এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের প্রথম পাঠের অন্তর্গত ‘চন্দ্রগুপ্ত’-এর কিছু ‘সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

‘কী বিচিত্র এই দেশ!’ – বক্তার চোখে এই দেশের বৈচিত্র্য কীভাবে ধরা পড়েছে?
বক্তা সেকেন্দার শাহের চোখে ভারতবর্ষের প্রাকৃতিক ও মানবিক বৈচিত্র্য সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে। তিনি দেখেছেন দিনে সূর্যের প্রচণ্ড অগ্নিলীলা আবার রাতে চন্দ্রের স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না; বর্ষায় ঘন কালো মেঘপুঞ্জের গম্ভীর গর্জন, উত্তরে দাঁড়িয়ে তুষারধৌত হিমালয়, আবার অন্যদিকে মরুভূমির রুক্ষতা; কোথাও মদমত্ত মাতঙ্গ গতিশীল পাহাড়ের মতো গমন করছে, কোথাও শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কুরঙ্গম; কোথাও শিশুর সারল্য আবার কোথাও দেহে বজ্রের শক্তি। এমনভাবেই বক্তার চোখে এ দেশের বৈচিত্র্য ধরা পড়েছে।
‘ভাবলাম-এ একটা জাতি বটে!’ – বক্তা কে? তাঁর এমন ভাবনার কারণ কী?
প্রশ্নে প্রদত্ত অংশটির বক্তা হলেন গ্রিক অধিপতি সেকেন্দার শাহ।
হিদাস্পিসের যুদ্ধে সেকেন্দার শাহ পুরুকে পরাজিত ও বন্দি করেছিলেন। পুরুকে তাঁর কাছে আনা হলে সেকেন্দার শাহ তাঁকে প্রশ্ন করেন যে তিনি কীরূপ আচরণ প্রত্যাশা করেন। নির্ভীকচিত্তে পুরু জবাব দিয়েছিলেন ‘রাজার প্রতি রাজার আচরণ’। একজন পরাজিত ব্যক্তি এমন সাহসী উত্তর দিতে পারে তা সেকেন্দার শাহ কল্পনাও করেননি। পুরুর বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি প্রশ্নোক্ত ভাবনায় ভাবিত হয়েছেন।
‘এ দিগবিজয় অসম্পূর্ণ রেখে যাচ্ছেন কেন সম্রাট?’ – এ প্রশ্নের উত্তরে সম্রাট কী জানালেন?
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে বক্তা গ্রিক সেনাপতি সেলুকস মহান বীর সেকেন্দার শাহ তথা আলেকজান্ডারকে উদ্দেশ করে এ কথা বলেছেন।
সম্রাটের সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে সেলুকস অবগত হন যে, পৃথিবী জয় করার বাসনা নিয়েই আলেকজান্ডার শৌখিন দিগবিজয়ের বিজয়রথে ভারতবর্ষ পর্যন্ত এসে পৌঁছোন। গ্রিক সেনার পরাক্রমে অর্ধেক এশিয়া পরাভূত হলেও শতদ্রুর তীরে এসেই তারা প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। রাজা পুরুকে তিনি পরাস্ত করলেও তাঁর শৌর্য, বীর্য, সাহসিকতা তাঁকে মুগ্ধ করে। পরাজিত হওয়ার পরেও পুরু যখন জানান যে, আলেকজান্ডারের কাছ থেকে তিনি ‘রাজার প্রতি রাজার আচরণ’-ই প্রত্যাশা করেন—এ কথা শোনার পর আলেকজান্ডার অনুধাবন করেন পুরু একজন বীর রাজাই নন, প্রকৃত ক্ষত্রিয়। আলেকজান্ডার কোনো উপনিবেশ গঠন করার জন্য কিংবা কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্যই অভিযান করেননি। তাই যখন তাঁর সৈন্যরা প্রায় সবাই ক্লান্ত, অবসন্ন তখন দিগবিজয় সম্পূর্ণ করার জন্য সুদূর ম্যাসিডন থেকে নতুন গ্রিক সেনার প্রয়োজন। তাই তিনি সেনাপতি সেলুকসের কাছে দিগবিজয় অসম্পূর্ণ রেখে ফিরে যাওয়ার বাসনা প্রকাশ করেন।
‘ভারতবাসী মিথ্যা কথা বলতে এখনও শিখে নাই।’ – বক্তা কে? কোন্ সত্য সে উচ্চারণ করেছে?
প্রশ্নে প্রদত্ত উক্তিটির বক্তা হলেন মগধের রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্ত।
গ্রিক সেনা আন্টিগোনস চন্দ্রগুপ্তকে ধরে নিয়ে আসে সেকেন্দার শাহের কাছে। সেকেন্দার শাহ চন্দ্রগুপ্তকে সত্যি করে বলতে বলেন যে সে কী করছিল। তখন বক্তা সত্য কথাটি বলে, সেটি হল – “আমি সম্রাটের বাহিনী-চালনা, ব্যূহ রচনা-প্রণালী, সামরিক নিয়ম, এই সব মাসাবধি কাল ধরে শিখছিলাম।”
‘আমার ইচ্ছা হলো যে দেখে আসি’ – বক্তার মনে কোন্ ইচ্ছা জেগে উঠেছিল? তার পরিণতিই বা কী হয়েছিল?
আলোচ্য উদ্ধৃতিটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটক থেকে গৃহীত। উক্তিটির বক্তা হলেন মগধের নির্বাসিত রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্ত। ম্যাসিডন অধিপতি পরাক্রান্ত আলেকজান্ডার শৌখিন দিগবিজয়ের কথা তিনি শুনেছিলেন। দুর্ধর্ষ বীর আলেকজান্ডারের পরাক্রমে অর্ধেক এশিয়া পরাস্ত। শতদ্রুর তীরে এসে সম্রাট পুরুর কাছেই তিনি প্রথম প্রতিরোধ পান। পুরুকে পরাস্ত করলেও পুরুর শৌর্য, বীর্য, সাহস ও নিষ্কম্পচিত্তে সেকেন্দার শাহ মোহিত হয়ে হৃত সাম্রাজ্য পুরুকে ফিরিয়ে দেন। এমন মহানুভব বীরকে দেখার ইচ্ছাই বক্তা অর্থাৎ চন্দ্রগুপ্তের মনে জেগে উঠেছিল।
ইচ্ছাপূরণ করার বাসনায় চন্দ্রগুপ্ত গ্রিক শিবিরে উপনীত হন এবং মিষ্ট ব্যবহার দ্বারা সেনাপতি সেলুকসের মন জয় করে নিয়ে তাঁর কাছ থেকে সমরকৌশল শিখে নিয়েছিলেন। তার কারণ, চন্দ্রগুপ্ত তাঁর হৃত সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন। সমরকৌশল যাতে তিনি বিস্মৃত না হন তাই লিখে নেওয়ার সময়েই গুপ্তচর সন্দেহে আন্টিগোনস তাঁকে ধরে আনেন আলেকজান্ডারের কাছে। শেষপর্যন্ত নানান ঘটনার অনুষঙ্গে আলেকজান্ডার চন্দ্রগুপ্তের সততা ও সাহসে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে মুক্তি প্রদান করেন।
‘ভাবলাম-এ একটা জাতি বটে!’ – বক্তার এরূপ ভাবনার কারণ কী?
প্রশ্নোক্ত অংশটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নামক নাটক থেকে নেওয়া হয়েছে। বক্তব্যটি করেছেন সেকেন্দার শাহ। পুরুর সঙ্গে যুদ্ধে সেকেন্দার শাহ বিজয়ী হয়েছিলেন। সেই যুদ্ধে পুরু অসমসাহসিকতার পরিচয় দিয়েও শেষপর্যন্ত পরাজিত হয়েছিলেন। বন্দি পুরুকে সেকেন্দার শাহের কাছে আনা হলে সেকেন্দার শাহ তাঁকে বলেন যে—তাঁর কাছে তিনি কীরূপ আচরণ আশা করেন। তখন নির্ভীকহৃদয় পুরু বলেন – রাজার কাছে রাজার মতো আচরণ তিনি প্রত্যাশা করেন। এমন উত্তর সেকেন্দার শাহ কল্পনাও করেননি। তিনি পুরুর সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে প্রশ্নোক্ত ভাবনায় ভাবিত হন।
‘সাম্রাজ্য স্থাপন করতে আসি নাই।’ – বক্তা কী উদ্দেশ্যে এসেছিলেন? কেনই বা ফিরে যাচ্ছেন?
প্রশ্নোক্ত অংশটির বক্তা সেকেন্দার শাহ। তিনি ভারতবর্ষে রাজ্যস্থাপনের উদ্দেশ্যে আসেননি। তিনি শৌখিন দিগবিজয়ে বেরিয়েছিলেন আর জগতে একটা কীর্তিস্থাপন করার উদ্দেশ্য ছিল তাঁর।
সুদূর ম্যাসিডন থেকে যুদ্ধ করতে করতে তিনি ভারতে প্রবেশ করেছেন। অর্ধেক এশিয়া তাঁর পদতলে দলিত হয়েছে। ফলে তাঁর সৈন্যরা বড়ো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। নতুন গ্রিক সৈন্য না আনতে পারলে তাঁর দিগবিজয় সম্ভব হবে না। এই কারণেই দিগবিজয় অসম্পূর্ণ রেখেই তিনি ফিরে যাচ্ছেন।
‘আমি তারই প্রতিশোধ নিতে বেরিয়েছি।’ – বক্তা কে? তিনি কখন, কেন এমন কথা বলেছেন?
প্রশ্নোক্ত অংশটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটক থেকে নেওয়া হয়েছে। উক্তিটির বক্তা হলেন চন্দ্রগুপ্ত।
একদিন সন্ধ্যাকালে সিন্ধুনদতটে শিবিরে দাঁড়িয়ে সেলুকসের সঙ্গে কথোপকথনে মগ্ন ছিলেন সেকেন্দার শাহ। সেই সময় একজন গ্রিক সেনা আন্টিগোনস গুপ্তচর সন্দেহে চন্দ্রগুপ্তকে ধরে নিয়ে আসেন সেকেন্দার শাহের কাছে। কারণ চন্দ্রগুপ্ত তালপাতায় কী লিখছিলেন আন্টিগোনস তা বুঝতে পারেনি। সেকেন্দার যখন জানতে চান চন্দ্রগুপ্তের কাছে যে সে কেন লিখছিল তালপাতায়, তখনই কথা-প্রসঙ্গে চন্দ্রগুপ্ত প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছিলেন।
চন্দ্রগুপ্তের বৈমাত্রেয় ভাই ধননন্দ মগধের সিংহাসনে বসেছে। সে চন্দ্রগুপ্তকে সিংহাসন থেকে বঞ্চিতই করেনি, তাঁকে নির্বাসিতও করেছে। তাই চন্দ্রগুপ্ত রাজ্য পুনরুদ্ধার করে প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলেছেন।
‘যাও, এই মুহূর্তেই তোমায় নির্বাসিত করলাম।’ – বক্তা কাকে, কেন নির্বাসিত করলেন?
প্রশ্নোক্ত উক্তিটির বক্তা হলেন গ্রিক অধিপতি সেকেন্দার শাহ।
তিনি নির্বাসিত করেছিলেন সেনাধ্যক্ষ আন্টিগোনসকে। আন্টিগোনস ছিলেন গ্রিক বাহিনীর একজন সাধারণ সেনাধ্যক্ষ, আর সেলুকস ছিলেন গ্রিক সেনাপতি। অর্থাৎ পদমর্যাদায় সেলুকস ছিলেন ঊর্ধ্বতন। অথচ অধস্তন আন্টিগোনস সম্রাট সেকেন্দারের সামনে দাঁড়িয়ে সেলুকসের প্রতি অবাধ্যতা করে এবং সেলুকসের মাথা লক্ষ করে তরবারি চালনা করে। সেক্ষেত্রে চন্দ্রগুপ্তের দক্ষতায় সেলুকস বিপদ থেকে নিস্তার পান। কিন্তু একজন সাধারণ সেনাধ্যক্ষের এরূপ অবাধ্যতা গ্রিক অধিপতি মেনে নিতে পারেননি। আন্টিগোনসের স্পর্ধা ও ঔদ্ধত্য সেকেন্দারকে বিরক্ত করে তুলেছিল। তাই তিনি আন্টিগোনসকে নির্বাসিত করেছিলেন।
চন্দ্রগুপ্ত কী কারণে গ্রিক শিবিরে এসেছিলেন?
ইতিহাসের চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যই হলেন আলোচ্য ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকের চন্দ্রগুপ্ত। তিনি মগধের নন্দবংশের রাজা মহাপদ্মনন্দের সন্তান ও ধননন্দের বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন। তিনি দিগবিজয়ী বীর সেকেন্দার শাহের নাম শুনেছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত জানেন অর্ধেক এশিয়া পদদলিত করে সেকেন্দার ভারতে এসেছেন। এমনকি আর্যকুলরবি পুরুও তাঁর কাছে পরাজিত হয়েছেন। সেই শক্তিধর বীর সেকেন্দারকে দেখার ইচ্ছা তাঁর ছিল। তা ছাড়া তিনি গ্রিক সেনাপতি সেলুকসের কাছে গ্রিক সমরবিদ্যা শিক্ষা করছিলেন, যাতে হৃত রাজ্য পুনরায় উদ্ধার করতে পারেন। এই দুই উদ্দেশ্যেই চন্দ্রগুপ্ত গ্রিক শিবিরে পদার্পণ করেছিলেন।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের প্রথম পাঠের অন্তর্গত ‘চন্দ্রগুপ্ত’-এর কিছু ‘সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করলাম। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যালয়ের বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের উপকারে এসেছে। যদি তোমাদের কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।





Leave a Comment