মাধ্যমিক ইতিহাস – বিশ শতকের ভারতের কৃষক, শ্রমিক, ও বামপন্থী আন্দোলন – বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর

বিশ শতকে ভারতে ব্রিটিশবিরোধী জাতীয় আন্দোলনের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলনও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনগুলি ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

Table of Contents

মাধ্যমিক ইতিহাস – বিশ শতকের ভারতের কৃষক, শ্রমিক, ও বামপন্থী আন্দোলন – বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা

বিশ শতকের ভারতে কৃষক আন্দোলন প্রসার সম্পর্ক আলোচনা করো।

ভূমিকা – ভারতের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে কৃষক আন্দোলন এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। ঊনবিংশ শতকের ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিক্ষিপ্তভাবে কৃষক আন্দোলন শুরু হলেও বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বলিষ্ঠ কৃষক আন্দোলন শুরু হলেও বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বলিষ্ঠ কৃষক আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করে।

কৃষক আন্দোলন – বিশ শতকের কৃষক আন্দোলনগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল –

চম্পারণ সত্যাগ্রহ – বিহারের চম্পারণে তিন কাঠিয়া প্রথার বিরুদ্ধে সংগঠিত কৃষক আন্দোলনে গান্ধীজি যোগদান করেন (১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ)। সরকার চম্পারণ কৃষি বিল পাশ করে তিন কাঠিয়া প্রথার অবসানের কথা ঘোষণা করলে চম্পারণ সত্যাগ্রহ বন্ধ হয়।

খেদা সত্যাগ্রহ – গুজরাটের খেদা জেলার কৃষকরা ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি জনিত কারণে কৃষকেরা খাজনা হ্রাসের দাবি করে ও আন্দোলন শুরু করে। গান্ধিজি খেদার কৃষকদের নিয়ে খাজনা বৃদ্ধির প্রতিবাদে খেদা সত্যাগ্রহ (১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ) শুরু করেন।

মোপলা বিদ্রোহ – অসহযোগ আন্দোলন পর্বে কেরালার মালাবার অঞ্চলে মোপলা নামক মুসলিম কৃষকরা স্বরাজের সমর্থনে ব্যাপক জমিদার বিরোধী কৃষক আন্দোলন শুরু করে। জমিদারদের অধিকাংশই হিন্দু হওয়ায় আন্দোলনটি অচিরেই সাম্প্রদায়িক রূপ পরিগ্রহ করে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।

একা অন্দোলন – ১৯২১-২২ খ্রিস্টাব্দে উত্তরপ্রদেশের কংগ্রেস ও খিলাফতি নেতাদের উদ্যোগে এবং মাদারি পাশির নেতৃত্বে হরদোই, সীতাপুর, বারাচ, বারবাকি জেলায় ব্যাপক কৃষক আন্দোলন শুরু হয়। কৃষকরা মাদারি পাশির নেতৃত্বে একতা বা ঐক্যবদ্ধ থাকার শপথ গ্রহণ করে।

বারদৌলি সত্যাগ্রহ – গুজরাটের সুরাট জেলার বারদৌলি তালুকে সরকার ৩০ শতাংশ খাজনা বৃদ্ধি করলে ব্যাপক কৃষক জাগরণ ঘটে। কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বল্লভভাই প্যাটেল এগিয়ে আসে। তিনি হিন্দু কৃষকদের নিয়ে খাজনা না দেওয়ার আন্দোলন শুরু করেন। আন্দোলনের ব্যাপকতায় সরকার বিচলিত হয়ে খাজনার হার সংশোধন করে ৬.০৩ শতাংশ খাজনা বৃদ্ধি করে।

বখস্ত আন্দোলন – বিহারে বখস্ত জমি বলতে বোঝাত, জমিদারদের খাসজমি। খাজনা বাকি পড়ায় জমিদাররা এই জমিগুলি বাজেয়াপ্ত করে খাসজমিতে পরিণত করে এবং কৃষকদের উচ্ছেদ করতে থাকে। বিহারের কিষাণ নেতা স্বামী সহজানন্দের নেতৃত্বে কৃষকরা সংগঠিত হয়। আইন অমান্য আন্দোলন পর্বে এই আন্দোলন ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। গয়া, মুঙ্গের, দ্বারভাঙ্গা, সরন প্রভৃতি জেলায় আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে।

তেভাগা আন্দোলন – দ্বিতীয় যুদ্ধোত্তর কালে বঙ্গীয় কৃষক সভার উদ্যোগে এবং কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে ১৯৪৬-৪৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়। ‘আধি নয়, তেভাগা চাই, কর্জ ঋণের সুদ নাই, লাঙল যার জমি তার প্রভৃতি ছিল এই আন্দোলনের দাবী। কৃষকরা যে জমিতে চাষ করে তার ওপর দখলি স্বত্ত্বপ্রদানও দাবী করে। বাংলার প্রায় ৬০ লক্ষ কৃষক এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিল। চারু মজুমদার ভবানী সেন, সমর গাঙ্গুলী, গুরুদাস তালুকদার, সুনীল সেন প্রমুখরা এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

পুন্নাপ্রা-ভায়লার গণ আন্দোলন – ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যের কৃষক ও শ্রমিকরা সেখানকার দেওয়ান রামস্বামী আয়ারের বিরুদ্ধে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে যে গণসংগ্রাম পরিচালিত করেছিলেন। তা পুন্নাপ্রা-ভায়লার গণ সংগ্রাম নামে খ্যাত। এর ফলে ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যের ভারতভুক্তি সহজ হয়।

তেলেঙ্গানা আন্দোলন – স্বাধীনতা প্রাক্কালে কমিউনিস্ট পরিচালিত একটি দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র অভ্যুত্থান ছিল হায়দরাবাদের তেলেঙ্গানা আন্দোলন। হায়দরাবাদের নিজামের স্বৈরাচারি শাসন ও সামন্ততান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে ৯টি তেলুগু ভাষা এই ভাষীর জেলার তিন হাজার গ্রামের প্রায় ৩০ লক্ষ কৃষক। আন্দোলনে শামিল হয়েছিল।

মূল্যায়ণ – এভাবে দেখা যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে যে সব কৃষক আন্দোলন হয়েছিল সেগুলির ওপর কংগ্রেসের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কৃষক আন্দোলন গুলি ছিল পুরোপুরি কমিউনিস্ট পরিচালিত। ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী অভ্যুত্থান হিসেবে কৃষক আন্দোলনগুলির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

বিশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে জাতীয় রাজনীতিতে বামপন্থী প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ কী? মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা কী?

প্রথম অংশ – বিশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে জাতীয় রাজনীতিতে বামপন্থী ঝোঁক প্রবল হয়ে ওঠে।

প্রেক্ষাপট – জাতীয় রাজনীতিতে বামপন্থী প্রবণতা বৃদ্ধির কারণগুলি হল —

  • রুশ বিপ্লবের প্রভাব ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রাধান্য
  • প্রথম বিশ্বজনিত অর্থনৈতিক মন্দা
  • শ্রমিক-কৃষক ও সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশায় কংগ্রেস নেতৃত্বের উদাসীনতা ও জাতীয় আন্দোলনের প্রতি মোহভঙ্গ
  • কমিউনিস্ট কার্যকলাপের প্রভাব
  • জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসুর বামপন্থী চিন্তাধারা প্রভৃতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে জাতীয় রাজনীতিতে বামপন্থী প্রবণতা বাড়তে থাকে। এমনকি কংগ্রেসের অভ্যন্তরেও একটি বামপন্থী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে।

বামপন্থী প্রবণতা – ভারতে বামপন্থী প্রবণতার বিভিন্ন দিকগুলি হল —

কমিউনিস্ট পার্টি – ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় কমিউনিস্টদের উদ্যোগে কানপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। এই পার্টি শ্রমিক ও কৃষকদের আন্দোলন সংগঠিত করণের মাধ্যমে জাতীয় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল।

কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল গঠন – কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী প্রবণতাকে সুসংবদ্ধ রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে আচার্য নরেন্দ্রদেব, জয়প্রকাশ নারায়ণ, রাম মনোহর লোহিয়া, অচ্যুত পটবর্ধন, ইউসুফ মেহের আলি প্রমুখের নেতৃত্বে কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল কংগ্রেসের ভিতরে বামপন্থী শক্তিকে সুদৃঢ় করে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করা।

কমিউনিস্ট পার্টির কার্যকলাপ – ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে কমিউনিস্ট পার্টি অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় কমিউনিস্টরা প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালাতে পারে নি। তাই পরবর্তীকালে তারা জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যৌথভাবে গণ আন্দোলন গড়ে তোলার কর্মপন্থা গ্রহণ করে।

কৃষক সভা – এই সময় কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট গঠনের আহ্বান করলে নিখিল ভারত কৃষক সভা ও নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসে কমিউনিস্ট দলের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ভারতে শ্রমিকও কৃষক তৎপরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

দ্বিতীয় অংশ – ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৩২জন কমিউনিস্ট নেতাকে গ্রেপ্তার করে তাঁদের বিরুদ্ধে যে মামলা রুজু করা হয়, তা শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা নামে খ্যাত।

প্রেক্ষাপট – ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূচনা, কমিউনিস্ট পার্টি গঠন এবং শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক সচেতনতার ফলে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে থেকে শ্রমিক আন্দোলন জঙ্গী চরিত্র ধারণ করে। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে এস. এ. ডাঙ্গে, মিরাজকর প্রমুখ শ্রমিক নেতার নেতৃত্বে বোম্বাই গিরনী কামগার ইউনিয়নের দেড় লক্ষ শ্রমিক ছমাস ব্যাপী বোম্বাই-এর বস্ত্ৰকলে ধর্মঘট চালায়। এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে Public Safety Act এবং Trade disputes Act(এপ্রিল ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ) প্রণয়ন করা হল। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিক আন্দোলনের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেওয়া।

প্রতিক্রিয়া – ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে AITUC-র ঝরিয়া অধিবেশনে এই আইনের তীব্র নিন্দা করা হয়। কলকাতা প্রকাশিত বিশ্বমিত্র পত্রিকা এই বিলটিকে ধিক্কার জানায়, গণবাণী পত্রিকায় লেখা হল, বিলটি শ্রমিকের চিরন্তন দাসত্বের সূচনা করছে।

সৌভাগ্যের গ্রেপ্তার – ১৯২৯ খ্রি: ২০ মার্চ Public Safety Act এবং Trade Disputes Act -এর দ্বারা ৩০ জন শ্রমিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন- মুজাফ্ফর আহমেদ, এস. বি. ঘাটে, এস. এ. ভাঙ্গে, পি. সি. যোশী, মিরাজকর, ধরনী গোস্বামী, গঙ্গাধর অধিকারী প্রমুখ।

পরিণতি – দীর্ঘ সাড়ে চার বছর মামলা চলার পর মোট ২৭জন বন্দীর বিভিন্ন মেয়াদে অত্যাধিক কঠোর দন্ডাদেশ হয়। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ৩ আগস্ট এই মামলা সমাপ্ত হয়। ব্রিটিশ শ্রমিক দল এই মামলার রায়কে Judicial Scandal বলে নিন্দা করে।

বিশ শতকের কিষাণ আন্দোলনের সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেস ও বামপন্থীদের সম্পর্ক আলোচনা করো।

ভূমিকা – বিশ শতকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে যে কিষাণ আন্দোলনগুলি ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সংগঠিত হয়েছিল – যেগুলির ওপর জাতীয় কংগ্রেসের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ছিল। কিন্তু চল্লিশের দশকে এই কিষাণ আন্দোলনের চরিত্র বদল ঘটে। এই সময় থেকে কিষাণ আন্দোলনগুলি কমিউনিস্ট নিয়ন্ত্রনাধীন হয়ে পড়ে।

কিষাণ আন্দোলনের সঙ্গে কংগ্রেসের সম্পর্ক –

কৃষক আন্দোলন সম্পর্কে দ্বিমুখী নীতি – জাতীয় কংগ্রেস কৃষক আন্দোলনকে জাতীয় সংগ্রামের মূল স্রোতের সঙ্গে বেঁধে রাখতে বদ্ধপরিকর ছিল। কৃষকদের জন্য এবং কৃষকদের নেতৃত্বে কোনোরকম শ্রেণি সংগ্রাম গড়ে তোলার ইচ্ছা কংগ্রেস নেতাদের ছিল না।

কৃষক আন্দোলনের নিয়ন্ত্রক – কৃষক আন্দোলনে সামান্যতম হিংসার প্রকাশ পেলে বা জঙ্গী আকার ধারণ করলে কংগ্রেস কৃষকদের উৎসাহ উদ্দীপনার রাশ টেনে ধরে তাদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করত। এর ফলে ভারতের কৃষক আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

গান্ধিজির চিন্তাধারা – অনেকে মনে করেন, জমিদার ও কৃষকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও দ্বন্দ্ব নিয়ে মাথা না ঘামালেও গান্ধি কৃষকদের দরদী বন্ধু ছিলেন। তিনি শ্রেণি সংগ্রামের পরিবর্তে শ্রেণি সহযোগিতার কথাই বলতেন। তাই শ্রেণি সংগ্রামের পথ এড়িয়ে গ্রাম পুনগঠন ও খাদি আন্দোলনের মাধ্যমে কৃষকদের স্বনির্ভর করে তুলতে চেয়েছিলেন।

গান্ধিজির প্রতি কৃষকদের আস্থা – কৃষকরা গান্ধিজিকে মুক্তির অগ্রদূত হিসেবে বরণ করেছিল। তিনি ছিলেন তাদের কাছে পরিত্রাতা বা অবতার। কৃষকরা অন্তর থেকে বিশ্বাস করত যে, ইংরেজ শাসনের অবসানের পর ভারতে গান্ধিরাজ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তাদের দুঃখের দিন শেষ হবে। গান্ধিজিকে না দেখলেও তাঁর নামের জাদু কৃষকদের সম্মোহিত করেছিল। এজন্য গান্ধিজি পরিচালিত আন্দোলনগুলিতে কৃষকদের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল।

মূল্যায়ণ : কংগ্রেস কিষাণ আন্দোলনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করত। কৃষক আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বপ্রণোদিত ধারাকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাছে লাগানোর চেষ্টা করত হত। কিন্তু কংগ্রেসি নেতাদের আপোষ নীতি ও অহিংসা নীতি কৃষক সমাজকে কংগ্রেসের প্রতি বিমুখ করে তোলে। গান্ধিবাদী বাবা রামচন্দ্র কংগ্রেসি নীতিতে বিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত লেনিন ও রাশিয়ার প্রশংসা করতে থাকেন।

কিষাণ আন্দোলনের সঙ্গে বামপন্থীদের সম্পর্ক –

কংগ্রেসী আন্দোলনে হতাশ হয়েই অনেক কৃষক নেতা বামপন্থীদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তবে কমিউনিস্টদের পক্ষে কৃষকদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করা কঠিন কাজ ছিল।

শ্রেণি সংগ্রাম গড়ে তোলার প্রতিবন্ধকতা – আদিবাসী কৃষক, বর্গাদার, দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে কমিউনিস্টদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। কিন্তু আঞ্চলিক বৈষম্য, ধর্মীয় বিভেদ, জাতিভেদ প্রথা অর্থাৎ গ্রামীণ সমাজের কাঠামোগত জটিলতা শ্রেণিসংগ্রাম গড়ে তোলার পথে অন্তরায়ের সৃষ্টি করেছিল। তাছাড়া সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি প্রভাবিত কমিন্টার্নের নির্দেশে ভারতীয় কমিউনিস্টদের কর্মবিধি নিয়ন্ত্রিত হত বলে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারত না। উপরন্তু কৃষকদের মধ্যে সাম্যবাদী মতাদর্শ প্রচার করা হলেও কৃষক শ্রেণি থেকে কোনো কৃষক নেতার আবির্ভাব ঘটেনি।

কৃষকদের ওপর কমিউনিস্টদের প্রভাব – বাংলা ও বিহারে কিষাণ সভার ওপর কমিউনিস্টদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। এইসব অঞ্চলে কমিউনিস্টরা কংগ্রেসের কিষাণ
আন্দোলনের বিকল্প হিসেবে নিজেদের একটা ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল – যা কংগ্রেসের কাছে মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণে ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ডিসেম্বর মাসে কংগ্রেস তাদের কর্মীদের কিষাণ সভার কার্যাবলী থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছিল। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে বল্লভভাই প্যাটেল বলেন, Comrade Lenin was not born in this country and we do not want a Lenin here. We want Gandhi and Ramchandra.

বিশ্বযুদ্ধোত্তর কৃষক আন্দোলন নেতৃত্ব – বিশ শতকের চল্লিশের দশকে কিষাণ আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি কমিউনিস্ট হাতে চলে যায়। স্বাধীনতার প্রাক্কালে যেসব কৃষক আন্দোলন (যেমন- তেভাগা, তেলেঙ্গানা, পুন্নাপ্রা – ভায়লার) সংগঠিত হয়েছিল যেগুলি কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন পরিচালিত হয়েছিল।

মূল্যায়ণ : পরিশেষে বলা যায় যে, কৃষক আন্দোলনকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য কৃষকদের অনেকেই কিষাণ সভা ও কংগ্রেসের সদস্যপদ নিয়েছিল — যা আন্দোলনকে দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত করতে সাহায্য করেছিল।

উনিশ শতকের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে কংগ্রেস ও কমিউনিস্টদলের সম্পর্ক আলোচনা করো।

ভূমিকা – সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে নতুন ধারার সংযোজন হল—শ্রমিক আন্দোলন। বিশের দশকে শ্রমিক আন্দোলনের রাশ, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি শ্রমিক আন্দোলনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। রুশবিপ্লব, প্রথম বিশ্বজনিত অর্থনৈতিক মন্দা, শ্রমিকদের মধ্যে বামপন্থী চিন্তাধারা বিকাশের সহায়ক হয়েছিল।

শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গি – শ্রমিকদের দাবিদাওয়া ও আন্দোলন সম্পর্কে প্রাথমিক পর্বে কংগ্রেসের মনোভাব ছিল নেতিবাচক। কারণ, কংগ্রেস কখনো চায়নি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন কোনোভাবে দুর্বল হোক। কংগ্রেস পরিচালিত জাতীয়-আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হলে দেশীয় শিল্পপতিদের সক্রিয় সমর্থন ও আর্থিক সহযোগিতা অপরিহার্য ছিল। তাই শ্রমিকদের পক্ষ নিয়ে আন্দোলন করে কংগ্রেস শিল্পপতিদের সমর্থন হারাতে চায়নি। অন্যদিকে, শ্রমিক শ্রেণির কাছে স্বাধীনতা অপেক্ষা নিজেদের আর্থসামাজিক উন্নয়নই বেশি কাম্য ছিল।

শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কে গান্ধিজির দৃষ্টিভঙ্গি – কংগ্রেসের মধ্যে গান্ধিজি ছিলেন অবিসংবাদী নেতা। তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের পূর্বে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে আমেদাবাদ সূতাকল শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবীতে শ্রমিকদের পক্ষে অনশন সত্যাগ্রহ শুরু করেন। মালিকপক্ষ বাধ্য হয়ে শ্রমিক মজুরি ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেন। এই আন্দোলনের সফলতায় শ্রমিকদের কাছে গান্ধিজির ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পায়। অবশ্য এটিই ছিল গান্ধীজি পরিচালিত প্রথম ও শেষ শ্রমিক আন্দোলন। পরবর্তীকালে শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কে তিনি আর আগ্রহ দেখাননি। আসলে গান্ধিজি শ্রেণি সংগ্রামে কোনো দিনই বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি শ্রেণি সংগ্রামের পরিবর্তে বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহাবস্থানের কথা বলতেন। শ্রমিকদের নিয়ে রাজনীতি করার পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না। (তিনি বলতেন, Labour should not be allowed to be a pawn in the political chess board.)

AITUC গঠন – ১৯১৯ এবং ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অমৃতসর ও গয়া অধিবেশনে শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া হয়। যার ফলশ্রুতি হিসেবে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে গঠিত হয় সর্বভারতীয় শ্রমিক সংগঠন AITUC। লালা লাজপত রায় ছিলেন এই সংগঠনের প্রথম সভাপতি। যদিও গান্ধীজি এই সংগঠন গড়ার ব্যাপারে কোনো সহযোগিতা করেননি। অসহযোগ আন্দোলনের সময় কংগ্রেসের নেতৃত্ব শ্রমিকদের নানা দাবি চাওয়ার সমর্থনে এগিয়ে আসে। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে জওহরলাল নেহরুর সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সভাপতিরূপে নির্বাচন শ্রমিক আন্দোলনকে কংগ্রেসের কাছাকাছি নিয়ে আসে।

বামপদী ও শ্রমিক আন্দোলন – শ্রমিকদের খুশী করতে গিয়ে কংগ্রেস শিল্পপতিদের বিরাগভাজন হতে চায় নি। কিন্তু কমিউনিস্ট নেতাদের এইরূপ চিন্তাধারা ছিল না। তবে কমিউনিস্টদের সংকীর্ণ নীতি অনেক সময় শ্রমিকদের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল।

বামপন্থী আদর্শের প্রতি শ্রমিকদের ঝোঁক – রুশবিপ্লব, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ জনিত অর্থনৈতিক মন্দা, জাতীয় আন্দোলনের সীমাবন্ধতা শ্রমিক শ্রেণিকে কমিউনিস্ট আদর্শে উদ্‌বুদ্ধ করে। কমিউনিস্টদের ঘোষিত নীতিই ছিল শ্রেণি সংগ্রাম।

শ্রমিক আন্দোলনে কমিউনিস্ট প্রভাব – অসহযোগ আন্দোলন পরবর্তীকালে শ্রমিক আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ছিল শ্রমিকদের মধ্যে কমিউনিস্ট ভাবধারার বিস্তার। কমিউনিস্ট নেতারা রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার প্রশ্নটি সকলের সামনে তুলে ধরতে থাকেন। কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন সংগঠিত হতে থাকে নানা শ্রমিক সংগঠন। বোম্বাই-এর গিরনী কামগার ইউনিয়ন ছিল পুরোপুরি কমিউনিস্ট প্রভাবাধীন।

মূল্যায়ণ – তবে শ্রমিক আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে শ্রমিকরা কংগ্রেস বা কমিউনিস্ট নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের মধ্যে নানা মতভেদ ও কমিউনিস্টদের পরিবর্তনশীল নীতি অনেক সময় শ্রমিক আন্দোলনকে বিপথগামী করে তুলতো।

কংগ্রেসের অভ্যন্তরে সমাজতন্ত্র প্রসারে জওহরলাল নেহরুর ভূমিকা আলোচনা করো। গান্ধি-নেহরু বিতর্ক কী?

প্রথম অংশ – বিশ শতকের ত্রিশের দশক থেকে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। জওহরলাল নেহরু ছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী ভাবধারার মূল প্রবক্তা। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তিনি নিজেকে সমাজতন্ত্রী বলে অভিহিত করেন। গান্ধিজি বলেন, Jawhar is a confirmed socialist.

জওহরলালের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার উৎস – ১৯২৬-২৭ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপ সফরের সময় নেহরু ইউরোপের বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ও চিন্তানায়কদের সংস্পর্শে আসেন। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে সব্রাসেল – এ অনুষ্ঠিত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যে আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেখানে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করাই ছিল এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য। মানবেন্দ্রনাথ রায়ের চিন্তাধারাও তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল।

সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা – ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে ভারত কোন পথ নামক প্রবন্ধে জওহরলাল নেহরু শ্রেণি বৈষম্যমুক্ত সমাজগঠনের কথা ব্যক্ত করেন এবং সোভিয়েত সমাজতন্ত্রবাদকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁর চিন্তাধারায় আকৃষ্ট হয়ে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে একটি বামপন্থী গোষ্ঠীর বিকাশ ঘটতে শুরু করে। যার পরিণতিরূপে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দলের প্রতিষ্ঠা। তবে তিনি মনে করতেন ভারতে সমাজতন্ত্র ভারতের পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তিনি কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দলের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকলেও কোনোদিন এর সদস্যপদ গ্রহণ করেননি।

নেহরু বামপন্থী কার্যধারা – ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে লক্ষ্ণৌতে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে নেহরু বলেন — এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে বিশ্বের ও ভারতের সমস্ত সমস্যা সমাধানের একমাত্র চাবিকাঠি হল সমাজতন্ত্র। অচ্যুত পটবর্ধন, জয়প্রকাশ নারায়ণ, নরেন্দ্রদেবকে কংগ্রেসের কার্যকরী সমিতিতে অন্তর্ভুক্ত করলে নীতি নির্ধারণে বামপন্থী আদর্শের সংযোজন সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। তিনি ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে নতুন সংবিধান অনুসারে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও মন্ত্রীত্ব গ্রহণের বিরোধিতা করেন। কারণ এর ফলে কংগ্রেসের সংগ্রামী ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যাবে।

দ্বিতীয় অংশ –

গান্ধী-নেহরু বিরোধ – গান্ধিজি নেহরুর মত সমাজতন্ত্রী দলের হাতে জাতীয় কংগ্রেসের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে একদিকে যেমন – নেহরুর সমাজতান্ত্রিক ভাবোচ্ছাস থামিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তেমনি নতুনভাবে গড়ে ওঠা ভারতীয় সমাজতন্ত্রের বিষদাঁত ভেঙ্গে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর কোনোটিই কার্যকরী হয়নি। বিপরীত ফল দেখে গান্ধিজি সমেত কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী নেতারা বিব্রতবোধ করলেন। কিন্তু দক্ষিণপন্থী নেতারা চুপ করে রইলেন না। রাজেন্দ্র প্রসাদ, কৃপালনী চক্রবর্তী, বল্লভভাই প্যাটেল, রাজাগোপালাচারী প্রমুখ দক্ষিণপন্থী নেতারা একযোগে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করলেন। গান্ধি-নেহরু বিবাদ বহুদিনের–ডোমিনিয়ান স্টাটাসকে কেন্দ্র করে। কিন্তু লক্ষ্ণৌ অধিবেশনে গান্ধিজির নির্দেশে নেহরুর সভাপতি হওয়া ও বামপন্থী ধ্যান ধারণার আস্ফালন গান্ধিজিকে মোটেই খুশি করতে পারেনি। গান্ধিজি জওহরলালের সমালোচনা করে বলেন, জওহরের পথ আমার পথ নয়। তিনি কার্যত তাঁর কর্মপদ্ধতি অনুমোদন করেন নি। তিনি সর্বশক্তি দিয়ে শ্রেণি সংগ্রামের বিরোধিতা করবেন বলে ঘোষণা করেন।

নেহরুর আত্মসমর্পণ – বুদ্ধিমান নেহরু বুঝেছিলেন যে, গান্ধিজি কংগ্রেসের প্রাণপুরুষ। বামপন্থী ভাবমূর্তি বজায় রাখার চেয়ে অনেকবেশি জরুরি গান্ধির ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেওয়া। গান্ধি আনুগত্য হারানোর পরিণতি রাজনৈতিক অপমৃত্যু। তাই নেহরু না ঝুঁকি নিয়ে অবশেষে গান্ধির কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করেন।

সমাজতন্ত্র প্রসারে সুভাষচন্দ্র বসুর অবদান বর্ণনা করো। কংগ্রেস থেকে তাঁকে বিতাড়িত হতে, হয়েছিল কেন?

প্রথম অংশ – ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা বিকাশের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। সমাজতান্ত্রিক ভাবনার প্রতি অবিচল থাকতে গিয়ে কংগ্রেস থেকে তাঁকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল। আসলে ঘরে-বাইরে তিনি ছিলেন আপোষহীন সংগ্রামী নায়ক।

সুভাষের সমাজতান্ত্রিক ভাবনার উৎস – স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তাচেতনা, ত্যাগ ও সেবার আদর্শ সুভাষচন্দ্রকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। বিবেকানন্দের মতোই সুভাষচন্দ্র বিশ্বাস করতেন, ভারতবাসীর বড় অভিশাপ হল দারিদ্র এবং এই দারিদ্র্যের মূল কারণ ইংরেজদের সাম্রাজ্যবাদী শোষণ। তিনি মনে করতেন, সমাজতন্ত্রের উদ্ভব কার্লমার্কস থেকে হয়নি, তার শিকড় নিহিত ছিল ভারতীয় সংস্কৃতির মধ্যে।

সুভাষচন্দ্রের সমাজতান্ত্রিক ধ্যান ধারণা – তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সম্পদের সুষম বণ্টন ও সামাজিক অসাম্য দূর করার কথা বলেছিলেন। সুভাষচন্দ্র নিজেকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী বলেছেন। সুভাষচন্দ্র চেয়েছিলেন, ভারতবর্ষের নিজস্ব সমাজতন্ত্র গড়ে উঠুক তার নিজের ভূগোল ও ইতিহাসের ভিত্তিতে—যা সমন্বয় সাধিত সমাজতন্ত্র গঠনে সহায়তা করবে। লাহোর-এ অনুষ্ঠিত ছাত্র সম্মেলনের উদবোধনী ভাষনে তিনি বলেছিলেন, এই স্বাধীনতার লক্ষ্য কেবল রাজনৈতিক বন্দীদশা থেকে মুক্তিনয়; এর লক্ষ্য সম্পদের সমবন্টন, জাতিভেদ প্রথার অবসান ও সামগ্রিক সাম্যের প্রতিষ্ঠা। এই স্বাধীনতার লক্ষ্য সাম্প্রদায়িকতার অবসান এবং ধর্মীয় সহনশীলতার বাতাবরণ তৈরি করা। এই লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য তিনি ইয়ং ইতালি দলের আদর্শে ভারতের ছাত্র, যুবক, কৃষক, শ্রমিক প্রভৃতি নানা স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

হরিপুরা কংগ্রেসে সভাপতি নির্বাচন – কংগ্রেসের বামপন্থী গোষ্ঠীকে তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের হরিপুরা অধিবেশনে সুভাষচন্দ্রকে কংগ্রেস সভাপতির পদে আসীন করা হয়। সুভাষচন্দ্র বামপন্থী মনোভাব এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামী মানসিকতার জন্য সুপরিচিত। গান্ধিজির আপোষমুখী মনোভাবের তিনি ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। মত ও পথের তীব্র সংঘাত সত্ত্বেও গান্ধিজি সুভাষকে সভাপতি করার প্রস্তাব দেন। অনেকে বলেন বামপন্থীদের চাপ ও সুভাষের প্রতি অবহেলার প্রতিদান হিসেবে গান্ধিজি তাঁকে সভাপতি পদে মনোনীত করেছিলেন।

গান্ধি-সুভাষ বিরোধের সূত্রপাত – হরিপুরা অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তিনি প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্র গঠন (১৯৩৫-এর ভারতশাসন আইনানুযায়ী) ও মন্ত্রীসভা গঠনের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনগুলিকে কংগ্রেসের অধীনে এনে সাম্রাজ্যবাদী বিরোধী মঞ্চ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। সুভাষচন্দ্র ভারতে কংগ্রেস সমাজতন্ত্রীদলের কর্মপন্থাকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান এবং সোভিয়েত রাশিয়ার ধাঁচে ভারতের পুনর্গঠনের জন্য প্ল্যানিং কমিশন গঠনের কথা বলেন। সভাপতি রূপে সুভাষের কার্যাবলি ও চিন্তাধারা গান্ধিজি অনুমোদন করতে পারলেন না। রাশিয়ার অনুকরণে প্ল্যানিং কমিশন গঠন করার প্রস্তাবও গান্ধি মেনে নিতে পারলেন না। এই রূপ নানা প্রশ্নে গান্ধি-সুভাষের মত পার্থক্য প্রকট হয়ে উঠতে লাগল।

দ্বিতীয় অংশ –

ত্রিপুরি অধিবেশন ও সুভাষচন্দ্র – ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের ত্রিপুরি অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র দ্বিতীয়বারের জন্য সভাপতি পদ প্রার্থী হলে গান্ধিজি আপত্তি জানান। এতদিন পর্যন্ত গান্ধিজিই কংগ্রেস সভাপতি মনোনীত করতেন এবং কারো কোনো আপত্তি উঠত না। গান্ধিজি ত্রিপুরি কংগ্রেস আবুল কালাম আজাদকে সভাপতি মনোনীত করেন। কিন্তু তিনি রাজী না হওয়ায় পট্টভি সীতারামাইয়াকে প্রার্থী মনোনীত করা হয়। মনোনয়ন প্রত্যাহারের ব্যাপারে কংগ্রেস কার্য নির্বাহক সমিতির অনুরোধ সত্ত্বেও সুভাষ নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। ২৯ জানুয়ারি ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে এই নির্বাচনে সুভাষচন্দ্র ২০৩ টি (সুভাষের পক্ষে ১৫০০ এবং বিপক্ষে ১৩৭৭) ভোটের ব্যবধানে গান্ধি মনোনীত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করেন।

প্রতিক্রিয়া – সুভাষচন্দ্রের বিজয়লাভে গান্ধিজি ও তাঁর অনুগত দক্ষিণপন্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে সহযোগিতা না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

সভাপতির পদে ইস্তফা – সুভাষচন্দ্র জানতেন যে, সংগঠন চালানোর জন্য গান্ধিজির নেতৃত্ব ও সহযোগিতা আবশ্যিক। কিন্তু সুভাষের প্রতি গান্ধিজির অনমনীয় মনোভাব সুভাষকে হতাশ করে। হতাশ সুভাষ মন্তব্য করেন, আমি যখন দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষটির আস্থা হারিয়েছি তখন আমার আর সভাপতি থেকে কাজ নেই। অতঃপর ২৯ এপ্রিল ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতির পদে ইস্তফা দেন।

ফরওয়ার্ড ব্লক দল গঠন – অতঃপর ৩ মে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেসের অভ্যন্তরেই ফরওয়ার্ড ব্লক নামে এক নতুন দল গঠন করেন। সুভাষচন্দ্র নিজেই এই দলের সভাপতি হন। তিনি বামপন্থীদের সংঘবদ্ধ করার জন্য কংগ্রেসের উপদল হিসেবে ফরওয়ার্ড ব্লককে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল, কমিউনিস্ট পার্টি ও মানবেন্দ্রনাথ রায়ের গোষ্ঠী — কেউই তাঁর সাথে এক সঙ্গে চলতে রাজী হল না।

কংগ্রেস থেকে বহিঃস্কার – সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এনে ১১ আগস্ট ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে সুভাষচন্দ্রকে তিন বছরের জন্য কংগ্রেসের কোনো পদ গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। এভাবেই কংগ্রেসের রাজনীতি থেকে সুভাষচন্দ্রের চিরবিদায় ঘটে। তিনি আর কোনো দিন কংগ্রেসের ফিরে আসেননি। এভাবেই শেষ পর্যন্ত বামপন্থী ঐক্যের স্বপ্ন ও মায়া মরীচিকার মতো মিলিয়ে যায়।

বিশ শতকের ভারতে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে বামপন্থী রাজনীতির অংশগ্রহণের চরিত্র বিশ্লেষণ করো।

অথবা, বিশ শতকের ভারতে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে বামপন্থী দলগুলির ভূমিকা আলোচনা করো।

ভূমিকা – ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শ্রমিক কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল এই পার্টি। তাদের রাজনৈতিক কার্যকলাপ শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আবর্তিত হত। তাই জাতীয় আন্দোলনে শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণিকে শামিল করার মহান কৃতিত্বের দাবিদার ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি।

লেনিনের ঔপনিবেশিক চিন্তাধারা – ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে তাসখন্দে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট সম্মেলনে লেনিন পরামর্শ দেন যে, ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে স্বাধীনতালাভের জন্য যে জাতীয় আন্দোলন চলছে কমিউনিস্টদের উচিত এই আন্দোলনে শামিল হওয়া। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয় যে, সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি প্রভাবিত কমিন্টানের নির্দেশে ভারতীয় কমিউনিস্টদের কর্মপদ্ধতি পরিচালিত হত। তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারত না। চতুর্থ ও পঞ্চম কমিন্টার্নের অধিবেশনেও কমিউনিস্টদের সমাজবাদী চরিত্র বজায় রেখে জাতীয় আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সপ্তম কমিন্টার্ন (১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত এই ধারা বজায় ছিল।

কমিউনিস্টদের দ্বিস্তর কৌশল – এম. এন. রায় অত্যন্ত সুচতুরভাবে দলের দুটি ভাবমূর্তি গঠনের কৌশলের কথা বলেন। একটি হল – জাতীয় আন্দোলনের মূল স্রোতে যোগদান দ্বারা আইনগত ও বৈধভাবে আন্দোলন করা। অপরটি হল গোপনে শ্রমিক কৃষক সংগঠন দ্বারা দলের নিজস্ব ভিত্তি শক্ত করা।

বামপন্থীদের ভূমিকা – উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে বামপন্থীদের অংশগ্রহণের বিভিন্ন দিকগুলি হল—

সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন – ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে সাইমন কমিশন ভারতে এলে কংগ্রেসের তরফে যে ব্যাপক বিক্ষোভ কর্মসূচি নেওয়া হয়, তাকে বামপন্থীরা অংশ নেয়। এর পাশাপাশি কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে শিল্প-শ্রমিকদের ধর্মঘট ইংরেজ সরকারকে বিপাকে ফেলেছিল। এভাবে কমিউনিস্টরা নিজেদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরে।

পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি – কমিউনিস্ট দলের সদস্যরা জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে উপস্থিত থেকে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্রমাগত পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে এসেছিল — যা ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে পূর্ণতা পায়।

চরিত্রগত বদল – একদিকে লেলিনের মৃত্যু অপরদিকে এম. এন. রায়ের পরিবর্তে ভারত বিষয়ক ব্রাডলির দায়িত্ব গ্রহণ জাতীয় আন্দোলনে অংশ গ্রহণে চরিত্রগত বদল ঘটে। কংগ্রেসের জনপ্রিয় নেতাদের প্রতিক্রিয়াশীল আখ্যা দিয়ে সোভিয়েত ধাঁচে বিপ্লব সংঘটিত করার দিবা স্বপ্ন দেখা শুরু করে কমিউনিস্টরা। এর ফলে জাতীয় আন্দোলনে যোগদানে কমিউনিস্টরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়।

ফ্যাসিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যুক্তফ্রন্ট গঠন – ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে কমিউনিস্ট দল বেআইনি ঘোষিত হয়। এই পরিস্থিতিতে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল কমিউনিস্টদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে রাজি হয়। ব্রাডলিও কমিউনিস্টদের জাতীয় কংগ্রেসে যোগদানের নির্দেশ দেয়। এই পর্বে ইউরোপ জুড়ে বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় এবং ফ্যাসিবাদের উত্থানে কমিন্টার্ন বিচলিত হয়ে পড়ে। কমিন্টার্নের তরফ থেকে কমিউনিস্টদের ফ্যাসিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যুক্তফ্রন্ট গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

নৌ বিদ্রোহে অংশ গ্রহণ – ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে নৌ বিদ্রোহে একমাত্র কমিউনিস্টরাই সমর্থন জানিয়েছিল। কমিউনিস্ট নেতা ড: গঙ্গাধর অধিকারী এক বিবৃতি মারফৎ কংগ্রেস নেতৃবৃন্দকে এই বিদ্রোহে হস্তক্ষেপের ব্যাপারে আহ্বান জানান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ভারতীয় কমিউনিস্ট – বিশ্বযুদ্ধের সূচনায় কমিউনিস্টরা সাম্রাজ্যবাদের এবং যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও যুদ্ধে রাশিয়ার যোগদান সমস্ত ভাবনাকে এলোমেলো করে দেয়। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যুদ্ধকে কমিউনিস্টরা রাতারাতি জনযুদ্ধ আখ্যা দেয়। সাম্যবাদের পিতৃভূমি সোভিয়েত রাশিয়া নাৎসী জার্মানির দ্বারা আক্রান্ত হলে (১৯৪১) ভারতীয় কমিউনিস্ট দল সোভিয়েত রাশিয়ার মিত্র ব্রিটেনকে সমর্থন জানায়। যুদ্ধ রত ব্রিটিশ সরকারকে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করে।

বিশ্বযুদ্ধোত্তর কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব – বিশ্বযুদ্ধোত্তর বাংলার তেভাগা আন্দোলন বা তেলেঙ্গানা সংগ্রামী কাহিনির সঙ্গে কমিউনিস্টরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির পরিচালনায় এই আন্দোলনগুলি পরিচালিত হয়েছিল।

মূল্যায়ণ – ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে কমিউনিস্টরা সংহতিপূর্ণ কাজ করেছিল। ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক আগে দেশীয় রাজ্যগুলির রাজারা (যেমন- ত্রিবাঙ্কুর) ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যে চক্রান্ত শুরু করেছিলেন তার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে কমিউনিস্টরা দেশীয় রাজ্যসমূহের ভারতভুক্তির কাজটি সহজ করে দিয়েছিল। তবে কখনো কখনো এরা উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে চরিত্রগত বদল ঘটিয়েছিল।

১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কার্যকলাপ বর্ণনা করো।

রুশ বিপ্লবের পর থেকেই ভারতে কমিউনিস্ট আদর্শের বিস্তার ঘটতে থাকে। রুশ বিপ্লবের সাফল্য ও সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে নতুন ভাবনার দিকে চালিত করে। যার ফলশ্রুতি হিসাবে ভারতেও বামপন্থী চিন্তাধারার আনাগোনা শুরু হয়।

কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা – রাশিয়ার তাসখন্দে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানালের দ্বিতীয় অধিবেশনে পরাধীন দেশগুলির স্বাধীনতার প্রশ্নে গুরুত্ব দেওয়া হলে ভারতবাসীও সাম্যবাদী আন্দোলনের শরিক হওয়ার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। মানবেন্দ্র রায় এবং অপরাপর কতিপয় প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী ১৭ অক্টোবর ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে এখানে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করে। এপ্রসঙ্গে খিলাফতি নেতাদেরও ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

ভারতে কমিউনিস্ট গোষ্ঠীর বিস্তার – এদিকে ভারতে বহু নিবেদিত শ্রমিক কর্মী ও বিপ্লবী নিজ নিজ ইচ্ছায় কমিউনিস্ট গোষ্ঠী গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। এঁদের মধ্যে বাংলায় মুজ্জাফর আহমেদ, বোম্বাই-এ এস. এ. ডাঙ্গে মাদ্রাজে সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়া, লাহোরে গোলাম হোসেন উল্লেখযোগ্য। এঁরা গান্ধিনীতিতে আস্থা হারিয়ে মার্কসবাদে আস্থা জ্ঞাপন করেন। এঁদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এম. এন. রায় নলিনীগুপ্ত ও শওকত উসমানীকে ভারতে পাঠান।

কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা – ভারতে কমিউনিস্ট আদর্শকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেওয়ার জন্য কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কয়েকটি মিথ্যা মামলা সাজানো হয়। শওকত উসমানী, নলিনী গুপ্ত, মুজাফ্ফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে প্রমুখের বিরুদ্ধে কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা রুজু করা হয়। এর ফলে সদ্য প্রতিষ্ঠিত র কমিউনিস্ট আন্দোলন জোড় ধাক্কা খায়।

ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা – ভারতের কমিউনিস্ট গোষ্ঠীগুলিকে ঐক্যবদ্ধরূপে দেওয়ার জন্য ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে ডিসেম্বরে ভারতের সমস্ত কমিউনিস্ট গোষ্ঠী কানপুরে এক সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট সম্মেলনে মিলিত হয়। এখানে জন্মলাভ করে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি। যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন জানকী প্রসাদ বাগের হাট্টা এবং এস. বি. ঘাটে।

কার্যকলাপ – ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কার্যকলাপের বিভিন্ন দিককে এভাবে চিহ্নিত করা যায়—

ওয়ার্কার্স এ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি গঠন – কংগ্রেসের সমাজতন্ত্রী ব্যক্তি এবং কমিউনিস্টদের প্রচেষ্টায় ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা, বোম্বাই ও পাঞ্জাব ও যুক্তপ্রদেশে গঠিত হয় ওয়ার্কার্স এ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় এই সংগঠনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বভারতীয় সম্পাদক হন এন. আর. নিম্বকার। এই সময় বেশ কিছু পত্র-পত্রিকা কমিউনিস্ট আদর্শ প্রচারে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। এগুলির মধ্যে বাংলার ‘লাঙল’, বোম্বাই-এ ‘ক্রান্তি’, লাহোরে ‘কীর্তি কিষাণ’ ও ‘ইনক্লাব’, মাদ্রাজে ‘ওয়ার্কার’ উল্লেখযোগ্য। শ্রমিক আন্দোলনে এই সংগঠন সাফল্য পেলেও কৃষক আন্দোলনে তেমন কোনো দিশা দেখাতে পারে নি।

মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা – শ্রমিক আন্দোলনে কমিউনিস্ট প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকলে ব্রিটিশরা বিচলিত হয়ে পড়ে। এইরূপ পরিস্থিতি কমিউনিস্ট তৎপরতা দমনের উদ্দেশ্যে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কমিউনিস্ট নেতাদের গ্রেপ্তার করে ৩২জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা রুজু করা হয়—যা মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা বলে খ্যাত। সাড়ে চার বছর ব্যাপী এই মামলা চলার পর ২৭ জনের দীর্ঘমেয়াদি দন্ডাদেশ দেওয়া হয়।

কমিউনিস্টদের অগ্রগতি – কমিউনিস্টদের অন্তর্দন্দ্ব, মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা, কমিউনিস্ট আন্দোলনকে খানিকটা পিছিয়ে দেয়। কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হয়। তবে সপ্তম কমিন্টার্নের নির্দেশে ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলন বেশ উজ্জীবিত হয়। এই সময় জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্রের মতো সমাজতন্ত্রী নেতার আবির্ভাব এবং কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে নির্বাচন কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথ মসৃণ হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট প্রসার – বিশ শতকে ত্রিশের দশকে শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনগুলি বামপন্থী ঘেঁষা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলা ও বিহারে কৃষক আন্দোলনে কমিউনিস্টরা সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে কমিউনিস্ট দল যুদ্ধ বিরোধী জঙ্গী আন্দোলন শুরু করে। ইতিমধ্যে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে কমিউনিস্টদলের ওপর বেআইনি তকমা তুলে নেওয়া হয় এবং কমিউনিস্ট জাতীয় আন্দোলনে চরিত্র বদল করে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যুদ্ধকে জনযুদ্ধ আখ্যা দিয়ে ব্রিটিশদের প্রতি সহযোগিতার নীতি নেয়। এই সময় থেকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রমিক-কৃষক ছাত্র প্রভৃতি কমিউনিস্ট গণসংগঠনগুলি ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে।

মূল্যায়ণ – ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি আত্মপ্রকাশ করলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এই দল কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে নি। এর অন্যতম কারণ ছিল—ভারতীয় পরিস্থিতির সঙ্গে রাশিয়ার ফারাক। তবুও নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যে এই দল ভারতের আপামর জনমানসে ছাপ ফেলাতে পেরেছিল— এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

বিশ শতকের ভারতে কৃষক, শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলনগুলি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পাশাপাশি ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই আন্দোলনগুলির মাধ্যমে ভারতের জনগণ তাদের অধিকার ও দাবিদাওয়ার জন্য সংগ্রাম করে এবং ভারতের একটি নতুন সমাজ গড়ে তোলার পথে অগ্রসর হয়।

Rate this post


Join WhatsApp Channel For Free Study Meterial Join Now
Join Telegram Channel Free Study Meterial Join Now

মন্তব্য করুন