নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জীবন সংগঠনের স্তর – কলা – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

Rahul

এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘জীবন সংগঠনের স্তর’ -এর অন্তর্গত ‘কলা’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

জীবন সংগঠনের স্তর – কলা – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর
Contents Show

বহুকোশী জীবদেহে গঠনগত স্তরগুলি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।

বহুকোশী জীবদেহ অনেক কোশ দ্বারা গঠিত। কোশগুলির মধ্যে শ্রমবিভাজনের মাধ্যমে বহুকোশী জীব সফলভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকে। কোশ থেকে শুরু করে জীবদেহ গঠন পর্যন্ত বিভিন্ন সাংগঠনিক স্তর বর্তমান। এগুলি হল – কোশস্তর → কলাস্তর → অঙ্গস্তর → অঙ্গতন্ত্রস্তর → বহুকোশী জীবদেহ।

  1. কোশস্তর (Cellular Level) – সজীব জীবদেহের সবচেয়ে নীচের স্তর হল কোশ (Cell)। কোশ পর্দাবৃত সজীব প্রোটোপ্লাজম দ্বারা গঠিত। কোশ জীবনের গঠনগত এবং কার্যগত একক ও স্বাধীনভাবে নিজ অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম। বহুকোশী জীবদেহে কয়েক মিলিয়ন কোশ শ্রমবিভাজনের মাধ্যমে জীবনের বহুমুখী কাজগুলি সম্পন্ন করে।
  2. কলাস্তর (Tissue Level) – বহুকোশী জীবদেহে একটি নির্দিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত কোশসমষ্টিকে একত্রে কলা (Tissue) বলে। উদ্ভিদদেহে কলা গঠনকারী কোশগুলি সম বা বিষম আকারযুক্ত হয় এবং প্রাণীদেহে কলাগঠনকারী কোশগুলি একই আকারযুক্ত হয়ে থাকে।
  3. অঙ্গস্তর (Organ Level) – বহুকোশী জীবদেহে একাধিক কলা মিলিতভাবে একটি নির্দিষ্ট কাজ করে এবং অঙ্গস্তরে পরিস্ফুরণ ঘটায়। যেমন – হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, পাকস্থলী প্রভৃতি (প্রাণীদেহে) এবং মূল, কাণ্ড, পাতা প্রভৃতি (উদ্ভিদদেহে)।
  4. অঙ্গতন্ত্রস্তর (Organ-system Level) – বহুকোশী জীবদেহে অনেকগুলি অঙ্গ মিলিতভাবে একটি নির্দিষ্ট কাজ করে ও অঙ্গতন্ত্রস্তরে পরিস্ফুরণ ঘটায়। যেমন – প্রাণীদেহে পাকস্থলী, যকৃৎ, অন্ত্র মিলিতভাবে পরিপাকতন্ত্র গঠন করে। উদ্ভিদদেহে মূলতন্ত্র ও বিটপতন্ত্র গঠিত হয়।
  5. জীবদেহস্তর (Organisms Level) – অনেকগুলি অঙ্গতন্ত্র মিলিতভাবে জীবদেহ গঠন করে। অঙ্গতন্ত্রগুলি জীবের যাবতীয় কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করে।
বহুকোশী জীবদেহে গঠনগত স্তরগুলি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও

উদ্ভিদ কলা কাকে বলে? উদ্ভিদ কলার শ্রেণিবিভাগ করো।

উদ্ভিদ কলা (Plant Tissue) – উদ্ভিদদেহে উৎপত্তিগতভাবে এক সম বা বিষম আকৃতির কোশসমষ্টি মিলিতভাবে একটি নির্দিষ্ট কাজ করলে, তাদের একত্রে উদ্ভিদ কলা বলে।

উদ্ভিদ কলার শ্রেণিবিভাগ –

উদ্ভিদ কলার শ্রেণিবিভাগ

ভাজক কলা কাকে বলে? ভাজক কলার গঠনগত বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো। এই কলার কাজ কী?

ভাজক কলা (Meristematic Tissue; meristos = বিভাজনক্ষম) – উদ্ভিদের মূল ও কাণ্ডের অগ্রভাগে অবস্থিত একই প্রকার বিভাজনক্ষম যে অপরিণত কলার কোশগুলি ক্রমাগত বিভাজিত হয়ে নতুন কোশ সৃষ্টি করে, তাকে ভাজক কলা বলে।

ভাজক কলার বৈশিষ্ট্য –

  1. কোশের প্রকৃতি – কোশগুলি সজীব, অপরিণত এবং বিভাজনের মাধ্যমে নতুন কোশ সৃষ্টি করে। প্রত্যেকটি কোশে একটি করে সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস বর্তমান।
  2. আন্তঃকোশীয় স্থান – সজীব কোশগুলি ঘনসন্নিবিষ্টভাবে অবস্থান করে, ফলে কোনো কোশান্তর রন্ধ্র থাকে না।
  3. কোশের আকার – কোশের আকৃতি গোলাকার, ডিম্বাকার বা বহুভুজাকার হয়।
  4. কোশপ্রাচীর – কোশপ্রাচীর পাতলা, স্থিতিস্থাপক ও সেলুলোজ নির্মিত হয়।
  5. কোশের উপাদান –
    • কোশে বড়ো ও সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস ও ঘন সাইটোপ্লাজম থাকে। সাধারণত ভ্যাকুওল থাকে না বা থাকলেও ছোটো।
    • প্লাসটিড প্রোপ্লাসটিড অবস্থায় থাকে।
    • কোশে সঞ্চিত খাদ্য বা রেচন পদার্থ থাকে না।
    • কোশের কার্যক্ষমতা সংশ্লেষমূলক কাজ ও শ্বসনের হার কোশে বেশি থাকে।
ভাজক কলার গঠন

ভাজক কলার কাজ –

  1. এই কলা ক্রমাগত মাইটোসিস পদ্ধতিতে বিভাজিত হয়ে উদ্ভিদ অঙ্গের বৃদ্ধি ঘটায়।
  2. দেহে নতুন অঙ্গ উৎপাদনে (নতুন পাতা, শাখা, কাক্ষিক মুকুল) ও স্থায়ী কলা উৎপাদনে সাহায্য করে।
  3. ভাজক কলার দ্বারা উদ্ভিদের ক্ষতস্থান পূরণ হয়।
  4. ঘাসজাতীয় উদ্ভিদকে প্রবল বায়ুপ্রবাহের সময় খাড়া হয়ে দাঁড়াতে পার্শ্বস্থ ভাজক কলা সাহায্য করে।

ভাজক কলার অবস্থান লেখো ও অবস্থান অনুযায়ী ভাজক কলার শ্রেণিবিভাগ করো।

ভাজক কলার অবস্থান –

  1. ভাজক কলা উদ্ভিদের বর্ধনশীল অঞ্চলে বিশেষ করে কাণ্ড, মূল, শাখা প্রভৃতির অগ্রভাগে উপস্থিত থাকে।
  2. পাতা ও ফুলের কুঁড়িতে ভাজক কলা থাকে।
  3. ব্যক্তবীজী ও গুপ্তবীজী উদ্ভিদের নালিকা বান্ডিলে ক্যাম্বিয়াম নামক গৌণ ভাজক কলা বর্তমান।

অবস্থান অনুযায়ী ভাজক কলার শ্রেণিবিভাগ –

অবস্থান অনুযায়ী ভাজক কলার শ্রেণিবিভাগ
  1. অগ্রস্থ ভাজক কলা (Apical Meristem) – যে ভাজক কলা বর্ধনশীল উদ্ভিদ অঙ্গের শীর্ষে বা অগ্রভাগে অবস্থান করে, তাকে অগ্রস্থ ভাজক কলা বলে।
    • অবস্থান – মূল, কাণ্ড ও শাখার শীর্ষে, কাক্ষিক মুকুলে।
    • কাজ – মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজনের মাধ্যমে উদ্ভিদঅঙ্গের দৈর্ঘ্যবৃদ্ধি ঘটায় অর্থাৎ, প্রাথমিক বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত।
  2. নিবেশিত ভাজক কলা (Intercalary Meristem) – যে ভাজক কলা বর্ধনশীল উদ্ভিদঅঙ্গে দুটি স্থায়ী কলাস্তরের মাঝে অবস্থান করে, তাকে নিবেশিত ভাজক কলা বলে। এই কলা স্বল্পস্থায়ী।
    • অবস্থান – ঘাস, আখ, বাঁশ প্রভৃতির পর্বমধ্য, পাইনাসের পত্রমূলে এবং মিনট উদ্ভিদের পর্বের গোড়াতে উপস্থিত থাকে।
    • কাজ – মাইটোসিসের মাধ্যমে উদ্ভিদঅঙ্গের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করা।
  3. পার্শ্বস্থ ভাজক কলা (Lateral Meristem) – যে ভাজক কলা বর্ধনশীল উদ্ভিদ অঙ্গের পরিধি বরাবর অবস্থান করে, তাকে পার্শ্বস্থ ভাজক কলা বলে।
    • অবস্থান – দ্বিবীজপত্রী মূল ও কাণ্ডের পরিধিতে লম্বালম্বিভাবে অবস্থান করে।
    • কাজ – মাইটোসিসের মাধ্যমে উদ্ভিদের প্রস্থে বৃদ্ধি (গৌণবৃদ্ধি) ঘটায়। গৌণবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
অবস্থান অনুসারে ভাজককলার চিত্ররূপ

স্থায়ী কলা কাকে বলে? স্থায়ী কলা কয় প্রকার ও কী কী?

স্থায়ী কলা (Permanent Tissue) – ভাজক কলা থেকে উৎপন্ন বিভাজনক্ষমতাহীন পরিণত কোশযুক্ত কলাকে স্থায়ী কলা বলে।

স্থায়ী কলার প্রকারভেদ –

স্থায়ী কলা তিন প্রকার। যথা –

  1. সরল স্থায়ী কলা।
  2. জটিল স্থায়ী কলা।
  3. বিশেষ বা ক্ষরিত কলা।
  • সরল স্থায়ী কলা – যে স্থায়ী কলার কোশগুলি একই প্রকার কোশ দ্বারা গঠিত, সেই স্থায়ী কলাকে সরল স্থায়ী কলা (Simple Permanent Tissue) বলে। সরল স্থায়ী কলা আবার তিন প্রকার। যথা –
    • প্যারেনকাইমা।
    • কোলেনকাইমা।
    • স্ক্লেরেনকাইমা।
  • জটিল স্থায়ী কলা – যে স্থায়ী কলা দুই বা ততোধিক প্রকার কোশগুচ্ছ দ্বারা গঠিত, কোশগুলি নিজেদের মধ্যে সমন্বয়সাধন করে একটি সাধারণ কাজে লিপ্ত, সেই স্থায়ী কলাকে জটিল স্থায়ী কলা (Complex Permanent Tissue) বলে। জটিল স্থায়ী কলা প্রধানত দু-প্রকার। যথা –
    • জাইলেম।
    • ফ্লোয়েম।
  • বিশেষ কলা বা ক্ষরিত কলা (Special or Secretory Tissue) – উদ্ভিদদেহে অবস্থিত ক্ষরণ বা রেচনে অংশগ্রহণকারী কোশগুচ্ছকে বলা হয় বিশেষ কলা বা ক্ষরিত কলা। এই বিশেষ কলা থেকে গঁদ, রজন ও তরুক্ষীর জাতীয় পদার্থগুলি ক্ষরিত হয়।

বিশেষ কলা বা ক্ষরিত কলা (Special or Secretory Tissue) কী?

বিশেষ কলা বা ক্ষরিত কলা (Special or Secretory Tissue) – উদ্ভিদদেহে অবস্থিত ক্ষরণ বা রেচনে অংশগ্রহণকারী কোশগুচ্ছকে বলা হয় বিশেষ কলা বা ক্ষরিত কলা।

এই বিশেষ কলা থেকে গঁদ, রজন ও তরুক্ষীর জাতীয় পদার্থগুলি ক্ষরিত হয়।

বিভিন্ন কলার অবস্থান –

  • ল্যাটিসিফেরাস কোশ,
  • ক্ষীরনালি – ইউফরবিয়া (Euphorbia sp.),
  • গ্রন্থিরোম – বিছুটিগাছের পাতা (Utrica sp.),
  • পাচক গ্রন্থি – কলশপত্রী উদ্ভিদ (Nepenthes sp.),
  • মধুগ্রন্থি – কলশপত্রী উদ্ভিদের পত্রের কিনারায়,
  • রেচন গ্রন্থি – পাইন গাছ (Pinus sp.)।

স্থায়ী কলার অবস্থান উল্লেখ করো। স্থায়ী কলার গঠনগত বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো। এই কলার কাজ লেখো।

স্থায়ী কলার অবস্থান – উদ্ভিদের মূল ও কাণ্ডের ত্বকে, মজ্জায়, বহিত্ত্বক ও অন্তত্ত্বকে, দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের নালিকা বান্ডিলে স্থায়ী কলা অবস্থান করে।

স্থায়ী কলার বৈশিষ্ট্য –

  1. বিভাজন ক্ষমতা – কোশগুলি বিভাজনক্ষমতাহীন হয়।
  2. কোশের প্রকৃতি – এই কলার কোশগুলি জীবিত বা মৃত প্রকৃতির হয়। জীবিত কোশগুলি প্রোটোপ্লাজমযুক্ত এবং মৃত কোশগুলি প্রোটোপ্লাজমবিহীন।
  3. কোশপ্রাচীর – এই কলার কোশগুলির কোশপ্রাচীর কখনও পাতলা আবার কখনও পুরু হয়। পাতলা প্রাচীরে সেলুলোজ ও পেকটিন পদার্থ উপস্থিত। পুরু প্রাচীরে বিভিন্ন অলংকরণ দেখা যায়।
  4. কোশের আকার – কোশগুলি নির্দিষ্ট আকৃতিযুক্ত অর্থাৎ, গোলাকার, ডিম্বাকার বা বহুভুজাকার হয়।
  5. আন্তঃকোশীয় স্থান – এই কোশে কোশান্তর রন্ধ্র থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে।
  6. কোশীয় অঙ্গাণু – কোশ নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমযুক্ত বা বিহীন হয়। কোশে ভ্যাকুওল বর্তমান।

স্থায়ী কলার কাজ –

  1. এই কলা উদ্ভিদকে দৃঢ়তা প্রদান করে।
  2. স্থায়ী কলা উদ্ভিদে খাদ্য উৎপাদনে সাহায্য করে।
  3. খাদ্য ও জল সংবহনে সাহায্য করে।
  4. এই কলা খাদ্য ও জল সঞ্চয়েও সাহায্য করে।

প্যারেনকাইমা কাকে বলে? প্যারেনকাইমার কলার অবস্থান ও বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

প্যারেনকাইমা (Parenchyma; Para beside, enchyma = filling) –

যে সরল স্থায়ী কলার সজীব কোশগুলি সেলুলোজ নির্মিত পাতলা কোশপ্রাচীরযুক্ত, কোশান্তর রন্ধ্রযুক্ত ও গোলাকার, ডিম্বাকার বা বহুভুজাকার আকৃতিযুক্ত হয়, তাকে প্যারেনকাইমা বলে।

প্যারেনকাইমা কলার অবস্থান –

  1. উদ্ভিদের বিভিন্ন অঙ্গ যেমন – কাণ্ড, মূল, পাতা, ফুল, ফল ও বীজে উপস্থিত থাকে।
  2. মেসোফিল কলা, এপিডারমিস, কর্টেক্স, মজ্জা প্রভৃতি স্থানে প্যারেনকাইমা কলা থাকে।
  3. নালিকা বান্ডিলেও এই কলা বর্তমান।
প্যারেনকাইমা কলা

প্যারেনকাইমার বৈশিষ্ট্য –

  1. আকৃতি – কোশগুলি গোলাকার, ডিম্বাকার বা বহুভুজাকার।
  2. কোশপ্রাচীর – সেলুলোজ নির্মিত ও পাতলা।
  3. কোশীয় উপাদান – সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস, সাইটোপ্লাজম এবং বৃহৎ কেন্দ্রীয় ভ্যাকুওল বর্তমান।
  4. আন্তঃকোশীয় স্থান – কোশগুলির মাঝে কোশান্তর রন্ধ্র বর্তমান।

প্যারেনকাইমা কলার প্রকারভেদ সম্পর্কে ধারণা দাও। প্যারেনকাইমা কলার কাজগুলি লেখো।

প্যারেনকাইমা কলার প্রকারভেদ –

প্যারেনকাইমা কলার প্রকারভেদ

প্যারেনকাইমার কাজ –

  1. খাদ্য তৈরি – ক্লোরেনকাইমা সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরি করে, তাই একে পরিপোষক কলাও বলা হয়।
  2. খাদ্য ও জল সঞ্চয় – জাঙ্গল উদ্ভিদে প্যারেনকাইমা খাদ্য ও জল সঞ্চয়ে সাহায্য করে।
  3. যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান – প্যারেনকাইমা কলার কোশগুলি রসস্ফীত অবস্থায় উদ্ভিদের নরম অংশকে যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করে।
  4. বর্জ্যপদার্থ সঞ্চয় – ট্যানিন, রেজিন, গঁদ, কেলাস প্রভৃতি বিপাকজাত বর্জ্যপদার্থগুলি ইডিওব্লাস্ট কলাকোশে সঞ্চিত থাকে।
  5. প্লবতা দান – জলজ উদ্ভিদঅঙ্গে বর্তমান বায়ুপূর্ণ এরেনকাইমা উদ্ভিদকে জলে ভেসে থাকতে সাহায্য করে।
  6. ত্বক গঠন – উদ্ভিদদেহের ত্বক অর্থাৎ মূলে এপিব্লেমা, কাণ্ডে ও পাতায় এপিডারমিস গঠনে সাহায্য করে।
  7. পরিবহণ – জাইলেমে ও ফ্লোয়েমে বর্তমান প্যারেনকাইমা উদ্ভিদদেহে পরিবহণে অল্প সাহায্য করে।
  8. অন্যান্য কাজ – এ ছাড়া প্যারেনকাইমা প্রতিরক্ষা, ক্ষত নিরাময়, মুকুল সৃষ্টি ও বংশবিস্তারে সাহায্য করে।

কোলেনকাইমা কাকে বলে? এই কলার অবস্থান, গঠন ও কাজগুলি লেখো।

কোলেনকাইমা (Collenchyma; Kolla = glue, enchyma = tissue) – যে-সমস্ত সরল কলার কোশগুলি অসমভাবে স্থূল কোশপ্রাচীরযুক্ত গোলাকার, বেলনাকার বা বহুভুজাকার এবং যাদের কোশান্তর স্থান সাধারণত সেলুলোজ বা লিগনিন বা পেকটিন দিয়ে পরিপূর্ণ থাকে, তাদের কোলেনকাইমা কলা বলে।

কোলেনকাইমা কলার প্রস্থচ্ছেদ

কোলেনকাইমার অবস্থান – দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদে এপিডারমিসের নীচে অধস্ত্বকে, পত্রবৃন্তে, দ্বিবীজপত্রী পাতার মধ্যশিরাতে কোলেনকাইমা উপস্থিত থাকে (একবীজপত্রী উদ্ভিদের পাতা ও কাণ্ডে কোলেনকাইমা থাকে না)।

কোলেনকাইমার গঠনগত বৈশিষ্ট্য –

  1. আকার – সজীব কোশগুলি গোলাকার, বেলনাকার বা বহুভুজাকার।
  2. কোশপ্রাচীর – অসমভাবে স্থূল। অতিরিক্ত সেলুলোজ, পেকটিন, লিগনিন সঞ্চয়ের ফলে কৌণিক অঞ্চল বেশি স্থূল থাকে।
  3. কোশান্তর রন্ধ্র – কোশান্তর রন্ধ্র থাকে না বা থাকলেও খুব কম।
  4. কোশীয় উপাদান – কোশে সুষ্পষ্ট নিউক্লিয়াস, প্রচুর সাইটোপ্লাজম ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্লোরোপ্লাস্ট থাকে। কোশে স্পষ্ট ও বড়ো কোশগহ্বর উপস্থিত থাকে।
  5. প্রসারণশীলতা – এই কলার কোশগুলি প্রসারণক্ষম। পরিণত কোলেনকাইমার কোশ অপরিণত কোশের তুলনায় কম নমনীয় হয়। তাই পরিণত কোশ অপেক্ষাকৃত ভঙ্গুর প্রকৃতির।

কোলেনকাইমার কাজ –

  1. যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান – দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদে যান্ত্রিক দৃঢ়তা ও স্থিতিস্থাপকতা (flexibility) প্রদান করে।
  2. বৃদ্ধি – উদ্ভিদ অঙ্গের বৃদ্ধি ও দীর্ঘীকরণে সাহায্য করে।
  3. সঞ্চয় – কোশের মধ্যে খাদ্য সঞ্চয়ে সাহায্য করে।
  4. সালোকসংশ্লেষ – ক্লোরোপ্লাস্টযুক্ত কোলেনকাইমা সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরি করে।

গঠনগত দিক দিয়ে কোলেনকাইমা কলা কয় প্রকার ও কী কী

গঠনগত দিক দিয়ে কোলেনকাইমা কলা তিন প্রকার।

  • কৌণিক কোলেনকাইমা – কোশের কোণগুলি কেবল পুরু হয়। যেমন – লাউ, কুমড়ো, ধুতুরার কাণ্ড।
  • কূপাকৃতি কোলেনকাইমা – কোশান্তর রন্ধ্র বড়ো হয় ও রন্দ্রসংলগ্ন প্রাচীর অধিক স্থূল হয়। যেমন – আকন্দর কাণ্ড।
  • স্তরীভূত কোলেনকাইমা – কোশান্তর রন্ধ্র থাকে না ও স্থূলীভবন কোশের পৃষ্ঠপ্রাচীরে সমান্তরালভাবে স্তরে স্তরে ঘটে। যেমন – ঘেঁটু কাণ্ডের অধত্ত্বক।

স্ক্লেরেনকাইমা কাকে বলে? এই কলার অবস্থান, গঠনবৈশিষ্ট্য ও কাজগুলি লেখো।

স্ক্লেরেনকাইমা (Sclerenchyma; scleros = hard, enchyma = tissue) – যে-সমস্ত সরল স্থায়ী কলা মৃত ও লিগনিফায়েড স্থূল কোশপ্রাচীরযুক্ত এবং প্রোটোপ্লাজম ও কোশান্তর রন্ধ্রবিহীন কোশবিশিষ্ট হয়, তাকে স্ক্লেরেনকাইমা বলে।

স্ক্লেরেনকাইমাকলার প্রস্থচ্ছেদ

স্ক্লেরেনকাইমার অবস্থান – একবীজপত্রী উদ্ভিদের অধত্ত্বকে, নালিকা বান্ডিলের চারপাশে, জাইলেম ও ফ্লোয়েম কলায়, শক্ত বীজত্বকে, আপেল, পেয়ারা, ন্যাসপাতি প্রভৃতি ফলের শাঁসে স্ক্লেরেনকাইমা উপস্থিত থাকে।

স্ক্লেরেনকাইমার গঠনগত বৈশিষ্ট্য –

  1. আকার – কোশগুলি প্রধানত দীর্ঘ, গোলাকার, ডিম্বাকার বা তারকাকার এবং দু-প্রান্ত ছুঁচোলো।
  2. কোশপ্রাচীর – লিগনিন সমৃদ্ধ, সমভাবে স্থূল, সরল ও সপাড় কূপযুক্ত হয়।
  3. কোশীয় উপাদান – কোশ প্রোটোপ্লাজমবিহীন অর্থাৎ, কোশগুলি মৃত।
  4. কোশান্তর রন্ধ্র – কোশগুলি ঘনসন্নিবিষ্ট থাকার জন্য কোশান্তর রন্ধ্র অনুপস্থিত।
  5. প্রকারভেদ – স্ক্লেরেনকাইমা তন্তু জাইলেম কলার সঙ্গে অবস্থিত থেকে কাষ্ঠল তন্তু এবং ফ্লোয়েম কলার সঙ্গে অবস্থিত থেকে বাস্ট তন্তু গঠন করে।
  6. উদাহরণ – পাট, শণ ইত্যাদি স্ক্লেরেনকাইমা তন্তুর উদাহরণ।

স্ক্লেরেনকাইমার কাজ –

  1. যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান – উদ্ভিদ অঙ্গকে যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করে এবং উদ্ভিদ অঙ্গকে চাপ ও টান সহ্য করতে সাহায্য করে।
  2. সুরক্ষা দান – বীজত্বকে ও ফলত্বকে অবস্থান করে স্ক্লেরেনকাইমা তন্তু ফল ও বীজের বিস্তারে সাহায্য করে।
  3. অর্থনৈতিক গুরুত্ব – পাট, শণ, হেম্প ও নারকেলের ছোবড়াতে মৃত স্ক্লেরেনকাইমা তন্তু থাকে এবং এগুলি দড়ি, চট, থলি, কার্পেট প্রভৃতি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

জাইলেম কাকে বলে? জাইলেমের উপাদানগুলির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও। জাইলেমের অবস্থান ও কাজ লেখো।

জাইলেম (Xylem) – যেসব জটিল স্থায়ী কলার মাধ্যমে মাটি থেকে মূলরোম দ্বারা শোষিত জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ উদ্ভিদের পাতায় পরিবাহিত হয়, তাকে জাইলেম বলে।

জাইলেমের উপাদান –

জাইলেম কলায় চার রকমের উপাদান বর্তমান। যথা –

  1. ট্র্যাকিড (Tracheid) –
    • লম্বা, মৃত, সপাড় কূপযুক্ত কোশ দ্বারা গঠিত।
    • কোশপ্রাচীর লিগনিন সঞ্চয়ের ফলে অসমভাবে স্থূল।
  2. ট্র্যাকিয়া বা জাইলেম বাহিকা (Trachea or Xylem Vessel) –
    • নলাকার, প্রান্তপ্রাচীরবিহীন মৃত কোশ দ্বারা গঠিত।
    • পার্শ্বপ্রাচীর লিগনিনযুক্ত ও স্থূল।
  3. জাইলেম তন্তু (Xylem Fibre) –
    • জাইলেম কলায় অবস্থিত মৃত স্ক্লেরেনকাইমা তন্তু।
    • কোশগুলি লম্বা ও ছুঁচোলো এবং কোশপ্রাচীর স্থূল ও সপাড় কূপযুক্ত।
  4. জাইলেম প্যারেনকাইমা (Xylem Parenchyma) –
    • জাইলেম কলাস্থিত সজীব, পাতলা কোশপ্রাচীরযুক্ত প্যারেনকাইমা কোশ।
    • কোশগুলি লিপিড, শ্বেতসার বা ট্যানিন সঞ্চয় করে।
জাইলেমের বিভিন্নঅংশ

জাইলেমের অবস্থান – একবীজপত্রী ও দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের নালিকা বান্ডিলে অবস্থান করে।

জাইলেমের কাজ – উদ্ভিদের মূলরোমের সাহায্যে শোষিত জল ও জলে মিশ্রিত খনিজ লবণ জাইলেম বাহিকার মাধ্যমে ঊর্ধ্বমুখে বাহিত হয়।

ফ্লোয়েম কাকে বলে? ফ্লোয়েমের উপাদানগুলির সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও। ফ্লোয়েমের অবস্থান ও কাজ লেখো।

ফ্লোয়েম (Phloem, phloeis = inner bark) – যেসব জটিল স্থায়ী কলার মাধ্যমে পাতায় তৈরি খাদ্য উদ্ভিদদেহের সর্বত্র পরিবাহিত হয়, তাকে ফ্লোয়েম কলা বলে।

ফ্লোয়েম কলার উপাদালসমূহ –

ফ্লোয়েম কলায় চার প্রকার উপাদান বর্তমান। যথা –

  1. সীভনল বা সীভকোশ (Sieve tube or Sieve cell) –
    • নিউক্লিয়াসবিহীন, সজীব, নলাকার কোশ দ্বারা গঠিত।
    • সেলুলোজ নির্মিত পাতলা কোশপ্রাচীর বর্তমান।
    • একটির পর একটি কোশ সজ্জিত হয়ে নলের আকার ধারণ করে।
    • দুটি কোশের মধ্যবর্তী প্রস্থপ্রাচীর ছিদ্রযুক্ত হয়, একে চালুনিচ্ছদা বা সীভপ্লেট বলে।
  2. সঙ্গীকোশ (Companion Cell) –
    • সীভনল সংলগ্ন প্রোটোপ্লাজমযুক্ত প্যারেনকাইমা কোশ।
    • কোশগুলি লম্বা, সরু, বড়ো নিউক্লিয়াস ও ঘন সাইটোপ্লাজমযুক্ত।
    • সেলুলোজ নির্মিত পাতলা কোশপ্রাচীর বর্তমান।
    • সাইটোপ্লাজম ছোটো ছোটো গহ্বরযুক্ত হয়।
  3. ফ্লোয়েম প্যারেনকাইমা (Phloem Parenchyma) –
    • লম্বা, অপেক্ষাকৃত চওড়া প্যারেনকাইমা কোশ।
    • সেলুলোজ নির্মিত পাতলা কোশপ্রাচীর বর্তমান।
    • স্পষ্ট নিউক্লিয়াসযুক্ত ও সাইটোপ্লাজমে ট্যানিন, শ্বেতসার প্রভৃতি সঞ্চিত থাকে।
  4. ফ্লোয়েম তন্তু (Phloem Fibre) –
    • মৃত স্ক্লেরেনকাইমা তন্তু বা বাস্ট তন্তু।
    • কোশপ্রাচীর পুরু, লিগনিনসমৃদ্ধ ও সরল কূপযুক্ত।
প্রস্থচ্ছেদে সীভপ্লেট ও সঙ্গীকোশ ও লম্বচ্ছেদে ফ্লোয়েমের অংশ

ফ্লোয়েমের অবস্থান – একবীজপত্রী ও দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের নালিকা বান্ডিলে অবস্থান করে।

ফ্লোয়েমের কাজ – উদ্ভিদদেহের পাতায় উৎপন্ন শর্করা জাতীয় খাদ্য ফ্লোয়েমের মাধ্যমে নিম্নমুখে পরিবাহিত হয়।

আবরণী কলা কাকে বলে? আবরণী কলার শ্রেণিবিভাগ করো।

আবরণী কলা (Epithelial Tissue or Epithelium) – যে কলা প্রাণীর দেহত্বক ও আন্তরযন্ত্রীয় অঙ্গের ভিতরে ও বাইরে অবিচ্ছিন্ন আচ্ছাদন তৈরি করে, তাকে আবরণী কলা বলে।

আবরণী কলার শ্রেণিবিভাগ –

আবরণী কলার শ্রেণিবিভাগ

আবরণী কলার বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

আবরণী কলার বৈশিষ্ট্য –

  1. আবরণী কলা এক্টোডার্ম, মেসোডার্ম ও এন্ডোডার্ম থেকে সৃষ্টি হয়।
  2. আবরণী কলা গঠনকারী কোশগুলি এক বা একাধিক স্তরে ভিত্তিপর্দার ওপরে সজ্জিত থাকে।
  3. কোশগুলি ঘনসন্নিবিষ্ট হয়ে অবস্থান করে ফলে আন্তঃকোশীয় স্থান কম থাকে।
  4. কোশে সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস ও ঘন সাইটোপ্লাজম বর্তমান।
  5. কখনো-কখনো কোশ মাইক্রোভিলি, সিলিয়া প্রভৃতি যুক্ত হয়।
  6. আবরণীকলায় রক্তবাহ থাকে না।
  7. আবরণী কলার কোশগুলি বিভিন্ন প্রকার অন্তঃকোশীয় সন্ধি দ্বারা পরস্পর যুক্ত থাকে।
  8. মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় এই কলার কোশগুলি বিভাজিত হয়ে নতুন কোশ তৈরি করে।

আবরণী কলার কাজগুলি আলোচনা করো।

আবরণী কলার কাজ –

  1. সুরক্ষা প্রদান – ত্বকীয় এপিথেলিয়াম দেহত্বককে শুষ্কতা, জীবাণু, যান্ত্রিক আঘাত ও রাসায়নিক পদার্থের ক্ষতিকারক প্রভাবের হাত থেকে রক্ষা করে।
  2. বহিঃকঙ্কাল গঠন – দেহত্বকের বাইরের এপিথেলিয়াম নখ, নখর, আঁশ, পালক প্রভৃতি সৃষ্টিতে সাহায্য করে।
  3. গ্যাসীয় পদার্থের আদানপ্রদান – ফুসফুসের অ্যালভিওলাইতে উপস্থিত আবরণী কলা গ্যাসীয় পদার্থ আদানপ্রদানে অংশগ্রহণ করে।
  4. শোষণ – মাইক্রোভিলিযুক্ত আবরণী কলা শোষণতল বৃদ্ধি করে, ফলে ক্ষুদ্রান্ত্রে দ্রুত খাদ্যরস শোষিত হয়।
  5. রেচন – বৃক্কীয় নালিকার গাত্রে অবস্থিত আবরণী কলা পুনঃশোষণ, ক্ষরণের মাধ্যমে রেচন পদার্থ (মূত্র) উৎপাদনে সাহায্য করে।
  6. ক্ষরণ – গ্রন্থিময় আবরণী কলা বিভিন্ন পদার্থ (যেমন – অশ্রু, মিউকাস, পাচকরস, হরমোন প্রভৃতি) ক্ষরণে সাহায্য করে।
  7. পরিবহণ – শ্বাসনালী ও ডিম্বনালিস্থিত সিলিয়েটেড আবরণী কলা যথাক্রমে মিউকাস, ধুলোবালি, ডিম্বাণু পরিবহণে অংশ নেয়।
  8. গ্যামেট উৎপাদন – জনন অঙ্গস্থিত জার্মিনাল এপিথেলিয়াম গ্যামেট উৎপাদনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
  9. অনুভূতি গ্রহণ – ন্যাসাল এপিথেলিয়াম, স্বাদকোরক প্রভৃতি যথাক্রমে গন্ধের ও স্বাদের অনুভূতি গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রেরণ করে।
  10. পুনরুৎপাদন ক্ষমতা – আবরণী কলার উচ্চ পুনরুৎপাদন ক্ষমতার জন্যই ক্ষতস্থান দ্রুত পূরণ হয়ে যায়।

যোগকলা কাকে বলে? যোগকলার শ্রেণিবিভাগ করো। যোগকলার বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

যোগকলা (Connective Tissue) – ধাত্র, তন্তু ও কোশ দ্বারা গঠিত যে কলা প্রাণীদেহে কোশ, কলা, অঙ্গ ও তন্ত্রের মধ্যে সংযোগস্থাপন করে, তাকে যোগকলা বলে।

যোগকলার শ্রেণিবিভাগ –

যোগকলার শ্রেণিবিভাগ

যোগকলার বৈশিষ্ট্য –

  1. প্রচুর পরিমাণে ধাত্র (matrix) এবং অল্প পরিমাণে কোশ ও তন্তু দ্বারা গঠিত।
  2. কোশগুলি বিচ্ছিন্ন বা এলোমেলোভাবে ধাত্রে ছড়িয়ে থাকে।
  3. আন্তঃকোশীয় স্থান বেশি এবং তা তরল, অর্ধতরল বা কঠিন ধাত্র দ্বারা পূর্ণ থাকে।
  4. এই কলা ভ্রুণের মেসোডার্ম থেকে উৎপত্তি লাভ করে।
  5. যোগকলায় রক্তবাহ উপস্থিত থাকে।

যোগকলার অবস্থান ও কাজ উল্লেখ করো।

যোগকলার অবস্থান – মেরুদণ্ডী প্রাণীদেহে প্রায় সর্বত্র যোগকলা উপস্থিত থাকে। যেমন – অন্তঃকঙ্কাল, বহিঃকঙ্কাল, রক্ত, লসিকা প্রভৃতি।

যোগকলার কাজ –

  1. সংযোগস্থাপন – যোগকলার মাধ্যমে দেহে বিভিন্ন কলা ও অঙ্গের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়। যেমন – অস্থির সঙ্গে অস্থি, অস্থির সঙ্গে পেশি প্রভৃতি।
  2. পুরু আস্তরণ – দেহের অনেক অঙ্গের ওপরে যোগকলার রক্ষণাত্মক পুরু আস্তরণ থাকে।
  3. ঝাঁকুনি প্রতিরোধ – চোখ, হৃৎপিণ্ড, বৃক্ক প্রভৃতি অঙ্গকে ঝাঁকুনিজনিত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে।
  4. যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান – অস্থি, তরুণাস্থি প্রভৃতি যোগকলা প্রাণীদেহের অন্তঃকঙ্কাল গঠনের মাধ্যমে যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করে।
  5. পরিবহণ – রক্ত, লসিকা প্রভৃতি তরল যোগকলা দেহে খাদ্য, O2, CO2 প্রভৃতি পরিবহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  6. সঞ্চয় – অ্যাডিপোজ যোগকলায় ফ্যাট সঞ্চিত থাকে।
  7. প্রতিরক্ষা দান – যোগকলার বিভিন্ন উপাদান (যেমন – ম্যাক্রোফাজ, প্লাজমা কোশ, লিম্ফোসাইট, মনোসাইট, নিউট্রোফিল প্রভৃতি) দেহে প্রবিষ্ট রোগজীবাণু ও বিষাক্ত পদার্থ ধ্বংস করতে এবং অ্যান্টিবডি উৎপাদনে সাহায্য করে।
  8. রক্তকণিকা উৎপাদন – অস্থিমজ্জা থেকে বিভিন্ন প্রকার রক্তকণিকা উৎপন্ন হয়।
  9. ক্ষতস্থান নিরাময় – যোগকলার বিভিন্ন উপাদান দেহে ক্ষতস্থান নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়।

পেশিকলা কাকে বলে? পেশিকলার শ্রেণিবিভাগ করো। পেশিকলার বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

পেশিকলা (Muscular Tissue) – পেশিকোশ দিয়ে তৈরি যে কলার সংকোচন ও প্রসারণের দ্বারা প্রাণীদেহের অঙ্গ ও প্রত্যঙ্গের সঞ্চালন ঘটে, তাকে পেশিকলা বলে।

পেশিকলার শ্রেণিবিভাগ –

পেশিকলার শ্রেণিবিভাগ

পেশিকলার বৈশিষ্ট্য –

  1. পেশিকলা পেশিকোশ বা পেশিতন্তু দ্বারা গঠিত।
  2. পেশিকোশের আবরণীকে সারকোলেমা ও সাইটোপ্লাজমকে সারকোপ্লাজম বলে।
  3. পেশিকোশ এক বা একাধিক নিউক্লিয়াসযুক্ত হয়।
  4. সারকোপ্লাজমে অ্যাকটিন ও মায়োসিন প্রোটিন নির্মিত সূক্ষ্ম সরু মায়োফাইব্রিল উপস্থিত থাকে।
  5. পেশিকোশের একককে সারকোমিয়ার বলে।
  6. পেশিকলা স্থিতিস্থাপক, সংকোচন ক্ষমতাযুক্ত হয়।

পেশিকলার অবস্থান ও কাজগুলি লেখো।

পেশিকলার অবস্থান – দেহের বিভিন্ন অঙ্গে যেমন – খাদ্যনালীর প্রাচীরে, হৃৎপিণ্ডে হৃৎপেশিরূপে, শিরা-ধমনির প্রাচীরে অবস্থান করে।

পেশিকলার কাজ –

  1. পেশিকলা দেহের বিভিন্ন অঙ্গের সঞ্চালন ঘটায় ও জীবকে গমনে সাহায্য করে।
  2. পেশিকলা দৈহিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে।
  3. পেশিকলা খাদ্যবস্তুর গলাধঃকরণ, পৌষ্টিকনালির বিচলন, মূত্রনালি ও ফ্যালোপিয়ান নালির পেরিস্ট্যালসিস চলনে সাহায্য করে।
  4. পেশিকলা দেহের কঙ্কালতন্ত্রকে অবলম্বন দেয় ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহকে রক্ষা করে।
  5. ঐচ্ছিক পেশি ইচ্ছা অনুযায়ী দেহ অঙ্গসমূহ সঞ্চালন করে।
  6. পেশিকলা স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
  7. হৃৎপেশি হৃৎপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণকে নিয়ন্ত্রণ করে দেহে রক্তসংবহনকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।

অবস্থানভেদে বিভিন্ন প্রকার পেশিকলার বর্ণনা দাও।

পেশিকলাকে অবস্থান অনুযায়ী তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয় –

কঙ্কালপেশি –

এই পেশির অন্য নাম সরেখ পেশি, কারণ এই পেশির সারকোপ্লাজমে অনুপ্রস্থে রেখাঙ্কিত থাকে। এই পেশির সংকোচন ও প্রসারণ ব্যক্তির ইচ্ছাধীন। তাই এই ধরনের পেশিকে ঐচ্ছিক পেশিও বলা হয়।

কঙ্কালপেশির অবস্থান – অস্থির সঙ্গে সংলগ্ন অবস্থায় এই পেশি অবস্থান করে। 

কঙ্কালপেশির গঠনগত বৈশিষ্ট্য –

  1. পেশিতন্তুগুলি বেলনাকার, নিরেট, দীর্ঘ এবং পেশিতে অনুপ্রস্থে রেখা থাকে।
  2. প্রতিটি পেশিকোশ সারকোলেমা নামক পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে।
  3. পেশিকোশের সাইটোপ্লাজমকে সারকোপ্লাজম বলে। সাইটোপ্লাজমে মাইটোকনড্রিয়া, গ্লাইকোজেন দানা বর্তমান।
  4. ঐচ্ছিক পেশির পেশিকোশে অসংখ্য নিউক্লিয়াস থাকে।
  5. সংকোচন-প্রসারণ ব্যক্তির ইচ্ছাধীন।

কঙ্কালপেশির কাজ –

  1. ঐচ্ছিক পেশি প্রাণীর ইচ্ছানুযায়ী সংকুচিত ও প্রসারিত হয়ে অঙ্গপ্রতঙ্গ সঞ্চালনে ও গমনে সাহায্য করে।
  2. ঐচ্ছিক পেশি প্রতিবর্ত ক্রিয়ার কারক বা ইফেক্টর হিসেবে কাজ করে।
  3. ঐচ্ছিক পেশি/ কঙ্কাল পেশি দেহ-আকৃতি প্রদান করে।

আন্তরযন্ত্রীয় পেশি –

এই পেশিতন্তুগুলি অনুপ্রস্থ রেখাবিহীন হয় এবং ইচ্ছানুযায়ী সংকোচন-প্রসারণ ঘটে না। তাই এই পেশিকে মসৃণ বা অনৈচ্ছিক পেশিও বলা হয়।

আন্তরযন্ত্রীয় পেশির অবস্থান – পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র, জরায়ু, শ্বাসনালী, মূত্রনালি, শিরা ও ধমনির প্রাচীর, গ্রন্থির নালি, চোখের সিলিয়ারি পেশি ইত্যাদিতে এই কলা অবস্থান করে।

আন্তরযন্ত্রীয় পেশির গঠনগত বৈশিষ্ট্য –

  1. মসৃণ পেশির পেশিকলার পেশিতন্তুকে ঘিরে যোগকলার পাতলা আবরণ থাকে।
  2. পেশিতন্তুর গুচ্ছের চারপাশে স্থূল কোলাজেন ও স্থিতিস্থাপক তন্তু উপস্থিত থাকে।
  3. পেশির কোশে একটিমাত্র ডিম্বাকার নিউক্লিয়াস থাকে।
  4. নিঃসাড়কাল দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী।

আন্তরযন্ত্রীয় পেশির কাজ –

  1. পাক-অন্ত্রীয় নালি ও পুংজনন নালিতে ক্রমোসংকোচন চলন দেখা যায়।
  2. মসৃণ পেশি স্বয়ংক্রিয় স্নায়ু দ্বারা উদ্দীপিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট অঙ্গকে সংকুচিত করতে সাহায্য করে।

হৃৎপেশি –

এই পেশিগুলি রেখাযুক্ত হয় কিন্তু স্ব-ইচ্ছায় সংকোচন-প্রসারণে অক্ষম।

হৃৎপেশির অবস্থান – হৃৎপিণ্ডে এই পেশি অবস্থান করে।

হৃৎপেশির গঠনগত বৈশিষ্ট্য –

  1. হৃৎপিণ্ডের প্রাচীরে অনুদৈর্ঘ্য ও অনুপ্রস্থ রেখা থাকে।
  2. এই পেশির সারকোলেমা ঐচ্ছিক পেশির ন্যায়।
  3. পেশিকোশে অসংখ্য বৃহদাকার মাইটোকনড্রিয়া ও একটি করে নিউক্লিয়াস বর্তমান।
  4. ইন্টারক্যালেটেড ডিস্ক বর্তমান।
  5. কোশে মায়োগ্লোবিন নামক প্রোটিন থাকে।
  6. নিঃসাড়কাল ক্ষণস্থায়ী।

 হৃৎপেশির কাজ – হৃৎপিণ্ডকে নির্দিষ্ট ছন্দে সংকুচিত ও প্রসারণক্ষম করে তোলে।

স্নায়ুকলা কাকে বলে? স্নায়ুকলার বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

স্নায়ুকলা (Nervous Tissue) – স্নায়ুকোশ ও নিউরোগ্লিয়া কোশ দ্বারা গঠিত যে কলা প্রাণীদেহে উদ্দীপনা গ্রহণ ও উদ্দীপনায় সাড়া দেওয়ার মাধ্যমে দেহে বিভিন্ন অঙ্গের কাজের মধ্যে এবং পরিবেশের সঙ্গে দেহের সমন্বয় রক্ষা করে, তাকে স্নায়ুকলা বলে।

স্নায়ুকলার বৈশিষ্ট্য –

  1. বিশেষ ধরনের সূক্ষ্ম, লম্বা আকৃতির স্নায়ুকোশ বা নিউরোন দ্বারা গঠিত।
  2. স্নায়ুকলাতে ধারককোশ রূপে উপস্থিত থাকে সোয়ান কোশ, স্যাটেলাইট কোশ ও নিউরোগ্লিয়া কোশ।
  3. স্নায়ুকোশের আবরণকে নিউরোলেমা ও সাইটোপ্লাজমকে নিউরোপ্লাজম বলে।
  4. স্নায়ুকোশ কোশদেহ এবং বিশেষ ধরনের প্রোটোপ্লাজমীয় প্রবর্ধক যথা ডেনড্রন ও অ্যাক্সন দ্বারা গঠিত।
  5. নিউরোফাইব্রিল নামক সূক্ষ্ম তন্তু ডেনড্রন থেকে অ্যাক্সন পর্যন্ত বিন্যস্ত থাকে।
  6. স্নায়ুকোশের কোশদেহে নিজল দানা নামক স্নেহপদার্থ সমৃদ্ধ দানা বর্তমান।
  7. কোশদেহের অ্যাক্সন হিলক্ নামক অংশ থেকে অ্যাক্সন উৎপন্ন হয়।
  8. কোনো কোনো অ্যাক্সনে সাদা চর্বির আস্তরণ থাকে, একে মায়েলিন সিদ্‌ বলে।
  9. অ্যাক্সনের নির্দিষ্ট দূরত্বে কয়েকটি অঞ্চলে মায়েলিন আবরণ থাকে না, এরূপ অঞ্চলকে র‍্যানভিয়ারের পর্ব বলে।
  10. প্রতিটি অ্যাক্সনের প্রান্তীয় অংশ কয়েকটি শাখায় বিভক্ত হয়ে প্রান্ত বুরুশ গঠন করে।
নিউরোন

এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘জীবন সংগঠনের স্তর’ -এর অন্তর্গত ‘কলা’ অংশের রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

পরিবেশ ও তার সম্পদ-প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই-স্থিতিশীল ব্যবহার

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

পরিবেশ ও তার সম্পদ-প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই-স্থিতিশীল ব্যবহার

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার – টীকা

পরিবেশ ও তার সম্পদ-প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই-স্থিতিশীল ব্যবহার

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

About The Author

Rahul

Tags

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান: জলদূষণের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

জলদূষণের কুফলগুলি লেখো।

মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান – জলদূষণের কারণগুলি লেখো | পরিবেশদূষণ

মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান – বায়ুদূষণের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ও ব্যবহৃত যন্ত্রসমূহ

বিভিন্ন বায়ুদূষকের ক্ষতিকর প্রভাব – মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান (Class 10 Life Science)