অষ্টম শ্রেণি বাংলা – অদ্ভুত আতিথেয়তা – বিষয়সংক্ষেপ

Souvick

এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের প্রথম পাঠের অন্তর্গত ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ -এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করব। এখানে লেখকের পরিচিতি, গল্পের উৎস, গল্পের পাঠপ্রসঙ্গ, গল্পের সারসংক্ষেপ, গল্পের নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্প সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং গল্পটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এছাড়া, অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক ও গল্পের সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অদ্ভুত আতিথেয়তা-অষ্টম শ্রেণী-বাংলা

লেখক পরিচিতি

1820 খ্রিস্টাব্দের 26 সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতা হলেন ভগবতী দেবী। ঈশ্বরচন্দ্রের বাল্য ও কৈশোর কেটেছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। তিনি প্রাথমিক শিক্ষালাভ করেন গ্রামের পাঠশালায়। নয় বছর বয়সে তিনি গ্রামের প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে কলকাতার সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। কাব্য, অলংকার, বেদান্ত, স্মৃতি, জ্যোতিষ ও ন্যায়শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়ে তিনি ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ করেন। 1841 খ্রিস্টাব্দের 21 ডিসেম্বর মাত্র 21 বছর বয়সে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান অধ্যাপক হন। পরবর্তীকালে 1851 খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষপদ তিনি লাভ করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি প্রায় 20টি আদর্শ বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বালিকাদের জন্য তিনি প্রায় 30টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। তিনি শুধু একজন শিক্ষাসংস্কারক নন, তিনি সমাজসংস্কারকও ছিলেন। নারীজাতির দুর্গতিমোচনের জন্য তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তাঁরই অক্লান্ত প্রচেষ্টায় 1856 খ্রিস্টাব্দের 26 জুলাই বিধবাবিবাহ আইন বিধিবদ্ধ হয়। বাংলা গদ্যসাহিত্যে তাঁর দান অবিস্মরণীয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বাংলা গদ্যের ‘প্রথম যথার্থ শিল্পী’ আখ্যায় সম্মানিত করেছেন। তাঁর রচিত অনুবাদ গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’, ‘শকুন্তলা’, ‘সীতার বনবাস’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’। তাঁর মৌলিক রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘বোধোদয়’, ‘কথামালা’, ‘বর্ণপরিচয়’, ‘আখ্যানমঞ্জরী’, ‘প্রভাবতী সম্ভাষণ’। এ ছাড়াও সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য-বিষয়ক, সমাজ-বিষয়ক বহু প্রবন্ধ ও পুস্তিকা তিনি রচনা করেছেন। স্কুল পরিদর্শকরূপে তিনি হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর, 24 পরগনার বহু গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেড়িয়েছেন। শিক্ষা ও সমাজসংস্কারক এবং বাংলা গদ্যশিল্পের জনকরূপে তিনি চিরস্মরণীয়। 1891 খ্রিস্টাব্দের 29 জুলাই বিদ্যাসাগর দেহত্যাগ করেন।

উৎস

‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্পটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘আখ্যানমঞ্জরী’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

পাঠপ্রসঙ্গ

আতিথেয়তা এক পরম মানবীয় গুণ। বর্তমানে মানুষের মন থেকে এই গুণটি ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অথচ ভারতীয়রা ছোটোবেলা থেকেই এই গুণটির সঙ্গে পরিচিত হয়। বিপদে-আপদে মানুষ অনেক সময় আতিথ্য প্রার্থনা করে, তখন শত্রুমিত্র বিবেচনা না করে আশ্রিতকে সমাদর করার শিক্ষাই দিয়েছেন প্রাচীন ভারতীয় মুনিঋষিগণ। যে ব্যক্তি আতিথেয়তা দান করেন, তিনি মনের প্রশান্তি প্রাপ্ত হন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্পে সে প্রসঙ্গেই আলোচনা করা হয়েছে।

বিষয়সংক্ষেপ

একদা আরবদের সঙ্গে মুরদের যুদ্ধ হয়েছিল। আরব সেনারা বহুদূর পর্যন্ত এক মুর সেনাকে অনুসরণ করলে সেই সেনাপতি দ্রুত বেগে পলায়ন করে। কিন্তু শেষে দিকভ্রম হয়ে বিপক্ষ শিবিরের সামনে ক্লান্ত ও অবসন্ন শরীরে উপস্থিত হন। কিছুক্ষণ পরে তিনি এক আরব সেনাপতির তাঁবুর সামনে উপস্থিত হয়ে, তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। আতিথেয়তার ব্যাপারে আরবদের সমতুল্য কেউ নেই। শত্রুকেও তাঁরা যথাসাধ্য আতিথেয়তা করেন। আরব সেনাপতি আগত মুর সেনাকে ক্লান্ত ও ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর দেখে তাঁর আহারাদির ব্যবস্থা করেন। তাঁরা বন্ধুভাবে কথোপকথনে মগ্ন হন। তাঁরা পরস্পর পরস্পরের ও তাঁদের পূর্বপুরুষদের সাহস, পরাক্রম প্রভৃতির পরিচয় দিতে থাকেন। এমন সময় হঠাৎই আরব সেনাপতি বিবর্ণ মুখে সেখান থেকে প্রস্থান করেন এবং কিছুক্ষণ পরেই নিজের অসুস্থতার সংবাদ পাঠিয়ে মুর সেনাপতিকে জানান যে তাঁর আহার ও শয্যা তৈরি আছে, তিনি যেন আহার করে শয়ন করেন। তাঁর ঘোড়াও ক্লান্ত, হতবীর্য হয়েছে, তাই পরের দিন সকালে তাঁর জন্য তেজস্বী ঘোড়া সাজিয়ে রাখা হবে তাঁবুর সামনে। সেই সময় আবার দুজনের সাক্ষাৎ হবে এবং মুর সেনাপতি যাতে নিজ স্থানে পৌঁছোতে পারেন, তার ব্যবস্থাও তিনি করে দেবেন।

মুর সেনাপতি আশ্রয়দাতার এমন আচরণের কোনো কারণ বুঝতে না পেরে সন্দিগ্ধ মনেই শয়ন করেন। প্রভাতে আরব সেনাপতির লোকজন এসে তাঁর নিদ্রাভঙ্গ করায় এবং তারা বলে যে মুর সেনাপতির ফিরে যাওয়ার সময় উপস্থিত হয়েছে। মুর সেনাপতি শিবিরের দ্বারদেশে উপস্থিত হয়ে দেখেন আরব সেনাপতি ঘোড়ার লাগাম ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছেন। মুর সেনাপতিকে দেখামাত্র আরব সেনাপতি তাঁকে ঘোড়ায় আরোহণ করিয়ে দ্রুত বিপক্ষশিবির ত্যাগ করতে বলেন; তিনি আরও বলেন যে, এখানে তাঁর (মুর সেনাপতির) সবথেকে বড়ো শত্রু তিনিই (আরব সেনাপতি)। কারণ কথোপকথনের সময় আরব সেনাপতি জানতে পেরেছেন মুর সেনাপতিই তাঁর পিতার প্রাণহত্যার আদেশ দিয়েছিলেন এবং সে-কথা শুনে আরব সেনাপতি প্রতিজ্ঞা করেছেন সূর্যোদয় হলেই তিনি পিতৃহন্তার প্রাণনাশে প্রবৃত্ত হবেন। তাই মুর সেনাপতি যেন দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করেন। এরপর আরব সেনাপতি অতিথি সম্ভাষণ ও করমর্দন করে বিদায় জানান।

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই আরব সেনাপতি শত্রুকে করায়ত্ত করতে প্রবৃত্ত হন। তবে সামান্য সময়ের সুযোগেই দ্রুত গতিসম্পন্ন ঘোড়ায় ধাবমান হয়ে মুর সেনাপতি ততক্ষণে স্বপক্ষীয় সেনাশিবিরে অর্থাৎ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। আরব সেনাপতি তা দেখতে পান এবং বৈরসাধন সংকল্প সফল হবে না বুঝতে পেরে নিজের শিবিরের উদ্দেশে প্রত্যাগমন করেন।

নামকরণ

সাহিত্যের একটি অন্যতম প্রধান উপাদান নামকরণ। নামকরণের মাধ্যমেই রচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে আগাম ধারণা করা যায়। এবার আলোচনা করে দেখা যাক যে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্পের নামকরণটি কতটা সার্থক।

একদা যুদ্ধক্লান্ত এক মুর সেনাপতি ভুলক্রমে শত্রু আরব সেনাপতির শিবিরের সামনে উপস্থিত হন এবং তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। আরব সেনাপতিও তাঁকে বিনা দ্বিধায় আতিথ্য দানে প্রস্তুত হয়ে, তাঁর সাধ্যমতো আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। এরপর বন্ধুভাবে দুই সেনাপতির কথোপকথনে আরব সেনাপতি জানতে পারেন যে, মুর সেনাপতি তাঁর পিতৃহন্তা। কিন্তু এ কথা জেনেও আরব সেনাপতি মুর সেনাপতির কোনো ক্ষতি করলেন না, বরং তাঁর আহার ও নিদ্রার ব্যবস্থা করে দেন। প্রভাতে বিদায় দেওয়ার সময় আরব সেনাপতি মুর সেনাপতিকে জানান যে—মুর সেনাপতিই তাঁর পিতৃহন্তা, ফলে তিনি তাঁর চরম শত্রু এবং সূর্যোদয়ের পরেই তিনি তাঁকে সংহার করার চেষ্টা করবেন।

গল্পটিতে আমরা দেখলাম যে, বিপক্ষ সেনা জেনেও আরব সেনাপতি মুর সেনাপতির আতিথেয়তা পালন করেছেন। আবার যখন তিনি জানলেন যে মুর সেনাপতিই তাঁর পিতৃহন্তা, তখনও তিনি তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা তো করলেনই না—বরং তাঁর আহার-নিদ্রার সুব্যবস্থাও করে দেন এবং আতিথেয়তার চরম নিদর্শন স্থাপন করেন। আতিথেয়তার এমন উদাহরণ বিরল। সাধারণত এটা আশা করা যায় না যে, চরম শত্রুকে কেউ সমাদরে আতিথ্য দান করছেন। আবার সে যদি পিতৃহন্তা হয়, তাহলে তো সে আতিথ্য আশা করাটাই অন্যায়। অথচ আরব সেনাপতি সেই আতিথেয়তাই করেছেন মুর সেনাপতির প্রতি এবং তিনি আতিথেয়তার এক অদ্ভুত নিদর্শন স্থাপন করেছেন। গল্পটির মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে এমন ধরনের আতিথেয়তা। তাই গল্পটির কাহিনিধর্মী নামকরণ ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ সম্পূর্ণ সার্থক বলে মনে করি।


এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের প্রথম পাঠের অন্তর্গত ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ -এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেছি।

আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

অষ্টম শ্রেণি বাংলা - ছোটোদের পথের পাঁচালী - সঠিক উত্তর নির্বাচন করো

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ছোটোদের পথের পাঁচালী – সঠিক উত্তর নির্বাচন করো

ব্যাকরণ বিভাগ - সাধু ও চলিত রীতি - অষ্টম শ্রেণি - বাংলা

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – সাধু ও চলিত রীতি

ব্যাকরণ বিভাগ - সমাস - অষ্টম শ্রেণি - বাংলা

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – সমাস

About The Author

Souvick

Tags

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ছোটোদের পথের পাঁচালী – সঠিক উত্তর নির্বাচন করো

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – সাধু ও চলিত রীতি

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – সমাস

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – ক্রিয়ার কাল ও ক্রিয়ার ভাব

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া ও অব্যয়