নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – শ্বসন – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

Souvick

এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘শ্বসন’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

জৈবনিক প্রক্রিয়া-শ্বসন-জীবনবিজ্ঞান-নবম শ্রেণী
Contents Show

শ্বসন কাকে বলে? শ্বসন কোথায় ও কখন ঘটে? শ্বাসকার্য বলতে কী বোঝায়?

শ্বসন  (Respiration) – যে জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কোশসস্থ খাদ্যবস্তু অক্সিজেনের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিতে, উৎসেচকের নিয়ন্ত্রণাধীনে সম্পূর্ণ বা অসম্পূর্ণভাবে জারিত হয়ে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জল উৎপন্ন করে এবং সম্পূর্ণ বা আংশিক শক্তির মুক্তি ঘটায়, তাকে শ্বসন বলে।

শ্বসন সমস্ত সজীবকোশে, দিবা-রাত্র সবসময়ই সংঘটিত হয়।

শ্বাসকার্য (Breathing) – যে যান্ত্রিক পদ্ধতির সাহায্যে বায়ুমণ্ডলের বিশুদ্ধ বায়ু বা বেশি O₂ যুক্ত বায়ু শ্বাসনালী পথে ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং ফুসফুস থেকে দূষিত বা বেশি CO₂ যুক্ত বায়ু পরিবেশে নির্গত হয়, তাকে শ্বাসকার্ষ বলে।

শ্বাসকার্য প্রশ্বাস ও নিশ্বাস ক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে।

শ্বাসকার্য

শ্বাসঅঙ্গ কাকে বলে? শ্বাস অঙ্গের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

শ্বাসঅঙ্গ (Respiratory Organ) – জীবদেহে অবস্থিত যে-সমস্ত অঙ্গ পরিবেশের সঙ্গে দেহের গ্যাসীয় পদার্থ (O₂ এবং CO₂) আদানপ্রদানে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তাদের শ্বাসঅঙ্গ বলে।

শ্বাসঅঙ্গের বৈশিষ্ট্য – শ্বাসঅঙ্গের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল-

  • বিস্তীর্ণ ও আর্দ্র শ্বাসঅঙ্গ – জীবের শ্বাসঅঙ্গগুলি বিস্তৃত ও আর্দ্র এবং ব্যাপনে সক্ষম হয়। এই বৈশিষ্ট্য থাকার ফলে উন্নত বহুকোশী প্রাণীদের (কেঁচো) সিক্ত বা ভিজে দেহত্বকের মাধ্যমে সহজেই ব্যাপন প্রক্রিয়ায় বায়ু মাধ্যম থেকে অক্সিজেন গৃহীত হয় এবং রক্তজালকে প্রবেশ করে আর সেখান থেকে সংবাহিত হয়ে দেহের বিভিন্ন কলাকোশে পৌঁছে যায়।
  • অধিক ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট শ্বাসঅঙ্গ – কিছু কিছু প্রাণীর শ্বাসঅঙ্গের ক্ষেত্রে শ্বসনতলের ক্ষেত্রফল বেশি হয়, যেমন – স্পঞ্জ ও হাইড্রা প্রভৃতি নিম্নশ্রেণির বহুকোশী প্রাণীরা তাদের সমগ্র দেহতল দিয়ে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন (O₂) গ্রহণ করে।
  • রক্তজালকপূর্ণ শ্বাসঅঙ্গ – জীবের শ্বাসঅঙ্গগুলি অধিক মাত্রায় রক্তজালকপূর্ণ হওয়ায় শ্বাসঅঙ্গগুলিতে রক্তসরবরাহ বেশি হয় এবং গ্যাসীয় আদানপ্রদান বেশিমাত্রায় ঘটে। যেমন – প্রত্যেক প্রাণীরা বায়ুমণ্ডল থেকে অক্সিজেন শ্বাসঅঙ্গের মাধ্যমে গ্রহণ করে এবং ব্যাপন প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন রক্তজালকে প্রবেশ করে দেহের কলাকোশে পৌঁছায়। জলজ প্রাণীদের শ্বাসঅঙ্গ ফুলকা অধিকমাত্রায় রক্তজালকপূর্ণ হওয়ায় সরাসরি ব্যাপন প্রক্রিয়ায় জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে।
  • শ্বসন মাধ্যমের সঙ্গে সংস্পর্শ – শ্বাসঅঙ্গগুলি সরাসরি শ্বসন মাধ্যমের সংস্পর্শে থাকে।

মানুষের শ্বাসতন্ত্রের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।

মানুষের স্বাসতন্ত্র (Respiratory System of Human) – মানবদেহে মুখ্য শ্বাসঅঙ্গ এবং আনুষঙ্গিক শ্বাসঅঙ্গ পারিপার্শ্বিক বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে অক্সিজেন (O₂) ও কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) বিনিময়ের জন্য মিলিতভাবে যে তন্ত্র গঠন করে, তাকে শ্বাসতন্ত্র বলে। মানুষের ফুসফুসীয় শ্বাসতন্ত্রকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা –

  1. শ্বাসপথ (Respiratory tract),
  2. শ্বাসঅঙ্গ (Respiratory organ)।

শ্বাসপথ –

যে নলাকার পথে পরিবেশ থেকে O₂ প্রবেশ করে ফুসফুসে পৌঁছায় এবং ফুসফুস থেকে CO₂ পরিবেশে নির্গত হয়, তাকে শ্বাসপথ বলে। শ্বাসপথের অন্তর্গত অঙ্গগুলি হল –

  1. বহিঃনাসারন্ধ্র,
  2. নাসাপথ,
  3. গলবিল বা ফ্যারিংক্স,
  4. স্বরযন্ত্র বা ল্যারিংক্স,
  5. শ্বাসনালী বা ট্রাকিয়া এবং
  6. ক্লোমশাখা বা ব্রঙ্কাস।

স্বাসপথের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা –

  • বহিঃনাসারন্ধ্র – একজোড়া বহিঃনাসারন্ধ্র দ্বারা নাসিকা বাইরে উন্মুক্ত থাকে।
  • নাসাপথ – বহিঃনাসারন্ধ্রের পরে অবস্থিত ন্যাসাল সেপটাম দ্বারা পৃথকীকৃত দুটি সরু পথ হল নাসাপথ। এটি তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত থাকে –
    • ভেস্টিবিউলার অঞ্চল,
    • রেসপিরেটরি অঞ্চল এবং
    • অলফ্যাকটরি অঞ্চল। নাসাপথ একজোড়া অন্তঃনাসারন্ধ্র দ্বারা গলবিলে উন্মুক্ত হয়।
  • গলবিল বা ফ্যারিংক্স – পেশি ও তন্তু দ্বারা গঠিত প্রকোষ্ঠ। এটি নাসাগলবিল, মুখগলবিল ও স্বরযন্ত্রীয় গলবিল নামক তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত হয়।
  • স্বরযন্ত্র বা ল্যারিংক্স – মুখগলবিল ও শ্বাসনালীর মধ্যবর্তী 4 সেমি দৈর্ঘ্যযুক্ত সামান্য স্ফীত অংশ। এটি 9টি তরুণাস্থি দ্বারা গঠিত।
  • শ্বাসনালী বা ট্রাকিয়া – স্বরযন্ত্রের পরবর্তী প্রায় 12 সেমি দীর্ঘ এবং 2.5 সেমি ব্যাসযুক্ত নলাকার গঠন। এটির প্রাচীর 15-18টি ‘C’ আকৃতির অসম্পূর্ণ তরুণাস্থি নির্মিত ট্রাকিয়াল রিং দ্বারা বেষ্টিত থাকে।
  • ক্লোমশাখা বা ব্রংকাস – বক্ষগহ্বরে 5th পাঁজরের সামনের দিকে শ্বাসনালীটি দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এদের প্রাথমিক ব্রংকাই (Singular-ব্রংকাস) বলে। ডানদিকের ব্রংকাস বামদিকের ব্রঙ্কাসের তুলনায় ছোটো দৈর্ঘ্যযুক্ত হয়।
মানুষের শ্বাসতন্ত্র

শ্বাসঅঙ্গ – ফুসফুস

  • মানুষের শ্বাসঅঙ্গ একজোড়া ফুসফুস।
  • প্রতিটি ফুসফুস পাতলা প্রাচীরযুক্ত, স্থিতিস্থাপক, স্পঞ্জি, হালকা গোলাপি রঙের ত্রিকোণাকার এবং অত্যধিক প্রসারণ ক্ষমতাযুক্ত হয়।
  • বক্ষগহ্বরের বেশিরভাগ স্থান ফুসফুস অধিকার করে থাকে এবং এগুলি বক্ষপিঞ্জর দ্বারা সুরক্ষিত থাকে।
  • প্রতিটি ফুসফুস দ্বিস্তরীয় প্লুরা পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে।
  • প্রতিটি প্রাথমিক ব্রংকাস ফুসফুসে প্রবেশ করার পর বারবার বিভাজিত হতে থাকে এবং অবশেষে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম নালিকায় পরিণত হয়। এদের ব্রংকিওলস বা উপক্লোমশাখা বলে।
  • সবশেষে ব্রংকিওলগুলি অ্যালভিওলার ডাক্ট গঠন করে।
  • প্রতিটি অ্যালভিওলার ডাক্ট বা বায়ুথলি নালিকা বদ্ধ প্রান্তযুক্ত ক্ষুদ্র থলির মতো গঠন সৃষ্টি করে। এদের অ্যালভিওলাই বা বায়ুথলি বলে।
  • এই স্থান রক্তজালক দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। বায়ুথলি ও রক্তজালকের রক্তের মধ্যে O₂ ও CO₂ আদানপ্রদান ঘটে। অর্থাৎ, বায়ুথলি থেকে O₂ ব্যাপন প্রক্রিয়ায় রক্তজালকের রক্তে প্রবেশ করে এবং রক্তজালকের রক্ত থেকে CO₂ ব্যাপন ক্রিয়ায় বায়ুথলিতে প্রবেশ করে।

মানুষের প্রশ্বাস কৌশল বর্ণনা করো।

মানুষের শ্বাসক্রিয়া প্রধানত দুটি পর্যায়ে ঘটে। পর্যায় দুটি হল –

  1. প্রশ্বাস বা শ্বাসগ্রহণ
  2. নিশ্বাস বা শ্বাসত্যাগ।

প্রশ্বাস (Inspiration) –

যে যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিবেশ থেকে ফুসফুসে বিশুদ্ধ বায়ু (বেশি O₂ যুক্ত) প্রবেশ করে, তাকে প্রশ্বাস বলে।

প্রশ্বাস প্রক্রিয়া – প্রশ্বাস ক্রিয়া সক্রিয় পদ্ধতি। এই প্রক্রিয়ার পর্যায়ক্রমিক ঘটনাগুলি হল-

  • প্রশ্বাসকালে বক্ষগহ্বরের আয়তন বৃদ্ধি পায়।
  • বক্ষগহ্বর ও উদরগহ্বরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত গম্বুজ (Domb) আকৃতির মধ্যচ্ছদা (Diaphragm) সংকুচিত হয়।
  • সংকুচিত মধ্যচ্ছদা সোজা হয়ে উদরগহ্বরের দিকে নেমে আসে ফলে বক্ষগহ্বরের আয়তন নীচের দিকে বৃদ্ধি পায়।
  • বহিস্থ ইন্টারকস্টাল পেশির সংকোচনের ফলে স্টারনাম এবং পঞ্জরাস্থি সামনে, পাশে ও ওপরের দিকে সরে যায় ফলে বক্ষগহ্বরের আয়তন সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধি পায়।
  • বক্ষগহ্বরের আয়তন বৃদ্ধির ফলে ফুসফুসের আয়তন বৃদ্ধি ঘটে।
  • ফুসফুসের আয়তন বৃদ্ধির ফলে ফুসফুস মধ্যস্থ বায়ুর চাপ কমে যায় এবং বায়ুমন্ডলের উচ্চ চাপযুক্ত অঞ্চল থেকে বিশুদ্ধ বাতাস (বেশি O₂ যুক্ত) শ্বাসনালী পথে ফুসফুসে প্রবেশ করে।

মন্তব্য – ফুসফুসের বায়ুথলি থেকে O₂ ব্যাপন প্রক্রিয়ায় সংলগ্ন রক্তজালকের রক্তে প্রবেশ করে এবং রক্ত থেকে CO₂ বায়ুথলিতে প্রবেশ করে।

প্রশ্বাস

মানুষের নিশ্বাস কৌশল বর্ণনা করো।

নিশ্বাস (Expiration) –

যে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ফুসফুস থেকে দূষিত বায়ু অর্থাৎ, বেশি CO₂ যুক্ত বায়ু শ্বাসনালী পথে বাহিত হয়ে পরিবেশে নির্গত হয়, তাকে নিশ্বাস বলে।

নিশ্বাস প্রক্রিয়া – নিশ্বাস প্রক্রিয়া নিষ্ক্রিয় পদ্ধতি। এই প্রক্রিয়ার পর্যায়ক্রমিক ঘটনাগুলি হল –

  • বক্ষগহ্বরের আয়তন কমে যায়।
  • মধ্যচ্ছদা শিথিল হয় ফলে পুনরায় গম্বুজ (Domb) আকৃতি ধারণ করে এবং বক্ষগহ্বরের আয়তন নীচের দিকে কমে যায়।
  • অন্তঃইন্টারকস্টাল পেশির সংকোচনের ফলে স্টারনাম ও পঞ্জরাস্থি পাশে, সামনে ও ওপরের দিক থেকে ভিতরের দিকে সরে আসে।
  • এর ফলে সামগ্রিকভাবে বক্ষগহ্বরের আয়তন কমে যায়।
  • বক্ষগহ্বরের আয়তন কমে যাওয়ার ফলে ফুসফুস দুটির আয়তন কমে যায় এবং ফুসফুসের অভ্যন্তরে বায়ুর চাপ বেড়ে যায়।
  • ফুসফুস থেকে দূষিত বা বেশি CO₂ যুক্ত বায়ু শ্বাসনালী পথে বাইরের পরিবেশে মুক্ত হয়।
নিশ্বাস

ধূমপান কয় প্রকার ও কী কী? শ্বাসতন্ত্রের ওপর ধূমপান কীভাবে ক্ষতি করে?

ধূমপান দুপ্রকার, যথা –

  1. সক্রিয় ধূমপান ও
  2. নিষ্ক্রিয় ধূমপান।

সক্রিয় ধূমপান – কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় জ্বলন্ত সিগারেট, চুরুট, বিড়ি বা তামাকের ধোঁয়াকে যখন মুখ দিয়ে টেনে ফুসফুসে প্রবেশ করায়, তখন সেই ঘটনাকে সক্রিয় ধূমপান বলে।

নিষ্ক্রিয় ধূমপান – কোনো ব্যক্তির অনিচ্ছাকৃতভাবে পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা তামাকজাত দ্রব্যের ধোঁয়া যখন প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে, তখন সেই ঘটনাকে নিষ্ক্রিয় ধূমপান বলে।

শ্বাসতন্ত্রের ওপর ধূমপানের ক্ষতিকারক প্রভাব –

ক্যানসার উৎপন্ন করে – সিগারেটের ধোঁয়ায় উপস্থিত নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড বা অন্যান্য ক্যানসার উদ্দীপক পদার্থগুলি মানুষের মুখ, শ্বাসনালী, ফুসফুসের ক্যানসারের কারণ।

ক্যানসারে আক্রান্ত ফুসফুস

ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ –

  • কাশি – ধূমপায়ীদের প্রচণ্ড কাশি হয় ও কাশির সময় ফুসফুস থেকে শ্লেষ্মা উঠে আসে।
  • এমফাইসেমা – ধূমপায়ীদের বায়ুথলির প্রাচীরগুলি বিনষ্ট হয়। ফলে বায়ুথলিগুলির গ্যাসীয় আদানপ্রদান কমে যায় ও ফুসফুসের গ্যাসীয় আদানপ্রদানের কার্যকারিতা কমে, একে এমফাইসেমা বলে। ফলে, হৃৎপিণ্ডকে বেশি পরিমাণে রক্ত সরবরাহ করতে হয়। এর ফলে হার্ট-অ্যাটাক দেখা দিতে পারে।
  • হাঁপানি – ধূমপায়ীদের শ্বাসনালীর ক্লোমশাখার মধ্যে অ্যালার্জেনের অনুপ্রবেশের ফলে, শ্লেষ্মাস্তর ফুলে গিয়ে সেখান থেকে বেশি পরিমাণে শ্লেষ্মা বের হয় বলে শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয়। একেই হাঁপানি বলে।
  • হৃৎপিণ্ডের রোগ – হৃৎপিণ্ডের করোনারি আর্টারি সংক্রান্ত রোগ, হৃৎপিণ্ডে যন্ত্রণা বা অ্যানজাইনা পেকটোরিস হয়।
এমফাইসেমা রোগাক্রান্ত ফুসফুস

একনজরে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ –

  • প্লুরিসি – প্লুরা পর্দার প্রদাহজনিত রোগকে বলে প্লুরিসি।
  • অ্যানথ্রাকোসিস – কয়লার কণা ফুসফুসে প্রবেশের ফলে যে রোগ হয়, তাকে অ্যানথ্রাকোসিস বলে।
  • হাঁপানি – শ্বাসনালী ও ক্লোমশাখার প্রদাহজনিত রোগ।
  • এমফাইসেমা – ধূমপানের ফলে ঘটে।
  • সিলিকোসিস – ফুসফুসে সিলিকন কণার প্রবেশের ফলে হয়।
  • অ্যাসবেসটোসিস – ফুসফুসে অ্যাসবেসটোস কণা প্রবেশের ফলে এই রোগ হয়।

কোশীয় শ্বসন কাকে বলে? কোশীয় শ্বসন কত প্রকার ও কী কী? প্রতি প্রকার শ্বসনের সংঘটন স্থল, সংঘটিত বিভিন্ন পর্যায় ও উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করো।

কোশীয় শ্বসন (Cellular Respiration) – নির্দিষ্ট যে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় O₂ -এর উপস্থিতিতে, নির্দিষ্ট উৎসেচকের নিয়ন্ত্রণাধীনে কোশস্থ খাদ্যবস্তু জারিত হয়ে শক্তি উৎপন্ন করে এবং উপজাত পদার্থরূপে CO₂ ও H₂O সৃষ্টি হয়, তাকে কোশীয় শ্বসন বলে।

কোশীয় শ্বসন তিন প্রকার। যথা –

  1. সাবাত শ্বসন,
  2. অবাত শ্বসন ও
  3. সন্ধান।
শ্বসনসংঘটন স্থলপর্যায়উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ
সবাতসাইটোপ্লাজম ও মাইটোকনড্রিয়াi. গ্লাইকোলাইসিস,
ii. অ্যাসিটাইল CoA উৎপাদন,
iii. ক্রেবসচক্র,
iv. প্রান্তীয় শ্বসন
686 kcal
অবাতসাইটোপ্লাজমগ্লাইকোলাইসিস50 kcal
সন্ধানসাইটোপ্লাজমগ্লাইকোলাইসিস36 kcal

সবাত শ্বসন কাকে বলে? এটি কোশের কোথায় ঘটে? এই প্রক্রিয়াটি সংক্ষেপে আলোচনা করো।

সবাত শ্বসন (Aerobic Respiration) – যে শ্বসন প্রক্রিয়ায় মুক্ত অক্সিজেনের উপস্থিতিতে বায়ুজীবী জীবের কোশ অভ্যন্তরস্থ শ্বসনবস্তু (যেমন – গ্লুকোজ) সম্পূর্ণরূপে জারিত হয়ে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জল উৎপন্ন হয় এবং শ্বসনবস্তু মধ্যস্থ নিহিত শক্তির সম্পূর্ণরূপে মুক্তি ঘটে, তাকে সবাত শ্বসন বলে।

সংঘটন স্থান – সকল বায়ুজীবী জীব, যেমন – এককোশী অ্যামিবা থেকে শুরু করে উন্নত শ্রেণির বহুকোশী উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহে সবাত শ্বসন সম্পন্ন হয়।

সবাত শ্বসন পদ্ধতি –

সবাত শ্বসনের সমগ্র প্রক্রিয়াটি চারটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। পর্যায়গুলি হল –

1. গ্লাইকোলাইসিস (Glycolysis) – শ্বসনের প্রথম পর্যায়। সাইটোপ্লাজমে নির্দিষ্ট উৎসেচকের উপস্থিতিতে সংঘটিত হয়। এই পর্যায়ে গ্লুকোজ জারিত হয়ে পাইরুভিক অ্যাসিড ও ATP উৎপন্ন হয়।

গ্লুকোজউৎসেচক2 অণু পাইরুভিক অ্যাসিড + 2 অণু ATP

2. অ্যাসিটাইল CoA উৎপাদন (Formation of Acetyl CoA) – 3 কার্বনযুক্ত পাইরুভিক অ্যাসিড মাইটোকনড্রিয়ায় প্রবেশ করে এবং 2 কার্বনযুক্ত অ্যাসিটাইল CoA উৎপন্ন করে। এই প্রকার জারণে CO₂ নির্গত হয় বলে, একে পাইরুভিক অ্যাসিডের অক্সিডেটিভ ডিকার্বক্সিলেশন বলে।

3. ক্রেবস চক্র (Krebs Cycle) – মাইটোকনড্রিয়ার ধাত্রে নির্দিষ্ট উৎসেচকের উপস্থিতিতে চক্রাকার পথে অ্যাসিটাইল Co-A সম্পূর্ণরূপে জারিত হয়ে জল, CO₂ ও শক্তি উৎপন্ন করে। আবিষ্কারক বিজ্ঞানী হ্যানস ক্রেবস -এর নামানুসারে একে ‘ক্রেবস চক্র’ বলা হয়।

4. প্রান্তীয় শ্বসন (Terminal Respiration) – গ্লাইকোলাইসিস, পাইরুভিক অ্যাসিডের ডিকার্বক্সিলেশন এবং ক্রেবস চক্রে উৎপাদিত NADH + H+ এবং FADH₂ মাইটোকনড্রিয়ার অন্তঃপর্দায় অবস্থিত ইলেকট্রনবাহক দ্বারা বাহিত হওয়ার সময় শক্তি নির্গত করে। এই শক্তি ADP ও Pi -এর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয় এবং ATP উৎপন্ন করে।

সবাত শ্বসনের পর্যায়ক্রমিক ধাপ

গ্লাইকোলাইসিস কাকে বলে? গ্লাইকোলাইসিস পদ্ধতিটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।

গ্লাইকোলাইসিস (Glycolysis) – শ্বসনের প্রাথমিক পর্যায়ে যে পদ্ধতিতে কোশস্থ গ্লুকোজ অক্সিজেন ছাড়া, উৎসেচকের সাহায্যে কোশের সাইটোপ্লাজমে ধারাবাহিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আংশিকভাবে জারিত হয়ে পাইরুভিক অ্যাসিড, NADH ও ATP উৎপন্ন করে, তাকে গ্লাইকোলাইসিস বলে।

সংঘটন স্থল – সাইটোপ্লাজম।

গ্লাইকোলাইসিস পদ্ধতি –

বিজ্ঞানী এম্বডেন, মেয়ারহফ ও পারনাস মিলিতভাবে পদ্ধতিটি বর্ণনা করেন। পদ্ধতিটি নিম্নরূপ –

গ্লাইকোলাইসিস প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক বিক্রিয়াসমূহ

গ্লাইকোলাইসিসের অন্তর্জাত পদার্থগুলির নাম লেখো। পাইরুভিক অ্যাসিডের জারণ বলতে কী বোঝো? এর গুরুত্ব কী?

গ্লাইকোলাইসিসের অন্তর্জাত পদার্থ – 2 অণু পাইরুভিক অ্যাসিড, 2 অণু ATP ও 2 অণু NADH + H+

পাইরুভিক অ্যাসিডের জারণ – যে জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মাইটোকনড্রিয়ায় পাইরুভিক অ্যাসিড (3C), উৎসেচক এবং কোএনজাইম -এর সাহায্যে জারিত হয়ে এক অণু CO₂, এক অণু অ্যাসিটাইল CoA (2C) ও এক অণু NADH + H+ উৎপন্ন করে, তাকে পাইরুভিক অ্যাসিডের জারকীয় ডিকার্বক্সিলেশন বা পাইরুভিক অ্যাসিডের জারণ বলে।

পাইরুভিক অ্যাসিডের জারণ

গুরত্ব – পাইরুভিক অ্যাসিড (CH3COCOOH) জারিত হয়ে যে অ্যাসিটাইল CoA উৎপন্ন করে তা ক্রেবস চক্রে প্রবেশ করে।

ক্রেবস চক্র কাকে বলে? ক্রেবস চক্রে সংঘটিত জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়াগুলি ছকের মাধ্যমে বর্ণনা করো।

ক্রেবস চক্র (Krebs Cycle) – সবাত শ্বসনের যে পর্যায়ে দেহে উৎপন্ন অ্যাসিটাইল CoA জটিল চক্রাকার ধারাবাহিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে মাইটোকনড্রিয়ার ধাত্রে নির্দিষ্ট উৎসেচকের সাহায্যে সম্পূর্ণরূপে জারিত হয়ে জল, CO₂, শক্তি ও বিজারিত হাইড্রোজেন বাহক (NADH + H+ ও FADH₂) উৎপন্ন করে, তাকে ক্রেবস চক্র বা TCA চক্র (Tricarboxylic Acid Cycle) বলে।

সংঘটন স্থান –

  • ক্রেবস চক্রের 9টি বিক্রিয়া ঘটে মাইটোকনড্রিয়ার ধাত্রে
  • ক্রেবস চক্রের 1টি বিক্রিয়া ঘটে মাইটোকনড্রিয়ার অন্তঃপর্দায়

ক্রেবস চক্র পদ্ধতি –

ক্রেবস চক্রের প্রবাহচিত্র ও পর্যায়ক্রমিক ধাপের চিত্ররূপ

প্রান্তীয় শ্বসন বা ইলেকট্রন পরিবহণ পদ্ধতির সংজ্ঞা ও বর্ণনা দাও।

প্রান্তীয় শ্বসন – সবাত শ্বসনের যে শেষ পর্যায়ে মাইটোকনড্রিয়ার অন্তঃপর্দায় উপস্থিত বিভিন্ন ইলেকট্রন বাহকের মাধ্যমে গ্লাইকোলাইসিস ও ক্রেবস চক্রে উৎপন্ন পদার্থের আণবিক অক্সিজেনের উপস্থিতিতে জারণ-বিজারণের ফলে জল ও শক্তিধর ATP অণুর সংশ্লেষ হয়, তাকে প্রান্তীয় শ্বসন বা ইলেকট্রন পরিবহণ পদ্ধতি বলে।

সংগঠন স্থান – মাইটোকনড্রিয়ার অন্তঃপর্দা।

প্রান্তীয় শ্বসন বা ইলেকট্রন পরিবহণ পদ্ধতি –

  • প্রান্তীয় শ্বসনের প্রথম ধাপে NADH + H+, NADH-Q রিডাকটেজ কমপ্লেক্সে পৌঁছালে এটির জারণ ঘটে এবং 2টি H+ নির্গত হয়। এই সময় ইউবিকুইনোন, NADH + H+ -এর জারণের ফলে নির্গত ইলেকট্রনকে পরবর্তী সাকসিনেট-Q রিডাকটেজ কমপ্লেক্সে পাঠায়।
  • দ্বিতীয় পর্যায়ে ইলেকট্রন গ্রহণ করে সাকসিনেট-Q রিডাকটেজ বিজারিত হয়, পরবর্তী পর্যায়ে ইলেকট্রনকে সাইটোক্রোম-C রিডাকটেজ কমপ্লেক্সে পাঠায়।
  • তৃতীয় পর্যায়ে সাইটোক্রোম-C রিডাকটেজ কমপ্লেক্স প্রথমে বিজারিত হয় ও পরে ইলেকট্রন বর্জনের মাধ্যমে জারিত হয় ও ইলেকট্রনকে সাইটোক্রোম-C অক্সিডেজ কমপ্লেক্সে প্রেরণ করে।

অন্তিম পর্যায়ে সাইটোক্রোম-C অক্সিডেজ কমপ্লেক্স ইলেকট্রন, H+ ও আণবিক অক্সিজেনকে একত্রিত করে জল উৎপন্ন করে।

[2H++12O2+2eH2O]\left[2H^++\frac12O^2+2e^-\rightarrow H_2O\right]

বিক্রিয়ার শেষে 1 অণু NADH + H+ থেকে ও অণু করে ATP এবং 1 অণু FADH₂ থেকে 2 অণু করে ATP উৎপন্ন হয়। ইলকট্রন প্রবাহের এই পথ ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম বা ইলেকট্রন পরিবহণ পদ্ধতি নামে পরিচিত।


আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘শ্বসন’ অংশের রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

পরিবেশ ও তার সম্পদ-বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন-জীবনবিজ্ঞান-নবম শ্রেণী

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

পরিবেশ ও তার সম্পদ-বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন-জীবনবিজ্ঞান-নবম শ্রেণী

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – টীকা

পরিবেশ ও তার সম্পদ-বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন-জীবনবিজ্ঞান-নবম শ্রেণী

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

About The Author

Souvick

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – টীকা

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – বাস্তুবিদ্যা ও বাস্তুবিদ্যার সংগঠন – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর