নবম শ্রেণী – ইতিহাস – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তারপর – ব্যাখ্যামূলক উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন ও উত্তর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে প্রায় ৬০ মিলিয়ন মানুষ নিহত হয় এবং বিশ্বের অনেক দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়।

Table of Contents

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তারপর – ব্যাখ্যামূলক উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন ও উত্তর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটনে হিটলারের দায়িত্ব আলোচনা করো।

হিটলারের ভূমিকা – নাৎসি নেতা হিটলারের মেইন ক্যাম্প (Mein Kampf) গ্রন্থে হিটলার স্বয়ং Pan Germanism – এর ধারণার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। হিটলার চেয়েছিলেন, ব্রিটেনের সহযোগিতায় জার্মানিকে এক বিশ্বশক্তিতে পরিণত করতে এবং সোভিয়েত রাশিয়া দখলের মাধ্যমে বসবাসের উপযোগী ভূখণ্ডের সমস্যার সমাধান করতে। হিটলারের কথায় যুদ্ধ ঘটত অনিবার্যভাবেই। হয়তো তাকে কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া যেত, কিন্তু এড়ানো যেত না। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের Hossbach Report – এ যুদ্ধের অনিবার্যতার উল্লেখ রয়েছে।

হিটলারের ভার্সাই সন্ধি অমান্য – ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে হিটলার জার্মানির ক্ষমতা দখল করেন। এরপর তিনি ভার্সাই সন্ধির বিভিন্ন ধারা অমান্য করতে শুরু করেন। যেমন –

  • ক্ষতিপূরণ দান বন্ধ করেন
  • সার অঞ্চলের সংযুক্তিকরণে গণভোটকে প্রহসনে পরিণত করেন
  • বেসামরিক রাইন অঞ্চলে সৈন্যসমাবেশ করেন
  • জার্মানিতে জেনারেল স্টাফ পদ পুনরায় চালু করেন
  • প্রথমে ৩৬, পরে ৬৫ ডিভিশন পদাতিক এবং বিমান ও নৌবহর গড়ে তোলেন
  • বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা চালু করেন
  • জার্মানির হারানো অঞ্চলগুলির পুনরুদ্ধারের দাবি করেন প্রভৃতি।

হিটলারের আগ্রাসী নীতি –

স্পেন – সমকালীন ইউরোপে মুসোলিনি ও হিটলার একনায়করূপ ধারণ করেছিলেন। এসময় স্পেনে রাজনৈতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। স্পেনের বিদ্রোহী সেনাপতি ফ্রাঙ্কোকে হিটলার সামরিক সাহায্য দেন ও সফল হন।

অস্ট্রিয়া – প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির মিত্র ছিল অস্ট্রিয়া। যুদ্ধ শেষে জার্মানির মতো অস্ট্রিয়াও সেন্ট জার্মেইন সন্ধি দ্বারা শাস্তি লাভ করে। কিন্তু হিটলার অস্ট্রিয়ার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে অস্থিরতার সৃষ্টি করেন। তারপর বলপূর্বক অস্ট্রিয়া দখল করেন। তিনি এর নাম দেন আনস্লুজ।

চেকোশ্লোভাকিয়া – জার্মানির প্রতিবেশী নবগঠিত চেকোশ্লোভাকিয়া রাষ্ট্রের সুদেতান অঞ্চল জার্মান অধ্যুষিত ছিল। হিটলার এই অঞ্চলটি জার্মানির সঙ্গে সংযুক্তির দাবি করেন। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের মিউনিখ চুক্তি দ্বারা ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইটালি হিটলারের দাবি মেনে সুদেতান অঞ্চল জার্মানিকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু অল্পকালের মধ্যে হিটলার সমগ্র চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করেন।

মেমেল বন্দর দখল – হিটলার জার্মানির প্রতিবেশী লিথুয়ানিয়ার মেমেল বন্দর দখল করেন (১৯৩৯ খ্রি.)।

পোল্যান্ড – এরপর হিটলার পোল্যান্ডের ডানজিগ বন্দর দাবি করেন। জার্মানির সঙ্গে ডানজিগের সংযোগপথ পোলিশ করিডরের ঘটনায় শেষ পর্যন্ত হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করেন (১ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ খ্রি.)।

ঐতিহাসিকদের মতামত – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংঘটন হিটলারের দ্বারাই ত্বরান্বিত হয়েছিল কি না তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্কের শেষ নেই। ই এইচ কার (EH Carr), জি হার্ডি (G Herdy) প্রমুখ বলেন, জার্মানির সাম্রাজ্যবিস্তার নীতি ও উগ্র জাতীয়তাবাদের পরিণতি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মরিস বুমন্ট (Maurice Baumont) বলেন যে, হিটলার কর্তৃক যুদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে হিটলারের যুদ্ধ রূপে অভিহিত করা অধিক যুক্তিযুক্ত। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। এ জে পি টেলর (A JP Taylor)-এর মতে এই বিশ্বযুদ্ধ মোটেই পূর্ব পরিকল্পিত ছিল না। হিটলার মোটেও যুদ্ধ চাননি। তিনি স্নায়ুযুদ্ধের মাধ্যমে তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছোতে চেয়েছিলেন।

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তোষণনীতি (British and French Policy of Appeasement) গ্রহণের কারণ কী ছিল? কীভাবে তা রূপায়িত হয়? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য এই তোষণনীতি কতখানি দায়ী ছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স কর্তৃক অনুসৃত জার্মানি ও ইটালির প্রতি তোষণনীতি (British and French Policy of Appeasement)। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ভার্সাই সন্ধির পর ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স ইউরোপের শান্তি বজায় রাখার জন্য ইটালি ও জার্মানিকে যে সুবিধা দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছিল, তা তোষণনীতি নামে পরিচিত। এই তোষণনীতির উদগাতা হলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বাউইন (Baldwin) ও নেভিল চেম্বারলেন (Neville Chamberlain)।

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তোষণনীতি গ্রহণের কারণ

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তোষণনীতি গ্রহণের কারণ হল –

সাম্যবাদভীতি – ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের কাছে ফ্যাসিবাদ ও সাম্যবাদ সমান বিপজ্জনক ছিল। তারা – আপাতত সাম্যবাদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী জার্মানি ও ইটালিকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

ভার্সাই সন্ধির অন্যায় প্রতিকার – ভার্সাই সন্ধির পরবর্তীকালে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স মনে করেছিল যে, তারা ভার্সাই সন্ধিতে ইটালি ও জার্মানির প্রতি অন্যায় করেছে। সুতরাং এখন তাদের উচিত ইটালি ও জার্মানিকে কিছু সুযোগসুবিধা প্রদান করা।

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তোষণনীতির রূপায়ণ –

জার্মানির নৌশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা – ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বাল্ডউইনের আমলে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইঙ্গ-জার্মান নৌ-চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির ফলে জার্মানি তাদের নৌশক্তি ব্রিটিশ নৌবহরের ৩৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি করার অনুমতি লাভ করেছিল। ফলে জার্মানির নৌবহর শক্তিশালী হয়েছিল।

ইটালির আবিসিনিয়া দখলে উদাসীনতা – ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স ইটালির আবিসিনিয়া দখলের সময় উদাসীন থেকে পরোক্ষভাবে ইটালির সাম্রাজ্যবিস্তারে ইন্ধন জুগিয়েছিল।

রাইন উপত্যকা অধিকার – ভার্সাই ও লোকার্নো চুক্তির শর্তাবলি উপেক্ষা করে জার্মানি বিনা বাধায় রাইন অঞ্চলটি দখল (১৯৩৬ খ্রি.) করলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তার কোনো প্রতিবাদ করেনি।

স্পেনে বিদ্রোহ – স্পেনের গৃহযুদ্ধে (১৯৩৬-৩৯ খ্রি.) রাশিয়ার মদতপুষ্ট প্রজাতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে জার্মানি ও ইটালি বিদ্রোহীদের নেতা ফ্রাঙ্কোর সমর্থনে এগিয়ে এলেও ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে।

অস্ট্রিয়ার সংযুক্তি – ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি-অস্ট্রিয়ার সংযুক্তিকরণের বিষয়ে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স তোষণনীতি অনুসরণ করে জার্মানির বিরুদ্ধে কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে জার্মানি শক্তিশালী হয়েছিল।

মিউনিখ চুক্তি – মিউনিখ চুক্তি ছিল জার্মানির প্রতি ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের অনুসৃত তোষণনীতির চূড়ান্ত নিদর্শন। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে মুসোলিনির মধ্যস্থতায় ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুসারে হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চল লাভ করে। এই চুক্তির ছ-মাসের মধ্যেই হিটলার সমগ্র চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নিয়েছিল।

সাম্রাজ্যবাদী স্পৃহা – ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে জাপানের মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ এবং ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ইটালির আবিসিনিয়া দখলের সময় ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের উদাসীনতা একনায়কতন্ত্রী দেশগুলির সাম্রাজ্যবাদী স্পৃহাকে আরও বৃদ্ধি করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য তোষণনীতির দায়িত্ব –

হিটলার ও মুসোলিনির শক্তিবৃদ্ধি – ব্রিটেন ও ফ্রান্স ইটালি ও জার্মানিকে খুশি রেখে ইউরোপে শাস্তি বজায় রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু ইটালি ও জার্মানির প্রতি তোষণনীতি গ্রহণের ফলে মুসোলিনি ও হিটলারের ক্ষমতা ও রাজ্যজয়ের আকাঙ্ক্ষা বেড়ে গিয়েছিল।

তোষণনীতির ব্যর্থতা – ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স অনুসৃত তোষণনীতির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছিল। এর ফলে হিটলার ও মুসোলিনির সাম্রাজ্যবাদী স্পৃহা বেড়েছিল এবং এর চরম পরিণতি ছিল হিটলারের পোল্যান্ড আক্রমণ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা। অধ্যাপক এ জে পি টেলর (AJ P Taylor) তোষণনীতিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য দায়ী করেছেন।

হিটলারের শক্তিবৃদ্ধি – ইঙ্গ-ফরাসি শক্তি জার্মানিকে খুশি করে ইউরোপের শাস্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেও ইঙ্গ-ফরাসি শক্তির এই তোষণনীতি জার্মান শাসক হিটলারের ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও রাজ্যজয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আরও বৃদ্ধি করে তোষণনীতির মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দেয়।

চেকোশ্লোভাকিয়া দখল – মিউনিখ চুক্তি একদিকে যেমন ছিল তোষণনীতির চূড়ান্ত পর্যায় তেমনি অন্যদিকে তার ব্যর্থতারও প্রকৃষ্টতম উদাহরণ। এই চুক্তি স্বাক্ষরকালে হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়ার অবশিষ্ট অংশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিশ্রুতি দিলেও মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সমগ্র চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে তোষণনীতির অসারতা প্রমাণ করে দেন।

ব্রিটিশ বিদেশনীতিতে পরিবর্তন – ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ থেকেই ব্রিটিশ বিদেশনীতিতে জার্মানবিরোধী প্রবণতা দেখা দেয় এবং জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণের পর ব্রিটেনের দিকে এগিয়ে আসতে পারে এই আশঙ্কায় ব্রিটেন-ফ্রান্স জার্মানির সঙ্গে সমঝোতার পথে এগিয়ে যায়।

রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি – একদিকে হিটলারের পশ্চিমের রণাঙ্গনে সর্বশক্তি প্রয়োগের প্রচেষ্টা ও অন্যদিকে রাশিয়ার সম্ভাব্য জার্মান আক্রমণ এড়ানোর অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসেবে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত হয় রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি।

যৌথ নিরাপত্তার সমাধি – তোষণনীতির সুযোগ নিয়ে মুসোলিনি আবিসিনিয়া দখলে (১৯৩৬ খ্রি.) উৎসাহিত হলে কিংবা হিটলার রাইন অঞ্চলে সেনাসমাবেশ করলেও (১৯৩৬ খ্রি.) পশ্চিমী রাষ্ট্রগুলি ও জাতিসংঘ এ বিষয়ে নীরব থাকে। ফলে জাতিসংঘের যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমাধি রচিত হয়। তাই তোষণনীতির ব্যর্থতা প্রসঙ্গে ডেভিড থমসন বলেছেন, “যে চুক্তিগুলির উপর তোষণনীতি দাঁড়িয়েছিল সেগুলি চূড়ান্ত ভ্রান্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়।”

পোল্যান্ড আক্রমণ – হিটলার ডানজিগ বন্দরে যাওয়ার জন্য পোলিশ করিডোর (Polish Corridor) দাবি করেন। কিন্তু এতে প্রত্যাখ্যাত হলে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর তিনি পোল্যান্ড আক্রমণ করেন। ব্রিটেন ও ফ্রান্স পোল্যান্ডের পক্ষে যোগ দিলে ৩ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (World War II) কারণগুলি কী কী ছিল?

ভূমিকা – প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ২০ বছরের ব্যবধানে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাষ্ট্রনেতাগণ জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বকে ভয়াবহ যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি রচিত হয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণগুলিকে দুভাগে ভাগ করা যায়। যথা — পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ কারণ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরোক্ষ কারণ –

ভার্সাই সন্ধির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া – ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ভার্সাই সন্ধিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিজয়ী মিত্রপক্ষ জার্মানির উপর অপমানজনক ভার্সাই সন্ধির শর্ত চাপিয়ে দিয়েছিল, যা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জার্মান জাতির পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। বরং জার্মান জাতির মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা জেগে উঠেছিল। জার্মানি এই একতরফা ও জবরদস্তিমূলক চুক্তি ভেঙে ফেলার সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তাই ঐতিহাসিক ই এইচ কার যথার্থই বলেছেন যে, ভার্সাই চুক্তির মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল।

উগ্র জাতীয়তাবাদ – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল জার্মানি, ইটালি ও জাপানের উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতি। হেরেনডক তত্ত্বে ” বিশ্বাসী হিটলার বলতেন, জার্মানরাই হল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি। তিনি জার্মানিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শক্তিতে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। হিটলারের আগ্রাসী নীতির সঙ্গে জার্মানির উগ্র জাতীয়তাবাদের সমন্বয়ে যে সাম্রাজ্যবাদী নীতির জন্ম হয়েছিল তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল।

অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদ – জার্মানির অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল। এই অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদকে চরিতার্থ করতে নাৎসি দলের ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে জার্মানিতে প্রাক্-বিশ্বযুদ্ধকালীন সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা – উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ভার্সাই সন্ধির ফলে জার্মানি তার উপনিবেশগুলি হারিয়েছিল এবং নতুন উপনিবেশ গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর ছিল। অপরদিকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আমেরিকা প্রভৃতি রাষ্ট্রগুলি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ বৃদ্ধি করেই চলেছিল। এমতাবস্থায় ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রগুলি নতুন উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়।

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তোষণনীতি – ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জার্মানির প্রতি তোষণনীতি গ্রহণ করেছিল। তারা ভেবেছিল, এভাবে হিটলারকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু তাদের এই কর্মপন্থা হিটলারের আগ্রাসী মনোভাবকে চূড়ান্ত মাত্রা দেয়। তবে এক্ষেত্রে বলা ভালো, জার্মানির থেকে রাশিয়াকে আরও বিপজ্জনক মনে করেই জার্মানির প্রতি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তোষণনীতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এই তোষণনীতির ফলে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির আগ্রাসন আরও বৃদ্ধি পায়।

নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনের ব্যর্থতা – জেনেভার নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে (১৯৩৩ খ্রি.) বৃহৎ শক্তিবর্গ জার্মানির অস্ত্রশক্তি হ্রাসে অত্যন্ত উদগ্রীব হলেও তারা নিজেদের অস্ত্রশক্তি হ্রাস করতে রাজি ছিল না। জার্মানি নিজের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সুযোগ না পেয়ে সম্মেলন ত্যাগ করে নিজের ইচ্ছামতো সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে।

জাতিসংঘের ব্যর্থতা – জাতিসংঘের ব্যর্থতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংকল্প নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু জাতিসংঘ তার কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়েছিল। জাতিসংঘ বৃহৎ শক্তিবর্গের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে অপারগ থাকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘনীভূত হয়ে উঠেছিল। ইটালির আবিসিনিয়া অধিকার কিংবা জাপানের মাঞ্জুরিয়া অধিকারের ঘটনায় জাতিসংঘ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল।

পরস্পরবিরোধী শক্তিজোট গঠন – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে পরস্পরবিরোধী শক্তিজোট গঠন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি রচনা করেছিল। একদিকে জার্মানি, ইটালি, জাপান এই অতৃপ্ত রাষ্ট্রগুলি রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তি গঠন করেছিল। অপরদিকে জোটবদ্ধ হয়ে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স গঠন করেছিল মিত্রশক্তি। যুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া যোগদান করে মিত্রশক্তিকে আরও জোরদার করেছিল।

প্রত্যক্ষ কারণ- হিটলারের পোল্যান্ড আক্রমণ – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল হিটলারের পোল্যান্ড আক্রমণ। রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তি গঠন হওয়ার পর হিটলার পোলিশ করিডর দাবি করেন। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড এই ঘোষণার বিরোধিতা করে পোল্যান্ডের পক্ষ নেবে বলে হুমকি দেয়। এই হুমকি নস্যাৎ করে দিয়ে হিটলার ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ করেন। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স পোল্যান্ডের সঙ্গে সামরিক সাহায্যের শর্তে চুক্তিবদ্ধ ছিল। তাই ৩ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স পোল্যান্ডের পক্ষে ও জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়।

সময়সারণির মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতি সম্পর্কে আলোচনা করো।

১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে। ৩ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতি –

১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ

১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর — জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণ – ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানবাহিনী আচমকা পোল্যান্ড আক্রমণ করে। সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই জার্মানবাহিনী পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ দখল করে নেয়।

১৭ সেপ্টেম্বর — রাশিয়ার পোল্যান্ড আক্রমণ – রুশ-জার্মান গোপন চুক্তি অনুসারে রাশিয়া ১৭ সেপ্টেম্বর পূর্ব পোল্যান্ড আক্রমণ করে। এক মাসের মধ্যেই জার্মানি ও রাশিয়া যথাক্রমে পশ্চিম ও পূর্ব পোল্যান্ড দখল করে নেয়।

৩০ নভেম্বর — রাশিয়ার ফিনল্যান্ড দখল – রাশিয়া ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর ফিনল্যান্ড দখল করে নেয়।

১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ – ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের মধ্যেই রাশিয়া বাল্টিক অঞ্চলের তিনটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া দখল করে নেয়।

পশ্চিম ইউরোপে জার্মানির দ্রুত অগ্রগতি – জার্মানবাহিনী দ্রুতগতিতে একের পর এক পশ্চিম ইউরোপের দেশ হল্যান্ড, লুক্সেমবুর্গ ও বেলজিয়াম দখল করে নেয়।

জার্মানির ফ্রান্স আক্রমণ – জার্মানবাহিনী ফ্রান্সকে তিনদিক থেকে আক্রমণ করে। ফলে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২১ নভেম্বরের মধ্যে ফ্রান্স আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

জার্মানির ব্রিটেন আক্রমণ – এরপর জার্মানি ব্রিটেন আক্রমণের চেষ্টা করে। কিন্তু জার্মানবাহিনী ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বাধা পেরিয়ে ব্রিটেনে প্রবেশ করতে পারে না। এই অবস্থায় জার্মান বিমানবাহিনী ব্রিটেনের উপর বোমাবর্ষণ করতে শুরু করে। কিন্তু ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর আক্রমণে জার্মানবাহিনী ব্যর্থ হয়।

১৯১৪ খ্রাষ্টাব্দে –

জার্মানির রাশিয়া আক্রমণ – জার্মানি রাশিয়ার সঙ্গে ১০ বছরের জন্য অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। সেই চুক্তি অগ্রাহ্য করে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন জার্মানি রাশিয়া আক্রমণ করে। প্রথমদিকে জার্মানি। রাশিয়ার কিয়েভ, ওডেসা, রোস্টোভ প্রভৃতি অঞ্চল দখল করে নেয়।

রাশিয়ায় জার্মানির পরাজয় – রাশিয়ায় তীব্র শীত শুরু হলে এবং রুশবাহিনীর আক্রমণে জার্মানবাহিনী বিধ্বস্ত হয়। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে বিখ্যাত স্ট্যালিনগ্রাডের যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে জার্মানবাহিনী পর্যুদস্ত হয়।

যুদ্ধের গতি পরিবর্তন – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে জার্মানবাহিনী ছিল অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু রাশিয়ায় জার্মানির পতনের পর যুদ্ধের গতির পরিবর্তন ঘটে।

আমেরিকার যোগদান – আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তার নিরপেক্ষতা ভঙ্গ করে মিত্রশক্তির পক্ষে যোগদান করে। আমেরিকা, ব্রিটেন ও রাশিয়া জোটবদ্ধ হয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে।

ইটালির আত্মসমর্পণ – ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুন ইটালি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ইটালি আফ্রিকা আক্রমণ করে প্রাথমিক সাফল্য পেলেও মিত্রবাহিনীর হাতে পরাজিত হয়। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর ইটালি মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে।

১৯৪৪-৪৫ খ্রিস্টাব্দ –

জার্মানির আত্মসমর্পণ – রাশিয়ার স্ট্যালিনগ্রাডের যুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পর ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুন ব্রিটিশ ও আমেরিকান সেনাবাহিনী ফ্রান্সের নর্মান্ডি উপকূলে এসে নামে। এই দিনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে মুক্তি দিবস বা D-Day নামে পরিচিত। ব্রিটেন, রাশিয়া-সহ মিত্রবাহিনীর আক্রমণে ৭ মে জার্মানি আত্মসমর্পণ করে। এই ঘটনার জন্য ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ৮ মে সমগ্র ইউরোপে বিজয় দিবস বা Victory in Europe Day বা সংক্ষেপে VE Day পালিত হয়।

জাপানের আত্মসমর্পণ – জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে। ৭ ডিসেম্বর জাপান আমেরিকার নৌ-ঘাঁটি পার্ল হারবার ধ্বংস করে। এরপর ইটালি ও জার্মানি আত্মসমর্পণ করায় মিত্রশক্তি জাপানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমেরিকা ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে দুটি পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করে। শহর দুটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ফলে জাপান বাধ্য হয়ে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে। এর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে (১৯৩৯-১৯৪৫ খ্রি.) পরমাণু বোমার আবিষ্কার ও প্রয়োগ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে (১৯৩৯-১৯৪৫ খ্রি.) যুদ্ধাস্ত্রের ক্ষেত্রে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যুদ্ধাস্ত্রটি ছিল পরমাণু বোমা। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পরমাণু বোমার আবিষ্কার, পরীক্ষা ও প্রয়োগ ঘটতে দেখা যায়।

পরমাণু বোমা – পরমাণু বোমা হল এক বিধ্বংসী ও ভয়ংকর বোমা। পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা নিউটনকে বিদীর্ণ করে নির্দিষ্ট ওজনের এই বোমা তৈরি করতে হয়। ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, প্লুটোনিয়াম সমৃদ্ধ এই বোমা আবিষ্কার সংক্রান্ত পরীক্ষানিরীক্ষার পথিকৃৎ ছিলেন জার্মান বিজ্ঞানী অটোহান।

পরমাণু বোমার আবিষ্কার – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকজন প্রবাসী বিজ্ঞানীর ইচ্ছায় ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২ আগস্ট বিজ্ঞানী আইনস্টাইন ( Einstein) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে এক নতুন ধরনের বোমা তৈরির কথা জানিয়ে চিঠি লেখেন। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু বোমা তৈরির প্রচেষ্টা শুরু করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ম্যানহাটন প্রকল্পের (১৯৪২-১৯৪৬ খ্রি.) মাধ্যমে প্রথম পরমাণু বোমা তৈরি করে। প্রথমে তিনটি বোমা তৈরি হয়। একটি পরীক্ষামূলকভাবে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। অন্য দুটি লিটল ও ফ্যাট ম্যান জাপানে বর্ষিত হয়।

উদ্দেশ্য – ইউরোপে জার্মানির পরাজয়ের ক্ষেত্রে রাশিয়ার বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম মিত্রপক্ষের বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে স্নান করে দেয়। তাই জাপান বিরোধী যুদ্ধে রাশিয়াকে বাদ দিয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অগ্রণী ভূমিকা নিতে চেয়েছিল। সেজন্য নব আবিষ্কৃত এই বোমার প্রয়োগ করেছিল জাপানের উপর।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে পরমাণু বোমার প্রয়োগ –

পরীক্ষামূলক প্রয়োগ – পরমাণু বোমাকে অস্ত্র হিসেবে প্রথম পরীক্ষা করা হয় ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জুলাই। এই দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো রাজ্যে অ্যামোগোদোর কাছে পরমাণু বোমার প্রথম সফল পরীক্ষা হয়।

জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বিস্ফোরণ – ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে জার্মানির আত্মসমর্পণের পরেও জাপানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলছিল। এই অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে দুটি পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করে।

ফলাফল – জাপানে পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের ফলে –

  • কয়েক লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
  • জাপান ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। পৃথিবী পরমাণু যুগে প্রবেশ করে।

পরিশেষে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই পরমাণু বোমা ভয়ংকর অস্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর পাশাপাশি পরমাণু বোমার মতো মারাত্মক অস্ত্রের প্রয়োগ বন্ধ করারও প্রচেষ্টা চলছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগদানের কারণ কী ছিল?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের রাজনীতির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকার নীতি গ্রহণ করেছিল। তাই ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকা কোনো পক্ষে যোগ দেয়নি। কিন্তু কয়েকটি ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তার নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে এসে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগদানের কারণ – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগদানের কারণকে দুভাগে ভাগ করা যায় –

  • পরোক্ষ কারণ ও
  • প্রত্যক্ষ কারণ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ কারণ –

আমেরিকার ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি (Cash and Carry) নীতি – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনায় জার্মানির সাফল্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শঙ্কিত করে তুলেছিল। এই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক দেশগুলিকে অর্থের বিনিময়ে যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি করার নীতি গ্রহণ করে, যা ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি (Cash and Carry) নীতি নামে পরিচিত। ফলে আমেরিকা নাৎসিবাদী জার্মানির বিরোধীশক্তিকে সাহায্য করে।

লেন্ড-লিজ আইন (Lend-Lease Law) – আমেরিকার রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন সিনেটে লেন্ড-লিজ আইন পাস করেন। এই আইনে বলা হয়, আমেরিকা মিত্রপক্ষভুক্ত দেশগুলিকে সবরকম যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে সাহায্য করবে। এই আইনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে গণতন্ত্রের অস্ত্রাগার (Arsenal of Democracy)-এ পরিণত করা হয়।

রোম -বার্লিন-টোকিও অক্ষজোট (Rome- Berlin Tokyo Axis) – ইটালি, জার্মানি ও জাপানের মধ্যে রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষচুক্তি” স্বাক্ষরিত হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শঙ্কিত হয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চিন ও ইন্দোচিন থেকে জাপানি সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের সঙ্গে সমস্তরকম বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং জাপান বিরোধী ইন্দোনেশিয়াকে সমর্থন করে।

গণতন্ত্র রক্ষা – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে ও গণতন্ত্রের মড়ক শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথমদিকে ফ্যাসিবাদের জয়জয়কার দেখা যায়। পোল্যান্ড ও ফ্রান্সের পতন ঘটে। অস্ট্রিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া আগেই জার্মানির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। এই অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় গণতন্ত্র রক্ষায় সচেষ্ট হয়।

বাণিজ্য রক্ষা – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যস্ত ইংল্যান্ডের উপনিবেশগুলিতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের জোগান দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফলে মার্কিন বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। এমতাবস্থায় ফ্যাসিস্ট শক্তি সফল হলে মার্কিন বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে, এই আশঙ্কা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ কারণ –

পার্ল হারবার ঘটনা – ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী হন হিদেকি তোজো (Hideki Tojo)। জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিবাদ আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনে এক বৈঠকে মিলিত হয়। কিন্তু বৈঠক চলাকালে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-ঘাঁটি পার্ল হারবারে জাপান আক্রমণ করে। জাপানের আক্রমণে পার্ল হারবার ধ্বংস হয়। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরের দিন অর্থাৎ ৮ ডিসেম্বর জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১০ ডিসেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মানি ও ইটালির বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করে। এইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী ছিল?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বরাজনীতির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে ইটালি ও জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের উত্থান, জাপানের আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিচলিত করে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা –

রাষ্ট্রপতি রুজভেল্টের ভূমিকা – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথমদিকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিত্রপক্ষের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল।

ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি (Cash and Carry) নীতি গ্রহণ – ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে অর্থের বিনিময়ে অস্ত্র ও যুদ্ধের বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহের নীতি গ্রহণ করে। এই নীতি ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি নীতি নামে পরিচিত। এর ফলে মিত্রপক্ষের রাষ্ট্রগুলি অনেক উপকৃত হয়েছিল।

জার্মান ভীতির ফলে নিরপেক্ষতার নীতি ত্যাগ – ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে জার্মানির হাতে ফ্রান্সের পতন ঘটে। জার্মানি আগস্ট থেকে ইংল্যান্ডের উপর বিমান আক্রমণ শুরু করে। এরপর জার্মানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ ও অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত হতে শুরু করে এবং নিরপেক্ষতার নীতি ত্যাগ করে। জার্মানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর বাণিজ্যজাহাজ আক্রমণ করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির জাহাজগুলিকে দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেয়।

লেন্ড-লিজ আইন (Lend-Lease Law) পাস – ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লেড-লিজ আইন পাস করে গণতান্ত্রিক মিত্রপক্ষকে সমস্তরকম অস্ত্র সাহায্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে গণতন্ত্রের অস্ত্রাগার (Arsenal of Democracy) বলে অভিহিত করা হয়।

জাপানের পার্ল হারবার আক্রমণ – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির সহযোগী জাপানের আগ্রাসী নীতির বিরোধিতা করে এবং জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। এতে বিক্ষুব্ধ জাপান ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-ঘাঁটি পার্ল হারবার ধ্বংস করে দেয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৮ ডিসেম্বর জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং মিত্রপক্ষে যোগদান করে।

রাশিয়াকে সাহায্য দান – জার্মানি ইতিমধ্যে রাশিয়াকে আক্রমণ করেছিল (২২ জুন, ১৯৪১ খ্রি.)। এই আক্রমণে রাশিয়ার প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। জার্মান আক্রমণ মোকাবিলার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে সাহায্য করে। মার্কিন নৌবহর ভ্লাডিভোস্টক বন্দর দিয়ে যুদ্ধাস্ত্র ও রসদ পাঠায়। এ ছাড়া ইরানের মধ্য দিয়ে সরবরাহ পথ তৈরি করে রাশিয়ায় সাহায্য পৌঁছে দেয়।

মিত্রপক্ষকে সাহায্য দান – উত্তর আফ্রিকার রণাঙ্গনে অক্ষশক্তিকে প্রতিরোধ করতে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করে। এরপর জার্মানির বিরুদ্ধে ইউরোপে দ্বিতীয় রণাঙ্গন খুলে দেয়। এরপরই জার্মানবাহিনীর বিপর্যয় শুরু হয়।

জাপানের উপর পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ – ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর মিত্রপক্ষ জাপানের আত্মসমর্পণ দাবি করে কিন্তু জাপান এতে কর্ণপাত করেনি। এর ফলস্বরূপ ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ৬ আগস্ট হিরোশিমা ও ৯ আগস্ট নাগাসাকির উপর পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এরপর ২ সেপ্টেম্বর জাপান আত্মসমর্পণ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে।

এভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশ্ব ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব লেখো।

ভূমিকা – ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রবর্গের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে। এই যুদ্ধেই সর্বপ্রথম পারমাণবিক বোমার ধ্বংসলীলার সঙ্গে বিশ্ববাসী পরিচিত হয়েছিল। বিভিন্ন প্রধানমন্ত্রী চোৱাজন যদি মিউনিখ চুক্তি দ্বারা সম্মান অর্জন করেন। তাহলে ইংরেজ অভিধানে সম্মান কথাটির দেশের সমাজ, অর্থনীতি প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপক প্রভাব পড়ে।

বিশ্ব ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব –

সাম্রাজ্যবাদের পতন – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে যে সাম্রাজ্যবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, তা যুদ্ধের পর অনেকাংশে হ্রাস পায়। এই সময় বিভিন্ন দেশে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জন্মলাভ করে। এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ এই সময় স্বাধীনতা লাভ করে।

অক্ষশক্তির প্রাধান্য হ্রাস – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ইটালি, জার্মানি ও জাপান অর্থাৎ অক্ষশক্তি যে শক্তি ও প্রাধান্য অর্জন করেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে তার অবসান ঘটে। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে মিত্রশক্তি রোম অধিকার করলে ইটালির, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার লাল ফৌজ বার্লিন দখল করলে জার্মানির এবং ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন সরকার হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা নিক্ষেপ করলে জাপানের পরাজয় ঘটে।

বিজয়ী শক্তির উপর প্রভাব – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী ইউরোপীয় শক্তির অবস্থা মোটেও ভালো ছিল না। জনবল, জাতীয় সম্পদ, শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষয়ক্ষতির ধাক্কায় ব্রিটেন, ফ্রান্স প্রভৃতি বিজয়ী শক্তিগুলির অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।

জাতিপুঞ্জের প্রতিষ্ঠা – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে জাতিসংঘের পতন হয় এবং বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের (United Nations Organisation) প্রতিষ্ঠা হয়।

আর্থিক পুনর্বাসন – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমগ্র পৃথিবীতে কমবেশি আর্থিক প্রভাব ফেলেছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলির মৃতপ্রায় অর্থনীতিকে সচল করার উদ্দেশ্যে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে আমেরিকার ওয়াশিংটন শহরে জাতিপুঞ্জ ত্রাণ ও পুনর্বাসন বা UNRRA (United Nations Relief and Rehabiliation Administration) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সাহায্যের ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভিন্ন দেশের বাস্তুহারাদের পুনর্বাসন, কৃষি ও শিল্পের পুনরুজ্জীবন, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি প্রভৃতি সম্ভব হয়।

দ্বি-মেরু বিশ্বের আবির্ভাব – প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যেমন ইউরোপ মহাদেশের একক প্রাধান্য হ্রাস করে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র রাষ্ট্রবর্গকে (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল, ঠিক তেমনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও গুরুত্ব বৃদ্ধি করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে সমগ্র বিশ্ব দুটি পরস্পরবিরোধী গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই দুই গোষ্ঠীর একদিকে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং অপরদিকে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া আলোচ্য পর্বে ভারতের নেতৃত্বে এশিয়া ও আফ্রিকার সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলিকে নিয়ে জোটনিরপেক্ষ গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল।

আমেরিকার আধিপত্য – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশগুলির মধ্যে একমাত্র আমেরিকা সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে যুদ্ধের আমেরিকা বিশ্বের সর্ববৃহৎ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে সক্রিয় হস্তক্ষেপের নীতি গ্রহণ করে।

ঠান্ডা যুদ্ধের সূচনা – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন জার্মানির দ্বারা আক্রান্ত হয়। তার প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই অবস্থায় জার্মান আক্রমণের চাপ কমানোর জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বিতীয় রণাঙ্গন খোলার আবেদন জানায়। কিন্তু আবেদন গ্রাহ্য না হওয়ায় তখন থেকেই আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অবিশ্বাস ও পারস্পরিক উত্তেজনা শুরু হয়।

এরপর প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ফুলটন বক্তৃতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পরমাণু শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার এবং সোভিয়েত লাল দস্যুদের আক্রমণ থেকে ইউরোপীয় সভ্যতাকে রক্ষার আহ্বান জানান। এর ফলে ঠান্ডা যুদ্ধের সূচনা হয়।

জাতীয়তাবাদের বিকাশ – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক দেশগুলির সাফল্য। ফলে গণতন্ত্র জয়যুক্ত হলে সমগ্র বিশ্বে নতুন আবহের সূত্রপাত হয়। সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্রে বিভক্ত পৃথিবীর মেরুকরণে জাতীয়তাবাদী মানসিকতা গড়ে উঠতে থাকে। এই সময় বিভিন্ন উপনিবেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন খুবই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটতে থাকে।

তৃতীয় বিশ্বের উদ্ভব – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ইংল্যান্ড, ফ্রান্সের মতো ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে। যুদ্ধের প্রভাবে উপনিবেশগুলিতে জনজাগরণ ঘটে এবং অনেক উপনিবেশ স্বাধীন হয়। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় এই সদ্য স্বাধীন দেশগুলি নিয়ে তৃতীয় বিশ্বের উদ্ভব হয়।

পরমাণু যুগের সূচনা – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম পরমাণু বোমা তৈরি ও ব্যবহার করে। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়ন পরমাণ শক্তিধর হয়। একে একে অনেক দেশ পরমাণু শক্তিধর হয়ে ওঠে। শুরু হয় পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা।

উপসংহার – এই সমস্ত বিষয়গুলি ছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদ্ভূত পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও শান্তির ক্ষেত্রে সমস্যা, ঔপনিবেশিক সমস্যা, মারণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণের সমস্যা প্রভৃতিকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলেছিল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ফল ছিল আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এই যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসলীলা থেকে মানবজাতি যে শিক্ষা নিয়েছিল, তার কারণেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আজও স্থগিত রয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এই যুদ্ধের শিক্ষাগুলি আজও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক। তাই আমাদের সকলে মিলে শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে এবং বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে হবে।

Rate this post


Join WhatsApp Channel For Free Study Meterial Join Now
Join Telegram Channel Free Study Meterial Join Now

মন্তব্য করুন