এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘পুষ্টি’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

পুষ্টির দুটি তাৎপর্য লেখো।
পুষ্টির তাৎপর্য –
- পুষ্টি দেহের বৃদ্ধি ও পরিস্ফুরণ ঘটায়, ক্ষয়পূরণ করে এবং বিভিন্ন কলাকোশের গঠন নিয়ন্ত্রণ করে।
- পুষ্টির মাধ্যমে খাদ্যস্থ স্থৈতিকশক্তি গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয় যার দ্বারা জীবের চলন, গমন, রেচন, শ্বসন, সংবহন প্রভৃতি জীবনের মৌলিক ধর্মগুলি পালিত হয়।
শ্বসন ও পুষ্টির সম্পর্ক কেমন?
শ্বসন ও পুষ্টির সম্পর্ক – শ্বসন ও পুষ্টি পরস্পর ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। শ্বসন ও পুষ্টি একে অপরের উপর নির্ভরশীল। পুষ্টি প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত সরলতম খাদ্যবস্তুটি (গ্লুকোজ) শ্বসন প্রক্রিয়ায় শ্বসন বস্তু হিসেবে নিয়োজিত হয়। আবার শ্বসনে শ্বসন বস্তু জারিত হয়ে উৎপাদিত শক্তি ব্যয় করে পুষ্টি পদ্ধতির পর্যায়গুলি সম্পন্ন হয়। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে পুষ্টি ও শ্বসন প্রক্রিয়া একে অপরের উপর অঙ্গাঙ্গিভাবে নির্ভরশীল।
প্রোটোজোয়া (অ্যামিবা) রাজ্যের পুষ্টি প্রক্রিয়া কী কী প্রকার হয়?
প্রোটোজোয়া (অ্যামিবা) রাজ্যের পুষ্টি প্রক্রিয়া প্রকার –
- হলোজোয়িক পুষ্টি (অ্যামিবা),
- হলোফাইটিক পুষ্টি (ইউগ্নিনা/ক্রাইসামিবা),
- স্যাফ্রোজোইক পুষ্টি (ইউগ্লিনা),
- প্যারাসাইটিক পুষ্টি (মনোসিস্টিস)।
প্রাণীর পুষ্টিতে জলের প্রয়োজনীয়তা কী?
প্রাণীর পুষ্টিতে জলের প্রয়োজনীয়তা –
- প্রাণীদেহে কঠিন খাদ্যবস্তুকে তরল ও পরিপাকের উপযোগী করে তুলতে জলের প্রয়োজন হয়।
- খাদ্যের পরিপাক জলের উপস্থিতিতে হয়।
- পাচিত খাদ্যের শোষণের জন্য জলের প্রয়োজন হয়।
- জল দেহের অম্লক্ষার ও তাপীয় ভারসাম্য বজায় রাখে।
হোলোফাইটিক পুষ্টি কাকে বলে?
হোলোফাইটিক পুষ্টি (Holophytic nutrition) – স্বভোজী উদ্ভিদের পরিবেশ থেকে ব্যাপন পদ্ধতিতে তরল ও গ্যাসীয় পরিপোষক (H₂O ও CO₂) নিয়ে নিজদেহে খাদ্য সংশ্লেষের মাধ্যমে পুষ্টি সম্পন্ন করার পদ্ধতিকে হোলোফাইটিক পুষ্টি বলে।
হোলোজোয়িক পুষ্টি কাকে বলে?
হোলোজোয়িক পুষ্টি (Holozoic Nutrition) – যে পুষ্টি পদ্ধতিতে জটিল খাদ্য গৃহীত হয়ে উৎসেচকের সাহায্যে পরিপাচিত হয়, পরিপাচিত খাদ্য শোষিত হয়ে কোশে পৌঁছায় ও আত্তীকরণ ঘটে এবং অপাচ্য খাদ্যের বহিষ্করণের মাধ্যমে প্রাণীদেহে সামগ্রিকভাবে পুষ্টি সম্পন্ন হয়, তাকে হোলোজোয়িক পুষ্টি বলে।
হলোজোয়িক পুষ্টির কোন্ পর্যায়ে কোনটি গঠিত হয় তা লেখো – কাইম, কাইলোমাইক্রন, বোলাস, মল।
- কাইম – হলোজোয়িক পুষ্টির পরিপাক বা পাচন পর্যায়ে কাইম সৃষ্টি হয়।
- কাইলোমাইক্রন – হলোজোয়িক পুষ্টির পরিপাক পর্যায়ে কাইলোমাইক্রন সৃষ্টি হয়।
- বোলাস – হলোজোয়িক পুষ্টির প্রথম পর্যায় অর্থাৎ খাদ্যগ্রহণ পর্যায়ে বোলাস সৃষ্টি হয়।
- মল – হলোজোয়িক পুষ্টির শেষ বা পঞ্চম পর্যায় অর্থাৎ অপাচ্য অংশের বহিঃস্করণ পর্যায়ে মল সৃষ্টি হয়।
সম্পূর্ণ পরজীবী উদ্ভিদ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
সম্পূর্ণ পরজীবী উদ্ভিদ যে-সমস্ত পরজীবী উদ্ভিদ সারাজীবন ধরে পোষকদেহের সঙ্গে যুক্ত থেকে পুষ্টি সম্পন্ন করে, তাদের সম্পূর্ণ পরজীবী উদ্ভিদ বলে। উদাহরণ – স্বর্ণলতা, আরসিউথোরিয়াম, বেনেবৌ, র্যাফ্লেসিয়া প্রভৃতি।
আংশিক পরজীবী উদ্ভিদ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
আংশিক পরজীবী উদ্ভিদ যে-সমস্ত পরজীবী উদ্ভিদ তাদের জীবনের কিছুটা সময় পোষক উদ্ভিদের সঙ্গে যুক্ত থেকে পরিপোষক সংগ্রহ করে, তাদের আংশিক পরজীবী উদ্ভিদ বলে। উদাহরণ – লোরানথাস, ক্যাসিথা, চন্দন প্রভৃতি উদ্ভিদ।
বহিঃপরজীবী ও অন্তঃপরজীবী উদ্ভিদের উদাহরণ দাও।
বহিঃপরজীবী উদ্ভিদ – স্বর্ণলতা। স্বর্ণলতা কুলগাছের বাইরে পেঁচিয়ে থাকে এবং চোষকমূলের সাহায্যে কুলগাছ থেকে পুষ্টি পদার্থ সংগ্রহ করে।
অন্তঃপরজীবী উদ্ভিদ – ফাইটোপথোরা ইনফেসটান্স নামক ছত্রাক। এটি আলুগাছের ভিতরে বাসা বাঁধে এবং কোশের ভিতরে অণুসূত্র প্রবেশ করিয়ে পরিপোষক সংগ্রহ করে।
দুটি বহিঃপরজীবী প্রাণীর নাম লেখো।
দুটি বহিঃপরজীবী প্রাণী হল – উকুন, ল্যামপ্রে।
দুটি অন্তঃপরজীবী প্রাণীর নাম লেখো।
দুটি অন্তঃপরজীবী প্রাণী হল – গোলকৃমি ও ফিতাকৃমি।
স্যাপ্রোফাইট কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
স্যাপ্রোফাইট (Saprophyte) – যে-সমস্ত উদ্ভিদ মৃত, পচনশীল জৈবপদার্থ থেকে পরিপোষক সংগ্রহের মাধ্যমে পুষ্টি সম্পন্ন করে, তাদের স্যাপ্রোফাইট বা মৃতজীবী উদ্ভিদ বলে।
উদাহরণ – পূর্ণ মৃতজীবী – ছত্রাক (অপুষ্পক উদ্ভিদ), মনোট্রোপা (সপুষ্পক উদ্ভিদ)। আংশিক মৃতজীবী – পাইনগাছের মূলে আবদ্ধ ছত্রাক।
উদ্ভিদরা পতঙ্গভুক হয় কেন?
অথবা, পতঙ্গভুক উদ্ভিদ পতঙ্গদেহ থেকে পুষ্টিরস সংগ্রহ করে কেন?
পতঙ্গভুক উদ্ভিদরা যে-সকল মৃত্তিকায় জন্মায়, সেই মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কম থাকায় এদের দেহে নাইট্রোজেনের ঘাটতি দেখা যায়। তাই নাইট্রোজেনের ঘাটতি মেটাতে এরা পোকামাকড় ধরে খায় এবং এই পোকামাকড়ের দেহের প্রোটিন থেকে নাইট্রোজেনের অভাব পূরণ করে। তাই এই সকল উদ্ভিদরা পতঙ্গভুক হয় অর্থাৎ পতঙ্গদের দেহ থেকে পুষ্টিরস শোষণ করে।
সিকোট্রফি কারা এবং এদের কেন বলে?
সিকোট্রফি হল খরগোশ, গিনিপিগ প্রভৃতি শাকাশি স্তন্যপায়ী প্রাণীরা। কারণ এই সমস্ত স্তন্যপায়ী শাকাশি প্রাণীরা সিকামের অর্ধপাচিত খাদ্য বা মল পেলেট হিসেবে নির্গত হলে, পূর্ণ পরিপাক ও পূর্ণ শোষণের জন্য পুনরায় তা ভক্ষণ করে। এই ধরনের পুষ্টি পদ্ধতিকে সিকোট্রফি বলে। সিকোট্রফি হল একপ্রকার কপ্রোফ্যাগি।
মিক্সোট্রফিক পুষ্টি কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
যে পুষ্টি পদ্ধতিতে জীব স্বভোজী ও মৃতজীবীয় পুষ্টি উভয়ই সম্পন্ন করে, তাকে মিক্সোট্রফিক পুষ্টি (Myxotrophic Nutrition) বলে। যেমন – ইউগ্নিনা দিনের বেলা সূর্যালোকের উপস্থিতিতে নিজদেহে খাদ্য সংশ্লেষ করে অর্থাৎ, স্বভোজী পুষ্টি সম্পন্ন করে। রাত্রিবেলা সূর্যালোকের অনুপস্থিতিতে এরা মৃত পচনশীল জৈবপদার্থ থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে অর্থাৎ, মৃতজীবীয় পুষ্টি সম্পন্ন করে।
সব খাদ্যই পরিপোষক কিন্তু সব পরিপোষকই খাদ্য নয় – উক্তিটি যুক্তি দ্বারা বুঝিয়ে দাও।
পরিবেশ থেকে নেওয়া যে-সমস্ত বস্তু জীবের সবরকমের শারীরবৃত্তীয় কাজে অংশ নিয়ে জীবের স্বাভাবিকতা বজায় রাখে, তাদের পরিপোষক বা নিউট্রিয়েন্টস বলে। যেমন – কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, খনিজ লবণ, ভিটামিন, জল।
যে-সমস্ত পরিপোষক জীবদেহে স্বাভাবিকতা বজায় রাখা ছাড়াও শক্তি উৎপাদনে অংশ নেয়, তাদের খাদ্য বা ফুড বলে। যেমন – কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট ও প্রোটিন।
সুতরাং, খনিজ লবণ, ভিটামিন ও জল পরিপোষক হলেও খাদ্য নয়। আবার কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাট খাদ্য এবং একই সঙ্গে পরিপোষকও।
‘দুধ সুষম খাদ্য নয়’ – উক্তিটির যথার্থতা ব্যাখ্যা করো।
যে খাদ্যে প্রোটিন, ফ্যাট, শর্করা, ভিটামিন, খনিজলবণ ও জল এমন পরিমাণে উপস্থিত থাকে যাতে জীবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে এবং যথাযথ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, সেই খাদ্যকে সুষম খাদ্য বলে। দুধে প্রত্যেকটি উপাদান উপস্থিত থাকলেও তা যথাযথ পরিমাণে থাকে না। যেমন – দুধে ভিটামিন-C এবং লৌহের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তাই আধুনিক পুষ্টিবিদের মতে দুধ সুষম খাদ্য নয়। দুধ একটি আদর্শ খাদ্য। তবে স্তন্যপানকারী শিশুদের ক্ষেত্রে মাতৃস্তন দুগ্ধ সুষম খাদ্য।
পৌষ্টিকনালির কোন্ কোন্ অংশকে আদর্শ পরিপাক স্থল বলে?
মুখগহ্বর, পাকস্থলী এবং ক্ষুদ্রান্ত্র হল আদর্শ পরিপাক স্থল।
মানবদেহে ক্ষরিত HCI -এর দুটি ভূমিকা লেখো।
মানবদেহে ক্ষরিত HCI -এর কাজ –
- খাদ্যস্থিত জীবাণুকে ধ্বংস করে।
- নিষ্ক্রিয় পেপসিনোজেনকে সক্রিয় পেপসিনে পরিণত করে এবং এই সক্রিয় পেপসিন প্রোটিন পরিপাকে অংশ নেয়।
পৌষ্টিকনালিতে খাদ্যবস্তুর দুটি যান্ত্রিক পরিপাক পদ্ধতির নাম লেখো।
দুটি যান্ত্রিক পরিপাক পদ্ধতি –
- খাদ্যবস্তু দাঁতের সাহায্যে চিবানো বা পেষাই করা ও
- পেরিস্ট্যালসিস মুভমেন্ট।
মানুষের দন্ত সংকেত লেখো।
মানুষের দন্ত সংকেত হল \(I\frac22,\;C\frac11,\;PM\frac22,\;M\frac33\) যেখানে, । = Incisor বা কৃন্তক, C = Canine বা ছেদক, PM = Premolar বা পুরঃপেষক, M = Molar বা পেষক।
বোলাস কী?
মুখগহ্বর থেকে যে চর্বিত, লালামিশ্রিত খাদ্যমণ্ড গ্রাসনালিতে প্রবেশ করে, তাকে বোলাস বলে।
কাইম ও কাইল কী?
কাইম – পাকস্থলীতে খাদ্য প্রায় 4 ঘণ্টা অবস্থান করে। এই সময় পাচকরসের উৎসেচক, HCI খাদ্যবস্তুকে আংশিকভাবে পাচিত করে। এইরূপ আংশিক গঠিত, অপাচিত খাদ্য, উৎসেচক ও HCI মিশ্রিত হয়ে যে অর্ধতরল অম্লজাতীয় মণ্ডের মতো পদার্থ উৎপন্ন করে, তাকে পাকমণ্ড বা কাইম (Chyme) বলে।
কাইল – ক্ষুদ্রান্ত্রে সম্পূর্ণ পাচিত তরল, সরল শোষণোপযোগী খাদ্যবস্তুকে কাইল (Chyle) বলে।
কোন্ পাচকরসে কোনো উৎসেচক থাকে না? এর কাজ লেখো।
পিত্তরসে কোনো উৎসেচক থাকে না।
পিত্তরসের কাজ –
- সোডিয়াম টরোকোলেট, সোডিয়াম নাইকোকোলেট নামক পিত্তলবণ ফ্যাটের বড়ো দানাগুলিকে ছোটো ছোটো কণায় বিভক্ত করে অবদ্রবে পরিণত করে, ফলে ফ্যাটের পরিপাক ত্বরান্বিত হয়।
- পিত্ত লবণ ফ্যাটে দ্রবীভূত ভিটামিন A, D, Eও K শোষণে সাহায্য করে।
পিত্তে কোনো উৎসেচক থাকে না তা সত্ত্বেও একে পাচকরস বলে কেন?
পিত্তরসে উপস্থিত পিত্তলবণ ফ্যাটের বৃহৎ দানাকে ছোটো ছোটো অবদ্রবে পরিণত করে। ফলে ফ্যাটের ওপর লাইপেজ উৎসেচক দ্রুত ক্রিয়া করে এবং ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারল উৎপাদন ত্বরান্বিত হয়। এই কারণে পিত্তকে পাচকরস বলা হয়।
মানব ক্ষুদ্রান্ত্র কটি অংশে বিভক্ত ও কী কী?
মানব ক্ষুদ্রান্ত্র তিনটি অংশে বিভক্ত। যথা –
- ডিওডিনাম,
- জেজুনাম ও
- ইলিয়াম।
ক্ষুদ্রান্ত্রের কোন্ অংশে পরিপাক ও কোন্ অংশে শোষণ ঘটে?
ক্ষুদ্রান্ত্রের ডিওডিনাম বা গ্রহণী অংশে পরিপাক এবং জেজুনাম ও ইলিয়াম অংশে শোষণ ঘটে।
ব্রুনার গ্রন্থি কোথায় দেখা যায়? এর কাজ কী?
ক্ষুদ্রান্ত্রের ডিওডিনামের সাবমিউকাস স্তরে ব্রুনার গ্রন্থি দেখা যায়।
কাজ – ব্রুনার গ্রন্থি থেকে ক্ষারীয় মিউকাস ক্ষরিত হয়।
মিসেল (Micelle) কী?
মিসেল বা মাইসেলি (Micelle) – ক্ষুদ্রান্ত্রের গহ্বরে মনো-গ্লিসারাইড, দীর্ঘ শৃঙ্খলযুক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, কোলেস্টেরল, ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিন, সোডিয়াম কার্বনেট প্রভৃতি মিলিতভাবে জলে দ্রবীভূত যে ক্ষুদ্র ফ্যাটের অণু গঠন করে, তাকে মিসেল বা মাইসেলি বলে।
কাইলোমাইক্রন কাকে বলে?
কাইলোমাইক্রন (Chylomicron) – ক্ষুদ্রান্ত্রের স্তম্ভাকার আবরণী কোশের অভ্যন্তরে ফসফোলিপিড, ট্রাইগ্লিসারাইড, কোলেস্টেরল সমন্বিত ফ্যাটি অ্যাসিড ও অল্প পরিমাণ প্রোটিন সহযোগে গঠিত ছোটো ছোটো ফ্যাট কণিকাকে কাইলোমাইক্রন বলে।
ভিলাই (Villi) কী? এর কাজ কী?
ক্ষুদ্রান্ত্রের অন্তর্গাত্রে অবস্থিত আঙুলের মতো প্রবর্ধিত অংশকে ভিলাই (Villi) বলে।
কাজ – ভিলাই ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রাচীরের শোষণতল বাড়িয়ে পাচিত খাদ্যবস্তুর শোষণে সাহায্য করে।
পৌষ্টিকতন্ত্রের অন্তর্গত বৃহদন্ত্রের কাজ কী?
বৃহদ্রন্ত্রের কাজ –
- জল শোষণ এবং
- অপাচ্য খাদ্যকে মল-এ রূপান্তরিত করা।
এ ছাড়া বৃহদন্ত্রে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া মিথোজীবী রূপে বসবাস করে এবং ভিটামিন B₁₂ সংশ্লেষে সাহায্য করে।
প্রোটিন কোথায় শোষিত হয়?
প্রোটিন জাতীয় খাদ্য পরিপাচিত হয়ে অ্যামিনো অ্যাসিডে পরিণত হয়। এই সমস্ত অ্যামিনো অ্যাসিড সক্রিয় শোষণ প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত প্রোটিন বাহকের মাধ্যমে প্রধানত ক্ষুদ্রান্ত্রের ইলিয়াম অংশ { দ্বারা শোষিত হয়ে পোর্টাল শিরার রক্তে পৌঁছায়।
কার্বোহাইড্রেট পৌষ্টিকনালির কোথায় শোষিত হয়?
জটিল কার্বোহাইড্রেট উৎসেচকের ক্রিয়ায় আর্দ্রবিশ্লেষিত হয়ে মনোস্যাকারাইড (যেমন – গ্লুকোজ, ফ্রুকটোজ, গ্যালাকটোজ প্রভৃতি)-এ পরিণত হয়। সমস্ত মনোস্যাকারাইড ক্ষুদ্রান্ত্রের ডিওডিনাম বা গ্রহণী এবং জেজুনাম অংশ দ্বারা বিশোষিত হয়। এ ছাড়া পাকস্থলীতেও অল্প পরিমাণ গ্লুকোজ বিশোষিত হয়ে থাকে।
পৌষ্টিকনালির কোন্ অংশে ফ্যাটের বিশোষণ ঘটে?
ফ্যাট পাচিত হয়ে জলে অদ্রবণীয় ফ্যাটি অ্যাসিড ও জলে দ্রবণীয় গ্লিসারলে পরিণত হয়। ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারল ক্ষুদ্রান্ত্রের জেজুনাম (মধ্য ক্ষুদ্রান্ত্র) ও ইলিয়াম-এ (নিম্ন ক্ষুদ্রান্ত্র) শোষিত হয়। ফ্যাটি অ্যাসিড ভিলাই -এর কেন্দ্রীয় লসিকাবাহ বা ল্যাকটিয়ালের মাধ্যমে লসিকাবাহে এবং গ্লিসারল পোর্টাল শিরার রক্তে প্রবেশ করে।
আত্তীকরণ কাকে বলে? এটি কোথায় ঘটে?
যে প্রক্রিয়ায় শোষিত সরল খাদ্য প্রোটোপ্লাজমের অংশ-বিশেষে পরিণত হয়, তাকে আত্তীকরণ (Assimilation) বলে।
সংঘটন স্থান – আত্তীকরণ কোশের প্রোটোপ্লাজমে ঘটে।
মানবপুষ্টিতে আত্তীকরণের ভূমিকা লেখো।
মানবপুষ্টিতে আত্তীকরণের ভূমিকা – প্রাণীপুষ্টির চতুর্থ পর্যায় হল আত্তীকরণ। সরল ও শোষণযোগ্য অবস্থার খাদ্যবস্তু কোশের প্রোটোপ্লাজমের মধ্যে অঙ্গীভূত হওয়াকে আত্তীকরণ বলে। আত্তীকৃত খাদ্যবস্তু প্রোটোপ্লাজমে যথাযথভাবে অঙ্গীভূত না হলে পুষ্টি পদ্ধতি সম্পূর্ণ হয় না। কারণ কোশের জৈবনিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলি চালু রাখার জন্য, তথা কোশের সজীবতা ধরে রাখার জন্য শক্তির প্রয়োজন। সেই শক্তির চাহিদা মেটে আত্তীকরণের মাধ্যমে। বিপাক ক্রিয়া ও দেহগঠনের জন্য শর্করা ও প্রোটিনের সরল অংশ ভিলাই-এর রক্তজালকের মাধ্যমে পোর্টাল সংবহনে যকৃতে আসে। যকৃৎ কোশে পুষ্টি সরবরাহ করে পুনরায় সাধারণ সংবহনে প্রবেশ করে এবং রক্তের মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন কলাকোশে পৌঁছায়। অপরপক্ষে ফ্যাটের সরল অংশ লসিকাবাহে প্রবেশ করে এবং লসিকানালির মাধ্যমে বিভিন্ন কলাকোশে পৌঁছায়।
পরিপাকগ্রন্থিগুলি কী কী?
পরিপাকগ্রন্থিগুলি হল –
- লালাগ্রন্থি,
- পাকস্থলী,
- যকৃৎ,
- অগ্ন্যাশয়,
- আন্ত্রিক গ্রন্থি।
উৎসেচককে জৈব অনুঘটক বলে কেন?
উৎসেচক কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উপস্থিত থেকে সাবস্ট্রেটের ক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, কিন্তু নিজে পরিবর্তিত হয় না, আবার উৎসেচক কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নিজে অংশগ্রহণ করে না ফলে পুনরায় এটি ব্যবহারযোগ্য হয়, তাই উৎসেচককে জৈব-অনুঘটক বলা হয়।
অ্যাপো-এনজাইম কী?
অ্যাপো-এনজাইম – উৎসেচক বা এনজাইমের প্রোটিনযুক্ত অংশ হল অ্যাপো-এনজাইম। যেম ন- পেপসিন।
কো-এনজাইম কী?
অ্যাপো-এনজাইমের সঙ্গে শিথিলভাবে যুক্ত অপ্রোটিন অংশকে কো-এনজাইম বলে। যেমন- NAD, FAD ইত্যাদি।
প্রো-এনজাইম কী?
এনজাইম বা উৎসেচক যে-সকল জৈব যৌগের আর্দ্রবিশ্লেষণের দ্বারা উৎপন্ন হয়, তাদের প্রো-এনজাইম বলে। যেমন – পেপসিনের প্রো-এনজাইম হল পেপসিনোজেন।
হলো-এনজাইম কী?
অ্যাপো-এনজাইম ও কো-এনজাইমকে একত্রে হলো-এনজাইম বলে।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের এবং মহিলার মৌলবিপাকের জন্য দৈনিক কত শক্তির প্রয়োজন হয়?
পুরুষের ক্ষেত্রে – 1728 kcal শক্তি।
মহিলার ক্ষেত্রে – 1650 kcal শক্তি।
এপিফাইট বা পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ কাকে বলে? এপিফাইট কীভাবে পুষ্টি সম্পন্ন করে?
এপিফাইট বা পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ – যে-সমস্ত স্বভোজী উদ্ভিদ অন্য আশ্রয়দাতা উদ্ভিদের কাণ্ড বা শাখাপ্রশাখায় জন্মায় এবং বেড়ে ওঠে, তাদের এপিফাইট বা পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ বলে। যেমন – গজপিপুল, রাস্না প্রভৃতি।

এপিফাইট উদ্ভিদের পুষ্টি পদ্ধতি –
- এপিফাইট পরাশ্রয়ী হলেও খাদ্যের ব্যাপারে স্বনির্ভরশীল, অর্থাৎ, স্বভোজী বা অটোট্রফস।
- এদের বায়বীয় মূল থাকে এবং মূলের গায়ে ভেলামেন নামক আবরণীকলা স্পঞ্জের মতো অবস্থান করে।
- ভেলামেনের সাহায্যে এরা বাতাস থেকে জলীয়বাষ্প শোষণ করে এবং ক্লোরোফিলের সাহায্যে নিজ দেহে খাদ্য সংশ্লেষ করে।
ব্যতিহার ও সহভোক্তা বলতে কী বোঝো?
ব্যতিহার বা মিউচুয়ালিজম – যে মিথোজীবীয় পুষ্টি পদ্ধতিতে দুটি ভিন্ন প্রকার জীব পরস্পরের সাহচর্যে থেকে পুষ্টি সম্পন্ন করে এবং উভয়েই উপকৃত হয়, তাকে ব্যতিহার মিথোজীবী বা মিউচুয়ালিজম বলে। উদাহরণ – লাইকেন, পাইন প্রভৃতি।
সহভোক্তা বা কমেনসালিজম – যে মিথোজীবীয় পুষ্টি পদ্ধতিতে দুটি ভিন্ন জীব সহাবস্থানে থেকেও পরস্পর পৃথকভাবে পুষ্টি সংগ্রহ করে এবং একে অন্যকে প্রভাবিত করে না, তাকে সহভোক্তা বা কমেনসালিজম বলে। উদাহরণ – গজপিপুল, রাস্না প্রভৃতি।
নিম্নলিখিত মিথোজীবী সম্পর্কগুলির উদাহরণ দাও –
i. উদ্ভিদের সঙ্গে উদ্ভিদের মিথোজীবিতা,
ii. উদ্ভিদের সঙ্গে প্রাণীর মিথোজীবিতা এবং
iii. প্রাণীর সঙ্গে প্রাণীর মিথোজীবিতা।
i. উদ্ভিদের সঙ্গে উদ্ভিদের মিথোজীবিতা – শৈবাল ও ছত্রাক পরস্পরের সাহচর্যে থেকে লাইকেন গঠন করে। এই সম্পর্ক দ্বারা শৈবাল ও ছত্রাক উভয়েই উপকৃত হয়।
ii. উদ্ভিদের সঙ্গে প্রাণীর মিথোজীবিতা – জুক্লোরেলা নামক শৈবাল হাইড্রার এন্ডোজোমে মিথোজীবীরূপে বাস করে। জুক্লোরেলা খাদ্য সংশ্লেষ করে হাইড্রাকে সরবরাহ করে এবং হাইড্রা জুক্লোরেলাকে CO₂ ও N₂ ঘটিত জৈববস্তু সরবরাহ করে।
iii. প্রাণীর সঙ্গে প্রাণীর মিথোজীবিতা – ই. কোলাই (Escherichia coli) নামক ব্যাকটেরিয়া মানুষের অস্ত্রে বাস করে এবং ভিটামিন B-কমপ্লেক্স সংশ্লেষে সাহায্য করে।
পতঙ্গভুক উদ্ভিদরা কীভাবে পুষ্টিলাভ করে?
পতঙ্গভুক উদ্ভিদের পুষ্টি সংগ্রহ পদ্ধতি – পতঙ্গভুক উদ্ভিদের পাতা পরিবর্তিত হয়ে বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গঠনগুলি রঙিন ও উজ্জ্বল বর্ণের হয়, যার ফলে কীটপতঙ্গ আকৃষ্ট হয়।
- পতঙ্গ উদ্ভিদের নির্দিষ্ট অঙ্গে বা ফাঁদে বসলে তা আবদ্ধ হয়। যেমন – কলশপত্রী উদ্ভিদে পতঙ্গ পিছলে ঘটের মতো অংশে পড়ে যায় বা সূর্যশিশিরে পাতার কর্ষিকা দ্বারা আবদ্ধ হয়।
- উদ্ভিদের পরিবর্তিত অঙ্গের গ্রন্থিকোশ থেকে প্রোটিন পাচনকারী উৎসেচক ক্ষরিত হয় এবং পতঙ্গের দেহকে পাচিত করে।
- পাচিত প্রোটিন উদ্ভিদ অঙ্গ শোষণ করে পুষ্টি লাভ করে।
বহিঃপরজীবী ও অন্তঃপরজীবী প্রাণী বলতে কী বোঝো?
বহিঃপরজীবী প্রাণী (Ectoparasite) – যে-সমস্ত প্রাণী অন্য কোনো পোষক প্রাণীর দেহের বাইরে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বসবাস করে পোষকদেহ থেকে পুষ্টিরস শোষণের মাধ্যমে পুষ্টি লাভ করে, তাদের বহিঃপরজীবী প্রাণী বা এক্টোপ্যারাসাইট বলে। যেমন – উকুন, ছারপোকা প্রভৃতি।
অন্তঃপরজীবী প্রাণী (Endoparasite) – যে-সমস্ত প্রাণী অন্য কোনো পোষকপ্রাণীর দেহের অভ্যন্তরে স্থায়ীভাবে বসবাস করে পোষকদেহ থেকে পুষ্টিরস শোষণের মাধ্যমে পুষ্টি লাভ করে, তাদের অন্তঃপরজীবী বা এন্ডোপ্যারাসাইট বলে। যেমন – গোলকৃমি, ফিতাকৃমি, জিয়ার্ডিয়া, এন্টামিবা প্রভৃতি।
কপ্রোফ্যাগি বলতে কী বোঝো? কপ্রোফ্যাগির গুরুত্ব লেখো।
কপ্রোফ্যাগি (Coprophagy) – যে পদ্ধতিতে গিনিপিগ, খরগোশ প্রভৃতি তৃণভোজী প্রাণীরা নিজেদের রাত্রিকালীন জৈবপদার্থ সমৃদ্ধ পিচ্ছিল মল ভক্ষণ করে পুষ্টিলাভ করে, তাকে কপ্রোফ্যাগি বলে।
কপ্রোফ্যাগির গুরুত্ব –
- গিনিপিগ, খরগোশ প্রভৃতি কপ্রোফেগাস প্রাণীরা রাত্রিবেলা যে মল ত্যাগ করে তাতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি উপাদান থেকে যায়।
- এই সমস্ত প্রাণীদের সিকাম অংশে ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে সেলুলোজ পাচন ঘটে, ফলে রাত্রিকালীন নির্গত মলে সরল শর্করা, অ্যামিনো অ্যাসিড প্রভৃতি পুষ্টি উপাদান থাকে এবং এরা এই মল ভক্ষণ করে সম্পূর্ণ ও বেশি পুষ্টি লাভ করে।
- পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, যদি গিনিপিগ বা খরগোশকে ওই মল খেতে বাধা দেওয়া হয় তাহলে তারা অপুষ্টিজনিত রোগে আক্রান্ত হয়।
স্যাংগুইনিভোরি বলতে কী বোঝো? একটি উদাহরণ দাও।
স্যাংগুইলিভোরি – যে প্রকার পরভোজীয় পুষ্টি পদ্ধতিতে কোনো জীব অন্য জীবের (বিশেষত স্তন্যপায়ী) দেহ থেকে রক্ত পান করে পুষ্টি পদার্থ সংগ্রহ করে, তাকে স্যাংগুইনিভোরি বলে। প্রাণীগুলিকে স্যাংগুইনিভোর প্রাণী বলে।
উদাহরণ – মশা, রক্তচোষা বাদুড় প্রভৃতি।
হোলোজোয়িক পুষ্টি কাকে বলে? এই প্রকার পুষ্টির পর্যায় ও গুরুত্ব উল্লেখ করো।
হোলোজোয়িক পুষ্টি (Holozoic Nutrition) – যে পুষ্টি পদ্ধতিতে কঠিন, জটিল ও অদ্রবণীয় খাদ্য প্রাণীদেহে গৃহীত হয়ে উৎসেচকের ক্রিয়ায় সরল, দ্রবণীয়, শোষণোপযোগী খাদ্য উপাদানে পরিণত হয়, তাকে হোলোজোয়িক পুষ্টি বলে।
হোলোজোয়িক পুষ্টির পর্যায় – পাঁচটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। যথা –
- খাদ্যগ্রহণ,
- খাদ্য পরিপাক বা পাচন,
- শোষণ,
- আত্তীকরণ,
- খাদ্যের অপাচ্য অংশের বহিষ্করণ।
গুরুত্ব – হোলোজোয়িক পুষ্টির মাধ্যমে প্রাণীদেহে গৃহীত কঠিন, জটিল ও অদ্রবণীয় খাদ্য প্রাণীর ব্যবহারযোগ্য খাদ্য উপাদানে পরিণত হয়।
পরিপাক কাকে বলে? পরিপাক কত প্রকারের ও কী কী?
পরিপাক (Digestion) – যে পর্যায়ক্রমিক ভৌত-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রাণীদেহে গৃহীত কঠিন, জটিল ও অদ্রবণীয় খাদ্যবস্তু পৌষ্টিকনালির বিভিন্ন অংশে উৎসেচকের ক্রিয়ায় বিশ্লিষ্ট হয়ে সরল, শোষণোপযোগী দ্রবণীয় খাদ্যরসে পরিণত হয়, তাকে পরিপাক বলে।
ইহা দুই প্রকার। যথা –
- যান্ত্রিক পরিপাক এবং
- রাসায়নিক পরিপাক।
যান্ত্রিক পরিপাক – দাঁত, লালারস, জিভের সাহায্যে বড়ো বড়ো খাদ্যের টুকরোগুলি যান্ত্রিকভাবে ভেঙে ছোটো ছোটো টুকরোয় পরিণত হয়ে অর্ধ-তরল মণ্ডে (Paste) পরিণত হয়। যান্ত্রিক পরিপাকের ফলে খাদ্যের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি পায়, ফলে বিভিন্ন উৎসেচক ভালোভাবে কাজ করতে পারে এবং অর্ধ-তরল খাদ্য খুব সহজেই খাদ্যনালির মধ্যে প্রবেশ করতে পারে।
রাসায়নিক পরিপাক – বহিঃকোশীয় উৎসেচকগুলি খাদ্য কণাকে প্রধানত আর্দ্র-বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় পরিপাক করে এমন ক্ষুদ্র কণায় পরিণত করে যাতে কণাগুলি খুব সহজেই খাদ্যনালির প্রাচীর অতিক্রম করতে পারে। অর্থাৎ, শোষণের উপযোগী হয়।
খাদ্য পরিপাকের প্রয়োজনীয়তাগুলি লেখো।
খাদ্য পরিপাকের প্রয়োজনীয়তা –
- প্রাণীরা যে-সমস্ত খাদ্য গ্রহণ করে তা জটিল ও কঠিন প্রকৃতির হয়।
- এই জটিল খাদ্য কোশ সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না।
- পৌষ্টিকনালির বিভিন্ন অংশে ক্ষরিত উৎসেচকের সাহায্যে এই সমস্ত জটিল, অদ্রবণীয় খাদ্য বিশ্লিষ্ট হয়ে সরল, শোষণোপযোগী দ্রবণীয় খাদ্য উপাদানে পরিণত হয়।
- এই দ্রবণীয় খাদ্য উপাদান রক্তে প্রবেশ করে এবং কলাকোশে প্রেরিত হয়।
- পরিপাকের মাধ্যমে উৎপন্ন খাদ্য উপাদানই কোশীয় বিপাকে অংশগ্রহণ করে অর্থাৎ, আত্তীকরণ ঘটে।
- পরিপাকের ফলে কার্বোহাইড্রেট থেকে গ্লুকোজ, প্রোটিন থেকে অ্যামিনো অ্যাসিড এবং ফ্যাট থেকে ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারল উৎপন্ন হয়, যা জীবনধারণের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় উপাদান।
যান্ত্রিক পরিপাক বলতে কী বোঝো? পৌষ্টিকনালির কোন্ কোন্ অংশে যান্ত্রিক পরিপাক ঘটে?
যান্ত্রিক পরিপাক (Mechanical Digestion) – যে প্রক্রিয়ায় বৃহৎ আকারের খাদ্যদ্রব্য বাহ্যিক আঘাতের দ্বারা ছোটো ছোটো খাদ্য কণায় পরিণত হয়, তাকে যান্ত্রিক পরিপাক বলে।
মানব পৌষ্টিকনালির বিভিন্ন অংশে যান্ত্রিক পরিপাক পদ্ধতি –
| পৌষ্টিকনালির অংশ | যান্ত্রিক পরিপাক পদ্ধতি |
| মুখবিবর | দাঁতের সাহায্যে খাদ্যবস্তু পেষাই করা বা চিবানো। |
| গ্রাসনালি ও ক্ষুদ্রান্ত্র | অনৈচ্ছিক পেশির ক্রমসংকোচন বিচলন বা পেরিস্ট্যালসিস মুভমেন্টের দ্বারা খাদ্যবস্তু চূর্ণবিচূর্ণ হয় এবং সামনের দিকে অগ্রসর হয়। |
| পাকস্থলী | পাকস্থলী প্রাচীরের পেশিসমূহের ক্রমাগত সংকোচন ও প্রসারণ খাদ্যবস্তুর যান্ত্রিক পরিপাকে সাহায্য করে। |
কার্বোহাইড্রেটের পরিপাক স্থল, সংশ্লিষ্ট উৎসেচক, সাবস্ট্রেট ও বিক্রিয়ালব্ধ বা অন্তর্জাত পদার্থের নাম সারণি আকারে উল্লেখ করো।
| কার্বোহাইড্রেট পরিপাক স্থল | সংশ্লিষ্ট উৎসেচক | সাবস্ট্রেট | অন্তর্জাত পদার্থ |
| লালারস | i. টায়ালিন ii. মলটেজ | i. সিদ্ধ শ্বেতসার ii. মলটোজ | i. মলটোজ, আইসোমলটোজ ii. গ্লুকোজ |
| পাকস্থলী (পাকগ্রন্থি) | কোনো কার্বোহাইড্রেট পরিপাককারী উৎসেচক থাকে না। | ||
| ক্ষুদ্রান্ত্র | আন্ত্রিক রস – i. সুক্রেজ ii. ল্যাকটেজ iii. মলটেজ | i. সুক্রোজ ii. ল্যাকটোজ iii. মলটোজ | i. গ্লুকোজ ও ফ্রুকটোজ ii. গ্লুকোজ ও গ্যালাকটোজ iii. গ্লুকোজ |
| অগ্ন্যাশয় রস – i. অ্যামাইলেজ ii. মলটেজ | i. সিদ্ধ ও অসিদ্ধ বা কাঁচা শ্বেতসার এবং ডেক্সট্রিন ii. মলটোজ | i. মলটোজ ii. গ্লুকোজ |
মানব পৌষ্টিকনালিতে প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের পরিপাক স্থল, সংশ্লিষ্ট উৎসেচক, সাবস্ট্রেট ও অন্তর্জাত পদার্থের নাম সারণি আকারে উল্লেখ করো।
| পরিপাক স্থল | পরিপাককারী উৎসেচক | সাবস্ট্রেট | অন্তর্জাত পদার্থ |
| মুখবিবর (লালাগ্রন্থি) | লালারসে প্রোটিন পরিপাককারী কোনো উৎসেচক থাকে না। | ||
| পাকস্থলী (পাকগ্রন্থি) | পাকরস – i. পেপসিন ii. রেনিন | i. প্রোটিন ii. দুগ্ধ প্রোটিন | i. পেপটোন ii. কেসিন |
| ক্ষুদ্রান্ত্র | আন্ত্রিকরস – i. ইরেপসিন | নিম্নতর পেপটাইড | অ্যামিনো অ্যাসিড |
| অগ্ন্যাশয় রস – i. ট্রিপসিন | পেপটোন | অ্যামিনো অ্যাসিড | |
| ii. কাইমোট্রিপসিন | দুগ্ধ প্রোটিন | দুধের তঞ্চন/কেসিন |
মানব পৌষ্টিকনালিতে ফ্যাট জাতীয় খাদ্যের পরিপাক স্থল, সংশ্লিষ্ট উৎসেচক, সাবস্ট্রেট ও অন্তর্জাত পদার্থের নাম সারণি আকারে উল্লেখ করো।
| পরিপাক স্থল | পরিপাককারী উৎসেচক | সাবস্ট্রেট | অন্তর্জাত পদার্থ |
| মুখগহ্বর (লালাগ্রন্থি) | লালারসে ফ্যাট পরিপাককারী কোনো উৎসেচক থাকে না। | ||
| পাকস্থলী (পাকগ্রন্থি) | পাকরস – গ্যাস্ট্রিক লাইপেজ | ফ্যাট | ফ্যাটি অ্যসিড ও গ্লিসারল |
| যকৃৎ | পিত্তরস – কোনো উৎসেচক থাকে না। পিত্তরসে উপস্থিত পিত্তলবণ ফ্যাটকে অবদ্রবে পরিণত করে। | ||
| ক্ষুদ্রান্ত্র | অগ্ন্যাশয় রস – i. প্যানিক্রিয়েটিক লাইপেজ | ফ্যাট | ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারল |
| আন্ত্রিক রস – i. আন্ত্রিক লাইপেজ | ফ্যাট | ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারল |
তুমি বিদ্যালয়ে আসার সময় রুটি, মাখন, মাংস খেয়ে আসলে – এই খাদ্যসামগ্রী পরিপাকতন্ত্রে কীভাবে পাচিত হবে?
এখানে রুটি হল কার্বোহাইড্রেট/শর্করা জাতীয় খাদ্য, মাখন হল ফ্যাটজাতীয় খাদ্যবস্তু এবং মাংস হল প্রোটিনজাতীয় খাদ্যবস্তু। সুতরাং আমার পৌষ্টিকনালিতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট এই তিন প্রকার খাদ্যের পরিপাক আলোচনা করা হল।
বাটার সহ রুটির পরিপাক – মাখন সহ রুটিতে থাকে শ্বেতসার এবং ট্রাইগ্লিসারাইড নামক ফ্যাট। শ্বেতসার লালারসে অবস্থিত টায়ালিন, অগ্ন্যাশয় ও আন্ত্রিক রসে অবস্থিত অ্যামাইলেজ ও মলটেজ নামক উৎসেচকের সাহায্যে পাচিত হয়। অপরপক্ষে, মাখনের ফ্যাট পাকরস, অগ্ন্যাশয় রস ও আন্ত্রিক রসে অবস্থিত উৎসেচক লাইপেজের সাহায্যে পাচিত হয়। উৎসেচকগুলির ক্রিয়া নিম্নরূপ –
| টায়ালিন | টায়ালিন সিদ্ধ শ্বেতসারকে মলটোজে পরিণত করে। |
| অ্যামাইলেজ | শ্বেতসারকে মলটোজে পরিণত করে। |
| মলটেজ | মলটেজ মলটোজকে গ্লুকোজে পরিণত করে। |
| লাইপেজ | ফ্যাটকে ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারলে পরিণত করে। |
মাংসের পরিপাক – মাংসের উপাদান হল প্রোটিন। প্রোটিন পাকরসে অবস্থিত পেপসিন, অগ্ন্যাশয় রসে অবস্থিত ট্রিপসিন এবং আন্ত্রিক রসে অবস্থিত ইরেপসিন নামক উৎসেচকের সাহায্যে পাচিত হয়। প্রোটিন পরিপাকে এদের ভূমিকা নিম্নরূপ –
| পেপসিন | এটি প্রোটিন/মাংসকে পেপটোনে পরিণত করে। |
| ট্রিপসিন | এটি মাংসের পেপটোন ও প্রোটিনকে লোয়ার পেপটাইড এবং অ্যামিনো অ্যাসিডে পরিণত করে। |
| ইরেপসিন | এটি লোয়ার পেপটাইডকে অ্যামিনো অ্যাসিডে পরিণত করে। |
নিম্নলিখিত যৌগগুলির মধ্যে কোনগুলি মানবদেহে পাচিত হয় তা লেখো। সেলুলোজ, ডেক্সট্রোজ, সুক্রোজ, লিভুলোজ, বায়োটিন, কোলেস্টেরল, অ্যামাইলোজ, লেসিথিন, সেরিন, কোলিন, ট্রাইগ্লিসারাইড, H₃PO₄।
| মানবদেহে পাচিত হয় | মানবদেহে পাচিত হয় না |
| সুক্রোজ, লেসিথিন সেরিন, ট্রাইগ্লিসারাইড, H₃PO₄ | সেলুলোজ, ডেক্সট্রোজ, লেভুলোজ, বায়োটিন |
কোলেস্টেরল – মুক্ত কোলেস্টেরলের পাচনের প্রয়োজন হয় না। কোলেস্টেরল যৌগের পাচন হয়।
মানুষের খাদ্য পরিপাকে অগ্ন্যাশয়ের ভূমিকা লেখো। অথবা, অগ্ন্যাশয় রসে উপস্থিত শর্করা, প্রোটিন, ফ্যাট পরিপাককারী উৎসেচকের ভূমিকা লেখো।
পরিপাকে অগ্ন্যাশয়ের ভূমিকা – পাকস্থলী থেকে অর্ধপাচিত কাইম ক্ষুদ্রান্ত্রের ডিওডিনামে আসে এবং সেইসময় পিত্তাশয় থেকে পিত্তরস, অগ্ন্যাশয় থেকে অগ্ন্যাশয় রস, ক্ষুদ্রান্ত্রের আন্ত্রিক গ্রন্থি থেকে আন্ত্রিক রস খাদ্যবস্তুর সঙ্গে মেশে। অগ্ন্যাশয় রসে নিম্নলিখিত পরিপাককারী উৎসেচক বর্তমান।
1. শর্করা পরিপাককারী উৎসেচকের ভূমিকা –
i. অগ্ন্যাশয় রসে উপস্থিত α-অ্যামাইলেজ উৎসেচকটি গ্লাইকোজেন ও শ্বেতসারকে বিশ্লিষ্ট করে মলটোজ উৎপন্ন করে।
2. ফ্যাট পরিপাককারী উৎসেচকের ভূমিকা –
i. অগ্ন্যাশয় রসে অবস্থিত লাইপেজ ফ্যাটজাতীয় উপাদানকে বিশ্লিষ্ট করে ফ্যাটি অ্যাসিড ও মনোগ্লিসারাইড-এ পরিণত করে।
3. প্রোটিন পরিপাককারী উৎসেচকের ভূমিকা –
i. অগ্ন্যাশয় রসে অবস্থিত ট্রিপসিন প্রোটিনজাতীয় খাদ্যকে ভেঙে অ্যামিনো অ্যাসিডে পরিণত করে।
প্রোটিন → পেপটোন → পলিপেপটাইড → অ্যামিনো অ্যাসিড
ii. অগ্ন্যাশয় রসে থাকা ইলাস্টেজ উৎসেচকটি ইলাস্টিনকে ভেঙে পেপটাইড গঠন করে।
iii. অগ্ন্যাশয় রসে থাকা কোলাজিনেজ কোলাজেনকে ভেঙে পেপটাইড গঠন করে।
খাদ্য পরিপাকে যকৃতের ভূমিকা লেখো।
খাদ্য পরিপাকে যকৃতের ভূমিকা –
- যকৃৎ থেকে নিঃসৃত পিত্তরসে কোনো উৎসেচক থাকে না তবে অস্ত্রে ক্ষারীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে কাইমকে ক্ষারীয় করে এবং ক্ষারীয় পরিবেশে কার্যকরী উৎসেচকগুলিকে সক্রিয় করে।
- পিত্তরসে অবস্থিত পিত্ত লবণ স্নেহজাতীয় উপাদানকে অবদ্রবে পরিণত করে এতে পরিপাককারী উৎসেচকগুলি সহজে তাদের কার্যকারিতা বজায় রাখতে পারে।
- পিত্ত লবণ ফ্যাট জাতীয় উপাদানের শোষণে সাহায্য করে।
- যকৃৎ ভিটামিন A, D ও গ্লাইকোজেনের সঞ্চয়ভাণ্ডার রূপে কাজ করে।
কোশের অভ্যন্তরে পরিপোষকের পরিণতি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।
কোশের অভ্যন্তরে পরিপোষাকর পরিণতি – শোষিত খাদ্যরস বা খাদ্য উপাদান সংবহনতন্ত্রের মাধ্যমে দেহের সমস্ত কোশে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় অংশের বিপাক ঘটে। এই বিপাক ক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন শক্তি বিভিন্ন জৈবনিক ক্রিয়ায় সাহায্য করে। সরল খাদ্য উপাদান বিভিন্ন কোশে উৎসেচকের সাহায্যে পুনরায় জটিল খাদ্যে পরিণত হয় এবং জীবদেহে সঞ্চিত থাকে। যেমন –
- গ্লুকোজ জাতীয় সরল শর্করা গ্লাইকোজেন নামক পলিস্যাকারাইডে পরিণত হয়ে যকৃৎ ও পেশিকোশে সঞ্চিত থাকে।
- গ্লুকোজের কিছু অংশ বিভিন্ন সংশ্লেষমূলক প্রক্রিয়ায় প্রোটিন ও ফ্যাট উৎপন্ন করে।
- অ্যামিনো অ্যাসিড উৎসেচকের উপস্থিতিতে প্রোটিন সংশ্লেষ করে এবং দেহগঠনে ও ক্ষয়পূরণে সাহায্য করে।
- ডিঅ্যামাইনেজ উৎসেচক অ্যামিনো অ্যাসিডকে অ্যামোনিয়া ও নাইট্রোজেনবিহীন পদার্থে পরিণত করে। N₂-বিহীন অংশ থেকে মনোস্যাকারাইড এবং অ্যামোনিয়া যকৃতে অরনিথিন চক্রের মাধ্যমে ইউরিয়ায় পরিণত হয়।
- ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারল পুনরায় ফ্যাটে পরিণত হয় এবং মেদকলারূপে দেহের বিভিন্ন অংশে জমা হয়।
নিওগ্লুকোজেনেসিস, গ্লাইকোলাইসিস ও গ্লাইকোজেনেসিস কাকে বলে?
নিওগ্লুকোজেনেসিস – যে উৎসেচক নিয়ন্ত্রিত জৈব রাসায়নিক পদ্ধতিতে কার্বোহাইড্রেট ছাড়া অন্য কোনো জৈবযৌগ (ল্যাকটিক অ্যাসিড, অ্যামিনো অ্যাসিড) থেকে গ্লুকোজ বা গ্লাইকোজেন অর্থাৎ শর্করা জাতীয় পদার্থ উৎপন্ন হয়, তাকে নিওগ্লুকোজেনেসিস বলে।
গ্লাইকোলাইসিস – যে উৎসেচক নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে কোশের সাইটোপ্লাজমে অক্সিজেনের অনুপস্থিতি গ্লুকোজ অণু আংশিকভাবে জারিত হয়ে পাইরুভিক অ্যাসিড উৎপন্ন করে, তাকে গ্লাইকোলাইসিস বলে।
গ্লাইকোজেনেসিস – যে পদ্ধতিতে যকৃৎ ও পেশি কোশে গ্লুকোজ থেকে গ্লাইকোজেনের সংশ্লেষ ঘটে, তাকে গ্লাইকোজেনেসিস বলে।
বহিষ্করণ (Egestion) কাকে বলে? বহিষ্করণ পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দাও।
বহিষ্করণ (Egestion) – যে পদ্ধতিতে মলাশয়ে সঞ্চিত অপাচ্য খাদ্য ও অশোষিত অংশ মলাকারে দেহ থেকে পায়ু দ্বারা নির্গত হয়, তাকে বহিষ্করণ বলে। সংশ্লিষ্ট অঙ্গ সিগময়েড কোলন, মলাশয় ও পায়ুছিদ্র।
বহিষ্করণ পদ্ধতি –
- খাদ্যের অপাচ্য ও অশোষিত অংশ বৃহদন্ত্রে জল শোষণের ফলে অর্ধকঠিন মলে পরিণত হয়।
- বৃহদন্ত্রের ক্রমসংকোচন-বিচলনের ফলে মল সাময়িকভাবে মলাশয়ে সঞ্চিত হয় এবং ক্রমাগত এর পরিমাণ বাড়তে থাকে।
- মলের আয়তন বৃদ্ধির ফলে মলাশয় প্রাচীরে চাপ পড়ে। এর প্রভাবে মলাশয়ের বহিস্থ স্ফিংটার পেশি প্রসারিত ও অন্তস্থ স্ফিংটার পেশি সংকুচিত হয়।
- মলাশয়ের প্রসারণ পেলভিক স্প্যাংকনিক নার্ভকে উদ্দীপিত করে, যার দ্বারা বৃহদন্ত্রের সংকোচন তীব্র হয়।
- সামগ্রিকভাবে মলত্যাগের জন্য চাপ সৃষ্টি হয় ও পায়ুছিদ্র দ্বারা মল দেহের বাইরে নির্গত হয়।
সুষম খাদ্যে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাটের অনুপাত কীরূপ থাকা উচিত? দুধ শিশুদের ক্ষেত্রে সুষম খাদ্য কিন্তু বয়স্কদের ক্ষেত্রে তা সুষম খাদ্যরূপে বিবেচিত হয় না কেন?
সুষম খাদ্যে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাটের অনুপাত হল – কার্বোহাইড্রেট প্রোটিন ফ্যাট 405 গ্রাম : 100 গ্রাম : 100 গ্রাম; অর্থাৎ, 4 : 1 : 1।
দেহের যাবতীয় শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপ যে-সমস্ত খাদ্য উপাদান দ্বারা পরিচালিত হয় তা সুষম খাদ্যে যথাযথ এবং উপযুক্ত অনুপাতে থাকে। দুধ শিশুদের ক্ষেত্রে সুষম খাদ্য, কারণ- শিশুদের শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপ সম্পাদনের জন্য যে-সমস্ত খাদ্য উপাদানের প্রয়োজন তা সমস্তই যথাযথভাবে দুধ থেকে পেয়ে থাকে। কিন্তু বয়স্কদের ক্ষেত্রে দুধ সুষম খাদ্য নয় কারণ, দুধে লোহা (Fe) ও ভিটামিন C অত্যন্ত কম পরিমাণে থাকে যার দ্বারা বয়স্কদের চাহিদা মেটে না। এই কারণে দুধকে শিশুদের ক্ষেত্রে সুষম খাদ্য বলা হলেও প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দুধকে সুষম খাদ্য বলা যায় না।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দৈনিক কত ক্যালোরি শক্তির প্রয়োজন হয়? এই শক্তি পাওয়ার জন্য সুষম খাদ্য কীভাবে সাহায্য করে?
একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দৈনিক 3000 kcal শক্তির প্রয়োজন হয়।
দৈনিক ক্যালোরি প্রাপ্তিতে সুষম খাদ্যের ভূমিকা –
| খাদ্য উপাদান | দৈনিক প্রয়োজন | শক্তির পরিমাপ | মোট প্রাপ্ত শক্তি |
| কার্বোহাইড্রেট | 405 গ্রাম | 4.0 × 405 | 1660 kcal |
| প্রোটিন | 100 গ্রাম | 4.1 × 100 | 410 kcal |
| ফ্যাট | 100 গ্রাম | 9.3 × 100 | 930 kcal |
গ্লুকোজ বিপাকের সমস্যাজনিত একটি রোগের নাম লেখো। পৌষ্টিকতন্ত্রের কোন্ অংশ এই রোগকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে উল্লেখ করো।
গ্লুকোজ বিপাকের সমস্যাজনিত একটি রোগ হল হাইপার গ্লাইসেমিয়া বা রক্তশর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি (120 mg বা তারও বেশি গ্লুকোজ/100 mL রক্ত)।
হাইপার-গ্লাইসেমিয়া নিয়ন্ত্রণ করে যকৃৎ। যকৃৎ রক্তের অতিরিক্ত গ্লুকোজকে গ্লাইকোজেনেসিস-এর মাধ্যমে গ্লাইকোজেনে পরিণত করে। আবার চাহিদা তৈরি হলে গ্লাইকোজেনোলাইসিসের মাধ্যমে গ্লাইকোজেন ভেঙে রক্তে গ্লুকোজ সরবরাহ করে। কোনো কারণে গ্লাইকোজেনেসিস বিপাক ব্যাহত হলে রক্তে শর্করার পরিমাণ (স্বাভাবিক পরিমাণ 80-120 mg/100 mL) বৃদ্ধি পায় এবং হাইপারগ্লাইসেমিয়া দেখা দেয়।
বিপাকের তাৎপর্যগুলি আলোচনা করো।
বিপাকের তাৎপর্য –
শক্তি সরবরাহ – জীবকোশে গ্লাইকোলাইসিস, ক্রেবসচক্র, প্রান্তীয় শ্বসন প্রভৃতি বিপাকক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন হয়। সবাত শ্বসনে এক গ্রাম অণু গ্লুকোজ জারণে 686 kcal শক্তি (38 অণু ATP) উৎপন্ন হয়।
শক্তি সঞ্চয় –
- গ্লাইকোজেনেসিস বিপাক ক্রিয়ার মাধ্যমে অতিরিক্ত গ্লুকোজ যকৃৎ ও পেশিকোশে গ্লাইকোজেনরূপে সঞ্চিত হয়, যা ভবিষ্যতে শক্তির উৎসরূপে কাজ করে।
- মানুষের দেহে প্রায় 750 gm গ্লুকোজ গ্লাইকোজেনরূপে (যকৃতে 350 gm এবং পেশিতে 400 gm) সঞ্চিত থাকে।
- যকৃতে সংশ্লেষিত ফসফোলিপিডের বেশিরভাগ অংশ শক্তিপ্রদায়ী ফ্যাট বা মেদকলারূপে দেহে সঞ্চিত থাকে।
ক্ষয়ক্ষতি পূরণ ও কলা গঠন –
- দেহের গঠন, স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজে, ক্ষয়ক্ষতিপূরণ প্রভৃতি সম্পাদনের জন্য ফ্যাট ও প্রোটিন বিপাক অপরিহার্য।
- যকৃৎ, ত্বক, অস্থি, তরুণাস্থি, লিগামেন্ট প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকার কলার গঠনে গ্লুকোজ ও প্রোটিনের সমন্বয়ে গঠিত গ্লাইকোপ্রোটিন, মিউকোপলিস্যাকারাইডের একান্ত প্রয়োজন হয়।
- ফ্যাট ও প্রোটিনের সমন্বয়ে গঠিত লাইপোপ্রোটিন কোশপর্দা গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘পুষ্টি’ অংশের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন