আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের পঞ্চম পাঠের প্রথম অধ্যায়, ‘ভাঙার গান’ -এর কিছু রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

‘ভাঙার গান’ কবিতাটির মর্মার্থ নিজের ভাষায় লেখো।
1924 খ্রিস্টাব্দে রচিত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘ভাঙার গান’ গীতিকাটি মূলত পরাধীন ভারতবর্ষের বিপ্লবীদের প্রেরণার মূলমন্ত্র।
আলোচ্য কবিতায় কবি পরাধীন ভারতবাসীকে দেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করে কেবল জেলখানার লৌহকপাটই ভাঙতে বলেননি, সমগ্র ভারতবর্ষ যেভাবে ইংরেজ সরকারের ঔপনিবেশিক কারাগারে পরিণত হয়েছে, তার ভিত নড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করতে চেয়েছেন।
কবি তরুণ ভারতীয় বিপ্লবীদের নির্দেশ দিয়েছেন ভীম কারাগারের লৌহকপাটটিকে ভেঙে ফেলে লোপাট করবার জন্য। পাষাণবেদি আজ বিপ্লবীদের রক্তে জমাট হয়ে আছে। তরুণ সম্প্রদায়কে ঈশান মহাদেব শিবের সঙ্গে তুলনা করে কবি তাদের শিবের মতোই প্রলয়ংকর হয়ে উঠতে আহ্বান জানিয়েছেন। মহাদেব যেমন নতুন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রলয় নৃত্যে মেতে ওঠেন, পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত নতুন ভারত গঠনের লক্ষ্যে নজরুল তেমনি ধ্বংসের সাধনা করতে বলেছেন নবীন প্রজন্মকে। কবি তাদের উপলব্ধি করাতে চেয়েছেন যে, মানুষের কোনো ভেদাভেদ নেই। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ‘সাজা’ দেওয়ার অধিকার কোনো ‘রাজা’ বা ‘মালিক’ -এর নেই। ভগবানকে ফাঁসি দেওয়া যেমন হাস্যকর, অর্থহীন তেমনই বিপ্লবীদের ফাঁসি দিয়ে স্বাধীনতার লড়াইকে থামানোর চেষ্টা বৃথা এবং অর্থহীন ব্যাপার।
কবি ‘পাগলা ভোলা’ অর্থাৎ তরুণ ভারতীয়দের আহ্বান করে বলেছেন, ‘পাগলা ভোলা’ যেন প্রলয় দোলার সাহায্যে হ্যাঁচকা টানে গারদগুলোকে ভেঙে ধূলিসাৎ করে দেন। এই ‘পাগলা ভোলা’ নবজীবনের অগ্রদূত। তাই কবির নির্দেশ পাগলা ভোলা যেন জীবনমৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে ভাবনাহীন চিত্ত হয়ে হৈদরী হাঁক দিয়ে দুন্দুভি ঢাক কাঁধে নিয়ে মৃত্যুকে জীবনপানে ডেকে আনেন।
নজরুল লক্ষ করেছেন মহাদেব তাঁর প্রলয় নৃত্য শুরু করেছেন, আর নষ্ট করবার সময় নেই। বন্দি বিপ্লবীদের প্রতি কবির তাই নির্দেশ তারা যেন ওই ভীম কারার ভিত নাড়িয়ে দেয়, লাথি মেরে কারাগারের তালা ভেঙে দেয়, বন্দিশালায় আগুন জ্বালিয়ে সবকিছুকে লোপাট করে দেয়।
‘ভাঙার গান’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
ভূমিকা – সাহিত্যে নামকরণ অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। নামহীন সৃষ্টি অনেকটা মস্তিষ্কহীন মানবদেহের মতো। যদিও সাহিত্যে নামকরণের নির্দিষ্ট কোনো রীতি প্রচলিত নেই, তবুও মোটামুটিভাবে নামকরণ চরিত্রকেন্দ্রিক, বিষয়কেন্দ্রিক ও ব্যঞ্জনাধর্মী – এই তিন ধরনের হয়ে থাকে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ মূলত একটি গীতিকা। গীতিকার নামকরণ সাধারণত হয় না। তবুও সংকলকগণ মূল গ্রন্থের নামানুসারে নাম দিয়েছেন ‘ভাঙার গান’। এখন বিষয়বস্তু আলোচনা করে দেখব সংকলকগণ কর্তৃক প্রদত্ত নামকরণ কতখানি সার্থক।
বিষয়বস্তু – পরাধীন ভারতভূমিতে দাঁড়িয়ে কবি নজরুল ইংরেজদের কারাগারে বন্দি অসংখ্য বীর বিপ্লবীদের উজ্জীবিত করতে চেয়ে কারাগারের কঠিন লৌহকপাটকে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। পাষাণবেদি তখনও বীর বিপ্লবীদের রক্তে রঞ্জিত; তাই তরুণ ঈশানের কাছে কবির প্রত্যাশা, তরুণ ঈশান যেন তার প্রলয় বিষাণ বাজিয়ে ধ্বংস নিশান উড়িয়ে ‘প্রাচী’র প্রাচীরকে ভেদ করে। মহাদেব যেমন নতুন সৃষ্টির উদ্দেশে প্রলয় নৃত্যে মেতে ওঠেন, পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত ভারত গঠনের লক্ষ্যে নজরুল তেমনি ধ্বংসের সাধনা করতে বলেছেন তরুণ প্রজন্মকে। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ‘সাজা’ দেওয়ার অধিকার কোনো ‘রাজা’ বা ‘মালিকে’র নেই। ভগবানকে ফাঁসি দেওয়া যেমন হাস্যকর, সর্বনাশা ভাবনা, তেমনিই বিপ্লবীদের ফাঁসি দিয়ে স্বাধীনতার লড়াইকে থামানোর চেষ্টা অর্থহীন। এই হীন তথ্যের প্রকাশে কবির তাই হাসি পায়। বিপ্লবীদের কবি বলেছেন প্রলয় দোলাতে গারদগুলোকে হ্যাঁচকা টান মেরে বিনষ্ট করে, মৃত্যুকে জীবনপানে ডেকে আনতে হবে। অপচয় করার আর সময় নেই। তাই কবি বিপ্লবীদের সত্বর গরাদ ভেঙে বন্দিশালায় আগুন জ্বালাবার নির্দেশ দিয়েছেন।
উপসংহার – সমগ্র গীতিকা জুড়ে দেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ তরুণ বিপ্লবীদের যেমন কবি জেলখানার লৌহকপাট ভেঙে ফেলতে বলেছেন, ব্যাপক অর্থে আবার ভারতবর্ষের বুকে স্থাপিত ইংরেজ সরকারের ঔপনিবেশিক কারাগারটি ভেঙে ফেলারও আহ্বান জানিয়েছেন। ভাঙার কথা গীতিকাটিতে প্রাধান্য পেয়েছে বলে সংকলকবর্গ প্রদত্ত ‘ভাঙার গান’ নামকরণ সার্থক ও সর্বাঙ্গসুন্দর হয়েছে।
‘ভাঙার গান’ কবিতাটি কোন্ পটভূমিতে রচিত? কবিতাটি রচনার উদ্দেশ্য কী?
পটভূমি – কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ কবিতাটি রচিত হয় 1921 খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে। তখন পরাধীন ভারতবর্ষে চলছে অসহযোগ আন্দোলন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তখন জেলে। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘বাংলার কথা’ প্রকাশের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন স্ত্রী বাসন্তী দেবী। সামাজিক বিপ্লব, রাজনৈতিক অস্থিরতা বরাবর নজরুলের সচেতন কবি মনে তরঙ্গ তুলেছে। অসহযোগ আন্দোলন নজরুলের মনে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল তা তিনি প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছেন ‘বাংলার কথা’ পত্রিকায় দেশবন্ধু জায়া তাঁকে লেখার অনুরোধ করলে। বিদ্রোহী কবি আবারও বিপ্লবের মন্ত্রে পরাধীন ভারতবাসীকে উজ্জীবিত করতে লিখে ফেলেছেন ‘ভাঙার গান’। ভারতবর্ষের ‘তরুণ ঈশান’দের প্রলয় বিষাণ বাজিয়ে ধ্বংস নিশান উড়িয়ে বন্দিশালার কঠিন কপাট ভেঙে দিতে আহ্বান জানিয়েছেন, সমূলে উপড়ে ফেলতে বলেছেন ইংরেজের ঔপনিবেশিক কারাগারের ভয়ংকর ভিত।
উদ্দেশ্য – বিদ্রোহী কবি নজরুল দেশের পরাধীনতাকে মেনে নিতে পারেননি। তাই দেশকে স্বাধীনতা দিতে বিপ্লবীদের উজ্জীবন মন্ত্রে দীক্ষিত করতেই তিনি কবিতাটি রচনা করেন। কবিতাটি বিপ্লবীদের চেতনাকে কতটা প্রভাবিত করেছিল, তার পরিচয় পাই দেশপ্রেমিক সুভাষচন্দ্র বসুর কথায় – “ভাই, জেলে যখন ওয়ার্ডার লোহার দরজা বন্ধ করে, তখন মন কী যে আকুলি বিকুলি করে কী বলব! তখন বারবার মনে পড়ে কাজীর ওই গান –
“কারার ওই লৌহ-কপাট
ভেঙে ফেল, কররে লোপাট
রক্ত-জমাট শিকল-পুজোর পাষাণ-বেদী!”
‘ভাঙার গান’ কবিতায় কবির অকৃত্রিম স্বদেশপ্রীতির প্রকাশ কীভাবে ঘটেছে, তা আলোচনা করো।
অথবা, ‘ডাক ওরে ডাক/মৃত্যুকে ডাক জীবন পানে।’ – উদ্ধৃতিতে কবির যে শঙ্কাহীন দুর্দমনীয় স্বদেশপ্রেমের আর্তি প্রকাশ পেয়েছে, তা কবিতা অবলম্বনে লেখো।
আলোচ্য উদ্ধৃতিটি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ কবিতার অংশ।
কবির দেশপ্রেম – কবি নজরুল একবার বলেছিলেন – “বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরই অভিযানে সেনাদলের তুর্যবাদকের একজন আমি।” সৈনিক কবি নজরুল তাঁর কাব্যবীণাকে অগ্নিবীণায় এবং প্রেমের বাঁশিকে বিষের বাঁশিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। স্বজাতি ও স্বদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল প্রবল। এমনিতেই দেশপ্রেম তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি। দেশমাতাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। স্বাধীনতা তাঁর কাছে ছিল জন্মগত অধিকার। ‘ভাঙার গান’ কবিতাটি তাঁর স্বদেশপ্রেমের সাবলীল ভাষ্য।
কবির আহ্বানবাণী – স্বদেশপ্রেমিক নজরুল স্বদেশের শৃঙ্খলমোচনে তাই ইংরেজদের কারাগারে বন্দি স্বদেশবাসীকে বিপ্লবের মন্ত্রে উজ্জীবিত করতে বলেছেন –
‘কারার ওই লৌহ-কপাট
ভেঙে ফেল, কররে লোপাট’
স্বদেশপ্রেমিক নজরুলের এ এক ভিন্ন মূর্তি, বিপ্লবী মনোভাব। আসলে কবি জানেন যে, অত্যাচারী ইংরেজদের শান্তির ললিত বাণী শোনানো পরিহাস ছাড়া আর কিছু নয়। তাই নিজ অধিকার ছিনিয়ে নিতে কবি যেমন ‘তরুণ ঈশান’রূপী বিপ্লবীকে আহ্বান করেছেন, তেমনই আহ্বান করেছেন ‘পাগলা ভোলা’রূপী বিপ্লবীদের। এরাই পারে ধ্বংস নিশান ওড়াতে, এরাই পারে প্রলয় দোলাতে কারাগারের গারদগুলোকে ভেঙে ফেলতে। বিপ্লবীদের কাছে জীবনমৃত্যু পায়ের ভৃত্য ছাড়া আর কিছু নয়। তাই কবি বলেছেন –
‘ডাক ওরে ডাক
মৃত্যুকে ডাক জীবন পানে।’
তাই চুপচাপ সময় না কাটিয়ে তিনি বিপ্লবীদের ইংরেজদের ভীম কারাগারের ভিত্তি নাড়িয়ে বন্দিশালায় আগুন জ্বালাবার কথা বলেছেন। অর্থাৎ ভারতমাতার পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের কথা বলেছেন তিনি। সমগ্র কবিতাটি যেন স্বদেশপ্রাণ নজরুলের অকৃত্রিম দেশবন্দনার বাণীরূপের প্রকাশ স্বরূপ।
‘ভাঙার গান’ কবিতায় সমকালীন পরাধীন ভারতবর্ষের পটভূমিকায় কবি নজরুলের যে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে, তা নিজের ভাষায় লেখো।
অথবা, ‘ভাঙার গান’ কবিতায় কবির বিদ্রোহী মনোভাবের পরিচয় দাও।
ভূমিকা – কবি ও গীতিকার কাজী নজরুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী কবি’ রূপে সমধিক পরিচিত। তাঁর বিদ্রোহ কোনো নির্দিষ্ট দল বা জাতির বিরুদ্ধে নয়। তিনি যেখানে দেখেছেন ধর্মীয় ভণ্ডামি, কুসংস্কার, জাতপাতের ভেদাভেদ, অন্ধত্ব এবং অবিশ্বাস সেখানেই তিনি খড়্গহস্ত হয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন ধূমকেতুর মতো বিদ্রোহের নিশান উড়িয়ে ‘বিষের বাঁশি’ হাতে নিয়ে ‘ভাঙার গান’ গেয়ে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তিনি বলেছেন –
‘মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না।’
কবির বিদ্রোহী মানসিকতা – ‘ভাঙার গান’ কবিতাতেও কবির বিদ্রোহী মানসিকতা পরিলক্ষিত। তিনি সুন্দরের পূজারি বলে সুন্দরের অপমান সহ্য করেন না। ভারতবর্ষের পরাধীনতাকেও তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই যেসকল বিপ্লবী অত্যাচারী ইংরেজদের কারাগারে বন্দি, তাদের উদ্দেশে তিনি যা বলেছেন, তাতে তাঁর বিদ্রোহী মানসিকতা পরিলক্ষিত –
“কারার ওই লৌহ-কপাট
ভেঙে ফেল, কররে লোপাট
রক্ত-জমাট
শিকল-পুজোর পাষাণ-বেদী!”
কবির প্রতিবাদী ভাবনা – তিনি বিপ্লবীদের ‘তরুণ ঈশান’ সম্বোধন করে প্রলয় বিষাণ বাজিয়ে ধ্বংস নিশান উড়িয়ে পরাধীন প্রাচ্যের প্রাচীরকে বিনষ্ট করবার আহ্বান জানিয়েছেন। বিপ্লবীদের গাজনের বাজনা বাজানোর কথা বলেছেন, ‘পাগলা ভোলা’ সম্বোধন করে গারদগুলোকে হ্যাঁচকা টানে ধ্বংস করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। কবি বলতে চেয়েছেন বিপ্লবীরা যেন ‘হৈদরী হাঁক’ দিয়ে ‘দুন্দুভি ঢাক’ কাঁধে নিয়ে মৃত্যুকে জীবনপানে ডাক দেয়। সময়ের অপচয় না করে বিপ্লবীরা যেন ভীম কারাগারের ভিত্তিভূমিকে নাড়িয়ে দেয়, ‘যত সব বন্দি-শালা’-য় আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সমগ্র কবিতায় কবির প্রতিবাদী ভাবনার বা বিদ্রোহী মানসিকতার পরিচয় পরিলক্ষিত।
‘কারার ওই লৌহ-কপাট’ কবি কীভাবে ভেঙে ফেলতে চাইছেন? এই ভাঙার মধ্যে কাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সুর ধ্বনিত হয়েছে? কবির এরূপ আগ্রাসী মনোভাবের কারণ কী?
লৌহকপাট ধ্বংস – বিদ্রোহী কবি নজরুল ভারতবর্ষের পরাধীনতার জ্বালা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন। তাই তিনি অত্যাচারী ইংরেজদের কারাগারে বন্দি ভারতীয় বিপ্লবীদের সঙ্গে একীভূত হয়ে লৌহকঠিন কারাগারের কপাট ভেঙে ফেলতে চান। ‘পাগলা ভোলা’-র মতো প্রবল শক্তিধর হয়ে প্রলয় দোলায় গারদগুলোকে জোরসে ধরে হ্যাঁচকা টানে ভূলুণ্ঠিত করে সবকিছু লোপাট করতে চান। কবিতার শেষাংশে কবি বলেছেন –
‘লাথি মার, ভাঙরে তালা!’
কবি অবজ্ঞা ভরে পদাঘাত করে ইংরেজদের ভীম কারাগারের তালা ভাঙতে চান। তারপর বন্দিশালায় আগুন জ্বালিয়ে সবকিছু ধ্বংস করে দিতে চান।
এই ভাঙার মধ্যে অত্যাচারী ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সুর ধ্বনিত হয়েছে।
কবির আগ্রাসী মনোভাবের কারণ – কবি নজরুল স্বদেশপ্রেমিক, সুন্দরের পূজারি। তাই স্বদেশের অপমান তিনি যেমন সহ্য করেন না, তেমনই সুন্দরের অপমানেও তিনি কষ্ট পান। তিনি কবি, তিনি সচেতন, সংবেদনশীল এবং প্রতিবাদী। তিনিই বলতে পারেন –
“রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা
তাই লিখে যাই এ রক্ত লেখা।”
পরাধীনতার জ্বালাতে কবির সহ্যশক্তি হারিয়ে গেছে বলেই তিনি প্রতিবাদী হয়েছেন। তিনি দেখেছেন ভারতবর্ষের মানুষেরা ইংরেজদের অত্যাচারে জর্জরিত। এমন পরিস্থিতিতে তিনি নিজেকে ঠিক রাখতে না পেরে ‘অগ্নিবীণা’ হাতে নিয়ে ‘বিষের বাঁশি’তে ‘ভাঙার গান’ গেয়েছেন। তাঁর বিদ্রোহ প্রকাশ পেয়েছে ‘ভাঙার গান’ গীতিকায় –
“কারার ওই লৌহ-কপাট
ভেঙে ফেল, কররে লোপাট
রক্ত-জমাট
শিকল-পুজোর পাষাণ-বেদী।”
‘ওরে ও তরুণ ঈশান!’ – কবি এই আহ্বান জানিয়ে তাদের কী কী কাজ করতে বলেছেন, তা সংক্ষেপে লেখো।
ভূমিকা – সুন্দরের পূজারি নজরুল ইসলাম তাঁর ‘ভাঙার গান’ গীতিকায় ভারতবর্ষের পরাধীনতার প্রেক্ষাপটে বিপ্লবীদের উদ্দেশে উজ্জীবনের গান গেয়েছেন। নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে ‘বিদ্রোহী কবি’ নামে পরিচিত। তিনি ভারতবর্ষের পরাধীনতার জ্বালা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন বলে ‘অগ্নিবীণা’ হাতে নিয়ে ‘বিষের বাঁশি’-তে ‘ভাঙার গান’ গেয়েছেন। বিপ্লবীদের উদ্দেশে কবির বিদ্রোহাত্মক নির্দেশ –
“কারার ওই লৌহ-কপাট
ভেঙে ফেল, কররে লোপাট”
কবি যা করতে বলেছেন – দেবাদিদেব মহাদেবের প্রলয়ংকর ক্ষমতা তিনি দেখেছেন ভারতবর্ষের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। তাই সমগ্র গীতিকা জুড়ে দেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ তরুণ বিপ্লবীদের যেমন তিনি বন্দিশালার লৌহকপাট ভেঙে ফেলতে বলেছেন, ব্যাপক অর্থে আবার ভারতের বুকে স্থাপিত ইংরেজ সরকারের ঔপনিবেশিক কারাগারটি সমূলে উপড়ে ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতমাতার আরাধনায় যে বিপ্লবীরা শিকল পরেছে, তাদের আত্মদানের রক্তে শিকল পূজার পাষাণ বেদী রক্তাক্ত হয়ে গেছে। কবি সেইসব আত্মত্যাগী তরুণদের প্রলয়ংকর মূর্তি ধরে ভারতের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ফেলতে বলেছেন। বলেছেন –
“বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ
ধ্বংস-নিশান,
উড়ুক প্রাচী’র প্রাচীর ভেদি।”-
এই প্রাচ্যের পরাধীনতার প্রাচীর ভেদ করে ধ্বংসের ধ্বজা উড়িয়ে দেবে ‘তরুণ ঈশান’রা। তাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে সাজা দেওয়ার অধিকার কোনো ‘রাজা’ বা ‘মালিকে’র নেই। তাই কবি সেই সব নির্ভয় তরুণদের বলেন ‘পাগলা ভোলা’র মতো ভয়ংকর তেজে প্রলয় দোলায় জোর হ্যাঁচকা টানে গারদগুলোকে দুলিয়ে দিতে। ‘হৈদরী হাঁক’ ছেড়ে, ‘দুন্দুভি ঢাক’ কাঁধে নিয়ে মৃত্যুকে উপেক্ষা করে যুদ্ধোন্মাদনায় মেতে উঠতে বলেছেন কবি। ‘ভীম কারার’ ভিত্তি নাড়িয়ে দিতে বলেছেন তারুণ্যের দারুণ তেজে। অত্যাচারী ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদকে নির্মূল করতে তরুণদের প্রতি তাঁর নির্দেশ; –
“লাথি মার, ভাঙরে তালা!
যত সব বন্দি-শালায়-
আগুন জ্বালা,
আগুন জ্বালা, ফেল উপাড়ি!”
‘সর্বনাশী/শিখায় এ হীন তথ্য কে রে?’ – কোন তথ্যকে ‘সর্বনাশী’ ও ‘হীন’ বলা হয়েছে? কবি কেন এরূপ মন্তব্য করেছেন?
‘সর্বনাশী ও ‘হীন’ যাকে বলা হয়েছে – সংগ্রামী চেতনার অতন্দ্র প্রহরী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘ভাঙার গান’ কবিতায় ‘ভগবান পরবে ফাঁসি’ – এই তথ্যটিকে ‘সর্বনাশী’ ও ‘হীন’ বলেছেন।
এরূপ মন্তব্যের কারণ – আলোচ্য কবিতায় ভারতবর্ষের পরাধীনতার প্রেক্ষাপটে বিপ্লবীদের উদ্দেশে উজ্জীবনের গান গেয়েছেন নজরুল। এ কবিতায় কবি ভারতবর্ষের বীর বিপ্লবী তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেবাদিদেব মহাদেবের প্রলয়ংকর তেজ প্রত্যক্ষ করেছেন। কবি বিশ্বাস করেন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মনে মনে লালন করে পরাধীন ভারতবাসী কোনো অপরাধ করেনি। ভারতবাসীর স্বাধীনতার স্বপ্নকে ‘সাজা’ দেওয়ার ক্ষমতা কোনো ‘মালিক’ বা ‘রাজা’র নেই। ভগবানকে ফাঁসি দেওয়ার ভাবনা যেমন – অবান্তর, হাস্যকর, সর্বনাশা, তেমনি ভারতের শত-সহস্র বীর-বিপ্লবীকে ধ্বংস করার চেষ্টাও বৃথা হবে ব্রিটিশ সরকারের। এই ভাবনাতেই কবির হাসি পেয়েছে এবং তার ফলে ‘ভগবান পরবে ফাঁসি?’ – তথ্যটিকে তিনি ‘সর্বনাশী’ এবং ‘হীন’ বলেছেন।
‘ওরে ও পাগলা ভােলা’ – ‘পাগলা ভােলা’ কে? ‘পাগলা ভোলা’-কে আর কী ভিন্ন নামে কবি তাঁর অন্য কবিতায় ব্যবহার করেছেন? ‘পাগলা ভোলা’ এসে কী করবে?
‘পাগলা ভোলা’ – বিদ্রোহী কবি নজরুল তাঁর ‘ভাঙার গান’ গীতিকায় যে ‘পাগলা ভোলা’-কে আহ্বান করেছেন সেই ‘পাগলা ভোলা’ হলেন দেবাদিদেব মহাদেব, যার দুই রূপ – মঙ্গলময়রূপ ও ধ্বংসাত্মকরূপ।
‘পাগলা ভোলা’-র অপর নাম – ‘পাগলা ভোলা’-কে কবি নজরুল তাঁর ‘ফণিমনসা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘পথের দিশা’ কবিতায় ‘ভাঙনদেব’ নামে অভিহিত করেছেন।
‘পাগলা ভোলা’-কে আহ্বানের কারণ – ‘পথের দিশা’ কবিতায় কবি যেমন ‘ভাঙনদেব’ -এর মতো কোনো ধ্বংসাত্মক শক্তিকে আহ্বান করেছিলেন, একইরকমভাবে ‘ভাঙার গান’ কবিতাতেও দেবাদিদেব মহাদেবকে ‘পাগলা ভোলা’ সম্বোধনের অন্তরালে কবি অত্যাচারী ইংরেজদের কারাগারে বন্দি ভারতীয় বিপ্লবীদের মহাদেবের মতো প্রবল শক্তিধর হয়ে আবির্ভূত হতে বলেছেন। কবি সুন্দরের পূজারি। তিনি জানেন ধ্বংস না হলে কখনও নবসৃষ্টি হবে না। তাই কবি ভারতবর্ষের পরাধীনতার ধ্বংস চান। তাই গীতিকার প্রথমাংশে কবি ‘তরুণ ঈশান’-কে তার প্রলয়-বিষাণ বাজিয়ে এবং ধ্বংস নিশান উড়িয়ে প্রাচ্যের পরাধীনতার প্রাচীরকে ভেদ করতে বলেছেন –
“ওরে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ
ধ্বংস-নিশান,
উড়ুক প্রাচী’র প্রাচীর ভেদি।”
পরবর্তী অংশে তিনি বিদ্রোহী মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়ে ‘পাগলা ভোলা’-র উদ্দেশে জানিয়েছেন, ‘পাগলা ভোলা’ যেন প্রলয় দোলা দিয়ে গারদগুলোকে জোরসে ধরে হ্যাঁচকা টানে বিনষ্ট করে। এইভাবে কবি ভারতবর্ষের অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে সুন্দর সমাজ গড়ার লক্ষ্যে ‘পাগলা ভোলা’-কে আহ্বান জানিয়েছেন।
‘ওরে ও পাগলা ভোলা’ – কাদের কবি ‘পাগলা ভোলা’ বলেছেন এবং কেন? তাদের উদ্দেশে কবির বার্তা কী?
যাদের ‘পাগলা ভোলা’ বলা হয়েছে – সুন্দরের পূজারি কবি নজরুল ইসলাম তাঁর ‘ভাঙার গান’ গীতিকায় ভারতবর্ষের পরাধীনতার প্রেক্ষাপটে উজ্জীবনের গান গেয়ে ইংরেজদের কারাগারে বন্দি বিপ্লবীদের ‘পাগলা ভোলা’ আখ্যায় ভূষিত করেছেন।
কারণ – ‘পাগলা ভোলা’ বলতে দেবাদিদেব ভোলানাথকে বোঝায়। যিনি একদিকে নব সৃষ্টির, অপরদিকে ধ্বংসের প্রতিমূর্তি। কবি অত্যাচারী ইংরেজদের কারাগারে বন্দি শতসহস্র বিপ্লবীদের ‘পাগলা ভোলা’ বলেছেন। আসলে ভোলানাথ পাগল হলে যেমন প্রলয় নৃত্য করে পৃথিবীকে ধ্বংস করতে পারেন, জীর্ণ পুরাতনকে ধূলিসাৎ করতে পারেন; তেমনই তরুণ প্রাণ বিপ্লবীরাও মহাশক্তিধর। তারাও পারে পৃথিবীতে প্রলয় ঘটাতে। আসলে কবি বিপ্লবীদের উজ্জীবনের মন্ত্রে দীক্ষিত করার জন্য এমন সম্বোধন করেছেন।
কবির বিপ্লবী মানসিকতা – কবি নজরুল চিন্তা ও চেতনায় ছিলেন বিপ্লবী মানসিকতাযুক্ত। তিনি মেনে নিতে পারেননি ভারতবর্ষের পরাধীনতাকে। পরাধীনতার শৃঙ্খলমোচনে তিনি সদাসচেষ্ট। মসিকেই অসি করে তিনি আঘাত করেছেন। ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় তিনি নিজেই বলেছেন –
“রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা
তাই লিখে যাই এ রক্ত লেখা।”
কবির বার্তা – পরাধীনতার জ্বালা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তিনি কারাগারের লৌহকপাট ভেঙে ফেলতে চেয়েছেন নিমেষে। বন্দি বিপ্লবীদের প্রেরণাদাতা হয়ে উঠেছেন তিনি। বন্দি বিপ্লবীদের ‘পাগলা ভোলা’ সম্বোধন করে তিনি তাদের প্রলয় দোলা দিয়ে কারাগারের গারদগুলোকে জোরসে ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ভেঙে ফেলতে বলেছেন। তারা যেন ‘হৈদরী হাঁক’ দিয়ে কাঁধে ‘দুন্দুভি ঢাক’ নিয়ে মৃত্যুকে জীবনপানে ডেকে আনতে পারে।
‘কাটাবি কাল বসে কি?’ – কাদের উদ্দেশে কবি এ কথা বলেছেন? এ কথা বলার কারণ কী?
যাদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে – সংগ্রামী চেতনার অতন্দ্র প্রহরী কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘ভাঙার গান’ কবিতায় অত্যাচারী ইংরেজদের কারাগারে বন্দি বিপ্লবীদের উজ্জীবনের মন্ত্রে দীক্ষিত করতে তাদের উদ্দেশে এ কথা বলেছেন।
কারণ – কবি নজরুল বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হন এক হাতে বাঁশের বাঁশরি অন্য হাতে রণতুর্য নিয়ে। ভারতবর্ষের পরাধীনতা কবির আজন্ম যন্ত্রণা। শৈশবে তিনি সহ্য করেছিলেন দুঃসহ দারিদ্র্য যন্ত্রণা, আর যৌবনে জন্মভূমি ভারতমায়ের পরাধীনতার সুতীব্র জ্বালা। তিনি নিজেই বলেছেন –
‘আমার খেলার বাঁশি হয়ে ওঠে যুদ্ধের বিষাণ, রণশিঙ্গা।
সুর আমার সুন্দরের জন্য আর তরবারি সুন্দরের অবমাননা
যে করে সেই অসুরের জন্য।’
বিদ্রোহী কবি প্রচণ্ড যন্ত্রণা সহ্য করেছিলেন বলেই গতি তাঁর চিরচঞ্চল। তাঁরও যেন একটাই বাণী ‘চলার নাম জীবন, থামার নাম মৃত্যু।’ চিরচঞ্চল কবি তাই বন্দি বিপ্লবীদের বিনা প্রতিবাদে কাল না কটিয়ে বিদ্রোহের মন্ত্রে দীক্ষিত করতে চেয়েছেন। যেখানে ‘কাল-বোশেখি’র প্রলয় নৃত্য শুরু হয়েছে, সেখানে আর বসে থেকে কাজ নেই। বরং কবি চান –
“দেরে দেখি
ভীম কারার ওই ভিত্তি নাড়ি!”
কবি ভীম কারার ভিত্তিপ্রস্তরকে চূর্ণবিচূর্ণ করতে চান, লাথি মেরে তালা ভেঙে বন্দিশালায় আগুন জ্বালিয়ে দিতে চান।
‘ভীম কারা’ ও ‘বন্দি-শালা’ কীভাবে ধ্বংস করার জন্য কবি আহ্বান জনিয়েছেন?
প্রেক্ষাপট – ‘বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই নবী’ – এই বলিষ্ঠ আত্মঘোষণার মাধ্যমে বাংলা কবিতার জগতে নজরুলের আবির্ভাব। সমকালীন যুগপ্রভাব তাঁর কবিতাকে যে ভিন্ন পথে চালিত করেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি দেখেছেন ভারত তখনও ব্রিটিশশাসনের নাগপাশে বন্দি। দেশ সম্পর্কে দেশবাসির ধারণা তখনও পুষ্ট নয়। কারাগারে তখনও শত শত বন্দিরা চোখের জল ফেলছে। নজরুল এমন পরিস্থিতিতে বিপ্লবীদের প্রেরণা দিতে লিখলেন ‘ভাঙার গান’।
কবির আহ্বান – বিদ্রোহী কবি উপলব্ধি করেছিলেন কারাগারের কঠিন কঠোর কপাট যদি ভেদ করা যায়, তাহলে বিপ্লবীসহ ভারতমাতার মুক্তি ঘটবে। তিনি ইংরেজদের ‘ভীম কারা’ ও ‘বন্দি-শালা’-কে ধ্বংস করার জন্য যেমন ‘তরুণ ঈশান’-কে আহ্বান জানিয়েছেন, তেমনই আহ্বান জানিয়েছেন ‘পাগলা ভোলা’-কে। কবি বলেছেন –
“ওরে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ
ধ্বংস-নিশান,
উড়ুক প্রাচী’র প্রাচীর ভেদি।”
কবির প্রত্যাশা – ‘পাগলা ভোলা’র কাছে কবি প্রত্যাশা করেন, পাগলা ভোলা প্রলয় দোলা দিয়ে গারদগুলোকে হ্যাঁচকা টানে বিনষ্ট করবে। বিপ্লবীদের উদ্দেশে কবি বলেছেন বৃথা সময় কাটিয়ে কাজ নেই বরং প্রবল শক্তিধর হয়ে তারা ভীম কারাগারের ভিত্তিকে আলগা করুক, পদাঘাতে তালা ভেঙে বন্দিশালায় আগুন জ্বালিয়ে দিক –
“যত সব বন্দি-শালায়-
আগুন জ্বালা,
আগুন জ্বালা, ফেল উপাড়ি!”
‘আগুন জ্বালা, ফেল উপাড়ি’ – কবির এই ধ্বংসাত্মক আহ্বান কাদের উদ্দেশ্যে ও কেন?
অথবা, ‘আগুন জ্বালা,/আগুন জ্বালা, ফেল উপাড়ি!’ – কবির এরূপ আপাত ধ্বংসাত্মক উচ্চারণের মধ্য দিয়ে সমাজ পরিস্থিতির কোন্ পরিচয় পাওয়া যায়, তা কবিতা অবলম্বনে লেখো।
সমাজ পরিস্থিতির পরিচয় – রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক কাব্যে কবি নজরুল রবিচ্ছটায় না হারিয়ে গিয়ে প্রথম রবীন্দ্রনাথের মায়াজাল ছিন্ন করে বিদ্রোহের নিশান উড়িয়ে ‘অগ্নিবীণা’ হাতে নিয়ে ‘বিষের বাঁশি’-তে ‘ভাঙার গান’ গেয়েছেন। তিনি বিদ্রোহী কবি। বিদ্রোহ তাঁর চিন্তাচেতনায়, তাঁর রক্তে। কিন্তু এই বিদ্রোহ কোনো নির্দিষ্ট দল বা জাতির বিরুদ্ধে নয়, সমস্ত অরাজকতার বিরুদ্ধে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন, ওয়াহাবি আন্দোলন, খিলাফৎ আন্দোলন, সোভিয়েত বিপ্লব, অসহযোগ আন্দোলন –
এরূপ একাধিক আন্দোলন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে থাকেননি বরং সকলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত থেকে স্বাধীন মতবাদকে পৌঁছে দিয়েছেন জনমানসে। সমালোচক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সে যুগের সমাজ পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেছেন – ‘বাংলার অগ্নিপুরুষ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন গড়ে তুলেছেন তাঁর চরমপন্থী ‘স্বরাজ্যদল’, আর দেশবন্ধুর পরম অনুগত পার্শ্বচর যুদ্ধ ফেরত নজরুল তাঁর সঙ্গে সঙ্গে সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। যে যুগে হিসাব ছিল না, বিচারও ছিল না। অসন্তোষ আর বিক্ষোভের ধারা-প্রতিধারা চারদিক থেকে এসে আছড়ে পড়েছিল।’
ভাঙার কাজে তিনিই প্রথম হাত লাগিয়ে আর সকলকে ডাক দিয়েছেন। সমাজ পরিস্থিতির প্রতিকূলতা থেকে বাঁচতে গিয়ে কারাগারের লৌহকপাটকে ভেঙে ভীম কারাগারের ভিত্তিকে আলগা করতে চান তিনি, আর অবজ্ঞা করে কারাগারের তালাকে পদাঘাতে ভেঙে বন্দিশালায় আগুন জ্বালাতে চান –
“লাথি মার, ভাঙরে তালা!
যত সব বন্দি-শালায়
আগুন জ্বালা…”
ওরে ও তরুণ ঈশান। — ঈশান শব্দটির অর্থে লেখো। কবি এখানে কাদের ঈশান বলেছেন? তাদের উদ্দেশ্যে কবি কোন্ আহ্বান জানিয়েছেন?
ঈশানের পরিচয় – কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ কবিতায় উল্লিখিত ‘ঈশান’ শব্দটির অর্থ শিব। কবি দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত তরুণ সম্প্রদায়কে এখানে ঈশান বলেছেন।
কবির আহ্বান – তরুণদের কবি আহ্বান জানিয়েছেন – সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতীক কারাগারের ‘লৌহকপাট’ ভেঙে ফেলতে, ‘প্রলয়-বিষাণ’ বাজিয়ে ধ্বংসের পতাকা উড়াতে, এবং ‘দেশমাতার শৃঙ্খলমোচন’ করতে।
দেশমাতার শৃঙ্খলমোচন – কারাগারের ভিতরে দেশমাতার পূজার পাষাণ বেদী শহিদের রক্তে রঞ্জিত। কবি তাকেও লোপাট করতে বলেছেন। প্রলয়-বিষাণ বাজিয়ে ধ্বংসের পতাকা ওড়ানোর জন্য কবি দেশের তরুণ সম্প্রদায়কে আহ্বান করেছেন।
মুক্ত, স্বাধীন, সত্যের প্রতিষ্ঠা – কবি চেয়েছেন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক ‘মুক্ত স্বাধীন সত্য’। স্বাধীনতার এই ধারণাকে বাস্তবায়নে তিনি দেশপ্রেমিক তরুণদের ওপর ভরসা রেখেছেন।
অশুভের ধ্বংসসাধন – প্রলয়ঙ্কর শিব যেমন অশুভকে ধ্বংস করে সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করেন, তেমনি তরুণ বিপ্লবীরা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে আঘাত করে স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে—এই লক্ষ্যে কবি আহ্বান জানিয়েছেন।
মার হাঁক হৈদরী হাঁক,/কাঁধে নে দুন্দুভি ঢাক — হৈদরী হাঁক কী? কাঁধে দুন্দুভি ঢাক নেওয়ার তাৎপর্য কী?
হৈদরী হাঁকের অর্থ – ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলীর বজ্রকণ্ঠস্বর। কবি চেয়েছেন তরুণরা এমন প্রাণঘাতী হাঁকে শত্রুর হৃদয় কাঁপিয়ে দিক ।
দুন্দুভি ঢাক নেওয়ার তাৎপর্য – ‘দুন্দুভি’ যুদ্ধের ঘোষণাবাদ্য। কবি বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা করতে বলেছেন। কাঁধে দুন্দুভি তুলে নেওয়া মানে যুদ্ধের দায়িত্ব গ্রহণ—কারাগারের প্রাচীর ভেঙে বন্দিদের মুক্ত করতে ।
ডাক ওরে ডাক/মৃত্যুকে ডাক জীবনপানে! — মৃত্যুকে জীবনপানে ডাক দিতে হবে কেন? কেমন করে সেই ডাক দেওয়া সম্ভব?
ডাক দেওয়ার কারণ – মৃত্যু এখানে পরাজয় নয়, বরং জীবনের জয়গান। ফাঁসিকাঠে শহিদের আত্মদান কোটি প্রাণে স্বাধীনতার অমর বাণী সঞ্চার করে। কবি মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে এই আত্মত্যাগের ডাক দিতে বলেছেন ।
ডাক দেওয়ার পদ্ধতি – দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে। বিপ্লবীরা ফাঁসির মঞ্চে ‘জীবনের জয়গান’ গেয়ে প্রমাণ করেছেন – মৃত্যুই পারে জাতিকে নতুন প্রাণ দিতে ।
যত সব বন্দিশালায় — /আগুন জ্বালা, — কবি বন্দিশালায় আগুন জ্বালতে বলেছেন কেন? এর মধ্যে কবির কোন্ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে?
আগুন জ্বালানোর কারণ – বন্দিশালা সাম্রাজ্যবাদী অত্যাচারের প্রতীক। বিপ্লবীদের রক্তে রঞ্জিত এই স্থানগুলিকে ধ্বংস করে শাসকের দমনের যন্ত্র নষ্ট করতে হবে ।
কবির মনোভাব – এখানে প্রকাশ পেয়েছে নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা। তিনি বিশ্বাস করতেন – স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে ‘প্রত্যাঘাতই একমাত্র পথ’। আগুন জ্বালানো মানে অত্যাচারের প্রতীকে ধ্বংস করে সত্য প্রতিষ্ঠা ।
ভাঙার গান কবিতাটির পটভূমি উল্লেখ করে মূলার্থ লেখো।
পটভূমি – ভাঙার গান কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলাম অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমিতে রচনা করেছিলেন ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে।
বিদ্রোহের প্রকাশ – এই গানটিতে পরাধীন দেশমাতার শৃঙ্খলমোচনের কথা বিদ্রোহের ভঙ্গিতে প্রকাশিত হয়েছে। অত্যাচারী ইংরেজ শাসক স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কারারুদ্ধ করেছে। কবি সেই কারাগারের লৌহকপাট ভেঙে লোপাট করার ডাক দিয়েছেন।
বিপ্লবীদের আত্মবলিদান – ইংরেজের অত্যাচারে দেশমাতার পূজার বেদি রক্তে লাল হয়ে গেছে। বিদেশি শাসকরা স্বদেশপ্রেমীদের গলায় ফাঁসির দড়ি পরাতে চায়। কিন্তু তারা জানে না, বিপ্লবী বীরদের মৃত্যু নেই; তাঁরা মৃত্যুঞ্জয়ী।
প্রলয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতার আহ্বান – রুদ্র মহেশ্বর বা খ্যাপা ভোলানাথের মতো প্রলয়নৃত্যে সমস্ত বাঁধ ভেঙে তরুণ দেশপ্রেমীরা স্বদেশকে মুক্ত করবেই। অর্থাৎ পরাধীনতার বন্ধন ছিন্ন হবে। তীব্র ঘৃণার পদাঘাতে ভেঙে পড়বে ভীমকারার তালা। গোটা দেশটাই আজ যেন এক কারাগার। সেই কারাগার থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন কবি। তিনি বিশ্বাস করেন, দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধ ভারতবাসী এভাবেই দেশমাতাকে সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত করবে।
ভাঙার গান শীর্ষক গানটির নামকরণের তাৎপর্য আলোচনা করো।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের “ভাঙার গান” শীর্ষক গানটি যে মূলগ্রন্থে সংকলিত, সেটির নামও ভাঙার গান (১৯২৪)। অর্থাৎ কবিতাটি গ্রন্থের নামকবিতা।
শিরোনামের মধ্যে অনেক সময় কোনো সাহিত্যসৃষ্টির সারবস্তুর যে আভাস পাওয়া যায়, তা এখানেও আছে। অসহযোগ আন্দোলনের সময় রচিত এ গানে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে কারারুদ্ধ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মুক্তি তথা স্বদেশের মুক্তির দৃঢ়সংকল্প প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম পঙ্ক্তিতেই কবি ভাঙার কথা স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছেন—
“কারার ওই লৌহ-কপাট / ভেঙে ফেল, কররে লোপাট!”
আবার শেষের আগের পঙ্ক্তিতে বলেছেন—
“লাথি মার, ভাঙরে তালা!”
সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে কারার লৌহকপাট ভেঙে লোপাট করে, তার প্রাচীর ভেদ করে ধ্বংসনিশান ওড়ানোর ডাক দিয়েছেন কবি। তিনি চেয়েছেন, ঈশানের মতো প্রলয় বিষাণ বাজিয়ে, ভোলানাথের মতো তাণ্ডবনৃত্যে শাসকের সমস্ত চক্রান্ত ধূলিসাৎ করে দিক নবযুগের নওজোয়ানেরা। বিদ্রোহের আগুনে এই বন্দিশালাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে; শুভ, সুন্দর, স্বাধীন দেশ গঠনের জন্যই কবির এই ভাঙার ডাক। সমগ্র গানটিতে ভাঙার কথা এত প্রবলভাবে আছে বলেই “ভাঙার গান” শিরোনামটি যথাযথ হয়ে উঠেছে।
ভাঙার গান পাঠ্যাংশে কবির যুগচেতনা ও স্বদেশভাবনা কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে আলোচনা করো।
কবির যুগচেতনা ও স্বদেশভাবনা – কাজী নজরুল ইসলাম যুগসচেতন কবি। তিনি স্বয়ং অন্যত্র বলেছেন—
“বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই নবি।”
অত্যাচারের বিরুদ্ধে আহ্বান – অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে রচিত “ভাঙার গান” কবিতায় কবি বিদ্রোহের বার্তা দিয়েছেন। এই গানে তৎকালীন অর্থাৎ বিশ শতকের দ্বিতীয়-তৃতীয় দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ফুটে উঠেছে। স্বদেশের মুক্তিকামী বিপ্লবীদের কারারুদ্ধ করা, ফাঁসিতে ঝোলানো, ভয় দেখানো, অত্যাচার করা ইত্যাদির বিরুদ্ধে কবি দেশের তরুণসমাজকে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানিয়েছেন। অত্যাচারী ইংরেজ শাসকের কারাগারের লৌহকপাট ভেঙে ফেলতে তরুণদের ডাক দিয়েছেন কবি।
স্বদেশমুক্তির আহ্বান – দেশমাতার বন্ধনমোচনের গান গেয়েছেন স্বদেশপ্রেমী নজরুল। অত্যাচারী বিদেশি শাসকদের হাতে বন্দি দেশজননী। তাঁকে মুক্ত করার জন্য সশস্ত্র বিপ্লবীদের মধ্যে উৎসাহ জাগাতে কবি বলেছেন—
“লাথি মার, ভাঙরে তালা! যত সব বন্দিশালায়— / আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা, ফেল উপাড়ি!”
দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি আছেন যেসব বীরসন্তান, তাদের মুক্ত করতে হবে। শুধু তাই নয়, পুরো দেশটাই যেন এক কারাগার। সেখান থেকে মুক্তি দিতে হবে সমগ্র দেশবাসীকে। তাই কবি তরুণ দেশপ্রেমীদের কারার ওই লৌহ-কপাট ভেঙে ফেলার ডাক দিয়েছেন। এভাবেই আলোচ্য কবিতায় কবির স্বদেশভাবনা প্রকাশ পেয়েছে।
ভাঙার গান পাঠ্যাংশে কবির বিদ্রোহী মনোভাবের কী পরিচয় পাও?
কবির মনোভাব – “ভাঙার গান” কবিতায় কবি নজরুলের সহজাত বিদ্রোহী মনোভাবের প্রকাশ দেখা যায়।
কারাগারের প্রাচীর ভেদ ও ধ্বংসনিশান – দেশের মুক্তিকামী জনগণের প্রতি বিদেশি শাসকদের ক্রমাগত নিপীড়ন কবিকে বিদ্রোহী করে তুলেছে। দেশমাতার শৃঙ্খলমোচনে ব্রতী বীরসন্তানরা অনেকেই কারাবন্দি। তাই তরুণ ঈশানকে প্রলয়-বিষাণ বাজিয়ে কারাগারের প্রাচীর ভেদ করে ধ্বংসনিশান ওড়াতে বলেছেন তিনি।
বন্দিশালার দরজা উন্মোচন – খ্যাপা ভোলানাথের মতো প্রলয়-দোলা দিয়ে সজোরে হ্যাঁচকা টানে গারদগুলো ভেঙে দেওয়ার ডাক দিয়েছেন কবি। দুন্দুভি ঢাক কাঁধে নিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য শাসকের হাড় হিম করা ভয়ংকর হাঁক ছাড়তে বলেছেন তিনি। কালবৈশাখী ঝড়ের শক্তিতে ভীমকারার ভিত্তি নাড়িয়ে দিতে পারবেন তরুণ দেশপ্রেমীরা; ঘৃণার লাথিতে ভেঙে ফেলবেন বন্দিশালার দরজা।
মানবতার জয় ঘোষণা – আত্মদান ও সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁরা মৃত্যুকে জীবনপানে ডাক দেবেন। বিপ্লবীদের বন্দি করে, তাদের ফাঁসি দিয়ে ইংরেজ সরকার মুক্ত স্বাধীন সত্যকে (দেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে) রোধ করতে পারবে না। মানবতার জয় হবেই। কবির বিদ্রোহী মনোভাব গভীর দেশপ্রেম ও মানবতাবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সমগ্র গানটিতে সেই বিদ্রোহের সুরই ধ্বনিত হয়েছে।
ভাঙার গান পাঠ্যাংশে কবি হিন্দু ও মুসলমান পুরাণ-প্রসঙ্গ কীভাবে এনেছেন? কবির অসাম্প্রদায়িক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দাও।
হিন্দু ও মুসলমান পুরাণ-প্রসঙ্গ – হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই ভারতবর্ষে বাস করে। এদেশ উভয়েরই। দেশমাতা তখন বিদেশি রাজশক্তির দমনপীড়নে অত্যাচারিত ও অপমানিত। বিদ্রোহী মনোভাবের প্রকাশে “ভাঙার গান”-এ কবি হিন্দু-মুসলমান পৌরাণিক প্রসঙ্গ ব্যবহার করেছেন। পরাধীনতার বন্ধন থেকে স্বদেশকে মুক্ত করার জন্য কবি “ভাঙার গান”-এ হিন্দু পুরাণে উল্লিখিত মহাদেবের রুদ্র ও খ্যাপা স্বরূপের প্রসঙ্গ এনেছেন। তরুণ বিপ্লবীরা যেন শিবের মতো ধ্বংসের শিঙা বাজিয়ে ইংরেজদের শৃঙ্খল থেকে স্বদেশকে মুক্ত করেন—এই কামনায় কবি বলেছেন— “ওরে ও তরুণ ঈশান! / বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ!”
একই উদ্দেশ্যে পুনরায় কবি বলেছেন—
“ওরে ও পাগলা ভোলা! / দে রে দে প্রলয়-দোলা!”
অন্যদিকে, ইসলামি পুরাণ অনুযায়ী হজরত মুহাম্মদের জামাতা চতুর্থ খলিফা আলির বলিষ্ঠ হাইদরী হাঁকের মতো ইংরেজদের ভয়ংকর ও জোরালো হাঁক দিতে বলেছেন তরুণ বিপ্লবীদের—
“মার হাঁক হাইদরী হাঁক, / কাঁধে নে দুন্দুভি ঢাক!”
কবির অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় – কবি নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও উদার মানবতাবাদী। আলোচ্য গানে এবং অসংখ্য গান-কবিতায় হিন্দু ও মুসলমান পুরাণ-প্রসঙ্গ ব্যবহার করে বারবার তিনি সম্প্রীতির বার্তা দিতে চেয়েছেন। আলোচ্য কবিতায় দুই সম্প্রদায়গত পুরাণ-প্রসঙ্গ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়।
“ওরে ও তরুণ ঈশান” এবং “ওরে ও পাগলা ভোলা”—পৃথক দুটি পঙ্ক্তিতে কবি শিবের প্রসঙ্গ এনেছেন কেন?
শিবের প্রসঙ্গ আনার কারণ – কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিভিন্ন রচনায় শিবের প্রসঙ্গ ব্যবহৃত হয়েছে। “ভাঙার গান”-এ দেবাদিদেব মহাদেব দুটি পঙ্ক্তিতে দুটি ভিন্ন নামে প্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থিত। তৃতীয় পঙ্ক্তিতে তিনি “ঈশান” এবং নবম পঙ্ক্তিতে “ভোলা” নামে উল্লিখিত হয়েছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী বীর বিপ্লবীদের কবি রুদ্র ঈশানের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তরুণ দেশপ্রেমীরা শিবের মতো রুদ্রমূর্তি ধারণ করে প্রলয়ের শিঙা বাজিয়ে, ধ্বংসের নিশান উড়িয়ে কারাগারের প্রাচীর ভেঙে ফেলুক—এটাই কবির বাসনা।
খ্যাপা ভোলানাথের প্রলয়দোলার মতো হ্যাঁচকা টানে গারদগুলো ভেঙে ফেলতে বলেছেন কবি। অত্যাচারী ইংরেজ শাসকের কারাগারে বন্দি দেশমাতার সন্তানরা। পরাধীনতার কারাগারে গোটা দেশটাই বন্দি। প্রলয়ংকরী শিবশক্তিতে জেগে উঠে সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করতে হবে তরুণ দেশপ্রেমীদের। মহাদেব ধ্বংস ও সৃষ্টির দেবতা। তিনি অন্যায় ও অশুভের বিনাশ ঘটিয়ে ন্যায় ও শুভের প্রতিষ্ঠা করতে প্রচণ্ড রুদ্রমূর্তিতে আবির্ভূত হন। ক্ষিপ্ত ভোলানাথের মতোই তরুণরাও সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ শাসনকে ধ্বংস করে, অন্যায়-অত্যাচারের অবসান ঘটিয়ে নতুন রূপে সমাজ ও দেশকে গড়ে তুলবেন বলে কবি আশা করেন। এই কারণেই কবি শিবের প্রসঙ্গটি এনেছেন।
ভাঙার গানে কবির প্রতিবাদী ও স্বাধীন মনের পরিচয় কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে লেখো।
প্রতিবাদী ভাবনা – নজরুল ইসলামের সৃষ্টির সিংহভাগ জুড়ে তাঁর বিদ্রোহী, প্রতিবাদী ও স্বাধীনচেতা সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। “ভাঙার গান”-ও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানে কবির প্রতিবাদী সত্তা স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। কবিতার প্রথম পঙ্ক্তিতেই তিনি বলেছেন—
“কারার ওই লৌহ-কপাট / ভেঙে ফেল, কররে লোপাট!”
যে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ইংরেজ সরকার কারারুদ্ধ করেছে, লৌহকপাট ভেঙে তাঁদের মুক্ত করতে হবে। হ্যাঁচকা টানে গারদগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। লাথি মেরে ভাঙতে হবে বন্দিশালার তালা। ভীমকারার ভিত্তি নাড়িয়ে দিতে হবে। পরাধীন দেশে শাসক ইংরেজদের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে কবি এমনই বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
স্বদেশমুক্তির ভাবনা – স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা লড়াই করছেন, তাঁরা সবাই মুক্ত ও স্বাধীন সত্যের পূজারি। সেই সত্যকে কেউ বন্দি করতে বা সাজা দিতে পারবে না। ব্যক্তির মৃত্যু হলেও বৈপ্লবিক আদর্শ অমর; সত্য অবিচল; মানবতার বিনাশ নেই। অত্যাচারী ইংরেজ শাসক স্বাধীনতার সংকল্পকে কোনোমতেই নষ্ট করতে পারবে না। দেশপ্রেমীরা তরুণ ঈশানের মতো, পাগলা ভোলার মতো মনেপ্রাণে স্বাধীন। ইংরেজদের হটিয়ে সমস্তরকম বন্ধন থেকে স্বদেশকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখেছেন কবি। এভাবেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাঁর স্বাধীন মনের পরিচয়।
ভাঙার গান কবিতাটিতে কবি নজরুলের কবি-মানসিকতার যে পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে তা সংক্ষেপে লেখো।
কবি-মানসিকতা – কাজী নজরুল ইসলামের “ভাঙার গান” কবিতাটি স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ মানুষের প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষাকেই যেন প্রকাশ করে। এই কবিতায় সাম্রাজ্যবাদী শ্রেণির প্রতি কবির বিদ্রোহী মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কারাগারের লৌহকপাটকে ভেঙে ফেলে সেখানে থাকা “রক্ত জমাট / শিকল-পূজোর পাষাণ-বেদী”-কে কবি ধ্বংস করতে বলেছেন। জেলখানার গারদগুলোয় হেঁচকা টান দিতে বলেছেন। আত্মদানের মধ্য দিয়েই কবি চেয়েছেন জীবনকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে, বলেছেন— “ডাক ওরে ডাক / মৃত্যুকে ডাক জীবনপানে!” কখনও বা বলেছেন বন্দিশালায় আগুন জ্বালিয়ে তাকে উপড়ে ফেলার জন্য।
এই আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে কবি নজরুলের শুধু দুঃসাহস নয়, বরং বিদ্রোহ, সত্য ও স্বাধীনতার প্রতি আনুগত্যও প্রকাশ পেয়েছে। আপসহীন প্রতিবাদী মানসিকতায় কবি শুধু বিদ্রোহের কথা বলেননি, স্বাধীনতার জয় ঘোষণা করেছেন। গাজনের বাজনা বাজিয়ে ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃষ্টির আগমনকে ঘোষণা করেছেন কবি। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেখানে জীবনের নতুন অভিষেক ঘটবে। শাসক আর শাসিতের মধ্যেকার দূরত্ব মিটে যাবে। এভাবেই “ভাঙার গান” কবিতাটিতে নজরুলের স্বাধীনতাপ্রিয় বিদ্রোহী মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে।
ভাঙার গানের গঠনশৈলী বা আঙ্গিকশিল্প সম্পর্কে আলোচনা করো।
কবিতার গঠনশৈলী – কোনো কবিতার ভাবগত দিকের সঙ্গে গঠনগত দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কবিতার ছন্দ-অলংকার-শব্দব্যবহার ইত্যাদিকে মিলিতভাবে তার গঠনশৈলী বা আঙ্গিকশিল্প বলা হয়।
শব্দব্যবহার – আলোচ্য গানে কবির যে বিদ্রোহী ও প্রতিবাদী মনোভাব ব্যক্ত হয়েছে, তার সঙ্গে শব্দপ্রয়োগ অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। “লৌহ-কপাট”-এর মতো তৎসম শব্দ ব্যবহারের পাশাপাশি কবি “জোরসে”, “হেঁচকা টান”-এর মতো চলিত শব্দগুচ্ছ প্রয়োগ করে বক্তব্যে বলিষ্ঠতা এনেছেন। “লাথি মার, ভাঙরে তালা!” ইত্যাদি বাক্য বা বাক্যাংশে অত্যাচারী ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে কবির ক্ষোভ ও ঘৃণা চমৎকার শিল্পসৌন্দর্যে প্রকাশিত হয়েছে।
চিত্রকল্প – “তরুণ ঈশান”, “প্রলয়-বিষাণ”, “গাজনের বাজনা”, “পাগলা ভোলা”, “হাইদরী হাঁক” ইত্যাদি পৌরাণিক ও লৌকিক প্রসঙ্গের মাধ্যমে কবি দারুণ চিত্রকল্প সৃষ্টির প্রয়াস দেখিয়েছেন।
ছন্দ – আলোচ্য গানটি দ্রুতলয়ের দলবৃত্ত ছন্দে লেখা এবং প্রত্যেক পর্বে প্রবল শ্বাসাঘাত বা ঝোঁক পড়েছে। এক পঙ্ক্তি অন্তর অন্ত্যমিল (বেদী/ভেদি) যেমন আছে, তেমনই আছে মধ্যমিল (ঈশান/বিষাণ)।
এ ছাড়া সমগ্র রচনাটির মধ্যে ছোটো ছোটো উৎকৃষ্ট শৈল্পিক কাজও আছে—যা একজন অত্যন্ত দক্ষ ও সচেতন স্রষ্টার পরিচয় দেয়। তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, আলোচ্য গঠনশৈলী বা আঙ্গিকশিল্প কবি নজরুলের স্বকীয়তার পরিচায়ক এবং তা খুবই উন্নতমানের।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের পঞ্চম পাঠের প্রথম অধ্যায়, ‘ভাঙার গান’ -এর কিছু রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে এসেছে। যদি আপনার কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।
মন্তব্য করুন