এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের অষ্টম পাঠের অন্তর্গত ‘হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করব। এখানে লেখকের পরিচিতি, গল্পের উৎস, গল্পের পাঠপ্রসঙ্গ, গল্পের সারসংক্ষেপ, গল্পের নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়’ গল্প সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং গল্পটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এ ছাড়া, অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক ও গল্পের সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক পরিচিতি
সাহিত্যিক হীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম 1903 খ্রিস্টাব্দে, কুমিল্লা জেলার চাঁদপুরে। তিনি শান্তিনিকেতনে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। ‘ইন্দ্রজিৎ’ ছদ্মনামে ‘দেশ’ পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলো— ‘বন্ধনহীন গ্রন্থি’, ‘তিনবন্ধু’, ‘ইন্দ্রজিতের খাতা’, ‘ইন্দ্রজিতের আসর’, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’, ‘শান্তিনিকেতনে একযুগ’, ‘প্রাণবন্যা’, ‘বধূ অমিতা’, ‘সাহিত্যের আড্ডা’, ‘অচেনা রবীন্দ্রনাথ’, ‘আপন মনের মাধুরী মিশায়ে’, ‘খেলা ভাঙার খেলা’, ‘শেষ পারানির কড়ি’ ইত্যাদি। 1995 খ্রিস্টাব্দে তাঁর দেহাবসান ঘটে।
পাঠপ্রসঙ্গ
হীরেন্দ্রনাথ দত্ত আলোচ্য প্রবন্ধে মহাত্মা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনকর্ম আলোচনা করেছেন। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাঙালির বিদ্যাচর্চার যোগ নিবিড়। তাঁর ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ বাংলার সমাজে সুপরিচিত। বাংলা ভাষার এমন এক অভিধান দুর্লভ এবং বিরল দৃষ্টান্ত। সুবৃহৎ অভিধান প্রণয়নের নেপথ্যে হরিচরণের প্রজ্ঞা, নিষ্ঠা, শ্রম ও অধ্যবসায়ের কথা লেখক কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন। বাংলা ভাষায় এমন এক অভিধান রচনা করে হরিচরণ বাঙালি জাতিকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন।
চব্বিশ পরগনার রামনারায়ণপুর গ্রামে 1867 খ্রিস্টাব্দের 23 জুন হরিচরণ জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রকল্যাণ তহবিলের অর্থ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বি.এ. তৃতীয় বর্ষের পড়াশোনা তিনি চালিয়ে যেতে পারেননি। অর্থাভাবে তাঁকে মাঝপথেই লেখাপড়া ছেড়ে দিতে হয়। জীবিকার তাগিদে তিনি নাড়াজোলের কুমার দেবেন্দ্রলাল খানের গৃহশিক্ষকরূপে নিযুক্ত হন। পরে কলকাতার টাউন স্কুলে প্রধান পণ্ডিতের পদ অলংকৃত করেন। এরপরেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ঘটে ঠাকুরবাড়ির জমিদারির কাজে যোগদানের সূত্রে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের জমিদারির পতিসর কাছারিতে সুপারিনটেনডেন্টের পদে ব্রতী হয়েছিলেন। 1903 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার কালে রবীন্দ্রনাথ এই কর্মচারীর মেধা ও সংস্কৃত ভাষা সাহিত্যের ওপর দখল দেখে তাঁকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসেন। সেই থেকে 1932 খ্রিস্টাব্দে অবসরগ্রহণ না করা পর্যন্ত হরিচরণ শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রমের সংস্কৃত বিষয়ের অধ্যাপকরূপে জীবন অতিবাহিত করেন। বিশ্বকবির একান্ত ইচ্ছা ও অনুরোধে সাড়া দিয়ে হরিচরণ ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এর মতো বৃহদাকার অভিধান রচনায় মনোনিবেশ করেন।
কবি রবীন্দ্রনাথের দূরদৃষ্টি, মানুষের অন্তর্নিহিত প্রতিভা সন্ধানের দুর্লভ ক্ষমতা, উপযুক্ত ব্যক্তিকে দিয়ে উপযুক্ত কাজ করিয়ে নেওয়ার দক্ষতা এ পাঠ্যে আলোচিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান বজায় রেখে হরিচরণ যেভাবে অভিধান প্রণয়নে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, তা-ও এখানে বিস্তৃতরূপে আলোচিত হয়েছে। মহৎ মানুষের মানসিকতা, তাঁদের অনুসন্ধিৎসা, কর্মযোগ এ পাঠের মাধ্যমে আমাদের গোচরে এসেছে। গদ্যাংশটি পাঠ করতে করতে আমাদের মন পরিভ্রমণ করে বুধমণ্ডলীতে, মহাত্মাগণের কর্মোদ্যোগের মধ্যে। মনীষীতুল্য ব্যক্তিত্বদের আন্তরিক পরিচয় এ পাঠ্যে লভ্য। প্রচারের অন্তরালে থেকে যাঁরা নিভৃতে লোকহিতের সাধনায় মগ্ন হন, তাঁরা আমাদের নমস্য। নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে নিরলস শ্রম মানুষকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়—হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনবৃত্তান্ত আমাদের সে পথের সন্ধান দেয়।
বিষয়সংক্ষেপ
শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্বে রবীন্দ্রনাথ সুযোগ্য মানুষদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকপদে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর সত্যানুসন্ধানী দৃষ্টি সেই মুহূর্তে আরও অনেকের সঙ্গে শ্রদ্ধেয় হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও সন্ধান করে আনে। অপরিচয়ের দূরত্ব, পাণ্ডিত্যের প্রামাণিকতার অভাব, প্রখ্যাত না হওয়ার অসুবিধা রবীন্দ্রনাথকে বিচলিত করেনি। পাকা জহুরি যেমন সঠিক জহর চেনেন, ঠিক তেমনই রবীন্দ্রনাথও বাংলার পল্লি-অঙ্গন থেকে চয়ন করে এনেছিলেন ব্যক্তিত্বের সুরভিবৃন্দকে। প্রতিভার স্ফুরণ লক্ষ করে তাঁদের তিনি প্রতিভা বিকাশের উন্মুক্ত ক্ষেত্র শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসেন। সেইরূপ কতিপয় প্রতিভাধর মানুষের মধ্যে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতম।
হরিচরণের মধ্যে বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রটি উর্বর হয়েই ছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অভিধান রচনার আদেশ দিলে তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন। চিত্তের বিদ্যানুশীলনের গতিটি তাঁর সুপ্তই ছিল, বিশ্বকবি সে-গতির অভিমুখ নির্বাচন করে দিলেন। পালে লাগল হাওয়া, অভিধান রচনার তরিখানি এগিয়ে চলল সমাপ্তির অভিমুখে। সুদীর্ঘ চল্লিশ বছরের একনিষ্ঠ সাধনার ফল তাঁর ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’। হরিচরণের শ্রমসাধ্য কাজের বর্ণনা দিয়েছেন হীরেন্দ্রনাথ দত্ত। অশক্ত শরীরে, ক্ষীণদৃষ্টি নিয়ে, শত প্রতিকূলতাকে হেলায় তুচ্ছ করে হরিচরণ অভিধান রচনায় ব্যাপৃত থেকেছেন। অদম্য মানসিক জোর তাঁকে এ কাজে সদা সচল রেখেছে। একক প্রয়াসে তাঁর এ উদ্যোগ এবং সফল রূপায়ণ এ গদ্যে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে।
নামকরণ
আলোচ্য গদ্যের নামকরণ ‘হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়’ দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, এর উপজীব্য তাঁর জীবনী। কিন্তু পাঠ শেষ করে বোঝা যায়, এ গদ্য নিছক জীবনী ছাড়িয়েও অনেক কিছু। শুধুমাত্র কালানুক্রমিক শুষ্ক তথ্য সমাবেশ নয়, বরং হরিচরণের একনিষ্ঠতার আন্তরিক পরিচয় এখানে পাওয়া যায়। আনুষঙ্গিক ব্যক্তিচরিত্র, তাঁদের জীবনের কথা এসেছে হরিচরণের সূত্র ধরেই। হরিচরণকে খুঁজে বের করার কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথের। কিন্তু মনে রাখতে হবে জহরের উপস্থিতি, রত্নের ঔজ্জ্বল্য আছে বলেই জহুরির এত কদর। হরিচরণ এখানে রত্ন আর জহুরি রবীন্দ্রনাথ। কাজেই রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ এখানে এসেছে, আরও এসেছে শান্তিনিকেতনের সূচনাযজ্ঞের কথা, শান্তিনিকেতনের ফলপ্রসূ পরিবেশের কথা। প্রথম পর্বে রবীন্দ্রনাথ তথা শান্তিনিকেতন যে রত্ন-সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন, সে প্রসঙ্গও এখানে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে। তবে তার সবকিছুই এসেছে হরিচরণের প্রসঙ্গ ধরেই।
হরিচরণের একনিষ্ঠতা, তাঁর শ্রমসাধ্য কাজের প্রতি নিষ্ঠা, অধ্যবসায় সবকিছুই শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। গদ্যের ভরকেন্দ্রে রয়েছেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। লেখকের সরস বর্ণনাগুণে এ পাঠ্য মনোগ্রাহী ও সাহিত্যরসাস্বাদী হয়ে উঠেছে। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এর মতো সুবৃহৎ বাংলা অভিধান রচনা করে বাঙালি সমাজের কাছে চিরনমস্য হয়েছেন হরিচরণ। দীর্ঘ চল্লিশ বছরের শ্রমসাধ্য প্রয়াস যখন ফলপ্রসূ হলো, তখন বাংলার বিদ্বজ্জন দেখলেন এ কাজের মাহাত্ম্যকে। পর্বতপ্রমাণ, আয়াসসাধ্য কাজকে হরিচরণ যেভাবে অনায়াসে সুসম্পন্ন করলেন, তা বিস্ময়কর বৈ কী! গদ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছেন হরিচরণ। তাই গদ্যাংশের নামকরণ যথাযথ ও সার্থক।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের অষ্টম পাঠের অন্তর্গত ‘হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেছি।
আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। এ ছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





Leave a Comment