এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর উপবিভাগ ‘উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা’ -এর অন্তর্গত ‘জল, খনিজ পদার্থ, খাদ্য ও গ্যাসের পরিবহণ’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

ব্যাপন চাপ কী?
ব্যাপনে অংশগ্রহণকারী অণুগুলি বেশি ঘনত্বযুক্ত স্থান থেকে কম ঘনত্বযুক্ত স্থানে নিজস্ব গতিশক্তির প্রভাবে সঞ্চারিত হওয়ার সময় যে চাপ সৃষ্টি করে, তাকে ব্যাপন চাপ বলে।
ব্যাপন চাপের বৃদ্ধি ঘটলে ব্যাপন হারও বৃদ্ধি পায়।
অভিস্রবণ চাপ কাকে বলে?
যে চাপের প্রভাবে কোশে জল প্রবেশ বাধাপ্রাপ্ত হয় অর্থাৎ, অভিস্রবণ বাধাপ্রাপ্ত হয়, তাকে অভিস্রবণ চাপ বলে।
উদ্ভিদের মূলরোম দ্বারা শোষিত জল ও খনিজ লবণ কোন্ পথের মাধ্যমে জাইলেম বাহিকায় পৌঁছায়? পথে কোন্ কোন্ প্রক্রিয়া সাহায্য করে?
অভিস্রবণকে বিশেষ ধরনের ব্যাপন বলা হয় কেন?
ব্যাপন প্রক্রিয়ায় পদার্থের অণুগুলি বেশি ঘনত্বের স্থান থেকে কম ঘনত্বের স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। অভিস্রবণ প্রক্রিয়াতে উচ্চ ঘনত্বযুক্ত দ্রাবক (কম ঘনত্বযুক্ত দ্রবণ) অণু অর্ধভেদ্য পর্দা ভেদ করে কম ঘনত্বযুক্ত দ্রাবকের দিকে (বেশি ঘনত্বযুক্ত দ্রবণ) ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে দ্রাবক অণুর ব্যাপন ঘটে। এ কারণে অভিস্রবণকে বিশেষ ধরনে ব্যাপন বলা হয়।
রসের উৎস্রোত পরিবহণ বলতে কী বোঝো?
যে প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদদেহে মূলরোম দ্বারা শোষিত জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ জাইলেম বাহিকার মাধ্যমে অভিকর্ষের বিপরীতে ঊর্ধ্বমুখে বাহিত হয়ে পাতায় পৌঁছায়, তাকে ঊর্ধ্বমুখী পরিবহণ বা রসের উৎস্রোত (Ascent of Sap) বলা হয়।
উদ্ভিদদেহে নিম্নমুখী পরিবহণ কাকে বলে?
উদ্ভিদদেহে যে পরিবহণের মাধ্যমে পাতায় প্রস্তুত খাদ্য জলে দ্রবীভূত অবস্থায় ফ্লোয়েম কলার সাহায্যে নিম্নমুখে বাহিত হয় এবং সমস্ত সজীব অংশে খাদ্য সরবরাহ করে, তাকে নিম্নমুখী সংবহন বলে।
সক্রিয় শোষণ ও পরিবহণ কাকে বলে?
সক্রিয় শোষণ ও পরিবহণ (Active Absorption and Transportation) – যে পদ্ধতিতে মাটি থেকে জল এবং জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ বিপাকীয় শক্তি (ATP) খরচ করে মূলরোমের কোশে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে ক্রমশ মূল ও কাণ্ডের মধ্যে দিয়ে ঊর্ধ্বমুখে পরিবাহিত হয়, তাকে সক্রিয় শোষণ ও পরিবহণ বলে।
উদ্ভিদ পরিবহণে সক্রিয় পরিবহণের গুরুত্ব কী?
এই প্রক্রিয়ার ফলে নিম্নলিখিত ক্রিয়াগুলি সম্পাদিত হয় –
- সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় পাতায় উৎপন্ন শর্করাজাতীয় খাদ্য ফ্লোয়েম কলার মাধ্যমে পরিবাহিত হয়।
- মূলরোম কর্তৃক গৃহীত খনিজ লবণের বিশোষণ ও পরিবহণ ঘটে।
- উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় উপকরণ যথা – খাদ্য, জল, খনিজ লবণ, পুষ্টিদ্রব্য প্রভৃতির কোশান্তর পরিবহণ ঘটে।
উদ্ভিদদেহে সক্রিয় পরিবহণের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করো।
নাইট্রেট, পটাশিয়াম, সালফেট, জিংক প্রভৃতি আয়ন সক্রিয় পরিবহণের মাধ্যমে পরিবেশ থেকে কোশের মধ্যে প্রবেশ করে।
ব্যাখ্যা –
- নাইট্রেট, পটাশিয়াম, সালফেট ও জিংক প্রভৃতি আয়নগুলি মূলরোম কোশের কোশপর্দা সহজে ভেদ করতে পারে না, কারণ মাটিতে এদের ঘনত্বের তুলনায় কোশরসে এদের ঘনত্ব বেশি থাকে।
- এর ফলে এই সমস্ত আয়নগুলিকে কোশের মধ্যে ঘনত্ব নতিমাত্রার বিপক্ষে গ্রহণ করার জন্য কোশকে শক্তি ব্যয় করতে হয়।
- সজীব কোশপর্দায় কোশের ATP বিশ্লিষ্ট হয়ে এই শক্তির জোগান দেয়।
- সুতরাং, কোশ শক্তি ব্যয় করে এই সমস্ত প্রয়োজনীয় আয়নগুলি কোশ ঘনত্ব নতিমাত্রার বিপক্ষে কোশের মধ্যে গ্রহণ করে।
- কোশপর্দায় এই সমস্ত আয়ন পরিবহণের জন্য বিভিন্ন প্রকার প্রোটিন বাহক উপস্থিত থাকে। প্রোটিন বাহকগুলি আয়নগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের কোশপর্দা অতিক্রম করে কোশের সাইটোপ্লাজমে পৌঁছে দেয়।
‘সক্রিয় পরিবহণে শক্তির প্রয়োজন হয়’ – কীভাবে প্রমাণ করবে?
সক্রিয় পরিবহণে শক্তির প্রয়োজন হয় এর প্রমাণ হল –
- অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হলে সক্রিয় পরিবহণ পদ্ধতি বন্ধ হয়ে যায়, কারণ O₂ -র অভাবে কোশীয় শ্বসনে ATP উৎপাদন বন্ধ হয়।
- প্রয়োজনের তুলনায় কম তাপমাত্রায় সক্রিয় পরিবহণের হার কমে যায়, কারণ নিম্ন তাপমাত্রায় কোশীয় শ্বসনের হার কমে ও ATP উৎপাদন হ্রাস পায়।
নিষ্ক্রিয় শোষণ ও পরিবহণ বলতে কী বোঝো?
নিষ্ক্রিয় শোষণ ও পরিবহণ (Passive Absorption and Transportation) – যে পদ্ধতিতে জল, জলে দ্রবীভূত খনিজ আয়ন বিপাকীয় শক্তি খরচ না করে কোশপর্দা ভেদ করে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় পরিবেশের উচ্চ ঘনত্বযুক্ত স্থান থেকে কোশের অভ্যন্তরে নিম্ন ঘনত্বযুক্ত স্থানে প্রবেশ করে, তাকে নিষ্ক্রিয় শোষণ ও পরিবহণ বলে।
ফ্লোয়েম লোডিং কী?
পাতার মেসোফিল কলায় সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় শর্করা জাতীয় খাদ্য সংশ্লেষিত হয়। মেসোফিল কলাকোশ থেকে ফ্লোয়েমের সীভনলে এই শর্করার স্থানান্তরকে ফ্লোয়েম লোডিং বলে, একে ‘কম দূরত্বের পরিবহণ’-ও বলা হয়।
ফ্লোয়েম আনলোডিং কাকে বলে?
উদ্ভিদের মূল, কাণ্ড, ফুল প্রভৃতি অংশে ফ্লোয়েমের সিভনল থেকে শর্করার স্থানান্তরকে ফ্লোয়েম আনলোডিং বলে। একে ‘অধিক দূরত্বের পরিবহণ’ বলা হয়।
ডিক্সন ও জলির মতবাদ কোন্ কোন্ বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভরশীল?
- রসের উৎস্রোত বাষ্পমোচনজনিত টান ও সংসক্তি বলের মাধ্যমে ঘটে।
- রসের উৎস্রোত জৈবিক ও ভৌত উভয় প্রক্রিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
- জলের তীব্র সমসংযোগ বল জলের/রসের উৎস্রোতে সাহায্য করে।
- জাইলেম বাহিকা ও জলের অণুর অসমসংযোগ বল বাহিকাতে নিরবছিন্ন জলস্তম্ভ গঠন করে।
কোশরসের উপাদানগুলি লেখো।
কোশরসের উপাদানগুলি হল –
- খনিজ লবণ,
- দ্রবীভূত রঞ্জক, যেমন – অ্যান্থোসায়ানিন (বেগুনি) অ্যান্থোজ্যান্থিন (হলুদ),
- জৈব অ্যাসিড,
- শর্করা,
- ফ্যাট,
- প্রোটিন,
- O₂ এবং CO₂ গ্যাস।
রসের উৎস্রোতে বাষ্পমোচন টানের ভূমিকা উল্লেখ করো।
বাষ্পমোচনের ফলে পাতার মেসোফিল কলাকোশে যে ব্যাপন চাপের ঘাটতি দেখা যায় তা জাইলেম বাহিকার ওপর একটি শোষণচাপ সৃষ্টি করে, তাকে বাষ্পমোচন টান বলে। এই টান জাইলেম কলার মধ্যে থাকা জলস্তম্ভকে ধীরে ধীরে উপরের দিকে টেনে তোলে ও রসের উৎস্রোত ঘটায়।
রসের উৎস্রোত প্রক্রিয়ায় মূলজ চাপের ভূমিকা কী?
মূলরোমের সাহায্যে জল শোষণের সময় মূলের কর্টেক্স অঞ্চলের কোশগুলিতে যে রসস্ফীতিজনিত চাপ সৃষ্টি হয়, তাকে মূলজ চাপ বলে। এই চাপের প্রভাবে জল এবং জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ মৃত জাইলেম কলার মধ্যে দিয়ে ওপরের দিকে ঠেলে উঠে যায়।
উদ্ভিদ পরিবহণ বলতে কী বোঝো? উদ্ভিদদেহে পরিবহণের প্রধান মাধ্যম কী?
যে পদ্ধতিতে সুনির্দিষ্ট পথে উন্নত উদ্ভিদদেহে জল, জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ, খাদ্যরস, অক্সিজেন, হরমোন প্রভৃতি নির্দিষ্ট অংশে প্রেরিত হয় এবং কোশ থেকে বিপাকজাত পদার্থের অপসারণ ঘটে, তাকে উদ্ভিদ পরিবহণ বলে।
উদ্ভিদদেহে পরিবহণের প্রধান মাধ্যম হল – জল (H₂O)।
উদ্ভিদদেহের সংবহন কলাগুলি কী কী? কলাগুলির উপাদান ছকের মাধ্যমে লেখো।
উদ্ভিদের সংবহনকলাগুলি হল – জাইলেম কলা ও ফ্লোয়েম কলা।

উদ্ভিদদেহে পরিবহণের গুরুত্বগুলি লেখো।
উদ্ভিদদেহে পরিবহণের গুরুত্ব –
- জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ – উদ্ভিদ মূলরোম দ্বারা মাটি থেকে যে জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ বা রস শোষণ করে তা পরিবহণের মাধ্যমে উদ্ভিদের পাতায় পৌঁছায়।
- খাদ্য – পাতায় প্রস্তুত খাদ্য পরিবহণের মাধ্যমে উদ্ভিদদেহের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন প্রকার সঞ্চয়ী খাদ্য সংশ্লেষে অংশগ্রহণ করে।
- অক্সিজেন – শ্বসন কাজে অতি প্রয়োজনীয় অক্সিজেন (O2) গ্যাস পরিবহণ ক্রিয়ার দ্বারা উদ্ভিদদেহের প্রতিটি সজীব কোশে পৌঁছায়।
- বর্জ্যপদার্থের অপসারণ – বিপাক ক্রিয়ায় উৎপন্ন বর্জ্যপদার্থ পরিবহণের মাধ্যমে কোশ থেকে অপসারিত হয়ে উদ্ভিদের নির্দিষ্ট অঙ্গে পৌঁছায় ও সাময়িকভাবে জমা থাকে।
- হরমোন – পরিবহণের মাধ্যমে জলে দ্রবীভূত অবস্থায় হরমোন উৎপত্তিস্থল থেকে ক্রিয়াস্থলে পৌঁছায়।
উদ্ভিদদেহের পরিবহণে জাইলেম ও ফ্লোয়েম কীভাবে সাহায্য করে লেখো।
উদ্ভিদ পরিবহণে জাইলেম কলার ভূমিকা – মূলরোম দ্বারা শোষিত জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ বা রস অভিকর্ষের বিপরীতে ঊর্ধ্বমুখে পাতায় পৌঁছে দেওয়া।
উদ্ভিদ পরিবহণে ফ্লোয়েম কলার ভূমিকা –
- পাতায় উৎপন্ন খাদ্য জলে দ্রবীভূত অবস্থায় উদ্ভিদদেহের সমস্ত অংশে প্রেরণ করা।
- হরমোন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদার্থের পরিবহণে সাহায্য করা।
আত্মভূতি বা ইমবাইবিশন কী? তার গুরুত্ব লেখো।
যে পদ্ধতিতে কৈশিক বলের প্রভাবে কোলয়ডীয় বস্তু জল শোষণ করে, তাকে আত্মভূতি বা ইমবাইবিশন (Imbibition) বলে।
ইমবাইবিশনের গুরুত্ব –
- অঙ্কুরোদ্গমের সময় বীজ ইমবাইবিশনের মাধ্যমে জল শোষণ করে এবং বীজত্বক ফাটিয়ে অঙ্কুরিত হয়।
- মূলরোম দ্বারা শোষিত জলের অনেকটা অংশ ইমবাইবিশনের মাধ্যমে উদ্ভিদের পার্শ্ববর্তী অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
- ইমবাইবিশন চাপের প্রভাবে জল এবং জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ জাইলেম বাহিকার মাধ্যমে ঊর্ধ্বমুখে বাহিত হয়।
নিষ্ক্রিয় জলশোষণ ও সক্রিয় জলশোষণ বলতে কী বোঝো?
নিষ্ক্রিয় জলশোষণ (Passive Water Absorption) – যে জলশোষণ প্রক্রিয়াটিতে মূলরোম মুখ্য ভূমিকা পালন করে না এবং কোনো বিপাকীয় শক্তি খরচ হয় না, তাকে নিষ্ক্রিয় জলশোষণ বলে।
উদ্ভিদদেহে 98% জল শোষিত হয় নিষ্ক্রিয় পদ্ধতিতে। এইরূপ জল শোষণে বাষ্পমোচন টান মুখ্য ভূমিকা পালন করে এবং মূলরোম পরোক্ষভাবে জলশোষণ করে।
সক্রিয় জলশোষণ (Active Water Absorption) – যে জল শোষণ পদ্ধতিতে উদ্ভিদের মূলরোম মুখ্য ভূমিকা পালন করে এবং বিপাকীয় শক্তি খরচ করে জলশোষণ ঘটে, তাকে সক্রিয় জলশোষণ বলে।
এইরূপ জলশোষণ দুটিভাবে ঘটতে পারে। যথা –
- অভিস্রবণীয় পদ্ধতি এবং
- অনঅভিস্রবণীয় পদ্ধতি।
উদ্ভিদের জলশোষণে অন্তঃঅভিস্রবণীয় প্রক্রিয়ার গুরুত্ব লেখো।
উদ্ভিদের জলশোষণে অন্তঃঅভিস্রবণীয় প্রক্রিয়ার গুরুত্ব –
- আত্মভূতি বা ইমবাইবিশন পদ্ধতিতে মূলরোম কোশে জলশোষণ ঘটে। অণুর সমসংযোগ বলের কারণে এই বল কার্যকরী হয়। মূলরোমের কোশপ্রাচীরের সেলুলোজ প্রথমে আত্মভূতির মাধ্যমে লঘু দ্রবণের জলকে শোষণ করে।
- মূলরোমের কোশপ্রাচীরে অবস্থিত সেলুলোজ অণুগুলির মধ্যবর্তী স্থানে থাকা ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে জল মূলরোম কোশে প্রবেশ করে। মূলরোম কোশের বিপাকীয় শক্তির ওপর জলশোষণ নির্ভর করে। তাই বিপাক হার বেড়ে গেলে জল শোষণ -এর হারও বাড়বে।
- অন্তঃঅভিস্রবণীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূলরোমে বিভিন্ন খনিজ লবণ যেমন – সোডিয়াম (Na), পটাশিয়াম (K), ম্যাগনেশিয়াম (Mg) প্রভৃতি শোষিত হয়। এই খনিজগুলি উদ্ভিদের পুষ্টি ও বিপাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
- বিপাকীয় শক্তি ও বাহক অণুকে ব্যবহার করে অতিসারক দ্রবণ থেকে জলের অণু মূলরোম কোশে প্রবেশ করে। দেহের প্রতিটি কোশে গ্লুকোজ, প্রোটিন প্রভৃতি খাদ্য উপাদান এই প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে।
অভিস্রবণের প্রকারভেদগুলি আলোচনা করো।
অভিস্রবণকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। যথা –
- অন্তঃঅভিস্রবণ (Endosmosis) – যে পদ্ধতিতে কোশের কোশপর্দার মধ্যে দিয়ে বাইরের পরিবেশের লঘুসারক (হাইপোটনিক) দ্রবণ থেকে জল কোশের ভিতর অতিসারক (হাইপারটনিক) কোশরসে প্রবেশ করে, তাকে অন্তঃঅভিস্রবণ বলে।
- বহিঃঅভিস্রবণ (Exosmosis) – যে পদ্ধতিতে কোশপর্দার মধ্যে দিয়ে কোশের ভিতরের লঘুসারক (হাইপোটনিক) কোশরস থেকে জল বাইরের পরিবেশে অতিসারক (হাইপারটনিক) দ্রবণে প্রবেশ করে, তাকে বহিঃঅভিস্রবণ বলে।
- কোশান্তর অভিস্রবণ (Cell to Cell Osmosis) – যে পদ্ধতিতে পাশাপাশি অবস্থিত কোশগুলির মধ্যে কোশপর্দার উপস্থিতিতে লঘুসারক কোশরস থেকে জল অতিসারক কোশরসে প্রবেশ করে, তাকে কোশান্তর অভিস্রবণ বলে।
বাষ্পমোচনের সঙ্গে রসের উৎস্রোতের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করো।
বাষ্পমোচনের সঙ্গে রসের উৎস্রোতের সম্পর্ক –
- উদ্ভিদের মূলরোম দ্বারা শোষিত জল জাইলেম বাহিকা দিয়ে ঊর্ধ্বমুখে বাহিত হয়ে পাতায় পৌঁছায়।
- বাষ্পমোচনের মাধ্যমে জল পত্ররন্ধ্র দিয়ে বাষ্পাকারে বেরিয়ে যাওয়ায় জাইলেম বাহিকাস্থিত জল অণুস্তম্ভে একপ্রকার আকর্ষণ বা টানের সৃষ্টি হয়, একে বাষ্পমোচন টান (Transpiration pull) বলে।
- এই বাষ্পমোচন টানের প্রভাবে মূলরোম দ্বারা শোষিত জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ অর্থাৎ, রস (Sap) জাইলেম বাহিকা দিয়ে ঊর্ধ্বমুখে বাহিত হতে থাকে এবং রসের উৎস্রোত ঘটে।
- বাষ্পমোচন ও রসের উৎস্রোতের সম্পর্ককে বলা যায়, বাষ্পমোচন ‘কারণ’ হলে রসের উৎস্রোত হল তার ‘ফলাফল’।
শোষণের সঙ্গে রসের উৎস্রোতের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করো।
শোষণের সঙ্গে রাসর উৎস্রোতের সম্পর্ক –
- উদ্ভিদ মূলরোম দ্বারা মাটি থেকে জল ও জলের দ্রবীভূত খনিজ লবণ বা রস (Sap) শোষণ করে।
- শোষিত রস কোশান্তর অভিস্রবণের মাধ্যমে মূলের কর্টেক্স স্তরের মধ্যে দিয়ে বাহিত হওয়ার সময় মূলজ চাপ সৃষ্টি করে।
- মূলজ চাপের প্রভাবে রস জাইলেম বাহিকায় প্রবেশ করে এবং রসের উৎস্রোত ঘটে।
- পাতায় বাষ্পমোচনের ফলে জাইলেম বাহিকাস্থিত জলস্তম্ভে যে টান পড়ে, তার প্রভাবে রস শোষণ অব্যাহত থাকে।
- সুতরাং, শোষণের সঙ্গে রসের উৎস্রোতের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। কারণ, বাষ্পমোচনের ফলে জলের অপসারণ এবং শোষণের মাধ্যমে রসের অবিরাম সংযোজনের মাধ্যমেই রসের উৎস্রোত ঘটে।
মূলজ চাপ কাকে বলে? উদ্ভিদ পরিবহণে মূলজ চাপের গুরুত্ব লেখো।
মূলজ চাপ (Root Pressure) – উদ্ভিদের মূলরোম দ্বারা শোষিত জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ কোশান্তর অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় মূলের কর্টেক্সের কোশগুলির মধ্যে দিয়ে বাহিত হওয়ার সময় পরিচক্রের কোশগুলির অভ্যন্তরে যে চাপ সৃষ্টি করে, তাকে মূলজ চাপ বলে।
মূলজ চাপের গুরুত্ব –
- বীরুৎ বা গুল্মজাতীয় উদ্ভিদে রস পরিবহণে মূলজ চাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- মূলজ চাপের প্রভাবেই রস (জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ) মৃত জাইলেম বাহিকাতে পৌঁছায় এবং রসের উৎস্রোত ঘটে।
বাষ্পমোচন টান কাকে বলে? উদ্ভিদ পরিবহণে বাষ্পমোচন টানের গুরুত্ব লেখো।
বাষ্পমোচন টান (Transpiration Pull) – সূর্যালোকের উপস্থিতিতে পাতা থেকে বাষ্পমোচনের সময় জাইলেম বাহিকায় জলস্তম্ভে যে ঊর্ধ্বটান সৃষ্টি হয়, তাকে বাষ্পমোচন টান বলে।
বাষ্পমোচন টানের গুরুত্ব –
- বাষ্পমোচন টান রসের উৎস্রোত নিয়ন্ত্রণ করে।
- বাষ্পমোচন টানের প্রভাবে উদ্ভিদ মূলরোমের সাহায্যে নিষ্ক্রিয় পদ্ধতিতে জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ শোষণ করে ফলে, উদ্ভিদদেহে শক্তির অপচয় ঘটে না।
রসের উৎস্রোতে সমসংযোগ ও অসমসংযোগ বলের ভূমিকা লেখো।
রসের উৎস্রোত প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানী ডিক্সন ও জলির মতবাদ সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। রসের উৎস্রোত প্রক্রিয়ায় মাটি থেকে গৃহীত কৈশিক জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ জাইলেম বাহিকার মাধ্যমে পাতায় পৌঁছায়। এই প্রক্রিয়ায় সমসংযোগ ও অসমসংযোগ বলের ভূমিকা হল –
একই পদার্থের দুটি অণুর মধ্যে আকর্ষণকে সমসংযোগ বা সংশক্তি বলে এবং দুটি ভিন্ন পদার্থের অণুর মধ্যে আকর্ষণকে অসমসংযোগ বা আসঞ্জন বলে। উদ্ভিদের জাইলেম বাহিকা সূক্ষ্ম কৈশিক নলের (Capillary Tube) মতো। জলের অণুগুলি সংশক্তি বলের (Cohesive Force) সাহায্যে পরস্পর দৃঢ়ভাবে সংলগ্ন হয়ে অবিচ্ছিন্ন জলস্তম্ভের সৃষ্টি করে ঊর্ধ্বমুখে বাহিত হয়। আবার, জলের অণুগুলি জাইলেম বাহিকার প্রাচীরগাত্রে সেলুলোজ অণুর সঙ্গে আসঞ্জন বলের (Adhesive force) সাহায্যে লেগে থাকে। এর ফলে জলস্তম্ভ দীর্ঘ হলেও ভেঙে যায় না। এটি মূলজ চাপের থেকে আরও বেশি উচ্চতায় কাণ্ডের জাইলেম বাহিকায় জলকে তুলতে সাহায্য করে।
উদ্ভিদের ফ্লোয়েম কলার মাধ্যমে খাদ্যবস্তুর পরিবহণ সম্পর্কিত ‘সাইটোপ্লাজমীয় আবর্তন’ মতবাদটি লেখো।
বিজ্ঞানী দ্য ভিস (de Vries, 1885) উল্লেখ করেন যে, সীভনলের কোশের প্রোটোপ্লাজমীয় আবর্তন/Cyclosis -এর ফলে ফ্লোয়েমে দ্রাবের পরিবহণ ঊর্ধ্বমুখীভাবে ঘটতে পারে। পরবর্তীকালে বিজ্ঞানী কার্টিস (Curtis, 1935) এই মতবাদটি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন।
ব্যাখ্যা – সীভনলের কোশে নিউক্লিয়াস থাকে না। সাইটোপ্লাজম প্রাইমরডিয়াল ইউট্রিকল আকারে কোশপ্রাচীর সংলগ্ন অবস্থায় থাকে ও কোশের কেন্দ্রে একটি বড়ো কোশগহ্বর উপস্থিত থাকে। সীভনলের কোশগুলি একটির ওপর আর একটি সারিবদ্ধভাবে সঞ্চিত থাকে এবং দুটি সন্নিহিত কোশের মধ্যবর্তী প্রস্থপ্রাচীরটি ছিদ্রযুক্ত থাকে। একে সীভপ্লেট বলে। এই সীভপ্লেটের মধ্য দিয়ে সন্নিহিত কোশের সাইটোপ্লাজম প্লাজমোডেসমাটার মাধ্যমে যুক্ত থাকে। সীভনলের কোশে প্রোটোপ্লাজম তথা সাইটোপ্লাজমের সর্বদা একমুখীভাবে স্থানান্তর ঘটে বা ঘূর্ণন (Rotation) দেখা যায়। এর ফলে সীভনলের মধ্যে দিয়ে জৈব খাদ্য নিম্নমুখীভাবে প্রবাহিত হয় এবং সীভপ্লেটের ছিদ্রের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত প্লাজমোডেসমাটার মাধ্যমে এক কোশ থেকে অন্য কোশে পরিবাহিত হয়।
উদ্ভিদদেহে ফ্লোয়েম কলার মাধ্যমে খাদ্য পরিবহণ ঘটে তা পরীক্ষার মাধ্যমে লেখো।
পরীক্ষা পদ্ধতি –
- একটি সতেজ চারাগাছের কাণ্ড অংশ থেকে বলয়াকারে ফ্লোয়েম কলা অপসারণ করা হল।
- এমনভাবে ফ্লোয়েম কলা কাটা হল যাতে করে জাইলেম কলা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
- এইভাবে সমস্ত পরীক্ষাব্যবস্থাটিকে দু-সপ্তাহ স্থিরভাবে সূর্যালোকে রেখে দেওয়া হল।

পর্যবেক্ষণ – দু-সপ্তাহ পরে দেখা যাবে বলয়াকারে কাটা জায়গার ওপরের অংশটি স্থূল হয়ে গেছে এবং কর্তিত অংশের নীচে কাণ্ড ক্রমশ সরু হয়ে গেছে।
সিদ্ধান্ত – বলয়াকারে কাটা জায়গার ওপরের অংশটি স্থূল হওয়ার কারণ হল এই স্থানে খাদ্য সঞ্চিত হয়েছে। ফ্লোয়েম কলার অনুপস্থিতিতে এই খাদ্য উদ্ভিদের নিম্নাংশে পরিবাহিত হতে পারেনি, একারণে নিম্নাংশ সরু হয়ে গেছে।
উদ্ভিদদেহে সামগ্রিক খাদ্য সংবহনের মতবাদ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।
উদ্ভিদদেহে সামগ্রিক খাদ্য সংবহন মতবাদ –
উপস্থাপক – বিজ্ঞানী হার্টিগ (Hartig, 1860) এই মতবাদ উপস্থাপন করেন এবং পরবর্তীকালে বিজ্ঞানী মুনচ্ (Munch, 1930) এই মতবাদের ব্যাখ্যা দেন।
পদ্ধতি –
- সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে পাতার মেসোফিল কলাকোশে শর্করাজাতীয় খাদ্য তৈরি হয় যা কোশরসে দ্রবীভূত হয়ে ঘনত্ব বৃদ্ধি করে।
- অন্তঃঅভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় পার্শ্ববর্তী কোশ থেকে মেসোফিল কোশে জল প্রবেশ করে ফলে রসস্ফীতি চাপ বাড়ে।
- মুনচ্, এক্ষেত্রে পাতাকে উৎস (Source) এবং পরিবহণকারী ফ্লোয়েম কলাকে নর্দমারূপে (Sink) কল্পনা করেন।
- রসস্ফীতি চাপের প্রভাবে ফ্লোয়েম কলার সীভনলের সীভপ্লেটের মাধ্যমে কোশরসে দ্রবীভূত খাদ্য সামগ্রিক প্রবাহের দ্বারা সঞ্চালিত হয়।
- এই প্রক্রিয়ায় ATP খরচ হয় অর্থাৎ, প্রক্রিয়াটি সক্রিয়।
এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর উপবিভাগ ‘উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা’ -এর অন্তর্গত ‘জল, খনিজ পদার্থ, খাদ্য ও গ্যাসের পরিবহণ’ অংশের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন