নবম শ্রেণী – ইতিহাস – বিংশ শতকে ইউরোপ – বিশ্লেষণমূলক উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন ও উত্তর

বিংশ শতাব্দী ইউরোপের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুগ। এই শতাব্দীতে ইউরোপে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, এবং ঠান্ডা যুদ্ধ। এই ঘটনাগুলি ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

Table of Contents

নবম শ্রেণী – ইতিহাস – বিংশ শতকে ইউরোপ

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার – এর সংস্কারগুলি সংক্ষেপে লেখো।

জার প্রথম নিকোলাস – এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় আলেকজান্ডার জার হিসেবে সিংহাসনে বসেন (১৮৫৫ খ্রি.)। দ্বিতীয় আলেকজান্ডার পিতার মতো স্বেচ্ছাচারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন কর্তব্যপরায়ণ এবং প্রজাকল্যাণকামী শাসক।

  • দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সংস্কার – স্বৈরাচারী শাসন এবং ভূমিদাসপ্রথাই যে রাশিয়ার অবক্ষয়ের প্রধান কারণ — এই সত্য জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার উপলব্ধি করেছিলেন। তাই বিভিন্ন সংস্কারের মাধ্যমে তিনি রাশিয়ার উন্নতিসাধনে তৎপর হন।
  • উদারনৈতিক ব্যবস্থা – দ্বিতীয় আলেকজান্ডার জার নিকোলাসের আমলের দমননীতিকে রদ করেন, বিদ্রোহীদের নির্বাসনদণ্ড মকুব করেন, গুপ্তচর বাহিনী ভেঙে দেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেন।
  • ভূমিদাসপ্রথার বিলোপসাধন – ভূমিদাসরা (সাফ) রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের মেরুদণ্ডস্বরূপ ছিল। জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ছিল সার্ফ সম্প্রদায়ভুক্ত। সার্ফদের জীবন ছিল দুর্দশাগ্রস্ত। এই সার্ফদের মুক্তিদানের উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি মুক্তির ঘোষণাপত্র (Edict of Emancipation) – তে স্বাক্ষর করেন। ফলে রাশিয়া থেকে ভূমিদাসপ্রথার অবসান হয়। ভূমিদাসদের দাসত্বের বন্ধন থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন বলে তিনি মুক্তিদাতা জার (Czar Liberator) নামে খ্যাত।
  • বিচারবিভাগীয় সংস্কার – জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের অনুকরণে বিচারবিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারসাধন করেন। শাসনবিভাগ থেকে বিচারবিভাগকে পৃথক করা হয়।
  • শাসনবিভাগীয় সংস্কার – তিনি সমগ্র রাশিয়াকে ৩৫০টি জেলায় বিভক্ত করে প্রত্যেক জেলায় জেমস্টোভো (Zemstvo) নামে একটি কাউন্সিল বা প্রাদেশিক সভা গঠন করেন। শিক্ষা ও শিল্পের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি আনার চেষ্টা করেন দ্বিতীয় আলেকজান্ডার।

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের এই সংস্কারগুলি ছিল প্রায় নিষ্ফল। সংস্কারগুলি রূপ লাভ করেছিল অনেক বিলম্বে। স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা চালু থাকায় সংস্কারের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছোয়নি। আইনগতভাবে ভূমিদাসপ্রথা লোপ পেলেও গ্রাম্য সমবায় বা মির – দের আধিপত্য বজায় থাকে। তবুও বলতে হয়, এই সংস্কারগুলি ছিল ইতিবাচক এবং রাশিয়ার বদ্ধ সমাজে খোলা বাতাসের ন্যায়।

নারদনিক আন্দোলন (Narodnik Movement) — টীকা লেখো।

রুশ জারদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন এবং সামন্ততান্ত্রিক শোষণের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ায় চরমপন্থী ভাবধারার জন্ম হয়। বহুসংখ্যক গুপ্ত সমিতি গড়ে ওঠে। এই পথ ও পদ্ধতি সফল না হলে নারদনিক আন্দোলন গড়ে ওঠে।

নারদনিক আন্দোলন – সার্ফ প্রথার বিলুপ্তি ঘটলেও রাশিয়ার কৃষক অভ্যুত্থান দৈনন্দিন ব্যাপারে পরিণত হয়। রাশিয়ার উদারপন্থী শিক্ষিত সম্প্রদায় এই ভূমিহীন কৃষকদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। তাই নিহিলিস্ট আন্দোলন (Nihilist Movement) কেবল দার্শনিক মতবাদের মধ্যেই আবদ্ধ থাকেনি, ক্রমশ তা হয়ে উঠেছিল ‘জনতাবাদী আন্দোলন’ (Populist Movement)। রুশ ভাষায় ‘নারদ’ (Narod) শব্দ-এর অর্থ হল জনতা বা জনগণ। তা থেকেই এই আন্দোলনকে বলা হয় ‘নারদনিক আন্দোলন’ (Narodnik Movement)।

কর্মসূচি – নারদনিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ প্রায় ১ হাজার জন শিক্ষিত যুবক-যুবতী গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষকদের বিপ্লবী আদর্শের সঙ্গে পরিচিত করাতে থাকে। তারা জনগণকে বোঝায় যে — গ্রামের কৃষকরা এবং শহরের শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ না হলে শোষণের অবসান ঘটবে না। তবে অচিরেই আন্দোলনকারীরা সন্ত্রাসের পথ গ্রহণ করে।

নারদনিক আন্দোলনের ব্যর্থতা – নারদনিক আন্দোলন নানা কারণে ব্যর্থ হয়েছিল —

  • কৃষকরা নারদনিকদের আবেদনে সাড়া দেয়নি।
  • 2সরকারি দমননীতির চাপে আন্দোলন তার গতি হারায়।

গুরুত্ব – ব্যর্থতা সত্ত্বেও এই আন্দোলনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। কারণ— এই আন্দোলনই পরবর্তীকালে বৃহত্তর রুশ বিপ্লবের মানসিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছিল। এর ফলেই জনগণ বিপ্লবী আদর্শের সঙ্গে পরিচিত হয়।

নারদনিয়া ভলিয়া (Narodnaya Volya) সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

নারদনিক আন্দোলনের ব্যর্থতার পর আন্দোলকারীরা আন্দোলনের মত ও পথ পরিবর্তন করে। তারা কৃষকদের মধ্যে প্রচারের কর্মসূচি ত্যাগ করে সন্ত্রাসের পথ গ্রহণ করে। তারা ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে নারদনিয়া ভলিয়া* (Narodnaya Volya) নামক বিপ্লবী গুপ্ত সমিতি গঠন করে আন্দোলন চালিয়ে যায়।

নারদনিয়া ডলিয়া শব্দের অর্থ – রুশ ভাষায় ‘নারদ’ শব্দের  অর্থ ‘জনগণ’ এবং ‘ভলিয়া’ শব্দের অর্থ ‘ইচ্ছা’। অর্থাৎ নারদনিয়া ভিলিয়ার অর্থ  জনগণের ইচ্ছা’।

নারদনিয়া ভলিয়া-র কর্মসূচি – নারদনিয়া ভলিয়া গুপ্ত সমিতি জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে জঙ্গি কার্যকলাপ শুরু করেছিল। তারা অত্যাচারী রাজকর্মচারীদের হত্যার কর্মসূচি গ্রহণ করে। এই সংগঠনের নারী বিপ্লবী ভেরা জাসুলিক (Vera Zasulich) অত্যাচারী রুশ সামরিক গভর্নর জেনারেল ট্রেপভ (General Trepov) – কে হত্যা করেন। পরে তিনি ধরা পড়লেও বিচারে মুক্তি পান।

লক্ষ্য বদল – জার সরকার কঠোর দমননীতি অনুসরণ করে। পরবর্তীকালে বিপ্লবীরা নরম মনোভাব নিয়ে জার তৃতীয় আলেকজান্ডারের কাছে আবেদন জানায় যে,

  • জার সরকার নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা বন্ধ করবে
  • গণপরিষদ আহ্বান করলে বিপ্লবীরা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বন্ধ করবে।

জার সরকারের দমননীতি – জার তৃতীয় আলেকজান্ডার বিপ্লবীদের আবেদনে সাড়া না দিয়ে কঠোর দমননীতি অনুসরণ করেন। অনেক আন্দোলনকারী কঠোর দণ্ডে দণ্ডিত হন। লেনিনের দাদা আলেকজান্ডার উলিয়ানভ (Alexander Ulyanov) আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন। সরকারের এই দমননীতির ফলে আন্দোলন ব্যর্থ হয়।

গুরুত্ব – বিপ্লবীদের আন্দোলন ব্যর্থ হলেও এই আন্দোলনের গুরুত্বকে একেবারে অস্বীকার করা যায় না। এই আন্দোলন পরবর্তীকালের রুশ বিপ্লবের দিশা নির্ধারণে সহায়ক হয়েছিল।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবের প্রাক্কালের রাশিয়ার কৃষক ও শ্রমিকদের অবস্থা কীরূপ ছিল?

অথবা, ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবের প্রাক্কালে রাশিয়ার সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ায় বিপ্লবের প্রাক্কালে সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ চরম আকার ধারণ করেছিল, যার ফলে সবথেকে দুর্দশার সম্মুখীন হয়েছিল কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণি।

কৃষকশ্রেণির অবস্থা – বিপ্লবের পূর্বে রাশিয়ার সমাজ ছিল দুভাগে বিভক্ত — সুবিধাভোগী অভিজাত সম্প্রদায় এবং দরিদ্র কৃষক শ্রেণি। ভূমিদাসপ্রথার অবসান হলেও কৃষকদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। মুক্তিপ্রাপ্ত ভূমিদাসরা রাষ্ট্র, জমিদার, মির ইত্যাদিকে নানা প্রকার কর দিতে বাধ্য ছিল। মির – গুলিই ছিল জমির প্রকৃত মালিক — কৃষকরা সম্পূর্ণভাবে মিরগুলির অধীনস্থ হয়ে পড়েছিল। ইতিমধ্যে রাশিয়ার জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে ভূমিসমস্যা বিরাট আকার ধারণ করে। ফলে কৃষকদের উপর শোষণের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়।

শ্রমিকশ্রেণির অবস্থা – রাশিয়ায় ব্যাপক শিল্পায়নের ফলে রাশিয়ার জাতীয় ঋণের পরিমাণ দারুণভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে রুশ শ্রমিকদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। তারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অসহনীয় অবস্থার মধ্যে দিনযাপন করতে বাধ্য হত। শ্রমিকদের এই দুরবস্থা সম্পর্কে জার সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবের ব্যর্থতার কারণগুলি সংক্ষেপে লেখো।

১১০৫ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবের ব্যর্থতার কারণ –

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ায় যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল নানা কারণে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবের ব্যর্থতার কারণগুলি হল —

  • কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করলেও তাদের মধ্যে কোনো ঐক্যবোধ গড়ে ওঠেনি।
  • বিশালায়তন রাশিয়ার সর্বত্র এই বিপ্লব সংঘটিত হয়নি। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় এই বিপ্লব কার্যকর হয়েছিল।
  • ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব ছিল অপরিকল্পিত এবং বিক্ষিপ্ত। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি এতে যোগদান করায় ঐক্যবোধের অভাব পরিলক্ষিত হয়। প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বার্থকে বড়ো করে দেখেছিল।
  • নৌ ও স্থলবাহিনীর কিছু সৈন্য বিপ্লবে যোগ দিলেও সামগ্রিকভাবে সেনাবাহিনী জার সরকারের পক্ষই অবলম্বন করেছিল।
  • জার সরকারের কঠোর দমননীতি ছিল বিপ্লবের ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ।

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ায় নভেম্বর বিপ্লবের (November, Revolution) কারণ কী ছিল?

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ১৬ মার্চ বিপ্লবের মাধ্যমে জারতন্ত্রের পতন ঘটে। অস্থায়ী প্রজাতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সরকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হলে অস্থায়ী সরকারের পালাবদল হয়। শেষে লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় নভেম্বর বিপ্লব ঘটে (৭ নভেম্বর, ১৯১৭ খ্রি.)।

নভেম্বর বিপ্লব (November Revolution) – ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ বিপ্লবের ফলে রাশিয়ায় জারতন্ত্রের অবসান ঘটলেও জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর বিপ্লব’বা ‘বলশেভিক বিপ্লব’(Bolshevik Revolution)-এর ফলে ‘রুশ বিপ্লব’ সম্পূর্ণ হয়। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ বিপ্লবের ফলে সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটাধিকারের দ্বারা নির্বাচিত ডুমা (Duma)-র বুর্জোয়া সদস্যরা একটি অস্থায়ী প্রজাতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করে। রাশিয়ার বলশেভিক দল এই সরকারকে মেনে নেয়নি। তারা রাশিয়ার গ্রাম ও শহরের সাধারণ মানুষকে নিয়ে যে সোভিয়েত (Soviet) বা পরিষদ গঠন করেছিল, সেই সোভিয়েতগুলির হাতে ক্ষমতার হস্তান্তর চেয়েছিল।

প্রজাতান্ত্রিক সরকারের প্রতি জনগণের ক্ষোভের কারণ –

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে মার্চ বিপ্লবের ফলে প্রতিষ্ঠিত রাশিয়ার প্রজাতান্ত্রিক সরকারের প্রতি জনগণের মনে অসন্তোষ ও ক্ষোভ জমেছিল। কারণ —

  1. কৃষকদের ক্ষোভ – কৃষকরা আশা করেছিল যে রাশিয়ার আমূল ভূমিসংস্কার হবে, ‘কুলাক’ প্রথার অবসান ঘটবে এবং তারা জমি পাবে। কিন্তু কৃষকরা তা পায়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে অনেক কৃষককে যুদ্ধে যেতে হয়েছিল। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না থাকায় জার্মানবাহিনীর হাতে তারা দলে দলে মারা যায়। এই ঘটনায় কৃষকশ্রেণি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
  2. শ্রমিকদের ক্ষোভ – মার্চ বিপ্লবের ফলে গঠিত প্রজাতান্ত্রিক সরকারের কাছে শ্রমিকদের আশা ছিল যে, তাদের বেতন বৃদ্ধি হবে এবং কাজের সময়সীমা ৮ ঘণ্টা নির্ধারিত হবে। শ্রমিকদের এই চাহিদা পূরণ হয়নি বলে শ্রমিকরাও সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল।
  3. সেনাবাহিনীর ক্ষোভ – রাশিয়ার সেনাবাহিনী ও তাদের পরিবারেরা আশা করেছিল সরকার যুদ্ধ বন্ধ করবে এবং শাস্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু প্রজাতান্ত্রিক সরকার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিল। ফলে সেনাবাহিনী ও তাদের পরিবার-পরিজনরা সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছিল।
  4. অ-রুশ জনগণের অসন্তোষ – রাশিয়ায় অনেক অ-রুশ জনগণ বসবাস করত। তারা আশা করেছিল সরকার তাদের স্বায়ত্তশাসন দেবে। কিন্তু তাদের আশা পূরণ হয়নি।
  5. বলশেভিকদের ভূমিকা – লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক দল বিভিন্ন শাখা সংগঠন এবং সোভিয়েত প্রতিষ্ঠা করেছিল। লেনিন’ এপ্রিল থিসিস’ ঘোষণা করেন ১৬ এপ্রিল, ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে এবং সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েত-এর হাতে সমর্পণের দাবি ওঠে।

এইভাবে লেনিন তার অসাধারণ নেতৃত্বের দ্বারা প্রতিকূল পরিস্থিতিকে অনুকূলে আনেন। অনুগত লাল ফৌজ এবং সোভিয়েতগুলির সাহায্যে রাশিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে (৭ নভেম্বর, ১৯১৭ খ্রি.) নভেম্বর বিপ্লব সফল হয়।

লেনিনের চিন্তাধারা ও মতবাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

লেনিন ছিলেন সাম্যবাদের প্রবর্তক কার্ল মার্কস-এর আদর্শে বিশ্বাসী। তিনি তাঁর মতাদর্শ ইসক্রা’ (Iskra), ‘প্রাভদা’ (Pranta) প্রভৃতি পত্রপত্রিকায়, বিভিন্ন গ্রন্থে ও বক্তৃতার মাধ্যমে প্রচার করেন।

লেনিনের চিন্তা ও মতবাদ –

সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (Social Democratic Party) – র লন্ডন সম্মেলন – ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে অনুষ্ঠিত সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির দ্বিতীয় অধিবেশনে লেনিন তাঁর প্রধান দুটি বক্তব্য তুলে ধরেন- 1. দলের সদস্যপদ দলের সক্রিয় কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। 2. এই দলের প্রধান উদ্দেশ্য হবে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটানো। তাই এই দল রাশিয়ায় জারতন্ত্র ও পুঁজিবাদের উচ্ছেদ করে সর্বহারা শ্রেণির একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে।

এই নীতিগত কারণে দল বলশেভিক ( Bolshevik) ও মেনশেভিক (Menshevik) নামক দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

লেনিনের চিন্তাধারা ও মতবাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও

লেনিনের এপ্রিল থিসিস (April Theses) – লেনিন সুইজারল্যান্ড থেকে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ১৬ এপ্রিল দেশে ফিরে আসেন। এরপর তিনি বলশেভিক অনুগামীদের সামনে তাঁর বিখ্যাত এপ্রিল থিসিস (April Theses) ঘোষণা করেন। যাতে বলা হয় –

  • মার্চ বিপ্লবে জারতন্ত্রের পতন ঘটেছে বলশেভিকদের জন্যই, তাই অস্থায়ী সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করতে হবে।
  • সোভিয়েতের হাতে সমস্ত ক্ষমতা অর্পণ করতে হবে।
  • রাশিয়ার সমস্ত জমি অধিগ্রহণ করে তা রাষ্ট্রীয়করণ করতে হবে।
  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে রাশিয়া বিরত থাকবে।
  • রাশিয়ার সৈনিক, কৃষক ও শ্রমিকদের জন্য শান্তি, জমি ও রুটি – র তত্ত্ব বাস্তবায়িত করা হবে।
  • রাশিয়াতে ‘সর্বহারা শ্রেণির একনায়কতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হবে।
  • নভেম্বর বিপ্লবের পর লেনিন রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।

এই পথে বাধার সৃষ্টি হলে তিনি মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা করেন। এইজন্য তিনি নতুন আর্থিক নীতি বা New Economic Policy (NEP ) ঘোষণা করেন।

লেনিনের অবদান – লেনিনের শান্তি, জমি ও রুটি-র স্লোগানে রাশিয়ার জনগণ আকৃষ্ট হয়। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর লেনিন পেট্রোগ্রড শহরে এক গোপন বৈঠকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ৭ নভেম্বর ট্রটস্কি-র নেতৃত্বে ২৫ হাজার লাল ফৌজ রাজধানী পেট্রোগ্রাড দখল করে। ফলে অস্থায়ী কেরেনস্কি সরকারের পতন ঘটে এবং লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

লাল ফৌজ

এপ্রিল থিসিস – টীকা লেখো

অথবা, এপ্রিল থিসিস কে প্রবর্তন করেন? এর বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব লেখো।

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ১৬ এপ্রিল বলশেভিক নেতা লেনিন সুইজারল্যান্ডের নির্বাসন থেকে রাশিয়ায় ফিরে এসে বলশেভিক কর্মীদের উদ্দেশ্যে এক কর্মধারা প্রকাশ করেন; যা ‘এপ্রিল থিসিস’ নামে খ্যাত।

বিষয়বস্তু – বলশেভিক কর্মীদের উদ্দেশ্যে লেনিন যে এপ্রিল থিসিস ঘোষণা করেছিলেন, সেখানে বলা হয় —

  • মার্চ বিপ্লবে যেহেতু সোভিয়েতগুলি প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল, সেহেতু সব ক্ষমতা সোভিয়েতগুলিকে দিতে হবে।
  • বুর্জোয়া শাসনের অবসান ঘটিয়ে সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হবে।
  • শান্তি, রুটি ও জমির স্লোগানকে বাস্তবায়িত করে শ্রমিকদের রুটি, কৃষকদের জমি এবং সেনাদলকে শান্তি দেওয়া হবে।
  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে রাশিয়া বিরত থাকবে ইত্যাদি।

গুরুত্ব – রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব সংগঠনে এপ্রিল থিসিসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কারণ —

  • লেনিনের শান্তি, জমি ও রুটির স্লোগান সৈনিক, কৃষক ও শ্রমিককে একত্রিত করে বিপ্লবের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল।
  • এপ্রিল থিসিস ঘোষণার পরেই বলশেভিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি কৃষক, শ্রমিক ও সেনা প্রতিনিধিদের সংগঠন সোভিয়েতের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।

এইভাবে লেনিনের এপ্রিল থিসিস মার্চ বিপ্লবকে নভেম্বর বিপ্লবে রূপায়িত করতে সক্ষম হয়েছিল।

বলশেভিক দল কীভাবে রাশিয়ায় ক্ষমতা দখল করে?

অথবা, রুশ বা বলশেভিক বিপ্লবে (১৯১৭ খ্রি.) লেনিনের ভূমিকা কী ছিল?

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে রুশ বিপ্লবের ফলে রাশিয়ায় বলশেভিক দলের নেতৃত্বে সর্বহারার একনায়কত্ব’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন বলশেভিক দলের নেতা লেনিন।

অস্থায়ী সরকারের ব্যর্থতা – রুশ বিপ্লবের ফলে জার সরকারের পতন ঘটলে প্রিন্স লুভড্ এবং কেরেনস্কির নেতৃত্বে অস্থায়ী প্রজাতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও এই সরকার জনগণের প্রত্যাশা মেটাতে ব্যর্থ হয়।

ক্ষমতা দখলের আহ্বান – লেনিন বলেন যে, বলশেভিকদের উদ্যোগেই মার্চ মাসে জারতন্ত্রের পতন ঘটায় দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা বলশেভিকদেরই প্রাপ্য। তিনি বুর্জোয়া প্রজাতান্ত্রিক সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা দখলের জন্য বলশেভিকদের আহ্বান জানান।

লেনিনের নেতৃত্ব এবং বলশেভিক দল – এমতাবস্থায় বলশেভিক নেতা লেনিন রাশিয়ায় ফিরে বিখ্যাত এপ্রিল থিসিস ঘোষণা করেন। তিনি বলেন – সেনাবাহিনীকে শাস্তি কৃষকদের জমি শ্রমিকদের রুটি দিতে হবে এবং সব ক্ষমতা থাকবে সোভিয়েতের হাতে। ফলে কৃষক, শ্রমিকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে বলশেভিক দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।

বলশেভিক দল ও সংকট সমাধান – এমতাবস্থায় জেনারেল কর্নিলভ-এর অভ্যুত্থান ঘটলে প্রথমে কেরেনস্কি কর্নিলভের সাহায্যে বলশেভিকদের দমন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কর্নিলভ একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হলে কেরেনস্কি বলশেভিকদের সাহায্য প্রার্থনা করেন। বলশেভিকরা সাহায্য করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

বিদ্রোহ – কিন্তু ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে বলশেভিকরা অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করলেও কেরেনস্কি সরকার তা কঠোর হাতে দমন করে। ২৫ অক্টোবর শ্রমিকদের বিশাল বিক্ষোভ মিছিলে পেট্রোগ্রাড শহর উত্তাল হয়ে ওঠে। সোভিয়েত সৈন্যরা গিয়ে সরকারি বাড়ি, টেলিগ্রাফ অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, সরকারি ব্যাংক ইত্যাদি দখল করে। ট্রটস্কি-র নেতৃত্বে ‘রেড গার্ড’ বা ‘লাল ফৌজ’ ছিল এই কর্মকাণ্ডের মূল নায়ক।

সরকারের পতন ও ক্ষমতা দখল – ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ৭ নভেম্বর লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকদের বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানে অস্থায়ী সরকার ভেঙে পড়ে এবং বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করে। লেনিনের নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন সমাজতান্ত্রিক সরকার।

প্যারিসের শান্তি সম্মেলন (Paris Peace Conference) – টীকা লেখো।

১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ নভেম্বর জার্মানির আত্মসমর্পণের পর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জানুয়ারি প্যারিস সম্মেলনে বিজয়ীপক্ষের ৩২টি দেশের প্রতিনিধিগণ সমবেত হন।

প্যারিস সম্মেলনে যোগদানকারী রাষ্ট্র – প্যারিস সম্মেলনে যোগদানকারী রাষ্ট্রগুলি ছিল ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আমেরিকা, ইটালি, পোল্যান্ড, বেলজিয়াম, চেকোশ্লোভাকিয়া, যুগোশ্লাভিয়া, চিন, জাপান, গ্রিস ইত্যাদি।

প্যারিস সম্মেলনে সমবেত নেতৃবৃন্দের মধ্যে সম্মেলনের প্রকৃত নিয়ন্তা চারজন রাষ্ট্রপ্রধান হলেন –

  • আমেরিকার রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson),
  • ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ (Lloyd George),
  • ফরাসি প্রধানমন্ত্রী জর্জ ক্লেমেনশোঁ (George Clemenceau),
  • ইটালির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টোরিও অর্ল্যান্ডো (Vittorio Orlando)। এরা চার প্রধান বা ‘বিগ ফোর’ (Big Four) নামে পরিচিত ছিলেন। এই সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেনশো।
প্যারিসের শান্তি সম্মেলন (Paris Peace Conference)

সম্মেলনের উদ্দেশ্য – প্যারিস সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল — 

  • পরাজিত রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে বিজয়ীপক্ষের সন্ধির শর্ত নির্ধারণ করা।
  • আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা।

প্যারিস সম্মেলনের রচিত সন্ধির খসড়া – সমবেত রাষ্ট্রনেতাগণ দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর প্যারিস সম্মেলনে ৫টি সন্ধি রচনা করেছিলেন।

  • জার্মানির সঙ্গে ভার্সাই সন্ধি (Treaty of Versailles)।
  • অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সেন্ট জার্মেইনের সন্ধি (Treaty of St. Germain)।
  • বুলগেরিয়ার সঙ্গে নিউলির সন্ধি (Treaty of Neuilly)।
  • হাঙ্গেরির সঙ্গে ট্রিয়াননের সন্ধি (Treaty of Treanan।
  • তুরস্কের সঙ্গে সেভরের সন্ধি (Treaty of Sevres)।

প্যারিস সম্মেলনে ৭০ জন রাজনীতিবিদ এবং ১০৩৭ জন প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এই উদ্দেশ্যে ৫৬টি কমিশন নিয়োগ করা হয়। তা সত্ত্বেও প্যারিস সম্মেলনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক অসুবিধা হয়েছিল। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সমবেত রাষ্ট্রনেতাগণ বিভিন্ন সন্ধিপত্রগুলি রচনা করেছিলেন।

উড্রো উইলসন – এর চোদ্দো দফা নীতি ঘোষণার প্রেক্ষিত বা পটভূমি সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উড্রো উইলসন ছিলেন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম রাষ্ট্রপতি। তিনি ছিলেন সৎ ও আদর্শবাদী। তিনি বিশ্বের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁর বিখ্যাত ‘চোদ্দো দফা নীতি’ ঘোষণা করেন।

উড্রো উইলসনের চোদ্দো দফা নীতি ঘোষণার প্রেক্ষিত –

  • উড্রো উইলসনের সততা – আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন ছিলেন সৎ ও আদর্শবাদী।
  • যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে উইলসনের অভিমত – ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ২ এপ্রিল উড্রো উইলসন যুদ্ধের আদর্শ ঘোষণা করে বলেছিলেন যে, কোনোরকম স্বার্থ চরিতার্থ করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য হল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বের নিরাপত্তা বিধান করা। রাজনৈতিক স্বাধীনতার উপর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং মানবাধিকার রক্ষা করা। কোনো রাজ্যগ্রাস বা প্রভুত্ব স্থাপন আমাদের উদ্দেশ্য নয়। এটি ছিল মিত্রপক্ষের যুদ্ধের আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রথম ঘোষণা।
  • লয়েড জর্জের ঘোষণা – ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ৫ জানুয়ারি ঘোষণা করেন যে, জার্মান সাম্রাজ্য, তুরস্ক সাম্রাজ্য বা অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্য ধ্বংস করা বা দখল করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য হল শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
  • উইলসনের চোদ্দো দফা ঘোষণা – লয়েড জর্জের ঘোষণার তিন দিন পর ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ জানুয়ারি উড্রো উইলসন মার্কিন কংগ্রেসে স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য তাঁর বিখ্যাত ‘চোদ্দো দফা নীতি’ ঘোষণা করেন।

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় উড্রো উইলসন – এর চোদ্দো দফা নীতি কী ভূমিকা নিয়েছিল?

মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন আমেরিকাকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। পরবর্তীকালে যুদ্ধে যোগদান করলেও তিনি বারবার শাস্তি স্থাপনের উপর জোর দেন। বিশ্বে দীর্ঘকালীন শান্তির ভিত্তি হিসেবে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ জানুয়ারি তাঁর বিখ্যাত ‘চোদ্দো দফা’ নীতি ঘোষণা করেন।

উইলসনের আদর্শ – উড্রো উইলসন পৃথিবীতে অশান্তির কারণ হিসেবে গোপন কূটনীতি, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে পদানত করে রাখা ও স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রকে দায়ী বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, বিশ্বশান্তির জন্য প্রত্যেকটি জাতির স্বাধীনতা জরুরি। বিশ্ববাসীর সামনে তিনি কয়েকটি বিকল্প পথের সন্ধান দেন —

  • পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমস্যা ও বিবাদের সমাধান করতে হবে।
  • প্রত্যেক পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীকে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দিতে হবে।
  • প্রত্যেকটি স্বাধীন দেশে গণতান্ত্রিক শাসন প্রবর্তন করতে হবে।
  • বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন তৈরি করা হবে।
  • কোনো ঔপনিবেশিক শক্তির ঔপনিবেশিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সময় সেখানকার জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করতে হবে।
  • অস্ত্রশস্ত্রের পরিমাণ কমাতে হবে।

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা – উইলসনের আদর্শের উপর ভিত্তি করেই পূর্ব ও মধ্য ইউরোপে জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটে এবং পোল্যান্ড, চেকোশ্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, রুমানিয়া-সহ বিভিন্ন রাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করে। তাঁর চোদ্দো দফা নীতির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই আন্তর্জাতিক বিরোধ-মীমাংসা ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ পরিবেশের মধ্যে উইলসনের আদর্শবাদ বিশ্বকে এক নতুন মূল্যবোধের সন্ধান দিয়েছিল।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে কেন বিশ্ব অর্থনীতি মহামন্দার (The Great Depression) কবলে পড়ে?

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র-সহ ইউরোপীয় দেশগুলিতে যে আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছিল, তাকে ঐতিহাসিক ও অর্থনীতিবিদরা ‘মহামন্দা’ বা Great Depression বলে উল্লেখ করেছেন।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে মহামন্দার কারণ

বিশ্বব্যাপী মহামন্দার পিছনে প্রধান কারণগুলি ছিল —

  • কৃষিসংকট – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কৃষিজ পণ্যের চাহিদা থাকায় কৃষকরা প্রচুর ঋণ নিয়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু যুদ্ধের শেষে কৃষিজ পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে হ্রাস পেলে কৃষকরা চরম আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হয়।
  • মার্কিন বাণিজ্যে সংকোচন – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ভোগ্যপণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে আমেরিকার উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শেষে ইউরোপে মার্কিন পণ্যের রপ্তানি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হয়।
  • ঋণ বৃদ্ধি  – সমৃদ্ধির সময় থেকে আমেরিকানদের মধ্যে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
  • শেয়ার বাজারে ধস – বিংশ শতকের দুইয়ের দশকে আমেরিকাবাসীরা শেয়ার বাজারের প্রত্যাশিত সমৃদ্ধির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে শেয়ার বাজারে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে। প্রথমদিকে শেয়ারের দাম বাড়লেও অচিরেই শেয়ারের দাম কমতে থাকে। এর ফলে আমেরিকার অর্থনীতিতে মন্দা নেমে আসে।
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে কেন বিশ্ব অর্থনীতি মহামন্দার (The Great Depression) কবলে পড়ে

উপরোক্ত কারণগুলি ছাড়াও আরও অনেক কারণ ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের বিশ্বব্যাপী মহামন্দার জন্য দায়ী ছিল।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের মহামন্দার সমকালীন ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর কী প্রভাব পড়েছিল?

অর্থনীতির ভাষায় দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক কার্যকলাপের ধীরগতি বা বাণিজ্যের সংকোচনকে মন্দা (Depression) বলা হয়। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপ ও আমেরিকা-সহ সারা বিশ্বে যে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়, তাকে ‘১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের মহামন্দা’ (The Great Depression of 1929 ) বলা হয়।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মহামন্দার প্রভাব –

  • শেয়ার ক্রেতাদের বিপর্যয় – ইউরোপ ও আমেরিকার লক্ষ লক্ষ মানুষ শেয়ার কিনে অর্থ বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু শেয়ার বাজারে ধস নামায় তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, অনেকে সর্বস্বান্তও হয়ে পড়েছিল।
  • ব্যাংক ব্যবস্থায় বিপর্যয় – ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক ব্যাংকই শেয়ার বাজারে অর্থলগ্নি করেছিল। শেয়ার বাজারের বিপর্যয়ের ফলে তাদের লগ্নি করা অর্থ  হাতছাড়া হয়ে যায়। তা ছাড়া ব্যাংকগুলি সাধারণ মানুষকে যে ঋণ দিয়েছিল সেগুলিও আমার ফেরত পায়নি। এর ফলে শুধু আমেরিকাতেই ৫৭০টি নর হে ব্যাংক বন্ধ হয় ও ৩৫০০টি ব্যাংক তাদের লেনদেন বন্ধ করে দেয়।
  • শিল্প উৎপাদনে বিপর্যয় – ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের আর্থিক মন্দার ফলে শিল্পে উৎপাদন হ্রাস পায়। ফলে শিল্পমালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনে বিপর্যয় দেখা দেয়।
  • বেকার সমস্যা বৃদ্ধি – ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের মহামন্দার প্রভাবে ইউরোপ ও আমেরিকায় বেকার সমস্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। শুধু আমেরিকায় ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে বেকারের সংখ্যা ছিল ১০ লক্ষ। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তা বেড়ে হয়েছিল দেড় কোটি। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের অর্থনৈতিক মহামন্দার প্রভাব শুধু ইউরোপ আমেরিকা নয়, সারা বিশ্বের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছিল। এর পরিণতিতে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়।
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের মহামন্দার সমকালীন ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর কী প্রভাব পড়েছিল

লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি (New Economic Policy) বা সংক্ষেপে NEP সম্বন্ধে একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লেখো।

লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় সাম্যবাদী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও কিছুদিনের মধ্যে রুশ জনগণ সোভিয়েত সরকারের বিরোধিতা করতে শুরু করে। দেশে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। উৎপাদন হ্রাস পায়, জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে। এমনকি কৃষক বিদ্রোহ, নৌবিদ্রোহ ও শিল্পসংকটও পরিলক্ষিত হয়। এই অবস্থায় লেনিন ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে দশম পার্টি কংগ্রেসে ‘নতুন অর্থনৈতিক নীতি’ (NEP) ঘোষণা করেন।

লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি (New Economic Policy) বা NEP-র গৃহীত ব্যবস্থাসমূহ

কৃষিক্ষেত্রে –

  • আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষির উৎপাদনে জোর দেওয়া হয়।
  • কৃষকদের উদ্‌বৃত্ত শস্য বাজারে বিক্রি করার অধিকার দেওয়া হয়।
  • কৃষি ব্যাংক তৈরি করে কৃষকদের ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

শিল্পক্ষেত্রে –

  • যেসব শিল্পকারখানায় ২০ জনের কম শ্রমিক কাজ করে তাদের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
  • শ্রমিকদের দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুসারে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
  • [শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিদেশি মূলধনকে স্বাগত জানানো হয়েছিল।

ব্যাবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে –

  • ব্যাংক ব্যবস্থা, বৈদেশিক বাণিজ্য, পরিবহণ ব্যবস্থা, বৃহৎ শিল্প সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
  • দেশে ব্যাবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ উঠে গিয়েছিল।
  • সরকারি বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করে মূল্যবৃদ্ধি রদ করা হয়।

NEP-র প্রকৃতি – অনেক ঐতিহাসিক বলেন, লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি ছিল সাম্যবাদ থেকে বিচ্যুত হয়ে ধনতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের প্রথম ধাপ। আবার অনেকে বলেন, লেনিনের নতুন অর্থনীতি ছিল প্রয়োজনভিত্তিক মিশ্র অর্থনীতি। আসলে লেনিন পুঁথিগত কমিউনিজম থেকে বাস্তব প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে NEP গ্রহণ করেছিলেন।

হুভার স্থগিতকরণ বা হুভার মোরাটোরিয়াম (Hoover Moratorium)- টীকা লেখো।

হারবার্ট ক্লার্ক হুভার (Herbert Clark Hoover) ছিলেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি (১৯২৯-১৯৩৩ খ্রি.)। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন তিনি ঘোষণা করেন যে, ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ১ জুলাই থেকে এক বছরের জন্য বিভিন্ন দেশ পরস্পরের ঋণশোধ করা স্থগিত রাখবে। এই ঘোষণা হুভার স্থগিতকরণ’ বা হুভার মোরাটোরিয়াম’ (Hoover Moratorium) নামে পরিচিত।

হুভার স্থগিতকরণ বা হুভার মোরাটোরিয়াম (Hoover Moratorium)-টীকা লেখো।

হুভার মোরাটোরিয়ামের পটভূমি –

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ভার্সাই সন্ধিতে মিত্রপক্ষ জার্মানির উপর বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণের বোঝা চাপিয়ে দেয়। জার্মানি যাতে মিত্রশক্তির ক্ষতিপূরণের অর্থ দিতে পারে সেজন্য আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র জার্মানিকে ডয়েজ (Dawes) ও ইয়ং (Young) পরিকল্পনা অনুসারে ঋণ দিত। জার্মানি সেই অর্থ দিয়ে মিত্রশক্তির পাওনা মেটাত। আবার মিত্রশক্তিভুক্ত দেশগুলি সেই অর্থ দিয়ে যুদ্ধকালে আমেরিকার কাছে নেওয়া ঋণের টাকা শোধ করত।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের অর্থনৈতিক মহামন্দা সৃষ্টি হলে আমেরিকার পক্ষে জার্মানিকে ঋণ দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এদিকে জার্মানিও আমেরিকার সাহায্য না পাওয়ার জন্য মিত্রশক্তির ক্ষতিপূরণের অর্থ দিতে পারছিল না। এর ফলে আন্তর্জাতিকক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়।

এই সংকট মোচনের জন্য আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হুভার (Hoover) তাঁর ঋণশোধ স্থগিতকরণের নীতি ঘোষণা করেন।

হুভার মোরাটোরিয়ামের ফলে আমেরিকা আর্থিক দিক থেকে লাভবান হয়নি। ১৯৩৩-এর নির্বাচনে হুভারের রিপাবলিকান দল পরাজিত হয় এবং ডেমোক্র্যাটিক দলের ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট (Franklin Roosevelt) রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট মনরো এক ঘোষণার দ্বারা ইউরোপীয় শক্তিগুলিকে আমেরিকায় হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত করেন (১৮২১ খ্রি.)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত (১৮২১-১৯১৭ খ্রি.) এই বিচ্ছিন্নতা বজায় থাকে। পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ইউরোপের রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র –

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধে – প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে (১৯১৪-১৮ খ্রি.) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিত্রপক্ষে (ব্রিটেন, ফ্রান্স) যোগদান করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ, অস্ত্র ও ঋণলাভ করে মিত্রপক্ষ নানাভাবে উপকৃত হয়। মিত্রপক্ষের শক্তিবৃদ্ধির ফলে জার্মানির পতন ত্বরান্বিত হয়। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ২ এপ্রিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উদ্দেশ্য হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন ঘোষণা করেন যে, ‘গণতন্ত্রের জন্য বিশ্বের নিরাপত্তা বিধান করা এবং মানবাধিকার রক্ষা করা আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।’ এটিই ছিল মিত্রপক্ষের যুদ্ধের আদর্শ সম্পর্কে প্রথম ঘোষণা ৷
  • জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠায় – উড্রো উইলসন ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ জানুয়ারি বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর বিখ্যাত ‘চোদ্দো দফা নীতি’ ঘোষণা করেন। এই চোদ্দো দফা-র সর্বশেষ দফায় জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। তাঁর আদর্শের ভিত্তিতেই জাতিসংঘ (League of Nations) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ এপ্রিল।
  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বে – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে মিত্রপক্ষ ভার্সাই সন্ধিতে জার্মানির উপর কঠোর অর্থনৈতিক শর্ত আরোপ করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মানিকে ঋণ দিয়ে ইউরোপীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভারসাম্য বজায় রেখেছিল।
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠায় – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলিকে সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠাতেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

পরিশেষে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ইটালিতে মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট দলের উত্থানের কারণ কী ছিল?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে যেসব দেশে একনায়কতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল এবং যারা ইউরোপ ও বিশ্বের ইতিহাসে আলোড়ন তুলেছিল সেই দেশগুলির অন্যতম ছিল ইটালি। ইটালিতে বেনিটো মুসোলিনি (Benito Mussolini) – র নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল।

ইটালিতে মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট দলের উত্থানের কারণ কী ছিল

মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট দলের উদ্ভবের কারণ

মুসোলিনির নেতৃত্বে ইটালিতে ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রের উদ্ভবের কারণগুলি হল —

  1. ভার্সাই সন্ধির অতৃপ্তি – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার সঙ্গে ইটালি ত্রিশক্তি মৈত্রীতে আবদ্ধ হলেও প্রকৃতপক্ষে বিশ্বযুদ্ধের সূচনায় ইটালি যোগদান করেছিল ইংল্যান্ড জারিয়া ও ফ্রান্সের পক্ষে। অর্থাৎ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইটালি ছিল বিজয়ী পক্ষ। কিন্তু ভার্সাই সন্ধিতে ইটালি তার প্রত্যাশামতো ফিউম বন্দর, আলবেনিয়া প্রভৃতি লাভে ব্যর্থ হয়ে মিত্রশক্তির উপর ক্ষুব্ধ হয়েছিল।
  2. অর্থনৈতিক বিপর্যয় – প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রভূত অর্থ ও জীবনহানি ঘটায় ইটালি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। একদিকে মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটেছিল, অপরদিকে কৃষি ও শিল্পে বিপর্যয় হওয়ার দরুন তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল।
  3. গণতান্ত্রিক সরকারের ব্যর্থতা – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর নির্বাচনের মাধ্যমে ইটালিতে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকার সমস্যা, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইটালির মর্যাদা হ্রাস, শিল্পের অবক্ষয় প্রভৃতি কারণে ইটালিবাসীর মনে গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল।
  4. রুশ সাম্যবাদের প্রভাব – এই সময় রাশিয়ায় সাম্যবাদী বলশেভিক সরকারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইটালির কৃষক ও শ্রমিকরা সাম্যবাদী সরকার গঠনে উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠেছিল। এমতাবস্থায় ইটালির গণতান্ত্রিক সরকার তাদের দমন করতে অপারগ ছিল। ইটালির ভূস্বামী ও শিল্পপতিরাও দুর্বল সরকারের পরিবর্তে শক্তিশালী সরকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়েছিল।
  5. প্রচার – মুসোলিনি ও তাঁর ফ্যাসিস্ট দলের প্রচার ইটালিবাসীকে মোহিত করে। মুসোলিনি প্রাচীন রোমের গৌরব পুনরুদ্ধার এবং ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। ফলে মুসোলিনি ও ফ্যাসিস্ট দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।

এই পরিস্থিতিতে ইটালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দলের নেতৃত্বে একনায়কতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল।

ফ্যাসিবাদের (Fascism) মূল নীতিগুলি বা বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

ফ্যাসিবাদ (Fascism) হল ইটালিতে বেনিটো মুসোলিনি-র নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট দল পরিচালিত এক বিশেষ রাজনৈতিক মতবাদ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, ‘ফ্যাসিবাদ হল উগ্র জাতীয়তাবাদী ও আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত একদলীয় একনায়কতন্ত্রী শাসনব্যবস্থা এবং একটি সর্বনিয়ন্ত্রণবাদী মতবাদ।’

ফ্যাসিবাদের মূল নীতি বা বৈশিষ্ট্য –

  • সর্বশক্তিমান ও সর্বনিয়ন্ত্রণবাদী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা – ফ্যাসিবাদের মূলনীতি হল রাষ্ট্রের চূড়ান্ত প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে জনগণের উপর রাষ্ট্রের অধিকার সর্বাধিক। ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্র নয়— রাষ্ট্রের জন্য ব্যক্তি – এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • একদলীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা – ফ্যাসিবাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল একদলীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে যে – কোনো বিরোধী দলের অস্তিত্ব লুপ্ত করার জন্য গ্রেফতার, হত্যা এবং সন্ত্রাস সৃষ্টির পথ অনুসরণ করা হয়।
  • ব্যক্তিস্বাধীনতার উপেক্ষা – ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কাছে জনগণের আত্মসমর্পণ বাধ্যতামূলক। ব্যক্তি রাষ্ট্রের জন্য বলিপ্রদত্ত।
  • উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদে সমর্থন – ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র জল প্রকৃতিগতভাবে উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী। তাদের মতে, সাম্রাজ্যবিস্তার জাতির ‘পবিত্র কর্তব্য’ এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ‘কাপুরুষের স্বপ্ন’।
  • কর্পোরেট রাষ্ট্র – ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য সার্বিক চেষ্টা করে। খাদ্যসংকট, নৈরাজ্য ও বেকার সমস্যার সমাধান, শিল্পের জাতীয়করণ, শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজ ও বিভিন্ন সুযোগসুবিধা জার্মা প্রদান, বাণিজ্যের উন্নতি, পথ ও পরিবহনের উন্নতি, জনমানসে রাষ্ট্রের জৌলুস বৃদ্ধি করে। কিন্তু ক্ষমতা থাকে একনায়কের হাতে। এখানে খ্রিষ্টধর্ম প্রধান হলেও চার্চের কর্তৃত্ব হ্রাস পায়। চার্চের সম্পত্তির জাতীয়করণ করা হয়।

ফ্যাসেস বা ফ্যাসিও শব্দ থেকে ফ্যাসিস্ট কথাটি এসেছে। এর অর্থ দণ্ডের আটি বা শলাকাগুচ্ছ। প্রাচীন রোমের কনসালরা এই রকম শলাকাগুচ্ছ বহন করতেন। এই প্রতীকের অর্থ হল — একতাই শক্তি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে ইটালি ও জার্মানির ফ্যাসিবাদী মতবাদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি রচনা করেছিল।

ভাইমার প্রজাতন্ত্র (Weimar Republic ) – টীকা লেখো।

ভাইমার প্রজাতন্ত্র (Weimar Republic) – প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয় এবং জার্মানির সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম হল্যান্ডে পালিয়ে যান। ফলে জার্মানিতে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং সমাজতান্ত্রিক নেতা ফ্রেডরিখ ইবার্টের (Friedrich Ebert) নেতৃত্বে প্রজাতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। জার্মানির ভাইমার শহরে এই প্রজাতান্ত্রিক সরকারের প্রথম অধিবেশন বসেছিল বলে, একে ভাইমার প্রজাতন্ত্র’ (Weimar Republic) বলা হয়। এই সরকারের চ্যান্সেলার নিযুক্ত হন ইবার্ট। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে গণতান্ত্রিক জাতীয় পরিষদ (National Assembly) নির্বাচিত হয়। এই পরিষদ সুইজারল্যান্ডের অনুকরণে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করে।

কার্যকলাপ – এই সরকারের প্রথম কাজ ছিল মিত্রশক্তির সঙ্গে সন্ধির শর্ত নিয়ে আলোচনা করা। ভার্সাই সন্ধির বিভিন্ন সংশোধনী দাবি করে ব্যর্থ হলে এই সরকার বাধ্য হয়ে ভার্সাই সন্ধি স্বাক্ষর করে ( ২৮ জুন, ১৯১৯ খ্রি.)। এই সন্ধির বিরুদ্ধে জার্মানিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও নতুন সরকার শর্তপালনে সচেষ্ট হয়। এ ছাড়া অর্থনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায়ও এই সরকার তৎপর হয়।

ভাইমার প্রজাতন্ত্রের ব্যর্থতা – জন্মলগ্ন থেকেই ভাইমার প্রজাতন্ত্র নানান জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। বিভিন্ন সমস্যা জর্জরিত জার্মানিতে ভাইমার প্রজাতন্ত্রের কার্যাবলিকে ঐতিহাসিকগণ ‘আগ্নেয়গিরির উপর নৃত্য’ (The Dance on Volcano) বলে বর্ণনা করেছেন।

প্রথমত – প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানিকে অপমানজনক ভার্সাই সন্ধি মেনে নিতে হয়।

দ্বিতীয়ত – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্যাভাব, বেকারত্ব প্রভৃতি ভাইমার প্রজাতন্ত্রের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব হয়নি।

পরিশেষে ভাইমার প্রজাতন্ত্রের প্রতি হতাশ জনগণ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি দলের উত্থান ঘটায়।

বিংশ শতকে ইউরোপের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিবর্তনগুলি বিশ্বের ইতিহাসের গতিপথকে বদলে দেয়। এই পরিবর্তনগুলির পিছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করেছিল। এই অধ্যায় থেকে আমরা এই পরিবর্তনগুলি সম্পর্কে জানতে পারি এবং ইতিহাসের গতিপথ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি করতে পারি।

Rate this post


Join WhatsApp Channel For Free Study Meterial Join Now
Join Telegram Channel Free Study Meterial Join Now

মন্তব্য করুন