দশম শ্রেণি – বাংলা – প্রলয়োল্লাস – সামগ্রিক বিষয়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর


প্রলয়োল্লাস কবিতায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের চিরন্তন আশাবাদ ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি দেখতে পান যে, ভারতবর্ষ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। দেশবাসী অত্যাচার ও শোষণের শিকার। এই অন্ধকারের অবসান ঘটাতে কবি প্রলয়ের আগমন কামনা করেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, প্রলয়ের মধ্য দিয়েই নতুন সৃষ্টির সূচনা হবে।

দশম শ্রেণি – বাংলা – প্রলয়োল্লাস – সামগ্রিক বিষয়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর

তোরা সব জয়ধ্বনি কর! – কাদের উদ্দেশ্যে কবির এই আহ্বান? কবিতায় কেন এই আহ্বানটি পুনরাবৃত্ত হয়েছে লেখো।

অথবা, তোরা সব জয়ধ্বনি কর। – তোরা বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে? তারা কেন জয়ধ্বনি করবে?
অথবা, প্রলয়োল্লাস কবিতায় একদিকে ধ্বংসের চিত্র আঁকা হয়েছে আবার অন্যদিকে নতুন আশার বাণী ধ্বনিত হয়েছে-কবিতা অবলম্বনে আলোচনা করো।

যাদের উদ্দেশে এই আহ্বান – ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কবি নজরুল ইসলাম দেশবাসীর উদ্দেশে এই আহ্বান জানিয়েছেন।

আহ্বানের পুনরাবৃত্তির কারণ – ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় মোট উনিশবার তোরা সব জয়ধ্বনি কর এই আহ্বানসূচক পঙ্ক্তিটি উচ্চারিত হয়েছে, যা বুঝিয়ে দেয় এই পঙ্ক্তিটিতেই কবি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। আসলে ‘প্রলয়োল্লাস’ হল ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃষ্টির বন্দনা। স্বাধীনতাপ্রিয় যে তরুণের দল তাদের দুর্জয় সাহস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে পরাধীনতা এবং সামাজিক বৈষম্যের অবসান ঘটাতে চায় কবি তাদেরই জয়ধ্বনি করতে বলেছেন। কবির কথায় তারা হল ‘অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল,’ কিন্তু তারাই সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে আঘাত করে নতুন চেতনা, বিপ্লবের বার্তাকে বয়ে আনে। অসুন্দরকে দূর করতে তারা আপাত ভয়ংকরের বেশ ধরে। এর মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে নবপ্রাণের প্রতিষ্ঠা ঘটে, প্রাণহীনতার বিনাশ হয়। জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে/জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ-লুকানো ওই বিনাশে। প্রলয়ংকর শিবের মতো রুদ্রমূর্তিতে যে বিপ্লবীশক্তির অভ্যুদয় ঘটে তারাই ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃষ্টির কারিগর। তাই তাদের অভ্যর্থনা জানাতে হবে সমাজকে সুন্দর করে তুলতে। এ কারণেই ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ পঙ্ক্তিটি পুনরাবৃত্ত হয়েছে কবিতায়। এ হল বিপ্লবী যুবশক্তির প্রতি কবির মুগ্ধ অভিবাদন।

প্রলয়োল্লাস কবিতার মূল বক্তব্য সংক্ষেপে আলোচনা করো।

অথবা, ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় প্রলয়ের মধ্যে কবি উল্লাস অনুভব করেছেন কীভাবে বুঝিয়ে লেখো।
অথবা, ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কবি প্রলয় ও আশাবাদের সুর কীভাবে ব্যক্ত করেছেন তা বর্ণনা করো।

  • প্রাককথন – কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ আসলে কবির জীবন-উল্লাসের কবিতা। শোষণ-বঞ্চনা, পরাধীনতার নাগপাশকে ছিন্ন করে জীবনের যে জাগরণ ঘটে, স্বাধীনতা আর সাম্যের ভোরে যার প্রতিষ্ঠা হয় তাকেই কবি স্বাগত জানিয়েছেন। গ্রন্থাকারে যে বছর (১৯২২) ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটি প্রকাশ পায় ওই একই বছরে ধূমকেতু পত্রিকার এক সংখ্যায় নজরুল লেখেন – পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে। সকল কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খলা মানা- নিষেধের বিরুদ্ধে।
  • সুন্দরের আবির্ভাব – ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাতেও দেখা যায় – সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল। পঙ্ক্তিটি দেখেই বোঝা যায় কবি স্পষ্ট বিদ্রোহের কথাই বলছেন। ভয়ংকরের বেশে এ হল সুন্দরের আবির্ভাব। প্রবল তেজ, বিপর্যয় নিয়ে যে বিপ্লবীশক্তির আগমন ঘটে তা প্রাথমিকভাবে শঙ্কিত করতে পারে, কিন্তু বিশ্বমায়ের আসন সে-ই পাতে।
  • চিরসুন্দরের প্রতিষ্ঠা – কবি দেখেছেন অন্ধ কারার বন্ধ কূপে/দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যুপে -এই ‘দেবতা’ স্বাধীনতার প্রতীক। এখান থেকে মুক্ত হয়ে তার আগমনের সময় হয়ে গিয়েছে। রথচক্রের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তাই আলোচ্য কবিতায় কবি বলেছেন যে ধ্বংস দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, প্রাণহীন অসুন্দরকে বিনাশ করতেই এই ধ্বংস। এরপরই চিরসুন্দরের প্রতিষ্ঠা ঘটবে। তাকেই স্বাগত জানানোর জন্য সকলকে আহ্বান করেছেন কবি।

প্রলয়োল্লাস কবিতাটিতে কবির রচনারীতির যে যে বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে, তা লেখো।

  • রচনাশৈলী – বাংলা সাহিত্যে ‘বিদ্রোহী’ কবি হিসেবে নজরুলের প্রতিষ্ঠা হলেও সেই বিদ্রোহের সুরকে কবিতায় সার্থক করে তুলেছিল নজরুলের অনবদ্য রচনাশৈলী। এক্ষেত্রে শব্দ ব্যবহারের বৈচিত্র্য তাঁর কবিতাকে বিশিষ্ট করে তুলেছিল।
  • শব্দ প্রয়োগ – পবিত্র সরকার নজরুল সম্পর্কে বলেছেন – বাংলার প্রায় সমস্ত কবির তুলনায় নজরুলের অভিধান বিস্তৃততর। কিন্তু আরবি-ফারসি শব্দের যে বিপুল ব্যবহার সাধারণত নজরুলের কবিতায় দেখা যায় তা ‘প্রলয়োল্লাস’-এ নেই। বরং তৎসম শব্দবাহুল্য এই কবিতায় ধ্বনিময়তা থাকা সত্ত্বেও গাম্ভীর্য নিয়ে এসেছে। যেমন – দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা ভয়াল তাহার নয়নকটায়/দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়!
  • পঙ্ক্তি বিন্যাস – কবিতার চালে একইসঙ্গে উচ্ছ্বাস আর গাম্ভীর্য মিলে যাওয়া নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। কবিতার পঙ্ক্তিগুলি অসম। কিন্তু তারই অন্ত্যমিল সার্থকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রায় ধ্রুবপদের মতো ফিরে এসেছে। তোরা সব জয়ধ্বনি কর!এই পঙ্ক্তিটি। এই জয়ধ্বনিই কবিতার মূলকথা। এই জয়ধ্বনি স্বাধীনতার, নবযুগের।
  • ভাষা ও ছন্দের মিশেল – বিপ্লবীশক্তির যে জীবনোল্লাস কবিতার প্রাণ তাকে ভাষা এবং ছন্দের মধ্যে অনায়াসে মিশিয়ে দিয়েছেন কবি। তীব্র বেদনা, ক্রোধ, সেখান থেকে নতুন জাগরণের স্বপ্ন-কবিতার নির্মাণকে ছুঁয়ে আছে ভালো করেই।

প্রলয়োল্লাস কবিতা অবলম্বনে কাজী নজরুল ইসলামের সংগ্রামী চেতনার পরিচয় দাও।

  • কথামুখ – কবি নজরুল কলমকে তরবারিতে রূপান্তরিত করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অংশীদার হয়েছিলেন। ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটি কবির সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার অনবদ্য প্রকাশ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়েই নজরুলের কবিপ্রতিভার বিকাশ ঘটে।
  • সামাজিক অবক্ষয় – তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন সমকালীন সমাজের সর্বব্যাপী অবক্ষয়ের রূপ। এই পচনশীল সমাজ ধ্বংস করে নতুন সমাজ গড়ার অদম্য ইচ্ছা বুকে নিয়ে কবি মহাকালরূপী শিবের আগমন কামনা করেছেন।
  • নটরাজ শিবের আগমন – নজরুল জানেন, সর্বব্যাপী দুর্দশা আর অবক্ষয় থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে রক্ষক ও সংহারক নটরাজ শিবকেই প্রয়োজন। এই অলৌকিক শক্তিই সামাজিক পাঁকে ফোটাবে মানবিকতার পদ্ম।
  • সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা – মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হলেই সমাজে সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা হবে। তার জন্য জীর্ণতার অবসান চাই। ধ্বংসরূপী শিব তাঁর বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে রুদ্রমূর্তিতে আবির্ভূত হবেন। তিনি ভেঙে দেবেন জড়তাগ্রস্ত, বিপথগামী সমাজকে।
  • শিবের সংহারক মূর্তি – সমগ্র কবিতায় প্রলয়রূপী শিবের সংহারক মূর্তিকেই কবি তুলে ধরেছেন। নজরুলের সংগ্রামী চেতনার পথেই নটরাজ শিবের আবাহন সূচিত হয়েছে। এই শিবই দিনবদলের সূচনা করবেন।
  • দেশপ্রেমের স্বরূপ – শিবের প্রতীকে নজরুল তারুণ্যের শক্তিকে মর্যাদা দিয়েছেন। সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠার জন্য কবির এই চেষ্টা তাঁর দেশপ্রেমের স্বরূপকেই স্পষ্ট করে তোলে।

প্রলয়োল্লাস কবিতায় নজরুল সমাজ পরিবর্তনের যে ইঙ্গিত দিয়েছেন তার বর্ণনা দাও।

অথবা, ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার পটভূমি আলোচনা প্রসঙ্গে নজরুলের কবিমানসের পরিচয় দাও।

  • কথামুখ – ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে ইংরেজ সরকার সন্ত্রস্ত হয়ে কঠোর দমননীতির আশ্রয় নিয়েছিল। এর সঙ্গে কবি পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, বিপ্লবীরা দেশের স্বাধীনতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
  • মূল্যবোধের অবক্ষয় – আবার, ধর্মের নামে ভণ্ডামি চলছে চারিদিকে। মেকি দেশনেতারা স্বার্থের খেলায় মেতে উঠেছে। কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয়কে আরও সর্বব্যাপী করেছে।
  • সমাজ পরিবর্তন – এই অবস্থায় নজরুল উপলব্ধি করেছিলেন যে আগে সমাজকে পালটাতে হবে। জড়তাগ্রস্ত মৃতপ্রায় মানুষকে জীবনের আলোয় ফিরিয়ে আনতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন প্রলয়রূপী শিবের মতো কোনো অলৌকিক শক্তিকে।
  • সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা – সত্য ও সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে জাতিকে গ্রাস করবে অসুন্দর। কবি কামনা করলেন নটরাজ শিবের আবির্ভাবকে। এই নটরাজ শিবই হলেন নববিধানের বাণীবাহক। তিনিই জীর্ণ সমাজকে ধ্বংস করে সত্য ও সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করবেন। আর আশাবাদী হলেন এই ভেবে – এবার মহানিশার শেষে/আসবে ঊষা অরুণ হেসে।
  • জয়ধ্বনি – নবসৃষ্টির কামনায় জয়ধ্বনি দিলেন সেই প্রলয়ংকরের। ধ্বংস দেখে ভয় নয়, বরং সৃষ্টিসুখের উল্লাসে টগবগিয়ে উঠল কবিমন। সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় কাল – ভয়ংকরের ভীষণমূর্তি তখন আর ভীতিজনক মনে হল না। বরং তাঁকে বরণ করার প্রত্যাশায় কবি দেশবাসীকে আহবান জানালেন।

কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার নামকরণ কতদূর সার্থক হয়েছে বিচার করো।

নামকরণ হল যে-কোনো সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষেত্রেই প্রবেশের মূল চাবিকাঠি। নামকরণের মধ্য দিয়েই রচয়িতা তার রচনাটি সম্বন্ধে ধারণা দিয়ে থাকেন। আলোচ্য ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটিতে কবি নজরুল ইসলামের শুভচেতনার বাণীরূপ প্রকাশিত হয়েছে। সত্য, শিব ও সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করতে কবি এই কবিতায় ধ্বংসের দেবতা শিবকে আহবান করে এনেছেন। ‘প্রলয়োল্লাস’ নামকরণটির মধ্য দিয়েই শিবের ভাঙাগড়ার গভীর তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে।

শিব হলেন প্রলয়ের দেবতা। একদিকে তিনি যেমন সৃষ্টিকর্তা, অন্যদিকে তেমনই ধ্বংসকর্তা। আলোচ্য কবিতায় প্রলয়দেবের ধ্বংসাত্মক মূর্তিই প্রধান। তিনি আসছেন কালবৈশাখী ঝড়ের রূপ ধরের সামাজিক অসংগতি, ধর্মান্ধতা, পরাধীনতা এবং সর্বব্যাপী অন্যায়- অবিচারের অবসান ঘটাবেন নটরাজ শিব। তাঁর আগমনে কবি আকাশে নতুনের পতাকা উড়তে দেখেছেন। প্রলয়নেশায় নৃত্যপাগল শিব বন্দি ভারতীয়দের মুক্তি দেবেন। মহাভয়ংকররূপে বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে তিনি আসছেন। জগৎজুড়ে তৈরি হয়েছে আতঙ্কের পরিবেশ। কিন্তু কবি বলতে চেয়েছেন সেই আতঙ্ক সাময়িক। কারণ মহাকাল শিব নিত্য ভাঙাগড়ার খেলায় মগ্ন। সামাজিক অন্ধকার দূর করে, তিনিই শুভচেতনার উদয় ঘটাবেন। নতুন সৃষ্টির জন্য ভাঙন তাঁর নেশা। তাই প্রলয়ের সময়ও তাঁর উল্লাস দেখা যায়। কবিও সেই কথাই বলেছেন – প্রলয় বয়েও আসছে হেসে/মধুর হেসে। কবির অভিপ্রেত বক্তব্যকে সামনে রাখলে কবিতাটির নামকরণ সার্থক বলেই মনে হয়।

কবি প্রলয়ের মধ্য দিয়ে অন্ধকারের অবসান ও নতুন সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। প্রলয়োল্লাস কবিতার শিক্ষা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে। কবির আশাবাদ ও বিশ্বাস আমাদেরকে শক্তি দেয়।

Rate this post


Join WhatsApp Channel For Free Study Meterial Join Now
Join Telegram Channel Free Study Meterial Join Now

মন্তব্য করুন