নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – সালোকসংশ্লেষ – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

Rahul

এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর উপবিভাগ ‘উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা’ -এর অন্তর্গত ‘সালোকসংশ্লেষ’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত

জৈবনিক প্রক্রিয়া-উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা-সালোকসংশ্লেষ-নবম শ্রেণী-জীবনবিজ্ঞান
Contents Show

সালোকসংশ্লেষ কাকে বলে? সালোকসংশ্লেষ কোথায় ও কখন হয়? সালোকসংশ্লেষের সমীকরণটি লেখো।

সালোকসংশ্লেষ (Photosynthesis; Photos = আলোক, synthesis = সংশ্লেষ) –

যে শারীরবৃত্তীয় উপচিতিমূলক প্রক্রিয়ায় ক্লোরোফিলযুক্ত উদ্ভিদকোশে সূর্যালোকের উপস্থিতিতে পরিবেশ থেকে গৃহীত জল ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সরল শর্করাজাতীয় খাদ্য উৎপন্ন হয়, উৎপন্ন খাদ্যে সৌরশক্তির আবদ্ধকরণ ঘটে এবং উপজাত বস্তুরূপে পরিবেশে অক্সিজেন নির্গত হয়, তাকে সালোকসংশ্লেষ বলে।

সালোকসংশ্লেষের স্থান –

জীবদেহের সমস্ত ক্লোরোফিলযুক্ত কোশে সালোকসংশ্লেষ ঘটে। যেমন –

  1. সবুজ উদ্ভিদ দেহাংশ – পাতা, বৃতি, বৃত্ত, সবুজ কাণ্ড প্রভৃতি।
  2. ব্যাকটেরিয়া কোশ – ক্লোরোবিয়াম, ক্রোমাটিয়াম প্রভৃতি।
  3. প্রোটিস্টান কোশ – ইউগ্লিনা, ক্রাইস্যামিবা, নক্টিলিউকা, জিমনোডিনিয়াম প্রভৃতি।

সালোকসংশ্লেষের সময় –

সালোকসংশ্লেষ কেবলমাত্র দিনের বেলায় (সূর্যালোকের উপস্থিতিতে) সম্পন্ন হয়। (উপযুক্ত তীব্রতা ও তরঙ্গদৈর্ঘ্যযুক্ত [390-760 nm] কৃত্রিম আলোতেও সালোকসংশ্লেষ ঘটতে পারে) 

সালোকসংশ্লেষের সমীকরণ –

6CO2কার্বন ডাইঅক্সাইড+12H2Oজলক্লোরোফিলসূর্যালোকC6H12O6শর্করা+6H2Oজল+6O2অক্সিজেন
সালোকসংশ্লেষের উপাদানের উৎস
সালোকসংশ্লেষের উপাদানের উৎস

সালোকসংশ্লেষের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি কী কী? প্রতিটি উপাদানের উৎস ও ভূমিকা সংক্ষেপে ছকের সাহায্যে উল্লেখ করো।

সালোকসংশ্লেষের উপাদান –

  • জল (H2O)।
  • কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2)।
  • সূর্যালোক (ফোটন কণা)।
  • ক্লোরোফিল।

উপাদানগুলির উৎস ও ভূমিকা –

উপাদানউৎসভূমিকা
জল (H2O)মাটির কৈশিক জল, জলাশয়ের জল এবং বায়ুমন্ডলের জলীয় বাষ্প।[1] অক্সিজেনের উৎস রূপে ব্যবহৃত হয়।

[2] ক্লোরোফিলকে ইলেকট্রন দান করে।

[3] গ্লুকোজ উৎপাদনে সাহায্য করে।
কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2)বায়ুর CO2, জলে দ্রবীভূত কার্বনেট, বাইকার্বনেট লবণ।গ্লুকোজ অণুর কার্বন ও অক্সিজেনের উৎসরূপে কাজ করে।
ক্লোরোফিলসবুজ কোশের ক্লোরোপ্লাস্টের গ্রাণা অংশ।[1] সূর্যালোকের ফোটন কণা আবদ্ধকরণ।

[2] সৌরশক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে।

[3] জলকে H+ ও OH আয়নে বিশ্লিষ্ট করে।
সূর্যালোকসূর্য[1] ক্লোরোফিলকে সক্রিয়করণ।

[2] ফসফোরাইলেশনের মাধ্যমে ATP উৎপাদন।

সালোকসংশ্লেষের আলোকদশা কাকে বলে? প্রক্রিয়াটি সংক্ষেপে আলোচনা করো।

অনুরূপ প্রশ্ন, সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতির আলোকদশার বিক্রিয়াগুলির বর্ণনা দাও।

আলোকদশা (Light Phase) – সালোকসংশ্লেষের প্রথম পর্যায়ে ক্লোরোপ্লাস্টের গ্রাণা অংশে সূর্যালোকের উপস্থিতিতে এবং ক্লোরোফিলের সক্রিয়তায় জলের আয়নীকরণ, অক্সিজেন (O2) উৎপাদন, NADPH গঠন ও ATP সংশ্লেষের প্রক্রিয়াকে সামগ্রিকভাবে আলোকদশা বলে।

আলোকদশার বিক্রিয়াসমূহ –

ক্লোরোফিলের উত্তেজিতকরণ (Excitation of Chlorophyll) – ক্লোরোফিল সূর্যালোকের ফোটন কণা শোষণ করে উত্তেজিত ও সক্রিয় হয়ে ওঠে।

ক্লোরোফিলa(স্থিতাবস্থা)+hν (সূর্যালোকের ফোটনকণা)ক্লোরোফিলa(সক্রিয় ক্লোরোফিল)+e(উত্তেজিত ইলেকট্রন)

জলের ফোটোলাইসিস (Photolysis of water) – সূর্যালোকের উপস্থিতিতে সক্রিয় ক্লোরোফিল জলকে হাইড্রোজেন আয়ন (H+) ও হাইড্রক্সিল আয়নে (OH) বিশ্লিষ্ট করে।

2H2Oসক্রিয় ক্লোরোফিলসূর্যালোক2H++2OH

বিজারিত NADP গঠন (Formation of NADPH) – জলের বিশ্লেষণের ফলে উৎপন্ন হাইড্রোজেন আয়ন (H+) পাতায় উপস্থিত NADP+ -এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে NADPH + H+ গঠন করে।

NADP+ + 2H+ + 2e → NADPH + H+

অক্সিজেন নির্গমন (Release of Oxygen) – জলের বিশ্লেষণের ফলে উৎপন্ন হাইড্রক্সিল আয়ন (OH) ইলেকট্রন ত্যাগ করে [OH] মূলকে পরিণত হয়। চারটি [OH] মূলক পরস্পর যুক্ত হয়ে 2 অণু জল ও 1 অণু অক্সিজেন উৎপন্ন করে। উৎপন্ন অক্সিজেন পরিবেশে নির্গত হয়।

4(OH) – 4e → 4[OH] → 2H2O2 → 2H2O + O2

আলোকফসফোরিভবন (Photophosphorylation) – পাতায় উপস্থিত ADP এবং অজৈব ফসফেট (Pi) সূর্যালোকের উপস্থিতিতে উচ্চশক্তিধর যৌগ ATP উৎপাদন করে। এই ঘটনাকে আলোকফসফোরিভবন বা ফোটোসিন্থেটিক ফসফোরাইলেশন বলে।

ADP+অজৈব ফসফেট(Pi)শক্তিসূর্যালোকATP

সালোকসংশ্লেষের আলোকদশার সংক্ষিপ্ত রেখাচিত্র

সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় যে অক্সিজেন নির্গত হয় তা একটি পরীক্ষার সাহায্যে দেখাও।

সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় যে অক্সিজেন নির্গত হয় তা নিম্নোক্ত পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করা যায় –

  • উপকরণ – একটি বিকার, একটি ফানেল, একটি টেস্টটিউব, জল, সোডিয়াম বাইকার্বনেট, পটাশিয়াম পাইরোগ্যালেট দ্রবণ, সজীব হাইড্রিলা উদ্ভিদ।
  • পরীক্ষা পদ্ধতি – সজীব হাইড্রিলা উদ্ভিদগুলিকে বিকারের তলদেশে এমনভাবে রাখা হল যাতে উদ্ভিদগুলির কাটা প্রান্তগুলি ওপরের দিকে থাকে। বিকারটির অংশ সোডিয়াম বাইকার্বনেট মিশ্রিত জল দিয়ে পূরণ করা হল। ফানেলটিকে উদ্ভিদগুলির ওপর ঢেকে দেওয়া হল। এরপর একটি জলপূর্ণ টেস্টটিউব ফানেলের সরু প্রান্তটির ওপর সাবধানে রাখা হল যাতে টেস্টটিউবের জল পড়ে না যায়। সমগ্র পরীক্ষা ব্যবস্থাটিকে সূর্যালোকে রাখা হল।
  • পর্যবেক্ষণ – কয়েক ঘণ্টা পর দেখা গেল, হাইড্রিলার কাটা প্রান্ত থেকে ছোটো ছোটো বুদ্বুদ উঠছে ও টেস্টটিউবের জলতল আস্তে আস্তে নেমে যাচ্ছে। টেস্টটিউবে জমা গ্যাসটি শনাক্ত করার জন্য জলে ক্ষারীয় পটাশিয়াম পাইরোগ্যালেট দ্রবণ যোগ করা হল। টেস্টটিউবটি পুনরায় জলপূর্ণ হল এবং দ্রবণটি কালো বর্ণের হয়ে গেল।
  • ব্যাখ্যা – ক্ষারীয় পটাশিয়াম পাইরোগ্যালেট O2 শোষণ করে। সুতরাং, টেস্টটিউবে জমা গ্যাসটি অক্সিজেন যা হাইড্রিলার সালোকসংশ্লেষের প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হয় ও টেস্টটিউবে জলের নিম্ন অপসারণ দ্বারা জমা হয়।
  • সিদ্ধান্ত – সবুজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষের সময় অক্সিজেন গ্যাস (O2) নির্গত করে।
সালোকসংশ্লেষের সময়ে অক্সিজেন গ্যাস নির্গমনের পরীক্ষা

সালোকসংশ্লেষে আলোর প্রয়োজনীয়তা হয় তা একটি পরীক্ষার সাহায্যে দেখাও।

সালোকসংশ্লেষে আলোর প্রয়োজনীয়তা পরীক্ষা –

  • উপকরণ – টবসহ তাজা গাছ, কালো ফিতে, অ্যালকোহল, লঘু আয়োডিন দ্রবণ।
  • পরীক্ষা পদ্ধতি –
    1. টবসহ একটি তাজা গাছ নেওয়া হল।
    2. গাছটির একটি পাতার কিছুটা অংশের দুপাশ কালো ফিতে দিয়ে ঢেকে দেওয়া হল। গাছটিকে সারাদিন সূর্যালোকে রাখা হল।
    3. কালো ফিতে ঢাকা পাতাটির ফিতে সরিয়ে পাতাটিকে প্রথমে গরম অ্যালকোহলে ডোবানো হল, এরপর লঘু আয়োডিন দ্রবণে ডোবানো হল।
  • পর্যবেক্ষণ – গরম অ্যালকোহলে ডোবানোর ফলে ক্লোরোফিল দ্রবীভূত হবে। এরপর আয়োডিন দ্রবণে ডোবালে দেখা যাবে কালো ফিতে ঢাকা অংশটি আয়োডিনের বর্ণ ধারণ করেছে অর্থাৎ, ওই অংশে শ্বেতসার তৈরি হয়নি। পাতার বাকি অংশটি নীল বর্ণ ধারণ করেছে অর্থাৎ, ওই অংশে শ্বেতসার উৎপন্ন হয়েছে। শ্বেতসার আয়োডিনের সংস্পর্শে নীল বর্ণ ধারণ করে।
  • সিদ্ধান্ত – এই পরীক্ষা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, সালোকসংশ্লেষের জন্য আলো একটি অপরিহার্য উপাদান।
সালোকসংশ্লেষে আলোর প্রয়োজনীয়তার পরীক্ষা

সালোকসংশ্লেষের অন্ধকারদশা কাকে বলে? অন্ধকার দশার বিক্রিয়াগুলি সম্পর্কে ধারণা দাও।

অনুরূপ প্রশ্ন, সালোকসংশ্লেষের আলোক নিরপেক্ষ দশা ছকের সাহায্যে লেখো।
অথবা, কেলভিন চক্রটি চার্ট আকারে লেখো।
অথবা, সালোকসংশ্লেষের আলোক নিরপেক্ষ দশায় CO2 -এর স্থিতিকরণ কীভাবে ঘটে তা ব্যাখ্যা করো।

অন্ধকারদশা (Dark Phase Reaction) – সালোকসংশ্লেষের দ্বিতীয় পর্যায়ে ক্লোরোপ্লাস্টের স্ট্রোমা অংশে উৎসেচকের সাহায্যে অঙ্গার আত্তীকরণ ও গ্লুকোজ উৎপাদনের সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে একত্রে অন্ধকারদশা বলে।

অন্ধকারদশার বিক্রিয়াসমূহ –

অঙ্গার আত্তীকরণ (Carbon Assimilation or Carboxylation) – বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2) রাইবিউলোজ বিসফসফেট কার্বোক্সিলেজ উৎসেচকের (RuBisCO) সহায়তায় পাতায় উপস্থিত RuBP -এর সঙ্গে বিক্রিয়া করে ফসফোগ্লিসারিক অ্যাসিড (PGA) উৎপন্ন করে। এই ঘটনাকে অঙ্গার আত্তীকরণ বলে।

6CO2+6RuBPRuBisCO12PGA

ফসফোগ্লিসার‍্যালডিহাইড উৎপাদন (Formation of PGAId) – আলোকদশায় উৎপন্ন আত্তীকৃত শক্তি NADPH + H+ ও ATP, PGA (ফসফোগ্লিসারিক অ্যাসিড) -এর সঙ্গে বিক্রিয়া করে ফসফোগ্লিসার‍্যালডিহাইড (PGAld) সংশ্লেষ করে।

12PGA + 12 (NADPH + H+) + 18 ATP → 12PGAld + 12 NADP+ + 18ADP + 18Pi

গ্লুকোজ উৎপাদন (Formation of Glucose) – 2 অণু PGAId কয়েকটি অন্তর্বর্তী যৌগ গঠনের মাধ্যমে 1 অণু গ্লুকোজ উৎপন্ন করে।

2PGAldউৎসেচকDHAPউৎসেচকFBPউৎসেচকগ্লুকোজ(C6H12O6)

RuBP -এর পুনরুৎপাদন (Regeneration of RuBP) – 10 অণু PGAId রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পুনরায় 6 অণু RuBP (রাইবিউলোজ বিসফসফেট) উৎপাদন করে।

10 PGAld → RuMP → RuBP (6 অণু)

কেলভিন চক্রের রেখাচিত্র

কেলভিন চক্রের বিক্রিয়কসমূহ, শক্তি সরবরাহকারী জৈব অণু, উৎপন্ন পদার্থের নাম লেখো।

কেলভিন চক্রের বিক্রিয়ক সমূহ –

  1. CO2 (কার্বন ডাই অক্সাইড)।
  2. RuBP (রাইবিউলোজ বিস ফসফেট)।
  3. কিছু উৎসেচক বিক্রিয়া ঘটাতে সাহায্য করে, যেমন – RuBisCO (রাইবিউলোজ বিস ফসফেট কার্বক্সিলেজ), কাইনেজ, আইসোমারেজ, অ্যালডোলেজ বিসফসফাটেজ, ফসফাটেজ প্রভৃতি।

শক্তি সরবরাহকারী জৈব অণু –

  1. ATP (অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট)।
  2. NADPH (বিজারিত নিকোটিনামাইড অ্যাডিনাইন ডাইনিউক্লিওটাইড ফসফেট)।

উৎপন্ন পদার্থ সমূহ –

  1. PGA (ফসফোগ্লিসারিক অ্যাসিড)।
  2. PGAld (ফসফোগ্লিসারালডিহাইড)।
  3. DHAP (ডাই হাইড্রক্সি অ্যাসিটোন ফসফেট)।
  4. RuMP (রাইবিউলোজ মনোফসফেট)।
  5. RuBP (রাইবিউলোজ বিসফসফেট)।
  6. কিছু অন্তর্বর্তী যৌগসমূহ।

6CO2+_ক্লোরোফিলসূর্যালোক_+6O2+6H2O বিক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করো। সম্পূর্ণ বিক্রিয়াটি কোন্ প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে? এই সমীকরণ থেকে তুমি কোন্ কোন্ বিষয়গুলি জানতে পারো?

সম্পূর্ণ বিক্রিয়া –

6CO2+12H2O_ক্লোরোফিলসূর্যালোকC2H12O6_+6O2+6H2O

সম্পূর্ণ বিক্রিয়াটি সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে।

সমীকরণ থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি জানা যায় –

  1. 6 অণু CO2, 12 অণু H2O -এর সঙ্গে বিক্রিয়া করে 1 অণু গ্লুকোজ, 6 অণু অক্সিজেন ও 6 অণু জল উৎপন্ন করে।
  2. প্রক্রিয়াটি সূর্যালোকের উপস্থিতিতে ক্লোরোফিলের সাহায্যে ঘটে।
  3. গৃহীত কার্বন ডাইঅক্সাইডের (6CO2) সমপরিমাণ অক্সিজেন (6O2) বর্জিত হয়।
  4. এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন অক্সিজেন বাতাসে নির্গত হয়।
  5. এই প্রক্রিয়ায় H2O জারিত হয়ে O2 উৎপন্ন করে এবং CO2 বিজারিত হয়ে গ্লুকোজ উৎপন্ন করে।

জীবজগতে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার তাৎপর্য বা গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তাগুলি আলোচনা করো।

জীবজগতে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার তাৎপর্য বা গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা –

  1. খাদ্য উৎপাদন – সবুজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় শর্করাজাতীয় খাদ্য উৎপন্ন করে। গ্লুকোজ থেকেই উদ্ভিদদেহে প্রোটিন, ফ্যাট প্রভৃতি সংশ্লেষিত হয়। প্রাণীজগৎ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল।
  2. শক্তির উৎস – সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় সৌরশক্তি খাদ্যের মধ্যে স্থিতিশক্তিরূপে আবদ্ধ হয়। এই শক্তিই সমস্ত জীবজগতে শক্তির উৎসরূপে কাজ করে।
  3. পরিবেশে O2 – CO2 ভারসাম্য রক্ষা – সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় সবুজ উদ্ভিদ CO2 গ্রহণ করে এবং গৃহীত CO2 -এর সমপরিমাণ O2 বাতাসে বর্জন করে। শ্বসনকালে জীব পরিবেশ থেকে O2 গ্রহণ করে ও গৃহীত O2 -এর সমপরিমাণ CO2 বাতাসে ত্যাগ করে। অর্থাৎ, সালোকসংশ্লেষ ও শ্বসন উভয় বিক্রিয়ার মাধ্যমেই বায়ুমণ্ডলে O2 – CO2 ভারসাম্য রক্ষিত হয়।
  4. জ্বালানির উৎস – জীবজগতে জীবাশ্ম জ্বালানির (কয়লা ও পেট্রোলিয়াম) উৎস হল সালোকসংশ্লেষ।
  5. মানবসভ্যতার বিকাশে সালোকসংশ্লেষ – মানবকল্যাণে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী (যেমন – বস্ত্র, কাগজ, গঁদ, ওষুধ প্রভৃতি) সালোকসংশ্লেষের অবদান।

সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় বাহ্যিক শর্তগুলি আলোচনা করো।

সালোকসংশ্লেষের হার কতকগুলি বাহ্যিক প্রভাবক বা শর্তের ওপর নির্ভরশীল, সেগুলি হল –

  1. আলোক – আলোর ধর্ম, প্রকৃতি এবং স্থিতিকাল সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। আলোকের অতি তীব্রতায় সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। আবার আলোক বর্ণালির লাল আলোতে সালোকসংশ্লেষের হার বেশি হয়। ক্লোরোফিলের সক্রিয়তা এবং ফটোফসফোরাইলেশন প্রক্রিয়ার জন্য আলো একান্তই প্রয়োজনীয়। তাই আলো ছাড়া সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া হওয়া সম্ভব নয়।
  2. জল – জল ছাড়া সালোকসংশ্লেষ সম্ভব নয়। জলের পরিমাণ কমে গেলে জলের অভাবে উদ্ভিদের পাতার পত্ররন্ধ্রগুলির এবং রক্ষীকোশগুলির কর্মক্ষমতা হ্রাস পায় ফলে প্রক্রিয়াটি বিঘ্নিত হয়।
  3. কার্বন ডাইঅক্সাইডের ঘনত্ব – বায়ুমণ্ডলের CO2 -এর পরিমাণ শতকরা 0.01 বৃদ্ধিতে সালোকসংশ্লেষের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। আবার CO2 -এর পরিমাণ অতিরিক্ত হারে বেড়ে গেলে কোশের প্রোটোপ্লাজম বিষাক্ত হয় ফলে প্রক্রিয়াটি বন্ধ হয়।
  4. অক্সিজেনের ঘনত্ব – অক্সিজেন ঘনত্বের তারতম্যর ওপরও সালোকসংশ্লেষ নির্ভরশীল থাকে। অক্সিজেনের ঘনত্ব বেশি হলে উদ্ভিদের কোশস্থিত উৎসেচকগুলির ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং সালোকসংশ্লেষের হার কমে যায়।
  5. উষ্ণতা – সালোকসংশ্লেষের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহ্যিক শর্ত হল উন্নতা বা তাপমাত্রা। সাধারণত 25–35°C তাপমাত্রায় সালোকসংশ্লেষ ভালো হয়, কিন্তু তাপমাত্রা 40°C কিংবা তার বেশি হলে উৎসেচকের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়, তখন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়।
  6. রাসায়নিক পদার্থসমূহ – ক্লোরোফর্ম, হাইড্রোজেন সালফাইড প্রভৃতি রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতির দরুন সালোকসংশ্লেষের হার হ্রাস পায়।
  7. বয়স – পাতার বয়স বৃদ্ধিতে সালোকসংশ্লেষের হারও কম হয়।

সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ শর্তগুলি আলোচনা করো।

সালোকসংশ্লেষে প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ শর্তগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হল –

  1. ক্লোরোফিল – ক্লোরোফিলের সক্রিয়তার উপরই সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল থাকে। সবুজ ক্লোরোফিলযুক্ত উদ্ভিদ সৌরশক্তি সমৃদ্ধ ফোটন কণা শোষণ করে সমস্ত জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। তাই ক্লোরোফিলের অনুপস্থিতিতে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।
  2. উৎসেচক – উদ্ভিদদেহ অভ্যন্তরস্থ বিভিন্ন উৎসেচকের দ্বারা সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
  3. প্রোটোপ্লাজম – উদ্ভিদের প্রোটোপ্লাজমে বেশি পরিমাণ গ্লুকোজ জমা হলে সালোকসংশ্লেষের হার কমে যায়। আবার প্রোটোপ্লাজমে গ্লুকোজের পরিমাণ কমে গেলে সালোকসংশ্লেষের হার বৃদ্ধি পায়।
  4. পাতার অন্তর্গঠন – পাতার অন্তর্গঠন, মেসোফিল কলার গঠনের ওপর সামগ্রিকভাবে সালোকসংশ্লেষ নির্ভরশীল থাকে।
  5. পত্ররন্ধ্র – পত্ররন্ধ্রের সংখ্যা ও আকারের ওপর সালোকসংশ্লেষের হার নির্ভরশীল থাকে। পত্ররন্ধ্রের সংখ্যা ও আকার বেশি থাকলে সালোকসংশ্লেষের হার বাড়ে, আবার পত্ররন্ধ্রের সংখ্যা কম হলে এবং এদের আকার ছোটো হলে সালোকসংশ্লেষের হার কমে যায়।

সালোকসংশ্লেষে কোন্ কোন্ রঞ্জক পদার্থ অংশগ্রহণ করে? রঞ্জক পদার্থগুলি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।

অনুরূপ প্রশ্ন, সালোকসংশ্লেষে রঞ্জক পদার্থের ভূমিকা উল্লেখ করো।

সালোকসংশ্লেষে অংশগ্রহণকারী রঞ্জক পদার্থগুলি হল –

  1. ক্লোরোফিল।
  2. ক্যারোটিনয়েড।
  3. ফাইকোবিলিন।

ক্লোরোফিল (Chlorophyll) –

সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় সবুজ রঙের যে রঞ্জক পদার্থ উচ্চশক্তি সম্পন্ন ফোটনকণা শোষণ করে প্রক্রিয়াটিকে চালনা করে, তাকে ক্লোরোফিল বলে।

প্রকারভেদ – উচ্চতর উদ্ভিদদেহে ক্লোরোফিল-a (C55H72O5N4Mg) ও ক্লোরোফিল-b (C55H70O6N4Mg) পাওয়া যায়। এছাড়াও ক্লোরোফিল-c, ক্লোরোফিল-d ও ক্লোরোফিল-e ও পাওয়া যায়। এদের মধ্যে ক্লোরোফিল-a হল প্রধান সালোকসংশ্লেষীয় রঞ্জক।

কাজ – ক্লোরোফিল সৌরশক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে পরিণত করে এবং জলকে হাইড্রোজেন আয়ন ও হাইড্রক্সিল আয়নে বিশ্লিষ্ট করে।

ক্যারোটিনয়েড (Carotenoids) –

উদ্ভিদের প্রায় সমস্ত অংশে যে হলুদ, কমলা, বাদামি প্রভৃতি সাহায্যকারী রঞ্জকগুলি উপস্থিত থাকে, তাদের একত্রে ক্যারোটিনয়েড বলে।

প্রকারভেদ – ক্যারোটিনয়েড প্রধানত দুপ্রকার। যথা – ক্যারোটিন ও জ্যান্থোফিল।

কাজ –

  • ক্যারোটিনয়েড সূর্যালোকের 400-500 nm -এর বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্যযুক্ত আলোকরশ্মি শোষণ করে ক্লোরোফিল-a অণুতে পাঠায়।
  • ক্যারোটিনয়েড ক্লোরোফিলকে আলোকজারণের হাত থেকে রক্ষা করে।

ফাইকোবিলিন (Phycobillin) –

শৈবালদেহে উপস্থিত লাল ও নীল রঙের সাহায্যকারী রঞ্জক পদার্থকে ফাইকোবিলিন বলে।

প্রকারভেদ – ফাইকোবিলিন প্রধানত দুপ্রকার। যথা – ফাইকোএরিথ্রিন (লাল) ও ফাইকোসায়ানিন (নীল)।

কাজ – ফাইকোবিলিন 500 600 nm তরঙ্গদৈর্ঘ্যযুক্ত আলোকের ফোটন কণাকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে শোষণ করে এবং শোষিত শক্তি ক্লোরোফিল-a অণুতে স্থানান্তরিত করে।

ফোটোফসফোরাইলেশন বা আলোকফসফোরিভবন বলতে কী বোঝো? পদ্ধতিটির সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।

আলোকফসফোরিভবন (Photophosphorylation) – যে পদ্ধতিতে সূর্যালোকের উপস্থিতিতে ক্লোরোফিল যুক্ত কোশে ADP (অ্যাডিনোসিন ডাইফসফেট) ও Pi (অজৈব ফসফেট) -এর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ATP (অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট) উৎপন্ন হয়, তাকে আলোকফসফোরিভবন বা ফোটোফসফোরাইলেশন বলে।

ADP+Piসূর্যালোকATP(উচ্চ শক্তিধর জৈবযৌগ)

আলোকফসফোরিভবন পদ্ধতি –

আলোকফসফোরিভবন বা ATP উৎপাদন দুভাবে ঘটে। যথা –

  • আবর্তাকার আলোকফসফোরিভবন (Cyclic Photophosphorylation)।
  • অনাবর্তাকার আলোকফসফোরিভবন (Non Cyclic Photophosphorylation)।
  1. আবর্তাকার আলোকফসফোরিভবন (Cyclic Photophosphorylatoin) – সূর্যালোকের উপস্থিতিতে উত্তেজিত ক্লোরোফিল (P700) থেকে নির্গত ইলেকট্রন (23 Kcal/mole যুক্ত) বিভিন্ন ইলেকট্রন বাহকের মাধ্যমে বাহিত হয়ে পুনরায় ক্লোরোফিল (P700) অণুতে ফিরে আসে এবং চক্রাকার আবর্তন পথে ইলেকট্রন নির্গত শক্তির সাহায্যে ATP উৎপাদন ঘটে। এই ঘটনাকে আবর্তাকার ফোটোফসফোরাইলেশন বলে।
  2. অনাবর্তাকার আলোকফসফোরিভবন (Non Cyclic Photophosphorylation) – দুটি পৃথক রঞ্জকতন্ত্রের বিক্রিয়াকেন্দ্র গঠনকারী দুপ্রকার ক্লোরোফিল-a অণু (P700 ও P680) থেকে আলোক তাড়িত ইলেকট্রন দুটি ভিন্ন লক্ষ্যে বিভিন্ন বাহকের দ্বারা অচক্রাকার পথে পরিবাহিত হওয়ার সময় যে পদ্ধতিতে ATP সংশ্লেষ করে, তাকে অনাবর্তাকার ফোটোফসফোরাইলেশন বলে।
ফোটোফসফোরাইলেশন বা আলোকফসফোরিভবন বলতে কী বোঝো

পাতাকে উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষের প্রধান স্থানরূপে গণ্য করা হয় কেন?

পাতাকে উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষের প্রধান স্থানরূপে গণ্য করার কারণগুলি হল –

  1. পত্রফলক – পাতার পত্রফলক চ্যাপটা ও প্রসারিত হওয়ায় সর্বাধিক পরিমাণ সূর্যালোক শোষণ করতে পারে।
  2. ক্লোরোফিলের উপস্থিতি – পাতার মেসোফিল কলাকোশে প্রচুর সংখ্যায় ক্লোরোপ্লাস্ট উপস্থিত থাকে। এই সমস্ত ক্লোরোপ্লাস্টে বর্তমান ক্লোরোফিল পর্যাপ্ত সূর্যালোক শোষণ করে।
  3. পত্ররন্ধ্র – পত্রত্বকে উপস্থিত অসংখ্য পত্ররন্ধ্রের মাধ্যমে সহজেই CO2 গ্রহণ ও O2 বর্জন ঘটে।
  4. সংবহনকলা – পাতার অসংখ্য শিরা-উপশিরায় উপস্থিত জাইলেম ও ফ্লোয়েমকলা যথাক্রমে জল সরবরাহে এবং খাদ্য অপসারণে সাহায্য করে।
  5. মেসোফিল কলা – আলগাভাবে বিন্যস্ত মেসোফিল কলা কোশের মাঝে উপস্থিত বায়ুপূর্ণ স্থানগুলি গ্যাসীয় আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মেসোফিল কলা কাকে বলে? এই কলার বৈশিষ্ট্য কী? সালোকসংশ্লেষে এর ভূমিকা লেখো।

  • মেসোফিল কলা – পাতার ঊর্ধ্বত্বক ও নিম্নত্বকের অন্তর্বর্তী স্থানে অবস্থিত আদি কলাতন্ত্রকে মেসোফিল কলা বলে।
  • মেসোফিল কলার বৈশিষ্ট্য –
    1. মেসোফিল কলা প্যারেনকাইমা কলাকোশ (প্যালিসেড ও স্পঞ্জি) দ্বারা গঠিত।
    2. প্যালিসেড ও স্পঞ্জি = প্যারেনকাইমা ক্লোরোপ্লাস্ট ও ক্লোরোফিল সমৃদ্ধ হয়।
  • সালোকসংশ্লেষে মেসোফিল কলার ভূমিকা – মেসোফিল কলা ক্লোরোফিল সমৃদ্ধ বলে এই সমস্ত কলাকোশে সালোকসংশ্লেষের হার সবথেকে বেশি।
মেসোফিল কলা কাকে বলে
মেসোফিল কলা কাকে বলে

সালোকসংশ্লেষে ক্লোরোফিলের উৎস ও ভূমিকা ব্যাখ্যা করো।

ক্লোরোফিলের উৎস –

  1. উদ্ভিদকোশে ক্লোরোপ্লাস্টের গ্রাণাতে অবস্থিত থাইলাকয়েডের পর্দাস্থিত কোয়ান্টোজোম দানায় ক্লোরোফিল অণু উপস্থিত থাকে।
  2. একটি কোয়ান্টোজোম দানায় প্রায় 250 ক্লোরোফিল অণু বর্তমান থাকে।

ক্লোরোফিলের ভূমিকা –

সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় ক্লোরোফিল সূর্যালোকের অদৃশ্য ফোটন কণা শোষণ করে উত্তেজিত হয় এবং জলকে হাইড্রোজেন আয়ন (H+) ও হাইড্রক্সিল আয়নে (OH) বিশ্লিষ্ট করে।

H2Oসক্রিয় ক্লোরোফিলসূর্যালোকH++OH

উত্তেজিত ক্লোরোফিল থেকে নির্গত উচ্চ শক্তিযুক্ত ইলেকট্রনের (e) উপস্থিতিতে ADP ও Pi -এর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়। অর্থাৎ সৌরশক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই শক্তিই খাদ্যে অঙ্গীভূত হয়।

ADP+PieATPখাদ্যে আবদ্ধকরণ

সালোকসংশ্লেষে সূর্যালোকের উৎস ও ভূমিকা উল্লেখ করো।

সূর্যালোকের উৎস –

  1. সূর্যালোকের উৎস হল সূর্য। সূর্য থেকে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গরূপে উচ্চশক্তিসম্পন্ন ফোটন কণা পৃথিবীতে আসে।
  2. দৃশ্যমান আলোকরশ্মির নীলবেগুনি অংশ (390-470 nm) ও লাল অংশে (660-760 nm) সালোকসংশ্লেষের হার সবচেয়ে বেশি হয়। এজন্য আলোক বর্ণালির এই অংশকে সালোকসংশ্লেষের কার্যবর্ণালি (Action Spectrum) বলে।

সূর্যালোকের ভূমিকা –

  1. ক্লোরোফিল সক্রিয় করা।
  2. সক্রিয় ক্লোরোফিল জলকে H+ ও OH আয়নে বিশ্লিষ্ট করে।
  3. সূর্যালোক থেকে আগত শক্তি ফটোফসফোরাইলেশনের মাধ্যমে ATP অণুতে রাসায়নিক শক্তিরূপে আবদ্ধ হয়।

সালোকসংশ্লেষে ব্যবহৃত কাঁচামাল হিসেবে জলের উৎস ও ভূমিকা আলোচনা করো।

জলের উৎস –

  • স্থলজ উদ্ভিদ মাটি থেকে কৈশিক জল শোষণ করে।
  • জলজ উদ্ভিদ পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে জল সংগ্রহ করে।
  • পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প শোষণ করে।

সালোকসংশ্লেষে জলের ভূমিকা –

সালোকসংশ্লেষে উৎপন্ন গ্লুকোজে যে হাইড্রোজেন উপস্থিত থাকে তার উৎস হল জল। এক অণু গ্লুকোজ উৎপাদনের জন্য 12 অণু জল প্রয়োজন হয়।

6CO2+12H2Oক্লোরোফিলসূর্যালোকC6H12O6+6O2+6H2O

জল ক্লোরোফিলকে ইলেকট্রন দান করে। ফলে, উত্তেজিত ক্লোরোফিল স্থিতাবস্থায় আসে।

CO2 -কে বিজারিত করে শর্করা জাতীয় খাদ্য উৎপাদনের সময় যে হাইড্রোজেন প্রয়োজন হয় তা জলের আলোক বিশ্লেষণে উৎপন্ন হয়।

H2Oসক্রিয় ক্লোরোফিলসূর্যালোকH++OH

জলের আলোক বিশ্লেষণের ফলে উৎপন্ন OH থেকে পুনরায় জল ও অক্সিজেন উপজাত বস্তু রূপে উৎপন্ন হয়। ফলে, বাতাসে O2 ও CO2 ভারসাম্য বজায় থাকে।

4[OH]2H2O+O2

সালোকসংশ্লেষে ব্যবহৃত কাঁচামাল হিসেবে কার্বন ডাইঅক্সাইডের উৎস ও ভূমিকা আলোচনা করো।

কার্বন ডাইঅক্সাইডের উৎস –

  1. স্থলজ, জলে ভাসমান উদ্ভিদ বাতাস থেকে CO2 শোষণ করে।
  2. জলজ উদ্ভিদ জল থেকে জলে দ্রবীভূত কার্বনেট, বাইকার্বনেট লবণ শোষণ করে।

সালোকসংশ্লেষে কার্বন ডাইঅক্সাইডের ভূমিকা –

  1. সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় CO2 বিজারিত হয়ে গ্লুকোজ (C6H12O6) উৎপন্ন করে। 1 অণু গ্লুকোজ উৎপাদনের জন্য 6 অণু কার্বন ডাইঅক্সাইডের প্রয়োজন হয়।
  2. গ্লুকোজ অণুর মধ্যস্থিত কার্বন (C) ও অক্সিজেন (O) -এর উৎসরূপে কাজ করে।

রঞ্জকতন্ত্র কাকে বলে? সালোকসংশ্লেষে রঞ্জকতন্ত্রের ভূমিকা কী?

রঞ্জকতন্ত্র (Pigment System বা PS) –

সালোকসংশ্লেষের আলোক দশায় অংশগ্রহণকারী ক্লোরোপ্লাস্টের থাইলাকায়েড পর্দায় উপস্থিত ক্লোরোফিল, ক্যারোটিনয়েড, প্রোটিন প্রভৃতি মিলিত হয়ে যে জটিল তন্ত্র গঠন করে, তাকে রঞ্জকতন্ত্র বলে।

রঞ্জকতন্ত্রের ভূমিকা –

  1. উদ্ভিদদেহে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় প্রধানত দুটি রঞ্জকতন্ত্র অংশ গ্রহণ করে। যথা – রঞ্জকতন্ত্র-। বা PS। এবং রঞ্জকতন্ত্র II বা PS II।
  2. PS। ও PS II -এর কেন্দ্রে উপস্থিত ক্লোরোফিল-a অণু, যথাক্রমে P700 ও P680 সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান দেয় এবং সমগ্র প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে।

সালোকসংশ্লেষে আলোকদশার তাৎপর্যগুলি লেখো।

সালোকসংশ্লেষে আলোকদশার তাৎপর্য –

  1. শক্তির রূপান্তর – ক্লোরোফিল দ্বারা আবদ্ধ সৌরশক্তি ATP -এর মধ্যে রাসায়নিক শক্তিরূপে সঞ্চিত হয়।
  2. অক্সিজেন উৎপাদন – জলের আয়নীকরণের ফলে উৎপন্ন OH আয়ন অক্সিজেনের উৎসরূপে কাজ করে।
  3. আত্তীকৃত শক্তি উৎপাদন – আলোকদশায় আত্তীকৃত শক্তিরূপে (Assimilated Power) NADPH + H+ ও ATP উৎপাদিত হয়। এই শক্তি অন্ধকারদশায় বিজারণ ক্রিয়ার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে সাহায্য করে।

অঙ্গার আত্তীকরণের তাৎপর্যগুলি আলোচনা করো।

অঙ্গার আত্তীকরণের তাৎপর্য –

  1. খাদ্যের উৎস – অঙ্গার আত্তীকরণের মাধ্যমে উদ্ভিদদেহে শর্করাজাতীয় খাদ্য উৎপন্ন হয় ও জীবজগৎ দ্বারা গৃহীত হয়।
  2. শক্তির উৎস – অঙ্গার আত্তীকরণের মাধ্যমে উৎপন্ন খাদ্যে সৌরশক্তি স্থৈতিক শক্তিরূপে আবদ্ধ হয়। জীবদেহে এই খাদ্য শ্বসনকালে জারিত হয়ে গতিশক্তিতে পরিণত হয় ও জীবের শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপে ব্যবহৃত হয়।
  3. পরিবেশদূষণ রোধ – অঙ্গার আত্তীকরণের মাধ্যমে বাতাসের CO2 কোশস্থ যৌগে অঙ্গীভূত হয়। ফলে, পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পায়।

সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন গ্লুকোজের পরিণতি কী?

সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন গ্লুকোজের পরিণতি –

গ্লুকোজের শ্বেতসারে রূপান্তর – দিনেরবেলা উৎসেচকের উপস্থিতিতে গ্লুকোজ জল বিয়োজনের মাধ্যমে অদ্রবণীয় শ্বেতসারে পরিণত হয়।

গ্লুকোজের শ্বেতসারে রূপান্তর
গ্লুকোজের শ্বেতসারে রূপান্তর

আত্তীকৃত শ্বেতসার থেকে গ্লুকোজ সংশ্লেষ – রাত্রিবেলা ডায়াস্টেজ উৎসেচকের সাহায্যে আত্তীকৃত শ্বেতসার পুনরায় তরল, দ্রবণীয় গ্লুকোজে পরিণত হয়।

সালোকসংশ্লেষে উৎপন্ন বিভিন্ন জৈববস্তু
সালোকসংশ্লেষে উৎপন্ন বিভিন্ন জৈববস্তু

গ্লুকোজ বিপাকীয় কাজে ব্যবহৃত হয় এবং উদ্বৃত্ত গ্লুকোজ অদ্রবণীয় শ্বেতসার, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন প্রভৃতি সংশ্লেষের মাধ্যমে উদ্ভিদের মূল, কাণ্ড, পাতা, বীজ প্রভৃতি অঙ্গে সঞ্চিত থাকে।

সালোকসংশ্লেষের আলোকদশা ও অন্ধকারদশার পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ব্যাখ্যা করো।

আলোকদশার ওপর অন্ধকারদশার নির্ভরশীলতা –

  1. আলোকদশায় উৎপন্ন NADPH + H+ অন্ধকারদশায় PGA -কে বিজারিত করে PGAld উৎপন্ন করে।
  2. আলোকদশায় উৎপন্ন ATP অন্ধকার দশায় খাদ্যের মধ্যে স্থৈতিকশক্তি আবদ্ধকরণে ও RuMP -কে RuBP -তে পরিণত হতে সাহায্য করে।

অন্ধকারদশার ওপর আলোকদশার নির্ভরশীলতা –

  1. অন্ধকারদশায় যে NADP+ মুক্ত হয় তা পুনরায় আলোকদশায় হাইড্রোজেন গ্রাহকরূপে ব্যবহৃত হয়।
  2. অন্ধকারদশায় উৎপন্ন ADP ও Pi পুনরায় আলোকদশায় ATP উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
আলোকদশা ও অন্ধকারদশার পারস্পরিক নির্ভরশীলতা
আলোকদশা ও অন্ধকারদশার পারস্পরিক নির্ভরশীলতা

সালোক সংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন O2 -এর উৎস কী? ঘটনাটি ব্যাখ্যা করো।

অনুরূপ প্রশ্ন, আলোকদশায় উৎপন্ন বিজারিত হিল বিকারকের পরিণতি উল্লেখ করো।

সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন O2 -এর উৎস হল জল (H2O)।

O2 উৎপাদন পদ্ধতি –

  1. সূর্যালোকের উপস্থিতিতে সক্রিয় ক্লোরোফিলের সংস্পর্শে জল বিশ্লিষ্ট হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন (H+) ও হাইড্রক্সিল আয়ন (OH) উৎপন্ন করে। একে হিল বিক্রিয়া বলে।
  2. উৎপন্ন হাইড্রক্সিল আয়ন (OH) ইলেকট্রন ত্যাগ করে হাইড্রক্সিল মূলকে [OH] পরিণত হয়।
  3. 4টি [OH] মূলক পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অন্তর্বর্তী যৌগ হাইড্রোজেন পারক্সাইড (H2O2) সৃষ্টি করে।
  4. পারক্সিডেজ উৎসেচকের সাহায্যে H2O2 ভেঙে যায় এবং 2 অণু জল ও 1 অণু অক্সিজেন উৎপন্ন করে।
আলোকদশায় উৎপন্ন বিজারিত হিল বিকারকের পরিণতি উল্লেখ করো
আলোকদশায় উৎপন্ন বিজারিত হিল বিকারকের পরিণতি উল্লেখ করো

এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের তৃতীয় অধ্যায় ‘জৈবনিক প্রক্রিয়া’ -এর উপবিভাগ ‘উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা’ -এর অন্তর্গত ‘সালোকসংশ্লেষ’ অংশের রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

জৈবনিক প্রক্রিয়া-উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা-বাষ্পমোচন-জীবনবিজ্ঞান-নবম শ্রেণী

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – বাষ্পমোচন – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

জৈবনিক প্রক্রিয়া-উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা-বাষ্পমোচন-জীবনবিজ্ঞান-নবম শ্রেণী

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – বাষ্পমোচন – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

জৈবনিক প্রক্রিয়া-উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা-বাষ্পমোচন-জীবনবিজ্ঞান-নবম শ্রেণী

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – বাষ্পমোচন – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

About The Author

Rahul

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – বাষ্পমোচন – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – বাষ্পমোচন – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – বাষ্পমোচন – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – বাষ্পমোচন – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – খনিজ পুষ্টি – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর