এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘জীবন সংগঠনের স্তর’ -এর অন্তর্গত ‘মানবদেহের প্রধান অঙ্গ ও তাদের কাজ’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

অঙ্গ ও তন্ত্র বলতে কী বোঝো? মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ তন্ত্রগুলির নাম উল্লেখ করো।
অঙ্গ (Organ) – দেহে নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করার জন্য বিভিন্ন কলা বা টিস্যু (যেমন – আবরণী কলা, পেশিকলা, যোগকলা, স্নায়ুকলা) মিলিতভাবে যে অংশ গঠন করে, তাকে অঙ্গ বলে। যেমন – পাকস্থলী, বৃক্ক, ফুসফুস, যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড প্রভৃতি।
তন্ত্র (System) – নির্দিষ্ট শারীরবৃত্তীয় কার্যসাধনের জন্য দেহের বিভিন্ন আন্তরযন্ত্রগুলি মিলিতভাবে যে অংশ গঠন করে, তাকে তন্ত্র বলে।
মানবাদাহন গুরুত্বপূর্ণ তন্ত্রসমূহ –
- আচ্ছাদনতন্ত্র।
- পেশিতন্ত্র।
- কঙ্কালতন্ত্র।
- পরিপাক বা পৌষ্টিকতন্ত্র।
- শ্বাসতন্ত্র।
- সংবহনতন্ত্র।
- রেচনতন্ত্র।
- জননতন্ত্র।
- স্নায়ুতন্ত্র।
- অন্তঃক্ষরাতন্ত্র।

মানবদেহে ত্বকের অবস্থান ও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি উল্লেখ করো।
মানবদেহে ত্বকের অবস্থান – ত্বক বা চর্ম মানবদেহের বাইরের আবরণ অর্থাৎ দেহের বহিঃতলে অবস্থান করে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদেহে ত্বকের মোট ক্ষেত্রফল প্রায় 1.8 বর্গমিটার এবং প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীদেহে ত্বকের ক্ষেত্রফল প্রায় 1.6 বর্গমিটার। ত্বক করতল, পদতল, ঘাড় প্রভৃতি স্থানে বেশি পুরু (প্রায় 3-6 মিলিমিটার) এবং চোখ, নাক, পুরুষাঙ্গ প্রভৃতি স্থানে খুব পাতলা (প্রায় 0.5 মিমি) হয়।
ত্বকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ –
- রক্ষণাত্মক (Protection) – মানবদেহের বাইরের পুরু ত্বক, নখ, চুল, লোম প্রভৃতি ত্বকীয় উপাদান বাহ্যিক আঘাতের হাত থেকে শরীরকে রক্ষা করে।
- প্রতিরক্ষা (Defence) – ত্বক এবং এন্ডোডারমিসে উপস্থিত হিস্টিওসাইট, ম্যাক্রোফাজ প্রভৃতি কোশগুলি জীবাণু সংক্রমণের হাত থেকে দেহকে রক্ষা করে।
- অনুভূতি গ্রহণ (Sensation receive) – ত্বকে উপস্থিত বিভিন্ন গ্রাহক কোশ ব্যথা, তাপ, চাপ, স্পর্শ, ঠান্ডা প্রভৃতি অনুভূতি গ্রহণে সাহায্য করে।
- দেহউষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ (Regulation of Body temperature) – পরিবহণ, পরিচলন ও বিকিরণের দ্বারা দেহ থেকে প্রচুর পরিমাণে তাপ নির্গমনে ত্বক সাহায্য করে। এ ছাড়া প্রয়োজনে ত্বকে উপস্থিত রক্তবাহ ভ্যাসোমোটর স্নায়ু দ্বারা সংকুচিত হয়ে দেহে তাপ সংরক্ষণেও সাহায্য করে।
- ভিটামিন D সংশ্লেষ (Synthesis of Vitamin-D) – ত্বকে উপস্থিত 7-ডিহাইড্রোকোলেস্টেরল বা কোলেক্যালসিফেরল সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ভিটামিন-D সংশ্লেষ করে।
- ক্ষরণ কাজ (Secretion) – ত্বকে উপস্থিত ঘর্মগ্রন্থি থেকে ঘর্ম বা স্বেদ, সিবেসিয়াস গ্রন্থি থেকে সিবাম প্রভৃতি পদার্থ ক্ষরিত হয়।
- রেচন কাজ (Excretion) – ঘামের মাধ্যমে অল্প পরিমাণে ‘ইউরিয়া, বিপাকীয় জল, লবণ, প্রভৃতি রেচিত হয়।
- মেলানিন উৎপাদন (Formation of Melanin) – ত্বকের মেলানোসাইট কোশ থেকে মেলানিন রঞ্জক উৎপন্ন হয়।
মানবদেহে পাকস্থলীর অবস্থান ও কাজগুলি লেখো।
পাকস্থলীর অবস্থান – পাকস্থলী মানবদেহে ঊর্ধ্ব উদরগহ্বরের বাঁদিকে মধ্যচ্ছদার ঠিক নীচে অবস্থান করে। এটি পৌষ্টিকনালির গ্রাসনালি ও ক্ষুদ্রান্ত্রের ডিওডিনামের মধ্যবর্তী অংশ।

পাকস্থলির কাজ –
- পরিপাক – পাকস্থলীর পেপটিক গ্রন্থি থেকে পেপসিন ও লাইপেজ উৎসেচক ক্ষরিত হয়। লাইপেজ ফ্যাটকে ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারলে পরিণত করে। পেপসিন প্রোটিনকে পেপটোনে পরিণত করে। পাকস্থলীর প্যারাইটাল গ্রন্থি থেকে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCI) ক্ষরিত হয় যা জীবাণু ধ্বংস করে এবং প্রোটিন পরিপাকে সাহায্য করে।
- যান্ত্রিক কাজ – পাকস্থলীতে গৃহীত খাদ্য উপাদান সাময়িকভাবে সঞ্চিত থাকে এবং বিচলন পদ্ধতিতে (পেরিস্ট্যালসিস প্রক্রিয়া) খাদ্যবস্তু পাচক রসের সঙ্গে মিশ্রিত হয়।
- শোষণ – অল্প পরিমাণে গ্লুকোজ, লবণ, জল, অ্যালকোহল, অ্যাসপিরিন প্রভৃতি শোষিত হয়। পাকস্থলী থেকে ক্যাসেলের ইনট্রিনসিক ফ্যাক্টর ক্ষরিত হয়, যা ভিটামিন B12 শোষণে সাহায্য করে।
- ক্ষরণ – পাকস্থলীর শ্লেষ্মা স্তর থেকে মিউকাস ক্ষরিত হয়। মিউকাস উৎসেচক ক্রিয়ার হাত থেকে পাকস্থলীর অন্তঃপ্রাচীরকে রক্ষা করে। এছাড়া পাকগ্রন্থি থেকে উৎসেচক ও HCI ক্ষরিত হয়।
- রেচন – মরফিন, কিছু বিষাক্ত পদার্থ, ভারীধাতু প্রভৃতি পাকস্থলী থেকে রেচিত হয়।
মানবদেহে যকৃতের অবস্থান ও কাজ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।
মানবদেহে যকৃতের অবস্থান – যকৃৎ মধ্যচ্ছদার ঠিক নীচে উদরগহ্বরের ডান দিকে বেশিরভাগ অংশ জুড়ে অবস্থান করে। এটি মানবদেহের সর্ববৃহৎ পাচকগ্রন্থি।

যকৃতের কাজ –
- পাচক রস ক্ষরণ ও পরিপাক – যকৃৎ থেকে উৎসেচকবিহীন পিত্তরস ক্ষরিত হয়। পিত্তরসের পিত্তলবণ ফ্যাটের অবদ্রব তৈরি করে এবং লাইপেজ উৎসেচকের সক্রিয়করণের মাধ্যমে ফ্যাটের পরিপাকে সাহায্য করে।
- বিপাক – যকৃতে সমস্ত প্রকার খাদ্যবস্তুর বিপাক সম্পন্ন হয়। যেমন – কার্বোহাইড্রেট বিপাক (গ্লাইকোজেনেসিস, গ্লাইকোজেনোলাইসিস প্রভৃতি), প্রোটিন বিপাক (ডিঅ্যামাইনেশন, ইউরিয়া সংশ্লেষ প্রভৃতি) ও ফ্যাট বিপাক (লাইপোজেনেসিস)।
- রেচন – দেহে উৎপন্ন বিষাক্ত পদার্থ, ব্যাকটেরিয়া, ওষুধ, ভারী ধাতু প্রভৃতি যকৃৎ নিঃসৃত পিত্তরসের মাধ্যমে দেহ থেকে নির্গত হয়। এছাড়া, যকৃতেই অরনিথিন চক্রের মাধ্যমে প্রধান রেচনবস্তু ইউরিয়া উৎপন্ন হয়।
- অনাক্রম্যতা – যকৃতে উপস্থিত কুফার কোশ (Kupffer Cell) দেহে প্রবিষ্ট রোগজীবাণু ধ্বংসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।
- রক্ত সংবহনতন্ত্র – মাতৃগর্ভে থাকাকালীন অবস্থায় ভ্রুণের লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনে যকৃৎ ভূমিকা নেয়। পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় যকৃতে লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস হয়। এর ফলে বিলিরুবিন ও বিলিভারডিন উৎপন্ন হয়, যা মল ও মূত্রের হলুদ বর্ণের জন্য দায়ী।
পিত্তথলি বা পিত্তাশয় কাকে বলে?
যকৃতের পশ্চাদতলে নাসপাতির মতো আকৃতি সম্পন্ন একটি থলি থাকে, একে পিত্তথলি বা পিত্তাশয় বলে। এই থলিতে পিত্ত (Bile) সঞ্চিত হয়।
মানবদেহে বৃক্কের অবস্থান ও কাজ উল্লেখ করো।
মানবদেহে বৃক্কের অবস্থান –
একজোড়া বৃক্ক বা কিডনি উদর গহ্বরের পিছনের দিকে মেরুদণ্ডের দুপাশে অবস্থান করে। ডান বৃক্কটি বাম বৃক্কের তুলনায় প্রায় 0.5 ইঞ্চি নীচে থাকে।

বৃক্কের কাজ –
- মূত্র উৎপাদন – বৃক্কের প্রধান কাজ হল মূত্র প্রস্তুত করা। নেফ্রনের অভ্যন্তরের রক্ত থেকে নানা প্রকার নাইট্রোজেনযুক্ত ও নাইট্রোজেনবিহীন রেচন পদার্থ জলের সঙ্গে মিশে মূত্র তৈরি করে।
- রেচন পদার্থের অপসারণ – বৃক্কের মাধ্যমে নানা রেচন পদার্থ যেমন – ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া, হিপ্পিউরিক অ্যাসিড প্রভৃতি মানবদেহ থেকে নিষ্কাশিত হয়।
- দেহে জলসাম্য নিয়ন্ত্রণ ও অভিস্রবণ চাপ বজায় রাখা – বৃক্কে উৎপন্ন মূত্র রেচনের মাধ্যমে দেহের জলসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে ও বহিঃকোশীয় দেহতরলে অভিস্রবণ চাপ বজায় রাখে।
- ইলেকট্রোলাইটস্ ও লবণ ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ – বৃক্কের মাধ্যমে দেহতরলে বিভিন্ন ইলেকট্রোলাইটস্ ও লবণের ঘনত্ব নিয়ন্ত্রিত হয়।
- পুনঃশোষণ – বৃক্ক নেফ্রনের মাধ্যমে বিভিন্ন পদার্থের নিয়ন্ত্রিত পুনঃশোষণ ঘটিয়ে রক্তে বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা স্বাভাবিক রাখে।
- রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ – বৃক্ক দেহে জলসাম্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রক্তচাপ বজায় রাখে।
- রেনিন ক্ষরণ – বৃক্ক রেনিন-অ্যানজিওটেনসিনোজেন তন্ত্রের মাধ্যমে দেহতরলে উচ্চ Na+ ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ করে।
- এরিথ্রোপোয়েটিন উৎপাদন – বৃক্ক এরিথ্রোপোয়েটিন উৎপাদনের মাধ্যমে লোহিত রক্তকণিকা সৃষ্টিকে উদ্দীপিত করে।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও মহিলার বৃক্কের ওজনের পার্থক্য কত?
একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের বৃক্ক প্রায় 150gm ও একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার বৃক্কের ওজন প্রায় 135gm।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘জীবন সংগঠনের স্তর’ -এর অন্তর্গত ‘মানবদেহের প্রধান অঙ্গ ও তাদের কাজ’ অংশের রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন