এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের প্রথম পাঠের অন্তর্গত ‘বোঝাপড়া’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করবো। এখানে কবির পরিচিতি, কবিতার উৎস, কবিতার পাঠপ্রসঙ্গ, কবিতার সারসংক্ষেপ, কবিতার নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘বোঝাপড়া’ কবিতা সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং কবিতাটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এছাড়া, অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে কবি ও কবিতার সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কবি পরিচিতি
1861 খ্রিস্টাব্দের 7 মে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্মাল স্কুল, বেঙ্গল একাডেমি, সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের ছাত্র হলেও কোথাও তিনি শিক্ষা সমাপ্ত করেননি; অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তিনি শিক্ষিত হননি। ছেলেবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ ছিল। ঠাকুরবাড়ির শিক্ষা-সংস্কৃতির পরিমণ্ডলেই তিনি বড়ো হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘হিন্দু মেলার উপহার’ তাঁর কিশোর বয়সেই রচিত হয়েছিল। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল—‘চিত্রা’, ‘চৈতালী’, ‘খেয়া’, ‘সোনার তরী’, ‘মানসী’, ‘গীতাঞ্জলি’, ‘বলাকা’, ‘আরোগ্য’, ‘শিশু’, ‘শিশু ভোলানাথ’, ‘নৈবেদ্য’, ‘প্রান্তিক’ ইত্যাদি। বহু ছোটোগল্পের স্রষ্টা হলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর উল্লেখযোগ্য ছোটোগল্পগুলি হল—‘দেনা-পাওনা’, ‘ছুটি’, ‘বলাই’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘পোস্টমাস্টার’, ‘কঙ্কাল’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘গুপ্তধন’, ‘সওগাত’ ইত্যাদি। ‘গোরা’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘চার অধ্যায়’, ‘চোখের বালি’, ‘নৌকাডুবি’ তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক হল—‘ডাকঘর’, ‘রক্তকরবী’, ‘কালের যাত্রা’, ‘বিসর্জন’, ‘রাজা ও রানী’ ইত্যাদি। এ ছাড়া বহু প্রবন্ধ, গান, সমালোচনামূলক সাহিত্যও তিনি রচনা করেছেন। বহু ছবিও এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদ ‘Song Offerings’-এর জন্য তিনি সাহিত্যে ‘নোবেল পুরস্কার’ অর্জন করেন 1913 খ্রিস্টাব্দে। এশিয়াবাসী হিসেবে তিনিই প্রথম সাহিত্যে ‘নোবেল’ পান। 1905 খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ। এই সময়েই ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ গানটি তিনি রচনা করেছিলেন। 1919 খ্রিস্টাব্দে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধি ঘৃণার সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তিনি রচনা করেছিলেন ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে’ গানটি। 1940 খ্রিস্টাব্দে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ‘ডক্টরেট’ উপাধি প্রদান করে। দুটি স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত (বাংলাদেশের ‘আমার সোনার বাংলা’ এবং ভারতের ‘জনগণমন’) রচনার বিরল কৃতিত্ব কেবল রবীন্দ্রনাথেরই আছে। রবীন্দ্রনাথ একইসঙ্গে ছিলেন কবি, গল্পকার, নাট্যকার, গীতিকার, গায়ক এবং চিত্রকর। এই মহান মানুষটি 1941 খ্রিস্টাব্দের 7 আগস্ট ইহলোক ত্যাগ করেন।
উৎস
1307 বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থ থেকে ‘বোঝাপড়া’ কবিতাটি নেওয়া হয়েছে।
পাঠপ্রসঙ্গ
জীবনে চলার পথে দ্বন্দ্ব-সংঘাত থাকবেই। পৃথিবীতে সব মানুষ একই রকমের নয়, মানুষে মানুষে মানসিকতার তফাত ঘটবেই। পৃথিবীতে সকলেই সকলকে নানা কারণেই পছন্দ করে না বা মেনে নেয় না। তাই বলে সকলের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত হওয়াও যুক্তিগ্রাহ্য পথ নয়। সবাই যে আমার কথা মেনে নেবে—এমনটা কখনোই সম্ভব নয়। আবার, সেই কারণে আমিও কারও কথা মেনে নেব না—এটাও হতে পারে না সভ্যসমাজে। সব কিছুর মধ্যেই একটা বোঝাপড়ার ভাব বা মানসিকতা গড়ে তোলা দরকার। সব কিছুর সঙ্গেই মানিয়ে নিয়ে চলতে হয়, তবেই পৃথিবীর সৌন্দর্য ও সুখ অনুভব করা সহজ হয়ে ওঠে। ‘বোঝাপড়া’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই প্রসঙ্গই আলোচনা করেছেন।
বিষয়সংক্ষেপ
মনকে বোঝাতে হবে জীবনে ভালোমন্দ যাই ঘটুক না কেন, যা সত্য তাকে সহজভাবে মেনে নিতেই হবে। কোনো ব্যক্তি সকলেরই ভালোবাসা পাবে—তা নাও হতে পারে। কারও ভালোবাসা সে পাবে, আবার কারও ভালোবাসা থেকে সে বঞ্চিত হবে—এটাই স্বাভাবিক। কেউ নিজের সর্বস্ব বিকিয়ে দেয়, কেউ বা আপনার সিকি পয়সাও অপরের জন্য ব্যয় করতে চায় না। এই পাওয়া না-পাওয়ার ব্যাপারটা উভয়ের স্বভাবের উপর নির্ভরশীল।
পৃথিবীতে এটাই বাস্তব সত্য যে, প্রত্যেকটি মানুষ প্রত্যেকের জন্য সমানভাবে ভাবে না। কখনও ব্যক্তি নিজে ফাঁকিতে পড়ে, আবার কখনও নিজেও ফাঁকি দেয় অপরকে। অর্থাৎ কতকটা লাভ নিজের ভাগে পড়ে, আবার কতকটা কাজে লাগে অপরের ভোগে। আদিকাল থেকে জগতে এমনটাই হয়ে চলেছে। এর থেকে কারও নিস্তার পাওয়ার পথ নেই। আঘাত বা বেদনা সকলকেই বরণ করে নিতে হয়। তাই মনকে বোঝাতে হবে যে, ভালোমন্দ সব কিছুকেই সহজভাবে স্বীকার করতে হবে।
অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা কাটিয়ে যখন মনে করা হয় এবার হয়তো সুখের সন্ধান পাওয়া যাবে, তখনই কোনো নতুন আঘাত নেমে আসে জীবনে—এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটতে দেখা যায়। যেমন—স্বচ্ছন্দে এগিয়ে চলা জলযান হঠাৎ করে জলের নীচে ডুবে থাকা পাহাড়ে আঘাত খেয়ে চূর্ণ হয়ে যায়, তেমনই সুখের হাতছানি থাকা সত্ত্বেও বিপদ দেখা দিতে পারে যেকোনো সময়। তবে তা নিয়ে কখনও বিবাদ করা উচিত হবে না। সর্বদা ভেসে থাকার চেষ্টায় লিপ্ত থাকতে হবে, তা না পারলে তলিয়ে তো যেতেই হবে। এমনটা হয়েই থাকে যে, মানুষ যেখানে কোনো বিপদ আশঙ্কা করে না, সেখানেও বিপদ এসে হানা দেয়। তবে ভালোমন্দ যাই হোক, তাকে সহজে মেনে নেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত।
মনে রাখতে হবে সবাই তোমার মতো নয়, আবার তুমিও সকলের মতো নও। তোমাকে যেমন চাপ সহ্য করতে হয়, তেমনই তোমার মাধ্যমেও কেউ চাপে পড়ে। তাই দুঃখিত হওয়ার কোনো কারণই নেই। একটু ভেবে দেখলেই অনেকটা সুখ পাওয়া সম্ভব হবে। তার জন্য কোনো ব্যক্তির উপরে নির্ভরশীল হওয়ারও প্রয়োজন হবে না। আমরা কাউকে ভালোবাসলাম বা বাসলাম না, কেউ আমাকে ভালোবাসল বা ভালোবাসল না—তাতে বিশ্বপ্রকৃতিতে কোনো আলোড়ন সৃষ্টি হওয়ার নয়। তাই আকাশ আপন মহিমাতেই সুনীল থাকে, ভোরের আলো সর্বদাই মধুর লাগে, আর মৃত্যুর মুখোমুখি হলেই অনুভূত হওয়া যায় যে, বেঁচে থাকাটা অনেক বেশি শ্রেয়। ব্যক্তিবিশেষের জন্য মহাবিশ্বে কারও সুখের দরজা বন্ধ হয় না। কারণ বিশ্বভুবন অনেক উদার, অনেক প্রশস্ত স্থান। সেখানে বেঁচে থাকার বহু উপকরণ আছে। তাই মনকে এ কথাটাই বোঝাতে হবে যে—ভালোমন্দ যাই ঘটুক না কেন, সত্যকে সহজভাবেই মেনে নিতে হবে।
নিজের চারদিকে অন্ধকারের প্রাচীর তুলে রেখে জীবনটাকে নষ্ট করে দেওয়া উচিত হবে না। বিধি বা নিয়তিকে লঙ্ঘন করতে যাওয়াও ঠিক নয়। তবু যদি তাই ঘটে, তবে তা থেকে মুক্ত হওয়ার দ্রুত চেষ্টা করতেই হবে। নিজেকে কখনোই বৃহৎ জগতের আনন্দযজ্ঞ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা ঠিক হবে না। বরং খানিকটা কেঁদে মনকে হালকা করে ভিতরের কষ্টটাকে দূরে সরানোই ভালো। সর্বদাই মনের সাথে বোঝাপড়া করে চলতে হবে। কারও সঙ্গে মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হলে তা মিটিয়ে নেওয়া দরকার। পৃথিবীতে ভালো ও খারাপ দুই-ই থাকবে—এটাই বাস্তব, আর এই সহজ সত্যটাকে মেনে নিতেই হবে আমাদের।
নামকরণ
নামকরণের মধ্য দিয়ে সাহিত্যিক তাঁর অভিপ্রেত বক্তব্য বিষয়কে পাঠকের কাছে উপস্থাপিত করেন। নামকরণের চৌম্বকশক্তির মধ্য দিয়েই বিষয় সম্পর্কে একটি প্রাক্ধারণা তৈরি হয়। রচনার ক্ষেত্রে নামকরণ তাই ধ্রুবতারার মতো, যার সাহায্যে বিষয়বস্তুর সঠিক নির্দেশিকা লাভ করা যায়।
‘বোঝাপড়া’ কবিতার মধ্যে কবি জীবনের এক সামগ্রিক রূপের ছবি তুলে ধরেছেন। ‘বোঝাপড়া’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ বিবেচনা করা, সমঝে চলা ইত্যাদি। বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই সমগ্র জীবন সুন্দরভাবে গড়ে ওঠে। জীবনের পথ মসৃণ নয়। নানা বাধা-বিপত্তি, প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েই জীবন এগিয়ে চলে। চলার পথের নানা বৈচিত্র্যকে স্বীকার করার নামই জীবন। নিরবচ্ছিন্ন সুখ কিংবা দুঃখ কোনোটাই জীবনের একমাত্র সত্য নয়।
সবার কাছেই আমি প্রিয়, কিংবা পৃথিবীর সবাই আমার কাছে প্রিয়—এমনটা বাস্তবসম্মত নয়। অনেক মানুষ আছেন, যারা পরার্থে জীবনদানকেই মহৎ বলে স্বীকার করে নেন; আবার এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের কাছ থেকে আত্মকেন্দ্রিকতা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। হাসি-কান্না মিলিয়েই জীবন; কোনোটাকে বাদ দিয়ে জীবন যথাযথ হতে পারে না। জীবনের এই সহজ-সরল সত্যকে স্বীকার করার মধ্যেই আছে বেঁচে থাকার আনন্দ। সব কিছুই যখন স্বাভাবিক; যখন কোথাও কোনো বিপদ বা শঙ্কার ঘনঘটা নেই তখনই অকস্মাৎ কালো মেঘের ঘনঘটায় ঝঞ্ঝারূপী বিপদ এসে যেতে পারে; নিমেষের মধ্যে সমস্ত আশা, স্বপ্ন, আনন্দ বিচূর্ণ হতে পারে, তখন সেই নির্মম, কঠিন, নিষ্ঠুর সত্যকে বরণ করে নিতেই হয়। দুঃখকে বরণ করে এগিয়ে চলার নামই জীবন। চরম দুঃখে নিবৃত্ত হয়ে থাকার মধ্যে কোনো গরিমা নেই। বরং ভালোর সঙ্গে মন্দের, আনন্দের সঙ্গে দুঃখের, অন্ধকারের সঙ্গে আলোর সঠিক বোঝাপড়াতেই মধুময় হয়ে ওঠে এই পৃথিবী, এই জীবন।
ব্যক্তিজীবনে নানা শোকের অভিঘাতে জর্জরিত কবি অনুধাবন করেছেন সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে যাওয়াই জীবন। জীবনের এই ভারসাম্য রক্ষার নামই বোঝাপড়া। তাই কবিতার ব্যঞ্জনাধর্মী এই নামকরণ সুপ্রযুক্ত।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের প্রথম পাঠের অন্তর্গত ‘বোঝাপড়া’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেছি।
আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন