জলবায়ুর পরিবর্তন কীভাবে লোহাচড়া, ঘোড়ামারা বা নিউমুর দ্বীপকে প্রভাবিত করছে?

জলবায়ুর পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী একটি বড় হুমকি। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তীব্র আবহাওয়ার ঘটনা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিসহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত লোহাচড়া, ঘোড়ামারা এবং নিউমুর দ্বীপগুলি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এই দ্বীপগুলি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার কাছাকাছি অবস্থিত এবং তীব্র আবহাওয়ার ঘটনার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।

জলবায়ু হচ্ছে কোনো এলাকা বা ভৌগোলিক অঞ্চলের ৩০-৩৫ বছরের গড় আবহাওয়া। বর্তমান বিশ্বে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন একটি নৈমিত্তিক ঘটনা। এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বৈশিক উষ্ণতা নামে অধিক পরিচিত। বৈজ্ঞানিক ভাষায় একে গ্রিন হাউস প্রভাব বলা হয়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নানা প্রকারের দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে যেমন – অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি। যার ফলশ্রুতিতে জ্ঞান ও মালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এর কারণে প্রতি বছর নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ।

যেভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে, তাতে আগামী দিনে পৃথিবী গভীর সংকটে পড়তে চলেছে। ইতিমধ্যেই সুন্দরবনের লোহাচড়া, ঘোড়ামারা বা নিউমুর দ্বীপগুলি সমুদ্রের তলায় তলিয়ে গেছে বা ভ্যানিশিং আইল্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ক্রম উন্নায়নকেই দায়ী করেছেন। পৃথিবীর উন্নতা ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় গত শতক থেকেই মেরুপ্রদেশের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং বরফের অতিরিক্ত গলন সমুদ্রের জলের পরিমাণকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে সমুদ্রের জলতলের উত্থান ঘটেছে। ফলে সমুদ্রের মধ্যে দ্বীপগুলির অবস্থা শোচনীয়। এমন অনেক দ্বীপ রয়েছে যেখানে সমৃদ্ধ গ্রাম ছিল, জলস্তর বৃদ্ধির জন্য দ্বীপগুলি এখন সমুদ্রে হারিয়ে গেছে, হাজার হাজার মানুষ ক্লাইমেট রিফিউজি হয়ে পড়েছেন।

আরও পড়ুন – নদীর মোহানায় বদ্বীপ সৃষ্টির ভৌগোলিক কারণগুলি লেখো

জলবায়ুর পরিবর্তন কীভাবে লোহাচড়া, ঘোড়ামারা বা নিউমুর দ্বীপকে প্রভাবিত করছে?

নীচে উল্লিখিত দ্বীপগুলির অবস্থা আলোচনা করা হল –

  1. লোহাচড়া দ্বীপ – হুগলি নদীর মোহানায় সুন্দরবন জাতীয় উদ্যানের একটি সাধারণ দ্বীপ ছিল লোহাচড়া দ্বীপ। সেটি এখন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত দ্বীপে পরিণত হয়েছে। 2006 সাল নাগাদ এই দ্বীপটি সম্পূর্ণ জলমগ্ন হয়ে পড়ে। 2009 সালে দ্বীপটি আবার ধীরে ধীরে জেগে উঠতে থাকে। পুনরায় বর্তমানে দ্বীপটি ডুবে গেছে।
  2. দক্ষিণ তালপট্টি বা নিউমুর দ্বীপ – এই ছোটো দ্বীপটি হাড়িয়াভাঙা নদীর মোহানা থেকে 2 কিমি দূরে অবস্থিত। বাংলাদেশ এই দ্বীপের নাম দিয়েছে দক্ষিণ তালপট্টি। ভারতে এর নাম নিউমুর। অবস্থানগত দিক দিয়ে এটি 21°37′00” উত্তর এবং 89°08′30″ পূর্ব অবস্থানে রয়েছে। এটিও গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের বদ্বীপের অংশ। 1970 সালে ভোলা ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপটি পুরোপুরি জলমগ্ন হয়ে যায় এবং এরপর থেকেই দ্বীপটি ধীরে ধীরে ডুবে যেতে থাকে। 1974 সালে আমেরিকার উপগ্রহ চিত্র থেকে জানা যাচ্ছে সে সময় এর আয়তন ছিল 2500 বর্গমিটার। কিন্তু বর্তমানে এটি সম্পূর্ণ জলমগ্ন বা মগ্নচরা হিসেবে অবস্থান করছে।
  3. ঘোড়ামারা দ্বীপ – কলকাতা থেকে মাত্র 150 কিমি দূরে বঙ্গোপসাগরের মধ্যে এটিও একটি ক্রমনিমজ্জমান দ্বীপ। পরীক্ষা থেকে জানা গেছে 1951 সালে এই দ্বীপের আয়তন ছিল 38.23 বর্গকিমি, 2011 সালে এর আয়তন দাঁড়ায় 4.37 বর্গকিমি।

জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা যা আমাদের সমস্তকে প্রভাবিত করছে। লোহাচড়া, ঘোড়ামারা বা নিউমুর দ্বীপের মতো ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জ দেশগুলি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলির জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

এই দ্বীপগুলি উচ্চতায় কম, তাই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি তাদের দ্রুত ভূমি হারাতে বাধ্য করছে। এটি তাদের জনসংখ্যার জন্য বাসস্থান, খাদ্য এবং জলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেছে।

Rate this post


Join WhatsApp Channel For Free Study Meterial Join Now
Join Telegram Channel Free Study Meterial Join Now

মন্তব্য করুন