এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘রেচন’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

রেচনকে অপচিতিমূলক বিপাকক্রিয়া বলে কেন?
রেচনক্রিয়ার ফলে জীবদেহে জটিল জৈবযৌগ বিশ্লিষ্ট হয়ে সরল জৈব বা অজৈব যৌগে পরিণত হয় এবং দূষিত বিপাকজাত পদার্থগুলি দেহ থেকে নির্গত হয়। এর ফলে জীবদেহের শুষ্ক ওজন হ্রাস পায় বলে, রেচনকে অপচিতি বিপাক বলা হয়।
রেচনের দুটি উদ্দেশ্য লেখো।
রেচনের দুটি উদ্দেশ্য –
- দেহকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখা – বিপাকক্রিয়ায় উৎপন্ন দূষিত পদার্থগুলিকে দেহ থেকে নির্গত করে দেহকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখা।
- দেহে জলসাম্য বজায় রাখা – রেচনের মাধ্যমে জীবদেহ থেকে অতিরিক্ত জল নির্গমন ঘটে এবং দেহে জলসাম্য বজায় থাকে।
‘সব রেচন পদার্থই বর্জ্যপদার্থ, কিন্তু সব বর্জ্যপদার্থ রেচন পদার্থ নয়’ – ব্যাখ্যা দাও।
যেসব পদার্থ দেহে উৎপন্ন হয় এবং দেহের পক্ষে ক্ষতিকারক, তাদের বর্জ্যপদার্থ বলে। যেমন – মল, মূত্র। মল দেহে উৎপন্ন বর্জ্যপদার্থ হলেও বিপাকক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন হয় না। তাই মল রেচনপদার্থ নয়, মল হল আসলে খাদ্যের অপাচ্য অংশ। অপরদিকে দেহে বিপাকক্রিয়ার ফলে মূত্র উৎপন্ন হয়, তাই এটি রেচন পদার্থ।
মলকে রেচন পদার্থরূপে গণ্য করা হয় না কেন?
মল প্রাণীদেহে অপাচ্য খাদ্যবস্তুর রূপান্তর। এটি বিপাকক্রিয়ায় উৎপন্ন হয় না। এই কারণে, মলকে রেচন পদার্থরূপে গণ্য করা যায় না।
উদ্ভিদের নির্দিষ্ট রেচন অঙ্গ থাকে না কেন?
উদ্ভিদদেহে বিপাকক্রিয়ার হার কম এবং মূলত কার্বোহাইড্রেট বিপাক ঘটে। ফলে উৎপন্ন রেচন পদার্থ কম ক্ষতিকারক হয় ও সেগুলিকে দেহে দীর্ঘদিন সঞ্চয় করে রাখা যায় বা পুনরায় অন্য কোনো বিপাকীয় কাজে ব্যবহার করা যায়। এই কারণে উদ্ভিদদেহে রেচনবস্তুর দ্রুত অপসারণের প্রয়োজন দেখা দেয় না ও উদ্ভিদদেহে নির্দিষ্ট রেচন অঙ্গ থাকে না।
গ্লাইকোসাইড কী? এর অর্থকরী গুরুত্ব লেখো।
গ্লাইকোসাইড – কিছু কিছু উদ্ভিদদেহে কার্বোহাইড্রেটের পচনের ফলে যে কার্বনযুক্ত রেচন পদার্থ উৎপন্ন হয়, তাকে গ্লাইকোসাইড বলে।
উৎস – ডিজিটালিস গাছ।
অর্থকরী গুরুত্ব – ডিজিটক্সিন, জিটক্সিন, জিটালিন প্রভৃতি গ্লাইকোসাইড ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে।
উদ্ভিদদেহে রেচন পদার্থ সঞ্চয়কারী অঙ্গগুলির নাম লেখো।
| রেচন পদার্থের নাম | সঞ্চয়কারী অঙ্গ/কোশ |
| রজন | রজননালি (শাল) |
| তরুক্ষীর | তরুক্ষীর কোশ ও নালি (পেঁপে) |
| সিস্টোলিথ | লিথোসিস্ট (বট) |
| র্যাফাইড | ইডিওব্লাস্ট (কচুরিপানা) |
উপক্ষার কী? উদাহরণ দাও।
উপক্ষার উদ্ভিদদেহে প্রোটিন বিপাকের ফলে সৃষ্ট নাইট্রোজেন ঘটিত ক্ষারীয়, তিক্ত স্বাদযুক্ত কেলাসাকার রেচন পদার্থ যা উদ্ভিদ অঙ্গে কঠিন বা তরল হিসেবে পাওয়া যায়, তাকে উপক্ষার বলে। উদাহরণ – মরফিন, কুইনাইন, রেসারপিন, নিকোটিন, ক্যাফেইন।
ওল খেলে গলায় অস্বস্তিবোধ সৃষ্টি হয় কেন? এই অসুবিধা কীভাবে দূর করা যায়?
ওলের কোশগুলিতে ক্যালশিয়াম অক্সালেট নির্মিত র্যাফাইড সঞ্চিত থাকে। ওল খাওয়ার সময় লম্বা ছুঁচের মতো র্যাফাইডগুলি গলার মিউকাস স্তরে গেঁথে যায় ফলে অস্বস্তি তৈরি হয়।
লেবু বা তেঁতুল খেলে এই অসুবিধা দূর হয় কারণ, লেবুর সাইট্রিক অ্যাসিড বা তেঁতুলের টারটারিক অ্যাসিডের সংস্পর্শে র্যাফাইড দ্রবীভূত হয়ে যায়।
র্যাফাইড কত প্রকার ও কী কী?
র্যাফাইড দু-প্রকার। যথা –
- অ্যাসিকিউলার র্যাফাইড (ওল, কচু পাতার একগুচ্ছ ছুঁচের মতো র্যাফাইড) এবং
- স্ফির্যাফাইড (কচুরিপানা বৃন্তের তারার মতো র্যাফাইড)।
থেইন ও ক্যাফিন -এর উৎস ও গুরুত্ব লেখো।
ক্যাফিন -এর উৎস – কফি বীজ।
থেইন -এর উৎস – চা পাতা।
থেইন ও ক্যাফিনের গুরুত্ব – শারীরিক ও মানসিক অবসাদ দূর করা।
ধুনো প্রকৃত অর্থে কী? এটির উৎস কী?
ধুনো প্রকৃত অর্থে একপ্রকার গঁদ রজন নামক উদ্ভিদ রেচন পদার্থ।
উৎস – শালগাছ।
উদ্ভিদদেহে সৃষ্ট CO₂-কে রেচন পদার্থরূপে গণ্য করা হয় না, কিন্তু প্রাণীদেহে CO₂-কে রেচন পদার্থরূপে গণ্য করা হয়- যুক্তিসহ ব্যাখ্যা করো।
উদ্ভিদদেহে CO₂ বিপাকজাত পদার্থ হলেও রেচন পদার্থ হিসেবে গণ্য হয় না কারণ, CO₂ উদ্ভিদদেহের পক্ষে ক্ষতিকারক নয় এবং সালোকসংশ্লেষ নামক উপচিতিমূলক বিপাকক্রিয়ায় পুনরায় ব্যবহার হয়ে যায়। অন্যদিকে, প্রাণীদেহে বিপাকজাত CO₂ প্রাণীকোশের পক্ষে ক্ষতিকর এবং অপ্রয়োজনীয়। এই কারণে প্রাণীদেহে CO₂-কে রেচন পদার্থরূপে গণ্য করা হয়।
কুইনাইন ও ট্যানিন -এর মধ্যে একটি সাদৃশ্য ও একটি বৈসাদৃশ্য উল্লেখ করো।
সাদৃশ্য – কুইনাইন ও ট্যানিন উভয়েই উদ্ভিদ রেচন পদার্থ।
বৈসাদৃশ্য – কুইনাইন নাইট্রোজেনঘটিত রেচন পদার্থ এবং ট্যানিন কার্বনঘটিত রেচন পদার্থ।
প্রতিটি নেফ্রনে কটি অংশ থাকে ও কী কী?
প্রতিটি নেফ্রনে দুটি অংশ থাকে। যথা –
- ম্যালপিজিয়ান কণিকা ও
- বৃক্কীয় নালিকা।
নেফ্রন কয় প্রকার ও কী কী?
অবস্থান অনুযায়ী নেফ্রন দুপ্রকার। যথা –
- সুপারফিসিয়াল নেফ্রন (বৃক্কের কর্টেক্স স্তরে বর্তমান, প্রায় 85%) এবং
- জাক্সটামেডুলারি নেফ্রন (কর্টেক্স ও মেডুলা স্তরের সংযোগস্থলে বর্তমান, প্রায় 15%)।
পোডোসাইট কোশ কাকে বলে? এর কাজ কী?
বাওম্যানস ক্যাপসুলের ভিসেরাল স্তরে অ্যামিবা সদৃশ যে-সমস্ত কোশ উপস্থিত থাকে, তাদের পোডোসাইট কোশ (Podocyte cell) বলে।
কাজ –
- এই সমস্ত কোশ থেকে বাহুর মতো অংশ নির্গত হয়। এদের পেডিসেল বলে।
- ভিসেরাল স্তরের ভিত্তিঝিল্লির ওপরে বিন্যস্ত কোশগুলির মূল দেহের সঙ্গে ভিত্তিঝিল্লির কিছুটা ব্যবধান থাকে। এর ফলে যে ফাঁকা স্থান সৃষ্টি হয়, তাকে কোশান্তর ছিদ্র বা পরিস্রাবণ ছিদ্র বলে।
- এই পরিস্রাবণ ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে পরাপরিস্রাবণ ঘটে।
হেনলির লুপের অধোগামী ও ঊর্ধ্বগামী বাহুর পুনঃশোষিত পদার্থগুলির নাম লেখো।
| হেনলির লুপের অংশ | পুনঃশোষিত পদার্থ |
| অধোগামী বাহু | জল |
| ঊর্ধ্বগামী বাহু | Na+ ও CI– আয়ন। |
মূত্রের উপাদানের ওপর নির্ভর করে প্রাণীকে কয় ভাগে ভাগ করা হয় ও কী কী?
মূত্রের উপাদানের ওপর নির্ভর করে প্রাণীকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা –
- অ্যামোনিওটেলিক প্রাণী,
- ইউরিকোটেলিক প্রাণী এবং
- ইউরিওটেলিক প্রাণী।
অ্যামোনিওটেলিক প্রাণী কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
যে-সমস্ত প্রাণী প্রোটিন বিপাকের ফলে উৎপন্ন অ্যামোনিয়া রেচন পদার্থরূপে দেহের বাইরে বের করে দেয়, তাদের অ্যামোনিওটেলিক প্রাণী বলে। যেমন – চিংড়ি, তারামাছ, ব্যাঙাচি, হাইড্রা, প্ল্যানেরিয়া এবং অস্থিযুক্ত মাছ।
ইউরিকোটেলিক প্রাণী কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
যে-সমস্ত প্রাণীর মূত্রে প্রধান রেচন পদার্থরূপে ইউরিক অ্যাসিড উপস্থিত থাকে, তাদের ইউরিকোটেলিক প্রাণী বলে। যেমন – পতঙ্গ, স্থলজ শামুক, সরীসৃপ এবং পক্ষী শ্রেণিভুক্ত প্রাণী।
ইউরিওটেলিক প্রাণী কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
যে-সমস্ত প্রাণীর মূত্রে প্রধান রেচন পদার্থরূপে ইউরিয়া উপস্থিত থাকে, তাদের ইউরিওটেলিক প্রাণী বলে। যেমন – তরুণাস্থিযুক্ত মাছ, ব্যাং, কুমির, কচ্ছপ, তিমি, সিল, ক্যাঙারু, ইঁদুর, গিনিপিগ, মানুষ প্রভৃতি।
সংকোচনশীল গহ্বরের মাধ্যমে কোন্ কোন্ রেচন পদার্থ জীবকোশের বাইরে নির্গত হয়?
এককোশী প্রাণী অ্যামিবার দেহে সংকোচনশীল গহ্বর রেচনাঙ্গ হিসেবে উপস্থিত থাকে। এর মাধ্যমে দেহ থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও অ্যামোনিয়া নির্গত হয়।
রেচনের মাধ্যমে মানবদেহে জলসাম্য কীভাবে বজায় থাকে?
রেচনবস্তু হিসেবে মানবদেহ থেকে ঘাম, মূত্র নির্গত হয়। বৃক্ক মূত্র উৎপাদনের সময় দেহ থেকে প্রয়োজন মতো জলের নির্গমন ঘটায়। দেহে জলের ঘাটতি থাকলে গাঢ় এবং জলের মাত্রা বেশি থাকলে লঘু মূত্র নির্গত করে, বৃক্ক দেহে জলের সাম্যতা বজায় রাখে। ঘাম উৎপাদনের সময় ও ত্বকের ঘর্মগ্রন্থি থেকে নির্গত ঘামের মাধ্যমেও বেশ কিছুটা জলের নির্গমন ঘটে এবং এর মাধ্যমেও দেহে জল সাম্যতা নিয়ন্ত্রিত হয়।
বৃক্কের সঙ্গে নেফ্রনের সম্পর্ক কী?
প্রতিটি বৃক্ক প্রায় 10 লক্ষ নেফ্রনের সমন্বয়ে গঠিত। নেফ্রনে রক্ত থেকে পরিসুত তরল মূত্রে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ, নেফ্রনে উৎপাদিত মূত্রই বৃক্ক থেকে গবিনী পথে মূত্রথলিতে এসে জমা হয়। সুতরাং, বলা যায় নেফ্রন হল বৃক্কের গঠনগত ও কার্যগত উপাদান।
নেফ্রনের কোন অংশে পরাপরিস্রাবণ ঘটে? এর গুরুত্ব কী?
নেফ্রনের ম্যালপিজিয়ান কণিকাতে পরাপরিস্রাবণ ঘটে।
পরাপরিস্রাবণের গুরুত্ব – পরাপরিস্রাবণের মাধ্যমে রক্ত থেকে রেচন পদার্থসহ পরিস্রুত তরল বাওম্যানস ক্যাপসুলের গহ্বরে জমা হয়।
বৃক্কীয় নালিকায় কী কী পদার্থ পুনঃশোষিত হয়?
বৃক্কীয় নালিকা দ্বারা পুনঃশোষিত পদার্থগুলি হল গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, অ্যাসকরবিক অ্যাসিড, ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, Na+, K+, ফসফেট, সালফেট প্রভৃতি।
বৃক্কীয় নালিকায় ক্ষরিত পদার্থগুলির নাম লেখো।
বৃক্কীয় নালিকায় ক্ষরিত পদার্থগুলি হল ক্রিয়েটিনিন, পটাশিয়াম আয়ন, সালফেট, কোলিন, হিস্টামিন, পেনিসিলিন প্রভৃতি।
মূত্রে উপস্থিত দুটি রঞ্জক পদার্থের নাম লেখো।
মূত্রে উপস্থিত দুটি রঞ্জক পদার্থের নাম –
- ইউরোক্রোম ও
- ইউরোবিলিনোজেন।
বৃক্কীয় নালিকায় উৎপাদিত নতুন পদার্থগুলি কী কী?
বৃক্কীয় নালিকায় উৎপাদিত নতুন পদার্থগুলি হল অ্যামোনিয়া, হিপ্পিউরিক অ্যাসিড, অজৈব ফসফেট, এরিথ্রোপোয়েটিন প্রভৃতি।
প্রাণীদের নাইট্রোজেনঘটিত রেচন পদার্থের নাম লেখো।
ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া প্রভৃতি।
প্রাণীদের নাইট্রোজেনবিহীন রেচন পদার্থের নাম লেখো।
কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), বিলিরুবিন, বিলিভারডিন, কিটোন বডি প্রভৃতি।
আনুষঙ্গিক রেচন অঙ্গ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
প্রধান রেচন অঙ্গ ছাড়া যে-সমস্ত অঙ্গ প্রাণীদেহে রেচন পদার্থ উৎপাদনে এবং নির্গমনে সাহায্য করে, তাদের আনুষঙ্গিক রেচন অঙ্গ বলে। উদাহরণ – যকৃৎ, ফুসফুস, বৃহদন্ত্র প্রভৃতি।
রেচনে যকৃতের দুটি ভূমিকা লেখো।
রেচনে যকৃতের দুটি ভূমিকা –
- অরনিথিন চক্রের মাধ্যমে যকৃতে ইউরিয়া সংশ্লেষিত হয়।
- হিমোগ্লোবিন ভাঙনের ফলে যকৃতে উৎপন্ন বিলিরুবিন, বিলিভারডিন রঞ্জকপদার্থ পিত্তের মাধ্যমে পৌষ্টিকনালিতে জমা হয়।
ত্বককে রেচন অঙ্গ রূপে গণ্য করা হয় কেন?
ত্বক ঘর্ম নিঃসরণের মাধ্যমে দেহ থেকে জল, খনিজ লবণ, সামান্য পরিমাণ ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া রেচিত করে। এই কারণে ত্বককে রেচন অঙ্গ রূপে গণ্য করা হয়।
ফুসফুসকে রেচন অঙ্গরূপে গণ্য করা হয় কেন?
ফুসফুসের মাধ্যমে দেহ থেকে নিশ্বাসবায়ু নির্গত হয়। এই নিশ্বাস বায়ুতে CO₂, জলীয় বাষ্প প্রভৃতি উপস্থিত থাকে বলে ফুসফুসকে রেচন অঙ্গরূপে গণ্য করা হয়। এ ছাড়া ত্বকে উপস্থিত সিবেসিয়াস গ্রন্থি নিঃসৃত সিবামের মাধ্যমে দেহ থেকে কোলেস্টেরল, ফ্যাটি অ্যাসিড, হাইড্রোকার্বন প্রভৃতি রেচিত হয়।
রক্তের চেয়ে মূত্রে অ্যামোনিয়া বেশি থাকে কেন?
নেফ্রনের নিকটবর্তী সংবর্ত নালিকা অ্যামোনিয়াম আয়ন ক্ষরণ করে। এই কারণে রক্তের চেয়ে মূত্রে অ্যামোনিয়া বেশি থাকে।
মূত্র উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত দুটি হরমোনের কার্য ও উৎপত্তিস্থল লেখো।
মূত্র উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত দুটি হরমোন হল –
- অ্যান্টি ডাইইউরেটিক হরমোন (ADH) বা ভেসোপ্রেসিন – পিটুইটারি গ্রন্থির পশ্চাৎ খণ্ড থেকে উৎপন্ন হয়। বৃক্কীয় নালিকায় জলের ভেদ্যতা বাড়ায়, জলের পুনঃশোষণে সাহায্য করে।
- অ্যালডোস্টেরন – অ্যাড্রিনাল কর্টেক্স থেকে উৎপন্ন হয়। Na+ আয়নের পুনঃশোষণে সাহায্য করে।
ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস বা বহুমূত্র রোগ কাকে বলে?
ADH হরমোন কম ক্ষরণের ফলে প্রচুর পরিমাণে লঘু মূত্র ত্যাগ হয়, একে বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস বলে। এই অবস্থায় মূত্রের সঙ্গে শর্করা নির্গত হয় না।
মানবদেহে ইউরিয়া কোথায় ও কীভাবে উৎপন্ন হয়?
মানবদেহে বিপাকের ফলে উৎপন্ন অ্যামোনিয়া ও CO₂ -এর বিক্রিয়ায় যকৃতে, অরনিথিন চক্রের মাধ্যমে ইউরিয়া উৎপন্ন হয়।
গাঢ় মূত্র উৎপাদনে ADH -এর ভূমিকা আলোচনা করো।
পিটুইটারি নিঃসৃত ADH হরমোন বৃক্কীয় নালিকাতে জলের পুনঃশোষণে সাহায্য করে। নেফ্রনের দূরবর্তী সংবর্ত নালিকায় ADH -এর প্রভাবে গ্লোমেরুলার পরিসুত থেকে জলের পুনঃশোষণের ফলে মূত্র উৎপন্ন হয়। শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ জলের ঘাটতি হলে জল সংরক্ষণের প্রয়োজনে ADH বেশি পরিমাণে জলের পুনঃশোষণ ঘটিয়ে গাঢ় মূত্র উৎপন্ন করে।
ম্যাকুলা ডেনসা কী? এর কাজ কী?
নেফ্রনের দূরসংবর্ত নালিকার যে অংশ অন্তর্মুখী ধমনিকার সংস্পর্শে আসে, সেইস্থানে নালিকা প্রাচীরের কোশগুলি বড়ো ও ঘনসন্নিবিষ্ট হয়ে যে গঠন তৈরি করে, তাকে ম্যাকুলা ডেনসা বলে।
কাজ – এটি জাক্সটাগ্লোমেরুলার কোশকে রেনিন ও অ্যানজিওটেনসিন ক্ষরণে উদ্দীপিত করে।
জাক্সটাগ্লোমেরুলার কোশ কাকে বলে?
বৃক্কের অন্তর্মুখী ধমনিকার গাত্রে টিউনিকা মিডিয়াস্তরে JGA -এর অন্তর্গত ভিত্তি পর্দাবিহীন যে বিশেষ পরিবর্তিত কোশ দেখা যায়, তাকে জাক্সটাগ্লোমেরুলার কোশ বলে।
রেচনকে বাষ্পমোচন বলা যায় না কেন?
রেচন সাধারণত বিপাক ক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন রেচন পদার্থ নিষ্কাশন পদ্ধতি। কিন্তু, বাষ্পমোচন বিপাক ক্রিয়ার অন্তগর্ত নয়। এটি একপ্রকার শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যার সাহায্যে উদ্ভিদেহের অতিরিক্ত জল বাষ্পাকারে দেহ থেকে নির্গত হয়। বাষ্পমোচনের দ্বারা অতিরিক্ত জলের নির্গমন ঘটলেও কোনো রেচনবস্তু নির্গত হয় না। তাই রেচনকে বাষ্পমোচন বলা যায় না।
ওলিও রজনের উৎস ও অর্থকারী গুরুত্ব লেখো।
ওলিও রজনের উৎস পাইন গাছের কাণ্ড থেকে প্রাপ্ত টারপেনটাইন বা তার্পিন তেল। এটি তরল এবং উদ্বায়ী তেলের সঙ্গে মিশ্রিত অবস্থায় থাকে।
গুরুত্ব –
- রং প্রস্তুতিতে, ভার্নিশ করতে, পালিশের কাজে তার্পিন তেল বা ওলিও রজনের ব্যবহার আছে।
- এছাড়া, বিভিন্ন সুগন্ধি ও ভেষজ ওষুধ প্রস্তুতিতে এর ব্যবহার করা হয়।
রজনের প্রকারভেদগুলি উল্লেখ করো।
রজনের প্রকারভেদ – রজন প্রধানত তিন প্রকার। যথা –
- কঠিন রজন (Hard Resin) – শক্ত ও ভঙ্গুর এবং অ্যালকোহলে দ্রবীভূত হয়।
- উদাহরণ – চাঁচগালা, লাক্ষা-বার্নিশ প্রভৃতি।
- ওলিও রজন (Oleo Resin) – বানতেলের সঙ্গে মিশ্রিত অবস্থায় থাকে। এই প্রকার রজন তরল ও সুগন্ধি।
- উদাহরণ – তার্পিন, কানাডা-বালসাম প্রভৃতি।
- গঁদ রজন (Gum Resin) – গঁদের সঙ্গে মিশ্রিত অবস্থায় থাকে। এটি অর্ধতরল এবং আঠালো।
- উদাহরণ – ধুনো, হিং প্রভৃতি।
উদ্ভিদদেহে ধাতব কেলাসরূপে সঞ্চিত রেচন পদার্থগুলির নাম ও উৎস ছকের মাধ্যমে লেখো।
| র্যাফাইড | উৎস |
| র্যাফাইড | ওল, কচু, কচুরিপানা প্রভৃতির দেহকোশ। |
| সিস্টোলিথ | বট, রবার প্রভৃতি উদ্ভিদের পাতার যৌগিক ত্বক। |
| সিলিকা | ইকুইজিটাম গাছের ত্বক ও ঘাসের পাতার কিনারা। |
সংকোচনশীল গহ্বর কোন্ প্রাণীর রেচন অঙ্গ? এটি কীভাবে রেচনে সাহায্য করে?
সংকোচনশীল গহ্বর – অ্যামিবা, প্যারামেসিয়াম প্রভৃতি এককোশী আদ্যপ্রাণীর রেচন অঙ্গ।
রেচনে সংকোচনশীল গহ্বরের ভূমিকা – অ্যামিবা, প্যারামেসিয়াম প্রাণীরা সংকোচনশীল গহ্বরের মধ্যে রেচন পদার্থ সঞ্চয় করে রাখে। গহ্বরটি রেচন পদার্থ দ্বারা পূর্ণ হলে কোশপর্দার কাছে এসে ফেটে যায় এবং রেচন পদার্থগুলিকে কোশের বাইরে নিক্ষেপ করে।

নেফ্রিডিয়া কোন্ প্রাণীর রেচন অঙ্গ? এর গঠন ও কাজ লেখো।
কেঁচো, জোঁক প্রভৃতি প্রাণীর রেচন অঙ্গ হল নেফ্রিডিয়া।
নেফ্রিডিয়ার গঠন – কেঁচো, জোঁক প্রভৃতি প্রাণীর দেহখণ্ডকের দুপাশে নেফ্রিডিয়াগুলি প্যাঁচানো নালির মতো অবস্থান করে। প্রতিটি নেফ্রিডিয়া সিলিয়াযুক্ত একটি ফানেলাকৃতি নেফ্রোস্টোম ও সরু কুণ্ডলীকৃত নালিকা ও নেফ্রিডিওপোর দ্বারা গঠিত।
রেচনে নেফ্রিডিয়ার ভূমিকা – নেফ্রোস্টোমের সিলিয়ার সঞ্চালনের থেকে দ্বারা দেহগহ্বর সংগৃহীত রেচন পদার্থ কুণ্ডলীকৃত নালিতে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে নেফ্রিডিওপোরের সাহায্যে দেহের বাইরে বর্জিত হয়।

নিম্নলিখিত প্রাণীগুলির রেচন অঙ্গের নাম লেখো – চিংড়ি, মাকড়সা, শামুক।
| প্রাণীর নাম | রেচন অঙ্গ |
| চিংড়ি | সবুজ গ্রন্থি বা গ্রিন গ্ল্যান্ড বা অ্যানটেনাল গ্রন্থি |
| মাকড়সা | কক্সাল গ্রন্থি |
| শামুক | বৃক্ক |
বৃক্ক (Kidney) কী? উদাহরণসহ বৃক্কের প্রকারভেদগুলি ছকের সাহায্যে লেখো।
বৃক্ক (Kidney) – মেরুদণ্ডী প্রাণীর মুখ্য রেচন অঙ্গ হল বৃক্ক।
বৃক্কের প্রকারভেদ –
| বৃক্কের প্রকারভেদ | উদাহরণ |
| আর্কিনেফ্রস | হ্যাগফিশ (লার্ভাদশা) |
| প্রোনেফ্রস (হেড কিডনি) | টেরোমাইজনের লার্ভাদশা |
| মেসোনেফ্রস (পশ্চাৎ কিডনি) | মাছ ও উভচর প্রাণী |
| মেটানেফ্রস | সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী |
বৃক্কীয় নালিকা (Renal tubule) কাকে বলে? এটি কটি অংশে বিভক্ত ও কী কী?
বৃক্কীয় নালিকা (Renal tubule) – বাওম্যানস ক্যাপসুলের পশ্চাৎ অংশ থেকে সংগ্রাহক নালি পর্যন্ত বিস্তৃত দীর্ঘ, প্যাঁচানো রক্তজালকবেষ্টিত নালিকে বৃক্কীয় নালিকা বলে।
বৃক্কীয় নালিকা তিনটি অংশে বিভক্ত। যথা –
- নিকটবর্তী সংবর্ত নালিকা,
- হেনলির লুপ ও
- দূরবর্তী সংবর্ত নালিকা।
হেনলির লুপের অংশগুলির নাম ও কাজ লেখো।
হেনলির লুপ চারটি অংশে বিভক্ত। যথা –
- মোটা অধোগামী অংশ,
- সরু অধোগামী অংশ,
- সরু ঊর্ধ্বগামী অংশ এবং
- মোটা ঊর্ধ্বগামী অংশ।
হেনলির লুপের কাজ – পুনঃশোষণ – নিষ্ক্রিয় পদ্ধতিতে জল ও Cl– আয়ন এবং সক্রিয় পদ্ধতিতে Na+ আয়ন পুনঃশোষিত হয়।
ম্যালপিজিয়ান কণিকার গঠন ও কাজ লেখো।
প্রতিটি নেফ্রনের অগ্রভাগে অবস্থিত গোলাকার স্ফীত অংশকে ম্যালপিজিয়ান কণিকা বলে। ইহা দুটি অংশ দ্বারা গঠিত।
বাওম্যান ক্যাপসুল – ইহা কাপ সদৃশ দ্বিস্তরীয় গঠন। এর রক্তজালক সংলগ্ন ভেতরের স্তরটিকে ভিসেরাল এবং বাইরের দিকের স্তরটিকে প্যারাইটাল স্তর বলে। দুটি স্তরের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানকে বাওম্যান আবরক গহ্বর বলে। ভিসেরাল স্তরটি চ্যাপটা ক্ষণপদ যুক্ত, স্পষ্ট নিউক্লিয়াসযুক্ত ভিত্তিপর্দার ওপর সজ্জিত একস্তরীয় পোডোসাইট দ্বারা গঠিত। পোডোসাইটের বর্ধিত প্রবর্ধক অংশকে পেডিসেল বলে।
গ্লোমেরুলাস – বাওম্যান ক্যাপসুলের অবতল খাঁজে অবস্থিত ধমনির জটকে গ্লোমেরুলাস বলে। ইহা অন্তর্বাহী ধমনি ও বহির্বাহী ধমনির সংযোগস্থলে অবস্থিত কুণ্ডলীকৃত রক্তজালক দ্বারা গঠিত। অন্তর্বাহী ধমনির ব্যাস 50µm কিন্তু বহির্বাহী ধমনীর ব্যাস 25µm। গ্লোমেরুলাসের রক্তজালকের প্রাচীর একস্তরীয় চ্যাপটা এন্ডোথেলিয়াল কোশ দ্বারা গঠিত। এই কোশগুলি পাতলা ভিত্তিপর্দার ওপর অবস্থান করে।
কাজ –
- গ্লোমেরুলাস পরাপরিস্রাবক রূপে কাজ করে।
- পরাপরিস্রাবণের মাধ্যমে সংগৃহীত তরলকে রেনাল টিউবিউলে প্রেরণ করে।
বাওম্যানস ক্যাপসুলের গঠন ও কাজ লেখো।
বাওম্যানস ক্যাপসুলের গঠন –
- নেফ্রনের অগ্রপ্রান্তে অবস্থিত বাওম্যানের ক্যাপসুল হল ফানেল সদৃশ বদ্ধ, স্ফীত প্রান্তযুক্ত গঠন।
- বাওম্যানস আবরকের সম্মুখপ্রান্ত প্রায় সম্পূর্ণরূপে গ্লোমেরুলাসকে বেষ্টন করে থাকে এবং পশ্চাৎপ্রান্ত বৃক্কীয় নালিকার সঙ্গে যুক্ত থাকে।
- এটি দুটি পৃথক একস্তরবিশিষ্ট কোশস্তর দ্বারা গঠিত। যথা – গ্লোমেরুলাস সংলগ্ন ভিসেরাল স্তর এবং বৃক্কীয় নালিকা সংলগ্ন প্যারাইটাল স্তর।
- দুটি কোশস্তরের মাঝখানে ফাঁকা গহ্বরকে বাওম্যানের আবরক বিবর বলে।
- ভিসেরাল স্তর অ্যামিবা সদৃশ পোডোসাইট কোশ দ্বারা গঠিত।
বাওম্যানস ক্যাপসুলের কাজ – বাওম্যানের ক্যাপসুল পরিস্রাবক ঝিল্লি বা ছাঁকনিরূপে গ্লোমেরুলাসস্থিত রক্তজালকের রক্ত পরিস্রাবণে সাহায্য করে।

গ্লোমেরুলাসের বৈশিষ্ট্য ও কাজ লেখো।
গ্লোমেরুলাসের বৈশিষ্ট্য –
- বৃক্কীয় ধমনি থেকে সৃষ্ট 50µm ব্যাস ও পেশিযুক্ত অন্তর্মুখী উপধমনি বা অ্যাফারেন্ট আর্টেরিওল বাওম্যানস ক্যাপসুলে প্রবিষ্ট হয়ে প্রথমে কয়েকটি বড়ো বড়ো রক্তজালকে পরিণত হয়।
- বড়ো রক্তজালকগুলি পরে অসংখ্য মোট 50টি লুপযুক্ত সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম রক্তজালক গুচ্ছে বিভক্ত হয়ে কুণ্ডলীকৃত গ্লোমেরুলাস গঠন করে।
- রক্তজালকের গুচ্ছগুলি পুনরায় পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়ে 25µm ব্যাস ও পেশিযুক্ত বহির্মুখী উপধমনি বা এফারেন্ট আর্টেরিওল গঠন করে এবং বাওম্যানস ক্যাপসুল থেকে নির্গত হয়।
গ্লোমেরুলাসের কাজ – অন্তর্মুখী উপধমনির ব্যাস বহির্মুখী উপধমনির ব্যাসের তুলনায় বেশি হওয়ায় গ্লোমেরুলাসের রক্তজালকে রক্তচাপ দেহের অন্যান্য অংশের চেয়ে বেশি থাকে। ফলে, এইস্থান থেকে অতিরিক্ত চাপের প্রভাবে রক্ত পরিস্রাবিত হয়ে বাওম্যানস ক্যাপসুলে প্রবেশ করে।
মূত্র উৎপাদনে বাওম্যানস্ ক্যাপসুলের ভূমিকা কী?
বাওম্যান ক্যাপসুল, গ্লোমেরুলাসকে তার অবতল খাঁজে ধারণ করে। গ্লোমেরুলাসের অন্তর্বাহী ধমনির ব্যাস বহির্বাহী ধমনী অপেক্ষা বড়ো হওয়ায় গ্লোমেরুলাসের পাতলা প্রাচীর যুক্ত রক্তজালকের গাত্রে প্রচুর পরিমাণ চাপের সৃষ্টি হয়। এই চাপের কারণে জলে দ্রবীভূত অবস্থায় বিভিন্ন আয়ন, শর্করা, প্রোটিন ও অন্যান্য উপাদান গ্লোমেরুলার প্রাচীর ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং বাওম্যান ক্যাপসুলের অবতল অংশে জমা হয়। বাওম্যান ক্যাপসুলের ভিসেরাল স্তর গঠনকারী পেডিসেলগুলির অন্তবর্তী ছিদ্রগুলি পরিস্রাবক ছিদ্র রূপে কাজ করে এবং সংগৃহীত তরলের পরিসুতকরণের পর তাকে সংগ্রহ করে পুনঃশোষণের জন্য রেনাল টিউবিউলে প্রেরণ করে।
বৃক্কের পরাপরিস্রাবণে নেফ্রনের ভূমিকা আলোচনা করো।
অথবা, গ্লোমেরুলাস কীভাবে রক্তের দূষিত পদার্থগুলি পরিস্রুত করে?
প্রতিটি নেফ্রন দুটি অংশ দ্বারা গঠিত – ম্যালপিজিয়ান কণিকা এবং রেনাল নালিকা। ম্যালপিজিয়ান কণিকার দুটি অংশ বাওম্যান ক্যাপসুল এবং গ্লোমেরুলাস। গ্লোমেরুলাস অন্তর্মুখী ধমনি, বহির্মুখী ধমনি এবং সূক্ষ্ম কুণ্ডলীকৃত রক্তজালক দ্বারা গঠিত। অন্তর্মুখী ধমনির ব্যাস (50µm) অপেক্ষা বহির্মুখী ধমনির ব্যাস (25µm) কম হওয়ায় কুণ্ডলীকৃত রক্তজালকে উচ্চ রক্তচাপের সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় রক্তের প্লাজমা উপাদানের এবং বৃক্কের পরিসুত তরলের চাপ ওই রক্তচাপের বিরুদ্ধে কার্যকরী হয়। এই চাপগুলি সমষ্টিগতভাবে পরাপরিস্রাবণ চাপের সৃষ্টি করে। এই কার্যকর পরিস্রাবণ চাপের কারণে দুটি বৃক্কের মধ্যে দিয়ে প্রতি মিনিটে যে 1300 mL রক্ত প্রবাহিত হয়। এই পরিসুত তরল পরবর্তী পর্যায়ে রেনাল টিউবিউলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং ওই তরল থেকে প্রয়োজনীয় উপাদানের ও জলের পুনঃশোষণ ঘটিয়ে প্রতিদিন প্রায় 15 লিটার মূত্র দেহ থেকে নির্গত করে। এইভাবে প্রতিটি বৃক্ক পরাপরিস্রাবণে সাহায্য করে।
অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী রেনাল ধমনিকার সম্পর্ক কী? এই সম্পর্কের গুরুত্ব কী?
অন্তর্মুখী রেনাল ধমনিকা ও বহির্মুখী রেনাল ধমনিকা গ্লোমেরুলাসের প্রধান গঠনগত উপাদান। অন্তর্মুখী ধমনিকা বাওম্যান ক্যাপসুলে প্রবেশ করে কুণ্ডলীকৃত রক্তজালক সৃষ্টি করে পুনরায় বাওম্যান ক্যাপসুল থেকে নির্গত হয়ে বহির্মুখী ধমনি সৃষ্টি করে মূল রক্ত সংবহনে মেশে। সুতরাং, রক্তসংবহন পথের দৃষ্টিকোণে একথা বলা যায় যে, অন্তর্মুখী রেনাল ধমনিকাই বহির্মুখী রেনাল ধমনিকা সৃষ্টি করে। এই হল রেনাল ধমনিকা দুটির মধ্যে সম্পর্ক।
গুরুত্ব – অন্তর্মুখী ধমনিকা দিয়ে দূষিত পদার্থসহ রক্ত গ্লোমেরুলাসের কুণ্ডলীকৃত রক্তজালকে প্রবেশ করে। পরাপরিস্রাবণের পর বিশুদ্ধ রক্ত বহির্মুখী ধমনিকা দিয়ে মূল রক্তসংবহনে ফিরে যায়। এছাড়া অর্ন্তমুখী ধমনিকার ব্যাস 50µm এবং বহির্মুখী ধমনিকার ব্যাস 25µm হওয়ায় রক্ত সর্বদা রক্তজালকে উচ্চচাপ সৃষ্টি করে। এই চাপের প্রভাবে রক্ত থেকে জল, গ্লুকোজ, লবণ ও অন্যান্য উপাদান মিশ্রিত মিশ্রণের পরাপরিস্রাবণ ঘটে। এটি হল মূত্র উৎপাদনের প্রথম ধাপ।
JGA কী? এর কাজগুলি লেখো।
JGA কথার অর্থ জাক্সটাগ্লোমেরুলার অ্যাপারেটাস।
সংজ্ঞা – নেফ্রনের দূরবর্তী সংবর্ত নালিকা যেখানে অন্তর্মুখী রেনাল ধমনিকায় সংলগ্ন হয় সেই স্থানের কোশগুলি পরিবর্তিত হয়ে ভিত্তিপর্দাহীন এক বিশেষ ধরনের কোশ সমষ্টিতে রূপান্তরিত হয়। এই কোশসমূহকে একত্রে জাক্সটাগ্লোমেরুলার অ্যাপারেটাস বলে।
এই অ্যাপারেটাসের অন্তর্বর্তী কোশগুলি হল –
- জাক্সটা গ্লোমেরুলার কোশ।
- ম্যাকুলা ডেনসা।
- ল্যাসিস কোশ।
কাজ –
- জাক্সটাগ্লোমেরুলার কোশ O₂ -এর অভাবজনিত অবস্থায় এরিথ্রোপোয়েটিন নিঃসরণ করে যা লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণ করে।
- JGA থেকে ক্ষরিত রেনিন উৎসেচক/হরমোন কতকগুলি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় রক্তবাহকে সংকুচিত করে রক্তচাপ বৃদ্ধি করে।
- অ্যালডোস্টেরন হরমোন ক্ষরণকে উদ্দীপিত করে Na+ শোষণ ত্বরান্বিত করে।
মূত্রথলির গঠন ও কাজ লেখো।
মূত্রথলির (Urinary Bladder) গঠন –
- শ্রোণি গহ্বরে অবস্থিত পেশিবহুল থলি।
- মূত্রথলির প্রাচীরে ডেট্রুসর (detrusor) পেশি নামক মসৃণ পেশি ও ভিতরের দিকে পরিবর্তনশীল আবরণীকলা বর্তমান।
মূত্রথলির কাজ – মূত্রকে সাময়িকভাবে সঞ্চয় করে রাখে। মূত্রথলিতে 400 – 500 mL মূত্র জমা হলে মূত্রত্যাগের ইচ্ছা প্রবল হয়। এই সময় স্ফিংকটার পেশির সংকোচনের মাধ্যমে মূত্র দেহের বাইরে নির্গত হয়।
মূত্রনালির (Urethra) গঠন ও কাজ লেখো।
মূত্রনালি বা ইউরেথ্রার (Urethra) গঠন –
- মূত্রথলি থেকে মূত্রছিদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত নলাকার গঠন।
- পুরুষদের ক্ষেত্রে মূত্রনালি 20 সেমি এবং স্ত্রীদেহে মূত্রনালি 4 সেমি দৈর্ঘ্যযুক্ত হয়।
- মূত্রথলি ও মুত্রনালির সংযোগস্থলে অনৈচ্ছিক বা মসৃণ পেশি দ্বারা গঠিত একটি পেশিবলয় বর্তমান, একে অন্তস্থ পেশিবলয় বলে।
- এর কিছুটা নীচে থাকে ঐচ্ছিক পেশি দ্বারা গঠিত বহিস্থ পেশিবলয়।
- দুটি পেশিবলয় স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণাধীনে থেকে মূত্রের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করে।
মূত্রনালির কাজ – মূত্রথলি থেকে মূত্রকে দেহের বাইরে নির্গত করে।

মূত্রের অস্বাভাবিক উপাদান সংক্রান্ত সাধারণ রোগগুলি উল্লেখ করো।
| রোগের নাম | মূত্রে অস্বাভাবিক উপাদান |
| গ্লাইকোসুরিয়া বা ডায়াবেটিস মেলিটাস | মূত্রের সঙ্গে গ্লুকোজ নির্গত হয়। |
| অ্যালবুমিনিউরিয়া | মূত্রের সঙ্গে অ্যালবুমিন নির্গত হয়। |
| কিটোনিউরিয়া | মূত্রের সঙ্গে কিটোনবডি নির্গত হয়। |
| জন্ডিস | মূত্রের সঙ্গে পিত্তরঞ্জক পদার্থ (বিলিরুবিন ও বিলিভারডিন) নির্গত হয়। |
| হিমাচুরিয়া | মূত্রের সঙ্গে রক্ত নির্গত হয়। |
| ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস বা বহুমূত্র রোগ | বেশি পরিমাণে ঘনঘন মূত্র ত্যাগ হয়। |
যকৃৎ, ফুসফুস ও ত্বক থেকে কী কী পদার্থ রেচিত হয় ছকের মাধ্যমে উল্লেখ করো।
| অঙ্গ | রেচন পদার্থ |
| যকৃৎ | ইউরিয়া, কোলেস্টেরল, লেসিথিন, ভারী ধাতু, বিলিরুবিন ও বিলিভারডিন। |
| ফুসফুস | CO₂, জলীয়বাষ্প। |
| ত্বক | জল, NaCl, ইউরিয়া, কোলেস্টেরল, ফ্যাটি অ্যাসিড প্রভৃতি। |
ফুলকা ও ফুসফুস শ্বাসঅঙ্গ হলেও কীভাবে রেচনঅঙ্গ রূপে কাজ করে?
ফুলকা, ফুসফুস শ্বাসঅঙ্গ হলেও বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে অঙ্গদুটি রেচন অঙ্গ রূপে কাজ করে।
ফুলকা – ফুলকা জলজ প্রাণীদের শ্বাসঅঙ্গ হিসেবে কাজ করে। এই সকল প্রাণীতে বিপাকীয় পদ্ধতির কারণে CO₂ রেচনবস্তু হিসেবে উৎপন্ন হয়। এরা শ্বসন প্রক্রিয়া সম্পাদনের সময় দূষিত কার্বন ডাইঅক্সাইডকে দেহের বাইরে নির্গমনের মাধ্যমে রেচন কার্য সম্পন্ন করে। কিছু কিছু সামুদ্রিক মাছের ফুলকাতে ক্লোরাইড কোশ বর্তমান। এই কোশগুলি দেহ থেকে অতিরিক্ত NaCI-কে বহিঃপরিবেশে রেচিত করে।
ফুসফুস – মেরুদণ্ডী প্রাণীদের রেচন অঙ্গ হিসেবে ফুসফুস গরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেহে বিপাক ক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন CO₂ ফুসফুসের মাধ্যমে দেহের বাইরে নির্গত হয়; এর সঙ্গে সঙ্গে কিছু জলীয় বাষ্পের নির্গমনের মাধ্যমে ফুসফুস ওই সকল প্রাণীতে গৌণ বা আনুষঙ্গিক রেচন অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। এছাড়া, ফুসফুসের মাধ্যমে কিছু বিজাতীয় গ্যাস যেমন – অ্যামোনিয়া, অ্যাসিটোন প্রভৃতি নির্গত হয়।
জীবদেহে অতিরিক্ত রেচনঅঙ্গের প্রয়োজনীয়তা কী?
জীবদেহের প্রতি কোশে কোশে বিপাক ক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ফলে বর্জ্যপদার্থ হিসেবে রেচনবস্তু উৎপন্ন হয়। এগুলি বিষাক্ত, কোশে সঞ্চিত থাকার উপযুক্ত নয়। বিশেষ করে প্রাণীদের নাইট্রোজেন ঘটিত রেচন পর্দাথ দীর্ঘ সময় জমা থাকলে তা শরীরে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। এগুলি জীবদেহ থেকে অপসারণের প্রধান দায়িত্ব শরীরের প্রধান রেচন অঙ্গ-বৃক্কের। রেচন একটি জটিল এবং দীর্ঘসূত্রী প্রক্রিয়া। প্রাণীদের মতো অত্যন্ত জটিল দেহগঠনের সর্বত্র উৎপন্ন হওয়া রেচন বস্তুর কিছু অংশ অতিরিক্ত রেচন অঙ্গের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হলে তা বৃক্কের ওপর চাপ কমিয়ে দেয়। ফুসফুস, ত্বক, ফুলকা, যকৃৎ প্রভৃতি প্রাণীদেহে অতিরিক্ত রেচন অঙ্গ হিসেবে কাজ করে।
জীবদেহে মুখ্য রেচন পদার্থ (মূত্র) ছাড়াও কিছু কিছু কম ক্ষতিকারক রেচনবস্তু উৎপন্ন হয় যাদের অপসারণ মুখ্য রেচন অঙ্গের মাধ্যমে ঘটে না। এই সকল ক্ষতিকারক উপাদানগুলিকে অপসারণের জন্য জীবদেহে অবস্থিত আনুষঙ্গিক রেচন অঙ্গগুলি কার্যকরী হয়। যেমন – ভারী ধাতুর কিছু অংশ লালাগ্রন্থি ও আন্ত্রিক কোশ দ্বারা, কার্বন ডাইঅক্সাইড ফুসফুস দ্বারা রেচিত হয়।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘রেচন’ অংশের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন