এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের তৃতীয় পাঠের প্রথম অধ্যায়, ‘হিমালয় দর্শন’ -এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করবো। এখানে প্রাবন্ধিক পরিচিতি, প্রবন্ধের উৎস, প্রবন্ধের পাঠপ্রসঙ্গ, প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ, প্রবন্ধের নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘হিমালয় দর্শন’ সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং প্রবন্ধটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এছাড়া, নবম শ্রেণীর পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে প্রাবন্ধিক পরিচিতি ও প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হিমালয় দর্শন প্রবন্ধের লেখিকা পরিচিতি
বেগম রোকেয়ার জন্ম, শিক্ষা ও কর্মজীবন –
ঊনবিংশ শতকে বাংলাদেশের নবজাগরণের ইতিহাসে বেগম রোকেয়ার নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি 1880 খ্রিস্টাব্দের 9 ডিসেম্বর রংপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল জহিরুদ্দিন মহম্মদ আবু আলি সাবের। ছেলেবেলা থেকেই রোকেয়ার লেখাপড়ায় আগ্রহ দেখে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা তাঁকে ইংরেজি ও জ্যেষ্ঠ ভগিনী বাংলা শেখান। মাত্র 18 বছর বয়সে তাঁর সঙ্গে নারীশিক্ষার সমর্থক সাখাওয়াত হোসেনের বিয়ে হয়। কিন্তু মাত্র 10 বছর পরে সাখাওয়াতের মৃত্যু হলে তিনি শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে আসেন। 1910 খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতায় মহিলাদের শিক্ষাদানে ব্রতী হন। 1911 খ্রিস্টাব্দের 15 মার্চ মাত্র আট জন মেয়েকে নিয়ে তিনি ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি অন্তঃপুরবাসী নারীদের সামনে আলোর দরজা খুলে দেন এবং অশিক্ষা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। তিনি ‘আঞ্জুমান খাওয়াতীন ইসলাম’ নামে মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন।
বেগম রোকেয়ার রচনাগ্রন্থসমূহ, মৃত্যু –
রোকেয়া প্রণীত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘মতিচুর’, ‘পদ্মরাগ’, ‘অবরোধবাসিনী’ ইত্যাদি। মহিলাদের শিক্ষিতা ও প্রগতিশীলা করার দিকে তাঁর লক্ষ্য ছিল ক্লান্তিহীন। এ কালে আমরা যখন বহু নারীকে উচ্চশিক্ষিতা ও কর্মরতা দেখি, তখন মনে হয় বেগম রোকেয়ার আশা বোধহয় পূর্ণ হয়েছে। তাঁর কিছু রচনা আছে যেগুলি গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়নি, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘কূপমন্ডুকের হিমালয় দর্শন’, ‘রসনাপূজা’, ‘নারীপূজা’, ‘আশা জ্যোতি’, ‘চাষার দুক্ষু’ ইত্যাদি। 1932 খ্রিস্টাব্দের 9 ডিসেম্বর, জন্মদিনের দিন মাত্র 52 বছর বয়সে তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটে।
হিমালয় দর্শন প্রবন্ধের উৎস
আমাদের পাঠ্য ‘হিমালয় দর্শন’ প্রবন্ধাংশটি বেগম রোকেয়া রচিত ‘কুপমণ্ডুকের হিমালয় দর্শন’ নামক ভ্রমণকাহিনি থেকে গৃহীত। এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ না পেলেও প্রথম প্রকাশিত হয় ‘মহিলা’ পত্রিকায়, কার্তিক 1311 বঙ্গাব্দে।
হিমালয় দর্শন প্রবন্ধের পাঠপ্রসঙ্গ
নারীবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ মহীয়সী রমণী বেগম রোকেয়া তৎকালীন সমাজে নারীর পর্দানশিন থাকার প্রসঙ্গে প্রতিবাদী ভূমিকা গ্রহণ করেন। পার্বত্য প্রকৃতিতে ভ্রমণ, বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন তাঁর ভ্রমণকাহিনির মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। শৈলশহর শিলিগুড়ি থেকে রেলগাড়িতে যাত্রা এবং কার্সিয়াং-এ পৌঁছোনোর পথে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁকে মুগ্ধ করে। এভাবেই দার্জিলিং-এ অবতরণ এবং সেখানকার বর্ণনা অবশ্যই মনোমুগ্ধকর। প্রাকৃতিক শোভার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া, সবুজক্ষেত্র, জলপ্রপাত, ঝরনা লেখিকাকে মোহিত করে। ভুটিয়াদের জীবনযাত্রা থেকে পার্বত্যপ্রদেশের মানুষদের জীবন সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। যতই তিনি উচ্চে ওঠেন ততই পার্বত্য অঞ্চল, মানুষ, তাদের আদবকায়দা আরও বেশি করে আকৃষ্ট করে তাঁকে। বিধাতার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলি যেন এখানে চোখে ধরা দেয়, তৃপ্ত করে মানসিক ক্ষুধাকে। ঈশ্বরকে তিনি ধন্যবাদ দেন সমুদ্রের মতো সুন্দর সৃষ্টির পাশাপাশি পাহাড় ও তার অসাধারণ সৃষ্টির জন্য। আমরা ভাগ্যবান এই সৃষ্টিকে স্বচক্ষে দর্শন ও উপলব্ধি করতে পেরে।
হিমালয় দর্শন প্রবন্ধের বিষয়সংক্ষেপ
বেগম রোকেয়া রচিত ‘হিমালয় দর্শন’ পাঠ্যাংশে লেখিকা অত্যন্ত মনোজ্ঞ ভঙ্গিতে তাঁর হিমালয় ভ্রমণের বর্ণনা প্রদান করেছেন। এই বর্ণনায় আমরা তাঁর হিমালয় যাত্রার প্রতিটি মুহূর্তের মনোরম অভিজ্ঞতার নিখুঁত উল্লেখ পাই। প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে তিনি নিজের অনুভূতিকেও যথাযথভাবে ব্যক্ত করেছেন। শিলিগুড়ি থেকে হিমালয় রেল রোড ধরে খুব নীচু আকারের হিমালয়ান রেলগাড়ির সওয়ারি হয়ে পাহাড়ি আঁকাবাকা পথে কখনও পাহাড় আবার কখনও জঙ্গল ভেদ করে ক্রমশ তিনি প্রায় তিন হাজার ফুট উপরে চলে এসেছেন। দু-ধারে চায়ের খেত, কখনও আবার জলপ্রপাত প্রভৃতি দেখতে দেখতে রেলগাড়ি 1864 ফিট উপরে কার্সিয়াং স্টেশনে পৌঁছোয়। সেখানে একটি নির্ধারিত বাসায় এলেও তাদের মালপত্র কিন্তু বুকিং মতো দার্জিলিং-এ পৌঁছে যায়। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় মনোরম পরিবেশে। বায়ু এবং মেঘের লুকোচুরি খেলা লেখিকার মন হরণ করে। নির্জন বনপথে তাঁকে জোঁকের উপদ্রব সহ্য করতে হয়। পাহাড়ি ভুটিয়া মহিলাদের কঠিন পরিশ্রমের অভিজ্ঞতা, তাদের জীবিকা অর্জনের শ্রম এবং সাহস, সততা দেখে লেখিকা মুগ্ধ হয়েছেন। এইভাবে হিমালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সেখানকার অধিবাসীদের জীবনযাপনের বিস্ময়কর পরিচয় লেখিকার হৃদয়কে অভিভূত করে। হিমালয়ের অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও তার মহিমা উপলব্ধি করে লেখিকা সকৃতজ্ঞচিত্তে ঈশ্বরকে স্মরণ করেছেন।
হিমালয় দর্শন প্রবন্ধের নামকরণ
ভূমিকা –
নামকরণ সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নামকরণের মাধ্যমে। বিষয়টি সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া যায়। নামকরণকে রচনার অভ্যন্তরে প্রবেশের সিংহদ্বার বলা যেতে পারে। নামকরণ নানাপ্রকার হতে পারে – বিষয়ভিত্তিক, চরিত্রভিত্তিক, ব্যঞ্জনাধর্মী ইত্যাদি। আমাদের পাঠ্য ‘হিমালয় দর্শন’ ভ্রমণকাহিনি অংশটির নামকরণ সার্থক কি না, সেটাই বিচার্য।
হিমালয় দর্শনের বর্ণনা –
ভ্রমণকাহিনির শুরুতে আছে হিমালয় রেল রোড ধরে শিলিগুড়ি থেকে ছোটো রেলগাড়ি করে শৈলক্ষেত্রের উদ্দেশে যাত্রা। চড়াই উতরাই পথে কোথাও অতি উঁচু চূড়া আবার কোথাও নিবিড় অরণ্য, কোথাও বা কুয়াশা দেখে মনে হয় মেঘ। শ্যামল বনানী, আঁকাবাঁকা পথ, কোথাও জলপ্রপাত বা নির্ঝর-সত্যিই অবর্ণনীয়। প্রস্তরখণ্ডের চারপাশ দিয়েই রেলপথ। এভাবেই এগিয়ে চলা। হাজার ফিট ওপরেও শীত নেই। সেখানকার অধিবাসী ভুটিয়ানিদের সঙ্গে পরিচিতি, তাদের সৎ ও সাহসী বৈশিষ্ট্য রমণীদের ঐতিহ্যকে আরও বৃদ্ধি করে। পরমেশ্বরের অসাধারণ সৃষ্টি নির্ঝরের কলতান পার্বত্য পরিবেশে সুর মূর্ছনার সৃষ্টি করে। ঈশ্বরের কাছে মানুষ কৃতজ্ঞ। সমুদ্রের মতোই রয়েছে সুন্দর পাহাড়। বিশ্বসৃষ্টির অমোঘ বিস্তৃতিতে হিমালয়কে লেখিকার নিতান্তই ক্ষুদ্র বলে মনে হয়েছে। চিত্রকর যেন তার চিত্রাঙ্কনের নৈপুণ্যই প্রকাশ করেছেন। সমুদ্রতীরবর্তী বালুকণার ক্ষুদ্রতা থেকে শুরু করে সুউচ্চ হিমালয়ের মহত্ত্বই ভাস্বর হয়ে উঠেছে। আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়কে তৃপ্ত করেছে, মন হয়েছে সৌন্দর্য দর্শনে ঋদ্ধ। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপলব্ধিতে বারবার মন চলে গেছে সুদূরপানে সুউচ্চ শিখর দেশে।
নামকরণ –
আলোচ্য পাঠ্যাংশটি লেখিকা বেগম রোকেয়া উত্তম পুরুষে বর্ণনা করেছেন। শব্দচয়ন, বাক্যগঠন, উপমা উপস্থাপন, চিত্রকল্প নির্মাণ রচনাটিকে এমন প্রাঞ্জল করেছে যে ‘হিমালয় দর্শন’ কেবল লেখিকার একক অভিজ্ঞতা হয়ে থাকেনি। তাঁর হিমালয় দর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনাগুণে পাঠকের মানসপটে আরও একটি সৌন্দর্যক্ষেত্র রচনা করেছে। রচনাটির সঙ্গে অন্বিত হয়ে পাঠকও যেন হিমালয় যাত্রার মনোরম অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করতে পেরেছে। লেখিকার এই সৃষ্টি যথার্থ অর্থেই পাঠকের সঙ্গে সাযুজ্য স্থাপন করতে পারায় নামকরণটি সার্থক হয়েছে।
এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের তৃতীয় পাঠের প্রথম অধ্যায়, ‘হিমালয় দর্শন’ -এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করবো। এখানে প্রাবন্ধিকের পরিচিতি, প্রবন্ধের উৎস, প্রবন্ধের পাঠপ্রসঙ্গ, প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ, প্রবন্ধের নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘হিমালয় দর্শন’ সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দিয়েছে এবং প্রবন্ধটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এছাড়া, নবম শ্রেণীর পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে প্রাবন্ধিক পরিচিতি, প্রবন্ধের নামকরণ ও কবিতার সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য করুন