আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের ষষ্ঠ পাঠের তৃতীয় অধ্যায়, ‘চন্দ্রনাথ’ -এর কিছু রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করবো। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

‘চন্দ্রনাথ’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।
ভূমিকা – সাহিত্যে নামকরণ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শিরোনাম সাহিত্য ও পাঠকের মধ্যে একটি প্রারম্ভিক সেতু গঠন করে। সাহিত্যে নামকরণের নির্দিষ্ট কোনো রীতি প্রচলিত না থাকলেও মোটামুটিভাবে নামকরণ চরিত্রকেন্দ্রিক, বিষয়কেন্দ্রিক ও ব্যঞ্জনাধর্মী – এই তিন ধরনের হয়ে থাকে। আলোচ্য পাঠ্যাংশটি মূলত চরিত্রকেন্দ্রিক।
সম্পাদককৃত নামকরণ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আগুন’ উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়ের পুরোটা এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ের অংশবিশেষ একত্র করে ‘চন্দ্রনাথ’ নামে পাঠ্য ‘সাহিত্য সঞ্চয়ন’ বইতে সংকলিত হয়েছে। সুতরাং চরিত্রপ্রধান ‘চন্দ্রনাথ’ পাঠ্যাংশটির নামকরণ লেখককৃত নয়, সম্পাদককৃত।
নামকরণের বিষয়বস্তু – মূল উপন্যাসের নায়ক এবং কেন্দ্রীয় চরিত্র চন্দ্রনাথ। পাঠ্য গদ্যাংশের কাহিনিও চন্দ্রনাথকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। কাহিনির কথক নরেশ এবং তার দুই সহপাঠী হীরু আর চন্দ্রনাথ। চন্দ্রনাথের দাদা নিশানাথও এক উল্লেখযোগ্য চরিত্র। চন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করেই কাহিনির সূচনা। স্কুলের পরীক্ষায় অন্যায়ভাবে হীরুকে প্রথম স্থান দিয়ে চন্দ্রনাথকে দ্বিতীয় করা হয়েছে বলে চন্দ্রনাথ প্রতিবাদ জানাতে দ্বিতীয় পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রধানশিক্ষককে লেখা প্রত্যাখ্যানপত্র ফিরিয়ে নিয়ে ক্ষমা চাইতে বলেন চন্দ্রনাথের দাদা। কিন্তু চন্দ্রনাথ রাজি হয়নি। ফলে তার দাদার সঙ্গে চন্দ্রনাথের চিরবিচ্ছেদ ঘটে যায়। অভিমানী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আত্মবিশ্বাসী চন্দ্রনাথ গ্রাম ছেড়ে একা নিরুদ্দেশের পথে পাড়ি দেয়।
নামকরণের সার্থকতা – মেধাবী ও দরিদ্র চন্দ্রনাথের প্রতি নরেশ বিশেষ সমব্যথী। হীরু, নিশানাথ, প্রধানশিক্ষক কেউই চন্দ্রনাথকে উপেক্ষা করতে পারেননি। সকলের আচার-আচরণ, ভাবনাচিন্তা ও কথাবার্তার কেন্দ্রে চন্দ্রনাথ বিরাজমান। পাঠ্য অংশটি শেষও হয়েছে হীরুকে লেখা চন্দ্রনাথের চিঠি এবং চন্দ্রনাথের প্রতি নরেশের সমীহপূর্ণ স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে।
অতএব, কেন্দ্রীয় চরিত্রের নামেই আলোচ্য রচনাটির নামকরণ হয়েছে এবং এই নামকরণ যথার্থ।
চন্দ্রনাথকে ঘিরে নরুর যে মুগ্ধতা ছিল তার পরিচয় দাও।
নরুর মুগ্ধতার স্বরূপ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘চন্দ্রনাথ’ গদ্যাংশের কথক নরু। সে, হীরু আর চন্দ্রনাথ ছিল সতীর্থ। নরুর জীবন ইতিহাসের কয়েকটি পৃষ্ঠায় চন্দ্রনাথের উজ্জ্বল উপস্থিতি। এই উপস্থিতিকে সে গভীর রাতের কালপুরুষের মতো দীপ্তিময় বলে উল্লেখ করেছে। চন্দ্রনাথের আকৃতি ছিল কালপুরুষের মতো ভীম এবং ভঙ্গি ছিল দৃপ্ত। তার চরিত্রমহিমা নরুকে মুগ্ধ করেছে। চন্দ্রনাথ দরিদ্র, মেধাবী এবং দৃঢ়চেতা। সে স্কুলের পরীক্ষায় বরাবর প্রথম হত। কিন্তু শেষবার অন্যায়ভাবে তাকে দ্বিতীয় স্থান দেওয়া হয়। সেইবার স্কুলের সেক্রেটারির ভাইপো হীরুকে ফার্স্ট করা হয়। হীরু অঙ্ক পরীক্ষায় চন্দ্রনাথের দেখে তিনটে অঙ্ক করেছিল, এ ছাড়া তার গৃহশিক্ষক ছিলেন স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার। তিনি হীরুকে পরীক্ষার প্রশ্ন বলে দিয়ে ও তার খাতা ঠিকভাবে না দেখে হীরুকে প্রথম হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তাই চন্দ্রনাথ প্রধানশিক্ষককে চিঠি লিখে দ্বিতীয় পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে। দাদা নিশানাথের কথাতেও সে তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। এ বিষয়ে দাদার সঙ্গে চরম মতবিরোধের কারণে দু-ভাইয়ের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়াকেও সে মেনে নেয়। ইউনিভার্সিটির পরীক্ষায় স্কুলের ফলাফল কী হতে পারে তা চন্দ্রনাথ অনুমান করেছিল এবং তা প্রায় মিলে গিয়েছিল। কোনো কিছুর বিনিময়েই সে সত্য ও আত্মসম্মানের সঙ্গে আপস করেনি। সে বলেছে ‘সেকেন্ড প্রাইজ নেওয়া আমি বিনিথ মাই ডিগনিটি বলে মনে করি।’ ইউনিভার্সিটির পরীক্ষায় ভালো ফল করায় হীরু স্কলারশিপ পাবে শুনে নরু খুশি হতে পারেনি। সে জানে, ‘চন্দ্রনাথ ও হীরুতে অনেক প্রভেদ।’ চন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠত্বে নরুর কোনো সন্দেহ ছিল না। শুধু মেধা নয়, চন্দ্রনাথের নির্লোভ প্রকৃতি, দূরদৃষ্টি, ভদ্রতা বন্ধুপ্রীতি এবং মানসিক দৃঢ়তা নরুকে মুগ্ধ করেছিল।
‘চন্দ্রনাথ’ গদ্যাংশে কয়টি চিঠির উল্লেখ আছে? যে-কোনো তিনটি চিঠির ভূমিকা পর্যালোচনা করো।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘চন্দ্রনাথ’ গদ্যাংশে ছয়টি চিঠির উল্লেখ আছে।
প্রথম চিঠির ভূমিকা – কাহিনি অনুযায়ী প্রথম চিঠিটির প্রেরক চন্দ্রনাথ স্বয়ং। সে সেই বছর প্রথমবার পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করায় সেকেন্ড প্রাইজ গ্রহণ করবে না জানিয়ে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের পূর্বে স্কুলকে চিঠি দেয়। সেই চিঠির অভিঘাতে বিদ্যালয়ে আলোড়ন পড়ে যায়। এমনকি এই চিঠির কারণে তার দাদা নিশানাথের ভাইয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান পত্র ফিরিয়ে নেওয়া নিয়ে প্রবল দ্বন্দ্ব শুরু হয়। শেষ অবধি দাদা-ভাইয়ের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।
দ্বিতীয় চিঠির ভূমিকা – এরপর এক উল্লেখযোগ্য চিঠি হল হীরুর কলকাতা থেকে পাঠানো দীর্ঘ চিঠি। সেই চিঠি থেকে জানা যায় ইউনিভার্সিটির পরীক্ষার ফলাফল, অদ্ভুতভাবে যা চন্দ্রনাথের অনুমানের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। দশজন অকৃতকার্য, নরুর তৃতীয় বিভাগে পাস ও চন্দ্রনাথের পাঁচশো-পঁচিশের কম নম্বর পাওয়া। এই চিঠি থেকে আরও জানা যায় পুনরায় হীরু সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপক হয়ে চন্দ্রনাথকে পিছনে ফেলে দিয়েছে, হীরু স্কলারশিপও পাবে।
তৃতীয় চিঠির ভূমিকা – সর্বশেষ চিঠিটির প্রেরক চন্দ্রনাথ। সে হীরুর বাড়িতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে না পেরে এই চিঠি দিয়ে নিমন্ত্রণ রক্ষার অক্ষমতার কারণ জানায়। তবে চিঠির সম্বোধনে সে হীরুকে বন্ধুত্বের আন্তরিকতার বন্ধনে না বেঁধে প্রথাগত মানুষের ন্যায় সম্বোধন করে। ‘প্রিয়বরেষু’ কেটে লেখে ‘প্রীতিভাজনেষু’। সেই চিঠি থেকে জানা যায় সে প্রথমে অনুষ্ঠানে না থাকার কারণে মার্জনা চায়। হীরুর সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করে। পাশাপাশি স্কলারশিপের জন্য এত বড়ো বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান অপ্রয়োজনীয় এ মতও প্রকাশ করে। এরপর সে যাত্রা করে সকলের অজানা গন্তব্যে।
এভাবেই যেন চিঠি এ গল্পের কাহিনিতে কখনও আলোড়ন তুলেছে কখনও চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি ফুটিয়ে তুলেছে।
‘চন্দ্রনাথ’ গল্পে প্রধান শিক্ষক মহাশয়ের ভূমিকা আলোচনা করো।
ছাত্রদরদি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ গল্পের কথক নরেশ ওরফে নরু। স্কুলজীবনের স্মৃতিচারণা প্রসঙ্গে দুই সহপাঠী এবং প্রধানশিক্ষকের কথা তার বিশেষভাবে মনে পড়েছে। রোগা, লম্বা চেহারা এবং শান্ত স্বভাবের মাস্টারমশাই ছিলেন অত্যন্ত ছাত্রদরদী। পরিস্থিতির শিকার হয়ে তাঁকে অবাঞ্ছিত একটি ঘটনার সাক্ষী থাকতে হয়েছে। চন্দ্রনাথ তাঁর অতি প্রিয় ছাত্র। সে কখনও সেকেন্ড হয়নি অথচ স্কুলের শেষ পরীক্ষায় সেক্রেটারির ভাইপো হীরু ফার্স্ট হয়। চন্দ্রনাথের কথায় জানা যায় হীরু চন্দ্রনাথের খাতা দেখে তিনটে অঙ্ক টুকেছে এবং সহকারী শিক্ষক অন্যায়ভাবে হীরুকে বেশি নম্বর পাইয়ে দিয়েছেন। অভিমানে চন্দ্রনাথ পুরস্কার বিতরণের দিন সেকেন্ড প্রাইজ নেবে না জানিয়ে প্রধানশিক্ষককে চিঠি দিয়েছিল। চন্দ্রনাথের প্রত্যাখ্যান পত্রে স্কুলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। চিন্তিত বিমর্ষ মাস্টারমশাই নরুকে বলেন, চন্দ্রনাথের মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না জেনে আসতে। নরু ফিরে এসে চন্দ্রনাথ ও তার দাদার এ বিষয়ে তর্কবিতর্ক এবং সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনা মাস্টারমশাইকে জানায়। মাস্টারমশাই তখন নিজে চন্দ্রনাথের কাছে যেতে চান এবং অনুতাপ ও বেদনায় জর্জরিত হয়ে বলেন, “আমারই অন্যায় হলো। চন্দ্রনাথের দাদাকে না জানালেই হতো। না, ছি ছি ছি!”
স্নেহশীল ও প্রেরণাদায়ক – বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় স্কুলের মধ্যে হীরু ফার্স্ট হয়েছে বলে স্কলারশিপ পাবে। সেই উপলক্ষ্যে তাদের বাড়িতে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে একপ্রকার বাধ্য হয়েই মাস্টারমশাইকে উপস্থিত থাকতে হয়েছে এবং সেখানেও তিনি নরেশকে সাহিত্যচর্চা ও লেখাপড়ায় উৎসাহ দিয়েছেন, চন্দ্রনাথের খোঁজ নিয়েছেন। চন্দ্রনাথ কাউকে কিছু না জানিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ায় তিনি দুঃখ পেয়েছেন। অসম্ভব স্নেহশীল মাস্টারমশাই পরিস্থিতির শিকার হয়ে অসহায় বোধ করেছেন। চন্দ্রনাথের অবাঞ্ছিত পরিণতির জন্য বেদনার্ত হয়েছেন।
“কালপুরুষ নক্ষত্রের সঙ্গে চন্দ্রনাথের তুলনা করিয়া আমার আনন্দ হয়।” – কালপুরুষ ও চন্দ্রনাথের সাদৃশ্য গল্পাংশ অবলম্বনে আলোচনা করো।
অথবা, “কালপুরুষ নক্ষত্রের সঙ্গে চন্দ্রনাথের তুলনা করিয়া আমার আনন্দ হয়।” – এই মন্তব্যের আলোকে চন্দ্রনাথ চরিত্র আলোচনা করো।
অথবা, ‘চন্দ্রনাথ’ গল্প অবলম্বনে নাম চরিত্রটির বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
আত্মবিশ্বাসী এবং মেধাবী – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ কাহিনির নামচরিত্রটি চেহারায় ও স্বভাবে ছিল বলিষ্ঠ। কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলীর খড়্গধারী বিশাল আকৃতির মতো চন্দ্রনাথের চেহারা ও ভঙ্গিমা ছিল দৃপ্ত। অন্ধকার অসীম আকাশের বুকে কালপুরুষ যেমন নিঃসঙ্গ, তেমনি জীবনের পথে চন্দ্রনাথও একা দৃপ্ত পদক্ষেপে পাড়ি দিয়েছিল। তাই তার সহপাঠী তথা আলোচ্য কাহিনির কথক নরেশ কালপুরুষ নক্ষত্রের সঙ্গে চন্দ্রনাথের তুলনা করে আনন্দ পায়। চন্দ্রনাথ দরিদ্র, মেধাবী ছাত্র। জীবনে সে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হওয়ার স্বাদ পায়নি, তাই স্কুলের অন্তিম পরীক্ষায় হীরুর প্রথম হওয়া সে মেনে নিতে পারেনি। প্রধান শিক্ষককে পত্র লিখে দ্বিতীয় পুরস্কার সে প্রত্যাখ্যান করেছে।
জেদি ও আত্মপ্রত্যয়ী – দাদা নিশানাথের শত শাসন ও অনুরোধেও সে প্রত্যাখ্যান পত্র ফিরিয়ে নেয়নি। হীরুর প্রথম হওয়ার নেপথ্যে এক সহশিক্ষকের পক্ষপাতিত্ব ছিল এবং হীরু নিজেও অসদুপায় অবলম্বন করেছিল। এসব কথা দাদাকে বিস্তারিতভাবে জানিয়ে চন্দ্রনাথ বলেছে, ‘সেকেন্ড প্রাইজ নেওয়া আমি বিনিথ মাই ডিগনিটি বলে মনে করি।’ এর জন্য দাদার সঙ্গে চিরবিচ্ছেদকেও সে মেনে নেয়।
উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও অহংকারী – অতিরিক্ত আত্মসচেতনতা এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস তাকে অহংকারী ও উদ্ধত করে তুলেছিল। তাই প্রধানশিক্ষক ডেকে পাঠালেও সে দেখা করেনি। সে মনে করে ‘গুরুদক্ষিণার যুগ আর নেই’। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাতেও হীরুর প্রথম হওয়া এবং স্কলারশিপ পাওয়াকে চন্দ্রনাথ সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। তাই হীরুর বাড়ির উৎসবের দিনই গ্রাম ছেড়ে নিরুদ্দিষ্ট হয়েছে।
কালপুরুষ চন্দ্রনাথ – চন্দ্রনাথ চরিত্রটি নানা গুণের সমাবেশে আকর্ষণীয়। দু-একজনের অসাধুতায় যে প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তা থেকে সে বেরিয়ে আসতে পারেনি তার অনমনীয় জেদ ও অহংকারের জন্য। এই অনমনীয়তাই তাকে কালপুরুষের মতো নিঃসঙ্গ এবং নিরুদ্দেশের পথে একক যাত্রী করে তুলেছে।
“হীরুর কথা মনে করিয়া আকাশের দিকে চাহিলে, মনে পড়ে শুকতারা।” – এই মন্তব্যের আলোয় হীরু-চরিত্রটি আলোচনা করো।
মেধাবী, নিরহংকারী – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ গদ্যাংশে হীরু একটি বিশিষ্ট চরিত্র। চরিত্র মহিমায় সে আকাশের শুকতারার মতোই প্রদীপ্ত অথচ তার আলো কোমল স্নিগ্ধ। ধনীর সন্তান বলে তার কোনো অহংকার নেই। হীরু মেধাবী ছাত্র। চন্দ্রনাথের প্রতি বছর প্রথম হওয়া রেকর্ড সে ভেঙে দিয়েছিল। অবশ্য চন্দ্রনাথের কথা অনুযায়ী হীরু নাকি চন্দ্রনাথের খাতা থেকে অঙ্ক টুকেছিল। তা যদি সত্যি হয়েও থাকে তবু সেটুকু ছাড়া সে আর কোনো অসততা করেনি। তার কাকা স্কুলের সেক্রেটারি হওয়ায় সে যদি বাড়তি সুবিধে পেয়ে থাকে এবং সহকারী শিক্ষক যদি পক্ষপাতিত্ব করেই থাকেন তবু তাতে হীরুর কোনো দোষ নেই।
শান্ত, সরল, বন্ধুবৎসল – হীরু ফার্স্ট হয়েও সহপাঠী চন্দ্রনাথের দ্বিতীয় হওয়াতে সমব্যথী হয়েছে। সে কখনও চন্দ্রনাথের প্রতি বিরূপ মনোভাব দেখায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাতেও সে চন্দ্রনাথকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। ভালো ফল করায় হীরু স্কলারশিপ পাবে। তাই তার বাড়িতে প্রীতি ভোজের যে অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় তাতে চন্দ্রনাথকেও নিমন্ত্রণ করতে সে ভোলেনি। অনুষ্ঠানে আগত সহপাঠী নরুকে সে সমাদর করে বসিয়েছে এবং অকপটে তার মনের ইচ্ছে ব্যক্ত করেছে – “বিলেতে যাবার আমার বড়ো সাধ, নরু।” হীরুর শান্তস্বভাব, সরলতা আর বন্ধুপ্রীতির আরও পরিচয় পাওয়া যায় যখন সে প্রধানশিক্ষকের কাছে নরুর সাহিত্যকৃতির প্রশংসা করে। নরুর লেখা কাগজে বেরিয়েছে – এ খবর খুশি হয়ে সে মাস্টারমশাইকে জানায়। অনুষ্ঠানের দিন গ্রাম ছেড়ে চলে যাবার আগে চন্দ্রনাথ যে চিঠি তাকে লিখে গেছে হীরু সেটি নরুকে দেখায়। সেই চিঠি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সে রেখে দেয় এবং চন্দ্রনাথের গন্তব্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তিত হয়। উৎসবের সমারোহের মধ্যেও হীরু কিন্তু তার অভিমানী বন্ধুকে ভোলেনি।
নরু, হীরু ও চন্দ্রনাথের মধ্যে কাকে তোমার ভালো লাগে এবং কেন ভালো লাগে তা লেখো।
অথবা, চন্দ্রনাথ ও হীরুর মধ্যে প্রকৃতিগত পার্থক্য আলোচনা করো।
হীরু চরিত্র – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ গদ্যাংশের নরু, হীরু, চন্দ্রনাথ তিনটি চরিত্রকেই আমার কমবেশি ভালো লাগে। হীরু পড়াশোনায় খারাপ ছিল না। অঙ্ক পরীক্ষায় চন্দ্রনাথের খাতা থেকে তিনটে অঙ্ক টোকা ছাড়া আর কোনো অসততা সে করেনি। তার কাকা স্কুলের সেক্রেটারি, অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার তার প্রতি পক্ষপাতিত্ব করায় হীরু ফার্স্ট হয়েছে। এর জন্য তার নিজের কোনো দোষ নেই।
চন্দ্রনাথ চরিত্র – চন্দ্রনাথের আত্মগরিমা বড়ো বেশি। সে দরিদ্র, মেধাবী, একরোখা। জীবনে প্রথমবার সেকেন্ড হওয়াকে সে মেনে নিতে পারেনি। সে জানে হীরুর প্রথম হওয়ার নেপথ্য কারণগুলো। দাদা নিশানাথের আদেশ ও অনুরোধেও সে পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের চিঠি প্রত্যাহার করেনি। এজন্য সে দাদার সঙ্গে বিচ্ছেদকেও মেনে নিয়েছে। কাহিনির কথক নরু এবং হেডমাস্টার চন্দ্রনাথের প্রতি একটু বেশি দুর্বল। তার দৃঢ়তাকে আমিও কুর্নিশ জানাই।
নরু চরিত্র – কিন্তু নরু! সে যেন প্রকৃত উপেক্ষিত। সে কথক, বিশ্লেষক। সে চন্দ্রনাথের মানসিক দৃঢ়তা, প্রতিবাদ এবং চন্দ্রনাথের প্রতি হীরু ও প্রধানশিক্ষকের মনোভাবকে পাঠকের সামনে হাজির করেছে। চন্দ্রনাথের পরিণতিতে সে ব্যথিত হয়েছে, মাস্টারমশাইয়ের অসহায়তায় কষ্টও পেয়েছে। হীরুর বাড়ির উৎসবে উপস্থিত থেকে তাকেও নিরাশ করেনি। লেখাপড়ায় সে অসাধারণ না হতে পারে কিন্তু সে সাহিত্যচর্চা করে। অন্যের প্রতি নরুর আচরণ ও মনোভাবের মধ্য দিয়ে বোঝা যায় তার মন কত বড়ো। মাস্টারমশাইয়ের কথায় সে চন্দ্রনাথের বাড়িতে গেছে, দাদার সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটার পরও সে চন্দ্রনাথের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। হীরু ও চন্দ্রনাথ নরুকে কীভাবে মনে রেখেছে জানা যায় না। কিন্তু নরু অতীতের স্কুল জীবন আর দুই সহপাঠীর স্মৃতিচারণ করেছে। চন্দ্রনাথের কথা তার বিশেষভাবে মনে পড়েছে। তাই নরুকেই আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে।
“অন্ধকারের মধ্যে সুস্পষ্ট রূপ পরিগ্রহ করিয়া সম্মুখে দাঁড়াইল কিশোর চন্দ্রনাথ।” – আলোচ্য অংশে বক্তার সম্মুখে কীভাবে অন্ধকারের মধ্যে কিশোর চন্দ্রনাথের রূপ পরিস্ফুট হল? এই অংশে চন্দ্রনাথের যে দৈহিক বর্ণনা আছে তা আলোচনা করো।
কিশোর চন্দ্রনাথের রূপ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ গল্পাংশের কথক নরেশ আলোচ্য উক্তিটির বক্তা। অতীতের স্মৃতিচারণ প্রসঙ্গে বিদ্যালয় জীবনের একটি ঘটনা এবং সহপাঠী হীরু ও চন্দ্রনাথের কথা তার মনে পড়েছিল। টেবিল-ল্যাম্পের আলোয় আলোকিত ঘরে একা আয়নার সামনে বসে সে ছাত্রজীবনের কথা ভাবছিল। কিন্তু নিজেরই প্রতিবিম্বের দিকে বার বার দৃষ্টি যাওয়ায় সে বাতি নিভিয়ে দিয়েছিল, যাতে চিন্তাসূত্র বিচ্ছিন্ন না হয়। তখনই অন্ধকারের মধ্যে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল কিশোর চন্দ্রনাথের রূপ।
দৈহিক বর্ণনা – চন্দ্রনাথের শরীর দীর্ঘ, সবল এবং সুস্থ। তার দৃষ্টিতে নির্ভীকতা এবং মুখমণ্ডলে একটা অসাধারণত্ব ছিল। চন্দ্রনাথের মুখমণ্ডলের মধ্যে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে তার অদ্ভুত মোটা নাক। সেই নাকের প্রান্ত সামান্য উত্তেজনাতেই স্ফীত হয়ে উঠত। তার চোখ দুটি বেশ বড়ো, কপাল চওড়া। সেই চওড়া কপালের মাঝখানে নাকের ঠিক ওপরেই শিরা দিয়ে অঙ্কিত একটা ত্রিশূলচিহ্ন। যদি কোনো কারণে মনের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে রক্তচাপ বৃদ্ধি পেত আর কপালের মাঝে ফুলে উঠত সেই ত্রিশূলাকৃতির শিরা।
“নরু, তুমি একবার জেনে এসো তো চন্দ্রনাথ কী বলে!” – নরু কে? বক্তা কে? চন্দ্রনাথ কোন্ বিষয়ে কী বলবে?
নরু অর্থাৎ নরেশ হল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত ‘চন্দ্রনাথ’ গদ্যাংশের কথক এবং হীরু ও চন্দ্রনাথের সহপাঠী।
উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা নরুদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
পরীক্ষায় চন্দ্রনাথের দ্বিতীয় স্থান – চন্দ্রনাথ মেধাবী ছাত্র। সে কখনও পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়নি। সর্বদা প্রথম স্থান লাভ করে এসেছে। কিন্তু এবার হীরু প্রথম হয়েছে এবং চন্দ্রনাথ পেয়েছে দ্বিতীয় স্থান। কিন্তু দ্বিতীয় পুরস্কার নেওয়া তার মর্যাদা হানিকর মনে করে সে বিদ্যালয়ে প্রত্যাখ্যান পত্র পাঠিয়েছে। তার এই পত্রাঘাতে বিদ্যালয়ে আলোড়ন পড়ে গেছে।
চন্দ্রনাথের সিদ্ধান্ত – শান্ত স্বভাবের, স্নেহশীল প্রধান শিক্ষক এই ঘটনায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। চন্দ্রনাথকে তিনি স্নেহ করেন। চন্দ্রনাথের মনের কষ্ট তাঁকেও ব্যথিত করেছে। তবু তিনি চান চন্দ্রনাথ প্রত্যাখ্যান পত্র প্রত্যাহার করুক এবং পুরস্কার বিতরণে এসে দ্বিতীয় পুরস্কার গ্রহণ করুক। এ বিষয়ে চন্দ্রনাথের মত বা সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন হল কি না বা এ বিষয়ে সে এখন যা ভাবছে, সেটাই মাস্টারমশাই নরুকে জেনে আসতে বলেছেন।
“তাহার কথা শুনিয়া আশ্চর্য হইয়া গেলাম।” – কার কোন্ কথা শুনে বক্তা আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল? শেষ পর্যন্ত আশ্চর্য হওয়া কতটা বাস্তবায়িত হয়েছিল?
অথবা, “চন্দ্রনাথের অনুমান অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়া গিয়াছে।” – চন্দ্রনাথ কবে কোন্ বিষয়ে অনুমান করেছিল? তার অনুমান কী ছিল? বাস্তবে কী ঘটেছে?
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘চন্দ্রনাথ’ গল্পে চন্দ্রনাথের কথা শুনে বক্তা নরু আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে স্কুলে কে কত নম্বর পেতে পারে সেটাই অনুমান করেছিল চন্দ্রনাথ। সে-কথা শুনে বক্তা নরু আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল।
চন্দ্রনাথের অনুমান – চন্দ্রনাথের অনুমান ছিল সে সাড়ে-পাঁচশোর বেশি পেলে স্কুলের ফলাফলে দেখা যাবে অমিয় এবং শ্যামা ফেল। বাকি সবাই পাস। আর সে পাঁচশো-পঁচিশের কম পেলে স্কুলে দশটি ছাত্র ফেল করবে এবং বক্তা নরু তৃতীয় বিভাগে পাস করবে।
বাস্তব পরীক্ষার ফল – চন্দ্রনাথের অনুমান অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল। নরুর তৃতীয় বিভাগে পাস, দশজন ফেল আর চন্দ্রনাথের নম্বর পাঁচশো-পঁচিশের কম হয়েছিল। কিন্তু হীরু যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাতেও তাকে পিছনে ফেলে দেবে এটা চন্দ্রনাথ অনুমান করতে পারেনি। তাই নরুর আশ্চর্য হওয়া পুরোটাই বাস্তবায়িত হয়েছিল। চন্দ্রনাথ যা বলেছিল বাস্তবে সেটাই ঘটেছিল।
কোন কারণে চন্দ্রনাথের ক্ষোভ হয়েছিল এবং এর জন্য সে কী করেছিল?
চন্দ্রনাথের ক্ষোভের কারণ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ গদ্যাংশের প্রধান চরিত্র
চন্দ্রনাথ স্কুলের পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছিল। এর আগে সে কখনও কোনো পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়নি, সর্বদা প্রথম হত। স্কুলের সেক্রেটারির ভাইপো, ধনীর দুলাল হীরু এবার ফার্স্ট হয়েছে। কিন্তু মেধার যথার্থ বিচারে চন্দ্রনাথেরই ফার্স্ট হবার কথা। অঙ্ক পরীক্ষায় চন্দ্রনাথের খাতা দেখে হীরু তিনটে অঙ্ক টুকেছে। স্কুলের সহকারী শিক্ষক তথা হীরুর গৃহশিক্ষক আগে থেকে প্রশ্ন বলে দিয়েছেন এবং মূল্যায়নের সময়ও ইচ্ছাকৃতভাবে হীরুকে বেশি নম্বর দিয়েছেন। তাই হীরু প্রথম হয়েছে, সে নিজের যোগ্যতায় এই ফল করেনি। যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়িত না হওয়ায় চন্দ্রনাথের ক্ষোভ হয়েছিল।
চন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়া – এই ক্ষোভ থেকে সে চিঠি দিয়ে স্কুলকে জানিয়েছিল যে পুরস্কার বিতরণের সময় সে দ্বিতীয় পুরস্কার নেবে না। তার প্রত্যাখ্যান পত্রে স্কুলে আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল। চন্দ্রনাথের দাদা নিশানাথ ভাইকে সেই পত্র প্রত্যাহার করতে এবং প্রধান শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন। কিন্তু চন্দ্রনাথ রাজি হয়নি। সে বলেছিল, ‘সেকেন্ড প্রাইজ নেওয়া আমি বিনিথ মাই ডিগনিটি বলে মনে করি।’ এর ফলে দু-ভাইয়ের তর্কাতর্কি হয়েছিল এবং শেষপর্যন্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল। ইউনিভার্সিটি এগজামিনের রেজাল্ট বের হওয়ার পর হীরুর বাড়ির উৎসবের দিনে চন্দ্রনাথ গ্রাম ছেড়ে নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা করেছিল।
“সেকেন্ড প্রাইজ নেওয়া আমি বিনিথ মাই ডিগনিটি বলে মনে করি।” – বক্তা কে? সে কাকে, কোন্ প্রসঙ্গে এ কথা বলে? এই প্রসঙ্গে সে আরও যেসব কথা বলেছিল তা বিবৃত করো।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ গদ্যাংশ থেকে উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা চন্দ্রনাথ।
সে তার দাদা নিশানাথকে এ কথা বলে। নিশানাথ যখন একটি পত্র দেখিয়ে সেকেন্ড প্রাইজ রিফিউজ করার কারণ জানতে চান তখন চন্দ্রনাথ এ কথা বলে।
চন্দ্রনাথের বক্তব্য – এই প্রসঙ্গে নিশানাথের সঙ্গে চন্দ্রনাথের বিস্তর তর্কবিতর্ক হয়। দাদার ক্ষোভ প্রশমনের জন্য তাঁকে সমগ্র পরিস্থিতিটি বোঝানোর চেষ্টা করে চন্দ্রনাথ। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাকে বঞ্চিত করে হীরুকে প্রথম করা হয়েছে, কারণ হীরুর কাকা স্কুলের সেক্রেটারি। তা ছাড়া পরীক্ষার সময় হীরু চন্দ্রনাথের খাতা থেকে তিনটে অঙ্ক টুকেছে। স্কুলের সহকারী শিক্ষক হীরুর প্রাইভেট মাস্টারও। তিনি পরীক্ষার আগেই হীরুকে প্রশ্ন বলে দিয়েছেন। আবার উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় তিনি ও আরও দু-একজন শিক্ষক ইচ্ছাকৃত ভুল করে হীরুকে বেশি নম্বর পাইয়ে দিয়েছেন। নিশানাথ ভাইয়ের আচরণ কিছুতেই মানতে পারেননি। শেষপর্যন্ত তিনি ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বললেও চন্দ্রনাথ অবিচলিত থেকে বলেছে, ‘বেশ।’
“সেকেন্ড প্রাইজ নেওয়া আমি বিনিথ মাই ডিগনিটি বলে মনে করি।” – বক্তার এরকম খেদোক্তির কারণ কী? শেষপর্যন্ত সে নিজের ‘ডিগনিটি’ কীভাবে বজায় রেখেছিল, গল্প অবলম্বনে লেখো।
খেদোক্তির কারণ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ গদ্যাংশের আলোচ্য উক্তিটির বক্তা চন্দ্রনাথ। মেধাবী চন্দ্রনাথ স্কুলের কোনো পরীক্ষায় কখনও দ্বিতীয় হয়নি, সর্বদা সে প্রথম হত। কিন্তু এবার অস্বাভাবিকভাবে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাকে দ্বিতীয় করা হয়েছে। চন্দ্রনাথ জানে, হীরু কেন ও কীভাবে ফার্স হয়েছে। হীরুর কাকা স্কুলের সেক্রেটারি বলে সে বিশেষ সুবিধা পেয়েছে। পরীক্ষায় সে চন্দ্রনাথের কাছ থেকে তিনটে অঙ্ক টুকেছে। স্কুলের সহকারী শিক্ষক হীরুকে প্রাইভেটে পড়াতে গিয়ে প্রশ্ন বলে দিয়েছেন। তিনি ও আরও দু-একজন শিক্ষক হীরুকে যোগ্যতার চেয়ে বেশি নম্বর ইচ্ছে করেই দিয়েছেন। তাই বক্তার এরকম খেদোক্তি।
চন্দ্রনাথের কার্যকলাপ – বক্তা চন্দ্রনাথ নিজের ‘ডিগনিটি’ অর্থাৎ সম্মান বজায় রাখতে প্রধানশিক্ষককে পত্র দিয়ে সেকেন্ড প্রাইজ প্রত্যাখ্যান করেছিল। তার দাদা নিশানাথ তাকে অনেক বুঝিয়েছেন, ক্রুদ্ধ হয়েছেন, শাসন করেছেন। প্রধানশিক্ষকের কাছে ক্ষমা চেয়ে প্রত্যাখ্যান পত্র ফিরিয়ে নিতে বলেছেন। এ বিষয়ে দু-ভাইয়ের বিস্তর তর্কবিতর্ক হয়েছে। চরম অস্ত্র হিসেবে তার দাদা ভাইয়ের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। তাতেও চন্দ্রনাথ নির্বিকার চিত্তে নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থেকেছে। হীরুর কাকা তথা স্কুলের সেক্রেটারি চন্দ্রনাথকে স্পেশাল প্রাইজ দিতে চাইলেও চন্দ্রনাথ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। হেডমাস্টারমশাই ডেকে পাঠালেও চন্দ্রনাথ আর স্কুলে যায়নি।
পরে ইউনিভার্সিটির এগজামিনেও হীরু চন্দ্রনাথের চেয়ে ভালো ফল করেছে এবং সে স্কলারশিপ পেয়েছে। তাই তার বাড়িতে উৎসব। সেই উৎসবের নিমন্ত্রণ চন্দ্রনাথ পত্রমারফত প্রত্যাখ্যান করে সেদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। এইভাবে বক্তা তার ‘ডিগনিটি’ শেষপর্যন্ত বজায় রেখে গেছে।
পরীক্ষায় সেকেন্ড প্রাইজ না নিতে চেয়ে চন্দ্রনাথের পদক্ষেপ প্রসঙ্গে চন্দ্রনাথ ও নিশানাথের কথোপকথন গল্পাংশ অবলম্বনে বিবৃত করো।
চন্দ্রনাথ ও নিশানাথ -এর কথোপকথন – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ গদ্যাংশে চন্দ্রনাথ পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করার পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে স্কুলকে পত্র দেয়। কারণ সে বরাবর প্রথম স্থান অধিকার করে আসছে। এই সংবাদ প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে জানতে পারেন চন্দ্রনাথের পিতৃসম দাদা নিশানাথ। তিনি স্কুলে দেওয়া পত্রটি নিয়ে মুখোমুখি হন ভাইয়ের। বিনা ভূমিকায় চিঠি দেওয়ার কৈফিয়ত চান। চন্দ্রনাথ অত্যন্ত স্বাভাবিক অভিব্যক্তিতে বলে – “আমি সেকেন্ড প্রাইজ রিফিউজ করেছি।” কারণস্বরূপ বলে – ‘সেকেন্ড প্রাইজ নেওয়া আমি বিনিথ মাই ডিগনিটি বলে মনে করি।’ ভাইয়ের এরূপ উত্তরে ক্ষোভে ফেটে পড়ে তাকে তিরস্কার করেন নিশানাথ। বলেন এটা তার অক্ষমতার পরিচয়বাহী, অসম্মান নয়। প্রতিবাদী হয়ে চন্দ্রনাথ জানায় স্কুলের সেক্রেটারির ভাইপো তার সহায়তায় প্রথম হয়েছে। পাশাপাশি সে অসৎ উপায়ে প্রশ্ন জেনে গিয়েছিল ও তার খাতার মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্ব হয়েছে। এসব অভিযোগের তির না ছুঁড়ে নিশানাথের কাছে তিনি তার ভাইকে সংযত হতে বলে বারবার প্রধান শিক্ষকের প্রতি যোগ্য সম্মানজ্ঞাপন করে প্রত্যাখ্যান পত্র ফিরিয়ে নিতে বলেন।
চন্দ্রনাথ দাদার অবাধ্য হয়ে নিজ সিদ্ধান্তে অবিচল থাকে। তার এই অনড় মনোভাবে যারপরনাই ক্ষুব্ধ হয়ে নিশানাথ জানায় সে পূর্বে তার বউদির কাছে তার সম্পর্কে অভিযোগ শুনেও তাকে বিশ্বাস করে গেছে। এর পর উদ্ধত ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করার কথাও তিনি ঘোষণা করেন। কিন্তু চন্দ্রনাথও অবিচলিত হয়ে বলে ‘বেশ’। ভাইয়ের এরূপ হৃদয়হীন উত্তরে তার চোখ থেকে বেদনা ও ক্রোধের যুগপৎ দৃষ্টি ঝরে পড়ে।
চন্দ্রনাথের দাদা কেমন প্রকৃতির লোক ছিলেন? চন্দ্রনাথের সঙ্গে তার দাদার মতবিরোধ হয়েছিল কেন?
নিশানাথের প্রকৃতি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ গদ্যাংশের কেন্দ্রীয় চরিত্র চন্দ্রনাথ। তার দাদা নিশানাথ ছিলেন খুবই ভদ্রলোক। তিনি নির্বিরোধী ও শান্ত প্রকৃতির মানুষ। ভাই চন্দ্রনাথকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং ভাইয়ের স্কুলের প্রধান শিক্ষকমশাইকেও শ্রদ্ধা করতেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি মানিয়ে চলতে চাইতেন। ভাইয়ের ঔদ্ধত্যকে তিনি যেমন ক্ষমা করেননি, আবার মতবিরোধের কারণে চন্দ্রনাথের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ায় নিশানাথ বেদনার্ত হয়েছেন।
মতবিরোধের কারণ – স্কুলের পরীক্ষায় সেকেন্ড প্রাইজ প্রত্যাখ্যানের কারণেই চন্দ্রনাথের সঙ্গে তার দাদার মতবিরোধ হয়েছিল। স্কুলের প্রতিটি পরীক্ষায় চন্দ্রনাথ প্রথম হত। কিন্তু এবার তাকে অন্যায়ভাবে দ্বিতীয় করা হয়েছে বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের নেপথ্যে সে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করেছে। সেক্রেটারির ভাইপো হওয়ায় হীরুকে এবার প্রথম করা হয়েছে। স্কুলের সহকারী শিক্ষক হীরুর গৃহশিক্ষক বলে তাঁর মাধ্যমে হীরু আগে থেকেই প্রশ্ন জেনেছে এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নেও দু-একজন শিক্ষকের পক্ষপাতিত্ব পেয়েছে। চন্দ্রনাথের খাতা থেকেও সে অঙ্ক পরীক্ষায় তিনটে অঙ্ক টুকেছে। দ্বিতীয় পুরস্কার নেওয়া নিজের ডিগনিটির পক্ষে হানিকর বলে চন্দ্রনাথ মনে করে। তাই সে প্রধান শিক্ষকের কাছে পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের পত্র পাঠিয়েছে। তার নির্বিরোধী দাদা নিশানাথ সেই পত্র ফিরিয়ে নিয়ে ক্ষমা চেয়ে প্রধানশিক্ষককে পত্র লিখতে বলায় চন্দ্রনাথ কিছুতেই রাজি হয়নি। সেইজন্য দাদার সঙ্গে তার মতবিরোধ হয়েছিল।
“চোখের দৃষ্টিতে বেদনা ও ক্রোধের সে এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।” – কার মধ্যে, কেন বেদনা ও ক্রোধের সংমিশ্রণ ঘটেছে? তাঁর মধ্যে এই দুই ভাবের সংমিশ্রণ হওয়া কতটা স্বাভাবিক ছিল তা বুঝিয়ে দাও।
নিশানাথের মধ্যে বেদনা ও ক্রোধের সংমিশ্রণ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ গদ্যাংশে চন্দ্রনাথের দাদা নিশানাথের মধ্যে বেদনা ও ক্রোধের সংমিশ্রণ ঘটেছে। মেধাবী ছাত্র চন্দ্রনাথ স্কুলের পরীক্ষায় সর্বদা প্রথম হত। এবার সে দ্বিতীয় হওয়ায় চিঠি দিয়ে দ্বিতীয় পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছে। তার পত্রাঘাতে স্কুলে আলোড়ন পড়ে গেছে। নিশানাথ ভাইকে প্রত্যাখ্যান পত্র ফিরিয়ে নিতে এবং প্রধানশিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাইতে বলে, চন্দ্রনাথ রাজি হয়নি। চরম মতবিরোধের ফলে দু-ভাইয়ের সম্পর্ক ছিন্ন হয়। ভাইয়ের জেদি ও উদ্ধত আচরণের সঙ্গে শান্ত প্রকৃতির নিশানাথের হৃদয়ে বেদনা ও ক্রোধের সংমিশ্রণ ঘটেছে।
স্বাভাবিক ভাব – নিশানাথ বিবাহিত, শান্ত, নির্বিরোধী ভদ্রলোক। ভাই চন্দ্রনাথ তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক ছোটো। চন্দ্রনাথের সেকেন্ড প্রাইজ প্রত্যাখ্যান করা নিয়ে দুজনের মতবিরোধ হয়। ভাইয়ের একগুঁয়েমি, অবাধ্যতা নিশানাথকে ক্রুদ্ধ করে জাগায়। চন্দ্রনাথ তার দাদার কথা মানেনি, নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থেকেছে। এমনকি মতান্তর চরমে পৌঁছোলে নিশানাথ ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। তাতে চন্দ্রনাথ নমনীয় হয়নি। ভাইয়ের আচরণ নিশানাথকে একদিকে ক্রুদ্ধ ও অবাক করেছে। অন্যদিকে ভাইয়ের প্রতি স্নেহশীলতার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার বেদনাবোধ করেছেন নিশানাথ। একদিকে মতাদর্শ, অন্যদিকে ভ্রাতৃস্নেহ; মতের অমিলের কারণে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার বেদনা; ভাইয়ের আচরণের জন্য ক্রোধ আর ভাইকে হারানোর বেদনা মিশ্রিত হয়ে নিশানাথের মনে যে অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল।
“আজও এই অন্ধকারের মধ্যে আমি চোখ মুদিলাম।” – বক্তা কে? ‘এই অন্ধকার’ বলতে সে কী বুঝিয়েছে? বক্তার চোখ বন্ধ করার কারণ গল্পাংশ অনুসরণে বুঝিয়ে দাও।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ গদ্যাংশের কথক নরেশ ওরফে নরু আলোচ্য উক্তিটির বক্তা।
অন্ধকারের তাৎপর্য – নরু তার কৈশোরের স্কুলজীবনের নানা ঘটনা ও সহপাঠীদের স্মৃতিচারণা করছিল। একা ঘরে বসে টেবিল-ল্যাম্পের আলো নিভিয়ে দিয়ে সে স্মরণ করছিল অতীতের দিনগুলিকে। ‘এই অন্ধকার’ বলতে সে বর্তমানের স্মৃতিচারণার সময়কে বুঝিয়েছে।
চোখ বন্ধ করার তাৎপর্য – নরুর স্কুলের মেধাবী সহপাঠী চন্দ্রনাথ প্রতি বছর পরীক্ষায় প্রথম হত, কিন্তু সেবার সে দ্বিতীয় হয়েছিল। দ্বিতীয় পুরস্কার নেওয়া তার ডিগনিটির পক্ষে শোভন নয় মনে করে সে তা প্রত্যাখ্যান করে। তার দাদা নিশানাথ তাকে প্রধানশিক্ষকের কাছে ক্ষমা চেয়ে প্রত্যাখ্যান পত্র ফিরিয়ে নিতে বলেন। এই নিয়ে দাদার সঙ্গে তার মতবিরোধ ও তর্কাতর্কি হয়। চন্দ্রনাথ কোনোমতেই তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেনি। শেষপর্যন্ত তার দাদা, ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখতে চাইলে চন্দ্রনাথ সেই বিচ্ছেদকেও নির্বিকারচিত্তে মেনে নেয়। ক্রোধে ও বেদনায় ক্ষতবিক্ষত মন নিয়ে নিশানাথ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর দৃষ্টিতে বেদনা ও ক্রোধের সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায়। সেখানে উপস্থিত নরু সমস্ত ঘটনার সাক্ষী ছিল। সেদিনের মতো আজও স্মৃতিচারণার সময় নিশানাথের করুণ দৃষ্টি এবং মুখটি মনের মধ্যে ফুটে ওঠায় নরু চোখ বন্ধ করল।
“উৎসবের বিপুল সমারোহ সেখানে।” – কোথায়, কেন অনুষ্ঠান হয়েছিল? অনুষ্ঠানটির পরিচয় দাও।
অনুষ্ঠান স্থান – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ রচনায় চন্দ্রনাথ ও নরেশের সহপাঠী হীরুর বাড়িতে অনুষ্ঠান হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত পরীক্ষায় স্কুলের মধ্যে হীরু সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে পাস করেছে। ভালো ফল করায় সে স্কলারশিপ পাবে। সেই আনন্দে ধনী হীরুদের বাড়িতে অনুষ্ঠান হয়েছিল।
অনুষ্ঠানের পরিচয় – হীরু ধনীর সন্তান, তাদের প্রচুর অর্থ। তাই তাদের বাড়িতে বিপুল সমারোহে সন্ধ্যাকালীন উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। হীরুর কাকা স্কুলের সেক্রেটারি। তিনি খুব শৌখিন মানুষ। জেলায় তাঁর খ্যাতি ছিল। তিনি নিজে চিনা লণ্ঠন ও রঙিন কাগজের মালা দিয়ে বাড়ির পাশের আমবাগানটা নিপুণভাবে সাজিয়েছিলেন। হীরুর সহপাঠীরা এবং স্কুলের প্রধানশিক্ষক ছাড়াও বহু বিশিষ্ট অতিথি নিমন্ত্রিত ছিলেন। দুজন ডেপুটি, ডি. এস. পি., স্থানীয় সাব রেজিস্ট্রার, থানার দারোগা এবং গ্রামের ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ ভদ্রজনেরা সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রধান শিক্ষক মহাশয় এসেছিলেন এন্ডির অর্থাৎ তসরের একটি চাদর গায়ে দিয়ে। আলোচ্য রচনার কথক নরেশও সেই প্রীতিভোজের অনুষ্ঠানে এসেছিল। আসেনি কেবল চন্দ্রনাথ। সেদিন সকালেই সে কাউকে না জানিয়ে গ্রাম ছেড়েছিল।
অন্ধকারের মধ্যে সুস্পষ্ট রূপ পরিগ্রহ করিয়া সম্মুখে দাঁড়াইল কিশোর চন্দ্রনাথ। — চন্দ্রনাথের যে রূপের বর্ণনা কথক দিয়েছেন তা নিজের ভাষায় লেখো। চন্দ্রনাথের স্বভাবের সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?
চন্দ্রনাথের রূপের বর্ণনা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চন্দ্রনাথ গল্পাংশে স্কুলের পাঠ শেষ করার বহু বছর পরে একদিন স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কথকের স্কুলজীবনের সহপাঠী চন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে। চন্দ্রনাথ ছিল এক দীর্ঘাকৃতি, সবল, সুস্থদেহের নির্ভীক কিশোর। তার মুখমণ্ডলের মধ্যেও ছিল অসাধারণত্ব। অদ্ভুত মোটা নাক; সামান্য চলাফেরাতেই তার সেই নাকের সামনের দিক ফুলে উঠত। তার বড়ো বড়ো চোখ, চওড়া কপাল আর কপালের মাঝখানে শিরা ফুলে তৈরি হত এক ত্রিশূল চিহ্ন—যা সামান্য উত্তেজনাতেই রক্তের চাপে ফুলে উঠত।
রূপের সঙ্গে চন্দ্রনাথের স্বভাবের সম্পর্ক – চেহারার মতো আচরণেও বিশেষত্ব ছিল চন্দ্রনাথের। প্রতিভা তার মধ্যে যেমন বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল, তেমনি অহংকারেরও প্রকাশ ঘটিয়েছিল। বিদ্যালয় সম্পাদকের বিশেষ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান কিংবা হেডমাস্টারমহাশয়কে “গুরুদক্ষিণার যুগ নেই আর” বলার মধ্যে এক ধরনের ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় হীরুর প্রথম হওয়া মানতে পারে না চন্দ্রনাথ। সে হীরুর বাড়িতে আয়োজিত প্রীতিভোজে হাজির হয় না; বরং চিঠি লিখে জানিয়ে দেয় যে হীরু স্কলারশিপ পাওয়ার জন্য উৎসব না করলেই পারত। আসলে শ্রেষ্ঠত্বের যে অহংকার তার মনের মধ্যে ছিল, সেখান থেকে সরে আসা চন্দ্রনাথের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
দুর্দান্ত চন্দ্রনাথের আঘাতে সমস্ত স্কুলটা চঞ্চল, বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছে। — চন্দ্রনাথ যে আঘাত করেছিল তার কারণ কী ছিল? এ জন্য তাকে কী ফলভোগ করতে হয়েছিল?
চন্দ্রনাথের আঘাত করার কারণ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চন্দ্রনাথ গল্পাংশে দ্বিতীয় স্থান লাভের পুরস্কার গ্রহণ না করার কথা জানিয়ে চন্দ্রনাথ স্কুলকে যে চিঠি দেয়, তাকেই এখানে আঘাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনোদিন দ্বিতীয় না হওয়ায় দ্বিতীয় পুরস্কার চন্দ্রনাথের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয় বলে চিঠিতে জানিয়েছিল সে। তার মনে হয়েছিল, প্রথম স্থানাধিকারী হীরুর সাফল্য সোজাপথে আসেনি। সে স্কুলের সম্পাদকের ভাইপো এবং স্কুলের জনৈক সহ-শিক্ষক তার বাড়িতে গৃহশিক্ষকতা করেন। তিনি হীরুকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখিয়ে দিয়েছেন। উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে। এরপরেও অঙ্ক পরীক্ষায় তিনটি অঙ্ক হীরু চন্দ্রনাথের খাতা থেকে টুকেছে। এসবের ফলেই হীরুর প্রথম হওয়া চন্দ্রনাথ মানতে পারেনি। তাই সে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে।
ফলভোগ – এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের চিঠি চন্দ্রনাথের জীবনেও বিড়ম্বনা ডেকে আনে। তার নির্বিরোধী দাদা চন্দ্রনাথকে চিঠি প্রত্যাহার করতে নির্দেশ দিলেও চন্দ্রনাথ তাতে রাজি হয় না। ক্ষমা চেয়ে হেডমাস্টার মহাশয়কে চিঠি লেখার প্রস্তাবও দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে চন্দ্রনাথ। শেষপর্যন্ত নিশানাথ চন্দ্রনাথের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করার কথা বলেন। কিন্তু এতেও তার মধ্যে কোনো চাঞ্চল্য দেখা যায় না। সে বলে যে, এই ব্যবস্থা তাকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করবে।
একে তুমি ডিগ্নিটি বল? তোমার অক্ষমতার অপরাধ! — কোন্ প্রসঙ্গে বক্তা এ কথা বলেছেন? বক্তা এখানে কী বোঝাতে চেয়েছেন?
প্রসঙ্গ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চন্দ্রনাথ গল্পাংশে চন্দ্রনাথ স্কুলের পরীক্ষায় দ্বিতীয় হলেও তার স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে। হেডমাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে চন্দ্রনাথের দাদা নিশানাথ বিষয়টি জানতে পারেন। চন্দ্রনাথের কাছে এরকম আচরণের কারণ জানতে চাওয়া হলে সে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়, “সেকেন্ড প্রাইজ নেওয়া আমি বিনিথ মাই ডিগ্নিটি বলে মনে করি।” কিন্তু সহজ-সরল নির্বিরোধী নিশানাথ তার ভাইয়ের এই আচরণ মানতে না পেরে মন্তব্যটি করেন।
বক্তব্য বিষয় – নিশানাথের একটা নিজস্ব জীবনদর্শন ছিল। চন্দ্রনাথ যে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছে, তাতে তাঁর মনে হয়েছে এতে প্রত্যক্ষভাবে প্রধানশিক্ষক এবং পরোক্ষভাবে শিক্ষকসমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থাকেই অপমান করা হয়েছে। তাঁর মতে, পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়ে পুরস্কার গ্রহণ না করলে শুধু যে চন্দ্রনাথেরই মর্যাদার হানি করা হবে তা নয়, বরং যে প্রথম হয়েছে তার সাফল্যকেও অস্বীকার করা হবে। এই দ্বিতীয় হওয়াটা একান্তভাবেই চন্দ্রনাথের ব্যর্থতা। এই সহজ সত্যকে স্বীকার করতে না পারার জন্যই নিশানাথ চন্দ্রনাথের ওপরে রেগে গিয়ে বলেন যে এটা তার অক্ষমতার অপরাধ।
চন্দ্রনাথের সহিত সংস্রব রাখিব না। মনে মনে সংকল্পটা দৃঢ় করিতেছিলাম। — কোন্ ঘটনার জন্য কথক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন? শেষপর্যন্ত চন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর মনোভাব কী হয়েছিল?
উদ্দিষ্ট ঘটনা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চন্দ্রনাথ গল্পাংশে স্কুলের পরীক্ষায় প্রথমবারের জন্য দ্বিতীয় হয়ে চন্দ্রনাথ যেসব আচরণ করছিল, সেগুলো কথক মেনে নিতে পারেননি। স্কুলকে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে চিঠি লেখা, গল্পের কথককে তৃতীয় বিভাগে পাস করার ভবিষ্যদ্বাণী করা ইত্যাদি কথকের পছন্দ হয়নি। কিন্তু যেভাবে পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের চিঠি ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য এবং প্রধানশিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য দাদার নির্দেশ চন্দ্রনাথ ঔদ্ধত্যের সঙ্গে অমান্য করে, তা কথককে বিস্মিত করে। যেভাবে অন্যের আবেগ-অনুভূতিকে মর্যাদা না দিয়ে চন্দ্রনাথ নিজের অহংবোধকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, তা কথকের ভালো লাগেনি বলেই তিনি চন্দ্রনাথের সাথে আর সম্পর্ক না রাখার কথা ভেবেছেন।
চন্দ্রনাথ সম্পর্কে কথকের মনোভাব – চন্দ্রনাথ সম্পর্কে কথকের এই মনোভাব ছিল সাময়িক। চন্দ্রনাথ সম্পর্কে কথকের মনের মধ্যে এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ ছিল। কারণ, তার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কথক নরেশের কোনো সন্দেহ ছিল না। তাই যখন চন্দ্রনাথকে পিছনে ফেলে হীরু স্কলারশিপ পায়, তখন তা কথক মানতে পারেন না। তাঁর মনে হয় যে চন্দ্রনাথ ও হীরুর মধ্যে অনেক প্রভেদ আছে। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে চলা চন্দ্রনাথের সঙ্গে কালপুরুষ নক্ষত্রের তুলনার মধ্যে কথকের তার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের মনোভাবই প্রকাশ পায়।
চন্দ্রনাথের অনুমান অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়া গিয়াছে – চন্দ্রনাথের কোন্ অনুমান অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল? কোন্ বিষয়ে চন্দ্রনাথের অনুমান মেলেনি? এতে কথকের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?
চন্দ্রনাথের অনুমান – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চন্দ্রনাথ গল্পে স্কুলের পরীক্ষায় দ্বিতীয় হওয়ার পরে চন্দ্রনাথের অহংকারে আঘাত লাগে। এই সময় নিজের ঘরে বসে চন্দ্রনাথ নিজের মতো করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন্ন পরীক্ষার একটা সম্ভাব্য ফলাফল তৈরি করে। গল্পকথক নরু চন্দ্রনাথের কাছ থেকে সেই কাল্পনিক ফলাফল সম্পর্কে অবহিত হয়। তার মতে অনুযায়ী, চন্দ্রনাথ নিজে যদি সাড়ে পাঁচশো বা তার বেশি পায়, তাহলে স্কুলে অমিয় আর শ্যামাই শুধু ফেল করবে, বাকি সবাই পাস করবে। আর সে যদি পাঁচশো পঁচিশের কম পায়, তাহলে দশ জন ফেল করবে। আর কথক নরু থার্ড ডিভিশনে পাস করবে।
অনুমানে অমিল – পরীক্ষার ফল বেরোলে দেখা যায় চন্দ্রনাথের সব অনুমানই অক্ষরে অক্ষরে মিলেছে। দশটি ছেলে ফেল করেছে, কথক তৃতীয় বিভাগে কোনোরকমে পাস করেছে, চন্দ্রনাথও পাঁচশো পঁচিশ পায়নি। শুধু একটা অনুমানই মেলেনি — তাহল হীরু চন্দ্রনাথকে পিছনে ফেলে বেশি নম্বর পেয়েছে। কথকের প্রতিক্রিয়া – হীরুর চিঠিতে পরীক্ষার ফলাফল জেনে এবং হীরুর স্কলারশিপের খবর পেয়ে কথক নরু মনে মনে দুঃখিতই হয়েছিল। কারণ সে মনে করেছিল যে চন্দ্রনাথের সঙ্গে হীরুর মেধাগত অনেক পার্থক্য আছে। চন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে নরুর মনে কখনোই কোনো সন্দেহ ছিল না—সে কথাও সে মুক্তকণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছে।
উৎসবের বিপুল সমারোহ সেখানে। — কীসের জন্য উৎসব? উৎসবটির বর্ণনা দাও। এই উৎসব সম্পর্কে চন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
উৎসবের কারণ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চন্দ্রনাথ গল্পাংশে হীরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় প্রথম হওয়ায় এবং স্কলারশিপ পাওয়ায় তার বাড়িতে প্রীতিভোজের আয়োজন হয়েছিল। উৎসবের বর্ণনা – উৎসব উপলক্ষ্যে হীরুর বাড়ি খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল। অর্থের প্রাচুর্যের সঙ্গে শৌখিনতার মিশেলে উৎসবটি হয়ে উঠেছিল বর্ণময়। চিনা লণ্ঠন এবং রঙিন কাগজের মালায় নিপুণভাবে বাড়ির পাশের আমবাগানটিকে সাজানো হয়েছিল। প্রীতিভোজের এই অনুষ্ঠানে সরকারি উচ্চপদে থাকা ব্যক্তি-সহ গ্রামের কর্তাব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। দুজন ডেপুটি, ডিএসপি, স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রার, থানার দারোগা এবং গ্রামের ব্রাহ্মণ, কায়স্থ অর্থাৎ উচ্চবর্গীয় মানুষেরা সকলেই প্রায় এই উৎসবে উপস্থিত হয়েছিলেন।
উৎসব সম্পর্কে চন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়া – স্কুলের পরীক্ষাতেই হীরুর প্রথম এবং তার নিজের দ্বিতীয় হওয়াকে চন্দ্রনাথ মেনে নিতে পারেনি। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় তাকে পিছনে ফেলে হীরুর স্কলারশিপ পাওয়া তাকে আহত করে। প্রীতিভোজের অনুষ্ঠানে হীরুর নিমন্ত্রণে সাড়া না দিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় সে একটা চিঠি হীরুকে দিয়ে যায়। তাতে হীরুর সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করেও লেখা ছিল যে স্কলারশিপ এমন কোনো বড়ো সাফল্য নয়, যার জন্য উৎসব করতে হয়। এভাবে চন্দ্রনাথ নিজের বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল।
চিঠিখানা হীরুকে ফিরাইয়া দিলাম। — কোন্ চিঠির কথা বলা হয়েছে? চিঠিতে কী লেখা ছিল? এই চিঠির বিষয়ে হীরু কী বলেছিল?
উদ্দিষ্ট চিঠি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চন্দ্রনাথ গল্পাংশে হীরুর বাড়ির প্রীতিভোজে উপস্থিত না থাকতে পারার জন্য চন্দ্রনাথ হীরুকে যে চিঠি লিখে রেখে গিয়েছিল, সেই চিঠির কথাই এখানে বলা হয়েছে। চিঠির বিষয়: চিঠির শুরুতেই হীরুকে প্রথমে “প্রিয়বরেষু” সম্বোধন করলেও পরে চন্দ্রনাথ সেটি কেটে “প্রীতিভাজনেষু” লেখে। চিঠিতে হীরুর সাফল্যে সে আনন্দ প্রকাশ করলেও তার মধ্যে কোনো আন্তরিকতার ছোঁয়া ছিল না। বরং স্কলারশিপ পাওয়াটা এমন বড়ো সাফল্য নয় যে তার জন্য উৎসব করতে হবে বলে সে হীরুর সাফল্যকে উপেক্ষা করতে চেয়েছিল। হীরুর বাড়িতে উপস্থিত থাকতে না পারার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেয় চন্দ্রনাথ।
চিঠির বিষয়ে হীরুর বক্তব্য – যদিও পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার বিষয়ে হীরু এবং চন্দ্রনাথের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল এবং চন্দ্রনাথের কাছে নিজের সাফল্যের স্বীকৃতি হীরু কোনোদিনই পায়নি—তা সত্ত্বেও চন্দ্রনাথের জন্য তার মনের মধ্যে একটা শ্রদ্ধার জায়গা ছিলই। সে কারণেই হীরু আন্তরিকভাবে চেয়েছিল চন্দ্রনাথ তার বাড়ির অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকুক। কিন্তু তা না হওয়ায় চন্দ্রনাথের লেখা চিঠিটিকেই হীরু এক পরমপ্রাপ্তি বলে মনে করে। চিঠিখানা নিজের কাছে রেখে দিয়ে সে বলে—”এইটেই আমার কাছে তার স্মৃতিচিহ্ন।”
চন্দ্রনাথের সঙ্গে তার বন্ধুদের সম্পর্কটি চন্দ্রনাথ গল্প অবলম্বনে আলোচনা করো।
চন্দ্রনাথ ও বন্ধুদের সম্পর্ক – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চন্দ্রনাথ গল্পের কেন্দ্রে আছে তিন সহপাঠী বন্ধু — চন্দ্রনাথ, হীরু এবং গল্পকথক নরু বা নরেশ।
চন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি – তিন বন্ধুর সম্পর্ক চন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চন্দ্রনাথকে দেখলে মনে হয়েছে সে কোনো সম্পর্ক নিয়ে নয়, শুধু নিজেকে নিয়েই ভাবিত। তাই স্কুলের পরীক্ষায় চন্দ্রনাথ প্রথমবার দ্বিতীয় হলে হীরুর প্রথম হওয়ার সাফল্যকে সে মেনে নিতে পারেনি। হীরুর বিরুদ্ধে সে অসদুপায় অবলম্বনেরও অভিযোগ এনেছে। এমনকি হীরু স্কলারশিপ পাওয়ার পরে উৎসব করলে নিমন্ত্রণ সত্ত্বেও সে তাতে যোগ দেয়নি; বরং চিঠি লিখে বলেছে – “এ উৎসবটা না করিলেই পারিতে। স্কলারশিপটা কী এমন বড়ো জিনিস!”
চন্দ্রনাথের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি – অপরদিকে, হীরু এবং কথকের মনে চন্দ্রনাথের সম্পর্কে শুধু প্রীতি নয়, শ্রদ্ধার বোধও বজায় ছিল। চন্দ্রনাথের তৈরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলে চন্দ্রনাথ তাকে নিজের তুলনায় খারাপ অবস্থানে রাখলে ক্রুদ্ধ নরু কামনা করেছে — “এই দাম্ভিকটা যেন ফেল হয়।” কিন্তু গল্পের শেষে হীরু স্কলারশিপ পেলেও নরু অকপটেই স্বীকার করেছে যে চন্দ্রনাথ হীরুর তুলনায় শ্রেষ্ঠ। অন্যদিকে হীরুও চন্দ্রনাথকে মন থেকেই বন্ধু বলে ভাবত। তাই হীরুর অনুষ্ঠানে চন্দ্রনাথ অনুপস্থিত থাকলেও তার রেখে যাওয়া চিঠিকে হীরু বন্ধুর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দেয়।
চন্দ্রনাথ গল্পে চন্দ্রনাথের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
চন্দ্রনাথের চরিত্র –
বৈশিষ্ট্য – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চন্দ্রনাথ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র চন্দ্রনাথ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে অহংকারী এক কিশোর।
- অহংকারী – তাই স্কুলের পরীক্ষায় হীরুর প্রথম হওয়া এবং নিজের দ্বিতীয় হওয়াকে সে মানতে পারে না। হীরুর বিরুদ্ধে অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগ আনে চন্দ্রনাথ। নিজেকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে দেখতে সে এতটাই ভালোবাসে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার কাল্পনিক ফলাফলও তৈরি করে চন্দ্রনাথ এবং সেখানে নিজের নম্বরের অনুপাতে বাকিদের ফলাফলও ঠিক করে ফেলে।
- দাম্ভিকতা – চন্দ্রনাথের মধ্যে ঔদ্ধত্যের প্রকাশ ঘটে যখন সে স্কুলকে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে চিঠি দেয়। প্রধানশিক্ষককে উদ্দেশ্য করে “গুরুদক্ষিণার যুগ আর নেই” বলার মধ্যে তার এই দাম্ভিকতাই ফুটে ওঠে। এক্ষেত্রে নিজের দাদার নির্দেশও সে শুধু অমান্য করেনি, দাদার সঙ্গে সম্পর্কের বিচ্ছেদও ঘটিয়েছে। তাই হীরুর কাকার বিশেষ পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাবকে চন্দ্রনাথের অপমানজনক বলে মনে হয়েছে।
- সৌজন্যতার অভাব – অহংকারের কারণেই হীরুর বাড়ির প্রীতিভোজে আমন্ত্রণ পেয়েও চন্দ্রনাথ হাজির হয়নি, বরং স্কলারশিপ পাওয়ার মতো সামান্য কারণে অনুষ্ঠান করার প্রয়োজন ছিল না বলে চিঠি লিখে রেখে গেছে। সব মিলিয়ে অহংকার, চূড়ান্ত আত্মমর্যাদা এবং চরম আত্মকেন্দ্রিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে চন্দ্রনাথ চরিত্রটি।
চন্দ্রনাথ গল্পে হীরুর চরিত্রটি যেভাবে পাওয়া যায় লেখো।
গল্পে হীরুর চরিত্র – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চন্দ্রনাথ গল্পাংশে হীরু পার্শ্বচরিত্র হলেও একটি বিশিষ্ট চরিত্র।
- মেধা – চন্দ্রনাথের পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার একচেটিয়া সাফল্যকে দূরে সরিয়ে সে স্কুলের পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে এবং এটা যে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, তা প্রমাণিত হয়েছে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাতেও সে চন্দ্রনাথকে পিছনে ফেলে স্কলারশিপ পেয়েছে।
- সৌজন্যবোধ – চন্দ্রনাথ নানাভাবে হীরুর স্কুলের পরীক্ষায় প্রথম হওয়াকে তাচ্ছিল্য করেছে, অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগ এনেছে। কিন্তু হীরুর তরফ থেকে তার সাফল্যের জন্য চন্দ্রনাথকে ছোটো করার কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। বরং হীরু চন্দ্রনাথকে তার কাকার দেওয়া বিশেষ পুরস্কারের কথা বলে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছে।
- বন্ধুপ্রীতি – স্কলারশিপ পাওয়া উপলক্ষ্যে হীরুর বাড়িতে আয়োজিত প্রীতিভোজে চন্দ্রনাথ উপস্থিত থাকুক, এটা সে আন্তরিকভাবেই চেয়েছিল। চন্দ্রনাথের চলে যাওয়া তাকে কষ্ট দিয়েছিল। চন্দ্রনাথ সম্পর্কে হীরুর বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব কতটা আন্তরিক ছিল, তা বোঝা যায় যখন হীরুর উদ্দেশে লেখা চন্দ্রনাথের শ্লেষাত্মক চিঠিটিকেও সে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দিতে চেয়েছিল। ধনীর সন্তান হলেও এবং আইসিএস হওয়ার মতো উচ্চাশা থাকলেও হীরুর চরিত্রে সৌজন্য ও সহৃদয়তার এক মিশ্রণ ঘটেছিল।
চন্দ্রনাথ পাঠ্য অবলম্বনে চন্দ্রনাথের দৈহিক বিবরণ দাও। তাকে কালপুরুষ নক্ষত্রের সঙ্গে তুলনা করার কারণ নির্ণয় করো।
চন্দ্রনাথের দৈহিক বর্ণনা – চন্দ্রনাথ পাঠ্যাংশে চন্দ্রনাথ ছিল এক দীর্ঘাকৃতি, সবল, সুস্থদেহের অধিকারী নির্ভীক কিশোর। তার মুখের গড়ন ছিল অসাধারণ। প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করত চন্দ্রনাথের অদ্ভুত মোটা নাক, সামান্যমাত্র চাঞ্চল্যেই যার অগ্রভাগ ফুলে ওঠে। বড়ো বড়ো চোখ, চওড়া কপাল, আর কপালের ঠিক মাঝখানে শিরা যেন ত্রিশূলের চেহারা নিয়েছিল। সামান্য উত্তেজনাতেই রক্তের চাপ প্রবল হলে ওই শিরা ফুলে উঠত।
কালপুরুষ নক্ষত্রের সঙ্গে তুলনার কারণ – জীবনপথে চন্দ্রনাথ ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক চরিত্র। পরীক্ষায় দ্বিতীয় হওয়া সে মেনে নিতে পারে না। স্কুলের পুরস্কারকে অনায়াসে প্রত্যাখ্যান করে। স্পর্ধার সঙ্গে বলে, “সেকেন্ড প্রাইজ নেওয়া আমি বিনিথ মাই ডিগ্নিটি বলে মনে করি।” আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য সে দাদার নির্দেশ অমান্য করতে দ্বিধা করে না, এমনকি তার সঙ্গে সম্পর্কও ছেদ পড়ে। হেডমাস্টারমশাইয়ের ডাক ফিরিয়ে দিয়ে অনায়াসে ঔদ্ধত্যে বলে — “গুরুদক্ষিণার যুগ আর নেই।” বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় হীরুর ভালো ফলাফলের জন্য যখন উৎসব হয়, তাতে আমন্ত্রণ পেয়েও চন্দ্রনাথ তাতে যোগ দেয় না, বরং বলে — “এ উৎসবটা না করিলেই পারিতে। স্কলারশিপটা কী এমন বড়ো জিনিস!” লাঠির প্রান্তে পোঁটলা বেঁধে হয়তো জনহীন প্রান্তরে সকলের থেকে পৃথক হয়ে হারিয়ে যায় চন্দ্রনাথ — ঠিক যেমন রাতের আকাশে শিকারির মতো ভাস্বর হয়ে থাকে কালপুরুষ নক্ষত্র, বাকিদের থেকে সর্বদা স্বতন্ত্র হয়ে।
চন্দ্রনাথকে ঘিরে নরুর যে মুগ্ধতা ছিল তার পরিচয় দাও।
নরুর মুগ্ধতা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চন্দ্রনাথ গল্পে চন্দ্রনাথ ছিল গল্পকথক নরুর সহপাঠী। অত্যন্ত মেধাবী চন্দ্রনাথ সম্পর্কে নরুর ছিল গভীর শ্রদ্ধাবোধ। তাই জীবনে প্রথমবার দ্বিতীয় হয়ে সে যখন পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে, তখন শ্রদ্ধাবশত নরু বলে — “তাঁহার কথা অবহেলা করিতে পারিলাম না।” চন্দ্রনাথ নরুকে তাঁর ঘরে অভ্যর্থনা না করলেও নরু রেগে যায় না। বরং সে “তাহার স্বভাব নয়” বলে বিষয়টিকে হালকা করতে চায়। যদিও চন্দ্রনাথের তৈরি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাল্পনিক ফলাফল নরুকে ক্ষুব্ধ করে, কিংবা চন্দ্রনাথের তার দাদার প্রতি ব্যবহারকে নরু ভালোভাবে মেনে নিতে পারে না, কিন্তু তাতে চন্দ্রনাথের প্রতি তার মুগ্ধতায় কোনো খামতি হয়নি। ইউনিভার্সিটির পরীক্ষায় হীরু চন্দ্রনাথকে পিছনে ফেললে নরু দুঃখিত হয়েছে, নিজের মনেই বলেছে — “সত্য বলিতে কী চন্দ্রনাথ ও হীরুতে অনেক প্রভেদ। চন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠত্বে আমার অন্তত সন্দেহ ছিল না।” চন্দ্রনাথ যখন এই ব্যর্থতার পরে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে, তখনও নরু কল্পনা করেছে — চন্দ্রনাথ লাঠির প্রান্তে পোঁটলা বেঁধে একা জনহীন পথে চলেছে। দু-পাশের প্রান্তর যেন পিছনের দিকে চলেছে, মাথার ওপরে গভীর নীল আকাশে ছায়াপথ, পাশে কালপুরুষ নক্ষত্র সঙ্গে চলেছে। এই কল্পনাও আসলে চন্দ্রনাথের প্রতি নরুর মুগ্ধতারই আর-এক প্রকাশ।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের ষষ্ঠ পাঠের তৃতীয় অধ্যায়, ‘চন্দ্রনাথ’ -এর কিছু রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নোত্তরগুলো নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নবম শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে এসেছে। যদি আপনার কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।
মন্তব্য করুন