এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পাঠ, অর্থাৎ আশরাফ সিদ্দিকী রচিত ‘একুশের কবিতা’-র কিছু গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ফাইনাল পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নোত্তরগুলো অত্যন্ত সহায়ক, কারণ বাংলা পরীক্ষায় এই অংশ থেকে নিয়মিত প্রশ্ন আসতে দেখা যায়।
সপ্তম শ্রেণি বাংলা – একুশের কবিতা – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবি আশরাফ সিদ্দিকীর ‘একুশের কবিতা’-র মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক অত্যুজ্জ্বল ইতিহাসকথা। অধুনা বাংলাদেশের মাতৃভাষাপ্রেমী ভাষা-আন্দোলনকারীদের প্রিয় 21 ফেব্রুয়ারির ইতিকথা। আশ্চর্য সংযমে কবি সারা কবিতার কোথাও একটিবারের জন্য ‘একুশে’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি, অথচ সমগ্র কবিতাটির অঙ্গে তিনি শৈল্পিক দক্ষতায় ছড়িয়ে দিয়েছেন একুশের ভাষা-আন্দোলনের প্রলেপ। ‘একুশের কবিতা’র মধ্যে ধরা আছে 1952 খ্রিস্টাব্দের 21 ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ইতিহাস, যার মূলে রয়েছে মাতৃভাষার মর্যাদা ও ঐতিহ্যরক্ষার আত্মিক প্রচেষ্টা। 1947 খ্রিস্টাব্দে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে দ্বিখণ্ডিত ভারত স্বাধীনতা লাভ করার পর পূর্ববঙ্গের অর্থাৎ পূর্ব-পাকিস্তানের বাংলা ভাষার উপর উর্দুকে বলপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। আন্দোলনের জোয়ার বয়ে যায় পূর্ববঙ্গে। মিছিলের উপর সেনাদের গুলিবর্ষণে পাঁচ মাতৃভাষাপ্রেমী তরুণের মৃত্যু হলে উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ববঙ্গের মানুষ। মাতৃভাষাকেন্দ্রিক এই গণ-আন্দোলনের সূচনা হয় 21 ফেব্রুয়ারিতেই। এই আন্দোলনে বিজয়ী হন আন্দোলনকারীরা, জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের, জয় হয় বাংলা ভাষার। এই আন্দোলন, এই মরণপণ লড়াই, এই বিজয়ের স্মরণেই ‘একুশের কবিতা’। স্বভাবতই কবিতায় একুশে শব্দটির অস্তিত্ব ধরা না পড়লেও নামকরণে কবি একুশে শব্দটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রয়োগ করতে ভোলেননি। নামকরণটি তাই সার্থক।
শুধু মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতার প্রকাশ নয়, এই কবিতায় রয়েছে আবহমানের ও অমরতার প্রতি বিশ্বাস – পাঠ্য কবিতাটি অবলম্বনে উপরের উদ্ধৃতিটি আলোচনা করো।
মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের মতো। এর মাধ্যমেই মানুষের আত্মপ্রকাশ ও আত্মবিকাশ। তাই কোনো মানুষই মাতৃভাষার অপমান সহ্য করতে পারে না। কবিও মাতৃভাষামুখী, তাঁরও আত্মপ্রকাশ বা আত্মবিকাশ মাতৃভাষাকে অবলম্বন করেই। তাই ‘একুশের কবিতা’য় তিনি মাতৃভাষার প্রতি কেবল অসীম শ্রদ্ধাই প্রকাশ করেননি, এই ভাষার প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতা ও এর আবহমানতা বা অমরতার প্রতি তাঁর বিশ্বাসও কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে। কবি মনে করেন ভাষার একটা নিজস্ব ঐতিহ্য আছে। এই কবিতায় সেই ঐতিহ্যেরই স্মারক করে তিনি এনেছেন মাতৃভাষার সুধামাখানো কথকতা-রূপকথার আশ্চর্য উন্মাদনাকে। ভাষার স্পর্শ গায়ে মেখে জীবন্ত হয়ে ওঠা জারি-সারি-ভাটিয়ালি-মুর্শিদি ইত্যাদি লোকগীতির দীর্ঘ প্রবহমানতাকে তিনি প্রাণের মূল্যে উপলব্ধি করেন। বাংলার সুমিষ্ট উৎকৃষ্ট খইয়ের বিন্নিধান তাঁর কাছে মূল্য পায় স্বর্গীয়ভাবে সমৃদ্ধ হয়ে। শিশুকালে পাঠশালায় দুলে দুলে পড়া বাল্য-কবিতাকে তিনি অন্যান্য বঙ্গভাষী মানুষের মতো ভুলতে পারেনবিধা না। মিছিলে এসে দাঁড়ানো মায়ের অমোঘ উপস্থিতিও কবির মনে অমরতার ঐতিহ্যগত প্রকাশ ঘটায়।
একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিকথা সংক্ষেপে তোমার ভাষায় বর্ণনা করো।
21 ফেব্রুয়ারির ইতিকথা আসলে এক জোরালো ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস। 1947 খ্রিস্টাব্দে ধর্মের ভিত্তিতে দুটি স্বাধীন দেশের জন্ম হয় – ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তানের ভাগে পড়ে পূর্ববঙ্গ। পূর্ববঙ্গ পশ্চিম-পাকিস্তানের থেকে কেবল স্থানিক দূরত্বেই অবস্থিত ছিল না, দুটি স্থানের ভাষা-সংস্কৃতির মধ্যেও ছিল যথেষ্ট ফারাক। তাই যখন পশ্চিম-পাকিস্তান রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের উপর বাংলার বদলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপানোর চেষ্টা চালায়, তখন মাতৃভাষাপ্রীতি ও ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতায় উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ববঙ্গ। 1952 খ্রিস্টাব্দের 21 ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের ছাত্র-বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলনের স্বার্থে এক শান্তিপূর্ণ মিছিলে পাকিস্তান সরকারের পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। মারা যান আব্দুস সালাম, রফিক-উদ্দিন আহমেদ, সফিউর রহমান, আবুল বরকত ও আব্দুল জব্বার নামক পাঁচ তরুণ ভাষাপ্রেমী। এঁরা ভাষা-শহিদ। এই মৃত্যু ও হিংসার রক্ত ভাষা-আন্দোলনকে দেয় গণ-আন্দোলনের জমাট রূপ। 1971 খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন জনপ্রজাতন্ত্রী ‘বাংলাদেশ’-এর আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন সমাপ্ত হয়। 1999 খ্রিস্টাব্দের 17 নভেম্বর ইউনেসকো (UNESCO) এই 21 ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-এর মর্যাদা দান করলে বঙ্গভাষা এক বিশ্বমাত্রিক মর্যাদায় ভূষিত হয়।
টীকা লেখো – জারি, সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, বিন্নি ধান, কথকতা, রূপকথা।
জারি – ফারসি শব্দ, ‘জারী’ বা ‘যারী’ থেকে এই শব্দটি এসেছে। এটি বাংলার মুসলমানি পল্লিগীতিবিশেষ, যা মুসলিম শোকগাথা হিসেবেও পরিচিত। বাংলাদেশের ইসলামধর্মী লোকশিল্পীরা কারবালার প্রান্তরে হাসান-হোসেনের শোকাবহ মৃত্যুকে স্মরণ করে উদাস কণ্ঠে এই পল্লিগান গেয়ে থাকেন।
সারি – তুরস্কের শব্দভাণ্ডার তথা তুর্কি শব্দ থেকে বাংলায় শব্দটির আগমন। এটিও বাংলাদেশের একপ্রকার লোকগীতি, মূলত মাঝিমাল্লাদের গান। নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গের মাঝিমাল্লারা নদীর খোলামেলা পরিবেশে সুরেলা কণ্ঠে দ্রুত ছন্দের এই গান গেয়ে থাকেন। এই বীররসের গান সমবেত কণ্ঠেও ধ্বনিত হতে দেখা যায়।
ভাটিয়ালি – ভাটিয়ালি শব্দটি যে অর্থ বহন করে আনে, তা আসলে সুর। ভাটার টানে নৌকো ভাসিয়ে বিশেষ রাগিণীতে এই সুর মাঝিমাল্লাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়। এটি বাংলার লোকসংস্কৃতিতে এক বিশেষত্বময় এমন এক সুরের প্রবাহ, যা সকল মানুষকে মুগ্ধ করে।
মুর্শিদি – মুসলমান সাধক সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিকে বলা হয় পির। ‘মুর্শিদি’ হল সেই পিরদের গান। এই গানে থাকে বাস্তবতা। সংকেতের মাধ্যমে দেহতত্ত্বকে এই গানে প্রকাশ করা হয়, থাকে লৌকিক উপমা। সব মিলিয়ে এই গানকেও পল্লিগীতি বলা হয়।
এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের কবিতা ‘একুশের কবিতা’-এর কিছু রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি।
আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে এসেছে। যদি আপনাদের কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন