নবম শ্রেণী – ইতিহাস – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তারপর – উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন ও উত্তর

আজকের এই পরিচয়পত্রে আমরা নবম শ্রেণীর ইতিহাসের ষষ্ঠ অধ্যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তারপর থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। এই অধ্যায়ে আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ, সূচনা, গতি-প্রকৃতি, ফলাফল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের নতুন পরিস্থিতি সম্পর্কে জানব।

Table of Contents

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তারপর – উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন ও উত্তর

ইটালিতে বেনিটো মুসোলিনি (Benito Mussolini) – র অভ্যন্তরীণ নীতি কী ছিল?

মুসোলিনি ইটালির সর্বময় ক্ষমতা দখল করে ফ্যাসিস্ট মতাদর্শ অনুসারে ইটালির অভ্যন্তরীণ নীতি পরিচালনা করেন।

ইটালিতে বেনিটো মুসোলিনি (Benito Mussolini) – র অভ্যন্তরীণ নীতির উদ্দেশ্য ছিল —

  • ইটালিতে ফ্যাসিস্ট দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা এবং
  • বিরোধীদের দমন করা।

একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা – মুসোলিনি ফ্যাসিস্ট দল ও রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা হস্তগত করে সংসদের আইন প্রণয়নের অধিকারও লাভ করেছিলেন। তিনি ইটালিতে গণতান্ত্রিক অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা উচ্ছেদ করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ভিক্টর ইমান্যুয়েল (Victor Emmanuel) ছিলেন ইটালির নামমাত্র রাজা। বাস্তবে মুসোলিনি ছিলেন ইটালির সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী।

বিরোধী মতবাদ দমন – অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে মুসোলিনির প্রধান কাজ ছিল বিরোধীদের দমন করা। মুসোলিনি পরিচালিত ফ্যাসিস্ট সরকার বিরোধীদের উপর কঠোর দমনপীড়ন ও হত্যালীলা চালিয়েছিল। সরকার সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করেছিল।

অভ্যন্তরীণ নীতি –

শিক্ষানীতি – মুসোলিনির শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য ছিল — ইটালিতে ফ্যাসিস্ট ভাবধারার সম্প্রসারণ ঘটানো। এজন্য –

  • ফ্যাসিস্ট প্রশাসন দলের অনুগামীদের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেছিল এবং
  • পাঠ্যপুস্তকগুলি ফ্যাসিস্ট আদর্শ অনুসারে রচিত হয়েছিল। মুসোলিনি ইটালির একনায়কতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা চালু করেছিলেন।

কৃষিনীতি – খাদ্যসমস্যার সমাধান ও শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনের উপর মুসোলিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তিনি ঋণদান, সেচব্যবস্থা ও পতিত জমিগুলিকে চাষজমিতে পরিণত করার ব্যবস্থা করেছিলেন।

শিল্পনীতি – শিল্পোন্নয়নের জন্য মুসোলিনি পুরোনো শিল্পগুলির আধুনিকীকরণ ও নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

শিল্পগুলির উন্নতি অব্যাহত রাখার জন্য তিনি শ্রমিক ধর্মঘট নিষিদ্ধ করেছিলেন। এর ফলে ইটালিতে রেল শিল্প, জাহাজ শিল্প, বিদ্যুৎ, বিমান, মোটর প্রভৃতি শিল্পের ব্যাপক অগ্রগতি ঘটেছিল।

পোপের সঙ্গে মৈত্রী – পোপ ও ক্যাথলিকদের সমর্থন লাভের জন্য ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে মুসোলিনি পোপের সঙ্গে ল্যাটেরান চুক্তি (Lateran Treaty) স্বাক্ষর করেছিলেন।

পরিশেষে বলা যায় যে, আইনের শাসন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা লোপ করে মুসোলিনি ইটালিতে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শক্তিশালী আধুনিক ইটালি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

ইটালিতে বেনিটো মুসোলিনির পররাষ্ট্রনীতি কী ছিল?

ইটালির ক্ষমতা দখলের পর মুসোলিনি ফ্যাসিস্ট দলের আদর্শ অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করেন।

ইটালিতে বেনিটো মুসোলিনির পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য –

মুসোলিনির পররাষ্ট্রনীতি বা বিদেশনীতির উদ্দেশ্য ছিল —

  • আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইটালির মর্যাদা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
  • ইটালির উপনিবেশ তৈরি বা সাম্রাজ্য বিস্তার করা।

ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ইটালির সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। এর কারণ ছিল —

  • ফ্রান্স ছিল ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে ইটালির প্রতিদ্বন্দ্বী।
  • ফ্রান্স আবার ইটালির নাগরিকদের ফ্রান্সে বসবাস করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিল।

রোমের সন্দ্বি স্বাক্ষর – জার্মানিতে হিটলারের উত্থান ফ্রান্স ও ইটালি উভয় দেশকেই শঙ্কিত করেছিল। তাই ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স ও ইটালি পারস্পরিক স্বার্থরক্ষার জন্য রোমের সন্ধি (Treaty of Rome) স্বাক্ষর করেছিল।

মুসোলিনির আবিসিনিয়া আক্রমণ – মুসোলিনির সাম্রাজ্যবাদী নীতির বহিঃপ্রকাশ ছিল আফ্রিকার আবিসিনিয়া আক্রমণ। মুসোলিনির আবিসিনিয়া আক্রমণের কারণ ছিল –

  • ইটালি দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক কারণে আবিসিনিয়াতে উপনিবেশ স্থাপন করতে আগ্রহী ছিল।
  • ফ্রান্স ইটালিকে আফ্রিকায় কিছু সুযোগসুবিধা প্রদান করে পরোক্ষভাবে আবিসিনিয়া দখলে উৎসাহিত করেছিল।

ওয়াল ওয়াল ঘটনা – ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ৫ ডিসেম্বর আবিসিনিয়ার ওয়াল ওয়াল গ্রামে ইটালি ও আবিসিনিয়ার বাহিনীর মধ্যে খণ্ডযুদ্ধ হয়। এতে ইটালির কিছু সৈন্য মারা যায়। মুসোলিনি এই ঘটনার অজুহাতে আবিসিনিয়ার সম্রাট হেইলে সেলাসির (Haile Selassie) কাছে বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ ও নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা দাবি করেন।

এই সময় ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ইটালির প্রতি তোষণনীতি অনুসরণ করে। ফলে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ৩ অক্টোবর ইটালি আবিসিনিয়া আক্রমণ করে এবং ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে সমগ্র আবিসিনিয়া দখল করে নেয়।

ইটালির জাতিসংঘ ত্যাগ – আবিসিনিয়া দখলের অপরাধে জাতিসংঘ ইটালির বিরুদ্ধে আর্থিক অবরোধ ঘোষণা করে। ফলে ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইটালি জাতিসংঘ ত্যাগ করে।

স্পেনে হস্তক্ষেপ – ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে স্পেনে রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে মুসোলিনি স্পেনের বিদ্রোহী সেনাপতি ফ্রাঙ্কোকে সামরিক সহায্য দেন। এর ফলে ফ্রাঙ্কো জয়ী হন।

অ্যান্টি-কমিন্টার্ন প্যাক্ট – জাতিসংঘের সদস্যপদ ত্যাগ করে ইটালি ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি ও জাপানের সঙ্গে অ্যান্টি-কমিন্টার্ন পা (Anti-Comintern Pact বা কমিউনিস্ট সোভিয়েত রাশিয়া বিরোধী চুক্তি) স্বাক্ষর করে। ফলে রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষজোট (Rome- Berlin Tokyo Axis) গড়ে ওঠে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদান – ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করেন। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স পোল্যান্ডের পক্ষে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মুসোলিনি জার্মানির পক্ষে যোগদান করেন।

উপসংহার – রোমের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য মুসোলিনি যুদ্ধনীতি ও উপনিবেশবাদকে সমর্থন করেন। পরিণামে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অংশীদার হন এবং পরাজিত হয়ে নিমর্মভাবে নিহত হন।

জার্মানিতে হিটলারের অভ্যন্তরীণ নীতির বিবরণ দাও।

১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে হিটলার জার্মানিতে নাৎসি দলের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি চ্যান্সেলার (প্রধানমন্ত্রী) ও রাষ্ট্রপতির সমস্ত ক্ষমতা করায়ত্ত করে জার্মানির সর্বময় কর্তা বা ফ্যুয়েরার (Fuhrer) হয়েছিলেন এবং ফ্যাসিবাদী নীতি অনুসারে জার্মানির অভ্যন্তরীণ নীতি পরিচালনা করেছিলেন।

হিটলারের অভ্যন্তরীণ নীতির উদ্দেশ্য ছিল —

  • জার্মানিতে নাৎসি দলের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা বা একদলীয় শাসন কায়েম করা।
  • হেরেনভক তত্ত্ব (Herrenvolk Theory) অনুসারে জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
  • শক্তিশালী সামরিকবাহিনী গড়ে তোলা।
  • জার্মানিকে নাৎসিকরণ করা।
  • জার্মানির অর্থনৈতিক পুনর্গঠন করা।

হিটলারের অভ্যন্তরীণ নীতি –

জার্মানিতে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা – হিটলার জার্মানিতে নাৎসি দলের একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অর্থাৎ জার্মানিতে নাৎসি দল ছাড়া সব দল নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক সামারভেল বলেছেন যে, হিটলারের দৃষ্টিতে জার্মানরা হয় একজন নাৎসি নয়তো দেশদ্রোহী।

ইহুদি বিতাড়ন –

  • হিটলার জার্মান জাতির বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য জার্মানি থেকে ইহুদিদের বিতাড়িত করার নীতি নিয়েছিলেন।
  • ইহুদিরা জার্মানির অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিল। অনেক ইহুদি জার্মানি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু যারা থেকে গিয়েছিল তাদের কয়েক লক্ষকে নানাভাবে হত্যা করা হয়।

হিটলারের শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন – হিটলার একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেছিলেন। সেনাবাহিনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল —

  • স্টর্ম উপার্স (Stormtroopers, SA) – জার্মান যুবকদের নিয়ে গঠিত স্টর্ম ট্রুপার্সদের কাজ ছিল নাৎসিদের রক্ষা করা ও অন্য দলের সভাসমিতি ভেঙে দেওয়া।
  • এলিট গার্ডস (Elite Guards, SS) – এরা ছিল নাৎসি নেতাদের দেহরক্ষী। অত্যন্ত নৃশংস ছিল এরা।

এ ছাড়া ছিল গেস্টাপো (Gestapo) বা গুপ্ত পুলিশবাহিনী প্রভৃতি। মূলত সামরিক বাহিনীর সাহায্যে হিটলার তাঁর নীতি জার্মানদের উপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

হিটলারের বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা – হিটলার জার্মানিতে সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন। কারণ তাঁর উদ্দেশ্য ছিল একটি বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করা।

হিটলারের জার্মানিকে নাৎসিকরণ করা – ক্ষমতা দখলের পর হিটলার জার্মানিকে নাৎসিকরণ করার নীতি গ্রহণ করেন।

  • জার্মানিতে নাৎসি দল ছাড়া সমস্ত দল অবৈধ বলে ঘোষিত হয়।
  • সমস্ত সরকারি কর্মচারীকে নাৎসি সরকারের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে বাধ্য করা হয়।
  • স্কুলকলেজের পাঠ্যপুস্তকগুলি নাৎসি আদর্শে রচনা করা হয়।
  • সংবাদপত্রগুলিকে নাৎসি আদর্শ প্রচারের কাজে ব্যবহার করা হয়।

হিটলারের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন – হিটলার জার্মানির অর্থনৈতিক অবস্থার পুনর্গঠন করেছিলেন।

  • জার্মানিতে অনেক কলকারখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
  • কারখানায় শিট প্রথা (Shift System) চালু করেছিলেন।
  • কারখানাগুলিতে শ্রমিক ধর্মঘট নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
  • কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার ও সারের প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করেছিলেন। তবে খাদ্য উৎপাদনের চেয়ে অস্ত্র উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেন। এই নীতিকে মাখনের চেয়ে কামানের অগ্রাধিকার (Cannon before butter) নীতি বলা হয়।

এইভাবে তিনি জার্মানিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে শক্তিশালী করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জার্মানির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হন।

হিটলারের পররাষ্ট্রনীতির বিবরণ দাও।

ভূমিকা – হিটলার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জার্মানিকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জার্মানির ক্ষমতা দখল করেছিলেন। ক্ষমতা দখলের পর হিটলার গৌরবজনক পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়নে সচেষ্ট হন।

হিটলারের পররাষ্ট্রনীতির বিবরণ দাও।

হিটলারের পররাষ্ট্রনীতির, লক্ষ্য হিটলারের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য ছিল –

  • জার্মানিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত করা।
  • জার্মানির পক্ষে অপমানজনক ভার্সাই সন্ধি লঙ্ঘন করা।
  • বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী জার্মানদের নিয়ে একটি বৃহৎ জার্মান সাম্রাজ্য গঠন করা প্রভৃতি।

হিটলারের কূটনীতি –

জেনেভা সম্মেলন – ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত জেনেভার নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে জার্মান প্রতিনিধিরা দাবি করেছিলেন। যে, হয় সমস্ত রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি হ্রাস করে জার্মানির পর্যায়ে আনা হোক অথবা জার্মানিকে অন্য রাষ্ট্রের সমান শক্তিবৃদ্ধির অনুমতি দেওয়া হোক। মিত্রপক্ষ জার্মানির এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করলে হিটলারের নির্দেশে জার্মান প্রতিনিধিরা সম্মেলন ত্যাগ করেন এবং পরে জার্মানি জাতিসংঘের সদস্যপদও ত্যাগ করে।

পোল্যান্ড-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি – হিটলার ইউরোপকে সচকিত করে শত্রুতা থাকা সত্ত্বেও পোল্যান্ডের সঙ্গে দশ বছরের জন্য অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন (১৯৩৪ খ্রি.)। আসলে হিটলারের উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপের জার্মানবিরোধী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে পোল্যান্ডের সম্পর্কের অবনতি ঘটানো।

সার ও রাইন অঞ্চল পুনরুদ্ধার – ভার্সাই সন্ধির দ্বারা জার্মানির শিল্পসমৃদ্ধ সার ও রাইন অঞ্চল পনেরো বছরের জন্য ফ্রান্সের দখলে ছিল। বলা হয়েছিল যে, পনেরো বছর পরে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে সার অঞ্চল জার্মানি বা ফ্রান্স কোন্ রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হবে তা গণভোটের দ্বারা স্থির হবে। ১৯৩৫-৩৬ খ্রিস্টাব্দে বিপুল গণভোট লাভ করে সার অঞ্চল এবং রাইন অঞ্চল জার্মানির সঙ্গে সংযুক্ত হয়।

ইঙ্গ-জার্মান, নৌ-চুক্তি – ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের সঙ্গে জার্মানির একটি নৌ-চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তি অনুসারে জার্মানি ব্রিটিশ নৌবহরের ৩৫% হারে নৌশক্তি বৃদ্ধি করার অধিকার লাভ করেছিল।

কমিন্টার্ন বিরোধী চুক্তি – ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি, ইটালি ও জাপানের মধ্যে সাম্যবাদবিরোধী অ্যান্টি-কমিন্টার্ন প্যাক্ট (Anti-Comintern Pact) স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষজেটি গঠন – ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইটালি, জার্মানি ও জাপানের মধ্যে একটি শক্তিজোট গড়ে ওঠে। এটি রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষজোট (Rome- Berlin Tokyo Axis) নামে পরিচিত।

মিউনিখ চুক্তি ও চেকোশ্লোভাকিয়া অধিকার – চেকোশ্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চল ছিল জার্মান জাতি অধ্যুষিত। হিটলার তাদের উপর নিপীড়নের মিথ্যা অজুহাতে সুদেতান অঞ্চল দখল করতে সচেষ্ট হন। এমতাবস্থায় ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন (Chamberlain), ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী দালাদিয়ের (Daladier), ইটালির মুসোলিনি (Mussolini) ও জার্মানির হিটলারের (Hitter) মধ্যে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২৯ সেপ্টেম্বর মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুসারে জার্মানি সুদেতান অঞ্চল লাভ করে।

রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি – হিটলার পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে ঘোর শত্রু রাশিয়ার সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া ও জার্মানির মধ্যে দশ বছরের জন্য অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে জার্মানি ও রাশিয়া উভয়েই লাভবান হয়েছিল।

হিটলারের আগ্রাসন নীতি –

স্পেনের গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ – স্পেনে প্রজাতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে জেনারেল ফ্রাঙ্কো (General Franco) যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের এই গৃহযুদ্ধে হিটলার জেনারেল ফ্রাঙ্কোকে সাহায্য করেছিলেন। ফলে জেনারেল ফ্রাঙ্কো জয়ী হয়েছিলেন।

হিটলারের অস্ট্রিয়া জয় – হিটলারের উদ্দেশ্য ছিল জার্মান জনগণের একতাসাধন। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে জার্মানবাহিনী অস্ট্রিয়া দখল করে। অস্ট্রিয়ার নতুন নির্বাচনে ৯৯.৭৫% জনগণ হিটলারকে সমর্থন করেছিল।

হিটলারের পোল্যান্ড-নীতি – চেকোশ্লোভাকিয়া দখলের পর হিটলার পোল্যান্ডের ডানজিগ বন্দর ও পোলিশ করিডর দাবি করেন। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তোষণনীতির ব্যর্থতা উপলব্ধি করে জার্মান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পোল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়।

হিটলারের পোল্যান্ড আক্রমণ – রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর হিটলার পোল্যান্ড-আক্রমণ করেন। পোল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে ৩ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়।

মূল্যায়ন – ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের অনৈক্য এবং তোষণনীতির কারণে হিটলারের পররাষ্ট্রনীতিতে কূটনৈতিক সাফল্য লক্ষ করা যায়। তবে তাঁর আগ্রাসী নীতি কালক্রমে তাঁর পতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

হিটলারের রাশিয়া আক্রমণের কারণ ও পরিণতি লেখো।

ভূমিকা – ইংল্যান্ডের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যর্থ হয়ে হিটলার ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন কোনোরকম যুদ্ধ ঘোষণা না করেই এবং রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি (Russo-German Non-Aggression Pact) অস্বীকার করে রাশিয়া আক্রমণ করেন। এই আক্রমণের পিছনে একাধিক কারণ বিদ্যমান ছিল –

হিটলারের রাশিয়া আক্রমণের কারণ –

কৌশল অবলম্বন – রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি ছিল হিটলারের একটি কৌশল মাত্র। ঐতিহাসিক অ্যালান বুলক (Allan Bullock)-এর মতে, এই চুক্তি ছিল। তাঁর One by One নীতির ফলশ্রুতি। তিনি একসঙ্গে সমগ্র ইউরোপে আক্রমণ করতে চাননি। তাই পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ শেষ করে পূর্বে রাশিয়ার দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন।

জার্মান আধিপত্য প্রতিষ্ঠা – রাশিয়া কর্তৃক রোমানিয়া এবং তিনটি বাল্টিক রাজ্য যথাক্রমে এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া ও লাটভিয়া আক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই এই সকল
অঞ্চলে জার্মান আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করেন।

ইংল্যান্ড জয়ের বাসনা – কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন, হিটলার আশা করেছিলেন রাশিয়াকে পরাজিত করতে পারলে পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত জার্মানবাহিনীকে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে।

রুশ ব্যবহারে অসন্তুষ্টি – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গোড়ার দিকে রাশিয়া জার্মানিকে প্রভূত খাদ্য ও রসদ সরবরাহ করত। কিন্তু পশ্চিম ইউরোপে ফ্রান্সের পতনের পর রুশ নেতারা জার্মানির সামরিক শক্তি সম্পর্কে আতঙ্কিত হয়ে খাদ্য ও অন্যান্য রসদ পাঠানো বন্ধ করে দেয়। জার্মানি এতে মুগ্ধ হয়।

রাশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ – কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন, রাশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করেন। তাদের মতে, হিটলার আশা করেছিলেন রাশিয়াকে পরাজিত করতে পারলে ইউক্রেনের গমের ভাণ্ডার ও বাকুর পেট্রোলিয়াম খনি তাঁর হস্তগত হবে, যা তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রে রসদের জোগান দেবে।

সন্দেহ – জার্মানি ও রাশিয়ার মধ্যে অনাক্রমণ চুক্তি থাকলেও কেউ কাউকে বিশ্বাস করত না। হিটলার সন্দেহ করতেন রাশিয়া হয়তো জার্মানিকে আক্রমণ করবে। এইজন্য তিনি রুশ সীমান্তে প্রচুর সৈন্য ও যুদ্ধ উপকরণ মোতায়েন রাখেন। আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে আক্রমণ করা শ্রেয়- এই নীতি অনুসরণ করে তিনি রাশিয়া আক্রমণ করেছিলেন।

সাম্যবাদ – নাৎসি জার্মানি আদর্শগতভাবে কমিউনিস্ট রাশিয়ার শত্রু ছিল। তাই রাশিয়া আক্রান্ত হলে কমিউনিস্ট বিরোধী আমেরিকা – ইংল্যান্ড সাহায্য করবে না — এই ধারণা নিয়ে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করেন।

পরিণতি – উপরোক্ত বিভিন্ন কারণে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করেন। ৫ মাসের যুদ্ধে হিটলার রাশিয়ার ৬,১৪,০০০ বর্গমাইল স্থান অধিকার করেন। কিন্তু ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে স্ট্যালিনগ্রাডের যুদ্ধে জার্মানবাহিনীর পরাজয় ঘটে। এই যুদ্ধে জার্মানির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। স্ট্যালিনগ্রাডের যুদ্ধজয় রুশবাহিনীকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে জার্মান সেনাপতি ভন পাউলাস আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। এইভাবে হিটলারের রাশিয়া অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

মন্তব্য – নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মতো হিটলারের রাশিয়া অভিযান ব্যর্থ হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদতপুষ্ট রাশিয়া সফল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এর ফলে বিশ্বযুদ্ধের গতি মিত্রপক্ষের অনুকূলে চলে যায়।

মিউনিখ চুক্তি (Munich Agreement) কী? এই চুক্তির পটভূমি ও শর্ত কী ছিল? এই চুক্তির গুরুত্ব উল্লেখ করো।

মিউনিখ চুক্তি – ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২৯ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন (Chamberlain), ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী দালাদিয়ের (Daladier), ইটালির মুসোলিনি (Mussolini) ও জার্মানির হিটলারের (Hitler) মধ্যে জার্মানির মিউনিখ শহরে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তা মিউনিখ চুক্তি (Munich Agreement) নামে পরিচিত।

মিউনিখ চুক্তি (Munich Agreement) কী এই চুক্তির পটভূমি ও শর্ত কী ছিল এই চুক্তির গুরুত্ব উল্লেখ করো।

পটভূমি – চেকোশ্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চলে প্রায় সাড়ে ত্রিশ লক্ষ জার্মান জাতির মানুষ বসবাস করত। হিটলার সুদেতান অঞ্চলকে জার্মানির অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সুদেতান-জার্মানদের নেতা কনরাড হেনলিন ( Konrad Henlein) – এর মাধ্যমে বিভিন্নভাবে প্রচেষ্টা চালান। হিটলার জোরপূর্বক সুদেতান অঞ্চল দখল করতে চাইলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স হিটলারের সঙ্গে মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষর করে।

মিউনিখ চুক্তি চুক্তির শর্ত

মিউনিখ চুক্তির শর্তগুলি ছিল —

  • সুদেতান অঞ্চল জার্মানির অন্তর্ভুক্ত হবে।
  • ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ও চেকোশ্লোভাকিয়ার প্রতিনিধিরা অবশিষ্ট চেকোশ্লোভাকিয়ার সীমানা নির্ধারণ করবে।

মিউনিখ চুক্তি চুক্তির গুরুত্ব –

  • হিটলারের ইচ্ছাপূরণ – মিউনিখ চুক্তির ফলে হিটলারের ইচ্ছাপূরণ হয়। হিটলার জার্মান অধ্যুষিত সুদেতান অঞ্চল লাভ করেন। চেকোশ্লোভাকিয়া তার ৫০ লক্ষ প্রজা-সহ সাম্রাজ্যের এক-চতুর্থাংশ হারিয়েছিল।
  • জার্মানির কূটনৈতিক সাফল্য – মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স, জার্মানির বিস্তারনীতিকে সমর্থন করেছিল, যা ছিল জার্মানির কুটনৈতিক সাফল্যের পরিচায়ক।
  • তোষণনীতির বহিঃপ্রকাশ – জার্মানির প্রতি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের অনুসৃত তোষণনীতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ছিল মিউনিখ চুক্তি। হিটলারের চাহিদামতো তাঁর হাতে সুদেতান তুলে দেওয়া ছিল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের দুর্বলতা ও স্বার্থপরতার নির্লজ্জ প্রকাশ।
  • হিটলারের সামরিক ও প্রাকৃতিক সম্পদ লাভ – মিউনিখ চুক্তির ফলে হিটলার সুদেতান অঞ্চলের সামরিক শক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও কলকারখানাগুলি লাভ করে জার্মানির অর্থনীতিকে মজবুত করে তুলেছিলেন।

মূল্যায়ন – ঐতিহাসিক ডেভিড থমসন এই মিউনিখ চুক্তিকে যৌথ ব্ল্যাকমেল ও ধাপ্পার নীতি বলে অভিহিত করেছেন। মিউনিখ চুক্তি ছিল জার্মানির প্রতি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তোষণনীতির চূড়ান্ত নিদর্শন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশ জড়িত ছিল এবং এর ফলে প্রায় ৬ কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। যুদ্ধের ফলে বিশ্বের মানচিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। জার্মানি, ইতালি ও জাপানকে পরাজিত করে মিত্রশক্তি বিশ্বের শক্তির ভারসাম্যকে বদলে দেয়। যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য জাতিসংঘ গঠিত হয়।

Rate this post


Join WhatsApp Channel For Free Study Meterial Join Now
Join Telegram Channel Free Study Meterial Join Now

মন্তব্য করুন