এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘পুষ্টি’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

পুষ্টি কাকে বলে? জীবদেহে পুষ্টির গুরুত্ব বা তাৎপর্যগুলি আলোচনা করো।
পুষ্টি (Nutrition) – যে পদ্ধতিতে জীব খাদ্য উপাদান বা পরিপোষক (জৈব অথবা অজৈব বস্তু) সংগ্রহ করে খাদ্যবস্তুর পরিপাক, শোষণ, আত্তীকরণ এবং বহিষ্করণের মাধ্যমে (প্রাণীদের ক্ষেত্রে) অথবা খাদ্য সংশ্লেষ ও আত্তীকরণের মাধ্যমে (উদ্ভিদের ক্ষেত্রে) দেহের বৃদ্ধি ঘটায়, ক্ষয়পূরণ ও রোগপ্রতিরোধ করে এবং খাদ্যমধ্যস্থ স্থৈতিক শক্তিকে ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরিত করে জীবনের মৌলিক ধর্মগুলি পালন করে, তাকে পুষ্টি বা পরিপোষণ বা নিউট্রিশন বলে।
জীবদেহে পুষ্টির গুরুত্ব বা তাৎপর্য –
- দেহের বৃদ্ধি ও ক্ষয়পুরণ – পুষ্টির মাধ্যমে প্রোটোপ্লাজমের বৃদ্ধি ঘটে, যা কোশ বিভাজন ঘটায় এবং জীবদেহের সামগ্রিক বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ ও শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
- জৈবিক ধর্ম পালন – পুষ্টির মাধ্যমে জীবদেহের মৌলিক ধর্মগুলি যেমন – চলন, গমন, রেচন, জনন প্রভৃতি পালনের জন্য শক্তি অর্জিত হয়।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা – পুষ্টির মাধ্যমে জীবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে এবং জীব বিভিন্ন রোগের হাত থেকে রক্ষা পায়।
- শক্তির রূপান্তর – পুষ্টির মাধ্যমে খাদ্যমধ্যস্থ স্থৈতিকশক্তি গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
- খাদ্য ও শক্তি সঞ্চয় – উদ্ভিদদেহে শ্বেতসার রূপে ও প্রাণীদেহের পেশি, যকৃৎ-এ গ্লাইকোজেন রূপে এবং মেদকলায় ফ্যাট বা চর্বিরূপে খাদ্য সঞ্চিত থাকে, যা ভবিষ্যতে শক্তির উৎসরূপে কাজ করে।
- কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি – পুষ্টির মাধ্যমে উৎপন্ন তাপ দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে ও প্রাণীদেহে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা বজায় রাখে।
উদ্ভিদজগতে কত ধরনের পুষ্টি দেখা যায়? প্রতি প্রকার পুষ্টি উদাহরণসহ ছকের মাধ্যমে লেখো।
উদ্ভিদজগতে প্রধানত দুই ধরনের পুষ্টি-পদ্ধতি দেখা যায়। যথা –
- স্বভোজী পুষ্টি ও
- পরভোজী পুষ্টি।

স্বভোজী পুষ্টি কাকে বলে? স্বভোজী পুষ্টি পর্যায়গুলির সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।
স্বভোজী পুষ্টি (Autotrophic Nutrition) – যে পুষ্টি পদ্ধতিতে ক্লোরোফিলযুক্ত জীব পরিবেশ থেকে সংগৃহীত কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জলের সাহায্যে সূর্যালোকের উপস্থিতিতে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে সরল শর্করাজাতীয় খাদ্য সংশ্লেষের মাধ্যমে পুষ্টি সম্পন্ন করে, তাকে স্বভোজী পুষ্টি বা অটোট্রফিক পুষ্টি বলে। যেমন – সমস্ত সবুজ উদ্ভিদের পুষ্টি, ইউগ্নিনা, ক্রাইস্যামিবা প্রভৃতি আণুবীক্ষণিক জীব এবং সালোকসংশ্লেষকারী ব্যাকটেরিয়ার পুষ্টি পদ্ধতি।
স্বাভাজী পুষ্টির পর্যায় – স্বভোজী পুষ্টি দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। যথা –
- সংশ্লেষ ও
- আত্তীকরণ।
খাদ্য বস্তুর সংশ্লেষ –
- শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি – সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় সবুজ উদ্ভিদের কোশে শর্করা জাতীয় খাদ্য সংশ্লেষ হয়। সূর্যালোকের উপস্থিতিতে ক্লোরোফিলের সাহায্যে CO2 ও H2O -র মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে গ্লুকোজ (C6H12O6) জাতীয় খাদ্য উৎপন্ন হয়।
- সেলুলোজ সংশ্লেষ – গ্লুকোজ থেকে অন্যান্য পলিস্যাকারাইড, যেমন – শ্বেতসার, সেলুলোজ প্রভৃতি সংশ্লেষিত হয়।
- স্নেহপদার্থ জাতীয় খাদ্য প্রস্তুত – শ্বসনের মাধ্যমে গ্লুকোজ থেকে বিভিন্ন জৈব অ্যাসিড উৎপন্ন হয়। এই জৈব অ্যাসিড গ্লিসারলের সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটিয়ে স্নেহপদার্থ বা ফ্যাট সংশ্লেষ করে।
- প্রোটিন জাতীয় খাদ্য সংশ্লেষ – উদ্ভিদদেহে নাইট্রোজেনঘটিত খনিজ লবণ উৎসেচকের সাহায্যে বিজারিত হয়ে অ্যামোনিয়াতে পরিণত হয়। অ্যামোনিয়া জৈব অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অ্যামিনো অ্যাসিড (প্রোটিনের সাংগঠনিক একক) সংশ্লেষ করে।
আত্তীকরণ –
উদ্ভিদদেহে সংশ্লেষিত বিভিন্ন প্রকার সরল খাদ্য প্রোটোপ্লাজমে অঙ্গীভূত হয় এবং উপচিতিমূলক বিপাক ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রোটোপ্লাজমের শুষ্ক ওজন বৃদ্ধি করে। এই ঘটনাকে আত্তীকরণ বলা হয়।
স্বভোজী পুষ্টি কয় প্রকার ও কী কী?
স্বভোজী পুষ্টি আবার দুই প্রকার –
- সালোকসংশ্লেষকারী – ক্লোরোফিলযুক্ত সবুজ উদ্ভিদ সূর্যালোকের উপস্থিতিতে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় খাদ্য উৎপন্ন করে। সূর্যালোক থেকে শক্তি আহরণ করে সেই শক্তিকে খাদ্যের মধ্যে স্থৈতিক শক্তি হিসেবে সঞ্চয় করে। উদাহরণ- সমস্ত ক্লোরোফিলযুক্ত সবুজ উদ্ভিদ।
- রাসায়নিক সংশ্লেষকারী – কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া কোশে রাসায়নিক যৌগ জারণের মাধ্যমে উৎপন্ন শক্তির দ্বারা CO₂ -এর সাহায্যে জৈব খাদ্য উৎপন্ন হয়। যেমন – নাইট্রোসোমোনাস ও নাইট্রোব্যাকটর।
উদ্ভিদের পরভোজী পুষ্টি কাকে বলে? এই পুষ্টি পদ্ধতির প্রকারভেদগুলি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।
উদ্ভিদের পরভোজী পুষ্টি (Heterotrophic Nutrition of Plants) – যে পুষ্টি পদ্ধতিতে ক্লোরোফিলবিহীন, নিজদেহে খাদ্য সংশ্লেষে অক্ষম উদ্ভিদ অন্য কোনো আশ্রয়দাতা উদ্ভিদের দেহ থেকে বা মৃত জৈবপদার্থ থেকে পুষ্টিরস শোষণ করে পুষ্টি সম্পন্ন করে, তাকে উদ্ভিদের পরভোজী পুষ্টি বা হেটারোট্রফিক পুষ্টি বলে।
খাদ্যের উৎস অনুযায়ী উদ্ভিদজগতে চার প্রকার পরভোজী পুষ্টি দেখা যায়। যথা –
- পরজীবীয় পুষ্টি,
- মৃতজীবীয় পুষ্টি,
- মিথোজীবীয় পুষ্টি এবং
- পতঙ্গভুক উদ্ভিদের পুষ্টি।
পরজীবীয় পুষ্টি (Parasitic Nutrition) –
যে পুষ্টি পদ্ধতিতে পরভোজী উদ্ভিদ সজীব আশ্রয়দাতা বা পোষক (Host) উদ্ভিদের দেহ থেকে পুষ্টিরস শোষণ করে পুষ্টি সম্পন্ন করে এবং এর দ্বারা পোষক উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাকে পরজীবীয় পুষ্টি বা প্যারাসাইটিক পুষ্টি বলা হয়।

উদাহরণ – স্বর্ণলতা, র্যাফ্লেসিয়া উদ্ভিদে পূর্ণ পরজীবীয় পুষ্টি এবং শ্বেতচন্দন, লোরানথাস প্রভৃতি উদ্ভিদে আংশিক পরজীবীয় পুষ্টি দেখা যায়।

মৃতজীবীয় পুষ্টি (Saprophytic Nutrition) –
যে পুষ্টি পদ্ধতিতে পরভোজী উদ্ভিদ মৃত, পচাগলা জৈবপদার্থ বা জীবের দেহাবশেষ থেকে পুষ্টিরস সংগ্রহের মাধ্যমে পুষ্টি সম্পন্ন করে, তাকে মৃতজীবীয় পুষ্টি বা স্যাপ্রোফাইটিক পুষ্টি বলে।
উদাহরণ –
- ইস্ট, অ্যাগারিকাস (ব্যাঙের ছাতা), মিউকর, পেনিসিলিয়াম প্রভৃতি উদ্ভিদ সম্পূর্ণভাবে পচনশীল জীবদেহ বা জীবদেহ নিঃসৃত পচনশীল জৈব বর্জ্য পদার্থের উপর নির্ভরশীল। এই ধরনের পুষ্টি পদ্ধতিকে পূর্ণ মৃতজীবীয় পুষ্টি বলে।
- পাইন উদ্ভিদ তার মূলে বসবাসকারী মাইকোরাইজার সাহায্যে পচনশীল জৈবপদার্থ থেকে পুষ্টি শোষণ করে। একে আংশিক মৃতজীবীয় পুষ্টি বলে।

মিথোজীবীয় পুষ্টি (Symbiotic Nutrition) –
যে পুষ্টি পদ্ধতিতে দুটি ভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ পরস্পরের সাহচর্যে এবং সহযোগিতায় জীবনধারণ করে এবং উভয়েই পারস্পরিক নির্ভরশীলতায় পুষ্টি সম্পন্ন করে, তাকে মিথোজীবীয় পুষ্টি বা সিমবায়োটিক পুষ্টি বলে।

উদাহরণ –
- লাইকেন। এক্ষেত্রে শৈবাল ও ছত্রাক পারস্পরিক সহযোগিতায় পুষ্টিলাভ করে এবং বেঁচে থাকে, এই পুষ্টি পদ্ধতিকে ব্যতিহারী পুষ্টি বলে।
- সপুষ্পক উদ্ভিদের গুঁড়ির ওপর জন্মানো অর্কিড সপুষ্পক উদ্ভিদের তৈরি করা খাবার শোষণ করে বেঁচে থাকে। এক্ষেত্রে অর্কিড উপকৃত হলেও সপুষ্পক উদ্ভিদটি উপকৃত বা অপকৃত কিছুই হয় না। এই ধরনের পুষ্টি পদ্ধতিকে সহভোক্তা বলে।
পতঙ্গভুক উদ্ভিদের পুষ্টি (Insectivorous Nutrition) –
যে পুষ্টি পদ্ধতিতে স্বভোজী উদ্ভিদ নাইট্রোজেনঘটিত পুষ্টিলাভের জন্য পতঙ্গদের দেহ থেকে পুষ্টিরস শোষণ করে, তাকে পতঙ্গভুক পুষ্টি বলে। উদাহরণ – কলশপত্রী, সূর্যশিশির প্রভৃতি উদ্ভিদে পতঙ্গভুক পুষ্টি দেখা যায়।

প্রাণীজগতে কত ধরনের পুষ্টি দেখা যায়? প্রত্যেক প্রকার পুষ্টি উদাহরণসহ ছকের মাধ্যমে লেখো।
প্রাণী জগতে মোট পাঁচ ধরনের পরভোজী পুষ্টি লক্ষ করা যায়। যথা –

প্রাণীজগতের পরভোজী পুষ্টি কাকে বলে? বিভিন্ন প্রকার পরভোজী পুষ্টি উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করো।
প্রাণীদের পরভোজী পুষ্টি –
যে পুষ্টি পদ্ধতিতে প্রাণীরা নিজের পুষ্টি সম্পন্ন করার জন্য স্বভোজী জীবের উপর নির্ভর করে অথবা আশ্রয়দাতা জীবের দেহ থেকে বা মৃত, পচনশীল, গলিত জীবদেহ থেকে পুষ্টিরস শোষণ করে, সেই প্রকার পুষ্টি পদ্ধতিকে পরভোজী পুষ্টি বলে।
প্রাণীরা খাদ্যের ব্যাপারে স্বনির্ভর নয় অর্থাৎ, পরভোজী পুষ্টি সম্পন্ন করে। খাদ্যের উৎসের ভিত্তিতে প্রাণীর পরভোজী পুষ্টিকে পাঁচভাগে ভাগ করা হয়। যথা –
- পরজীবীয় পুষ্টি,
- মিথোজীবীয় পুষ্টি,
- মৃতজীবীয় পুষ্টি,
- কপ্রোফ্যাগি এবং
- স্যাংগুইনিভোরি।
পরজীবীয় পুষ্টি (Parasitic Nutrition) –
যে পুষ্টি পদ্ধতিতে একটি জীব আশ্রয়দাতা (স্থায়ী বা অস্থায়ী) জীবদেহ থেকে পুষ্টিরস গ্রহণের মাধ্যমে পুষ্টি সম্পন্ন করে এবং আশ্রয়দাতা বা পোষক জীবের ক্ষতিসাধন করে, তাকে পরজীবীয় পুষ্টি বলে।
উদাহরণ – পরজীবী প্রাণী আবার দু-প্রকার –
- অন্তঃপরজীবী – যেসব পরজীবী প্রাণীরা পোষকের দেহের মধ্যে অবস্থান করে, তাদের অন্তঃপরজীবী বলে। যেমন – ফিতাকৃমি, গোলকৃমি, প্লাসমোডিয়াম প্রভৃতি মানুষের শরীরে বসবাস করে।
- বহিঃপরজীবী – যেসব পরজীবী প্রাণীরা পোষকের দেহের বাইরে পোষকের সংস্পর্শের মাধ্যমে পোষকের দেহ থেকে পুষ্টিরস শোষণ করে, তাদের বহিঃপরজীবী বলে। যেমন – উকুন, ছারপোকা প্রভৃতি।
মৃতজীবীয় পুষ্টি (Saprozoic Nutrition) –
যে পুষ্টি পদ্ধতিতে প্রাণী মৃত, পচাগলা জৈববস্তু থেকে পুষ্টিরস গ্রহণের মাধ্যমে পুষ্টি সম্পন্ন করে, তাকে মৃতজীবীয় পুষ্টি বা স্যাপ্রোজোয়িক পুষ্টি বলে।
মিথোজীবীয় পুষ্টি (Symbiotic Nutrition) – যে পুষ্টি পদ্ধতিতে দুটি ভিন্ন প্রজাতিভুক্ত প্রাণী পারস্পরিক সাহচর্যে থেকে একে অপরের সহযোগিতায় পুষ্টিলাভ করে, তাকে মিথোজীবীয় বা সিমবায়োটিক পুষ্টি বলে।
উদাহরণ –
1. উইপোকার পৌষ্টিকনালিতে বসবাসকারী প্রোটোজোয়া ট্রাইকোনিম্ফ উইপোকাকে সেলুলোজ পরিপাকে সাহায্য করে এবং বিনিময়ে ট্রাইকোনিম্ফ উইপোকার পৌষ্টিকনালি থেকে পুষ্টিরস সংগ্রহ করে, একে ব্যতিহারি মিথোজীবীয় পুষ্টি বলে।

2. হাঙরের পাখনার সঙ্গে চোষক অঙ্গের দ্বারা রেমোরা নামক মাছ আটকে থাকে। এরা হাঙরের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় যায় বলে হাঙরের ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে বেঁচে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে হাঙরের উপকার বা ক্ষতি কিছুই হয় না। এই প্রকার পুষ্টি সহভোক্তা মিথোজীবীয় পুষ্টির উদাহরণ।
কপ্রোফ্যাগি (Coprophagy) –
যে পুষ্টি পদ্ধতিতে কোনো প্রাণী অন্য প্রাণীর বা নিজের মল ভক্ষণ করে খাদ্যরস সংগ্রহ করে, সেই পুষ্টি পদ্ধতিকে কপ্রোফ্যাগি বলে। উদাহরণ – শুয়োর মানুষের মল ও ভক্ষণ করে। গিনিপিগ নিজের রাত্রিকালীন তরল মল ভক্ষণ করে। গুবরেপোকা গোবর থেকে পুষ্টিরস সংগ্রহ করে।

স্যাংগুইনিাভারি (Sanguinivore) –
যে পুষ্টি পদ্ধতিতে কোনো প্রাণী অন্য প্রাণীর রক্ত শোষণ করে বেঁচে থাকে, তাকে স্যাংগুইনিভোরি বলে।
উদাহরণ – মশা, জোঁক প্রভৃতি। এদের হিমাটোফাজ-ও বলে।

হলোজোয়িক পুষ্টির ধাপ ও ধাপগুলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবদেহের পৌষ্টিকনালির অংশগুলির নাম সারণি আকারে উল্লেখ করো।
| হলোজোয়িক পুষ্টির ধাপ | সংশ্লিষ্ট মানব পৌষ্টিকনালির অংশ |
| খাদ্যগ্রহণ | ওষ্ঠ, মুখছিদ্র ও মুখগহ্বর |
| খাদ্য পরিপাক | মুখবিবর, পাকস্থলী এবং ক্ষুদ্রান্ত্র |
| পরিপাচিত খাদ্যরস শোষণ | প্রধানত ক্ষুদ্রান্ত্র, অল্প পরিমাণে পাকস্থলী ও বৃহদন্ত্র |
| আত্তীকরণ | পৌষ্টিকনালিতে উপস্থিত কোশ ও সমস্ত দেহকোশ |
| অপাচ্য খাদ্য বহিষ্করণ | মলাশয় ও পায়ুছিদ্র |
হলোজোয়িক পুষ্টির বিভিন্ন পর্যায়গুলির সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।
প্রাণী পুষ্টি বা হালাজোয়িক পুষ্টির পর্যায়গুলি হল –
- খাদ্যগ্রহণ,
- পরিপাক বা পাচন,
- শোষণ,
- আত্তীকরণ এবং
- বহিষ্করণ।
- খাদ্যগ্রহণ (Ingestion) – যে প্রক্রিয়ায় প্রাণী নির্দিষ্ট অঙ্গের সাহায্যে বাইরের পরিবেশ থেকে খাদ্য দেহের মধ্যে গ্রহণ করে, তাকে অ্যামিবা ক্ষণপদের সাহায্যে, ব্যাং জিহ্বার খাদ্যগ্রহণ বলে। যেমন – সাহায্যে খাদ্যগ্রহণ করে।
- খাদ্য পরিপাক (Digestion) – যে প্রক্রিয়ায় প্রাণীদেহে গৃহীত অদ্রবণীয়, কঠিন ও জটিল খাদ্য বিভিন্ন উৎসেচকের সাহায্যে বিশ্লিষ্ট হয়ে বা ভেঙে গিয়ে দ্রবণীয়, সরল, তরল ও শোষণোপযোগী খাদ্যরসে পরিণত হয়, তাকে খাদ্য পরিপাক বলে। যেমন – শ্বেতসার, গ্লাইকোজেন প্রভৃতি জটিল কার্বোহাইড্রেট অ্যামাইলেজ, ল্যাকটেজ, মলটেজ প্রভৃতি উৎসেচকের ক্রিয়ায় সরল শর্করায় পরিণত হয়।
- শোষণ (Absorption) – যে প্রক্রিয়ায় পাচিত সরল খাদ্যরস কোশে বা রক্তজালকে বা লসিকাবাহে প্রবেশ করে, তাকে শোষণ বলে। যেমন – মানুষের পৌষ্টিকনালির ক্ষুদ্রান্ত্রের গহ্বর থেকে গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, গ্লিসারল প্রভৃতি রক্তজালকে এবং ফ্যাটি অ্যাসিড কেন্দ্রীয় লসিকাবাহ বা ল্যাকটিয়েলে প্রবেশ করে শোষণের মাধ্যমে। ক্ষুদ্রান্ত্রের অন্তঃপ্রাচীরে অবস্থিত আঙুলের ন্যায় প্রবর্ধক, ভিলাই শোষণে সাহায্য করে।
- আত্তীকরণ (Assimilation) – যে প্রক্রিয়ায় সরল শোষিত খাদ্য কোশের প্রোটোপ্লাজমের অংশবিশেষে পরিণত হয়, তাকে আত্তীকরণ বলে। যেমন – পরিপাক গ্রন্থি যকৃৎ আত্তীকরণে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। যকৃতে গ্লুকোজ বা ফ্যাটি অ্যাসিড বা অ্যামিনো অ্যাসিড এসে পৌঁছলে তা রক্ত সংবহনের মাধ্যমে দেহের প্রতিটি কোশে পৌঁছায় এবং কাজে লাগে।
- বহিষ্করণ (Egestion) – যে প্রক্রিয়ায় অপাচ্য খাদ্য নির্দিষ্ট অঙ্গের মাধ্যমে দেহ থেকে পরিত্যক্ত হয়, তাকে বহিষ্করণ বলে। যেমন – খাদ্যের অপাচিত অংশ বৃহদন্ত্রে প্রবেশ করে। সেখানে জল শোষিত হয়ে মলে পরিণত হয়ে মলাশয় ও পায়ুছিদ্রের মাধ্যমে দেহ থেকে নির্গত হয়।
পৌষ্টিকতন্ত্র কাকে বলে? মানব পৌষ্টিকতন্ত্রের অংশগুলি ছকের মাধ্যমে দেখাও।
পৌষ্টিকতন্ত্র বা পরিপাকতন্ত্র (Digestive System) – খাদ্যগ্রহণ, খাদ্যের পরিপাক, পাচিত খাদ্যের শোষণ এবং খাদ্যের অপাচ্য অংশের বহিষ্করণ -এর প্রক্রিয়াগুলি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে দেহের বিভিন্ন আস্তরযন্ত্রীয় অঙ্গসমূহ মিলিতভাবে যে তন্ত্র গঠন করে, তাকে পৌষ্টিকতন্ত্র বা পরিপাকতন্ত্র বলে।
পৌষ্টিকনালি কাকে বলে? মানব পৌষ্টিকনালির বিভিন্ন অংশগুলি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।
পৌষ্টিকনালি (Alimentary Canal) – মুখছিদ্র থেকে শুরু করে পায়ুছিদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত যে দীর্ঘ নলাকার অংশের মধ্যে দিয়ে খাদ্যগ্রহণ, গৃহীত খাদ্যের পরিপাক, পাচিত খাদ্যরস শোষণ, অপাচ্য খাদ্যবস্তুর বহিষ্করণ প্রভৃতি কাজগুলি সম্পন্ন হয়, তাকে পৌষ্টিকনালি বলে।
পৌষ্টিকনালির বিভিন্ন অংশ –
মানব পৌষ্টিকনালির দৈর্ঘ্য প্রায় 8 – 10 মিটার। পৌষ্টিকনালির অংশগুলি হল –

মুখগহ্বর (Mouth cavity) –
ওষ্ঠ দ্বারা বেষ্টিত মুখছিদ্রের পরবর্তী প্রশস্ত প্রকোষ্ঠকে মুখগহ্বর বলে। এই স্থানে দাঁত, জিহ্বা ও লালাগ্রন্থি থাকে।
কাজ – মুখগহ্বরে খাদ্যবস্তু দাঁত ও জিহ্বার সাহায্যে ভালোভাবে পেষাই হয় এবং লালারসের সঙ্গে মিশ্রিত হয়। এই স্থানে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্যের পরিপাক শুরু হয়।
গলবিল (Pharynx) –
মুখগহ্বরের পরে প্রায় 12-14 সেমি প্রশস্ত ফানেলের মতো অংশকে গলবিল বলে। এটি নাসা গলবিল, মুখ গলবিল ও স্বর গলবিল দ্বারা গঠিত।
কাজ – গলবিল খাদ্যবস্তুকে মুখগহ্বর থেকে গ্রাসনালিতে পৌঁছে দেয়।
গ্রাসনালি (Oesophagus) –
গলবিলের পরে প্রায় 25 সেমি দীর্ঘ নলাকার মসৃণ পেশিবহুল অংশকে গ্রাসনালি বলে।
কাজ – গ্রাসনালি বা খাদ্যনালির মসৃণ পেশির ক্রমসংকোচন বিচলনের (পেরিস্ট্যালসিস মুভমেন্ট) সাহায্যে খাদ্য গলবিল থেকে পাকস্থলীতে পৌঁছায়।
পাকস্থলী (Stomach) –
মধ্যচ্ছদার ঠিক নীচে পৌষ্টিকনালির সবথেকে প্রশস্ত প্রায় 25 – 30 সেমি দীর্ঘ থলির মতো গঠনকে পাকস্থলী বলে। এটি কার্ডিয়াক প্রান্ত, ফান্ডাস, দেহ ও পাইলোরিক প্রান্ত দ্বারা গঠিত।
কাজ –
- প্রধানত প্রোটিন জাতীয় ও অল্প পরিমাণে ফ্যাট জাতীয় খাদ্যের পরিপাক ঘটে।
- জল ও অ্যালকোহল এবং অল্প পরিমাণ গ্লুকোজ ও লবণ শোষিত হয়।
- মরফিন ও অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ রেচিত হয়।
ক্ষুদ্রান্ত্র (Small Intestine) –
পাকস্থলী পরবর্তী প্রায় 6 মিটার লম্বা ও 2.5 সেমি ব্যাসযুক্ত নলাকার অংশকে ক্ষুদ্রান্ত্র বলে। ক্ষুদ্রান্ত্র ডিওডিনাম বা গ্রহণী, জেজুনাম ও ইলিয়ামে বিভক্ত থাকে।
কাজ –
- ক্ষুদ্রান্ত্রে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাট জাতীয় খাদ্যের পাচন ক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং সরল খাদ্যবস্তু শোষিত হয়।
- ক্ষুদ্রান্ত্রে জল, খনিজ লবণ, ভিটামিন ইত্যাদি শোষিত হয়।
বৃহদন্ত্র (Large Intestine) –
ক্ষুদ্রান্ত্রের পরে প্রায় 1.5-1.8 মিটার দীর্ঘ এবং 6 সেমি ব্যাসযুক্ত নলাকার গঠনকে বৃহদন্ত্র বলে। এটি সিকাম ও কোলন অংশ দ্বারা গঠিত।
কাজ – প্রধানত জল শোষিত হয় ও অপাচ্য খাদ্য মলে রূপান্তরিত হয়। মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়ার সহযোগিতায় ভিটামিন K ও B-কমপ্লেক্স (ফোলিক অ্যাসিড) সংশ্লেষিত হয়।
মলাশয় (Rectum) –
সিগময়েড ও কোলন থেকে শুরু করে পায়ুছিদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় 15 সেমি দীর্ঘ নলাকার অংশকে রেকটাম বা মলাশয় বলে।
কাজ – মল সাময়িকভাবে সঞ্চিত থাকে এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর পায়ুছিদ্রের মাধ্যমে মল দেহের বাইরে নির্গত হয়।
ক্ষুদ্রান্ত্রের গঠনগত অংশগুলি কী কী? এর কাজগুলি উল্লেখ করো।
মানবদেহের পৌষ্টিকনালির অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্রান্ত্র উদরগহ্বরে পাকস্থলীর পাইরোলিক স্ফিংকটারের পরবর্তী অংশে অর্থাৎ পাকস্থলী ও বৃহদন্ত্রের মধ্যবর্তী অংশে অবস্থিত।
ক্ষুদ্রান্তের গঠন –
ক্ষুদ্রান্ত্রটি সরু ব্যাসবিশিষ্ট নলাকার অংশ যা তিনটি অংশে বিভেদিত। যথা –
- ডিওডিনাম,
- জেজুনাম,
- ইলিয়াম।
- ডিওডিনাম – এটি ‘C’ আকৃতিবশিষ্ট ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশ, যা সাধারণ অগ্ন্যাশয় নালি ও পিত্তনালিতে উন্মুক্ত হয়।
- জেজুনাম – এটি ডিওডিনামের পরবর্তী অংশ। একে মধ্য ক্ষুদ্রান্ত্র বলা হয়।
- ইলিয়াম – এটি জেজুনামের পরবর্তী অংশ অর্থাৎ ক্ষুদ্রান্ত্রের শেষ অংশ। এর অন্তর্গাত্রে অসংখ্য আঙুলের মতো প্রবর্ধক দেখা যায়। এগুলিকে ভিলাই বলে, যা শোষণে অংশগ্রহণ করে। ক্ষুদ্রান্ত্র অসংখ্য খাঁজবিশিষ্ট হয়। এর বহির্গাত্র মেসেনটেরি নামক পর্দা দিয়ে আবৃত থাকে।
ক্ষুদ্রান্ত্রের কাজ –
- খাদ্য পরিপাক – ক্ষুদ্রান্ত্রে উপস্থিত প্রয়োজনীয় উৎসেচক খাদ্যে উপস্থিত কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাট পরিপাকে সহায়তা করে।
- শোষণ – ক্ষুদ্রান্ত্রের আন্ত্রিক আবরণী কলায় অবস্থিত ভিলাই (একবচনে ভিলাস) হল শোষণের কার্যগত একক, যা খাদ্য শোষণে সহায়তা করে। শোষণের মাধ্যমে জল, খনিজ লবণ, ভিটামিন শোষিত হয়।

বৃহদন্ত্রের অংশগুলি কী কী? এর কাজ কী?
বৃহদন্তের ভাংশ মানুষের বৃহদন্ত্রের দৈর্ঘ্য প্রায় 1.5 m, ব্যাস 6.5 cm, যা ইলিয়ামের পরবর্তী অংশে অবস্থান করে। বৃহদন্ত্রের অংশগুলি হল –
- সিকাম,
- কোলন,
- মলাশয়,
- মলনালি।
- সিকাম – বৃহদন্ত্রের যে অংশে ইলিয়াম মুক্ত হয়েছে তার পশ্চাদভাগে একটি ক্ষুদ্র থলির মতো অংশ থাকে। একেই সিকাম বলে।
- কোলন – কোলন অংশটি ক্ষুদ্রান্ত্রের তুলনায় স্ফীত। এর চারটি অংশ থাকে। যথা – ঊর্ধ্বগামী, অনুপ্রস্থ, নিম্নগামী ও সিগময়েড কোলন।
- মলাশয় – সিগময়েড কোলনের পশ্চাদভাগ একটি স্ফীত প্রকোষ্ঠময় অংশে মুক্ত হয়; একে মলাশয় বলে, যার দৈর্ঘ্য 13 cm।
- পায়ু ও পায়ুছিদ্র – মলাশয়ের পশ্চাদভাগ একটি স্বল্পদীর্ঘ নালিকার সঙ্গে যুক্ত থাকে। এর দৈর্ঘ্য 3.8 cm। এই অংশটি হল পায়ু এবং পায়ু পায়ুছিদ্রে উন্মুক্ত হয়।
বৃহদন্ত্রের কাজ –
- মল উৎপাদন – মানুষের বৃহদন্ত্রের কোলন অংশে খাদ্যের অপাচ্য অংশ বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে মলে পরিণত হয়।
- ভিটামিন উৎপাদন – বৃহদন্ত্রে উপস্থিত কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া ভিটামিন K ও বায়োটিন সংশ্লেষ করে। গৃহীত খাদ্যে ভিটামিন কম থাকলে এগুলি ঘাটতি মেটায়।
- বিশোষণ – এই অংশে খাদ্যের অপাচ্য অংশ থেকে জল, খনিজ লবণ, ভিটামিন ও ওষুধ প্রভৃতি বিশোষিত হয়।
- শ্লেষ্মা ক্ষরণ – কোলন অংশের অন্তঃপ্রাচীরগাত্রে গবলেট কোশ থাকে। এখান থেকে মিউকাস নামক একপ্রকার পিচ্ছিল পদার্থ ক্ষরিত হয় যা মলকে পিচ্ছিল করে।
- মল সঞ্চয় – মলাশয়ে মল সাময়িকভাবে সঞ্চিত থাকে। এখানেও কিছু পরিমাণ জলের পুনঃবিশোষণ ঘটে।
- মল বহিঃস্করণ – প্রয়োজনমতো উন্মুক্ত পায়ুছিদ্রের মাধ্যমে মলাশয় থেকে মল দেহের বাইরে নির্গত হয়।

পৌষ্টিকগ্রন্থি কাকে বলে? মানবদেহের পৌষ্টিকগ্রন্থিগুলির নাম, অবস্থান ও কাজ সারণি আকারে লেখো।
পৌষ্টিকগ্রন্থি (Digestive Gland) – পৌষ্টিকনালির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে-সমস্ত নালিযুক্ত গ্রন্থির ক্ষরণ পদার্থ খাদ্য পরিপাকে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তাদের পৌষ্টিকগ্রন্থি বা পরিপাকগ্রন্থি বলে।
মানবদেহের বিভিন্ন পৌষ্টিকগ্রন্থি, তাদের অবস্থান ও কাজ –
| পৌষ্টিকগ্রন্থির নাম | অবস্থান | কাজ |
| লালাগ্রন্থি | মুখগহ্বর | সিদ্ধ শ্বেতসারকে টায়ালিন গ্লুকোজে পরিণত করে। |
| পাকগ্রন্থি | পাকস্থলীর মিউকাস স্তর | 1. পেপসিন প্রোটিন জাতীয় খাদ্যকে পেপটোনে পরিণত করে। 2. অল্প পরিমাণ ফ্যাট লাইপেজের ক্রিয়ায় ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারল-এ পরিণত হয়। |
| যকৃৎ | মধ্যচ্ছদার ঠিক নীচে ঊর্ধ্ব উদর গহ্বর | পিত্তরস লাইপেজের সক্রিয়করণে ও ফ্যাট পরিপাকে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। |
| আন্ত্রিকগ্রন্থি | ক্ষুদ্রান্ত্র | ক্ষরিত উৎসেচক কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাট জাতীয় খাদ্যের সম্পূর্ণ জারণে সাহায্য করে। |
| অগ্ন্যাশয় | পাকস্থলীর নীচে এবং ডিওডিনামের দুটি বাহুর মধ্যবর্তী অঞ্চল | নিঃসৃত উৎসেচক কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাটের সম্পূর্ণ পরিপাকে সাহায্য করে। |
মানবদেহে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্যের পরিপাক কীভাবে হয় আলোচনা করো।
শর্করা জাতীয় খাদ্যের পরিপাক কেবলমাত্র মুখবিবরে এবং ক্ষুদ্রান্ত্রে ঘটে এবং সরল উপাদান গ্লুকোজে পরিণত হয়।
1. মুখবিবরে পরিপাক – খাদ্যগ্রহণ করার পর শর্করা জাতীয় খাদ্য অর্থাৎ, সিদ্ধ শ্বেতসার মুখবিবরে লালারসের টায়ালিন এবং মলটেজ উৎসেচকের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সরলরূপে পরিণত হয়।
প্রথম অবস্থায় টায়ালিন সিদ্ধ শ্বেতসারকে মলটোজে পরিণত করে। পরে মলটোজ মলটেজের প্রভাবে গ্লুকোজে পরিণত হয়। এই জন্য খাদ্য মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাত অথবা রুটির কোনো স্বাদ পাওয়া যায় না, পরে গ্লুকোজ সৃষ্টি হলে মিষ্টি স্বাদ পাওয়া যায়।
2. পাকস্থলীতে পরিপাক – পাকস্থলীতে কার্বোহাইড্রেট পরিপাকের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো উৎসেচক না থাকায়, শর্করা জাতীয় খাদ্যের পরিপাক এখানে সম্পন্ন হয় না।
3. ক্ষুদ্রান্ত্রে পরিপাক – মুখবিবরের পরিপাক হওয়ার পর শ্বেতসার জাতীয় খাদ্য পাকস্থলী থেকে ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছায়। এই অংশে অগ্ন্যাশয় রস ও আন্ত্রিকরসের মাধ্যমে শর্করাজাতীয় খাদ্যের পরিপাক সম্পন্ন হয়।
a. অগ্ন্যাশয় রস দ্বারা পরিপাক – সিদ্ধ অথবা অসিদ্ধ শ্বেতসার ক্ষুদ্রান্ত্রে এসে পৌঁছালে অগ্ন্যাশয় রস অ্যামাইলেজের সঙ্গে মিশে পরিণত হয় মলটোজে।
b. আন্ত্রিক রসের দ্বারা পরিপাক – আন্ত্রিক রসের মলটেজের সহযোগিতায় মলটোজ ভেঙে গিয়ে 2 অণু গ্লুকোজে পরিণত হয়। এ ছাড়া আন্ত্রিক রসের সুক্রেজ দ্বারা সুক্রোজ, ল্যাকটেজ দ্বারা ল্যাকটোজ সরলরূপে পরিণত হয়।
মানবদেহে প্রোটিন জাতীয় খাদ্য কীভাবে পাচিত হয়?
প্রোটিন জাতীয় খাদ্যবস্তুর পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রে পরিপাক ঘটে এবং সরল উপাদান অ্যামিনো অ্যাসিডে পরিণত হয়।
1. মুখবিবরে পরিপাক – মুখবিবরে প্রোটিনজাতীয় খাদ্যের কোনো উৎসেচক না থাকায় খাদ্যগ্রহণের ফলে প্রোটিনজাতীয় খাদ্যের কোনো পরিপাক হয় না। তাই মুখবিবরে প্রোটিনজাতীয় খাদ্য চর্বিত হয়ে পাকস্থলীতে আসে।
2. পাকস্থলীতে পরিপাক – প্রোটিনজাতীয় খাদ্যবস্তু পাকস্থলীতে পৌঁছানোর পর চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। পাকস্থলীর জারক রসে উপস্থিত প্রধান প্রোটিন পরিপাককারী উৎসেচকটি হল পেপসিন। পাকস্থলীর প্রাচীরে অবস্থিত প্যারাইটাল কোশ থেকে নিঃসৃত HCI -এর সংস্পর্শে এসে নিষ্ক্রিয় পেপসিনোজেন সক্রিয় পেপসিন গঠন করে। খাদ্যস্থ প্রোটিনকে পেপসিন পেপটোনে রূপান্তরিত করে।
শিশুদের ক্ষেত্রে পাকস্থলীর জারক রসে অবস্থিত রেনিন উৎসেচক দুধের কেসিনোজেন প্রোটিনকে ছানায় রূপান্তরিত করে।
3. ক্ষুদ্রান্ত্রে পরিপাক – ক্ষুদ্রান্ত্রের গ্রহণী অংশে পাকস্থলী থেকে আসা আংশিক পাচিত খাদ্যবস্তু (কাইম), যকৃৎ থেকে আসা পিত্ত, অগ্ন্যাশয় থেকে আসা অগ্ন্যাশয় রস এবং ক্ষুদ্রান্ত্রের অন্তঃপ্রাচীর থেকে নির্গত আন্ত্রিক রসের সঙ্গে মিশ্রিত হয়।
a. অগ্ন্যাশয় রস দ্বারা পরিপাক – অগ্ন্যাশয় রসে ট্রিপসিন ও কাইমোট্রিপসিন থাকে, যা পেপটোন ও অপাচিত প্রোটিনকে নিম্ন পেপটাইডে পরিণত করে।
b. আন্ত্রিক রস দ্বারা পরিপাক – আন্ত্রিক রসের ইরেপসিন নিম্ন পেপটাইডকে শোষণ উপযোগী অ্যামিনো অ্যাসিডে পরিণত করে।
মানবদেহে স্নেহজাতীয় পদার্থের পরিপাক পদ্ধতি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
স্নেহজাতীয় পদার্থ অর্থাৎ ফ্যাট জাতীয় খাদ্যের পরিপাক হয় পাকস্থলীতে এবং ক্ষুদ্রান্ত্রে এবং সরল, শোষণ উপযোগী ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারলে পরিণত হয়।
- মুখবিবরে পরিপাক – মুখবিবরে স্নেহজাতীয় পদার্থ পরিপাককারী কোনো উৎসেচক না থাকায় ফ্যাটজাতীয় খাদ্যের পরিপাক ঘটে না।
- পাকস্থলীতে পরিপাক – ডিমের কুসুম, মাখন ইত্যাদি ফ্যাটজাতীয় খাদ্যবস্তুর মুখবিবরে চর্বণ সম্পূর্ণ হলে পাকস্থলীতে এসে পৌঁছায়। পাকস্থলীর পাচকরসে উপস্থিত ক্রিয়াক্ষম লাইপেজের সহযোগিতায় ফ্যাট জাতীয় খাদ্য পাচিত হয়ে ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারলে পরিণত হয়।
3. ক্ষুদ্রান্ত্রে পরিপাক – অর্ধপাচিত খাদ্য উপাদান ক্ষুদ্রান্ত্রে এসে পৌঁছালে, সেখানে উপস্থিত অগ্ন্যাশয় রসের সঙ্গে খাদ্যাংশ মিশে যায়। এখানে অগ্ন্যাশয় ও আন্ত্রিক রস থেকে নিঃসৃত লাইপেজ উৎসেচক ফ্যাটের অবদ্রবের ওপর ক্রিয়া করে ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারল উৎপন্ন করে।
উৎসেচক কী? উৎসেচকের বৈশিষ্ট্য লেখো।
উৎসেচক (Enzyme; en = in, zyme = yeast) – প্রধানত প্রোটিনধর্মী, কোলয়েড জাতীয় যে জৈব অনুঘটক জীবকোশে উৎপন্ন হয়ে কোশের ভিতরে বা বাইরে বিভিন্ন জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং বিক্রিয়া শেষে নিজে অপরিবর্তিত থাকে, তাকে উৎসেচক বা এনজাইম বলে।
উৎসেচকের বৈশিষ্ট্য –
- সমস্ত উৎসেচক গ্লোবিউলার প্রোটিন জাতীয় জৈববস্তু।
- প্রতিটি উৎসেচক নির্দিষ্ট সাবস্ট্রেট বা বিক্রিয়ক বা যৌগের ওপর কাজ করে। যেমন – প্রোটিওলাইটিক উৎসেচক (পেপসিন, ট্রিপসিন প্রভৃতি) কেবলমাত্র প্রোটিনের ওপর ক্রিয়া করে, কিন্তু কার্বোহাইড্রেট বা ফ্যাটের ওপর ক্রিয়া করে না।
- প্রতিটি উৎসেচকের সক্রিয়তা যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সর্বাধিক হয়, তাকে অনুকূল তাপমাত্রা (Optimum temperature) বলে।
- যে নির্দিষ্ট pH সীমার মধ্যে উৎসেচক সর্বাধিক ক্রিয়াশীলতা দেখায় তাকে অনুকূল pH বলে।
- উৎসেচক সাবস্ট্রেট বিশ্লেষণের মাধ্যমে যে-সমস্ত বিক্রিয়ালব্ধ পদার্থ উৎপন্ন হতে সাহায্য করে, সেই সমস্ত পদার্থগুলি পুনরায় ওই একই উৎসেচকের সাহায্যে সাবস্ট্রেট পুনরুৎপাদন ঘটায়। যেমন –
উৎসেচক একপ্রকার জৈব অনুঘটক। যে-কোনো জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি ত্বরান্বিত করলেও উৎসেচক নিজে বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে না এবং বিক্রিয়া শেষে গঠনগত ও কার্যগতভাবে অপরিবর্তিত থাকে।
পরিপাককারী বা পাচক উৎসেচক কাকে বলে? এই ধরনের উৎসেচকের রাসায়নিক প্রকৃতি কীরূপ হয়? পাচক উৎসেচকের প্রকারভেদগুলি আলোচনা করো।
পরিপাককারী বা পাচক উৎসেচক – যে-সমস্ত উৎসেচক খাদ্যবস্তুর পাচনক্রিয়ায় অর্থাৎ, পরিপাক ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে এবং জটিল খাদ্যবস্তুকে সরল, শোষণোপযোগী খাদ্য উপাদানে পরিণত করে, তাদের পরিপাককারী বা পাচক উৎসেচক বলে। যেমন – টায়ালিন, পেপসিন, লাইপেজ প্রভৃতি।
পরিপাককারী উৎসেচকগুলি হল – হাইড্রোলেজ প্রকৃতির।
পাচক উৎসেচকের প্রকারভেদ –
পাচক বা পরিপাককারী উৎসেচক তিন প্রকার। যথা –
- অ্যামাইলোলাইটিক উৎসেচক – যে-সমস্ত উৎসেচক জটিল কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্যের পরিপাকে সাহায্য করে, তাদের অ্যামাইলোলাইটিক উৎসেচক বলে। যেমন – টায়ালিন, অ্যামাইলেজ, সুক্রেজ, মলটেজ প্রভৃতি।
- প্রোটিওলাইটিক উৎসেচক – যে-সমস্ত উৎসেচক প্রোটিনজাতীয় খাদ্যের পরিপাকে সাহায্য করে, তাদের প্রোটিওলাইটিক উৎসেচক বলে। যেমন – পেপসিন, ট্রিপসিন, ইরেপসিন প্রভৃতি।
- লাইপোলাইটিক উৎসেচক – যে-সমস্ত উৎসেচক ফ্যাটজাতীয় খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে, তাদের লাইপোলাইটিক উৎসেচক বলে। যেমন – লাইপেজ।
বিভিন্ন প্রকার পাচক উৎসেচকের নাম, উৎস, কোন প্রকার খাদ্যের ওপর ক্রিয়া করে এবং পরিপাকলব্ধ পদার্থের নাম ছকের সাহায্যে উল্লেখ করো।
| উৎসেচক গোষ্ঠী | উৎসেচকের নাম | উৎসেচকের উৎস | কোন্ ধরনের খাদ্যের ওপর ক্রিয়া করে | পরিপাকলব্ধ পদার্থের নাম |
| অ্যামাইলোলাইটিক উৎসেচক (কার্বোহাইড্রেট পরিপাককারী উৎসেচক) | i. টায়ালিন ii. অ্যামাইলেজ iii. সুক্রেজ iv. ল্যাকটেজ v. মলটেজ | i. লালাগ্রন্থি ii. অগ্ন্যাশয় ও আন্ত্রিকগ্রন্থি iii. আন্ত্রিকগ্রন্থি iv. আন্ত্রিকগ্রন্থি v. লালাগ্রন্থি, অগ্ন্যাশয় ও আন্ত্রিকগ্রন্থি | i. সিদ্ধ শ্বেতসার ii. শ্বেতসার iii. সুক্রোজ iv. ল্যাকটোজ v. মলটোজ | i. মলটোজ ii. মলটোজ iii. গ্লুকোজ ও ফ্রুকটোজ iv. গ্লুকোজ ও গ্যালাকটোজ v. গ্লুকোজ |
| প্রোটিওলাইটিক উৎসেচক (প্রোটিন পরিপাককারী উৎসেচক) | i. পেপসিন ii. ট্রিপসিন iii. ইরেপসিন iv. রেননিন | i. পাকগ্রন্থি ii. অগ্ন্যাশয় iii. আন্ত্রিকগ্রন্থি iv. পাকগ্রন্থি | i. প্রোটিন ii. পেপটোন iii. পেপটাইড iv. কেসিনোজেন | i. পেপটোন ii. পেপটাইড iii. অ্যামিনো অ্যাসিড iv. কেসিন |
| লাইপোলাইটিক উৎসেচক (ফ্যাট পরিপাককারী উৎসেচক) | লাইপেজ | পাকগ্রন্থি, অগ্ন্যাশয় ও আন্ত্রিকগ্রন্থি | ফ্যাট বা ট্রাইগ্লিসারাইড | ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারল |
শোষণ কাকে বলে? শোষণের স্থানগুলি উল্লেখ করো।
শোষণ (Absorption) – যে প্রক্রিয়ায় সরল দ্রবণীয় খাদ্য উপাদান পৌষ্টিকনালির ক্ষুদ্রান্ত্রের মাধ্যমে সংবহনতন্ত্রে প্রবেশ করে, তাকে শোষণ বলে।
শোষণ স্থান – পৌষ্টিকনালির অন্তর্গত পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র এবং বৃহদন্ত্র শোষণ অঙ্গরূপে কাজ করে। শোষণে ক্ষুদ্রান্ত্রই হল প্রধান অঙ্গ। পাকস্থলী ও বৃহদন্ত্র শোষণে অল্প ভূমিকা গ্রহণ করে।
- পাকস্থলী – পাকস্থলী খুব অল্প পরিমাণে গ্লুকোজ, জল, ভিটামিন, স্যালাইন, অ্যালকোহল এবং কয়েকপ্রকার ভেষজ পদার্থ শোষণ করে। তবে, পাকস্থলীতে ভিলাই না থাকায় পাচিত খাদ্যের শোষণ খুবই অল্প হয়।
- ক্ষুদ্রান্ত্র – ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশ ডিওডিনাম প্রধানত ক্ষরণে ও পরিপাকে অংশগ্রহণ করলেও মধ্য ক্ষুদ্রান্ত্র বা জেজুনাম এবং নিম্ন ক্ষুদ্রান্ত্র বা ইলিয়াম প্রধান, শোষণস্থলরূপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জেজুনাম ও ইলিয়ামের প্রাচীরে প্রায় 50 লক্ষ ভিলাই বর্তমান। এরা শোষণতল বৃদ্ধি করে। এই স্থানে সমস্ত খাদ্যের পরিপাকজাত সরল দ্রবণীয় পদার্থ, জল, ভিটামিন, খনিজ লবণ প্রভৃতি শোষিত হয়। এর মধ্যে শর্করা ও প্রোটিনের সরল অংশ ভিলাই -এর মাধ্যমে শোষিত হয়ে পোর্টাল সংবহনতন্ত্রে প্রবেশ করে এবং ফ্যাটের সরল অংশ ল্যাকটিয়ালের মাধ্যমে শোষিত হয়ে লসিকাতন্ত্রে প্রবেশ করে।
- বৃহদন্ত্র – এই স্থানে খুব অল্প পরিমাণ জল, গ্লুকোজ, স্যালাইন এবং কয়েক প্রকার ভেষজ পদার্থ শোষিত হয়।

বিপাক কাকে বলে? বিপাক কয় প্রকার ও কী কী? প্রতি প্রকার বিপাকের সংজ্ঞা ও উদাহরণ দাও।
বিপাক (Metabolism) – জীবের প্রাণধারণ ও স্বাভাবিক কাজকর্ম পরিচালনার জন্য প্রতিটি সজীব কোশের প্রোটোপ্লাজমে সবসময় নির্দিষ্ট উৎসেচকের উপস্থিতিতে যে-সমস্ত গঠনমূলক ও ভাঙনমূলক জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত হয়, তাদের মিলিতভাবে বিপাক বা মেটাবলিজম বলে।
বিপাকের প্রকারভেদ –
বিপাক দুই প্রকার। যথা –
- উপচিতি বিপাক ও
- অপচিতি বিপাক।
উপচিতি বিপাক (Anabolism) – প্রতিটি সজীব কোশে যে গঠনমূলক জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শক্তির আবদ্ধকরণ, সরল যৌগ থেকে জটিল জৈব যৌগের সংশ্লেষ ঘটে এবং প্রোটোপ্লাজমের শুষ্ক ওজন বৃদ্ধি পায়, তাকে উপচিতি বিপাক বা অ্যানাবলিজম বলে। উদাহরণ – সালোকসংশ্লেষ, পুষ্টি প্রভৃতি।
অপচিতি বিপাক (Catabolism) – প্রতিটি সজীব কোশে যে ভাঙনমূলক জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শক্তির মুক্তি ঘটে, জটিল যৌগ বিশ্লিষ্ট হয়ে সরল যৌগ উৎপন্ন হয় এবং প্রোটোপ্লাজমের শুষ্ক ওজন হ্রাস পায়, তাকে অপচিতি বিপাক বা ক্যাটাবলিজম বলে। উদাহরণ – শ্বসন, রেচন প্রভৃতি।
সুষম খাদ্য কাকে বলে? সুষম খাদ্যের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।
সুষম খাদ্য (Balanced Diet) – যে-সকল খাদ্যে বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য উপাদানগুলি (কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ লবণ, খাদ্যতত্ত্ব) যথোপযুক্ত পরিমাণে এবং যথার্থ অনুপাতে উপস্থিত থাকে, তাকে সুষম খাদ্য বা ব্যালেন্সড ডায়েট বলে।
সুষম খাদ্যের বৈশিষ্ট্য-
- সুষম খাদ্যে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, খনিজ লবণ, ভিটামিন ও জল উপযুক্ত অনুপাতে উপস্থিত থাকে এবং এই সমস্ত খাদ্য উপাদান দেহের গঠনমূলক ক্রিয়াকলাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
- সুষম খাদ্য দেহের বিভিন্ন কলাকোশের বৃদ্ধি ও শারীরবৃত্তীয় কার্যকে নিয়ন্ত্রণ করে।
- সুষম খাদ্য দেহে তাপশক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে।
- সুষম খাদ্য ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
মৌল বিপাক হার কাকে বলে? মৌল বিপাক হার নিয়ন্ত্রণকারী শর্তগুলি আলোচনা করো।
মৌল বিপাক হার (Basal Metabolic Rate বা BMR) – একজন সুস্থ ব্যক্তির স্বাভাবিক খাদ্যগ্রহণের 12-18 ঘণ্টা পর সম্পূর্ণ শারীরিক ও মানসিক বিশ্রামরত অবস্থায় নাতিশীতোয় পরিবেশে দেহের প্রয়োজনীয় শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া সম্পাদনের জন্য প্রতি বর্গমিটার দেহতলে, প্রতি ঘণ্টায় যে ন্যূনতম তাপশক্তি নির্গত হয়, তাকে মৌল বিপাক হার বা BMR বলে।
মৌল বিপাক হার নিয়ন্ত্রণকারী শর্তসমূহ –
- বয়স – প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির তুলনায় শিশুদের BMR বেশি হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে BMR হ্রাস পায়।
- দেহতলের ক্ষেত্রফল – দেহতলের ক্ষেত্রফলের সঙ্গে BMR সমানুপাতিক। এই কারণে বেঁটে ও মোটা মানুষের তুলনায় লম্বা ও রোগা লোকের BMR বেশি হয়।
- লিঙ্গভেদ – সমবয়সি মহিলার চেয়ে পুরুষের BMR বেশি হয়।
- দৈহিক তাপমাত্রা – দেহের তাপমাত্রা বাড়লে BMR বৃদ্ধি পায়। এই কারণে জ্বর হলে প্রতি ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে BMR -এর মান 7% বৃদ্ধি পায়।
- ব্যায়াম – নিয়মিত শরীরচর্চা বা কায়িক পরিশ্রমের ফলে BMR বৃদ্ধি পায়। আবহাওয়া: আবহাওয়া উষ্ণ হলে BMR বৃদ্ধি পায়। এই কারণে শীতপ্রধান দেশের মানুষদের BMR গ্রীষ্মপ্রধান দেশের মানুষদের তুলনায় কম হয়।
মানবদেহের বিপাকীয় সমস্যা বলতে কী বোঝো? মানবদেহে বিপাকীয় সমস্যাগুলো ব্যাখ্যা করো।
বিপাকীয় সমস্যা – মানবদেহে খাদ্যগ্রহণের পর উপযুক্ত উৎসেচকের অভাবে স্বাভাবিক বিপাক পদ্ধতিতে ব্যাঘাত ঘটলে দেহে যে সমস্যা বা অসুবিধা তৈরি হওয়ার জন্য পুষ্টি ও ক্যালোরির চাহিদা পূরণ হয় না এবং স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়, তাদের বিপাকীয় সমস্যা বলে।
মানবদেহের কিছু বিপাকীয় সমস্যা –
আর্থ্রাটিস (Arthritis) –
দেহের বিভিন্ন অস্থিসন্ধি ফুলে গেলে বা অস্থিসন্ধিতে প্রদাহ সৃষ্টি হওয়ার ফলে, যে যন্ত্রণাদায়ক অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকে আর্থ্রাটিস বলে।
কারণ –
- অস্থিসন্ধিতে অবস্থিত তরুণাস্থি ক্ষয়প্রাপ্ত হলে,
- ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে দেহে উৎপন্ন অ্যান্টিবডি বিভিন্ন অস্থিসন্ধিকে আক্রমণ করলে,
- বিপাকজনিত অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি হলে,
- রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে।
লক্ষণ – অস্থিসংলগ্ন স্থানে প্রচণ্ড ব্যাথা অনুভূত হয়, অস্থিসন্ধি ফুলে যায়। চলাফেরায় অসুবিধা হয়।
উচ্চরচাপ (Hypertension) –
রক্তবাহের মধ্য দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার সময় রক্তবাহের প্রাচীরে চাপ সৃষ্টি করে যার স্বাভাবিক মান 120/80 mm Hg। কিন্তু, স্থূলতা বা লিপিডের বিপাকজনিত সমস্যা বা অত্যধিক পরিমাণে লবণ গ্রহণ করলে রক্তবাহের মধ্যে রক্তচাপের মান 140/90 mm Hg বা তার বেশি বৃদ্ধি পায়। রক্তবাহের মধ্যে এই অস্বাভাবিক অবস্থাকে উচ্চরক্তচাপ বলে।
লক্ষণ – উচ্চরক্তচাপের ফলে মানবদেহে প্রধানত হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক, বৃক্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (Atherosclerosis) –
বিপাকজনিত সমস্যার ফলে রক্তবাহের অন্তঃপ্রাচীরে ফ্যাট (যথা কোলেস্টেরল), ক্যালশিয়াম, শ্বেত রক্তকণিকা সঞ্চয়ের ফলে রক্তবাহের প্রাচীর স্থূল হয়ে যাওয়া এবং রক্তবাহের গহ্বরের ব্যাস হ্রাস পাওয়ার ঘটনাকে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস বলে।
লক্ষণ – রক্তবাহের মধ্য দিয়ে রক্তসংবহন বাধা পায়। ফলে হৃৎপিন্ডেও রক্ত সরবরাহ বিঘ্নিত হয় এবং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের সম্ভাবনা দেখা যায়।
লিভার সিরোসিস (Cirrhosis of Liver) –
অত্যধিক মাক্ষ্ম ত্রায় মদ্যপান করলে পাচনতন্ত্রজনিত বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে প্রধান হল লিভার সিরোসিস। অত্যধিক মদ্যপানের ফলে যকৃতের অন্তর্গাত্রে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, যকৃতের কোশগুলিতে কাঠিন্যতা দেখা যায় এবং সেগুলি তত্ত্বময় কলায় পরিণত হয়। এর ফলে, যকৃতের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায় এবং যকৃৎ শুকিয়ে যায়। এই পরিস্থিতিকে লিভার সিরোসিস বলে।
লক্ষণ – দেহে অস্বস্তির সৃষ্টি হয়, বমি হয়, জন্ডিস দেখা দেয়, অসহ্য পেটে যন্ত্রনা হয়। এমনকি ক্যানসারও হতে পারে।
ডায়াবেটিস মেলিটাস বা মধুমেহ (Diabetes mellitus) –
রক্তে ইনসুলিনের পরিমাণ কমে গেলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং মুত্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত পরিমাণ শর্করা বা গ্লুকোজ নির্গত হয়। দেহের এই অস্বাভাবিক অবস্থাকে ডায়াবেটিস মেলিটাস বা মধুমেহ বলে।
লক্ষণ – এই রোগে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়। দেহের ওজন হ্রাস পায়, ঘনঘন পিপাসা পায় এবং শর্করাযুক্ত মূত্র ত্যাগ হয়।
গয়টার বা গলগণ্ড (Goiter) –
থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন -এর অধিক ক্ষরণের প্রভাবে অথবা দেহে আয়োডিনের অভাবজনিত কারণে থাইরয়েড গ্রন্থির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে ও গলা স্ফীত আকার ধারণ করে। এই অবস্থাকে গয়টার বা গলগণ্ড বলে।
লক্ষণ – গলা অস্বাভাবিক ফুলে যায়, চোখের অক্ষিগোলকের স্ফিতি ঘটে এবং চোখ অক্ষিকোটর থেকে বেরিয়ে আসে।
স্থূলতা বা ওবেসিটি (Obesity) –
অতিরিক্ত পরিমাণ খাদ্য বা শক্তি (ক্যালোরি) গ্রহণের ফলে, বাড়তি ক্যালোরি দেহের অ্যাডিপোজ কলায় ফ্যাট বা চর্বিরূপে সঞ্চিত হয়। ফলে দেহের ওজন বেড়ে যায় এবং দেহ অত্যাধিক মোটা হয়ে যায়। একেই স্থূলতা বা ওবেসিটি বলে। স্বাভাবিক দেহ ওজনের থেকে 20% বেশি ওজন হলে স্থূলতা ঘটে থাকে।
লক্ষণ – নানা প্রকার শারীরবৃত্তীয় ও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। গেঁটে বাত, হৃদরোগ, পিওপাথুরি, উচ্চ রক্তচাপজনিত বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়।

হোলোফাইটিক পুষ্টি (Holophytic Nutrition) সম্পর্কে টীকা লেখো।
সংজ্ঞা – যে পুষ্টি পদ্ধতিতে স্বভোজী উদ্ভিদ পরিবেশ থেকে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় তরল, গ্যাসীয়, সরল, অজৈব খাদ্য উপাদান সংগ্রহের মাধ্যমে সরল জৈব খাদ্য সংশ্লেষ করে এবং পুষ্টি লাভ করে, তাকে হোলোফাইটিক পুষ্টি বলে। হোলোফাইটিক পুষ্টি সম্পন্নকারী উদ্ভিদকে হোলোফাইট (Holophyte) বলা হয়।
হোলোফাইটিক পুষ্টির পর্যায় –
দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। যথা –
- সংশ্লেষ ও
- আত্তীকরণ।
- সংশ্লেষ – হোলোফাইটিক পুষ্টির প্রথম পর্যায়। এই পর্যায়ে উদ্ভিদ পরিবেশ থেকে অজৈব খাদ্য উপাদান সংগ্রহ করে সূর্যালোকের উপস্থিতিতে ক্লোরোফিলের সাহায্যে নিজ দেহকোশে জৈব খাদ্য সংশ্লেষ করে।
- আত্তীকরণ – এটি হোলোফাইটিক পুষ্টির দ্বিতীয় পর্যায়। এই পর্যায়ে সংশ্লেষিত সরল খাদ্যকে উদ্ভিদ প্রোটোপ্লাজমে অঙ্গীভূত করে এবং বিভিন্ন বিপাকীয় কাজে ব্যবহার করে। এর দ্বারা প্রোটোপ্লাজমের শুষ্ক ওজন বৃদ্ধি পায় ও সামগ্রিকভাবে দেহের বৃদ্ধি ঘটে।
হোলোফাইটিক পুষ্টির গুরুত্ব – হোলোফাইটিক পুষ্টির মাধ্যমে উদ্ভিদদেহে বিভিন্ন প্রকার খাদ্য সংশ্লেষিত হয়। যেমন – কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন প্রভৃতি। এই সমস্ত খাদ্য উপাদান উদ্ভিদদেহে সঞ্চিত থাকে এবং পৃথিবীতে সমস্ত পরভোজী জীবের খাদ্য ও শক্তির উৎসরূপে কাজ করে।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর অন্তর্গত ‘পুষ্টি’ অংশের রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন