অষ্টম শ্রেণি বাংলা – স্বাধীনতা – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

Souvick

এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের সপ্তম পাঠের অন্তর্গত ‘স্বাধীনতা’-এর কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

স্বাধীনতা - অষ্টম শ্রেণী - বাংলা - রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

স্বাধীনতা নিয়ে লেখা আরও দুটো কবিতার উল্লেখ করো এবং এই কবিতার সঙ্গে তাদের তুলনামূলক আলোচনা করো।

স্বাধীনতা/রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে
কে বাঁচিতে চায়।
দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে
কে পরিবে পায়।।
কোটিকল্প দাস থাকা নরকের প্রায় হে
নরকের প্রায়।
দিনেকের স্বাধীনতা, স্বর্গ-সুখ তায় হে
স্বর্গ-সুখ তায় ।।
অই শুন! অই শুন! ভেরীর আওয়াজ হে
ভেরীর আওয়াজ।
সাজ সাজ সাজ বলে, সাজ সাজ সাজ হে
সাজ সাজ সাজ ৷৷
সার্থক জীবন আর বাহুবল তার হে
বাহুবল তার।
আত্মনাশে যেই করে দেশের উদ্ধার হে
দেশের উদ্ধার।।
অতএব রণভূমে চল ত্বরা যাই হে
চল ত্বরা যাই।
দেশহিতে মরে যেই তুল্য তার নাই হে
তুল্য তার নাই।

পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্র/নবীনচন্দ্র সেন

“দাঁড়া রে দাঁড়ারে ফিরে! দাঁড়া সৈন্যগণ!
দাঁড়াও ক্ষত্রিয়গণ! যদি ভঙ্গ দেও রণ”-
গর্জিলা মোহনলাল- “নিকট শমন!”
“আজি এই রণে যদি কর পলায়ন,
মনেতে জানিও স্থির, কারো না থাকিবে শির,
সবান্ধবে যাবে সবে শমন-ভবন!”
“দেখিছ না সর্বনাশ সম্মুখে তোমার?
যায় বঙ্গ সিংহাসন, যায় স্বাধীনতা-ধন
যেতেছে ভাসিয়া সব, কি দেখিছ আর?…”
“সামান্য বণিক এই শত্রুগণ নয়।
দেখিবে তাদের হায়। রাজা-রাজ্য, ব্যবসায়,
বিপণি, সমর-ক্ষেত্র, অস্ত্র-বিনিময়।”
“নিশ্চয় জানিও রণে হলে পরাজয়,
দাসত্বশৃঙ্খল-ভার ঘুচিবে না জন্মে আর
অধীনতা-বিষে হবে জীবন-সংশয়।”
“কি ছার জীবন যদি নাহি থাকে মান!
রাখিব রাখিব মান, যায় যাবে যাক প্রাণ,
সাধিব সাধিব যবে প্রভুর কল্যাণ।”
সহে না বিলম্ব আর, চলো ভাতৃগণ!
চলো সবে রণস্থলে, দেখিবে কে জিনে বলে;
দেখিবে ক্ষত্রিয়-বীর্য দেখাব কেমন।”

উপরের অংশ দুটি বিখ্যাত দুই কাব্যকার রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও নবীনচন্দ্র সেনের দুই বিখ্যাত কাব্য ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’ এবং ‘পলাশীর যুদ্ধ’ থেকে নেওয়া। ‘স্বাধীনতা’ কাব্যাংশটিতে বিষয়বস্তু ঐতিহাসিক কাহিনিসূত্র থেকে এসে স্বাধীনতাবোধ, স্বাধীনতা যুদ্ধে শামিল হওয়া এবং স্বাধীনতাপ্রাপ্তির আকুতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কীভাবে দেশীয় মানুষদের মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলা যায়-তাই যেন কবির প্রচার। অন্যদিকে কবি নবীনচন্দ্র সেনের রচনাটিতেও পরাধীন ভারতবাসীর মনে দেশাত্মবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা রয়েছে আন্তরিকভাবে। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ্‌দ্দৌলা পরাজিত হয়েছিলেন, বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। পরাধীনতার গ্লানি দেশ থেকে মোচন করার জন্য কবি সৈন্যদের রণসাজে সজ্জিত হয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলছেন।

ল্যাংস্টন হিউজের অনুবাদ কবিতাটিতেও ‘স্বাধীনতা’র সপক্ষে অনেক জোরালো কথা বলা হয়েছে। তিনটি কবিতাতেই ‘স্বাধীনতা’—এই সংগ্রামীবোধ ও চেতনাকে প্রবলভাবে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অতএব ভিন্ন সময়, ভিন্ন পরিস্থিতি, ভিন্ন ভাষাতে রচিত হলেও কবিমনের স্বাধীনতার স্বরূপটি এখানে স্বপ্নের উৎসের মতো উজ্জ্বল হয়ে ঝরে পড়তে দেখা যাচ্ছে; যা অকৃত্রিম ও আন্তরিক মুক্তোর মতো নিটোল।

‘স্বাধীনতা’ কবিতায় প্রকাশিত কবির স্বাধীনতাবোধের পরিচয় দাও।

‘স্বাধীনতা’ কবিতাটি একটি অনুবাদ কবিতা। প্রখ্যাত আমেরিকান কবি ল্যাংস্টন হিউজ-এর এই বিশেষ কবিতাটিকে বাংলায় তরজমা করেছেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও মুকুল গুহ।

স্বাধীনতা বা স্বাধিকারবোধ নিয়েই প্রতিটি মানুষ জন্মায়। তার বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বোধেরও ব্যাপ্তি ঘটে কোনো মানুষকে জাতিক ও রাষ্ট্রিক মানুষে পরিণত করে। স্বাধীনতালাভের ক্ষেত্রে ভয় যে প্রবল প্রতিবন্ধকতা এ নির্দেশ করে কবি জানান, সমঝোতা বা আপস করেও স্বাধীনতা আদায় করা সম্ভব নয়। যারা স্বাধীনতা নিজেরা ভোগ করে এবং অন্যকে অধীনতার মধ্যে রাখতে চায়, তারা নিজেরা কখনোই স্বাধীনতা হারাতে চায় না। সুতরাং স্বাধীনতা অর্জন করার জিনিস। স্থবির, রক্ষণশীল কিংবা দুর্বল চিত্তের মানুষেরা কিন্তু বলবে— ‘সময়ে / সবই হবে, কাল একটা নূতন দিন।’ কবি মনে করেন, কাল-কাল করে দিনাতিপাত করা বিপজ্জনক। কারণ পরাধীনতার মধ্যে মৃত্যু হলে, স্বাধীনতার আর কোনো প্রয়োজনই থাকবে না, ঠিক যেমন আগামীকালের রুটি দিয়ে আজ বাঁচা যায় না। কবি আরও মনে করেছেন স্বাধীনতা নামক শক্তিশালী বীজপ্রবাহকে চিনে নিতে হবে, যা আমার-তোমার সকলের মধ্যেই নিহিত। তাই স্বাধীনতার প্রশ্নে কোনো আপস নয়, তা পেতেই হবে।

অনুবাদ কবিতা হিসেবে ল্যাংস্টন হিউজের ‘স্বাধীনতা’ কবিতাটি কতটা সার্থক আলোচনা করো।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম এক বুদ্ধিজীবী ও কবি ল্যাংস্টন হিউজের ‘স্বাধীনতা’ কবিতাটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ দুই কলমচারী শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও মুকুল গৃহ। শ্রেষ্ঠ এক কবির কবিতা যখন ভাষান্তরিত হয় অন্য ভাষায় এবং তা অনুবাদ করেন সেই ভাষারই লব্ধপ্রতিষ্ঠ কোনো কবি, তখন তা হয়ে ওঠে যেন মণিকাঞ্চন যোগ।

স্বাধীনতা এমন এক অনুভব উপলব্ধি যা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মনের মধ্যেই স্থিত এবং যা ধরে রাখতে প্রতিটি মানুষই তৎপর। কিন্তু কখনো-কখনো বৈরী শক্তি মানুষের স্বাধীনতা হরণ করে স্বৈরশাসনের মাধ্যমে মানুষকে নতিস্বীকারে বাধ্য করে। এই যে অকারণ হীনতাবোধ, এ কখনো-কখনো মানুষের মধ্যে অনিবার্যভাবে গড়ে দেয় এক প্রতিস্পর্ধা। ল্যাংস্টন হিউজের মূল কবিতাটির মধ্যে এই যে বিশেষ স্বাধীনতাবোধের তীক্ষ্ণতম আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, কবিদ্বয় বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রে তার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শসহ বজায় রেখেছেন। বলাবাহুল্য এ অনুবাদ আক্ষরিক অনুবাদ নয়। কবিদ্বয় বঙ্গীকরণের ক্ষেত্রে ভাবানুবাদকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। এই অনুবাদ যেভাবে চমৎকারিত্ব লাভ করেছে তা অতুলনীয়। অনুবাদের মধ্যে একটি মানুষের স্বাধীনতাবোধ, স্বাধীনতাপ্রাপ্তির জন্য মানসিক টানাপোড়েন এবং প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির বেদনা এত নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে যে, মনে হয়েছে কবিতাটি বাংলা ভাষাতেই রচিত; এ যেন অনুবাদ কবিতা নয়। অনুবাদ কবিতা হিসেবে এখানেই কবিতাটির সার্থকতা।

‘স্বাধীনতা আমার প্রয়োজন / তোমার যেমন।’ – উদ্ধৃতিটির পরিপ্রেক্ষিতে কবির বক্তব্যের বর্ণনা দাও।

প্রখ্যাত মার্কিন কবি ও বুদ্ধিজীবী ল্যাংস্টন হিউজের অনুবাদ কবিতা ‘স্বাধীনতা’ থেকে উক্ত উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে। ‘স্বাধীনতা’ হল এমন একটি বোধ যা নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে আসে এবং রাষ্ট্রিক পরিবেশে লালিত হতে হতে সেই বোধ বিপুল আকার ও ধারণ করে মানুষের অহংকার বা গর্বের বিষয় হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। বলা চলে স্বাধীনতা হীনতায় কোনো মানুষই বাঁচতে চায় না বা পারে না।

‘স্বাধীনতা’ কবিতাটিতে কবি শুরুতেই স্বাধীনতা না আসার নিরাশাজনক মনোভাব জ্ঞাপন করেছেন সত্য, তবে কবিতায় সেই বোধই শেষ কথা নয়। তিনি স্বাধীনতা না আসার পিছনে মানুষের অকারণ ভীতি ও আপস বা সমঝোতার প্রতিও ইঙ্গিত করেছেন। স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি স্বাধিকারের প্রসঙ্গে উত্তরিত হয়েছেন, বলেছেন— ‘আমাদেরও তো অন্য সকলের মতন / অধিকার রয়েছে, / দুপায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার, / দু কাঠা জমির মালিকানার।’ যেন এ অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর লক্ষ্য। প্রসঙ্গক্রমে তিনি ‘অল্পে সন্তুষ্ট’ মানুষদের নেতিবাচক ভাবনার দিকটির প্রতিও ইঙ্গিত করেন, বলেন – ‘শুনে শুনে কান পচে গেল, / সময়ে সবই হবে, কাল একটা নূতন দিন’ – বলাবাহুল্য ‘কালে’ তাঁর কোনো আস্থা নেই। স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে তাঁর চাওয়া ‘আজ’ই। কারণ মৃত্যুর পরে প্রাপ্ত স্বাধীনতায় তিনি আস্থাশীল নন। জীবনাভিজ্ঞতাই তাঁকে জানিয়েছে-আগামীকালের রুটি দিয়ে আজ বাঁচা যায় না। তাই স্বাধীনতা নামক একটি শক্তিশালী বীজপ্রবাহকে তিনি মানুষের তীব্র আবেগপ্রবাহে সঞ্চারিত করতে চান।


এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের সপ্তম পাঠের অন্তর্গত ‘স্বাধীনতা’-এর কিছু ‘রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর’ নিয়ে আলোচনা করলাম। এই প্রশ্নোত্তরগুলো অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যালয়ের বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের উপকারে এসেছে। যদি তোমাদের কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

নির্মিতি ব্যাকরণ - এক শব্দের একাধিক অর্থে প্রয়োগ - অষ্টম শ্রেণি - বাংলা

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – নির্মিতি ব্যাকরণ – এক শব্দের একাধিক অর্থে প্রয়োগ

নির্মিতি ব্যাকরণ - বাংলা প্রবাদ - অষ্টম শ্রেণি - বাংলা

অষ্টম শ্রেণি – বাংলা – নির্মিতি ব্যাকরণ – বাংলা প্রবাদ

অষ্টম শ্রেণি বাংলা - ছোটোদের পথের পাঁচালী - সঠিক উত্তর নির্বাচন করো

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ছোটোদের পথের পাঁচালী – সঠিক উত্তর নির্বাচন করো

About The Author

Souvick

Tags

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – নির্মিতি ব্যাকরণ – এক শব্দের একাধিক অর্থে প্রয়োগ

অষ্টম শ্রেণি – বাংলা – নির্মিতি ব্যাকরণ – বাংলা প্রবাদ

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ছোটোদের পথের পাঁচালী – সঠিক উত্তর নির্বাচন করো

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – সাধু ও চলিত রীতি

অষ্টম শ্রেণি বাংলা – ব্যাকরণ বিভাগ – সমাস