” প্রশ্নটি মাধ্যমিক ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায় “সংস্কার – বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা” -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবং চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই দেখা যায়। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা অসুবিধা থাকলে, আমাদের সাথে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব। তাছাড়া, নিচে আমাদের এই পোস্টটি আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন, যাদের এটি প্রয়োজন হতে পারে। ধন্যবাদ।