মাধ্যমিক ভুগোল – বহির্জাত প্রক্রিয়া ও তাদের দ্বারা সৃষ্ট ভূমিরূপ – ব্যাখ্যামূলক উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন

পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে আসা শক্তি দ্বারা পৃথিবীতে পাহাড়, পর্বত, মালভূমি, সমভূমি সৃষ্টি হয়েছে, আর এই মালভূমি, সমভূমি, পাহাড়, পর্বত প্রভৃতি বাইরের অনেক শক্তি এদের উপর সক্রিয় হয় এবং ভূমিরূপের পরিবর্তন ঘটায়। আর যে শক্তি বা প্রক্রিয়া ভূমিরূপের পরিবর্তন ঘটায় ও তারফলে বিবর্তন ঘটে সেটাই হলো বহির্জাত প্রক্রিয়া।

Table of Contents

মাধ্যমিক ভূগোল বিষয়ের প্রথম অধ্যায় হলো বহির্জাত প্রক্রিয়া ও তাদের দ্বারা সৃষ্ঠ ভূমিরূপ, ছাত্ররা যারা মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছ তাদের জন্য নিচে এই অধ্যায় সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়া হলো। প্রতিটি প্রশ্নের মান 3.

বহির্জাত প্রক্রিয়া ও তাদের দ্বারা সৃষ্ট ভূমিরূপ

গঙ্গানদীর প্রবাহ কোথা থেকে কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত?

গঙ্গানদীর তিনটি প্রবাহ —

প্রবাহের নামপ্রবাহ পথের বিস্তৃতি
উচ্চ প্রবাহউত্তরাখণ্ডের গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ তুষারগুহা থেকে উত্তরাখণ্ডেরই হরিদ্বার পর্যন্ত গঙ্গার পার্বত্য প্রবাহ বা উচ্চগতি।
মধ্য প্রবাহউত্তরাখণ্ডের হরিদ্বার থেকে ঝাড়খণ্ডের রাজমহল পর্যন্ত গঙ্গার সমভূমি প্রবাহ বা মধ্যগতি।
নিম্ন প্রবাহঝাড়খণ্ডের রাজমহল থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত গঙ্গার বদ্বীপ প্রবাহ বা নিম্নগতি।

নদী কী কী প্রক্রিয়ায় ক্ষয়কার্য করে?

নদী তার গতিপথে জলধারার সাহায্যে পাঁচভাবে ক্ষয়কার্য করে। এগুলি হল —

ক্ষয়ের প্রক্রিয়াবিবরণ
দ্রবণজনিত ক্ষয়কোনো কোনো পাথর, যেমন — চুনাপাথর, লবণ প্রভৃতি নদীর জলের সংস্পর্শে গলে গিয়ে বা দ্রবীভূত হয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
জলপ্রবাহজনিত ক্ষয়পার্বত্য অঞ্চলে নদীখাতের নরম ও আলগা পাথরগুলি জলস্রোতের আঘাতে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং কালক্রমে ভেঙে জলস্রোতের সাহায্যে বহুদূরে বাহিত হয়।
ঘর্ষণজনিত ক্ষয়নদীর স্রোতে বাহিত পাথরগুলি পরস্পরের সাথে ঘর্ষণে এবং ঠোকাঠুকিতে ক্ষয় হয়ে যায় এবং অবশেষে ক্ষুদ্রাকার কণায় পরিণত হয়।
অবঘর্ষজনিত ক্ষয়নদীবাহিত পাথরগুলির সঙ্গে নদীখাতের ঘর্ষণ বা অবঘর্ষের ফলে নদীখাত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং নদীখাতে ছোটো ছোটো গর্তের সৃষ্টি হয়। গর্তগুলির জন্য নদীখাত আরও দ্রুত ক্ষয়ে যায়।
বুদবুদের কম্পন তরঙ্গজনিত ক্ষয়নদীর জলের মধ্যে বুদ্ধদের আকারে যে বাতাস সামান্য সময়ের জন্য অবরুদ্ধ থাকে, তা হঠাৎ নির্গত হলে যে শব্দ হয় সেই শব্দের কম্পন তরঙ্গের আঘাতেও শিলাখণ্ড চূর্ণবিচূর্ণ ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।

নদীর বহনক্ষমতা কীসের ওপর নির্ভর করে?

নদীর বহনক্ষমতা তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এগুলি হল—

বহনক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী বিষয়বিবরণ
নদীতে জলের পরিমাণনদীতে জলের পরিমাণ বেড়ে গেলে নদীর বহনক্ষমতা বাড়ে।
নদীর গতিবেগবহনক্ষমতা সবচেয়ে বেশি বাড়ে নদীর গতিবেগ বাড়লে। নদীর গতিবেগ আবার নির্ভর করে ভূমির ঢালের ওপর — ঢাল যদি বেশি হয়, নদীর গতিবেগও বেড়ে যায়। ফলে, নদীর বহন করার ক্ষমতাও বাড়ে।
নদীবাহিত বোঝার পরিমাণপাথরের আকৃতি ছোটো হলে নদীর বহনক্ষমতা বেড়ে যায়, বড়ো হলে বহনক্ষমতা কমে যায়।

নদী কী কী প্রক্রিয়ায় বহন করে?

নদী চারভাবে বহন করে। এগুলি হল —

বহন প্রক্রিয়াবিবরণ
দ্রবণের মাধ্যমেচুনাপাথর, লবণ প্রভৃতিকে জলে গুলে বা দ্রবণের মাধ্যমে নদী বয়ে নিয়ে চলে।
ভাসমান প্রক্রিয়ায়কাদা, বালি প্রভৃতি হালকা পদার্থগুলি নদী ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নদী যে পরিমাণ পদার্থ বহন করে, তার প্রায় | 70 শতাংশ বহন করে ভাসমান প্রক্রিয়ায়।
লক্ষনের মাধ্যমেকিছুটা বড়ো বা মাঝারি আকৃতির পাথরগুলি স্রোতের সঙ্গে যাওয়ার সময় নদীখাতে বার বার ধাক্কা খেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে যায়।
টান বা আকর্ষণ প্রক্রিয়ায়খুব বড়ো বড়ো পাথর নদীর স্রোতের আকর্ষণে বাহিত হয়।

কী কী অবস্থায় নদী সঞ্চয় করে?

প্রধানত চারটি অবস্থায় নদী সঞ্চয় করে। এগুলি হল —

  • নদীতে জলের পরিমাণ কমে গেলে। আবার, নদীতে জলের পরিমাণ কমে কয়েকটি বিশেষ অবস্থায় — 1. কম বৃষ্টিপাত হয় এমন অঞ্চলে নদী প্রবেশ করলে, 2. খরার সময়ে, 3. বৃষ্টিহীন ঋতুতে এবং 4.চুনাপাথর, বেলেপাথর প্রভৃতি সচ্ছিদ্র প্রস্তর-গঠিত অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে
  • ভূমির ঢাল কম হলে, অর্থাৎ নদীর গতিবেগ কমে গেলে।
  • নদীর বোঝা বেড়ে গেলে।
  • কোনো হ্রদের মধ্য দিয়ে নদী প্রবাহিত হলে। এইভাবে প্রবাহিত হওয়ার সময় পার্বত্য অঞ্চলে বড়ো বড়ো পাথরখণ্ড, আর সমভূমিতে ও মোহানার কাছে বালি, কাদা, পলি প্রভৃতি সঞ্চিত হয়৷

গঙ্গা, পদ্মা, মেঘনা বদ্বীপের সক্রিয় অংশের ওপর পৃথিবীব্যাপী জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব কতখানি?

সুন্দরবন অঞ্চলে পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনে নিম্নলিখিতভাবে প্রভাব ফেলেছে —

  • উষ্ণতা বৃদ্ধি – বিগত 1980 সাল থেকে 2007 সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে নদীর জলে প্রতি দশকে 0.5° সে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে। উয়তার এই বৃদ্ধি ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলছে।
  • ঘূর্ণিঝড় ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতে প্রভাব – সমুদ্রজলের উয়তা বৃদ্ধির জন্য সুন্দরবন অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়ছে। ভারতীয় উপমহাদেশের ঘূর্ণিঝড়ের 74% সৃষ্টি হয়েছে বঙ্গোপসাগর থেকে। আয়লা এমনই ঘূর্ণিঝড়।
  • সমুদ্রজলের উচ্চতা বৃদ্ধি – পৃথিবীর অন্য অংশের তুলনায় সুন্দরবন অঞ্চলে সমুদ্র জলতলের উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে। এতে বহু দ্বীপ (লোহাচড়া, দক্ষিণ তালপট্টি) সমুদ্রে তলিয়ে গেছে।
  • জল এবং মাটির লবণতা বৃদ্ধি – জলতল বেড়ে যাওয়ায় এখানকার জল এবং মাটির লবণতা বাড়ছে। ফলে কৃষি এবং খাদ্য ও পানীয় জলের সমস্যা বাড়ছে।

নদীর গতিপথে কীভাবে জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়?

  • ধারণা – নদীর জলপ্রবাহ যখন হঠাৎ কোনো উচ্চ স্থান থেকে নীচের দিকে লাফিয়ে পড়ে, তখন তাকে জলপ্রপাত বলে।
  • পদ্ধতি – নদীর গতিপথে কঠিন ও কোমল শিলাস্তর ওপর-নীচে আড়াআড়িভাবে বা অনুভূমিকভাবে অবস্থান করলে, প্রবল স্রোতে ওপরের কঠিন শিলাস্তর ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে নীচের কোমল শিলাস্তর বেরিয়ে পড়ে। কোমল শিলাস্তর দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় খাড়া ঢালের সৃষ্টি হয় এবং নদীস্রোত খাড়া ঢাল থেকে প্রবল বেগে নীচে পড়ে ও জলপ্রপাতের সৃষ্টি করে। উদাহরণ – আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত সেন্ট লরেন্স নদীর গতিপথে নায়াগ্রা একটি বিখ্যাত জলপ্রপাত।

জলপ্রপাতের শ্রেণিবিভাগ করো।

ভূবিজ্ঞানীরা নদীখাতে জলের পরিমাণ ও ভূমির ঢাল অনুসারে জলপ্রপাতকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেন। এগুলি হল — র‍্যাপিড, কাসকেড, ক্যাটারাক্ট।

শ্রেণিসংজ্ঞাউদাহরণ
র‍্যাপিডজলপ্রপাতের ঢাল কম হলে তাকে র‍্যাপিড বলা হয়। এই ধরনের জলপ্রপাতের উচ্চতা কয়েক মিটার মাত্র হয়।ছোটোনাগপুরের পাহাড়ি অঞ্চলে এরকম জলপ্রপাত প্রায়ই দেখা যায়। এ ছাড়া, নায়াগ্রা জলপ্রপাত হল র‍্যাপিডের দৃষ্টান্ত।
কাসকেডযখন কোনো জলপ্রপাতের জল অজস্র ধারায় বা সিঁড়ির মতো ঢাল বেয়ে ধাপে ধাপে নীচের দিকে নামে, তখন তার নাম কাসকেড।রাঁচির জোনা জলপ্রপাত।
ক্যাটারাক্টকোনো নদী বরাবর পরপর অনেকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলপ্রপাত অবস্থান করলে তাদের ক্যাটারাক্ট বলে।আফ্রিকার নীলনদে খাতুম থেকে আসোয়ান পর্যন্ত অংশে মোট ৬টি ক্যাটারাক্ট বা খরস্রোত দেখা যায়।

নিম্নগতিতে নদীর প্রধান কাজ অবক্ষেপণ – ব্যাখ্যা করো।

নদী যখন মোহানার কাছাকাছি চলে আসে, তখন শুরু হয় নদীর নিম্নগতি। এই অংশে ভূমির ঢাল খুব কমে যায় বলে নদী অত্যন্ত ধীরগতিতে প্রবাহিত হয়। এজন্য নদীর ক্ষয়কার্যের ক্ষমতা থাকে না এবং বহন ক্ষমতাও খুব কমে যায়। ফলে ঊর্ধ্বগতি ও মধ্যগতি থেকে বহন করে আনা পলি, বালি প্রভৃতি নদী আর বহন করতে পারে না, এগুলি নদীখাতে জমতে শুরু করে। সুতরাং, বদ্বীপ প্রবাহ বা নিম্নগতিতে নদীর প্রধান কাজ হয় অবক্ষেপণ।

পার্বত্য অঞ্চলে নদীর ক্ষয়কার্যই প্রাধান্য লাভ করে কেন?

পার্বত্য প্রবাহে নদী প্রধানত ক্ষয়কার্য করে। এর কারণ —

  • পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি বন্ধুর এবং ভূমির ঢালও বেশি। এজন্য নদী প্রবল বেগে নীচের দিকে নেমে আসে।
  • প্রবল স্রোতের মাধ্যমে নদী তার উপত্যকাকে ভীষণভাবে ক্ষয় করে (মূলত জলপ্রবাহ ক্ষয়, ঘর্ষণ ও অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায়) এবং ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থগুলিকে নদী নীচের দিকে বহন করে নিয়ে চলে। সুতরাং, পার্বত্য প্রবাহ বা উচ্চগতিতে নদীর ক্ষয়কার্যই প্রাধান্য লাভ করে।

নদীর নিম্নগতিতে কীভাবে বদ্বীপ সৃষ্টি হয়?

নিম্নগতিতে নদী যতই মোহানার কাছে চলে আসে, ভূমির ঢাল ততই কমে যায়। এজন্য মোহানায় অর্থাৎ নদী এসে যেখানে সমুদ্রে মিলিত হয় সেখানে নদীর স্রোতের বেগ এবং বহন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে তখন নদীর অবক্ষেপণ খুব বেড়ে যায়। নদীবাহিত পলি, বালি প্রভৃতি মোহানায় ব্যাপকভাবে সজ্জিত হয়। এ ছাড়া, নদীবাহিত এইসব পদার্থ সমুদ্রের লবণাক্ত জলের সংস্পর্শে এসে সুসংবদ্ধ হয় এবং মোহানায় জমা হতে শুরু করে। এগুলি জমতে জমতে ক্রমশ মোহানায় জলের ওপর নতুন ভূভাগ বা দ্বীপ সৃষ্টি হয়। তবে বদ্বীপ গঠনের জন্য মোহানায় নদীর সঞ্চয়ের হার সমুদ্রস্রোতের অপসারণ ক্ষমতার তুলনায় বেশি হওয়া দরকার। উদাহরণ — গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীর মোহানায় এইভাবে যে বদ্বীপ সৃষ্টি হয়েছে সেটি বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ।

নদীর সঞ্জয়কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপগুলি বর্ণনা করো।

নদীর সঞ্চয়কাজের ফলে গঠিত ভূমিরূপগুলি হল —

  • পলল ব্যজনী বা ত্রিকোণ পললভূমি – নদী পার্বত্য অঞ্চল থেকে সমভূমি অংশে পৌঁছোনো মাত্র ভূমির ঢাল কমে যাওয়ায় পর্বতের পাদদেশের সমভূমিতে পলি, বালি, কাঁকর প্রভৃতি সঞ্চয় করে ত্রিকোণ পললভূমি গঠন করে। ব্যজনী বা হাতপাখার মতো দেখতে বলে একে পলল ব্যজনীও বলা হয়।
  • নদীচর – সমভূমিতে নদীর গতিবেগ কম হওয়ায় নুড়ি, পাথর, বালি প্রভৃতি নদীবক্ষে সঙ্কিত হয়ে চর বা দ্বীপ সৃষ্টি হয়।
  • প্লাবনভূমি – সমভূমিতে ভূমির ঢাল হওয়ায় কম বর্ষাকালে নদীতে হঠাৎ জল বেড়ে গেলে উপত্যকায় বন্যা বা প্লাবন হয়। প্লাবিত অঞ্চলে বালি, পলি ইত্যাদি সঞ্চিত হয়ে প্লাবনভূমি সৃষ্টি হয়।
  • স্বাভাবিক বাঁধ – সমভূমিতে নদীর গতিবেগ কম থাকায় নদীবাহিত পলি, বালি, কাদা প্রভৃতি প্লাবনের সময় নদীর দুই তীরে সঞ্চিত হয়ে বাঁধের মতো উঁচু হয়ে যায়। প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় গঠিত হয় বলে এর নাম স্বাভাবিক বাঁধ।
  • বদ্বীপ – মোহানায় এসে সমুদ্রের লবণাক্ত জলের সংস্পর্শে নদীবাহিত পলি, বালি প্রভৃতি সংবদ্ধ হয়ে নদীর মোহানায় বা অগভীর সমুদ্রে জমা হতে থাকে। নতুন গঠিত এই ভূমিরূপ দেখতে ওলটানো মাত্রাহীন বাংলা অক্ষর ‘ব’ বা গ্রিক অক্ষর ডেল্টা (Δ)-র মতো হয় বলে একে বদ্বীপ বা ডেল্টা বলা হয়।

বদ্বীপ সৃষ্টি হওয়ার অনুকূল পরিবেশ উল্লেখ করো।

বদ্বীপ সৃষ্টি হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অনুকূল পরিবেশগুলি হল —

  • মোহানায় নদীর অবক্ষেপণের হার সমুদ্রস্রোতের অপসারণ হারের তুলনায় বেশি হওয়া প্রয়োজন।
  • নদীর জলের সঙ্গে যাতে বেশি পরিমাণে পলি আসে, তাই নদীকে সুদীর্ঘ হতে হবে এবং তার উপনদীর সংখ্যাও বেশি হওয়া বাঞ্ছনীয়।
  • নদীর মুখে বা মোহানায় যাতে পলি জমতে পারে, তাই নদীর স্রোত কম হওয়া দরকার।
  • সমুদ্রের যে অংশে নদী এসে মিশবে, সেখানে সমুদ্রের ঢাল কম হতে হবে, না হলে অবক্ষিপ্ত যাবতীয় পলি গভীর সমুদ্রে তলিয়ে যাবে।
  • মোহানায় জোয়ারভাটার প্রকোপ কম থাকলে সহজে বদ্বীপ গড়ে ওঠে।
  • মোহানায় নদীস্রোতের বিপরীত দিকে বায়ু প্রবাহিত হলে বদ্বীপ গঠনের কাজ দ্রুত হয়।
  • উন্মুক্ত সমুদ্রের তুলনায় আংশিক বেষ্টিত সমুদ্রে বেশি বদ্বীপ গড়ে ওঠে।
  • নদী মোহানার সংলগ্ন ভূমি সমতল হওয়া প্রয়োজন।

অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ কীভাবে তৈরি হয়?

অবস্থান – মধ্যগতির শেষের দিকে এবং নিম্নগতিতে নদীর প্রবাহপথে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের (ox-bow lake) সৃষ্টি হয়।

সৃষ্টির কারণ – এই সময় নদীর গতিবেগ খুব কম থাকে বলে সামান্য কোনো বাধা পেলেই নদী এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়। নদীর। আঁকাবাঁকা গতিপথকে বলা হয় মিয়েন্ডার। নদী যখন এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয় তখন প্রবাহপথের অন্তঃবাকের (উত্তল পাড়) তুলনায় বহিঃবাঁকে (অবতল পাড়) গতিবেগ বেশি থাকে। তাই বহিঃবাকে ক্ষয়কার্য চলে, কিন্তু অন্তঃবাঁকে পলি, কাদা ইত্যাদি সঞ্চিত হয়। নদী যখন খুব বেশি এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়, দুই বাঁক বা জলধারার মধ্যবর্তী ভূমি কালক্রমে সম্পূর্ণ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। (বহিঃবাঁক ক্ষয় প্রক্রিয়ার জন্য) এবং তার ফলে তখন নদীর ওই দুটি বাঁক বা জলধারার সংযুক্তি ঘটে, অর্থাৎ বাঁকা পথ ছেড়ে নদী তখন সোজা পথে প্রবাহিত হয় এবং পরিত্যক্ত বাঁকটি হ্রদে পরিণত হয়। এই হ্রদ দেখতে ঘোড়ার খুরের মতো হয় বলে এর নাম অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ।

উদাহরণ – নিম্নগতিতে গঙ্গা এবং তার শাখানদীগুলির গতিপথে এই ধরনের অনেক অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ দেখা যায়।

অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়

নদীর উচ্চগতিতে V – আকৃতির উপত্যকা সৃষ্টি হয় কেন?

পার্বত্য অঞ্চলের প্রবাহপথকে নদীর উচ্চগতি বলা হয়। এই অংশে নদীর গতিপথে ‘V’ আকৃতির উপত্যকা সৃষ্টি হওয়ার কারণ —

  • ভূমির ঢাল পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি বন্ধুর এবং ভূমির ঢালও বেশি। এজন্য নদী প্রবল বেগে নীচের দিকে নামে। প্রবল স্রোত এবং স্রোতের সঙ্গে বাহিত শিলাখণ্ড নদীগর্ভে ঘর্ষণ প্রক্রিয়ায় নদী উপত্যকায় নিম্নক্ষয় বৃদ্ধি করে। এভাবে নদী উপত্যকা ক্রমশ সংকীর্ণ ও গভীর হতে থাকে।
  • বৃষ্টিবহুলতা ও আবহবিকার – বৃষ্টিবহুল পার্বত্য অঞ্চলে প্রথমে নদী উপত্যকার দুই পার্শ্বদেশ কিছুটা সংকীর্ণ থাকলেও রাসায়নিক আবহবিকার ও পুঞ্জিত ক্ষয়ের প্রভাবে (পার্শ্বক্ষয়ের দ্বারা) নদী উপত্যকা ক্রমশ প্রশস্ত হয়ে পড়ে। তা ছাড়া,
  • ভূমিধস – দুই পাশ থেকে নদীতে ধস নামে ও কিছু উপনদীও এসে নদীখাতে মিলিত হয়। এর ফলে নদীখাত কিছুটা প্রশস্ত হয়ে ‘V’-আকৃতির উপত্যকা সৃষ্টি করে।

প্লাবনভূমি কীভাবে তৈরি হয়?

অবস্থান – মধ্য ও নিম্নগতিতে নদীর সঞ্জয়কার্যের ফলে প্লাবনভূমির (flood plain) সৃষ্টি হয়।

সৃষ্টির কারণ – নদীতে হঠাৎ জলপ্রবাহের পরিমাণ বেড়ে গেলে বন্যা বা প্লাবন দেখা দেয় এবং দুই তীর বা কূল ছাপিয়ে সেই জল অনেক দূর পর্যন্ত প্লাবিত করে। নদীর জলের সঙ্গে যেসব পলি, বালি, কাদা ইত্যাদি থাকে সেগুলিও জলের সঙ্গে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বন্যার সময় নদীখাতের দুই পাশে ছড়িয়ে পড়া নদীবাহিত বস্তুসমূহের সবটা নদীখাতে ফিরে আসে না, অনেকটাই প্লাবিত অঞ্চলে সঞ্চিত হয়। এইভাবে বছরের পর বছর নদীর দুই পাশে বা উপত্যকায় পলি, বালি, কাদা ইত্যাদি সঞ্চিত হতে হতে নতুন যে ভূমিভাগ গঠিত হয়, তাকে বলা হয় প্লাবনভূমি।

উদাহরণ – বিহারে গঙ্গানদীর গতিপথের দুই পাশে এবং অসম উপত্যকায় ব্রহ্মপুত্র নদের দুই পাশে এই ধরনের প্লাবনভূমি দেখা যায়।

প্লাবনভূমি

স্বাভাবিক বাঁধ কাকে বলে?

সমভূমি ও বদ্বীপ প্রবাহে ভূমির ঢাল কম থাকে বলে নদী ধীরগতিতে প্রবাহিত হয় এবং নদীখাত প্রশস্ত কিন্তু অগভীর হয়। জলের সঙ্গে যেসব পলি, বালি, কাদা প্রভৃতি বাহিত হয়ে আসে। নদী আর সেগুলি বহন করে আনতে পারে না। সেগুলি নদীর দুই তীরে সঞ্চিত হতে থাকে। এইভাবে ক্রমাগত নদীর দুই তীরে পলি সঞ্চিত হওয়ার ফলে তা বাঁধের মতো উঁচু হয়ে যায়। এই বাঁধ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় বলে একে বলা হয় স্বাভাবিক বাঁধ (natural levee)। উদাহরণ – মধ্য ও নিম্নগতিতে গঙ্গানদীর দুই তীরে এবং মিশরে নীলনদের দুই পাশে উঁচু স্বাভাবিক বাঁধ দেখা যায়।

জলপ্রপাত পশ্চাদপসারণ করে কেন?

পার্বত্য অংশে ভূমির ঢাল বেশি থাকে বলে নদী খুব দ্রুত নীচে নামে। এই সময় জলতলের পার্থক্য হলে জল ওপর থেকে নীচে লাফিয়ে পড়ে। একেই জলপ্রপাত বলে। জলপ্রপাতের জল নীচে যেখানে পড়ে, নরম শিলাস্তর গঠিত অঞ্চলে সেখানে বিশালাকার গর্তের সৃষ্টি হয়। ক্ষয়ের কারণে গর্তের আয়তন বাড়তে থাকে, তাই ওপরের কঠিন শিলাস্তর ঝুলতে থাকে এবং একসময় তা ভেঙে পড়ে। শিলাস্তর ভেঙে পড়ার কারণে জলপ্রপাতটি নদীর উৎসের দিকে বা পিছনের দিকে সরে যায়। একেই জলপ্রপাতের পশ্চাৎ অপসারণ বলে। উদাহরণ – ভারতের ইন্দ্রাবতী নদীর ওপর চিত্রকূট জলপ্রপাতটির পশ্চাৎ অপসারণ ভালোভাবে বোঝা যায়।

কী কী কারণে জলপ্রপাত সৃষ্টি হতে পারে?

নানা কারণে জলপ্রপাত সৃষ্টি হতে পারে –

  • কঠিন ও কোমল শিলা – নদীর চলার পথে নরম ও কঠিন শিলা থাকলে নরম শিলা বেশি ক্ষয়ে গিয়ে নীচু হয়ে যায়। কঠিন শিলা উঁচু হয়ে থাকে। নদী উঁচু থেকে নীচুতে জল পড়ে জলপ্রপাত তৈরি করে।
  •  চ্যুতি সৃষ্টি – নদীর প্রবাহপথে চ্যুতি সৃষ্টি হলে সেখানে জলপ্রপাত সৃষ্টি হতে পারে।
  • মালভূমির প্রান্তভাগ – মালভূমির প্রান্তভাগে নদী খাড়াভাবে নেমে এলে সেখানে জলপ্রপাত তৈরি হতে পারে।
  • ঝুলন্ত উপত্যকা – ঝুলন্ত উপত্যকার মধ্য দিয়ে জল নেমে এলে জলপ্রপাত গঠিত হয়।
  • লাভাস্রোত – নদীর প্রবাহপথে লাভাস্রোত বেরিয়ে এলে ওই লাভা উঁচু হয়ে শিখর গঠন করে। ওই উঁচু শিখর থেকে জল নীচে লাফিয়ে পড়ে।

জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব কীভাবে সুন্দরবন অঞ্চলের ওপরে পড়েছে?

পৃথিবীব্যাপী জলবায়ুর যে পরিবর্তন ঘটছে তাতে সুন্দরবনের অস্তিত্বের এবং স্থায়িত্বের ওপর প্রভাব পড়ছে —

  1. পৃথিবীর তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে তাতে আগামী 2050 সাল নাগাদ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা 2-4 “সে বেড়ে যাবে। এর জন্য এত বরফ গলে যাবে যে সমুদ্রজলের পরিমাণ বাড়বে। সমুদ্রজলের উচ্চতা 1 মিটার বাড়লে সুন্দরবনের বেশিরভাগ জায়গা ডুবে যাবে।
  2. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে সুন্দরবনের নদীগুলির লবণাক্ততা বেড়ে যাবে। এতে প্রাণীকূলের ও উদ্ভিদের খুব ক্ষতি হবে।
  3. সুন্দরবন অঞ্চলের কৃষিকাজ ব্যাহত হবে এবং খাদ্যাভাব হবে এখানকার প্রধান সমস্যা।
  4. সমুদ্র আরও বেশি উষ্ণ হলে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ বাড়বে। এ ছাড়া আরও পরিবর্তন সুন্দরবন অঞ্চলে ঘটতে পারে।

জলচক্রের অংশ হিসেবে নদীর ভূমিকা কতখানি?

  1. পদ্ধতি – পৃথিবীর জলমন্ডলের সব জল জলচক্রের মাধ্যমে একসূত্রে বাঁধা। সূর্যের উত্তাপে প্রতিদিন জলভাগ থেকে জল বাষ্পীভূত হয়। পরে সেগুলি মেঘ এবং আরও পরে ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টি বা তুষার হিসেবে ঝরে পড়ে। ওই বৃষ্টিপাতের বেশিরভাগ অংশ আবার হিমবাহ গলা জলও নদী তৈরি করে। ওই জলের কিছুটা অংশ বাষ্পীভূত হয় এবং কিছুটা মাটির তলায় পৌঁছে ভৌমজলের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে। বাকি জল সমুদ্রে ফিরে যায়। এভাবেই নদী জলচক্রের অংশ হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
  2. নদীর ভূমিকা – নদী কেবল ভূমিরূপের পরিবর্তন ঘটায় তাই না, সে জলচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদী আছে বলেই বৃষ্টির জল সবটা ভূপৃষ্ঠে আটকে না থেকে নদীর মাধ্যমে সমুদ্রে এসে পড়ে। এখানে নদী একটি সংযোগ বা সূত্র, যার মাধ্যমে জলচক্র পূর্ণতা পায়।
  3. মুক্ত প্রণালী – নদী অববাহিকার জলচক্রকে মুক্ত প্রণালী বলে।

অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বদ্বীপ অঞ্চলে দেখা যায় কেন?

অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বদ্বীপ অঞ্চলে দেখা যায়, কারণ —

আঁকাবাঁকা নদীবাঁকদ্বীপ অংশে ভূমিঢালের পরিসর একেবারেই কমে যায়, তাই নদী সামান্য বাধা পেলে এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়।

নদীবাঁকে ক্ষয় – বাঁকাপথে নদীর জল কুণ্ডলীর আকারে এগিয়ে যায়। সেজন্য অবতল পাড়ে ক্ষয় এবং উত্তল পাড়ে সঞ্চয় হয়।

নদীবাঁকের বিস্তার – ক্ষয় এবং সঞ্চয়ের জন্য নদীবাঁকের অংশ বাড়তে থাকে।

অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ গঠন – বাঁক আরও বেড়ে গেলে দুটি বাঁক পরস্পরের কাছে এগিয়ে এলে দুটি বাঁক জোড়া লেগে যায় এবং একসময় মূলনদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ গঠন করে।

গঠনমূলক বদ্বীপ এবং ধ্বংসাত্মক বদ্বীপ কাকে বলে?

গঠনমূলক বদ্বীপ নদী বিপুল পরিমাণ পলি অগভীর সাগরে জমা করে বদ্বীপ গঠন করে, এই ধরনের বদ্বীপকে গঠনমূলক বদ্বীপ বলে। এই ধরনের বদ্বীপ দুই রকমের হতে পারে — 1. জিভের আকৃতির মতো বদ্বীপ এবং 2. পাখির পায়ের মতো বদ্বীপ। নীলনদের বদ্বীপ জিভের মতো বা ব্যজনী আকৃতির কিন্তু মিসিসিপি নদীর বদ্বীপ পাখির পায়ের মতো হয়।

ধ্বংসাত্মক বদ্বীপ জোয়ারভাটা এবং সমুদ্রতরঙ্গের আঘাতে যেসব বদ্বীপের আকার এবং আয়তন সবসময় পরিবর্তিত হয়, সেই ধরনের বদ্বীপকে ধ্বংসাত্মক বদ্বীপ বলে। ব্রাজিলের সান ফ্রান্সিসকো, নাইজার নদীর বদ্বীপ এরকম ধ্বংসাত্মক বদ্বীপ।

নদীর সমভূমি প্রবাহ বা মধ্যগতি কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

নদীর সমভূমি প্রবাহ বা মধ্যগতি – পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে নদী যখন সমভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন নদীর সেই গতিপথকে বলা বলা হয় সমভূমি প্রবাহ বা মধ্যগতি। উদাহরণ – উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বার থেকে ঝাড়খণ্ডের রাজমহল পর্যন্ত গঙ্গার সমভূমি প্রবাহ বা মধ্যগতি।

সমভূমি প্রবাহ বা মধ্যগতিতে নদীর প্রধান কাজ কী?

সমভূমি প্রবাহে নদীর প্রধান কাজ – সমভূমি প্রবাহ বা মধ্যগতিতে নদীর প্রধান কাজ বহন। তবে এই অংশে নদী কিছু ক্ষয় (পার্শ্বক্ষয়) এবং অবক্ষেপণও করে।

নদীর নিম্নগতিতে কেন সচরাচর বন্যা দেখা যায়?

  1. মোহানার কাছাকাছি বলে এই অংশে নদীতে যথেষ্ট পরিমাণে জল থাকে। কিন্তু ভূমির ঢাল খুব কমে যায় বলে এখানে নদীর স্রোত বিশেষ থাকে না।
  2. নদীর বহন করে আনা পলির সিংহভাগই নিম্নগতিতে নদীর বুকে সঞ্চিত হয়। এর ফলে নদীখাত ক্রমশ অগভীর হয়ে যায়। তাই বর্ষাকাল বা অতিবৃষ্টির সময় নদীতে হঠাৎ জলের জোগান বেড়ে গেলে তা বহন করার ক্ষমতা নদীর থাকে না — দুই কূল ছাপিয়ে সংলগ্ন অঞ্চলে বন্যার সৃষ্টি করে।

অবরোহণ প্রক্রিয়াকে ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া বলে কেন?

অবরোহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ভূমিরূপের পরিবর্তন ঘটে বা ভূমিভাগের ক্ষয় হয়। ভূমি তার প্রকৃত উচ্চতা থেকে নীচু হতে থাকে। সেই কারণেই অবরোহণ প্রক্রিয়াটি একটি ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া। শিলার ওপর ক্রমাগত আবহবিকার, পুঞ্জক্ষয় ইত্যাদি ক্রিয়া করে শিলাস্তরের ওপরের অংশকে অপসারিত করে নীচের শিলাস্তরকে উন্মোচন করে। এভাবেই অবরোহণ প্রক্রিয়া কার্যকরী থাকে।

উচ্চগতিতে পার্শ্বক্ষয় অপেক্ষা নিম্নক্ষয় বেশি হয় কেন?

  1. উচ্চগতিতে বা পার্বত্য প্রবাহে নদীর ঢাল বেশি থাকায় নদী প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়।
  2. এই অংশে নদীর মধ্যে প্রচুর প্রস্তরখণ্ডও থাকে। তাই এই অংশে নদী প্রবল বেগে অবঘর্ষ পদ্ধতিতে নীচের দিকে ক্ষয় করে। এখানে অবঘর্ষ এবং জলপ্রবাহের ক্ষয়ের ফলে নদী উপত্যকা গভীর হয়।

মধ্যগতিতে নদীদ্বীপ বা চর সৃষ্টি হয় কেন?

  1. মধ্যগতিতে নদীর ঢাল কমে যায় ও নদী চওড়া হয় এলে নদীর বহনক্ষমতা কম হয়। সেজন্য নদীবাহিত পদার্থগুলি নদীগর্ভে ক্রমাগত সঞ্চয় হতে থাকে।
  2. নদীর তলদেশে পলিসঞ্চয়ের জন্যই একদিকে চর জেগে ওঠে। সেই চরে যত পলির সঞ্চয় বাড়বে ততই দ্বীপের আয়তন বাড়তে থাকবে।

ব্রহ্মপুত্র নদীতে অসংখ্য দ্বীপ বা চড়ার সৃষ্টি হয়েছে কেন?

  1. অসমের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদী মধ্যগতি বা সমভূমি প্রবাহের অন্তর্গত। এখানে ভূমির ঢাল এত কম হয় যে নদী অত্যন্ত ধীরে প্রবাহিত হয়। তাই নদীবাহিত পদার্থ নদীগর্ভেই জমে যায়।
  2. এ ছাড়া প্রচুর উপনদী ব্রহ্মপুত্রে পড়ায় জল ও বোঝার পরিমাণও বেশি। সেকারণে ব্রহ্মপুত্রের নদীদ্বীপগুলি খুব চওড়া ও বৃহৎ হয়। মাজুলি এমনই একটি নদীদ্বীপ।

বহির্জাত প্রক্রিয়ার পদ্ধতিগুলি কী কী?

মূলত তিনটি পদ্ধতির মাধ্যমে বহির্জাত প্রক্রিয়া কার্যকরী হয়। যথা —

  1. অবরোহণ প্রক্রিয়া – এই প্রক্রিয়ায় ভূমিভাগের উচ্চতা ক্রমশ কমতে থাকে। যেমন — ক্ষয়জাত পর্বত।
  2. আরোহণ প্রক্রিয়া – আরোহণ কথার অর্থ ওপরে ওঠা। এই ধরনের প্রক্রিয়ায় ভূমিভাগের উচ্চতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। নদী, হিমবাহ, বায়ুবাহিত পদার্থ সঞ্চিত হয়ে নিম্নস্থান উঁচু বা ভরাট হয়। একে আরোহণ প্রক্রিয়া বলে। যেমন — বদ্বীপ, প্লাবন সমভূমি, লোয়েস সমভূমি।
  3. জৈবিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ এবং প্রাণী যখন ভূমিরূপের পরিবর্তন ঘটায় তখন তাকে জৈবিক প্রক্রিয়া বলে। জলাভূমিতে শ্যাওলা, পাতা, ফুল, ফল জমে জলাভূমি ভরাট হয়ে যায়। মানুষ পাহাড় কেটে রাস্তা বানায়, সমুদ্রে বাঁধ দিয়ে সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ তৈরি করে। এভাবে জৈবিক প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল থাকে।

পর্যায়নের মাধ্যমে কীভাবে ভূমিভাগের সমতলীকরণ ঘটে?

পর্যায়ন – চেম্বারলিন ও সলিসবেরি নামক দুই বিজ্ঞানী প্রথম পর্যায়ন’ বা ‘gradation’ শব্দটি ব্যবহার করেন। অসমতল এবং বন্ধুর ভূপ্রকৃতি সমতলভাগে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে পর্যায়ন বলে। এককথায় বলা যায় অবরোহণ এবং আরোহণের সম্মিলিত ফল হল পর্যায়ন।

প্রক্রিয়া – পর্যায়ন দুটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্যকরী হয়। একটি অবরোহণ এবং অন্যটি আরোহণ।

ভূমিভাগের উঁচু অংশগুলি নদী, হিমবাহ, বায়ুর ক্ষয় প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে নীচু হয়। অন্যদিকে ওইসব ক্ষয়ীভূত পদার্থগুলি নীচু অংশে জমা হয়ে আরোহণ প্রক্রিয়ায় উঁচু হয়ে ওঠে। যতক্ষণ না সামগ্রিক ভূমিভাগ একই পাতলে আসে ততক্ষণ এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে।

ধনুকাকৃতি, তীক্ষ্ণাগ্র এবং পাখির পায়ের মতো বদ্বীপ কাকে বলে?

ধনুকাকৃতি বদ্বীপ – এই ধরনের বদ্বীপের সমুদ্রমুখী বহিরেখা সমুদ্রের দিকে ধনুকের মতো বেঁকে যায়। এই ধরনের বদ্বীপ অনেকটা জিভের মতো হয় বলে একে ‘জিহ্বাগ্র বদ্বীপ’-ও বলে। এর আকৃতি অনেকটা গ্রিক অক্ষর ‘Δ’ বা বাংলা মাত্রাহীন ‘ব’-এর মতো হয়। এদের আকৃতি সমুদ্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হয়। উদাহরণ — নাইজার, নীলনদ, হোয়াংহো, মেকং, গঙ্গা, রাইন নদীতে এমন বদ্বীপ দেখা যায়।

তীক্ষ্ণাগ্র বদ্বীপ – মূলনদীর মোহানা করাতের দাঁতের মতো হয়ে থাকে। ল্যাটিন শব্দ ‘কাসপেট’ শব্দের অর্থ তীক্ষ্ণ। নদী যেখানে সমুদ্রে এসে পড়ে সেখানে নদীর শক্তির তুলনায় সমুদ্রের শক্তি বেশি হলে এমন ধরনের বদ্বীপ গড়ে ওঠে। উদাহরণ — ইটালির টাইবার নদীর বদ্বীপ এই ধরনের।

পাখির পায়ের মতো বদ্বীপ – মূলনদী অনেকগুলি শাখায় বিভক্ত হয়ে সমুদ্রে পড়লে এমন বদ্বীপ গড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে নদীর গতিবেগ বদ্বীপ অঞ্চলে একটু বেশি থাকে ফলে দ্রবীভূত পদার্থগুলি সমুদ্রের বহুদূর পর্যন্ত গিয়ে জমা হয়। এই ধরনের বদ্বীপ দেখতে পাখির পায়ের মতো হয়। উদাহরণ – মিসিসিপি নদীর বদ্বীপ।

পাখির পায়ের মতো বদ্বীপ

হিমবাহ বলতে কী বোঝ?

আকাশ থেকে যে তুষারপাত হয়, সেই তুষার প্রকৃতিতে খুবই নরম। কিন্তু হিমরেখার ঊর্ধ্বে ক্রমশ জমা হওয়া তুষারের সম্মিলিত চাপে নীচের তুষার স্তর জমাটবেঁধে কঠিন বরফে পরিণত হয়। বরফের পরিমাণ যখন অনেক বেড়ে যায়, তখন তা ওপরের বরফের চাপে এবং পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে নীচের দিকে নামতে থাকে। খুব ধীরে ধীরে গড়িয়ে আসা সেই বরফের নদীকেই বলা হয় হিমবাহ। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হিমবাহ যখন নামতে থাকে তখন নীচের দিকে প্রচণ্ড চাপ ও ঘর্ষণের জন্য হিমবাহের তলদেশে তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পায়। এর ফলে তলদেশের বরফ গলে গিয়ে অবতরণ-পথকে পিচ্ছিল করে দেয়। তখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে কঠিন বরফযুক্ত হিমবাহের নীচের দিকে নেমে আসা কিছুটা সহজ হয়ে যায়।

হিমবাহ কী কী প্রক্রিয়ায় ক্ষয় করে?

হিমবাহ সাধারণত দুইভাবে ক্ষয় করে থাকে —

  1. উৎপাটন – প্রবহমান হিমবাহের চাপে পর্বতের দেহ থেকে পাথর খুলে আসে, একে বলা হয় উৎপাটন বা প্লাকিং।
  2. অবঘর্ষ – হিমবাহের সঙ্গে যেসব পাথরখণ্ড থাকে সেগুলির সঙ্গে সংঘর্ষে হিমবাহ উপত্যকা বা পর্বতগাত্র ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত এবং মসৃণ হয়, একে বলা হয় অবঘর্ষ।

পৃথিবীর দীর্ঘতম, দ্রুততম এবং ভারতের দীর্ঘতম হিমবাহের সম্পর্কে কী জান?

  1. পৃথিবীর দীর্ঘতম হিমবাহ – অ্যান্টার্কটিকার ল্যামবার্ট হিমবাহ পৃথিবীর দীর্ঘতম হিমবাহ। এটি প্রায় 700 কিলোমিটার দীর্ঘ।
  2. পৃথিবীর দ্রুততম হিমবাহ – গ্রিনল্যান্ডের জ্যাকোবসাভো ইসব্রে পৃথিবীর প্রধান হিমবাহগুলির মধ্যে দ্রুততম। এটি দিনে প্রায় 20 মিটার প্রবাহিত হয়।
  3. ভারতের দীর্ঘতম হিমবাহ – কারাকোরাম পর্বতশ্রেণির অন্তর্গত সিয়াচেন ভারতের দীর্ঘতম তথা বৃহত্তম হিমবাহ। এই হিমবাহের দৈর্ঘ্য প্রায় 76 কিলোমিটার।

হিমবাহের শ্রেণিবিভাগ করো।

অবস্থান অনুযায়ী হিমবাহ তিন রকমের হয় –

1. মহাদেশীয় হিমবাহ

সুমেরু এবং কুমেরু অঞ্চলে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে পাতের আকারে প্রবাহিত হিমবাহ হল মহাদেশীয় হিমবাহ।

অবস্থান – অ্যান্টার্কটিকা (প্রায় 85%), গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও সুমেরু অঞ্চলে এই ধরনের হিমবাহ রয়েছে।

বৈশিষ্ট্য –

  1. এগুলি কেন্দ্র থেকে পাতের আকারে চারদিকে প্রসারিত। দেখতে অনেকটা কচ্ছপের পিঠের মতো।
  2. এই হিমবাহের প্রান্তদেশের বরফ খুব পাতলা হয়।
  3. মহাদেশীয় হিমবাহ হিমসোপান সৃষ্টি করে।
  4. মূলত কোয়াটারনারি ভূতাত্ত্বিক যুগে এই হিমবাহ সঞ্চিত হয়েছিল এমন ধারণা করা হয়।

উদাহরণ – 1. অ্যান্টার্কটিকার ল্যামবার্ট। 2. গ্রেট রস বেরিয়ায়।

2. পার্বত্য বা উপত্যকা হিমবাহ

পর্বতের উঁচু অংশ থেকে হিমবাহ যখন নীচের দিকে ধীরে ধীরে নামতে থাকে তখন তাকে পার্বত্য বা উপত্যকা হিমবাহ বলে।

বৈশিষ্ট্য –

  1. মনে করা হয় প্রাচীন তুষার যুগ থেকে এই বরফ সঞ্চিত হতে থাকে।
  2. পার্বত্য হিমবাহ থেকেই মূলত নদীর সৃষ্টি হয়। 
  3. পার্বত্য হিমবাহ নানা ধরনের ফাটলযুক্ত হয়।

উদাহরণ- 1. আলাস্কার হুবার্ড। 2. ভারতের সিয়াচেন।

3. পাদদেশীয় হিমবাহ

হিমবাহ যখন পর্বতের নীচের দিকে নেমে এসে পর্বতের পাদদেশে সঞ্চিত ও প্রবাহিত হয়, তখন তাকে পাদদেশীয় হিমবাহ বলে।

বৈশিষ্ট্য –

  1. এগুলির আকার অপেক্ষাকৃত ছোটো হয়।
  2. পাদদেশীয় হিমবাহের সামনে গোলাকার অংশকে লোব বলে।
  3. উচ্চ অক্ষাংশে পর্বতের পাদদেশে দেখা যায়।

উদাহরণ – 1. আলাস্কার মালাসপিনা।

নদী উপত্যকা ও হিমবাহ উপত্যকার মধ্যে পার্থক্য লেখো।

নদী উপত্যকা ও হিমবাহ উপত্যকার মধ্যে পার্থক্য —

বিষয়নদী উপত্যকাহিমবাহ উপত্যকা
উপত্যকার অবস্থানশুষ্ক-মরু অঞ্চল ও তুষারাবৃত অঞ্চল ছাড়া নদী উপত্যকা ভূপৃষ্ঠের প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়।হিমবাহ উপত্যকা শুধুমাত্র সুউচ্চ পার্বত্য অঞ্চল ও শীতল মেরু অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ।
উপত্যকার আকৃতিশুষ্ক বা অর্ধ শুষ্ক অঞ্চলে পার্শ্বক্ষয়ের চেয়ে নিম্নক্ষয়ের মাত্রা বেশি হয় বলে ‘T’ আকৃতির এবং আর্দ্র বা আর্দ্রপ্রায় অঞ্চলে নিম্নক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা পার্শ্বক্ষয়ও হতে থাকে বলে ‘v’ আকৃতির উপত্যকা সৃষ্টি হয়।
 
পার্বত্য অঞ্চলে যে উপত্যকার মধ্যে দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হয়, সেখানে অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় হিমবাহ উপত্যকার তলদেশ ও পার্শ্বদেশ প্রায় সমানভাবে ক্ষয় ও মসৃণ হয় এবং এর ফলে উপত্যকার আকৃতি ইংরেজি ‘U’ অক্ষরের মতো হয়। 
উপত্যকায় সঞ্চিত পদার্থ- সমূহের আকৃতিনদীবাহিত পাথরগুলি পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে বা নদীখাতের সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে ক্রমশ গোলাকার ও মসৃণ হয় এবং শেষে বালি ও পলিতে পরিণত হয়। হিমবাহের শেষপ্রান্তে উপত্যকায় পড়ে থাকা হিমবাহ-বাহিত পাথরগুলি এবড়োখেবড়ো, অমসৃণ ও কোণযুক্ত হয়।

ঝুলন্ত উপত্যকায় জলপ্রপাত গঠিত হয় কেন?

পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে মূল হিমবাহ উপত্যকা এবং শাখা-হিমবাহ উপত্যকার মধ্যে গভীরতার পার্থক্য হয় বলে উভয়ের মিলনস্থলে কম গভীরতাবিশিষ্ট শাখা-হিমবাহ উপত্যকাটি মূল হিমবাহের উপত্যকার ওপর ‘ঝুলন্ত উপত্যকা’রূপে অবস্থান করে।

পরবর্তীকালে, উপত্যকা দুটিতে হিমবাহ গলে গিয়ে নদী উৎপন্ন হলে কম গভীরতাবিশিষ্ট উপত্যকার নদীটি নীচে অবস্থিত প্রধান উপত্যকার ওপর উচ্চতা ও ঢালের পার্থক্যহেতু প্রবল বেগে নীচে পড়ে। তাই ঝুলন্ত উপত্যকায় জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়। যেমন— রদ্রীনাথের কাছে অবস্থিত বসুধারা জলপ্রপাত।

ক্রেভাস ও বার্গস্রুন্ড কীভাবে তৈরি হয়?

ক্রেভাস হিমবাহ যখন নীচের দিকে নেমে আসে তখন তার পৃষ্ঠদেশ বেশ জমাট ও মসৃণ থাকে। এজন্য বন্ধুর পর্বতের গা বেয়ে নীচের দিকে নেমে আসার সময় ঢালের মুখে এলে হিমবাহের পৃষ্ঠদেশে যথেষ্ট টান পড়ে এবং সেই অংশে চিড় বা ফাটলের সৃষ্টি হয়। হিমবাহের পৃষ্ঠদেশের সেই চিড় বা ফাটলকে বলা হয় ক্রেভাস। ক্রেভাসগুলি কখনও লম্বালম্বিভাবে, আবার কখনও আড়াআড়িভাবে থাকে।

ক্রেভার্স ও বার্গস্রুন্ড

বার্গস্রুন্ড- হিমবাহ যখন নীচের দিকে নামে, তখন অনেক সময় বন্ধুর পর্বতের খাঁজকাটা গা এবং হিমবাহের মধ্যে ফাঁকের সৃষ্টি হয়। সেই ফাঁককে বলা হয় বার্গস্রুন্ড।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বার্গস্রুন্ড ও ক্রেভাস হালকা তুষার দিয়ে ঢাকা বা থাকে বলে দূর থেকে এদের উপস্থিতি বোঝা যায় না। তাই শীতকালে পর্বত অভিযাত্রীদের কাছে এটি বিপদের বিষয়।

আদর্শ হিমবাহ তৈরির পদ্ধতিটি লেখো।

হিমবাহ তৈরির পদ্ধতিটি বেশ জটিল। কয়েকটি ধাপের মধ্যে দিয়ে এই হিমবাহ তৈরি হয়।

  • উর্ধ্বপাতন – এই পদ্ধতিতে বরফ প্রত্যক্ষভাবে জলীয়বাষ্পে পরিণত হয়।
  • পুনর্কেলাসীভবন – ছোটো ছোটো কেলাস ভেঙে বড়ো কেলাসে রূপান্তরের মাধ্যমে তুষার থেকে বরফে পরিণত হয়।
  • গলন – বরফ গলে জল এবং জল জমে পুনরায় বরফে পরিণত হয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমেই হিমবাহ গঠনের কাজ সম্পূর্ণ হতে থাকে।
  • রেজেলেশান – চাপের কারণে বরফ গলে জলে পরিণত হয় এবং চাপ হ্রাস পেয়ে আবার বরফ জমাটবাঁধে। এর ফলে বরফের অভ্যন্তরীণ গঠনের পরিবর্তন হয় যা হিমবাহ সৃষ্টিতে সাহায্য করে।
  • সংবদ্ধতা – আরও বেশি তুষারপাতের কারণে নীচের স্তর ওপরের স্তরের চাপে আরও সংঘবদ্ধ হয়ে কঠিন ও ঘন বরফের সৃষ্টি হয়।

গ্রাবরেখা কী? শ্রেণিবিভাগ করো।

হিমবাহ যেসব পদার্থ ক্ষয় করে ওই সব ক্ষয়িত পদার্থগুলি হিমবাহের সামনে, ভেতরে, পাশে সঞ্চয় করে। একেই গ্রাবরেখা বলে।

শ্রেণিবিভাগ – আকার অনুযায়ী গ্রাবরেখা অনেকরকম হতে পারে।

  • হিমবাহের গতিপথের দুপাশে যে গ্রাবরেখা থাকে, তাকে পার্শ্ব গ্রাবরেখা বলে।
  • দুটি পার্শ্ব গ্রাবরেখা মিলে তৈরি হয় মধ্য গ্রাবরেখা।
  • হিমবাহ যেখানে গলে যায় সেখানে যে গ্রাবরেখা তৈরি হয়, তাকে প্রান্ত গ্রাবরেখা বলে।
  • হিমবাহের তলায় বা নীচে যে গ্রাবরেখা সঞ্চিত হয়, তার নাম ভূমি গ্রাবরেখা।
  • অনেকসময় গ্রাবরেখাগুলি বলয়ের আকারে জমা হয়, তাকে বলয়ধর্মী গ্রাবরেখা বলে।
  • একটি প্রাবরেখা অন্য গ্রাবরেখার ওপর সঞ্চিত হলে তাকে রোজেন গ্রাবরেখা বলে। এ ছাড়া অবিন্যস্ত গ্রাবরেখা, স্তরায়িত গ্রাবরেখা এবং অদ্রাব্য গ্রাবরেখা গঠিত হতে পারে।

নদী উপত্যকা I বা V আকৃতির কিন্তু হিমবাহ উপত্যকা U আকৃতির হয় কেন?

নদী উপত্যকার আকৃতি ‘।’ অথবা ‘V’ এর মতো হয়। পার্বত্য অংশে নদীর ঢাল খুব বেশি থাকে বলে নদী প্রবলবেগে নীচের দিকে নামতে থাকে। সেজন্য নদীর নিম্নক্ষয় পার্শ্বক্ষয়ের থেকে বেশি হয়। এ ছাড়া আবহবিকার, ধস, জলপ্রবাহ প্রভৃতি কারণে নদী উপত্যকা ‘I’ বা ‘V’-এর মতো দেখতে হয়।
কিন্তু পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে হিমবাহ যখন খুব ধীরগতিতে নামে, তখন প্রধানত অবঘর্ষ এবং উৎপাটন প্রক্রিয়ায় নিম্নক্ষয় এবং পার্শ্বক্ষয় সমানভাবেই হয়। তাই এই উপত্যকাগুলি ‘U’-এর মতো হয়ে যায়।

পৃথিবীর বৃহত্তম সুপেয় জলের সঞ্চয় হিসেবে হিমবাহের গুরুত্ব কতখানি?

হিমবাহ কেবল একটি বরফের নদী নয়, সে যেমন ভূমিরূপের পরিবর্তন করে, তেমনি জলবায়ুর পরিবর্তন করে। এসব বাদ দিয়েও বলা যায় হিমবাহ হল সুপেয় জলের জমাটবদ্ধ রূপ।

  1. পৃথিবীর মোট জলের 97.20 শতাংশ সমুদ্রজল। এই জল পানের অযোগ্য।
  2. বাকি 2.80 শতাংশ জল পানযোগ্য বা সুপেয়। এই জলের মাত্র 0.0001 ভাগ নদনদীতে 0.9999 ভাগ ভৌমজল হিসেবে এবং বাকি 2.15 শতাংশ বরফ হিসেবে জমে রয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীর যত পানীয় জলের ভাণ্ডার রয়েছে তার 75 ভাগই হিমবাহ হিসেবে জমাটবেঁধে রয়েছে। এই বরফের 90 শতাংশ রয়েছে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে।
  3. এমনকি আমাদের গঙ্গা, ব্রক্ষ্মপুত্র, সিন্ধু নদীও হিমবাহ থেকেই সৃষ্ট। পানীয় জলের সংরক্ষণ করতে হলে অবশ্যই হিমবাহ সংরক্ষণে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

রসে মতানে ভূমিরূপের প্রতিবাত ঢাল মসৃণ এবং অনুবাত ঢাল অমসৃণ হয় কেন?

পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের প্রবাহপথে কোনো কঠিন শিলাখণ্ড বা ঢিপি অবস্থান করলে ঢিপির প্রতিবাত ঢালে অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় ক্ষয়কার্য হয়। হিমবাহের মধ্যে জমে থাকা নুড়ি, পাথর, শিলাখণ্ড ভূমির প্রতিবাত অংশে অবঘর্ষ পদ্ধতিতে ক্ষয় করে মসৃণ করে। কিন্তু ঢিপির বিপরীত দিকে বা অনুবাত ঢালে হিমবাহ উৎপাটন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিলার ওপর চাপ সৃষ্টি করে ফাটল তৈরি করে ও আবহবিকারে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। এজন্য অনুবাত ঢালটি এবড়োখেবড়ো ও অমসৃণ হয়।

হিমসিঁড়ি কীভাবে গড়ে ওঠে?

সুউচ্চ পার্বত্য অঞ্চল থেকে হিমবাহ যখন উপত্যকার মধ্য দিয়ে নীচের দিকে নেমে আসে তখন যদি উপত্যকার সমগ্র অংশে সমানভাবে হিমবাহ প্রবাহিত না হয় কিংবা যদি কঠিন ও কোমল শিলা পরপর অবস্থান করে, তাহলে উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়কার্যেরও অনেক পার্থক্য দেখা যায়। তার ফলে উপত্যকার গায়ে সিঁড়ির মতো বহু ধাপের সৃষ্টি হয়। হিমবাহের ক্ষয়কার্যের তারতম্যে গড়ে ওঠা এই সিঁড়ি বা ধাপগুলিকে বলা হয় হিমসিঁড়ি।

ক্রেভাস এবং এবং বার্গস্রুন্ড পর্বতারোহীর কাছে বিপজ্জনক কেন?

বার্গস্রুন্ড এবং ক্রেভাস উভয়েই বরফের ওপর ফাটল। এই ফাটলগুলি এত গভীর যে নীচে পর্যন্ত দেখা যায় না। এইসব ফাটলের ওপর হালকা তুষার জমে থাকলে বোঝা যায় না এর নীচে এমন ফাটল রয়েছে। তাই পর্বতারোহীরা এইসব ফাটলগুলিকে খুব ভয় পায়। যে-কোনো কারণে ওই ফাটলে একবার পড়ে গেলে ফিরে আসা মুশকিল।

বারখান বালিয়াড়ির বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

বায়ুর গতিপথে আড়াআড়িভাবে গড়ে ওঠা অর্ধচন্দ্রাকৃতি, বালিয়াড়িকে বারখান বলা হয়। বারখানের কতকগুলি বৈশিষ্ট্য আছে, যেমন —

  • বারখানের বায়ুমুখী ঢাল খাড়া হয় না, উত্তল আকৃতির হয়। কিন্তু বিপরীত দিকের ঢাল খুব খাড়া এবং অবতল আকৃতির হয়।
  • বারখানের দুই পাশে দুটি শিং-এর মতো শিরা আধখানা চাঁদের দুই প্রান্তের মতো বিস্তৃত হয়।
  • বারখানের উচ্চতা সাধারণত 15 থেকে 30 মিটার পর্যন্ত হয় এবং এক-একটি বারখান প্রায় 5 থেকে 200 মিটার পর্যন্ত স্থান জুড়ে অবস্থান করে।
  • সমতল জায়গায় একসঙ্গে অনেকগুলি বারখান পরপর গড়ে উঠতে পারে, তবে এগুলি সাধারণত অস্থায়ী বা চলমান বালিয়াড়ি হয়।

সিফ বালিয়াড়ির বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

প্রবহমান বায়ুর গতিপথের সঙ্গে সমান্তরালভাবে গড়ে ওঠা খুব দীর্ঘ কিন্তু সংকীর্ণ বালিয়াড়িকে বলা হয় সিফ। এর বৈশিষ্ট্যগুলি হল —

  • সিফ বালিয়াড়ি কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ এবং এর উচ্চতা কয়েকশো মিটার পর্যন্ত হতে পারে।
  • অনেকসময় পরস্পর সমান্তরালভাবে অনেকগুলি সিফ বালিয়াড়ি গড়ে উঠতে দেখা যায়।
  • কখনও কখনও প্রবল বায়ুপ্রবাহে অর্ধচন্দ্রাকৃতি বালিয়াড়ি বা বারখানের মাঝের অংশ ক্ষয় হয়ে যায় এবং দুই পাশে শিং-এর মতো শিরা দুটি ক্রমশ বড়ো হয়ে অনুদৈর্ঘ্য বা সিফ বালিয়াড়িরূপে সমান্তরালভাবে গড়ে ওঠে।
  • দুটি সিফ বালিয়াড়ির মধ্যবর্তী অংশকে করিডোর বলে। এর মধ্য দিয়ে বায়ু প্রবল বেগে সোজাসুজি প্রবাহিত হয়।
  • বালিয়াড়ির শীর্ষদেশ তীক্ষ্ণ করাত আকৃতির হয়।

মরু অঞ্চলে বায়ুর কার্যের প্রাধান্য লক্ষ করা যায় কেন?

মরু অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে বায়ুর কার্যের প্রাধান্য লাভের প্রধান কারণ —

  • উষ্ণতার প্রসর – মরু অঞ্চলে দৈনিক ও বার্ষিক উষ্ণতার প্রসর খুব বেশি হওয়ায় যান্ত্রিক আবহবিকারের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় শিলা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। পরে বায়ু এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণাগুলি দিয়ে অবঘর্ষ ও ঘর্ষণ প্রক্রিয়ায় ভূপৃষ্ঠের শিলায় যেমন ক্ষয় করে, তেমনি এগুলি উড়িয়ে নিয়ে অন্যত্র জমা করে ভূমিরূপ গঠন করে।
  • বৃষ্টিপাতের স্বল্পতা – বৃষ্টিপাতের স্বল্পতার জন্য মরু অঞ্চলে গাছপালা দেখা যায় না। গাছ বায়ুপ্রবাহকে বাধা প্রদান করে এবং বালিকণাকে একস্থান থেকে অন্যস্থানে অগ্রসর হতে দেয় না। বৃক্ষশূন্যতাও মরু অঞ্চলে বায়ুর সক্রিয়তাকে সাহায্য করে।

লোয়েস ভূমি বা লোয়েস সমভূমি কী?

ধারণা – বায়ুবাহিত পীতরঙের চুনময় প্রবেশ্য সূক্ষ্ম কণাসমূহ লোয়েস নামে পরিচিত।

সৃষ্টির পদ্ধতি – সূক্ষ্ম কণাসমূহ মরুভূমি অথবা বহিঃধৌত সমভূমি থেকে বায়ুর দ্বারা বাহিত হয়ে ও বহু দূরে সঞ্চিত হয়ে যে নতুন ভূমিরূপের সৃষ্টি করে, তাকে লোয়েস ভূমি বা লোয়েস সমভূমি বলা হয়। উদাহরণ—মধ্য এশিয়ার গোবি মরুভূমি থেকে প্রতি বছর শীতের সময় মৌসুমি বায়ুর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বালিরাশি উত্তর চিনের হোয়াং হো নদী উপত্যকায় সঞ্চিত হয়ে লোয়েস ভূমি গঠন করেছে। এর গভীরতা 30 থেকে 200 মিটার। একইভাবে আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি থেকে বালি উড়ে এসে ইজরায়েলের দক্ষিণাংশে লোয়েস ভূমি গঠন করেছে। পৃথিবীর অন্যান্য স্থানেও কিছু লোয়েস ভূমি দেখা যায়, যেমন — ইউরোপের ফ্রান্সে, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি-মিসৌরি নদী উপত্যকার কোনো কোনো স্থানে এবং ভারতের উত্তর গুজরাতে।

লোয়েস সমভূমি।

ইয়ারদাং ও বারখান-এর মধ্যে প্রভেদ কী?

ইয়ারদাং ও বারখান-এর মধ্যে প্রধান প্রভেদগুলি হল —

বিষয়ইয়ারদাংবারখান
প্রকৃতিবায়ুর ক্ষয়জাত ভূমিরূপ হল ইয়ারদাং।বায়ুর সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ হল বারখান।
বায়ুর কার্যগত প্রক্রিয়াবায়ুর অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় ইয়ারদাং গঠিত হয়।বায়ুর সঞ্চয়-কার্যের প্রক্রিয়াগুলি বারখান গঠনে সাহায্য করে।
আকৃতিইয়ারদাং বিচিত্র আকৃতির শৈলশিরার মতো দেখতে হয়।আধখানা চাঁদ বা অর্ধচন্দ্রাকৃতি বালিয়াড়ি হল বারখান।
উপাদানকঠিন শিলা দিয়ে ইয়ারদাং গঠিত হয়।বারখান গঠিত হয় বালির স্তূপ দিয়ে।
উচ্চতাইয়ারদাং-এর উচ্চতা 6-15 মিটার পর্যন্ত হয়। বারখান বালিয়াড়ির উচ্চতা 30 মিটার পর্যন্ত হয়।

বায়ুর অপসারণের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলি কী কী?

বায়ুর অপসারণের ফলে মরু অঞ্চলে বিভিন্ন ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়। যেমন –

ধান্দ – তীব্র বায়ুপ্রবাহে মরু অঞ্চলের বালি অপসারিত হওয়ার ফলে ছোটো-বড়ো নানা আকৃতির গর্তের সৃষ্টি হয়। রাজস্থানের মরু অঞ্চলে এই ধরনের ছোটো-বড়ো বিভিন্ন আকৃতির গর্তগুলিকে বলা হয় ধান্দ।

অবনত ভূমি বা ব্লো আউট – অনেক সময় বায়ুর অপসারণ ক্রিয়ায় ভূপৃষ্ঠে সুবিশাল অবনত অঞ্চলও গঠিত হয়। উদাহরণ মিশরের কাতারা হল একটি অবনত ভূমি।

মরুভূমিতে বায়ুর অপসারণ প্রক্রিয়ায় অবনত অঞ্চল (মরুদ্দ্যান) এ গঠিত জলাশয়।

মরূদ্যান – বিশাল অঞ্চল জুড়ে বহুদিন ধরে বালি অপসারিত হতে হতে যদি অবনত অংশটির গভীরতা ভূগর্ভের জলস্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তবে সেখানে মরূদ্যান (oasis) গড়ে ওঠে। মরুদ্যান শুষ্ক ও রুক্ষ মরুভূমিতে মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণীর জীবনরক্ষা করে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াধ একটি বিশালাকৃতির মরূদ্যানের ওপর অবস্থিত।

বায়ুর ক্ষয়কার্যের প্রভাব কোথায় সর্বাপেক্ষা বেশি?

পৃথিবীর যেসব এলাকায় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ 25 সেন্টিমিটারের কম সেইসব উষ্ণ মরু অঞ্চল বা মরুপ্রায় অঞ্চলে স্বাভাবিক উদ্ভিদ খুবই কম জন্মায়। ফলে ভূমি প্রায় অনাবৃত এবং চারপাশ উন্মুক্ত থাকে বলে বায়ু তীব্র গতিতে প্রবাহিত হয় ও ক্ষয়কার্য করে। তা ছাড়া, এইসব অঞ্চলে যান্ত্রিক আবহবিকারের প্রাধান্যের জন্য স্বাভাবিকভাবে প্রচুর শিলাচূর্ণ, বালিকণা প্রভৃতির সৃষ্টি হয়। এজন্য উষ্ণ-মরু অঞ্চল তথা শুষ্ক অঞ্চলেই বায়ুর ক্ষয়কার্যের প্রভাব সর্বাপেক্ষা বেশি হয়।

উপকূল অঞ্চলে বায়ুর কাজ বেশি কার্যকরী কেন?

উপকূলীয় অঞ্চলে —

  • বাধাহীন উপকূল – বাতাস বাধাহীনভাবে সমুদ্রের দিক থেকে স্থলভাগের দিকে এগিয়ে আসে তাই উপকূলীয় অংশের বালিকে সহজে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে।
  • সমুদ্রের তরঙ্গ – উপকূলভাগে সমুদ্রের ঢেউ আছাড় খেয়ে খেয়ে শিলা ভেঙে বালিতে পরিণত করে।
  • বালি সঞ্চয় – উপকূলের ওইসব বালি সমুদ্রের বাতাস উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে কাছাকাছি কোথাও জমা করে বালিয়াড়ি তৈরি করতে পারে। দিঘা এবং কাথি অঞ্চলে এমন বালিয়াড়ি দেখা যায়।

পৃথিবীর কোথায় কোথায় মরুভূমি দেখা যায়?

পৃথিবীর মোট স্থলভাগের প্রায় 1/3 ভাগ বা 30 ভাগ মরুভূমির অন্তর্গত। এগুলি বেশিরভাগই রয়েছে নিম্ন অক্ষাংশে এবং মধ্য অক্ষাংশে।

নিম্ন অক্ষাংশের মরুভূমি – পৃথিবীর উভয় গোলার্ধে 20-30° অক্ষাংশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মরুভূমি রয়েছে। এখানকার মরুভূমিগুলি মহাদেশের পশ্চিমদিকে গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে –

  1. আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমে মরক্কো থেকে সাহারা
  2. এশিয়ার আরব মরুভূমি, বেলুচিস্তানের মরুভূমি, ভারতের থর
  3. উত্তর আমেরিকার পশ্চিমে সোনোরান
  4. দক্ষিণ আমেরিকার চিলি এবং পেরুর আটাকামা
  5. আফ্রিকার কালাহারি
  6. পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমি উল্লেখযোগ্য।

মধ্য অক্ষাংশের মরুভূমি –

  1. এশিয়ার গোবি, তাকলা মাকান, তুর্কিস্তানের মরুভূমি।
  2. উত্তর আমেরিকার কলোরাডো মরুভূমি মধ্য অক্ষাংশের মরুভূমি।

মরুভূমিতে বালুকাকণা কীভাবে সৃষ্টি হয়?

মরুভূমিতে যেমন বৃষ্টি হয় না, তেমনি সেখানে বালির কণা সঞ্চিত হয়ে বালির সাগর তৈরি হয়। এই বালির কণা সৃষ্টির মূল কারণ হল প্রধানত উষ্ণতার পার্থক্য। দিনেরবেলা মরুভূমির উষ্ণতা প্রায় 45°-50° সে বা তার বেশি পর্যন্ত উঠে যায়। আবার, রাতে তাপমাত্রা প্রায় 8-10° সে-এর কাছাকাছি নেমে আসে। এতে শিলার খনিজের ওপর খুব চাপ পড়ে। শিলার আবহবিকার ঘটে ও শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়। শেষে এগুলি বালির কণায় পরিণত হয়। গ্র্যানাইট, নিস্ প্রভৃতি শিলাখণ্ডগুলি ভেঙে বালির কণার সৃষ্টি করে। এইসব কণার মধ্যে কোয়ার্টজ কণা থাকে। যা শিলাকে ক্ষয় করতে সাহায্য করে।

মরূদ্যান কীভাবে সৃষ্টি হয়?

মরু অঞ্চলে বায়ুর অপসারণ প্রক্রিয়ার ফলে মরুভূমির বালি অনেক সময় এক স্থান থেকে আর-এক স্থানে উড়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে মরুভূমির কোনো অংশে এই প্রক্রিয়া চললে সেই স্থানের ভূমিভাগ অবনত হয়ে যায়। এইভাবে বালি অপসারিত হতে হতে যখন অবনত এলাকাটির গভীরতা ভূগর্ভের জলস্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন সেখানে মরূদ্যান সৃষ্টি হয়।

আরও পড়ুন – হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপের বর্ণনা দাও

পৃথিবীর অভ্যন্তর হল বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এবং শক্তির উৎস যা পৃথিবীর পৃষ্ঠে পর্বতমালা, মালভূমি, উপত্যকা এবং সমভূমি তৈরি করেছে। এই ভূমিরূপগুলি বাহ্যিক শক্তি এবং প্রক্রিয়া দ্বারা আকৃতি এবং পরিবর্তিত হয়, যাকে বলা হয় এক্সোজেনিক প্রক্রিয়া বা বহির্জাত পক্রিয়া। এক্সোজেনিক প্রক্রিয়াগুলির অধ্যয়ন ভূগোলের একটি অপরিহার্য অংশ, এবং এটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কিভাবে পৃথিবীর পৃষ্ঠ সময়ের সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে।

মাধ্যমিক ভূগোল বিষয়ের প্রথম অধ্যায়ে, শিক্ষার্থীরা এক্সোজেনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে শিখে। অধ্যায়টি বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে, যেমন আবহাওয়া, ক্ষয়, জমা এবং গণ অপচয়। এই বিষয়গুলি মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহারে, পৃথিবীর পৃষ্ঠ এবং সময়ের সাথে সাথে এর পরিবর্তনগুলি বোঝার জন্য এক্সোজেনিক প্রক্রিয়াগুলির অধ্যয়ন গুরুত্বপূর্ণ। ভূগোল অধ্যয়নরত ছাত্রদের তাদের পরীক্ষায় ভাল পারফর্ম করার জন্য এবং তাদের চারপাশের বিশ্ব সম্পর্কে আরও ভালভাবে বোঝার জন্য এই ধারণাগুলির একটি ভাল ধারণা থাকা উচিত।

Rate this post


Join WhatsApp Channel For Free Study Meterial Join Now
Join Telegram Channel Free Study Meterial Join Now

মন্তব্য করুন