এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের দ্বিতীয় পাঠের অন্তর্গত আবুল ফজল রচিত ‘একুশে মানে মাথা নত না করা’ বা ‘একুশের তাৎপর্য’ প্রবন্ধ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এখানে লেখক পরিচিতি, রচনার উৎস, পাঠপ্রসঙ্গ, বিষয়সংক্ষেপ, নামকরণ এবং এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।
এই আলোচনাটি আপনাদের ‘একুশের তাৎপর্য’ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেবে এবং এর মূলভাব বুঝতে বিশেষভাবে সহায়ক হবে। এছাড়া, সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক পরিচিতি ও প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত নানা প্রশ্ন এসে থাকে; তাই পরীক্ষার সেরা প্রস্তুতির জন্য এই তথ্যগুলো জেনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক পরিচিতি
আবুল ফজল অধুনা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার কেঁওচিয়া গ্রামে 1903 খ্রিস্টাব্দের 1 জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ধর্মনিষ্ঠ মৌলবি ফজলুল রহমান। তিনি 1923 খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের সরকারি নিউ স্কিম মাদ্রাসা থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন, 1925 খ্রিস্টাব্দে ঢাকার ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএ পাস করেন এবং 1928 খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করে স্নাতক হন। 1940 খ্রিস্টাব্দে একজন প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পেশাগত দিক থেকে তিনি প্রথমে বারবার বিদ্যালয় পরিবর্তন করে অবশেষে 1941 খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনগর সরকারি কলেজে অধ্যাপকের পদ গ্রহণ করেন। 1943-1956 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। 1973-1975 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত থাকেন। পরে তিনি সরকারের মুখ্য শিক্ষা-উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। তবে এই কাজকর্মের মধ্যেই তাঁর কর্মপ্রেরণা সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ঢাকা মুসলিম-সাহিত্যসমাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেরণাদাতা ছিলেন। তাঁর সম্পাদিত ‘শিখা’ পত্রিকা দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে সংস্কৃতির আলো বিলিয়েছিল। শিক্ষাকর্ম, শিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি ছিলেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, চিন্তাশীল লেখক, শিক্ষাবিদ ও কথাশিল্পী। অজস্র চিন্তামূলক প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি উপন্যাস, ছোটোগল্প, প্রবন্ধ এবং নাটকও রচনা করেছিলেন। সাহিত্যিক খ্যাতির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি লাভ করেন সাম্মানিক ডক্টরেট উপাধি। ‘রেখাচিত্র’ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের জন্য তিনি ‘আদমজী’ পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়াও ‘বাংলা একাডেমি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার’-এর মতো বিখ্যাত পুরস্কারও তাঁর ঝুলিতে আছে। এই কর্মবীর ও চিন্তাবিদের জীবনাবসান হয় 1983 খ্রিস্টাব্দের 4 মে।
উৎস
রচনাটি তাঁর ‘একুশে মানে মাথা নত না করা’ গ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। গ্রন্থটিতে প্রাবন্ধিকের ভাষাপ্রীতি ও দেশভক্তির পরিচয় গভীরভাবে লিপিবদ্ধ এবং ভাষা-শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিবেদিত।
পাঠপ্রসঙ্গ
1947 খ্রিস্টাব্দে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয় 1971 খ্রিস্টাব্দে। মাঝের একটা বড়ো সময়পর্ব ধরে এক ভূখণ্ডের জনজীবনে চলে ভাষাকেন্দ্রিক ও রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থা। জাতিতত্ত্বকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পূর্ববঙ্গ যুক্ত হয়েছিল পাকিস্তানের সঙ্গে এ কথা সত্য, কিন্তু ধর্মের মিল ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের কোনো মিলই ছিল না। সবচেয়ে বড়ো কথা দুই ভূখণ্ডের মানুষের ভাষা ছিল ভিন্ন ভিন্ন। দেশ গড়ে ওঠার কিছুদিনের মধ্যেই সরকার থেকে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার নির্দেশ জারি করা হয়। কিছুদিনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের উদ্দেশে জানানো হয় যে, বাংলা বর্ণে নয়, আরবি হরফে লিখতে-পড়তে হবে। এই ঘোষণার পরেই সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। 1952 খ্রিস্টাব্দের 21 ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান পুলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ঢুকে আন্দোলনকারী নিরস্ত্র ছাত্রদের উপর গুলি চালায় এবং কয়েকজন ছাত্র শহিদ হন। আন্দোলনের জোরদার চাপে পড়ে আপাতভাবে পাকিস্তান সরকারের স্বৈরতন্ত্রী ভাষাদমন থেমে যায়। 21 ফেব্রুয়ারি হয়ে যায় ভাষা-শহিদ দিবস, যা পরবর্তী ক্ষেত্রে জাতিপুঞ্জের স্বীকৃতিতে পরিণত হয় ‘বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস’-এ। এই ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ এবং প্রবলতম রূপই ভাষার ভিত্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেয়।
বিষয়সংক্ষেপ
ভাষা কী ও কেন? তা দিয়ে ব্যক্তি বা জাতির কী হয়? তা না হলে বা না থাকলে চলে না কেন? – এর উত্তরেই নিহিত আছে ভাষা আন্দোলন তথা একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য। ভাষার দ্বারাই মানুষ, মানুষ হয়; ভাষা ছাড়া মানুষ ভাবতে, কল্পনা করতে বা চিন্তা করতে পারে না। ভাষা ছাড়া মানুষের প্রকাশ ও বিকাশ অসম্ভব। ব্যক্তিত্ব ও ব্যক্তিজীবনের বিকাশের ক্ষেত্রেও ভাষাই প্রধান। জাতির জাত হয়ে ওঠা, জাতির জাতীয়ত্ব-সর্বত্রই ভাষা সক্রিয়। এই ভাষাই মাতৃভাষা। সুতরাং ব্যক্তি ও জাতির উভয় জীবনেই মাতৃভাষা ও তার সাহিত্যের গুরুত্ব অপরিহার্য। জাতির সাহিত্য-শিল্প-সভ্যতা-সংস্কৃতি, সবেরই প্রাণভোমরা মাতৃভাষা-সাহিত্য; অতএব এমন ভাষা নিয়ে কোনো আপস নয়। যদি প্রাণ যায়, রক্ত ঝরে, তবুও মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠা দিতেই হয়। মাতৃভাষার দাবি স্বভাবের দাবি এবং মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার দাবি। এই দাবিকে প্রতিষ্ঠা দিতে একুশে ফেব্রুয়ারির শহিদেরা প্রাণ দিয়েছেন; এতে মাতৃভাষা যেমন বাঁচার পথ পেয়েছে, তেমন আমরাও বাঁচার পথ পেয়েছি। তাঁরা এবং তাঁদের স্মৃতি তাই চিরকালের। মাতৃভাষার সম্মানরক্ষার্থে প্রাণ দেওয়ার এমন নজির বিশেষ আর কোথাও নেই। এই ভাষা-শহিদেরা তাই আমাদের গৌরব ও গর্ব। এই বিশেষ স্মৃতিদিবস বারবার ফিরে এসে আমাদের স্মরণ করায় মাতৃভাষার প্রতি পালনীয় দায়িত্ব-কর্তব্য। এই দিবসকে সার্থক করতে হলে, এর তাৎপর্য বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে সারা বছর।
নামকরণ
একুশের তাৎপর্য একটি ছোটো প্রবন্ধ, যেখানে লেখক ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ – এই স্মৃতিভারাক্রান্ত দিনটিকে সামনে রেখে যেমন নিজের অগাধ মাতৃভাষাপ্রেমকে প্রকাশ করেছেন, তেমনি মাতৃভাষাপ্রেমী সব মানুষকেও ভাষাপ্রীতির ঝরনাধারায় স্নান করতে আহ্বান জানিয়েছেন। এই বিশেষ দিনটি বিশ্বসংস্কৃতির বিশ্ব ইতিহাসে আজ অমর হয়ে গেছে। এই দিনটি আজ শুধু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পরিগণিত নয়, বিশ্বের তাবৎ মাতৃভাষাভাষী মানুষজনের হৃদয় এদিন আবেগে দুলে ওঠে। ভাষা যে কী? ভাষার অস্তিত্বের সঙ্গে ভাষা-ব্যবহারকারীদের অন্তরের যোগ কোথায় – এই পথ দিয়ে বক্তব্যের গভীরে প্রবেশ করে লেখক বুঝিয়েছেন, কেন মানুষ মাতৃভাষার অবমাননায় ক্ষিপ্ত হয়, আন্দোলন করে, প্রাণ দেয়। এ যে শুধু আবেগ নয়, এ হল অস্তিত্বের লড়াই, এ অনিবার্য কর্তব্য ও দায়িত্ব। ভাষার বয়ান, বক্তব্যের গভীরতা উজিয়ে লেখক এখানে ওই সবিশেষ দিন 21 ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন প্রবন্ধে। অতএব দেখা যাচ্ছে – তাঁর নিজস্ব বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে যেহেতু এ প্রবন্ধে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ দিনটির তাৎপর্য ব্যাখ্যাই প্রধান হয়ে উঠেছে, তাই লেখককৃত নামকরণটি যথাযথ ও সার্থক।
শব্দার্থ ও টীকা
- নিহিত – স্থাপিত, রক্ষিত বা গুপ্ত।
- আন্দোলন – কোনো লক্ষ্যসিদ্ধির জন্য প্রচার, উত্তেজনা, সংঘবদ্ধ বিক্ষোভ প্রদর্শন।
- তাৎপর্য – মর্ম, প্রকৃত অর্থ।
- বিকাশধর্মী জীব – বিকাশ লাভ করা ধর্ম যার এমন প্রাণী।
- অবলম্বন – আশ্রয়, নির্ভর, ভরসা।
- অস্তিত্ব – বিদ্যমানতা, সত্তা, স্থিতি, থাকা।
- ব্যক্তিত্ব – ব্যক্তির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
- ব্যক্তিজীবন – ব্যক্তির নিজের জীবন।
- জাতি – প্রকার, শ্রেণি।
- জাতীয় সত্তা – জাতির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতনতা।
- মাতৃভাষা – স্বজাতির ভাষা, কোনো ব্যক্তির নিজের ও তার স্বজাতির ভাষা।
- অপরিহার্য – ত্যাগ করা যায় না এমন, অত্যাজ্য।
- সাহিত্য – সাহিত্যের ভাব।
- শিল্প – কারুকার্য, বিবিধ নির্মাণকর্ম।
- সভ্যতা – মার্জিত রুচি, মনের উৎকর্ষ অনুযায়ী জীবনযাপন প্রণালি।
- সংস্কৃতি – অনুশীলন করে পাওয়া বিদ্যাবুদ্ধি, রীতিনীতি ইত্যাদির উৎকর্ষ, সভ্যতার উৎকর্ষ, সমাজনীতি, বুদ্ধি, আচার-ব্যবহার ও শিল্পসাহিত্যের মধ্যে কোনো জাতির যে পরিচয় থাকে।
- শহিদ – ন্যায়সংগত অধিকার লাভের জন্য নিহত ব্যক্তি।
- চিরস্মরণীয় – যা বা যাকে চিরদিন মনে রাখা হয় বা মনে রাখা উচিত।
- অনন্য – অভিন্ন, অদ্বিতীয়, একক।
- দৃষ্টান্ত – নজির, উদাহরণ, প্রমাণের নিদর্শন।
- গৌরব – মর্যাদা, কদর, সম্মান।
- গর্ব – অহংকার, দর্প, গৌরব।
- অশ্রুসিক্ত – চোখের জলে ভেজা।
- ইতিহাস – অতীত বৃত্তান্ত, বর্তমান সময়ের আগে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার বৃত্তান্ত।
- স্মরণ – মনে মনে বিগত বিষয়াদির চিন্তা, অনুভব বা আলোড়ন।
এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ‘একুশের তাৎপর্য’ প্রবন্ধের বিষয়সংক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আশা করি, লেখাটি প্রবন্ধটি সম্পর্কে আপনাদের একটি সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছে এবং বিষয়টি সহজে বুঝতে সাহায্য করেছে। সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক পরিচিতি ও প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ বা মূলভাব সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে। তাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য এই তথ্যগুলো ভালোভাবে আয়ত্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যোগাযোগ: আপনাদের যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ!





মন্তব্য করুন