নবম শ্রেণী – ইতিহাস – শিল্পবিপ্লব, উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ – সংক্ষিপ্ত উত্তর ভিত্তিক প্রশ্ন

Table of Contents

বিপ্লব কী? 

বিপ্লব কথার অর্থ দ্রুত এবং আমূল পরিবর্তন। সাধারণত রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিপ্লব কথাটি ব্যবহার করা হয় যখন শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে। বিপ্লব এমন এক পরিবর্তন, যার ফলে সমাজ ও সভ্যতার রূপ বদলে যায়।

শিল্পবিপ্লব বলতে কী বোঝায়?

শিল্পবিপ্লবের মূল কথা হল ‘বন্ধনমুক্তি’– মানবসমাজের উৎপাদন ক্ষমতার উপর প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ মুক্তি। সাধারণভাবে অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দৈহিক শ্রমনির্ভর কুটিরশিল্পভিত্তিক উৎপাদনের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফ্যাক্টরি প্রথায় শিল্পদ্রব্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে যে বিরাট পরিবর্তন আসে, তাকে ‘শিল্পবিপ্লব’ বলা হয়।

শিল্পবিপ্লবকে বিপ্লব বলা হয় কেন?

শিল্পবিপ্লব একদিকে যেমন উৎপাদনের পদ্ধতি, পরিমাণ ও গুণগত মানের ক্ষেত্রে পরিবর্তন নিয়ে আসে; অন্যদিকে তেমনি মানুষের অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও আমূল ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনে। গড়ে ওঠে শহরকেন্দ্রিক শিল্প সভ্যতা, শিল্পসমাজ ও সমাজ, সংস্কৃতি। তাই অধ্যাপক বার্নি, বেয়ার্ড প্রমুখ একে ‘বিপ্লব’ নামে অভিহিত করেছেন। তবে হ্যাজেন, হেজ প্রমুখ ঐতিহাসিকরা শিল্পবিপ্লব’ কথাটির পরিবর্তে ‘শিল্পবিবর্তন’ কথাটি ব্যবহারের পক্ষপাতী।

শিল্পবিপ্লব কথাটি প্রথম কে ব্যবহার করেন? কথাটিকে কে জনপ্রিয় করেন?

শিল্পবিপ্লব কথাটি প্রথম ব্যবহার করেন ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক গাতে ব্ল্যাকি (১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দ)।

এই কথাটিকে জনপ্রিয় করেন ইংরেজ ঐতিহাসিক আর্ন টয়েনবি। তাঁর বিখ্যাত অক্সফোর্ড বক্তৃতামালায় (১৮৮০-৮১ খ্রি.)।

শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি কী কী?

শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি হল – 1. যন্ত্রচালিত বৃহৎ কলকারখানা স্থাপন, 2. মজুরির বিনিময়ে শ্রমিক নিয়োগ, 3. মূলধন সরবরাহের জন্য ব্যাংক বা বিনিয়োগকারী সংস্থা এবং 4. উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রির বাজার।

শ্রমবিভাজন নীতি বলতে কী বোঝায়?

শিল্পবিপ্লবের ফলে শিল্পকারখানাগুলির উৎপাদনকার্যে নিযুক্ত একজন কারিগর উৎপাদনের এক একটি অংশ তৈরিতে নিযুক্ত হত অর্থাৎ সমগ্র উৎপাদন প্রক্রিয়াকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে এক একটি ভাগে শ্রমিকদের নিয়োগ করা হয়- যা শ্রমবিভাজন নীতি নামে পরিচিত। যদিও কার্ল মার্কস-এর মতে, এর ফলে শ্রমিকদের সৃষ্টিশীলতা যাহত হয়।

শিল্পবিপ্লবের সূচনাকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতামত আলোচনা করো।

আর্নল্ড টয়েনবি তাঁর অক্সফোর্ড বক্তৃতামালায় ১৭৪০-৬০ খ্রিস্টাব্দের সময়কালকে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের সূচনাকাল বলেছেন। ফিলিস ডিন ১৭৬০-১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়কে শিল্পবিপ্লবের সূচনাকাল বলে ধরেছেন। কোল, হৰসৰম, রোস্টো-সহ অধিকাংশ ঐতিহাসিক এই মতের সমর্থক। মার্কিন ঐতিহাসিক জে ইউ নেফ শিল্পবিপ্লবের সূচনাকালকে পিছিয়ে ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে টিউডর-স্টুয়ার্ট কাল’কে ধরেছেন। যদিও নেফ এ ধরনের সুনির্দিষ্ট কালসীমা চিহ্নিতকরণের বিরোধী এবং তিনি ইতিহাসের প্রবহমানতায় বিশ্বাসী।

শিল্পবিপ্লবের উড়ানকাল বলতে কী বোঝায়? 

দৈহিক শ্রমনির্ভর কুটিরশিল্পভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তে স্বনির্ভর দ্রুত ও আধুনিক শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশের চূড়ান্ত সময়কালকে ঐতিহাসিকরা শিল্পবিপ্লবের ‘উড়ানকাল’ বলে অভিহিত করেছেন। আর্নল্ড টয়েনৰি ১৯৪০-১৯৬০ খ্রিস্টাব্দকে ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবের উড়ানকাল বললেও সাম্প্রতিককালের বেশিরভাগ ঐতিহাসিক ১৭৬০-১৭৮০ খ্রিস্টাব্দ সময়কালকে উড়ানকাল বলে চিহ্নিত করার পক্ষপাতী। তবে ফিলিস ডিন প্রমুখ ঐতিহাসিকদের মতে, ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়েছিল।

শিল্পবিপ্লবের ক্ষেত্রে অগ্রণী ক্ষেত্র (Leading Sector) বলতে কী বোঝায়?

শিল্পবিপ্লবের ক্ষেত্রে ‘অগ্রণী ক্ষেত্র’ তত্ত্বের প্রবর্তক ছিলেন ডবলিউ ডবলিউ রোস্টো। রোস্টোর মতে, সমস্ত শিল্পের বিকাশ সমহারে হয় না। কেবলমাত্র এক বা একাধিক শিল্পের বিকাশ হয় দ্রুত হারে এবং এই শিল্পগুলিই শিল্পবিপ্লবের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে। ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে অগ্রণী ক্ষেত্র ছিল বস্ত্র ও লৌহ-ইস্পাত শিল্প।

এরিক হবসবম – এর মতে শিল্পবিপ্লবের কারণ কী ছিল?

এরিক হসবমের মতে শিল্পবিপ্লবের প্রধান সহায়ক ছিল ইংল্যান্ডের কৃষিবিপ্লব। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষের ফলে উৎপাদন দ্রুতবৃদ্ধি পায়। কৃষির সঙ্গে সঙ্গে পশুপালনেও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা গৃহীত হয়। কৃষি ও পশুপালনের উন্নতির জন্য খাদ্যের উৎপাদন বাড়ায় ইংল্যান্ড খাদ্যের দিক থেকে স্বয়ম্ভর হয়ে ওঠে, যা শিল্পবিপ্লবকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে।

ব্রিটেনে প্রথম শিল্পবিপ্লব ঘটেছিল কেন?

ব্রিটেনে প্রথম শিল্পবিপ্লব ঘটেছিল। ব্রিটেনে প্রথম শিল্পবিপ্লব ঘটার কারণগুলি হল –

  • শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান উপাদান – মূলধন, কাঁচামাল, উৎপাদিত সামগ্রী বিক্রির বাজার ব্রিটেনের ছিল।
  • ব্রিটেনে শিল্পসহায়ক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়েছিল।
  • ব্রিটেনের খনিজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল শিল্পের সহায়ক।
  • ব্রিটেনের সরকার শিল্প উৎপাদনে উৎসাহী ছিল।

ইংল্যান্ডে কবে থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের শিল্পবিপ্লব শুরু হয়?

ইংল্যান্ডে অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অর্থাৎ ১৭৬০-৮০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম পর্যায়ের শিল্পবিপ্লব শুরু হয়।

আর দ্বিতীয় পর্যায়ের শিল্পবিপ্লব ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় বলে মনে করা হয়। তবে কারও কারও মতে তা শুরু হয় ১৮৪০-১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে।

শিল্পবিপ্লবের যুগে বস্ত্রশিল্পের জন্য কোন্ কোন্ যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়?

শিল্পবিপ্লবের যুগে বস্ত্রশিল্পের জন্য যেসব যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়, সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-স্যার জন কে-এর উড়ন্ত মাকু’, হারগ্রিভস-এর ‘স্পিনিং জেনি’, আর্করাইট-এর ‘ওয়াটার ফ্রেম’, কার্টরাইট-এর ‘পাওয়ার লুম’, জেমস ওয়াট-এর ‘বাষ্পীয় ইঞ্জিন’ প্রভৃতি।

বাষ্পীয় ইঞ্জিন, বাষ্পচালিত রেলইঞ্জিন এবং নিরাপত্তা বাতি কারা, কবে আবিষ্কার করেন?

১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে জেমস ওয়াট বাষ্পীয় ইঞ্জিন, ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে জর্জ স্টিফেনসন বাষ্পচালিত রেলইঞ্জিন এবং ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে হামফ্রে ডেভি নিরাপত্তা বাতি আবিষ্কার করেন।

বোল্টন ইঞ্জিন বলতে কী বোঝায়?

জেমস ওয়াট ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার করেন। এই বাষ্পীয় ইঞ্জিন তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতেন ম্যাথু বোল্টন নামে এক ব্যক্তি। তাই ম্যাথু বোল্টনের নাম অনুসারে এই ইঞ্জিন ‘বোল্টন ইঞ্জিন’ নামে পরিচিত হয়।

এনক্লোজার কী? শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

এনক্লোজার কথাটির অর্থ জমি ঘেরাও করে চাষাবাদ। এনক্লোজার ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনী ভূস্বামীরা ছোটো ছোটো জমিগুলি ক্রয় করে নিলে কৃষিক্ষেত্রে বহু কৃষক কর্মহীন হয়ে পড়ে। এই সমস্ত কৃষকেরা শহরে এসে কলকারখানায় যোগ দিলে শিল্পায়নে গতি সঞ্চার হয়।

কারখানা প্রথা বা ফ্যাক্টরি প্রথা (Factory System) বলতে কী বোঝো?

শিল্পবিপ্লবের ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বৃহৎ শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। এইসব কলকারখানায় যান্ত্রিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিল্পোৎপাদনের গুণগত ও পরিমাণগত ব্যাপক উন্নতি ঘটানো সম্ভব হয়। বৃহৎ কারখানাভিত্তিক এই ব্যবস্থাই ফ্যাক্টরি প্রথা’ নামে পরিচিত। শিল্পবিপ্লবের ফলে এই ফ্যাক্টরি প্রথার উদ্ভব হয়।

কে, কেন ইংল্যান্ডকে বিশ্বের কারখানা বলেছেন?

পৃথিবীর ইতিহাসে ইংল্যান্ডে প্রথম বস্ত্রবয়ন ও অন্যান্য শিল্পের ক্ষেত্রে শিল্পবিপ্লব ঘটে। কারখানায় উৎপাদিত দ্রব্যকে ইংল্যান্ড সমগ্র বিশ্বের বাজারজাত করতে তৎপর হয়। সেইজন্য ঐতিহাসিক ফিশার ইংল্যান্ডকে ‘বিশ্বের কারখানা’ বলেছেন।

শিল্পবিপ্লবের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডকে কেন ইউরোপের শিক্ষক বলা হয়?

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যান্ডে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার শিল্পবিপ্লবের অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীকালে ফ্রান্স, জার্মানি ও রাশিয়া ইংল্যান্ডের প্রযুক্তি ও পরিকাঠামো অনুসরণ করেই তাদের দেশে শিল্পায়ন ঘটায়। এইসব দেশের প্রযুক্তিবিদরা ইংল্যান্ড থেকে শিক্ষা, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞ নিজেদের দেশে নিয়ে গিয়ে শিল্পোন্নয়নের প্রচেষ্টা চালায়। অর্থাৎ ইংল্যান্ডই ছিল তাদের ‘মডেল’ বা ‘আদর্শ’ — তাই শিল্পবিপ্লবের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডকে ইউরোপের শিক্ষক’ বলা হয় ৷

মহাদেশীয় ভূখণ্ডে কেন ইংল্যান্ডের পরে শিল্পায়ন শুরু হয়? 

মহাদেশীয় ভূখণ্ডের ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, হল্যান্ড, বেলজিয়াম প্রভৃতি দেশে ইংল্যান্ডের পরে শিল্পায়ন শুরু হয়। যেমন –

  • শিল্প-বাণিজ্যের কাজকে অসম্মানজনক মনে করে এসব দেশের অভিজাতরা কলকারখানা স্থাপনে এগিয়ে আসেনি।
  • এই সমস্ত দেশগুলিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা শিল্পায়নের পথে বাধার সৃষ্টি করেছিল।

ইংল্যান্ড ছাড়া ইউরোপের কোন্ কোন্ দেশে শিল্পবিল্পব ঘটে?

ইংল্যান্ডে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে প্রথম শিল্পবিপ্লব ঘটে। এ ছাড়া ফ্রান্সে শিল্পবিপ্লব সংঘটিত হয় ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পর জার্মানিতে শিল্পবিপ্লব দেখা যায় ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে। রাশিয়ায় প্রকৃত শিল্পবিপ্লব ঘটে উনিশ শতকের শেষের দিকে। এরপর ধীরে ধীরে ইউরোপের সব দেশেই শিল্পবিপ্লব হয়।

ফ্রান্সে দেরিতে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়েছিল কেন?

ফ্রান্সে দেরিতে শিল্পবিপ্লব শুরু হওয়ার কারণগুলি হল —

  • ফরাসি বিপ্লবের ফলে ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ফ্রান্সে রাজনৈতিক উত্থান-পতন শুরু হয়। ফলে এই সময় ফ্রান্সে শিল্পবিপ্লবের অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল না।
  • ফরাসি অভিজাতরা শিল্প ও ব্যাবসাবাণিজ্যকে ঘৃণা করত।
  • ফ্রান্সে শিল্পের উপযোগী মানসিকতা, মূলধন, পরিবহণ ব্যবস্থা, উপনিবেশ প্রভৃতির অভাব ছিল। তাই ফ্রান্সে দেরিতে অর্থাৎ অর্লিয়েন্স বংশের সম্রাট লুই ফিলিপের রাজত্বকালে (১৮৩০-১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ) শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়।

ফ্রান্সে শিল্পবিল্পব কখন শুরু হয়?

ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ফ্রান্সে শিল্পায়ন শুরু হয়। আমেরিকান ঐতিহাসিক লুই ডানহাম বলেন, ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে আধুনিক শিল্পায়ন শুরু হয় এবং ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ তা বৈপ্লবিক রূপ পরিগ্রহ করে। ঐতিহাসিক রোস্টো ১৮৩০-১৮৬০ খ্রিস্টাব্দকে ফ্রান্সের শিল্পবিপ্লবের বিকাশের কাল বলে ধরেছেন।

ফ্রান্সের শিল্পায়নে তৃতীয় নেপোলিয়নের অবদান কী ছিল?

ফ্রান্সে তৃতীয় নেপোলিয়নের আমলেই প্রকৃত অর্থে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। তিনি ক্রেডিট মবিলিয়ার ও ক্রেডিট ফসিয়ার নামে দুটি আধা-সরকারি ব্যাংক স্থাপন করে শিল্পবাণিজ্যে মূলধনের অভাব দূর করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ফ্রান্সে রেলপথের যথেষ্ট প্রসার ঘটে এবং কয়লা, লৌহ-ইস্পাত ও বস্ত্রশিল্পে প্রভূত উন্নতি হয়। এমনকি তাঁর আমলে ইউরোপে শিল্পজাত দ্রব্যের রপ্তানির ক্ষেত্রে ফ্রান্স দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল।

ক্রেডিট মবিলিয়ার ও ক্রেডিট ফসিয়ার কী? 

ফ্রান্সে শিল্পায়নের অর্থাভাব দূর করার জন্য তৃতীয় নেপোলিয়ন ক্রেডিট মবিলিয়ার এবং ক্রেডিট ফসিয়ার নামক আধা-সরকারি ব্যাংক স্থাপন করেন। নতুন শিল্পে অর্থ বিনিয়োগ করতে ক্রেডিট মবিলিয়ার এবং কৃষক ও শহরবাসীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির জামিনের জন্য ক্রেডিট ফসিয়ার ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

ইংল্যান্ডের তুলনায় জার্মানিতে শিল্পবিপ্লব কেন দেরিতে শুরু হয়?

জার্মানিতে দেরিতে শিল্পবিপ্লব শুরু হওয়ার কারণগুলি ছিল —

  • তৎকালীন জার্মানির রাজনৈতিক অস্থিরতা।
  • জার্মানির বিভিন্ন রাজ্যে শুল্ক আদায়ের নীতির পার্থক্য।
  • সামন্তপ্রভুদের শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগে অনীহা।
  • ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পূর্বে সেখানে শিল্প স্থাপনের কোনো অনুকূল পরিবেশ ছিল না।

জার্মানিতে কখন শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়?

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরে জার্মানিতে শিল্পবিপ্লব ঘটে। জার্মানির শিল্পায়নে বিসমার্কের বিশেষ অবদান ছিল। তিনি শিল্পকে কেন্দ্রীয় সরকারের আওতায় এনে শিল্পোন্নয়নের ব্যবস্থা করেন। শিল্পে মূলধন বিনিয়োগ করার জন্য ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন ও ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৭০-১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে ৮৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

জার্মানিতে কোন্ শিল্পের প্রথম উন্নতি হয়েছিল? এখানকার শিল্পায়নের দুটি উপাদান লেখো।

জার্মানিতে সর্বপ্রথম কয়লা ও লৌহশিল্পের উন্নতি পরিলক্ষিত হয়।

উপাদান – এখানকার শিল্পায়নের প্রধান উপাদান হল –

  • আলসাস, লোরেন প্রভৃতি আকরিক লৌহ উৎপাদক অঞ্চলের অবস্থান,
  • শিল্পবাণিজ্যে ব্যাংকগুলির অর্থ সরবরাহ নীতি প্রভৃতি।

ফ্রেডরিখ লিস্ট কে ছিলেন?

ফ্রেডরিখ লিস্ট ছিলেন প্রসিদ্ধ জার্মান অর্থনীতিবিদ। জার্মানির রেলপথ বিস্তারে এবং শুল্কসংস্থা সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি। কিছুদিনের জন্য অভ্যন্তরীণ শুল্কব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রিত করলে গ্রামের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি মনে করতেন। তিনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন এবং উদারনীতিবাদের সঙ্গে অর্থনৈতিক ভাবনাচিন্তাকে যুক্ত করেন।

বেলজিয়ামে কীভাবে শিল্পবিপ্লব ঘটে?

১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়ম ককরিল বেলজিয়ামে পশম বোনার শিল্প প্রতিষ্ঠা করলে বেলজিয়ামে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়। শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদ, কাঁচামাল, মূলধন ও জনসম্পদের প্রাচুর্য বেলজিয়ামে ছিল। বেলজিয়ামে শিল্পায়নের দ্রুত অগ্রগতি ঘটে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের পর।

রাশিয়াতে দেরিতে শিল্পবিপ্লব ঘটেছিল কেন?

রাশিয়াতে শিল্পবিপ্লবের প্রসার হয়েছিল অনেক দেরিতে। এর কারণ ছিল —

  • রাশিয়া ছিল কৃষিপ্রধান ও সামন্ততান্ত্রিক দেশ। তাই শিল্পবিপ্লবের প্রথম পর্বে রাশিয়াতে শিল্পোদ্যোগী বুর্জোয়া মধ্যবিত্তশ্রেণি গড়ে ওঠেনি।
  • রাশিয়ার ভূমিদাসরা গ্রামে বসবাস করত এবং তারা সামন্তপ্রভুর অনুমতি ছাড়া শহরে শ্রমিকের কাজ করতে যেতে পারত না।
  • রাশিয়ার যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা ছিল নিম্নমানের। ফলে রাশিয়াতে শিল্পায়নের সূচনা হয় ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে।

রাশিয়াতে শিল্পবিপ্লব কখন শুরু হয়?

ব্রিটেন ও ফ্রান্সে শিল্পবিপ্লব ঘটার অনেক পরে রাশিয়াতে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ভূমিদাস প্রথার উচ্ছেদ ঘটানোর পর রাশিয়ায় শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়। এরপর মুক্ত ভূমিদাসরা শহরে এসে শ্রমিকের কাজ করতে পারার ফলে কলকারখানায় শ্রমিকের অভাব দূর হয়।

সার্জেই উইটে কে ছিলেন?

সার্জেই উইটে ছিলেন রুশ সরকারের বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রী। রুশ শিল্প সম্প্রসারণে তাঁর ভূমিকা ছিল যথেষ্ট। বিসমার্ক যে জার্মান রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শক্তিশালী করে তোলেন তা তিনি ভোলেননি। শিল্পবিস্তারপ্রসূত জাতীয়তাবাদের তত্ত্বকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন।

রাশিয়ার শিল্পায়নে উইটের ভূমিকা কী ছিল?

অথবা, উইটি সংস্কার বলতে কী বোঝো?

রুশ বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রী সার্জেই উইটে ভারীশিল্প তথা লোহা, কয়লা, ইস্পাত, রেলপথ প্রভৃতি শিল্পস্থাপনে বিশেষ নজর দেন। অস্ত্রশিল্পকে তিনি উৎসাহ দেন। মূলধনের জোগানের জন্য রপ্তানি বাড়িয়ে আমদানি কমান। তিনি কৃষকদের উপর শিল্পকর চাপিয়ে সেই অর্থ শিল্পে বিনিয়োগ করেন, শিল্পে বেসরকারি উদ্যোগে উৎসাহ দেন, শিল্প সংরক্ষণ নীতি অনুসরণ করেন এবং বিদেশি পুঁজি আকর্ষণের জন্য ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ায় স্বর্ণমান চালু করেছিলেন।

ইটালিতে শিল্পবিপ্লব কীভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল? 

ইটালির বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনীতি ছিল কৃষিভিত্তিক। ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবের প্রভাব দুভাবে ইটালিতে পড়েছিল। প্রত্যক্ষ অর্থে ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবের যুগে ইটালি ব্রিটেনকে কাঁচামাল সরবরাহ করত। ফলে ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবের গতি যত বেড়েছে ততই সমৃদ্ধ হয়েছে ইটালি। এ ছাড়া সংবাদ বিনিময়, মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা প্রভৃতি ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশকে ইটালি অনুকরণ করেছিল।

স্পেনে শিল্পবিপ্লব দেরিতে হওয়ার কারণ কী? 

স্পেনের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ছিল ইংল্যান্ডের সম্পূর্ণ বিপরীত। ব্রিটেনের উপনিবেশ বিস্তারের ফলে স্পেন ক্রমশ তার উপনিবেশগুলি হারাতে থাকে। স্পেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজার ঋণপত্র কিনে রাজাকেই ধার দিত। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তখন অন্যান্য ব্যাংকের মাধ্যমে শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে ব্যস্ত। স্পেনে রেলপথ উন্নয়নেরও প্রয়োজন ছিল না। কারণ — সেখানে শিল্পের অস্তিত্বই ছিল না।

শিল্পবিপ্লবের ফলাফল কী হয়েছিল?

  • লে বিশ্বের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।
  • শিল্পবিপ্লবের ফলে সমাজে পুঁজিপতি মালিক ও শোষিত শ্রমিক শ্রেণির সৃষ্টি হয়।
  • ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়।
  • শিল্পবিপ্লবের ফলে নগর স

শিল্পবিপ্লবের রাজনৈতিক ফলাফল কী ছিল?

শিল্পবিপ্লবের ফলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় —

  • শিল্পবিপ্লবের ফলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জমিদার, ভূস্বামীদের পরিবর্তে মালিক ও শ্রমিকরা প্রভাব বিস্তার করে।
  • শ্রমিক ও মালিকশ্রেণির মধ্যে সংঘর্ষের সূচনা হয়।
  • শিল্পোন্নত দেশগুলি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ বিস্তারে সচেষ্ট হয়।

শিল্পবিপ্লবের সামাজিক ফলাফল কী ছিল?

শিল্পবিপ্লবের ফলে ইউরোপের সামাজিক ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছিল।

  • সমাজে দুটি নতুন শ্রেণির উদ্ভব হয় — মালিক ও শ্রমিকশ্রেণি।
  • শিল্পবিপ্লবের ফলে গ্রামের কৃষকরা ভালো মানের মজুরির আশায় শহরে এসে কলকারখানায় যোগদান করে।
  • শিল্পবিপ্লবের ফলে সামস্তশ্রেণির অবসান ঘটে ও শিল্পপতি, বণিক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়।

শিল্পবিপ্লবের অর্থনৈতিক ফলাফল কী ছিল?

শিল্পবিপ্লবের ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।

  • শিল্পবিপ্লবের ফলে প্রচুর পণ্যসামগ্রী উৎপাদন হতে থাকে এবং ব্যাবসাবাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে।
  • শিল্পে ‘ফ্যাক্টরি প্রথা’ বা বৃহৎ কারখানার উদ্ভব হয়।
  • শিল্পক্ষেত্রে শ্রমবিভাজন নীতি চালু হয়।

শিল্পবিপ্লবের কুফলগুলি লেখো।

শিল্পবিপ্লবের কুফলগুলি হল – 1. কুটিরশিল্পের ধ্বংসসাধন হয়। 2. গ্রামগুলি জনশূন্য হয়ে পড়ে। 3. শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানের অবনতি ঘটে।

শিল্পবিপ্লবের দুটি সুফল লেখো।

শিল্পবিপ্লবের দুটি সুফল হল – 1. দ্রুত নগরায়ণ ঘটে এবং 2. অল্প সময়ে অধিক দ্রব্য উৎপাদন সম্ভবপর হয়।

শিল্পাশ্রয়ী সভ্যতা বলতে কী বোঝো?

ইংল্যান্ডে শুরু হওয়া শিল্পবিপ্লব বিশ্বের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করে এবং শিল্পোৎপাদনের উপর ভিত্তি করে এক নতুন সভ্যতার উন্মেষ হয়। এই সভ্যতাই ‘শিল্পাশ্রয়ী সভ্যতা’ নামে পরিচিত। এর ফলে প্রাচীন কুটিরশিল্প, গ্রামীণ অর্থনীতি ও সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা রূপান্তরিত হয় শিল্পাশ্রয়ী সভ্যতা, নগরজীবন, মধ্যবিত্তশ্রেণি ও উদারনৈতিক আদর্শে পরিচালিত সমাজে।

শিল্পায়ন কীভাবে গ্রাম ও নগরজীবনকে প্রভাবিত করেছিল?

শিল্পায়নের ফলে কাজের আশায় গ্রামের মানুষ শহরে এসে ভিড় জমায়। এর ফলে গ্রামগুলি জনশূন্য হয়ে পড়ে এবং শহরগুলিতে জনসংখ্যার প্রাচুর্য দেখা যায়। প্রয়োজনের তুলনায় শ্রমিকের সংখ্যা অধিক হওয়ায় মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দিয়ে কম বেতনে অধিক পরিশ্রম করিয়ে নিয়ে শিল্পে প্রচুর লাভ করার সুযোগ পায়।

শিল্পবিপ্লবের ফলে নারী ও শিশুদের অবস্থার কী পরিবর্তন লক্ষ করা যায়?

শিল্পবিপ্লবের ফলে কলকারখানায় যন্ত্রের ব্যবহার হতে থাকে। ফলে কায়িক শ্রমের প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ায় নারী ও শিশুরা বিভিন্ন কর্মে নিযুক্ত হতে থাকে। তবে নারী ও শিশুশ্রমিকরা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সমপরিমাণ উৎপাদন করলেও বেতন পেত খুব কম। এইভাবে তারা শোষিত হত।

শিল্পবিপ্লব কীভাবে বুর্জোয়া শ্রেণির উদ্ভব ঘটায়?

শিল্পবিপ্লবের ফলে বুর্জোয়া শ্রেণির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অভিজাতদের ক্ষমতা লোপ পায়। বুর্জোয়া শ্রেণি অর্থ কৌলীন্যের জোরে সমাজে মর্যাদা ও ক্ষমতা লাভ করে। তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের জন্য ভোটাধিকার তাদের হাতেই রাখে। এইভাবে ইউরোপে বুর্জোয়া শ্রেণির উদ্ভব ঘটে।

শিল্পবিপ্লবের ফলে বুর্জোয়া শ্রেণি কীভাবে লাভবান হয়?

শিল্পবিপ্লবের ফলে বুর্জোয়াদের ক্ষমতা যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। শিল্পবিপ্লবের পূর্বে অভিজাত শ্রেণি যে সুযোগসুবিধা ভোগ করত, এখন বুর্জোয়ারা সেই ক্ষমতার অধিকারী হয়। এমনকি রাষ্ট্রকে নিজেদের উদ্দেশ্যপূরণে ব্যবহারের জন্য তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে এগিয়ে আসে। ইতিহাসে বুর্জোয়া যুগের সূচনা হয়।

উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন বলতে কী বোঝো?

শিল্পবিপ্লবের ফলে সম্পদ বণ্টনে সুস্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়। আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উঠতি পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় শিল্পবিপ্লবের সুফল ভোগ করে দিনে দিনে আরও ধনী হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ছোটোখাটো ব্যবসায়ী ও নিম্ন সম্প্রদায়ের মানুষ শিল্পবিপ্লবের জেরে আর্থিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দিনে দিনে আরও দরিদ্র হয়ে পড়ে। এইভাবে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার উপনিবেশগুলিতে শিল্পোন্নয়নের হার ইউরোপ বা আমেরিকার তুলনায় অনেকগুণ পিছিয়ে ছিল। ফলে বিশ্বে ধনসম্পদ সৃষ্টি ও বণ্টনের ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্ব এবং অনুন্নত বিশ্বের মধ্যে যে বৈষম্য তৈরি হয়, বিশেষজ্ঞরা সেই বৈষম্যকে ‘উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ইউরোপে শ্রমিকশ্রেণির উদ্ভব কীভাবে হয়?

শিল্পবিপ্লবের ফলে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে প্রচুর কলকারখানা গড়ে উঠেছিল। গ্রামের কৃষক ও কুটিরশিল্পে নিযুক্ত কারিগররা রোজগারের আশায় গ্রাম থেকে শিল্পশহরগুলিতে এসে ভিড় করে। এরা কলকারখানায় শ্রমিকের কাজ করে জীবিকানির্বাহ করতে শুরু করে। এইভাবে গ্রাম থেকে আগত ভূমিহীন, গৃহহীন কারখানার চাকুরি সম্বল শ্রমিকশ্রেণির উদ্ভব ঘটে।

শ্রমিকশ্রেণির জীবনধারা কেমন ছিল?

শিল্পবিপ্লবের ফলে হঠাৎ প্রচুর লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শিল্পশহরগুলির স্বাস্থ্য ও নগররক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। বাসস্থানের অভাবে শ্রমিকরা বস্তিতে (ঘেটো) নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করতে বাধ্য হয়। শ্রমিকদের শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যরক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় বস্তিগুলি ধীরে ধীরে নৈতিক অবক্ষয়ের পথে চলে যায়। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, হতাশাবোধ তাদের জীবনধারাকে গ্রাস করে।

শিল্পবিপ্লবের ফলে শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে কী পরিবর্তন লক্ষ করা যায়?

শিল্পবিপ্লবের পূর্বে উৎপাদন ব্যবস্থায় মালিক ও শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে কোনো প্রভেদ ছিল না। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পর বৃহৎ কলকারখানা স্থাপিত হলে ব্যাপক হারে শ্রমিকশ্রেণির প্রয়োজন অনুভূত হয়। মালিক শ্রেণির লক্ষ্য ছিল অল্প পারিশ্রমিকে শ্রমিকের শ্রম ক্রয় করে ব্যাপক হারে মুনাফা অর্জন করা।

শিল্পবিপ্লবের ফলে কীভাবে পুঁজিবাদের বিকাশ হয়?

অথবা, শিল্পবিপ্লবের ফলে পুঁজিবাদীরা কীভাবে লাভবান হয়?

শিল্পবিপ্লবের ফলে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার সমগ্র অংশ মালিক বা পুঁজিপতিদের কুক্ষিগত হয়। এরা বিশ্বের বাজারে ইচ্ছেমতো দামে পণ্য বিক্রয় করে মুনাফার পাহাড় জমিয়ে ফেলে। জমা মূলধন দিয়ে তারা দেশেবিদেশে কলকারখানা স্থাপন করে অর্থ উপার্জনের পথ প্রশস্ত করে পুঁজিবাদের বিকাশে সচেষ্ট হয়।

শিল্পবিপ্লবের ফলে কী ধরনের রাষ্ট্রদর্শনের উদ্ভব হয়?

অথবা, সমাজতন্ত্রবাদের উদ্ভব কখন হয়? এর বিষয়বস্তু কী?

শিল্পবিপ্লবের ফলে সমাজতন্ত্রবাদ নামে নতুন রাষ্ট্রদর্শনের উদ্ভব হয়। এই রাষ্ট্রদর্শনে ধনবণ্টন ব্যবস্থার বৈষম্য, শ্রমিকশ্রেণির সীমাহীন দুর্দশা ও শিল্পপতিদের হাতে প্রভূত সম্পদ সঞ্চয়ের ফলে যে সমস্যার উদ্ভব হয়, তার সমাধানসূত্র আলোচনা করা হয়েছে।

ট্রাক সিস্টেম (Truck System) কী?

ব্রিটেনে ঊনবিংশ শতকে প্রচলিত এক প্রথা অনুসারে শ্রমিকদের মজুরি নগদে না দিয়ে দ্রব্যের মাধ্যমে দেওয়া হত। এই দ্রব্য বিক্রি করে শ্রমিকরা জীবিকানির্বাহ করত। এই প্রথা ট্রাক সিস্টেম (Truck System) নামে পরিচিত।

দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব বলতে কী বোঝো?

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যান্ডে বস্ত্রশিল্পকে কেন্দ্র করে শিল্পবিপ্লব হয়েছিল বলে একে ‘বস্ত্রশিল্পের যুগ’ বলা হয়। কিন্তু উনিশ শতকে (১৮৪০-১৮৯৫ খ্রি.) মূলধনের উপর ভিত্তি করে কয়লা, লৌহ-ইস্পাত প্রভৃতি শিল্পের মধ্য দিয়ে শিল্পবিপ্লবের যে দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়, তাকে এরিখ হবসবম ‘দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব’ বা ‘মূলধনি শিল্প’ বলে অভিহিত করেছেন।

শ্রমজীবী আন্দোলন কেন শুরু হয়? 

শ্রমজীবীদের অনেকেই প্রয়োজনের থেকে কম মজুরি পেত। কাজের সময়সীমা নির্দিষ্ট ছিল না। তাই তারা শোষিত হত। কোনো আইন ছিল না। ফলে মালিকরা কম মজুরি দিয়ে বেশি খাটিয়ে মুনাফা বৃদ্ধি করছিল। এই শোষণের বিরুদ্ধেই শুরু হয় শ্রমজীবী আন্দোলন।

শ্রমজীবী আন্দোলনের লক্ষ্য কী ছিল?

পুঁজিপতি শ্রেণির বহুমুখী শোষণের হাত থেকে শ্রমিকশ্রেণিকে রক্ষা করা, শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থরক্ষা, তাদের মজুরির হার বৃদ্ধি, শ্রমের সময় হ্রাস ও বেকারত্বের বিরোধিতা, সামাজিক উন্নতি, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, শ্রমিকশ্রেণির উন্নতিকল্পে আইন প্রণয়ন ইত্যাদি ছিল শ্রমজীবী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন কখন গড়ে ওঠে?

শিল্পবিপ্লবকালে মালিকশ্রেণির শোষণে জর্জরিত হয়ে শ্রমিকেরা যখন উপলব্ধি করে যে, তাদের দুঃখকষ্ট লাঘবের জন্য সংঘবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন, তখন তারা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের দাবিদাওয়া আদায়ে সচেষ্ট হয়।

বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন কোনটি? এটি কবে, কার উদ্যোগে গড়ে ওঠে?

বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন হল কমিউনিস্ট লিগ

  • ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে কার্ল মার্কসের উদ্যোগে ‘কমিউনিস্ট লিগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়।

লন্ডন ওয়ার্কিং মেনস অ্যাসোসিয়েশন বা লন্ডন শ্রমিক সংঘ কবে, কাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়?

১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়ম লোভেট ও ফ্রান্সিস প্লেস-এর নেতৃত্বে ‘লন্ডন ওয়ার্কিং মেনস অ্যাসোসিয়েশন’ বা ‘লন্ডন শ্রমিক সংঘ’ প্রতিষ্ঠিত হয়।

শ্রমিক সংঘ ইংল্যান্ডে প্রথম কেন শুরু হয়?

শিল্পবিপ্লবের ফলে মালিক ও শ্রমিক দুই পৃথক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। ফলে শিল্পশহরগুলিতে সর্বহারা শ্রেণি নিজেদের স্বার্থরক্ষার তাগিদে মালিকদের শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। শ্রমিকশ্রেণির অসন্তোষ, ডারউইনের বিবর্তনবাদ এবং সর্বোপরি ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার আদর্শ প্রভৃতি কারণে ইংল্যান্ডে শ্রমিক সংঘ প্রথম শুরু হয়।

লুডাইট আন্দোলন কী? 

ব্রিটেনের শোষিত শ্রমিকশ্রেণি এক সময় উপলব্ধি করেছিল যে, যন্ত্র বা মেশিনের জন্যই তাদের এত দুঃখদুর্দশা। দুঃখদুর্দশার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য শ্রমিকরা নেড লুড নামে এক শিক্ষার্থী শ্রমিকের নেতৃত্বে কলকারখানার মেশিন ভেঙে আন্দোলন করে। এই আন্দোলন চলেছিল ১৮১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই আন্দোলন ‘লুডাইট আন্দোলন’ নামে পরিচিত।

কম্বলধারীদের অভিযান (March of the Blanketeers) বলতে কী বোঝায়?

১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের পর থিসেলউড নামে এক উগ্রপন্থী শ্রমিক নেতার নেতৃত্বে বন্দুকের দোকানে লুঠের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ সরকার শ্রমিকদের সভা নিষিদ্ধ করে। এর প্রতিবাদে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক সেন্ট পিটার ময়দানে সপরিবারে কম্বল কাঁধে জমায়েত হয়। এই সভাকেই কম্বলধারীদের অভিযান বা March of the Blanketeers বলা হয়।

পিটারলু হত্যাকাণ্ড কী? 

১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে সেন্ট পিটার ময়দানে সমবেত কম্বলধারীদের সভায় ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে ওয়াটারলুর যুদ্ধ (১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ) জয়ী সেনাবাহিনী গুলিবর্ষণ করে। এতে ১১ জন শ্রমিক নিহত হন এবং কয়েকশো শ্রমিক আহত হন। সেন্ট পিটার ময়দানের এই হত্যাকান্ডকে। পিটারলু হত্যাকাণ্ড বলা হয়।

কত খ্রিস্টাব্দে কোথায় ফ্যাক্টরি আইন পাস হ আইনে কী বলা হয়?

১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেনে ফ্যাক্টরি আইন পাস হয়। এতে বলা হয –

  • ১০ বছরের কমবয়সি শিশুদের কারখানার কাজে নিয়োগ করা যাবে না।
  • শিশুশ্রমিকদের ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না।
  • শ্রমিকদের নগদ বেতনের পরিবর্তে তৈরি দ্রব্যে বেতন (ট্রাক প্রথা) দেওয়া যাবে না।

ফ্যাক্টরি আইন কেন পাস করা হয়?

কলকারখানায় নারী ও শিশুরা কী অবস্থায় কাজ করে তা জানার জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কমিশন নিয়োগ করে। এই কমিশন বাস অনুযায়ী কাজের সময়সীমা ও কাজের প্রকৃতি নির্দিষ্ট করে আইন পাস। করে। এই আইনকেই ‘ফ্যাক্টরি আইন’ বলে।

জনগণের সনদ (People’s Charter) কী?

১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ছয় দফা দাবি সমন্বিত সনদকে ‘জনগণের সনদ’ বলা হয়। এই সনদের দাবিগুলি হল – 1. পার্লামেন্টের বাৎসরিক নির্বাচন, 2. সর্বজনীন ভোটাধিকার, 3. গোপন ব্যাট প্রথার মাধ্যমে ভোটদান, 4. পার্লামেন্টের সদস্যদের নিয়মিত ভাষা প্রদান, 5. সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটাধিকার বিলোপ, 6. জনসংখ্যার ভিত্তিতে সমান আয়তনের নির্বাচন কেন্দ্র গঠন।

চার্টিস্ট আন্দোলন কী?

১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত ‘লন্ডন শ্রমিক সংঘ’-এর উদ্যোগে ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ছয় দফা দাবির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন চার্টিস্ট আন্দোলন নামে পরিচিত। সনদ বা চার্টারের ভিত্তিতে এই শ্রমিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল বলে, একে চার্টিস্ট আন্দোলন বলা হয়।

প্যারি কমিউন কী?

ফ্রান্সের প্যারিস শহরে বিপ্লবী শ্রমিকরা ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মার্চ এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্যারি কমিউন নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। প্যারি কমিউনের আন্দোলন ছিল জার্মান সৈন্য ও ফরাসি রাষ্ট্রপতি থিয়ার্সের সরকারের বিরুদ্ধে। প্যারি কমিউন গঠনের কারণ ছিল থিয়ার্সের সরকারে রাজতন্ত্রীদের প্রাধান্য ও থিয়ার্সের জনবিরোধী নীতি। প্যারি কমিউন দমিত হলেও এটি ছিল পরবর্তী শ্রমিক আন্দোলনগুলির কাছে এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

রক্তাক্ত রবিবার (Bloody Sunday) বলতে কী বোঝায়?

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বুশ-জাপান যুদ্ধে রাশিয়া পরাজিত হয়। এই সময় জার শাসনের বিরুদ্ধে রাশিয়ায় তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। ২২ জানুয়ারি রবিবার সেন্ট পিটারসবার্গে শ্রমিকরা একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে শামিল হন। রুশ সৈন্য মিছিলের উপর গুলিবর্ষণ করলে প্রচুর শ্রমিক নিহত হন। এই ঘটনাকে ‘রক্তাক্ত রবিবার’ বলা হয়।

সমাজতন্ত্র বলতে কী বোঝো?

সমাজতন্ত্রবাদ একটি দার্শনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতবাদ। ব্যক্তিমালিকানার পরিবর্তে সমষ্টিগত উৎপাদন, আয় ও বণ্টনের দ্বারা সমাজে অর্থনৈতিক সমতা, ধনতন্ত্রবাদের সম্পূর্ণ ধ্বংসসাধন এবং শ্রমিকশ্রেণির কল্যাণসাধনই হল সমাজতন্ত্রবাদের মূল কথা।

কে প্রথম সমাজতন্ত্রবাদ কথাটির প্রচলন করেন? ব্রিটিশ সমাজতন্ত্রবাদের জনক কাকে বলা হয়?

রবার্ট আওয়েন প্রথম ‘সমাজতন্ত্রবাদ’ কথাটির প্রচলন করেন। রবার্ট আওয়েনকে ‘ব্রিটিশ সমাজতন্ত্রবাদের জনক’ বলা হয়।

সমাজতন্ত্রবাদের মূল নীতিগুলি কী?

সমাজতন্ত্রবাদের মূল নীতিগুলি হল –1. অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠা করে শ্রমিকশ্রেণির কল্যাণসাধন, 2. উৎপাদনের উপকরণগুলির উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ স্থাপন এবং 3. ব্যক্তিগত মালিকানা ও ধনতন্ত্রবাদের বিলোপসাধন।

কাল্পনিক সমাজতন্ত্র (ইউটোপিয়া) বলতে কী বোঝায়?

কার্ল মার্কসের পূর্ববর্তী সমাজতন্ত্রী সাঁ সিমোঁ, চার্লস ফ্যুরিয়ের, রবার্ট আওয়েন প্রমুখ সমাজতন্ত্রীগণ যে সমাজতন্ত্রী আদর্শ প্রচার করেছিলেন, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিল না। তাঁরা শোষণের বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছিলেন, সাম্যের আদর্শ প্রচার করেছিলেন, কিন্তু তাঁরা বাস্তব পথের সন্ধান দিতে পারেননি। এজন্য কার্ল মার্কস ও তাঁর অনুগামীরা ঐ সমাজতন্ত্রীদের ‘কাল্পনিক সমাজতন্ত্রী’ এবং তাদের আদর্শকে ‘কাল্পনিক সমাজতন্ত্র’ বলে অভিহিত করেছেন।

রবার্ট আওয়েন কেন বিখ্যাত ছিলেন?

রবার্ট আওয়েন ছিলেন ব্রিটিশ সমাজতন্ত্রবাদের জনক। তিনি প্রথম ‘সোশ্যালিজম’ কথাটি ব্যবহার করেছিলেন। আওয়েন এক নতুন সমাজের কথা বলেছেন, যার নাম তিনি দেন ‘New Harmony’। তিনি বৃহদায়তন শিল্প প্রতিষ্ঠার ও শ্রমিক শোষণের তীব্র বিরোধী ছিলেন এবং মানুষের নৈতিক উন্নতির থেকে সামাজিক পরিবর্তনের উপর বেশি জোর দিতেন। 

সেন্ট সাইমন কে ছিলেন? তিনি কেন বিখ্যাত?

অথবা, সাঁ সিমোঁ কে ছিলেন? তিনি কী কারণে বিখ্যাত?

সমাজতন্ত্রবাদের আদি প্রবক্তা ছিলেন ফরাসি চিন্তাবিদ সাঁ সিমোঁ বা সেন্ট সাইমন।
সাঁ সিমোঁ তাঁর ‘নিউ খ্রিশ্চিয়ানিটি’ গ্রন্থে সমাজতন্ত্রবাদের প্রধান সূত্রগুলি তুলে ধরেছিলেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বের সমস্ত মানুষের জন্য একটি সমবায় গড়ে তোলা, যেখানে প্রত্যেক মানুষ তার ব্যক্তিগত দক্ষতা অনুযায়ী বিবেচিত হবে এবং কর্ম অনুযায়ী পুরস্কৃত হবে।

চার্লস ফ্যুরিয়ের কে ছিলেন? তিনি কেন বিখ্যাত?

সমাজতন্ত্রবাদের আদি প্রবক্তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ফরাসি চিন্তাবিদ চার্লস ফ্যুরিয়ের বা শার্ল ফ্যুরিয়ের।

চার্লস ফ্যুরিয়ের সকলের মধ্যে একতার ভাব জাগ্রত করে সহযোগিতার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তিনি ১৫০০ ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি কমিউন বা ফ্যালাঞ্জ গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, যার সদস্যরা নিজেরাই বিভিন্ন ভোগ্যবস্তু উৎপাদন ও ভোগ করবে। এখানে মজুরি, মুনাফা ও প্রতিযোগিতা বলে কিছু না থাকায় সব মানুষ হবে সুখী ও সমৃদ্ধ।

লুই ব্ল্যাঙ্ক কে ছিলেন?

ফ্রান্সের খ্যাতনামা সমাজতান্ত্রিক নেতা ছিলেন লুই ব্ল‍্যাঙ্ক। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে তিনি অসাধারণ ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং বিপ্লব পরবর্তী সময়ে অস্থায়ী সরকারের সদস্যপদ লাভ করেন। তিনি তাঁর ‘Organisation of Labour’ গ্রন্থে শ্রমিকশ্রেণির সকলের সমান মজুরি, কাজের সুযোগ ও জাতীয় কর্মশালা স্থাপনের কথা বলেন। ব্যক্তিগত মূলধন ও স্বাধীন প্রতিযোগিতা যে শ্রমজীবীদের স্বার্থের পরিপন্থী সেকথা তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন।

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদ কী?

কার্ল মার্কস বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সমাজতন্ত্রকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র হল শোষণের এক যন্ত্র। ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভবের ফলে সম্পত্তির মালিকরা নিজেদের সম্পত্তির সংরক্ষণ করতে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। শোষিত শ্রেণি শেষ পর্যন্ত এই শোষণের অবসান ঘটিয়ে শ্রেণিহীন ও শোষণহীন সমাজ গড়ে তুলবে।

কার্ল মার্কস কেন বিখ্যাত?

কার্ল মার্কস ছিলেন আধুনিক সমাজতন্ত্রবাদের জনক। তিনি সমাজতন্ত্রবাদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ রচনা করেন। তাঁর এই গ্রন্থটিকে ‘সমাজতন্ত্রবাদের বাইবেল’বলা হয়। পরে তিনি ‘দাস ক্যাপিটাল’ নামে একটি বিখ্যাত গ্রন্থ প্রকাশ করেন। তাঁর সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ মার্কসবাদ নামে পরিচিত। তাঁর আদর্শের উপর ভিত্তি করে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো – কে সমাজতন্ত্রবাদের জন্ম – কান্না বলা হয় কেন?

কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস-এর ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ পুস্তিকায় ধনতন্ত্রের বিনাশের অনিবার্যতা ও শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব ঘোষিত হয় এবং বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়। তাই এই পুস্তিকাটিকে আধুনিক সমাজতন্ত্রবাদের ‘জন্ম-কান্না’ বলা হয়।

মার্কসীয় সমাজতন্ত্রকে কমিউনিজম বা সাম্যবাদ বলা হয় কেন?

কার্ল মার্কস তাঁর ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’, ‘উদ্‌বৃত্ত মূল্য’ প্রভৃতি তত্ত্বের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি অলীক সমাজতন্ত্র বা ইউটোপিয়ান সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে তাঁর জনকল্যাণমূলক নীতি ও আদর্শের পার্থক্য বোঝাবার জন্য ও ইতিপূর্বে ‘সমাজবাদ’ শব্দটির বহুল ব্যবহারের কারণে তাঁর মতবাদকে ‘সাম্যবাদ’ বা ‘কমিউনিজম’ বলে অভিহিত করেছেন।

কার্ল মার্কসের শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্বটি কী?

কার্ল মার্কসের মতে, শ্রেণিসংগ্রামই হল ইতিহাসের চালিকাশক্তি। প্রাচীনকালে উৎপাদনের উপকরণের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে শোষক ও শোষিত শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। ফলে সৃষ্টি হয় এক শ্রেণিসংঘাতের। এই শ্রেণিসংঘাতে শ্রমিকশ্রেণি জয়লাভ করবে, শোষণহীন শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে এবং একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটবে।

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ বলতে কী বোঝো? 

কার্ল মার্কস ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ এবং ‘দাস ক্যাপিটাল’ নামক দুটি গ্রন্থে তাঁর দার্শনিক তত্ত্বগুলি ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, যে-কোনো সমাজব্যবস্থায় সম্পদের উৎপাদন ব্যবস্থাই সমাজকে চালিত করে। শিল্পসমাজও তার ব্যতিক্রম নয়। এই উৎপাদনের উপর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সমাজের নানা শ্রেণির মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে, যা ‘দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ’ নামে পরিচিত।

উদ্‌বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব কী?

উত্তর মার্কস তাঁর ‘দাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থে বলেন যে, শ্রমিকের শ্রমই সামগ্রিকভাবে পণ্য উৎপাদন করে। কিন্তু তারা এর মাত্র একাংশ শ্রমশক্তির মূল্য বা মজুরি হিসেবে পায় এবং বাকি অংশ উদ্‌বৃত্ত হিসেবে মালিকশ্রেণি ভোগ করে। এই ধারণাই উদ্‌বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব’ নামে পরিচিত।

শিল্পসমাজ সম্পর্কে মার্কসের মূল বক্তব্য কী?

কার্ল মার্কসের মতে, শিল্পভিত্তিক সমাজে মালিক ও শ্রমিক – এই দুই শ্রেণির উদ্ভব হয়। শ্রমিকের শ্রমের ভিত্তিতে যে দ্রব্য উৎপন্ন হয় মালিকশ্রেণি স্বল্প মজুরির বিনিময়ে তার পুরো উদ্‌বৃত্ত অংশটাই ভোগ করে। তার মতে, মালিকশ্রেণির উচ্ছেদের মধ্যেই শ্রমিকশ্রেণির অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিহিত। শ্রমিকশ্রেণি বিপ্লবের মাধ্যমে মালিকশ্রেণির উচ্ছেদ ঘটালে শ্রেণিহীন সমাজ গড়ে উঠবে।

মার্কস কীভাবে শিল্পসমাজের সমালোচনা করেছেন?

মার্কসের মতে, শিল্পসমাজে মালিকরা যে আর্থিক লাভ করেন, তা প্রকৃতপক্ষে শ্রমিকদেরই প্রাপ্য। কারণ তাদের শ্রমের ফলেই কাচামালগুলি শিল্পসামগ্রীতে পরিণত হয়। তাই উদ্বৃত্ত মূল্য মালিক একা ভোগ করতে পারে না, তাতে শ্রমিকেরও অংশ থাকে।

ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস কেন বিখ্যাত?

ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস ছিলেন জার্মান সমাজবিজ্ঞানী, লেখক, দার্শনিক ও কার্ল মার্কসের প্রধান সহযোগী। তিনি কার্ল মার্কসের সঙ্গে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো বা কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহার নামক বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন।

রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রবাদ বলতে কী বোঝো?

বিসমার্ক ছিলেন রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রবাদের প্রবক্তা। তিনি বুঝেছিলেন, শুধুমাত্র শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তাই শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য শ্রমিকদের দুর্ঘটনা, বার্ধক্য ও চিকিৎসাবিমার মতো কতকগুলি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এর দ্বারা তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, সমাজতন্ত্রীদের চেয়ে রাষ্ট্র শ্রমিককল্যাণের জন্য বেশি চিন্তাশীল। বিসমার্কের এই শ্রমিক কল্যাণমূলক আইন রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রবাদ নামে পরিচিত।

শিল্পবিপ্লব কীভাবে নয়া সাম্রাজ্যবাদের জন্ম দেয়?

অথবা, শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে উপনিবেশ বিস্তারের সম্পর্ক লেখো। 

ইউরোপের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিল্পবিপ্লবের ফলে উদ্‌বৃত্ত পণ্যের বিক্রির বাজারের জন্য এশিয়া ও আফ্রিকার মতো অনগ্রসর দেশে উপনিবেশ স্থাপনের সুযোগ আসে। ফলে এশিয়া, আফ্রিকার দেশগুলি ইউরোপের অধীনস্থ বাজারে পরিণত হয়। ইউরোপের শিল্পদ্রব্য অনগ্রসর দেশগুলিতে বিক্রির জন্য ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে উপনিবেশ দখল নিয়ে যে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা দেয়, তার থেকেই নয়া সাম্রাজ্যবাদের জন্ম হয়। 

সাম্রাজ্যবাদ বলতে কী বোঝো? নব সাম্রাজ্যবাদ কী?

প্রাথমিক পর্বে সাম্রাজ্যবাদ বলতে বিজিত দেশে ভূমি সম্পর্কিত অধিকার প্রতিষ্ঠাকে বোঝাত। কিন্তু ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে সাম্রাজ্যবাদ বলতে বোঝাত বিজিত দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে গ্রাস করে ফেলার প্রচেষ্টাকে। একে ‘নব সাম্রাজ্যবাদ’ বলা হয়।

উপনিবেশবাদ বলতে কী বোঝায়? 

উপনিবেশবাদ বলতে বোঝায় অন্য দেশকে জয় করে সেই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করা এবং সেই দেশকে। নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখা। উনিশ শতকে ইউরোপের শক্তিশালী দেশসমূহ – ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া প্রভৃতি প্রায় গোটা পৃথিবীকে যেমন- তাদের উপনিবেশে পরিণত করেছিল। এই প্রক্রিয়া বিশেষত কার্যকরী। হয়েছিল এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে।

উনিশ শতকে সাম্রাজ্যবাদের কারণ বা উপাদান কী ছিল?

উনিশ শতকে সাম্রাজ্যবাদের মূল কারণ ছিল উপনিবেশের কাচামাল সংগ্রহ এবং শিল্পোৎপাদিত পণ্যের বিক্রির জন্য উপনিবেশের বাজার দখল করা। এ ছাড়া অতিরিক্ত পুঁজির বিনিয়োগ, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের অনুপ্রেরণা প্রভৃতিও উপনিবেশ বিস্তারে সহায়তা করে।

ঊনবিংশ শতকে নয়া উপনিবেশবাদের কারণগুলি কী ছিল?

ঊনবিংশ শতকে নয়া উপনিবেশবাদের কারণগুলি ছিল —

  • শিল্পপতি ও বণিকদের হাতে বিপুল অর্থসম্পদ জমা হওয়ায় তা পুনর্বিনিয়োগের ক্ষেত্রের অনুসন্ধান,
  • রাজনৈতিক আধিপত্য প্রসারের আকাঙ্ক্ষা,
  • খ্রিস্টধর্ম প্রচারের তাগিদ,
  • উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রসার প্রভৃতি।

সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে হবসন কী বলেছেন?

হবসনের মতে, সাম্রাজ্যবাদী কার্যকলাপের প্রতিকার করতে হলে উদ্‌বৃত্ত মূল্য বা অতিরিক্ত পুঁজি দরিদ্র শ্রেণির মানুষের মধ্যে বিতরণ করা দরকার। কারণ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়লে তারা কলকারখানায় তৈরি বাড়তি জিনিস কিনে উদ্‌বৃত্ত দ্রব্যকে ব্যবহার করতে পারবে। এর ফলে উপনিবেশ বিস্তারের আর প্রয়োজন হবে না।

সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে লেনিনের বক্তব্য কী?

লেনিনের মতে, ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদের বীজ নিহিত। কেননা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির বৈদেশিক নীতি পুঁজিবাদী শ্রেণির স্বার্থে পরিচালিত হয়। ফলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র উপনিবেশ দখলে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভবে মিশনারি বা ধর্মপ্রচারকদের অবদান কী ছিল? 

ধর্মপ্রচারকগণ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। যেমন — ব্রিটিশ। সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ও বিস্তারের ক্ষেত্রে মিশনারি বা ধর্মপ্রচারক ডেভিড লিভিংস্টোন, ফরাসি ধর্মপ্রচারক স্ট্যানলি ল্যাভিজেরি প্রমুখ ধর্মপ্রচারের জন্য আফ্রিকায় যান। এঁদের মাধ্যমেই ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি আফ্রিকার অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ ও সম্ভাবনার কথা জানতে পারে এবং আফ্রিকায় উপনিবেশ বিস্তারে আগ্রহী হয়।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক বিস্তার কোথায় কোথায় হয়েছিল?

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ থেকে ঊনবিংশ শতকের সূচনার মধ্যবর্তী সময়কালে আমেরিকা মহাদেশে কানাডা, নিউ ব্রান্সউইক, নোভাস্কেশিয়া, নিউ ফাউন্ডল্যান্ড, প্রিন্স এডওয়ার্ড দ্বীপ, হাডসন উপসাগরীয় অঞ্চল, জামাইকা প্রভৃতি দেশ ও অপরাপর কয়েকটি পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারতবর্ষে বাংলাদেশ, বোম্বাই এবং পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের কয়েকটি অঞ্চলে ইংরেজদের আধিপত্য ছিল। এ ছাড়া চিন ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলেও ব্রিটিশরা উপনিবেশ স্থাপন করেছিল।

হল্যান্ডের উপনিবেশ বিস্তার সম্বন্ধে কী জানো?

উপনিবেশ বিস্তারের ক্ষেত্রে হল্যান্ড পিছিয়ে ছিল না। হল্যান্ড এশিয়ার অন্তর্গত সুমাত্রা, জাভা, বোর্নিও, সেলিবিস দ্বীপপুঞ্জ ও নিউগিনি দ্বীপপুঞ্জের একাংশে উপনিবেশ বিস্তারের মাধ্যমে আধিপত্য স্থাপন করেছিল।

কোন্ কোন্ অঞ্চলে ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল?

ফরাসি সম্রাট লুই ফিলিপের আমলে ফ্রান্সের উপনিবেশ বিস্তারের যে সূত্রপাত হয়েছিল তৃতীয় নেপোলিয়নের আমলে তা চূড়ান্ত রূপ পায়। ফ্রান্স কোচিন চিন, আনাম, টংকিং, লাওস, কম্বোজ প্রভৃতি স্থানের উপর আধিপত্য স্থাপন করে। এ ছাড়া প্রশান্ত মহাসাগরের নিকটবর্তী কয়েকটি দ্বীপেও ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল।

অস্ট্রেলিয়ার কোন্ কোন্ অঞ্চল উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল?

১৮৫১-১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রেলিয়ায় সোনার খনি আবিষ্কৃত হলে দলে দলে উপনিবেশ স্থাপনকারীরা অস্ট্রেলিয়ায় আসতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস, কুইন্সল্যান্ড, ভিক্টোরিয়া, সাউথ অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি অঞ্চল উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল।

সাম্রাজ্যবাদের দুটি ফলাফল লেখো।

সাম্রাজ্যবাদের ফলে – 1. সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির উপনিবেশ বিস্তারের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিল এবং 2. সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির অর্থনৈতিক শোষণের ফলে উপনিবেশগুলির অর্থনৈতিক কাঠামো একেবারেই ভেঙে পড়েছিল।

সুয়েজ খাল কত খ্রিস্টাব্দে খুলে দেওয়া হয়? কত খ্রিস্টাব্দে ভারতে প্রথম টেলিগ্রাফ যোগাযোগ চালু হয়?

১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে সুয়েজ খাল খুলে দেওয়া হয়।

ভারতে প্রথম টেলিগ্রাফ যোগাযোগ ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে চালু হয়।

ভারতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রত্ন বলা হয় কেন?

ভারতকে ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রত্ন’ বলা হত। কারণ —

  • ভারত ছিল ব্রিটেনের উপনিবেশগুলির মধ্যে প্রধান। ভারতের অর্থনীতি ব্রিটেনের স্বার্থেই পরিচালিত হত।
  • ভারতকে ব্রিটিশ পণ্য বিক্রির উন্মুক্ত বাজার হিসেবে ব্যবহার করা হত।
  • ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ব্রিটেনের ল্যাঙ্কাশায়ারে তৈরি সুতির কাপড়ের ৮৫% কাপড় বিক্রি হত ভারতে।

ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে ঔপনিবেশিক বিরোধের কারণ কী?

ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে ইউরোপীয় শক্তিগুলি অর্থনৈতিক সুযোগসুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে উপনিবেশ স্থাপনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। উপনিবেশ থেকে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ এবং উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রির উদ্দেশ্যে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি নতুন নতুন ভূখণ্ডে উপনিবেশ স্থাপনকে কেন্দ্র করে বিরোধিতায় জড়িয়ে পড়ে।

উগ্র জাতীয়তাবাদ বলতে কী বোঝো?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ) প্রারম্ভে ইউরোপের বিভিন্ন জাতি নিজ নিজ জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্ব প্রচার করে জাতিবৈরিতার সৃষ্টি করে। এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী, ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিকরা এই জাতীয়তাবাদ প্রচার করতে থাকেন। যেমন— জার্মান ঐতিহাসিকেরা টিউটনিক জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করতে থাকেন। ইংল্যান্ডে প্রচারিত হয় অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতির শ্রেষ্ঠত্ব। এইভাবে বিভিন্ন জাতি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য উগ্র জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণার জন্ম দিয়েছিল।

উপনিবেশ বিস্তারের ফলে চিন কীভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল?

অথবা, চিন কোন কোন্ অঞ্চলের মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল?

উত্তর ঔপনিবেশিক ও বাণিজ্যিক আধিপত্য স্থাপনকে কেন্দ্র করে চিন বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। যেমন — 1. রাশিয়া দখল করে লিয়াও টুং উপদ্বীপ ও পোর্ট আর্থার বন্দর। 2. জার্মানি দখল করে কিয়াওচাও বন্দর এবং শানটুং প্রদেশ। 3. ইংল্যান্ড দখল করে ওয়াইহ্যাওয়ে বন্দর। 4. ফ্রান্স ইন্দোচিনের আনাম থেকে চিনের ভিতর পর্যন্ত রেলপথ স্থাপনের অধিকার পায়।

চিনের কোন্ অংশে রাশিয়ার উপনিবেশ স্থাপিত হয়?

চিনদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাশিয়া পূর্বদিকে আমুর নদী পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তারে সক্ষম হয়। রাশিয়া চিনের পোর্ট আর্থার বন্দর দখল করে নেয়। চিনের উত্তর সীমান্তে মঙ্গোলিয়ার আমুর উপত্যকা দখল করে নিয়ে সেখানে রাশিয়া ভ্লাডিভোস্টক বন্দর স্থাপন করে। এর ফলে রুশ সাম্রাজ্যের সীমা কোরিয়ার নিকটবর্তী হয়।

অতি-রাষ্ট্রিক অধিকার বলতে কী বোঝায়?

চিনে অবস্থিত ব্রিটিশ নাগরিকদের অপরাধমূলক কাজকর্মের বিচারের দায়িত্ব ইংরেজদের বিচারালয়ে নিষ্পত্তির অনুমতি দেওয় হয়। এই অধিকারবলে ব্রিটিশ নাগরিকরা চিনে বসবাস করলেও চিন সম্রাটের অধীনতা থেকে মুক্ত থাকেন। এই বিশেষ সুবিধা অতি-রাষ্ট্রিক অধিকার নামে পরিচিত।

উন্মুক্ত দ্বার নীতি কাকে বলে?

চিনা ভূখণ্ডে ইউরোপীয় দেশগুলির উপনিবেশ স্থাপন রোধ করার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব জন হে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে মুক্তদ্বার নীতি’ ঘোষণা করেন। এর দ্বারা চিনের অখন্ডতা রক্ষা এবং চিনা ভূখণ্ডে যে-কোনো দেশের বণিক বা বণিকগোষ্ঠীকে অবাধে বাণিজ্য করার অধিকার প্রদানের কথা বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে চিনদেশে আমেরিকার বাণিজ্যিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখাই ছিল ‘মুক্তদ্বার নীতি’ ঘোষণার প্রধান উদ্দেশ্য। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এই নীতিকে অদৃশ্য সাম্রাজ্যবাদ বলে অভিহিত করেছেন।

আফ্রিকা মহাদেশকে অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ বলা হত কেন?

আফ্রিকা মহাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের দিক দিয়ে ইউরোপের সবচেয়ে কাছে হলেও এর অন্তর্ভাগ ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত ইউরোপবাসীর কাছে ছিল অজ্ঞাত ও অনাবিস্তৃত। আফ্রিকার শ্বাপদসংকুল গহন অরণ্য, দুর্গম পর্বত ও খরস্রোতা নদীসমূহ, ঊষর মরুভূমি, অস্বাস্থ্যকর জলবায়ু ও আদিম অধিবাসীদের প্রতিকূলতার কারণে মহাদেশটি অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ নামে পরিচিত।

White Man’s Burden বা সাদা চামড়ার দায়বদ্ধতা বলতে কী বোঝায়?

শ্বেতাঙ্গরা নিজেদের উন্নত সভ্যতা-সংস্কৃতির ধারক ও বাহক বলে মনে করত, সেজন্য তারা পৃথিবীর অনুন্নত কৃয়াঙ্গ জাতিগুলিকে সুসভ্য করে তোলাকে তাদের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনুন্নত অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে। ইংরেজ লেখক রুডইয়ার্ড কিপলিং এবং ফরাসি লেখক জুল ফেরি এ ব্যাপারে দেশবাসীকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান। অবশ্য এ বিষয়টি ছিল সাম্রাজ্যবাদের একটি অজুহাত মাত্র।

আফ্রিকায় উপনিবেশ নিয়ে সংঘাতের প্রধান ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করো।

আফ্রিকায় উপনিবেশ নিয়ে সংঘাতের প্রধান ক্ষেত্রগুলি ছিল —

  • ফ্যাসোডা নিয়ে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে সংঘাত,
  • বুয়র যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইংল্যান্ড ও জার্মানির মধ্যে দ্বন্দ্ব,
  • মরক্কো নিয়ে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে বিরোধ ইত্যাদি।

ইন্টারন্যাশনাল আফ্রিকান অ্যাসোসিয়েশন করে কী উদ্দেশ্যে গঠিত হয়?

১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রাসেলস সম্মেলনে বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের উদ্যোগে ইন্টারন্যাশনাল আফ্রিকান অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয়।

এই সমিতির প্রকাশ্য উদ্দেশ্য আফ্রিকার দুর্গম অঞ্চল সম্পর্কে তথ্যসংগ্রহ করা হলেও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল নাইজার নদীর উপত্যকায় বিশাল কঙ্গো দেশের খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলিতে বেলজিয়ামের আধিপত্য স্থাপন করা।

কোন্ সন্ধির দ্বারা আফ্রিকার ব্যবচ্ছেদ হয়?

ইউরোপীয় দেশগুলি যাতে আফ্রিকার অনধিকৃত অঞ্চলগুলি শাস্তিপূর্ণভাবে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিতে পারে তার জন্য ১৮৮৪-৮৫ খ্রিস্টাব্দে বার্লিনে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান করা হয়। সুইজারল্যান্ড বাদে ইউরোপের ১৪টি দেশ এতে যোগদান করে। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে বার্লিন সন্ধির মাধ্যমে অবশেষে আফ্রিকার ব্যবচ্ছেদ ঘটে।

১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের বার্লিন সন্ধির কয়েকটি শর্ত লেখো।

১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের বার্লিন সন্ধিতে স্থির হয় যে – 1. কোনো রাষ্ট্র আফ্রিকার কোনো অংশ দখল করতে চাইলে তা আগে অন্য রাষ্ট্রগুলিকে জানাতে হবে। 2. কঙ্গো নদী আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে স্বীকৃত হবে। 3. সকল রাষ্ট্রের ধর্মপ্রচারক ও অভিযাত্রীদের কঙ্গোর অন্তর্দেশে প্রবেশের অধিকার থাকবে ইত্যাদি।

আফ্রিকার জন্য কাড়াকাড়ি বলতে কী বোঝো?

অথবা, আফ্রিকায় উপনিবেশ বিস্তারের জন্য কেন ইউরোপীয় দেশগুলি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়েছিল? 

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়েও আফ্রিকা ছিল একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ। কিন্তু উনিশ শতকের শেষে স্পেক, লিভিংস্টোন, স্ট্যানলি, ল্যাভিজেরি, পিটারস, দিব্রাজা প্রমুখ ধর্মপ্রচারক ও অভিযাত্রীদের প্রচেষ্টায় আফ্রিকার অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ, শ্রমিক ও নানা সম্ভাবনার কথা জানতে পেরে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি সেই সম্ভাবনার সুযোগ নেওয়ার জন্য আফ্রিকার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একেই ‘আফ্রিকার জন্য কাড়াকাড়ি’ বলা হয়।

আফ্রিকা কীভাবে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির মধ্যে বিভক্ত হয়েছিল?

অথবা, কোন্ কোন্ শক্তিগুলির মধ্যে আফ্রিকা বিভক্ত হয়েছিল?

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আফ্রিকা অনাবিষ্কৃত মহাদেশ হিসেবে থাকলেও ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আফ্রিকার ৯% ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়ে গিয়েছিল। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আফ্রিকার ৪.৫ মিলিয়ন বর্গমাইল ভূখণ্ডে ব্রিটেন, ৩.৫ মিলিয়ন বর্গমাইল ভূখণ্ডে ফ্রান্স, ৯ লক্ষ বর্গমাইল ভূখণ্ডে বেলজিয়াম, ১ লক্ষ বর্গমাইল ভূখণ্ডে জার্মানি এবং ১ লক্ষ ৮৫ হাজার বর্গমাইল ভূখণ্ডে ইটালি আধিপত্য স্থাপন করে। এ ছাড়া পোর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডের পুরোনো আধিপত্য বজায় ছিল। এইভাবে আফ্রিকা বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির মধ্যে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল।

ইউনিয়ন অফ সাউথ আফ্রিকা কীভাবে গঠিত হয়?

নেপোলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ইংরেজরা ওলন্দাজদের বিতাড়িত করে কেপ কলোনি দখল করে। এরপর আরও উত্তরে অগ্রসর হয়ে নাটাল, অরেঞ্জ কলোনি ও ট্রান্সভাল দখল করে। দক্ষিণ আফ্রিকার এই অঞ্চলগুলিকেই (কেপকলোনি, নাটাল, অরেঞ্জ কলোনি ও ট্রান্সভাল) ঐক্যবদ্ধ করে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে গঠিত হয় ‘ইউনিয়ন অফ সাউথ আফ্রিকা’।

ক্রুগার টেলিগ্রাম কী?

অথবা, জেমসন রেড কী? 

দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সভালে স্বর্ণখনি আবিষ্কৃত হলে সেখানকার বুয়রদের বিতাড়নের জন্য ব্রিটিশ ভাগ্যান্বেষী ড. জেমসনের নেতৃত্বে ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে একটি অভিযান পরিচালিত হয়। কিন্তু ট্রান্সভালের প্রেসিডেন্ট পল ক্রুগার তা সাফল্যের সঙ্গে প্রতিহত করলে জার্মান সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম টেলিগ্রাম মারফত তাকে অভিনন্দন জানান, এটি ক্রুগার টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত। এই টেলিগ্রাম ইঙ্গ-জার্মান সম্পর্ককে তিক্ত করে তোলে।

বুয়র যুদ্ধ কবে ও কাদের মধ্যে হয়?

ব্রিটিশ উপনিবেশ দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সভালে বসবাসকারী ডাচ কৃষকদের ‘বুয়র’ বলা হত। ব্রিটিশরা সোনা ও হিরের খনি দখল করতে ও কেপ কলোনি থেকে কায়রো পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন উপনিবেশ স্থাপনে সচেষ্ট হলে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে আফ্রিকার অরেঞ্জ কলোনি ও ট্রান্সভালের বুয়রদের সঙ্গে ইংল্যান্ডের যুদ্ধ হয় এবং এই যুদ্ধে ইংল্যান্ড জয়লাভ করে ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে বুয়র রাজ্য দুটি দখল করে নেয়।

আফ্রিকা ব্যবচ্ছেদের ফলাফল বা গুরুত্ব কী ছিল?

আফ্রিকা ব্যবচ্ছেদের ফলে –

  • আফ্রিকার অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ ইউরোপীয় দেশগুলির হস্তগত হওয়ায় ওইসব দেশ সমৃদ্ধিশালী হয়;
  • আফ্রিকার নানা অংশে ইউরোপীয় দেশগুলির ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে;
  • বহু নিগ্রো ক্রীতদাসে পরিণত হওয়ায় দাস ব্যাবসার দ্বারা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের প্রচুর অর্থাগম হয় ইত্যাদি।

Colonial League কবে, কারা প্রতিষ্ঠা করে?

Colonial League ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা প্রতিষ্ঠা করে। এই লিগের চাপে শেষ পর্যন্ত বিসমার্কও উপনিবেশবাদে আস্থাশীল হয়ে পড়েন।

ড্রেইকাইজারবুন্ড কী? এর লক্ষ্য কী ছিল?

জার্মানির চ্যান্সেলার বিসমার্কের প্রচেষ্টায় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে জার্মান সম্রাট কাইজার প্রথম উইলিয়ম, অস্ট্রিয়ার সম্রাট ফ্রান্সিস জোসেফ ও রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের মধ্যে ‘তিন সম্রাটের চুক্তি’ বা ‘ড্রেইকাইজারবুন্ড’ গড়ে ওঠে।

এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল — আন্তর্জাতিক শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা, রাজতন্ত্রবিরোধী ও সমাজতন্ত্রবাদী আন্দোলন ধ্বংস করা এবং সর্বোপরি ফ্রান্সকে মিত্রহীন করে রাখা।

রি-ইনসিওরেন্স সন্ধি কবে স্বাক্ষরিত হয়? এর উদ্দেশ্য আলোচনা করো।

বিসমার্কের উদ্যোগে ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার সঙ্গে জার্মানির রি-ইনসিওরেন্স সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।

বার্লিন কংগ্রেসে সানস্টিফানোর সন্ধি বাতিল করার কথা বলা হলে এবং বলকান অঞ্চলে জার্মানির আধিপত্য রক্ষার ব্যবস্থা হলে রাশিয়া তিন সম্রাটের চুক্তি ত্যাগ করে। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সের মিত্রতা গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে দূর করার জন্য বিসমার্ক গোপনে রি-ইনসিওরেন্স চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

Welt Politik নীতি কী? কে এই নীতি গ্রহণ করেন? কীভাবে এই নীতি বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে?

বিশ্ব রাজনীতিতে জার্মানির প্রাধান্য স্থাপনই হল ‘ওয়েল্ট পলিটিক’ নীতি। জার্মান শাসক কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম বিশ্ব রাজনীতিতে জার্মানির সক্রিয় অংশগ্রহণ ও হস্তক্ষেপ করার পক্ষপাতী ছিলেন। এই কারণে তিনি সামরিক ও নৌশক্তি বৃদ্ধি, উপনিবেশ দখল প্রভৃতির মাধ্যমে জার্মানির শক্তিবৃদ্ধির উদ্যোগ নেন। কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়মের এই সক্রিয় নীতিই ‘Welt Politik’ বা ‘বিশ্ব রাজনীতি নামে পরিচিত।

কীভাবে Welt Politik বা বিশ্ব রাজনীতি নীতি বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে?

উত্তর জার্মানির ঐক্য সম্পূর্ণ হওয়ার পর বিসমার্ক ঘোষণা করেন। যে, ‘জার্মানি একটি পরিতৃপ্ত দেশ’। কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম এই নীতি থেকে সরে এসে ঘোষণা করেন জার্মানি পরিতৃপ্ত নয়, তার সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা আছে। ওয়েল্ট পলিটিক নীতির মাধ্যমে সাম্রাজ্য বিস্তারে এগিয়ে এলে জার্মানির সঙ্গে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির সংঘর্ষ বাধে। এর পরিণতিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ দেখা দেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পিছনে উগ্র জাতীয়তাবাদের ভূমিকা আলোচনা করো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ইউরোপের অধিকাংশ দেশে প্রতিটি জাতি অপর জাতির তুলনায় বেশি সম্মান ও গৌরব দাবি করলে উগ্র জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়। জার্মানরা বিশেষত ট্রটস্কি, বার্নহার্ডি, দ্বিতীয় উইলিয়ম প্রমুখ টিউটনিক জাতির শ্রেষ্ঠত্ব ও ইংল্যান্ডে হোমার লি প্রমুখ অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করেন। এই পরস্পরবিরোধী জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের চেতনাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে।

অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদ বলতে কী বোঝায়? কীভাবে জা প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে?

ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কতকগুলি অঞ্চলে স্থানীয় অধিবাসীদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতা, বিভিন্ন জাতিসত্তার ভিত্তিতে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের দাবির ব্যর্থতাই অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদ নামে পরিচিত।

সেডানের যুদ্ধে আলসাস ও লোরেন হারানোয় ফ্রান্সের অসন্তুষ্টি, শ্লাভ-চেক জাতীয়তাবাদের বিরোধ, শ্লেজউইগ জার্মানির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ডেনমার্কের অসন্তুষ্টি, হাঙ্গেরি বোহেমিয়া বিরোধ, অস্ট্রো-সার্বিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সার্বিয়া ও ক্লোটবাসীদের ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের দাবি সমগ্র ইউরোপকে অশান্ত করে তোলে, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল।

প্রথম বলকান যুদ্ধ কবে, কাদের মধ্যে হয়েছিল? কোন সন্ধির দ্বারা এই যুদ্ধের অবসান ঘটে?

১৯১২ খ্রিস্টাব্দে তুরস্ক ও বলকান লিগের সদস্য রাষ্ট্রগুলির (গ্রিস, সার্বিয়া, মন্টিনিগ্রো, বুলগেরিয়া) মধ্যে প্রথম বলকান যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

  • লন্ডনের চুক্তির (১৯১৩ খ্রি.) দ্বারা প্রথম বলকান যুদ্ধের অবসান ঘটে।

কৰে, কেন বলকান লিগ গঠন করা হয়েছিল?

১৯১২ খ্রিস্টাব্দে গ্রিস, সার্বিয়া, মন্টিনিগ্রো ও বুলগেরিয়া একত্রিত হয়ে বলকান লিগ গঠন করেছিল।

  • বলকান লিগ গঠনের উদ্দেশ্য ছিল- তুর্কি সুলতানদের অত্যাচার থেকে জাতীয়তাবাদী বলকানদের রক্ষা করা।

মরক্কো সংকট কী?

আফ্রিকার মরক্কোয় ফরাসিদের প্রভাব ছিল। মরক্কোয় জার্মান স্বার্থ সুরক্ষিত করবার জন্য কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম মরক্কোর অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব এবং মুসলিম স্বার্থরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন। ফলে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা ‘মরক্কো সংকট নামে পরিচিত। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে আলজেসিরাস সম্মেলনে মরক্কো সংকটের সাময়িক সমাধান হয়।

আগাদির সংকট কী?

মরক্কো থেকে ফরাসি প্রভাব দূর করার জন্য কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর আগাদি বন্দরে ‘প্যান্থার’ নামে একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠান। এর ফলে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা ‘আগাদির সংকট’ নামে পরিচিত। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের মধ্যস্থতায় জার্মানি মরক্কোতে ফরাসি কর্তৃত্ব মেনে নেয়, বিনিময়ে জার্মানি ফ্রান্স অধিকৃত কঙ্গোতে ১ লক্ষ বর্গমাইল ভূখণ্ড লাভ করে।

হ্যালডেন দৌত্য কী? 

১৯১১ খ্রিস্টাব্দে আগাদির সংকট ও ত্রিপোলি যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জার্মানির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার রিচার্ড বার্ডন হ্যালডেনকে ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে প্রেরণ করেছিল। হ্যালডেন আফ্রিকাতে জার্মান ঔপনিবেশিক আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করার কথা বলেছিলেন। অবশ্য তার পরিবর্তে হ্যালডেন জার্মানির রণতরীর সংখ্যা হ্রাসের দাবি করেছিলেন, যা জার্মানি মেনে নেয়নি।

ইংল্যান্ডে গৌরবময় বিচ্ছিন্নতা (Splendid Isolation) বলতে কী বোঝো?

১৮৫৪-৫৬ খ্রিস্টাব্দে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের পর ইংল্যান্ড ইউরোপীয় রাজনীতি থেকে সরে এসে নিজ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য গঠন ও বাণিজ্যিক সুরক্ষার কাজে আত্মনিয়োগ করে। এই নীতি শুভচেতনাসম্পন্ন ছিল বলে ইউরোপীয় রাজনীতি সম্পর্কে ইংল্যান্ডের এই নিষ্ক্রিয়তা ‘গৌরবময় বিচ্ছিন্নতা’ নামে পরিচিত।

১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ইঙ্গ-জাপান চুক্তি দ্বারা এই বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভে ইউরোপে পরস্পরবিরোধী দুটি শক্তিজোটের নাম কী ছিল?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ইউরোপে পরস্পরবিরোধী দুই শক্তিজোটের একদিকে ছিল জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইটালিকে নিয়ে গঠিত ‘ত্রিশক্তি মৈত্রী’ (Tripple Alliance) এবং অন্যদিকে ছিল ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়াকে নিয়ে গঠিত ত্রিশক্তি আঁতাত (Tripple Entente)।

ত্রিশক্তি মৈত্রী বা ত্রিপল অ্যালায়েন্স কবে, কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়? এর প্রধান শর্ত কী ছিল?

১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে বিসমার্কের উদ্যোগে জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইটালির মধ্যে যে আত্মরক্ষামূলক ও অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তা ‘ত্রিশক্তি মৈত্রী’ নামে পরিচিত।

এই চুক্তির শর্তানুসারে চুক্তিবদ্ধ রাষ্ট্রগুলি কোনো এক বা একাধিক রাষ্ট্র দ্বারা আক্রান্ত হলে অপর রাষ্ট্রগুলি তাকে সাহায্য করবে।

ত্রিশক্তি আঁতাত বা ত্রিপল আঁতাত কবে, কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়?

কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়মের Welt Politik নীতির ফলে ভীত হয়ে ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জোটবদ্ধ হয়। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড ও রাশিয়ার বিরোধের অবসান ঘটলে ওই একই বছরে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যে ‘ত্রিশক্তি আঁতাত’ গড়ে ওঠে।

ইটালি কৰে ত্রিশক্তি মৈত্রী ত্যাগ করে ও কবে মিত্রপক্ষে যোগ দেয়?

১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ৪ মে ইটালি ত্রিশক্তি মৈত্রী (টিপল) অ্যালায়েন্স ত্যাগ করে।

১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ২৩ মে ইটালি মিত্রপক্ষে (ত্রিপল আঁতাত) যোগদান করে।

আঁতাত করডিয়াল কী?

১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে যে সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তাকে আঁতাত করডিয়াল বলা হয়। এই সময় ইংল্যান্ডের রাজা ছিলেন সপ্তম এডওয়ার্ড এবং ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ছিলেন এমিল লুবেৎ (লুবে)। অন্যদিকে উভয় রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন লর্ড ল্যান্সডাউন এবং থিওফিল দালকাসে।

ত্রিশক্তি মৈত্রী ও ত্রিশক্তি আঁতাত-এর মধ্যে চরিত্রগত পার্থক্য কী ছিল?

১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে ইটালি, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিশক্তি মৈত্রী ছিল একটি লিখিত ও আক্রমণাত্মক চুক্তি। অন্যদিকে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিশক্তি আঁতাত ছিল একটি মৌখিক ও আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা।

  • ত্রিশক্তি মৈত্রী ছিল একটি মধ্য ইউরোপীয় শক্তিজোট। অন্যদিকে ত্রিশক্তি আঁতাত ছিল ইউরোপের তিনটি প্রান্তিক শক্তির জোট।
  • সর্বোপরি, ত্রিশক্তি মৈত্রী ছিল প্রতিষ্ঠাকামী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিজোট, অপরদিকে ত্রিশক্তি আঁতাত ছিল প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিজোট।

কে, কাকে বাজে কাগজ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন?

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি বেলজিয়াম আক্রমণ করার ফলে ইংল্যান্ড লন্ডন চুক্তি (১৮৩৯ খ্রি.) অনুসারে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে জার্মানির চ্যান্সেলার বেধমান হলওয়েগ উক্ত চুক্তিকে বাজে কাগজ’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

সেরাজেভো হত্যাকাণ্ড কী? অথবা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ কী?

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জুন অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফ্রান্সিস ফার্দিনান্দ ও তাঁর পত্নী সোফিয়া বসনিয়ার রাজধানী সেরাজেভো পরিদর্শনকালে এক সার্ব আততায়ীর হাতে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডই ‘সেরাজেভো হত্যাকাণ্ড’ নামে পরিচিত। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য অস্ট্রিয়া সার্বিয়াকে দায়ী করে এক চরমপত্র পাঠায়। সার্বিয়া এই দাবি মানতে অস্বীকার করলে অস্ট্রিয়া সার্বিয়া আক্রমণ করে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।

ইউরোপে সশস্ত্র শান্তির যুগ কী?

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সেডানের যুদ্ধের পরবর্তীকালে কোনো বড়ো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। কিন্তু আপাত শান্তির আড়ালে যুদ্ধের এক মানসিক প্রস্তুতি চলতে থাকে। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অস্ত্র নির্মাণের প্রতিযোগিতা, পারস্পরিক সন্দেহ, বিদ্বেষ ও হিংসা এবং অতৃপ্ত জাতীয়তাবাদ ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে। ফলে যে-কোনো সময়ে যুদ্ধ সংঘটিত হতে পারত। এই কারণে ১৮৭১-১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে ‘সশস্ত্র শান্তির যুগ’ বলা হয়ে থাকে। 

শিল্পবিপ্লব ও উপনিবেশবাদ হল বিশ্বের ইতিহাসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই ঘটনাগুলি বিশ্বের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

Rate this post


Join WhatsApp Channel For Free Study Meterial Join Now
Join Telegram Channel Free Study Meterial Join Now

মন্তব্য করুন